Monday, 17 January 2022

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ৫৫

 




#স্বপ্নলোকের_চাবি_৫৫

“ভ্রমর কইও গিয়া, শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে আমার অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে…”

বাইরে বৃষ্টির শব্দ আর বারান্দায় অশোকের গান মিলে এক অপূর্ব ঐকতান সৃষ্টি হয়েছে। অশোকের গলায় সুর আছে। ভ্রমর রে … বলে কী অনায়াসে তার গলা উঠে যায় সুরের সিঁড়ির উঁচ্চতম ধাপগুলিতে। অথচ সে নাকি কখনো গান শেখেনি। না শিখেই সে এমন গাইতে পারে, শিখলে যে কী করতো জানি না। কেমন যেন ঈর্ষা হয় আমার। কান পেতে শুনতে থাকি। খালি গলায় বিচ্ছেদের গান শুনতে শুনতে কেমন যেন উদাস লাগছিলো।

কিন্তু আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে বিরহের গান শুনতে হয় একাকী। আনন্দভ্রমণে এসে বিরহের গান আমার সঙ্গীদের অনেকের কাছেই অসহ্য লাগছিলো। তাই অশোক বড়ুয়ার গানের বিরহজ্বালায় অঙ্গ জ্বলে যাবার বেদনায় একটুও কাতর না হয়ে মানস চক্রবর্তী অর্থাৎ আমাদের মানসদা চিৎকার করে উঠলো “বন্ধু, জ্বালাইয়া গেলা মনের আগুন নিভাইয়া গেলা না।“ মানসদার গলায় একফোঁটা সুর নেই, এবং সেজন্য কোন লজ্জাও নেই। বেসুরো গলায় চিৎকার করতে তার একটুও বাধে না। সে যেটা নিয়ে চিৎকার করছে সেটাও ধরতে গেলে বিরহেরই গান – কিন্তু সে যেভাবে ধরেছে তাতে মনে হচ্ছে ওটা অগ্নিযুগের বিপ্লবী গান। তার সাথে সাথে অন্যরাও যেভাবে “যালাইয়া” বলে চিৎকার করছে – মনে হচ্ছে সুযোগ পেলে এখনই আগুন জ্বালিয়ে দেবে।

পান্থনিবাসের বারান্দায় প্রায়-গভীর রাতে বসেছে আমাদের গানের আসর। কক্সবাজারে এখন অফ-সিজন। এই শ্রাবণে পর্যটকদের সংখ্যা খুবই কম। সে কারণেই হয়তো পর্যটন কর্পোরেশনের এই হোটেলটার প্রায় পুরোটাই এখন আমাদের দখলে। বড় বড় একেকটা রুমে আটটি করে বিছানা। ডিপার্টমেন্টের প্রায় সব ছাত্র-ছাত্রী চলে এসেছি আজ এখানে। আমাদের সাথে এসেছেন অরুনস্যার, হারুনস্যার, শংকরলালস্যার আর হামিদাবানুম্যাডাম। স্যার-ম্যাডামদের জন্য আরো ভালো রুমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্যার-ম্যাডামরা নিজেদের রুমে চলে গেছেন একটু আগে। মেয়েরাও সবাই চলে গেছে যার যার রুমে। আমরা বসে পড়েছি রুমের বাইরে বারান্দার ফ্লোরে। আগস্ট মাসে যেরকম গরম পড়ার কথা, এখন বৃষ্টি হচ্ছে বলে সেরকম গরম নেই, মশা-মাছিও নেই।

ফাইনাল পরীক্ষা সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরে সরে যেতেই আমাদের হঠাৎ পাখা গজিয়ে গেল। জানা গেল ঢাকা-সফর শেষে আমাদের কিছু টাকা বেচে গেছে। সুতরাং সেই টাকা খরচ করে ফেলতে হবে। কীভাবে? শাকিল বললো, “আরেকটা শিক্ষা-সফরে যেতে হবে।“

“মাফ চাই ভাই। আর শিক্ষা-সফরের দরকার নেই। পিকনিক করতে চাও তো রাজি। ব্যানারে শিক্ষাসফরের বদলে আনন্দভ্রমণ লেখ। অবশ্যই যাবো।“

ব্যানার বদলানো হলো। যা টাকা বেচেছিলো তাতে এক দিনের সফর হয়। সেটাকে দুদিনের সফর করার জন্য মাথাপিছু দেড়শো টাকা চাঁদা দিতে হলো।

পরীক্ষা নাও পেছাতে পারে এই আশংকায় কিছুদিন বইখাতার সাথে সম্পর্কটা যথাসম্ভব দৃঢ় করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পরীক্ষা আরো দু’মাস পিছিয়ে গেছে জানতে পারার পর সেই সম্পর্ক আবার শিথিল হয়ে গেল। এবং সেই শিথিলতা এখনো চলছে।

আগস্টের সাত তারিখ অর্থাৎ আজ সকালে প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে দুইটি বাসভর্তি হয়ে আমরা ইউনিভার্সিটি থেকে কক্সবাজারে চলে এলাম।

সোবহানস্যার এরকম সময়ে আমাদেরকে পিকনিক করার অনুমতি দিতে চাননি। কিন্তু হামিদাবানুম্যাডামের কারণে শেষপর্যন্ত অনুমতি দিয়েছেন। আমাদের অনেকেই পরীক্ষার আগে পিকনিকে আপত্তি তুলেছিল। অনেকে আসেওনি। যীশু ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আসতে পারেনি তার বাসায় একটা অনুষ্ঠান থাকার কারণে। কিন্তু এটাই আমাদের ছাত্রজীবনের শেষ পিকনিক। এরপর আমরা সবাই আবার একসাথে হবার সুযোগ আর নাও পেতে পারি। পরীক্ষার পর কে কোথায় ছিটকে যাবো তার কোন ঠিক নেই। মনের ভেতর এরকম একটা হারাই-হারাই অনুভূতি কাজ করছে। তাই প্রতিটা মুহূর্তই খুব গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে।

এখানে কোন নির্দিষ্ট প্ল্যান নেই। আগামীকাল সন্ধায় চলে যাবার আগপর্যন্ত কোন নিয়মের বাধ্যবাধকতা নেই। যার যেরকম খুশি ঘুরে বেড়াতে পারি। বেড়াতে এসে সময়সূচির বারাবাড়ি রকমের কড়াকড়ি থাকলে কেমন যেন দমবন্ধ লাগে। এবার তা নেই, তাই বেশ আরাম লাগছে।

খাওয়াদাওয়ার পর অনেকেই ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে নিজেদের মতো বের হয়ে গেল। আমরা চললাম সৈকতের দিকে। সমুদ্রসৈকত হোটেল থেকে খুব বেশি দূরে নয়। ঝিনুকমার্কেটের কাছাকাছি গিয়ে দেখলাম মেয়েরা সবাই দাঁড়িয়ে আছে। সবাই দলবেঁধে শপিং করতে বের হয়েছে। কিন্তু মার্কেটে না ঢুকে সবাই রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে কেন?

না, ঠিক দাঁড়িয়ে নেই, রিক্সা ঠিক করছে।

“কি রে, কই যাস তোরা?” – রিনা আর লিপিকে সামনে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

“জেসমিনের বাসায়।“

“জেসমিনের বাসা এখানে?”

“ঝাউতলার ওদিকে। ওর শ্বশুরবাড়ি।“

“আমাদেরকে ফেলে যাচ্ছিস?”

“যাবি তোরা? এভাবে হাফ-প্যান্ট পরে?“

তাই তো। সমুদ্রে নামার জন্য প্রস্তুত হয়ে এসেছি। এভাবে কারো শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া যায় না।

জেসমিনদের বাসা ঝাউতলার ভেতরে। ওদিকের রাস্তা ছোট, বাস যাবে না। নইলে বাস নিয়ে যেতে পারতো। এখন রিকশায় যেতে হবে। দশ বারোটা রিকশার দরকার। ততটা রিকশা একসাথে পাওয়া যাচ্ছে না। যেটা পাওয়া যাচ্ছে সেটাতে দু’জন করে উঠে যাচ্ছে। দিলারা আর ডল আপা দাঁড়িয়েছিল কাছাকাছি। একটা রিকশা আসতেই দিলারা উঠে বসার পর ডল আপা উঠে বসতেই হিসসস করে একটা শব্দ হলো। রিকশার পেছনের চাকার হাওয়া বের হয়ে গেল। এরকম পরিস্থিতিতে ‘লাফিং ডিজিজ’ মহামারির রূপ নেয়। প্রদীপ নাথ আর আমি হাসি সামলাতে পারি না সেটা জানা কথা। কিন্তু লিপি যে হাসতে হাসতে রাস্তায় বসে পড়বে তা চিন্তাও করিনি।

বৃষ্টি একটু থেমেছিল, আবার শুরু হলো। মেঘবৃষ্টি উপেক্ষা করে সৈকতের দিকে রওনা দিলাম। লোকজন তেমন নেই। ভাটার টানে পানি নেমে গেছে অনেকদূর। ভেজা বালিতে পা ফেলে হাঁটলাম অনেকদূর। ঝিনুকরা ফুটবল নিয়ে এসেছে।

সমুদ্র তার বিশালত্ব দিয়ে খুব কঠিন ধরনের মানুষকেও উদার করে দেয় সন্দেহ নেই। নইলে যে অরুনস্যারকে আমরা এত ভয় পাই – তিনি আমাদের সাথে ফুটবল খেলতে শুরু করেন কীভাবে। অরুনস্যার আমাদের ক্লাস খুব বেশি নেননি। যে ক’টা নিয়েছিলেন – প্রচুর বকাবকি করেছিলেন। কিন্তু এখন তাঁকে ততটা কড়া মনে হচ্ছে না। শুধুমাত্র ডিপার্টমেন্টে দেখে স্যার-ম্যাডামদের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা পাওয়া যায় না।

শুধুমাত্র স্যার-ম্যাডামদের কথা বলছি কেন। শুধুমাত্র ডিপার্টমেন্টে এবং ক্লাসে দেখে ক্লাসমেটদের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কেও কি পুরোপুরি ধারণা পাওয়া যায়? ক্লাসে প্রায় প্রতিদিনই একই ধরনের ঘটনা ঘটে বলে আমরা সবাই পরস্পরের সাথে প্রায় একই ধরনের ব্যবহার করি। ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছাড়া কয়জন সহপাঠীর ব্যক্তিগত জীবনের খবর রাখি আমরা? রাখা তো সম্ভব নয়। কোনো একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে তার হলের রুমমেট যতটুকু জানে, তার প্রেমিক কিংবা প্রেমিকাও ততটুকু হয়তো জানে না। ভালোবাসার বিশেষ মানুষের সাথে দেখা করার সময়টাকে আকর্ষণীয় করে তোলার একটা সযত্ন প্রয়াস থাকে। সেখানে কিছুটা হলেও কৃত্রিমতা থাকে, মন জয় করার জন্য কিছুটা হলেও অভিনয় থাকে।

বন্ধুদের সাথে পিকনিকে গেলে বিভিন্ন ঘটনার সাথে, বিভিন্ন মানুষের সাথে তাদের ব্যবহারের ভেতর দিয়ে বোঝা যায় তাদের ব্যক্তিত্বের স্বরূপ।

সন্ধ্যাবেলা শপিং-এ যাবার জন্য একটা বাস ঠিক করে রাখা হয়েছিল। পৌনে আটটার দিকে সেটাতে উঠে বসলাম। সম্ভবত আটটায় বাস ছাড়ার কথা। তখনো মিনিট দশেক বাকি। অনেকেই আসেনি তখনো। কিন্তু হারুন হঠাৎ ড্রাইভারের সাথে ঝগড়া লাগিয়ে দিলো। ঘটনাটি আমার চোখের সামনে না ঘটলে আমি বিশ্বাস করতে চাইতাম না যে আমার একজন সহপাঠী একজন বাস-চালকের সাথে এতটা দুর্ব্যবহার করতে পারে। হারুন বাসে উঠেই অর্ডার করলো, “হেই ড্রাইভার, গাড়ি স্টার্ট দাও।“ ড্রাইভার চুপচাপ বসে আছেন দেখে হারুন রেগে গেলো। “হেই, কথা কানে যায় না? স্টার্ট দিতে বললাম না?”

“শাকিলসাহেব আসুক আগে।“

“হু ইজ শাকিল?” তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো হারুন। মুহূর্তেই ড্রাইভারকে তুই-তোকারি শুরু করলো সে। “তোকে ভাড়া করে আনা হয়েছে। ইডিয়ট!” আমরা বাসে যারা ছিলাম সবাই হতভম্ব হয়ে গেলাম। একজন বয়স্ক ড্রাইভারকে কোন কারণ ছাড়াই এভাবে বকাবকি করার কারণ কী? শাকিল এই গাড়ি ঠিক করেছে। ড্রাইভার তো শাকিল ছাড়া আর কাউকে চেনেন না। আমার খুবই লজ্জা লাগছিলো। ড্রাইভার বাস থেকে নেমে দূরে গিয়ে তাঁর সহকারির সাথে কথা বলছেন।

ফারুক, প্রদীপ নাথ আর আমি নেমে ড্রাইভারের কাছে গেলাম। ভাষার একটা নিজস্ব শক্তি আছে। ভাষার ব্যবহারের উপর নির্ভর করে এই শক্তি। আর যে কোন অঞ্চলে সেই অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার আলাদা একটা কদর আছে। ড্রাইভারের সাথে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে অনেক দুঃখপ্রকাশ করে তার অপমান দূর করার চেষ্টা করলাম। শাকিল আসার পর বাস ছাড়লো।

হারুনকে জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে ছিল সে কেন এমন করছে। ঢাকায় গিয়েও সে অমলকে মেরেছিল, বাজে গালাগালি করেছিল। এখানে এসেও এরকম করছে। আরো অনেক সহপাঠীর সাথেও সে খারাপ ব্যবহার করেছে। প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান বিশ্বাস তার জেলার মানুষ। সেও বিএনপি করে – সেই কারণেই কি? নাকি এবারের পিকনিক কমিটিতে তাকে রাখা হয়নি সেই কারণে!

রাতের খাবারের পর হোটেলে এসে স্যার-ম্যাডামরা কিছুক্ষণ কথাবার্তা বললেন আমাদের সাথে। হারুণস্যার ডিপার্টমেন্টে যোগ দিয়েছেন ১৯৯০ সালে। দেড় বছর হয়ে গেলেও আমাদের ব্যাচের কোন ক্লাস তিনি নেননি এখনো। পাস করেই যোগ দিয়েছেন। পূর্ব-পরিচিত হলে আমরা তাঁকে হারুনভাই বলতে পারতাম। কিন্তু তাতে কি তিনি রেগে যেতেন? শুনেছি অনেকে নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হবার সাথে সাথেই তার বন্ধুদের কাছ থেকেও ‘স্যার’ ডাক আশা করেন।

গানের আসর শেষ হয়ে এলো। মানস চক্রবর্তীর গলার তেজ কমে এসেছে। সারাদিনে কম শক্তিক্ষয় হয়নি।

পরদিন সূর্য উঠার আগেই বিচে চলে গেলাম। এই বিচ থেকে সূর্যোদয় দেখা যায় না। গতকাল মেঘের কারণে সূর্যাস্তও দেখা যায়নি। আজ মেঘ না থাকলে সূর্যাস্ত দেখে তারপর রওনা দেবো এরকম প্ল্যান আছে।

ভোরবেলা অনেকেই চলে এসেছে। পানিতে নেমে গেলাম সবাই। হামিদাবানুম্যাডাম এসে যোগ দিলেন আমাদের সাথে। এমন রাশভারী ম্যাডামকেও দেখলাম পানিতে নেমে শিশুদের মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতে। যীশু না আসাতে তার ক্যামেরাও আসেনি। কিন্তু অনেকের হাতে হাতে ক্যামেরা। প্রচুর ছবি ওঠানো হলো, বিশেষ করে ম্যাডামের ছবি। কিন্তু এই ছবিগুলিকে যে একটা গোষ্ঠী ম্যাডামের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে তা তখন ধারণাও করতে পারিনি।

সকালে নাস্তা করার পর একটা জিপ ভাড়া করে হিমছড়িতে গেলাম রিনা, সুপর্ণা, দিলীপ, প্রদীপ নাথ, রাহুল, মোছাদ্দেক, ঝিনুকসহ আরো অনেকে মিলে। ওখান থেকে ফিরে দুপুরের খাবার খেতে খেতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। সূর্যাস্ত দেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু বৃষ্টি না হলেও আকাশে অনেক মেঘ। মেঘগুলি সূর্যাস্তের রঙে একটু রঙিন হলো – এছাড়া সূর্যাস্তের আর কোন আভাস দেখতে পেলাম না। সহপাঠীদের সাথে মিলে একসাথে শেষ সূর্যাস্ত দেখাটা হলো না।

দুটো গাড়ি একই সাথে রওনা দিলো। আমাদের গাড়ি আগে। রাস্তা খালি পেলেই গাড়ির গতি কেন অকারণে বাড়িয়ে দেয়া হয় জানি না। বর্ষাকালের ভেজা রাস্তা, তার উপর বৃষ্টি হচ্ছে। কেমন যেন ভয় লাগতে শুরু করে। সবার সামনের সিটে বসেছেন অরুনস্যার আর হারুনস্যার। শংকরলালস্যার আর হামিদাবানু ম্যাডাম কক্সবাজারে রয়ে গেছেন। কক্সবাজারে পোস্টার দেখেছি গণফোরামের মিটিং আছে। ডক্টর কামাল হোসেন সম্প্রতি গণফোরাম গঠন করেছেন আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে এসে। কমিউনিস্ট পার্টির সাইফুদ্দিন আহমদ মানিক যোগ দিয়েছেন তাঁর সাথে। হামিদাবানু ম্যাডাম গণফোরামে যোগ দিয়েছেন কিনা জানি না, তবে তাদের জনসভায় ম্যাডামের ভাষণ দেয়ার কথা আছে।

অরুনস্যার আর হারুনস্যারকে গান গাওয়ার জন্য অনুরোধ করতেই স্যাররা একের পর এক গান গাইতে শুরু করেছেন। অরুনস্যার রাশিয়ান গান গাইলেন। সুযোগ পেলেই আমরা স্যার-ম্যাডামদেরকে গান গাইতে বলি কেন? গান যদি তাঁরা না-ও জানেন, তবুও আমরা জোর করি। কারণটা কী? হতে পারে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের চেয়ে আমরা গানকে উপভোগ করি বেশি। নাকি গান উপভোগ করাটা সহজ? আসলেই কি? আমার তো মনে হয়, অনেক বছর পড়াশোনা করলে যে কারো পক্ষেই কোয়ান্টাম মেকানিক্স বোঝা সম্ভব। কিন্তু যার গলায় সুর নেই, তার পক্ষে কি অনেক বছর চেষ্টা করলেও গান শেখা সম্ভব?

এতসব চিন্তা করার মাঝখানেই হঠাৎ গাড়ি থেমে গেল রাস্তার মাঝখানে। কোন্‌ জায়গা এটা? রাস্তার দুপাশে ঘন বন। রামুর পরে চিরিঙ্গা পার হয়ে এসেছি মাত্র। এখানে মাঝেমাঝে ডাকাতি হয় শুনেছি। ঘটনা কী? গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। এই গাড়ি যাবে না। সবাইকে নামতে হবে। আমাদের পেছনের গাড়ি এলো আরো আধঘন্টা পর। ওইটাতে গাদাগাদি করে উঠলাম সবাই।

ভয়ে ভয়ে ছিলাম এতগুলি মানুষ নিয়ে গাড়ির চাকা না বাস্ট হয়ে যায় – দিলারা আর ডল আপার রিক্সার মতো। কিন্তু সেরকম কিছু হলো না। কিন্তু পটিয়ার কয়েক কিলোমিটার আগে চক্রশালা অতিক্রম করার পরপরই গাড়ির হেডলাইট নিভে গেল। আরাকান রোডে অন্ধকারে হেডলাইট ছাড়া গাড়ি চালানো মানে যে কোন সময় অন্য গাড়ি এসে ধাক্কা দেয়ার সম্ভাবনা। অনেক ধুকে ধুকে আস্তে আস্তে পটিয়া এসে একটা মেকানিক্যাল শপ থেকে হেড লাইট ঠিক করিয়ে শহরে আসতে আসতে রাত একটা বেজে গেল। ক্যাম্পাসে যেতে আরো চল্লিশ মিনিট।

ক’দিন পরে ডিপার্টমেন্টে দিলারাকে দিয়ে হামিদাবানুম্যাডাম খবর পাঠালেন দেখা করার জন্য। গেলাম তাঁর অফিসে। ম্যাডাম বললেন, “তোমার কাছে কি কক্সবাজারের কোন ছবি আছে? সেখানে আমার যদি কোন ছবি থাকে সেগুলি আমাকে একটু দিও তো।“

জানলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডানপন্থী শিক্ষকরা একজোট হয়েছেন হামিদাবানুম্যাডামের বিরুদ্ধে। তাঁদের অভিযোগ – ম্যাডাম নাকি কক্সবাজারে গিয়ে ছাত্রদের সাথে ‘অশালীন’ পোশাকে সমুদ্রে নেমেছেন!

কতটা জঘন্য মানসিকতার মানুষ হলে এরকম কথা বলতে পারেন কোন বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষক। ম্যাডাম পুরো সালোয়ার-কামিজ-ওড়না পরে সমুদ্রে নেমেছিলেন তাঁর সন্তানের মতো ছেলে-মেয়েদের সাথে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো আমাদের ভেতর থেকে কে সরবরাহ করেছে ম্যাডামের ছবি? ম্যাডামের কাছাকাছি থেকে ম্যাডামের ছবি তুলে সরবরাহ করার বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে কে এসেছিল আমাদের সাথে?

<<<<<<<< আগের পর্ব

Saturday, 8 January 2022

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ৫৪

 

#স্বপ্নলোকের_চাবি_৫৪

“ভারতের দালালেরা – হুসিয়ার সাবধান।“

“খুঁজে খুঁজে দালাল ধর, সকাল বিকাল জবাই কর।“ 

স্লোগানের শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো। মনে হচ্ছে আমার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দু’তিনজন মিলে এসব স্লোগান দিচ্ছে। চোখ খুলে দেখলাম এখনো ঘুটঘুটে অন্ধকার। ভোরের আলো ফুটলেই তার কিছুটা আমার রুমের পুবদিকের জানালায় আছড়ে পড়ে। এখনো সূর্য উঠেনি। মনে হচ্ছে জামায়াত-শিবিরের অতিউৎসাহী কর্মীরা ভোর হবার আগেই স্লোগানের গলা সাধছে আজকের হরতাল সফল করার জন্য। ফজরের নামাজ পড়েই রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়ার জন্য নেমে পড়বে।

কাল রাতে অনেক দেরি করে ঘুমিয়েছি। এত ভোরে এত হৈচৈ-এ মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। আমি জানি এদেরকে আপাতত ভয় পাবার কিছু নেই। আমার রুমে ঢুকে আমাকে মেরে ফেলতে চাইলে এরা যে কোনো সময় তা করতে পারে। তার জন্য স্লোগান দেয়ার কোন দরকার নেই। কিন্তু এরা তা করবে না। এদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বিরক্ত করা, মানসিক যন্ত্রণা দেয়া। 

দু’বারের পর বন্ধ হয়ে গেছে স্লোগান। হয়তো টয়লেট করতে এসে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছিল, এখন লাইন পেয়ে গেছে। টয়লেট-বাথরুম থেকে সমানে শব্দ আসছে - কল থেকে পানি পড়ার শব্দ ছাপিয়ে অন্যান্য আনুসঙ্গিক ব্যক্তিগত স্বয়ম্ভুত শব্দাবলি। 

জামায়াত-শিবিরের সাংগঠনিক দক্ষতা ঈর্ষনীয়। এই যে একটা ব্যক্তিমালিকানাধীন মেস – এটাও তারা নিজেদের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করে। তারা যেসব রুমে থাকে – সেগুলিতে সব সময় তাদের মতাদর্শের ছেলেরাই থাকতে আসে। অথচ এই বিল্ডিং-এর মালিক খানসাহেব আওয়ামী লীগের সমর্থক, তাঁর বড় ছেলে যুবলীগের নেতা। এই বিল্ডিং-এ আগে নিচের তলার সবগুলি রুমে শিবিরের ছেলেরা থাকলেও উপরের তলায় শিবির খুব একটা ছিল না। এখন উপরের তলার রুমগুলিতেও অনেক শিবির ঢুকে পড়েছে। খানসাহেব নিয়মিত ভাড়া পেলেই খুশি। 

ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে যাবার পর নিচের তলায় অনেকগুলি সিট খালি হয়েছিল। সেখানে যারা এসেছে তারা সবাই আগে যারা ছিল তাদের চেয়েও উগ্র। তাদের উপর কী নির্দেশ আছে জানি না, আমার দরজার কাছাকাছি এলেই তারা কোনো না কোনো মন্তব্য করবেই। গত ক’দিন থেকে চলছে “ভারতের দালাল” জাতীয় মন্তব্য। অথচ সামনাসামনি পড়লে এই ছেলেগুলির একটাও কোন কথা বলে না। আমার সাথে সরাসরি কোন কথাও হয় না, অথচ আমার সম্পর্কে যে ওদেরকে তথ্য দেয়া হয়েছে তা বোঝা যায়। মেজাজ খারাপ হলেও করার কিছু নেই। 

জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গোলাম আজমসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবিতে সারাদেশে গণসংযোগ শুরু হয়েছে। খালেদা জিয়ার সরকার জাহানারা ইমামসহ ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির চব্বিশ জনের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার মামলা করেছে। গণআদালতের রায় বাস্তবায়ন, জামাত-শিবির-ফ্রিডম পার্টিসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবিতে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আগামীকাল ২১ জুন সারাদেশে হরতাল ডেকেছে। 

এদিকে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আদলে জামায়াত আর ফ্রিডম পার্টি মিলে গঠন করেছে ‘ভারতীয় দালাল প্রতিরোধ কমিটি’। তারা আজ অর্থাৎ ২০ জুন হরতাল ডেকেছে সারাদেশে। কী নির্মম পরিহাস আমাদের স্বাধীনতাকে নিয়ে। যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে তারা গঠন করেছে ফ্রিডম পার্টি। এরশাদ তাদেরকে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বানিয়েছে। আর এখন এই বিএনপির আমলে জামায়াত আর ফ্রিডম পার্টি মিলে দেশের যারাই স্বাধীনতাবিরোধীদের বিরুদ্ধে কথা বলছে – তাদের সবাইকে ভারতীয় দালাল আখ্যা দিচ্ছে। বাংলাদেশের হিন্দুদেরতো ডাকনামই হয়ে গেছে ‘ভারতের দালাল’। সেই কারণেই আমার রুমের সামনে এসে শিবিরের ছেলেদের স্লোগান পায়। 

চোখ বন্ধ করে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু খুব একটা সুবিধা হলো না। এবার জুন মাসেই বৃষ্টি হচ্ছে খুব। খুব বেশি বৃষ্টি হলেই ইদানীং নতুন টেনশান শুরু হয় – কখন রুমে পানি ঢুকে যায়। প্রথমবার পানি ঢোকার পর আরো তিন বার পানি ঢুকেছে। 

সারাদিন কোথাও যাবো না ভেবেছিলাম। দুপুরের দিকে একবার রাস্তায় বের হয়ে হেঁটে এসেছি ফতেয়াবাদ পর্যন্ত। হরতাল সফল করার জন্য হাটহাজারী মাদ্রাসার হাজার হাজার ছাত্র রাস্তায় নেমে গেছে সকাল থেকে। ওরা হাটহাজারি থেকে এদিকে ছরারকুল পর্যন্ত চলে এসেছে। ফতেয়াবাদে একটি মাদ্রাসা আছে। ওখানকার ছাত্র-শিক্ষক সবাই রাস্তায় নেমে গেছে। জাহানারা ইমামকে ‘জাহান্নামের ইমাম’ বলে গালি দেয়াকে তাদের অবশ্যকর্তব্য বলে মনে হচ্ছে। একটা স্বাধীন দেশে যুদ্ধাপরাধীরা এমন প্রকাশ্যে হরতাল করছে এটা শুধুমাত্র বাংলাদেশেই সম্ভব। 

সরকারি ছত্রছায়ায় তারা যে কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে তার প্রমাণ পাওয়া গেল সন্ধায়। খবরে শুনলাম ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সমাবেশ ও অফিসে হামলা করেছে তারা। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে তারা পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। আহত হয়েছে কয়েক হাজার। এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশের মাটিতে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কোনোদিনও সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। 

বিএনপি নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি বলে পরিচয় দেয়। প্রায়ই এমন কথা বলে যেন বঙ্গবন্ধু কিংবা আওয়ামীলীগ কিছুই না, তারাই দেশের স্বাধীনতা এনেছে। কিন্তু তারাই এখন স্বাধীনতাবিরোধীদের রক্ষার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। হুমায়ূন আজাদ ঠিক কথাই বলেছেন – “একবার রাজাকার মানে চিরকাল রাজাকার; কিন্তু একবার মুক্তিযোদ্ধা মানে চিরকাল মুক্তিযোদ্ধা নয়।“

হুমায়ূন আজাদের প্রবচনগুচ্ছ প্রকাশিত হয়েছে এবছরের বইমেলায়। আজ ওটা পড়লাম আবার। তাঁর সবগুলি উক্তির সাথে একমত না হলেও অনেকগুলি উক্তি আমার কাছে অত্যন্ত কালজয়ী বলে মনে হয়। যেমন “স্বার্থ সিংহকে খচ্চরে আর বিপ্লবীকে ক্লীবে পরিণত করে।“, “সৎ মানুষ মাত্রই নিঃসঙ্গ, আর সকলের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু।“ 

সৎ মানুষ যে নিঃসঙ্গ আর সুযোগ পেলেই সবাই এই নিঃসঙ্গ সৎ মানুষকে আক্রমণ করে তা আমি প্রামাণিকস্যারের ক্ষেত্রে প্রায়ই ঘটতে দেখছি। ডিপার্টমেন্টে প্রামাণিকস্যার অনেকটাই কোণঠাসা। সোজাসাপ্টা সত্য কথা বলার জন্য তাঁর সামনে সবাই কেমন যেন টেনশানে থাকেন। রমজান মাসে একদিন তাঁর বাসায় গিয়েছিলাম থিসিসের কাজে। প্রশস্ত বারান্দায় বসে স্যার তাঁর কোয়ান্টাম মেকানিক্স বইয়ের পান্ডুলিপি টাইপ করতে করতে আমার সাথে কথা বলছিলেন। আমাকে চা আর পাঁপড় খেতে দেয়া হলে আমি সসংকোচে খাচ্ছি। এসময় শিবিরের চার-পাঁচজন ছেলে এসে স্যারের দরজায় খুব রুক্ষভাবে দাঁড়ালো। বারান্দায় গ্রিলের দরজা, বাইরে থেকেই সবকিছু দেখা যায়। তাদের কয়েকজনের দৃষ্টি আমার সামনে রাখা চা আর পাঁপড়ের দিকে। 

“কী জন্য এসেছো তোমরা?” – স্যার তাঁর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন তাদের।

ওদের নেতা গলার রগ ফুলিয়ে বেশ উচ্চস্বরে বললো, “এই রোজার সময় রোজা না রেখে সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে খাচ্ছেন – কারণটা কী? মুসলমান হিসেবে তো আপনার লজ্জা পাওয়া উচিত।“

“আমার কী করা উচিত আর না করা উচিত তা আমাকে বলার দায়িত্ব তো তোমাদের দেয়া হয়নি। এতই যদি রোজাদার হও, তাহলে তো তোমাদের এখন মসজিদে বসে এবাদত করার কথা। আমার বাসায় আসার তো কথা নয়।“ – স্যার উত্তেজনাহীন স্বাভাবিক গলায় বললেন।

“এর ফল কিন্তু ভালো হবে না। বলে গেলাম।“ – একজন সিনিয়র প্রফেসরকে বাসায় এসে এভাবে প্রকাশ্যে ধমক দিচ্ছে কিছু ছাত্র! এতটা স্পর্ধা এদের হয় কী করে! সৎ মানুষরা নিঃসঙ্গ বলেই তো। সব সৎ মানুষ জোটবদ্ধ হতে পারলে অসৎদের এতটা স্পর্ধা কোনদিনই হতো না। 

আমার নিজেকে কেমন যেন অপরাধী মনে হচ্ছিল। রোজার সময় স্যারের বাসায় আর যাইনি। পরে শুনেছি ঈদের দিন স্যারের বাসায় শিবিরের ছেলেরা তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। স্যার প্রক্টর থেকে শুরু করে ভিসিপর্যন্ত সবাইকে ফোন করার পরেও তালা খোলার লোক এসেছে প্রায় ছয় ঘন্টা পর। সবাই পরোক্ষভাবে স্যারকেই দায়ী করেছেন এই ঘটনায়। 

প্রামাণিকস্যারকে যতই দেখছি ততই অবাক হচ্ছি তাঁর নীতিনিষ্ঠতায়। এরজন্য আমাকেও অনেক কষ্ট পেতে হবে তা বুঝতে পারছি। স্যার ইতোমধ্যে সলিড স্টেট ফিজিক্সের একটা বই লিখেছেন। বইটির বাঁধানো পান্ডুলিপি আমি দেখেছি। ফিজিক্সের শিক্ষার্থীদের জন্য চমৎকার একটা টেক্সট বই। ইউনিভার্সিটি প্রেসের উচিত এই বই প্রকাশ করার। কিন্তু প্রামাণিকস্যার বিশ্ববিদ্যালয়প্রশাসনের প্রিয় ব্যক্তি নন। তাই তাঁর বই ছাপানো হচ্ছে না। এশিয়াটিক সোসাইটি তাঁর “রিলিজিয়াস অ্যান্ড সায়েন্টিফিক ভিউজ অব দ্য ইউনিভার্স” বইটি প্রকাশ করার জন্য রাজি হয়েছিল। কিন্তু মৌলবাদীরা স্যারের সেই বিষয়ে সেমিনার ভন্ডুল করে দেয়ার পর এশিয়াটিক সোসাইটিও  পিছিয়ে গেছে। এতেও দমে না গিয়ে প্রামাণিকস্যার এখন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বই লিখছেন। এই বইটিও হয়তো কেউ প্রকাশ করতে চাইবে না। 

থ্রি-বডি সিস্টেমের উপর বেশ বড় একটা পেপার আছে স্যারের। স্যার ওটা আমাকে দিয়েছেন আমার থিসিসে কাজে লাগবে বলে। ওটা টাইপ করতে শুরু করেছি। যীশুর মাধ্যমে রূপকের কাছ থেকে একটি টাইপ-রাইটার ধার করে নিয়ে এসেছি। 

২১ জুন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির হরতালে জামায়াত-শিবির-ফ্রিডম পার্টি এবং অনেক জায়গায় বিএনপির ক্যাডাররাও আক্রমণ করেছে। আগেরদিন জামায়াত-ফ্রিডম পার্টির হরতাল সফল করার জন্য সরকারি বাহিনি তাদেরকে সহায়তা করেছে। অথচ ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির হরতালের সময় পুলিশ নির্মূল কমিটির উপর চড়াও হয়েছে। হরতাল শেষে ঢাকার প্রেসক্লাবে যখন সংবাদ সম্মেলন করছিলেন নির্মূল কমিটির নেতারা – তখন পুলিশ লাঠি গুলি টিয়ারগ্যাস ছুঁড়তে ছুঁড়তে প্রেসক্লাবে ঢুকে গেছে। সাংবাদিকদেরও সমানে পিটিয়েছে তারা। স্বাধীনতাবিরোধীদের এতটা ঔদ্ধত্য এর আগে এতটা দেখা যায়নি। ভীষণ হতাশা ঘিরে ধরছে চারপাশ। 

দিন চলে যাচ্ছে। নিজেকে যতটা সম্ভব গৃহবন্দী করে ফেলার চেষ্টা করছি কিছুদিন থেকে। খুব একটা সফল হতে পারছি না। ক্লাস এখনো শেষ হয়নি, অথচ ফাইনাল পরীক্ষার সেকেন্ড ডেট দেয়া হয়েছে। জুলাই মাসের প্রথম ডেটে পরীক্ষা হবার কোন সম্ভাবনা ছিল না বলে কেউ কোন আন্দোলনও করেনি পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে। এবার সেপ্টেম্বরে ডেট দেয়া হয়েছে। এখন জুলাই। মাঝখানে একটি মাত্র মাস আছে। শুনছি এই ডেট পেছানোর জন্য আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এরকম আন্দোলনের ফলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিস খুব যে আন্দোলিত হয় তা নয়। আমার মনে হয় তারা বরং খুশিই হয় পরীক্ষা পেছানোর আন্দোলন চললে। কারণ আমাদের ব্যাচের পরীক্ষা নেয়ার জন্য এখনো তারা প্রস্তুত নয়। তারা প্রস্তুত থাকলে মনে হয় না আন্দোলন করে পরীক্ষা পেছানো যাবে।

আমাদের আগের ব্যাচের রেজাল্ট দেয়া হয়েছে মাত্র ক’দিন আগে। প্র্যাকটিক্যাল গ্রুপের রেজাল্ট অবশ্য দেয়া হয়েছে এপ্রিলে। অজিতসহ তিনজন ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে প্র্যাকটিক্যাল গ্রুপ থেকে। শুভ্রা বসু ফার্স্ট, লিপিকা দত্ত সেকেন্ড এবং অজিত পোদ্দার থার্ড হয়েছে। অজিত থিসিস করা শুরু করেছিল বিকিরণস্যারের তত্ত্বাবধানে। কিন্তু পরে থিসিস বাদ দিয়ে প্র্যাকটিক্যাল গ্রুপে চলে যায়। অজিত তার ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া উপলক্ষে বেশ বড় একটা পার্টি দিয়েছিল। 

থিসিস গ্রুপের রেজাল্ট দিয়েছে মাত্র ক’দিন আগে। অনার্সে যারা ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিল, তাদের অনেকেই মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস পায়নি। আবার অনার্সে সেকেন্ড ক্লাস পাওয়া কয়েকজন মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে। সুব্রত বড়ুয়া ফার্স্ট এবং শায়লা আপা সেকেন্ড হয়েছে। কিন্তু এই রেজাল্টের বিরুদ্ধে মামলা হয়। পরে রেজাল্ট পরিবর্তিত হয়ে শায়লা আপা ফার্স্ট হয়ে যায়। এদের রেজাল্ট দেখে আমার টেনশান বেড়ে যাচ্ছে। 

ডিপার্টমেন্টের স্যারদের অনেকেই এখন আমার নাম জানেন, রাস্তায় করিডোরে দেখা হলে চিনতে পারেন – এতে আমার খুশি হবার কথা। কিন্তু আমার চিন্তা বেড়ে যাচ্ছে। গতকাল দুপুরে সোবহানস্যার আর মোবাশ্বেরস্যারকে টিচার্স-বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমি একটু দূরত্ব রেখে চুপচাপ চলে যাচ্ছিলাম। সোবহানস্যার ডাকলেন। মোবাশ্বেরস্যারের সামনে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি ছাত্রইউনিয়ন করো?”

আমি কোন ছাত্রসংগঠনের সদস্যপদ নিইনি। তবে মাঝে মাঝে ইস্যুভিত্তিক মিছিলে যাই। ক’দিন আগে ছাত্রইউনিয়ন অনেক সাহস করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ছোট্ট একটা মিছিল বের করেছিল। কিছু না বলে চুপ করে আছি দেখে স্যার অদ্ভুতভাবে হেসে বললেন, “মিছিলে দেখলাম তো, তাই জিজ্ঞেস করছি। সে যাই হোক, সেটা তোমার ব্যাপার। তবে শুনলাম তুমি নাকি আমার ফিজিক্যাল কোরান নিয়ে মন্তব্য করেছো?”

বুঝতে পারলাম আমার বারোটা বেজে গেছে। সোবহানস্যার ক্লাসে বলেছেন তিনি পদার্থবিজ্ঞানের আলোকে কোরান শরিফ লিখছেন। ফিজিক্যাল কোরান। আমি স্যারকে কিছু বলিনি। ক্লাসে সহপাঠীদের কাছে শুধু প্রশ্ন করেছিলাম – কোরান শরিফ লেখা যায় কিনা। এই কথা এর মধ্যেই স্যারের কানে চলে গেছে! 

“তোমার কোন প্রশ্ন থাকলে আমার অফিসে এসো, তোমার সব প্রশ্নের উত্তর আমি দেবো।“ সোবহানস্যার ভ্রূ-কুঁচকে অদ্ভুতভাবে হাসলেন। 

মোবাশ্বেরস্যার ঘোলাটে দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। শুনেছি তিনি আমাদের পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান। আমাদের মোট ছয় শ নম্বরের মধ্যে তিন শ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা, বাকি তিন শ নম্বর নির্ভর করছে কমিটির মর্জির উপর। আমি ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান আর পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান উভয়কেই চটিয়ে দিয়েছি নিজের অজান্তে। 

'সময়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস'-এর ইতিহাস

 



স্টিফেন হকিং তাঁর জন্মদিনের ব্যাপারে সবসময় গ্যালিলিও’র মৃত্যুদিবসের রেফারেন্স দিয়েছেন। গ্যালিলিওর মৃত্যু হয়েছিল ৮ জানুয়ারি ১৬৪২ সালে। তার ঠিক তিন শ বছর পর ১৯৪২ সালের ৮ জানুয়ারি স্টিফেন হকিং-এর জন্ম। আলবার্ট আইনস্টাইনের পর যে বিজ্ঞানী সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন তিনি হলেন স্টিফেন হকিং। বেঁচে থাকলে তিনি ২০২০ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেতেন ব্ল্যাকহোল বিষয়ে তাঁর গবেষণার জন্য। কাকতালীয়ভাবে আইনস্টাইনের জন্মদিনেই – ২০১৮ সালের ১৪ মার্চ স্টিফেন হকিং মৃত্যুবরণ করেন; আইনস্টাইনের জন্মের ঠিক ১৩৯ বছর পর। 

স্টিফেন হকিং সম্পর্কে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অসংখ্য বই লেখা হয়েছে। তাঁর নিজের লেখা বইগুলিও – বিশেষ করে তাঁর জনপ্রিয় বিজ্ঞানের বইগুলি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে। তাঁর বইগুলির মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সর্বাধিক বিক্রিত বই ‘এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম ফ্রম বিগ ব্যাং টু ব্ল্যাক হোল্‌স’। এই বইটি তাঁর জনপ্রিয় বিজ্ঞানের প্রথম বই। এই বইয়ের আগে বিজ্ঞান-বিষয়ক আর কোন বই এতটা জনপ্রিয়তা পায়নি। 

১৯৮০ সালের মধ্যেই স্টিফেন হকিং তাঁর গবেষণার জগতে খ্যাতিলাভ করে ফেলেছেন। বিজ্ঞানের জগতে তিনি অবিশ্বাস্য মেধার সাক্ষর রেখেছেন। পদার্থবিজ্ঞানীরা তাঁর গবেষণার খবর রাখেন। কিন্তু তাঁর প্রতি বিশ্বের সাধারণ মানুষের আরো বেশি আগ্রহের কারণ হয়ে ওঠে তাঁর শারীরিক প্রতিবন্ধকতা। যে মানুষের শরীরের সামান্য কয়েকটি পেশী ছাড়া আর কোনকিছুই সচল নয়, সেই মানুষটি সমস্ত প্রতিবন্ধকতা ঠেলে মহাবিশ্বের গোপন রহস্য সন্ধানে যুগান্তকারী গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন – এটাই বেশিরভাগ মানুষের আগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা এবং অন্যান্য গবেষণা ফান্ডের মাধ্যমে তাঁর বিপুল পরিমাণ চিকিৎসার খরচ চালিয়ে নিতে তেমন কোন অসুবিধা হচ্ছিল না। কিন্তু যখন তাঁর বড় মেয়ে লুসিকে নামী-দামী প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি করাতে চাইলেন, তখন যে টাকার দরকার পড়লো তা তাঁর হাতে ছিল না। সেই টাকা জোগাড় করার জন্য তিনি একটি জনপ্রিয় বিজ্ঞানের বই লেখার পরিকল্পনা করলেন যা সব পাঠকের বোধগম্য হবে। সেই বইতে তিনি কোয়ান্টাম গ্রাভিটি, ব্ল্যাকহোল, স্ট্রিং থিওরিসহ সব আধুনিক তত্ত্বের সমন্বয়ে মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি সম্পর্কে একটি সঠিক এবং সহজবোধ্য ধারণা দিতে চাইলেন। 

লেখার কাজটা ততদিনে অসম্ভব কঠিন হয়ে পড়েছে তাঁর জন্য। টাইপ করার সাধ্য তাঁর নেই। তাঁর কথাও তখন খুবই দুর্বোধ্য। তাঁকে অনেকদিন ধরে জানেন এবং চেনেন এরকম ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাড়া তার কথা কেউ বুঝতেও পারে না। কিন্তু সেভাবেই প্রায়-অসম্ভব কাজ শুরু হলো। তাঁর গবেষক-ছাত্র ব্রায়ান হুইট (Brian Whitt)  তাঁকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এলেন। স্টিফেন হকিং ব্রায়ান হুইটকে বলেন কী লিখতে হবে। হুইট একেকটা লাইন লেখেন আর হকিং-কে দেখান। হকিং বারবার বদলাতে থাকেন প্রতিটি শব্দ, বাক্য – যতক্ষণ না তিনি নিশ্চিত হন যে যা বলতে চান তা বলা হচ্ছে। হকিং চাচ্ছিলেন বইটিতে প্রয়োজনের বেশি একটি শব্দও থাকবে না। প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ হতে হবে সাধারণের কাছে বোধগম্য। কিন্তু সহজ করতে গিয়ে বৈজ্ঞানিক সত্যতার সাথে কোন আপোষ করা চলবে না। এভাবে বই লেখা সহজ নয়। হকিং জানেন গাণিতিক সমীকরণ দেখলে সাধারণ পাঠক আঁতকে উঠেন। গাণিতিক সমীকরণ ছাড়া পদার্থবিজ্ঞানের বই লেখা প্রায়-অসম্ভবের পর্যায়ে পড়ে। হকিং সমীকরণের বদলে সহজ চিত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা করলেন। চিত্রের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক কার্যাবলি বুঝিয়ে দেয়া। 

এভাবে প্রায় দু’বছর লেগে থাকার পর ১৯৮৪ সালে প্রথম পান্ডুলিপি তৈরি হলো। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস খুবই বনেদি প্রকাশক। খুব আগ্রহভরে তারা হকিং-এর পান্ডুলিপি দেখে ধারণা করলেন এই বই বছরে বিশ হাজার কপির মতো বিক্রি হতে পারে। তারা হকিং-কে পঁচিশ হাজার পাউন্ড দেয়ার জন্য রাজি হলেন এই পান্ডুলিপি বাবদ। 

কিন্তু হকিং-এর স্বপ্ন বছরে বিশ হাজার কপিতে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি স্বপ্ন হলো এই বই শুধু একাডেমিক লাইব্রেরিতে শোভা পাবে না, এই বই পৃথিবীর সমস্ত বইয়ের দোকানে পাওয়া যাবে। এয়ারপোর্টগুলির বইয়ের দোকানে থ্রিলারের পাশে শোভা পাবে। মানুষ প্লেনে পড়ার জন্য যেমন রোমাঞ্চ কিংবা থ্রিলার কেনে, সেরকম তাঁর বইও কিনবে। 

কিন্তু এরকম বইয়ের মার্কেটিং কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসের মতো গম্ভীর প্রকাশকরা করেন না। তাহলে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস চলবে না। তাছাড়া মাত্র পঁচিশ হাজার পাউন্ডে পান্ডুলিপি দিতে রাজি নন স্টিফেন হকিং। 

বেস্ট সেলার বইয়ের লেখকদের জন্য যেসব এজেন্ট কাজ করেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী এজেন্ট হলেন নিউইয়র্কের আল জুকারম্যান (Al Zuckerman)। জুকারম্যান স্টিফেন হকিং সম্পর্কে পড়েছেন। হকিং-এর শারীরিক-মানসিক অবস্থা এবং জীবন-পদ্ধতি সম্পর্কে জানার পর তিনি বুঝতে পারলেন যে ঠিকমতো মার্কেটিং করতে পারলে হকিং-এর বইয়ের চেয়ে হকিং নিজেই পৃথিবীর মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবেন। তিনি হকিং-এর সাথে যোগাযোগ করলেন। 

হকিং একশ পৃষ্ঠার পান্ডুলিপি পাঠিয়ে দিলেন আল জুকারম্যানের কাছে। জুকারম্যান নিউইয়র্কসহ আমেরিকার অনেক প্রকাশকের সাথে দরকষাকষি শুরু করলেন। হকিং-এর অত্যাশ্চর্য জীবনকে তিনি ব্যবহার করলেন বইয়ের বাণিজ্যিক হাতিয়ার হিসেবে। 

ব্যান্টাম পাবলিশার্স বেস্ট সেলার বই প্রকাশ ও মার্কেটিং-এ দক্ষ। ব্যান্টাম প্রকাশনীর অন্যতম সম্পাদক পিটার গুজারডি (Peter Guzzardi) আমেরিকার একটা ম্যাগাজিনে স্টিফেন হকিং সম্পর্কে পড়েছিলেন। তিনি জেনেছেন প্রায় নিঃসাড় শরীর নিয়ে একজন বিজ্ঞানী মহাবিশ্বের সৃষ্টতত্ত্বের মূল রহস্য আবিষ্কার করার চেষ্টা করছেন। এখন সেই বিজ্ঞানীর বই প্রকাশ করার সুযোগ তারা পেলে পৃথিবীর প্রকাশনা জগতে ঝড় তোলা সম্ভব হতে পারে। অন্যান্য প্রকাশকরা যেখানে এক লক্ষ ডলার দিতে রাজি হয়েছে, সেখানে ব্যান্টাম পাবলিশার্স বই প্রকাশের স্বত্ব লাভ করার জন্য আড়াই লক্ষ ডলার (দুই কোটি টাকার বেশি)  দিতে রাজি হলো শুধু আমেরিকাতে প্রকাশের জন্য। যুক্তরাজ্যে প্রকাশের জন্য ব্যান্টামের সহযোগী সংস্থা ব্যান্টাম ট্রান্সওয়ার্ল্ড আরো তিরিশ হাজার পাউন্ড দিতে রাজি হলো। এর আগে আর কোন বইয়ের প্রকাশনার স্বত্ব লাভ করার জন্য এত টাকা দেয়া হয়নি। এর উপর প্রতিটি বইয়ের জন্য রয়ালটি বাবদ বইয়ের দামের শতকরা ১৫ ভাগ হিসেবে দেয়া হবে প্রচলিত মেধাসত্ত্ব নিয়ম অনুযায়ী – লেখকের মৃত্যুর পরেও আরো সত্তর বছর পর্যন্ত। 

এই প্রস্তাব হকিং এর পছন্দ হলো। হকিং যখন আমেরিকার শিকাগোতে একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে যোগ দিতে গেলেন, ব্যান্টাম প্রকাশনীর পিটার গুজারডি হকিং এর সাথে দেখা করলেন। হকিং ব্রায়ান হুইটের সাহায্যে গুজারডির সাথে কথা বললেন। চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। 

গুজারডি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন না। বৈজ্ঞানিক শব্দাবলির সাথে কোন পরিচয়ই ছিল না তাঁর। কিন্তু বইটি যেহেতু সবার জন্য লেখা হচ্ছে, তাই ঠিক করা হলো গুজারডি যদি কোনকিছু বুঝতে না পারেন – তাহলে সেই অংশ বদলাতে হবে, বোধগম্য করে তুলতে হবে। হকিং বোধগম্য করার ব্যাপারে রাজি, কিন্তু সহজ করতে গিয়ে বিজ্ঞানের কোন বিষয়ে ছাড় দিতে রাজি নন। 

এভাবে দ্বিতীয় পান্ডুলিপি তৈরি করা খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। এর মধ্যে হকিং-এর জীবনে ঘটে গেলো মারাত্মক ঘটনা। ১৯৮৫’র জুলাই মাসে তিনি যখন জেনিভার সার্নের সুপার-প্রোটন-সিনক্রোটনে কাজ করছিলেন তখন মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হকিং-এর প্রাণসংশয় দেখা দিলো। তাঁকে জরুরিভিত্তিতে জেনিভার হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো। কৃত্রিমভাবে কোমায় রেখে যান্ত্রিকভাবে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা হলো। ডাক্তাররা তাঁর বাঁচার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। তাঁকে বাঁচানোর একমাত্র রাস্তা ছিল তাঁর স্বরনালি কেটে ফেলা দেয়া। এতদিন খুবই দুর্বোধ্য হলেও কিছু কথা তিনি বলতে পারতেন। এবার তাও গেলো। কিন্তু তিনি বেঁচে ফিরে এলেন। 

হকিং-এর খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধ কিপ থোর্ন (২০১৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন) একটি সাহায্যসংস্থার মাধ্যমে হকিং-এর হাসপাতালের বিশাল খরচ সামলানোর ব্যবস্থা করলেন। 

ক্যালিফোর্নিয়ার কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ওয়াল্ট উলটজ (Walt Woltosz) হকিং-এর জন্য একটি কথা-বলা-যন্ত্র উদ্ভাবন করলেন। এই ভয়েস সিন্থেসাইজারের মাধ্যমে হকিং তখন যান্ত্রিকভাবে কথা বলতে শুরু করলেন। 

বইয়ের দ্বিতীয় পান্ডুলিপি তৈরি হলো। অনেক ঘষামাজা করা হলো। বইয়ের শেষ প্যারাগ্রাফে হকিং আশা প্রকাশ করেছেন থিওরি অব এভরিথিং বা একটি সর্বাত্মক তত্ত্ব যদি আবিষ্কৃত হয় – তাহলে মানুষ ‘মাইন্ড অব গড’ বা ঈশ্বরের মন বুঝতে পারবে। এই লাইনটির মাধ্যমে হকিং সাধারণ পাঠকের মন জয় করার চেষ্টা করেছেন। অনেকেই মনে করেন হকিং এখানে তাঁর বইয়ের কাটতি বাড়ানোর জন্য একটি সুবিধাবাদী অবস্থান গ্রহণ করেছেন। এরপর অনেকেই এই কাজ করেছেন – বিজ্ঞানের বইতে ইচ্ছে করে ‘ঈশ্বর’কে টেনে নিয়ে এসেছেন বাণিজ্যিক স্বার্থে। 

১৯৮৭ সালের জুলাই মাসে বইয়ের চূড়ান্ত পান্ডুলিপি তৈরি হলো। বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানবক্তা কার্ল সাগানকে দিয়ে বইটির ভূমিকা লেখানো হলো। ১৯৮৮ সালের ১ এপ্রিল আমেরিকায় প্রকাশিত হলো ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম। এর আড়াই মাস পর ১৬ জুন যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত হলো এই বই। বইয়ের প্রচ্ছদে হুইলচেয়ারে বসা হকিং-এর ছবি ব্যবহার করা হলো বাণিজ্যিক স্বার্থে। কোটি টাকা খরচ করা হলো বিজ্ঞাপনে। এর ফল পাওয়া গেল হাতে হাতে। নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলার লিস্টে এই বই ছিল একটানা ১৪৭ সপ্তাহ (প্রায় তিন বছর), ব্রিটিশ নিউজপেপার সানডে টাইমস এর বেস্ট সেলার লিস্টে এই বই ছিল একটানা পাঁচ বছর (২৪৭ সপ্তাহ)। এ পর্যন্ত এক কোটির চেয়েও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে এই বই। মেধাসত্ত্বের নিয়ম মেনে বিশ্বের চল্লিশটিরও বেশি ভাষায় অনুদিত হয়েছে এই বই। আর মেধাসত্ত্বের তোয়াক্কা না করে যার যা খুশি অনুবাদ হয়েছে আরো অসংখ্য ভাষায় যার হিসেব প্রকাশকের কাছে নেই। 

স্টিফেন হকিং এর ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম এখনো পাঠকপ্রিয়। আবার এটাও সত্য যে – এই বইটি সবচেয়ে বেশি বিক্রিত হলেও, যারা বইটি কিনেছেন সবাই যে প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বইটি পড়েছেন তা নয়। অনুসন্ধানী জরিপ অনুযায়ী এই বইটি যতটা প্রচারিত ততটা পঠিত নয়। এই বইয়ের অধিকাংশ পাঠকই চতুর্থ অধ্যায় পর্যন্ত পড়ার পর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন কিংবা বিষয়বস্তু দুর্বোধ্য বলে আর এগোতে পারেননি। তবুও এই বইয়ের বিক্রি থেমে নেই। কারণ এখন এই বইটা নিজের কাছে রাখাটা অনেকের কাছেই অবশ্যকর্তব্যের মধ্যে পড়ে। 


তথ্যসূত্র

1. Joel Levy, Hawking the man, the genius, and the theory of everything, Andre Deutsch, London, 2018.

2. Stephen W Hawking, A brief history of time from the big bang to black holes, Bantam Books, 1988. 


Thursday, 6 January 2022

নিউটনের জীবন ও বিজ্ঞান

 


সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে অনেক বৈজ্ঞানিক ধারণা। পদার্থবিজ্ঞানে সবচেয়ে বেশি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে যার হাত দিয়ে – তাঁর নাম আইজাক নিউটন। আলবার্ট আইনস্টাইন নিউটন সম্পর্কে বলেছিলেন – প্রকৃতি তাঁর হাতে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছে। প্রকৃতির রহস্য নিউটনের মতো করে আর কেউ এতটা উন্মোচন করতে পারেননি। নিউটনের হাত দিয়েই আমরা পেয়েছি আলো এবং বর্ণের সম্পর্ক, মাধ্যাকর্ষণ ও মহাকর্ষ বলের গাণিতিক সূত্র, গতির সূত্র। জ্যোতির্বিজ্ঞানে নিউটনের গতিবিদ্যা প্রয়োগ করার পর বিগত কয়েক হাজার বছরের চেয়েও বেশি অগ্রগতি হয়েছে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই। গণিতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখা ক্যালকুলাসের উৎপত্তি ও বিকাশের অন্যতম নায়ক ছিলেন আইজাক নিউটন। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সর্বকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনাগুলির একটি হলো নিউটনের ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথম্যাটিকা’ – যেখান থেকে আমরা পেয়েছি চিরায়ত বলবিজ্ঞান (যাকে আমরা নিউটনিয় বলবিজ্ঞান বলি), গ্রহ-নক্ষত্রগুলির মধ্যে মহাকর্ষ বলের সূত্র এবং মহাবিশ্বের গতির গাণিতিক অবকাঠামো।

আইজাক নিউটনের জন্ম ১৬৪২ সালের ক্রিস্টমাসের দিন অর্থাৎ ২৫ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের লিংকনশায়ার থেকে সাত মাইল দক্ষিণে কোল্‌সটারওয়ার্থ গ্রামের ‘উল্‌সথর্প’ নামের এক বিশাল ফার্ম হাউজে। সেই সময় ইউরোপের সব জায়গায় গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু হয়ে গেলেও ইংল্যান্ডে ১৭০০ সাল পর্যন্ত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু হয়নি। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের তারিখ থেকে দশ দিন পিছিয়ে ছিল ইংল্যান্ডের জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। সে হিসেবে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নিউটনের জন্ম তারিখ হয় ৪ জানুয়ারি ১৬৪৩। তারিখের হিসেবে এই গন্ডগোলটা অবশ্য নিউটনের জীবনে কোন প্রভাব ফেলেনি।

কেমব্রিজ থেকে প্রায় ৬০ মাইল উত্তর-পশ্চিমের এই গ্রামটি তুলনামূলকভাবে নতুন। নিউটনের পূর্বপুরুষরা এখানে এসেছিলেন ১৫০০ সালের দিকে। নিউটন তখন কোন নির্দিষ্ট পরিবারের পদবি ছিল না। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় নতুন শহরের গোড়াপত্তন হচ্ছিলো সেই সময়। নতুন শহরে এসে অনেকেই তখন নিউটন পদবি গ্রহণ করেছিলেন। নিউ-টাউন থেকে নিউটন শব্দটির উৎপত্তি।

নিউটনের দাদা রবার্ট নিউটন জন্মেছিলেন আনুমানিক ১৫৭০ সালে। উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি কিছু কৃষিজমির মালিক হয়েছিলেন। ১৬০৬ সালে রবার্ট নিউটনের পুত্র আইজাক নিউটনের জন্ম হয়। পরিবারে তখনো লেখাপড়ার কোন চল ছিল না। পিতা-পুত্র দু’জনই নিরক্ষর। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে রবার্ট ক্রমে ক্রমে আরো অনেক জমির মালিক হন এবং ১৬২৩ সালে উল্‌সথ্রপের ‘লর্ড অব দি ম্যানর’ হয়ে গেলেন। জমিজমাসহ বিশাল বাড়ির মালিক হয়ে লর্ড হয়ে নিউটন পরিবারের অর্থনৈতিক সম্মান অনেক বেড়ে গেল। এবার রবার্ট নিউটন ঠিক করলেন শিক্ষিত ভদ্রলোকের পরিবারে ছেলের বিয়ে দিয়ে পরিবারের সামাজিক সম্মান বাড়াবেন। ১৬৩৯ সালে জেমস আয়াসকাফের কন্যা হ্যানা আয়াসকফের সঙ্গে আইজাক নিউটনের বাগদান সম্পন্ন হয়। কিন্তু রবার্ট নিউটনের শরীর ভালো যাচ্ছিল না বলে বিয়ে পিছিয়ে দিতে হয়। ১৬৪১ সালে রবার্ট মারা যান। তার মাস ছয়েক পর ১৬৪২ সালের শুরুর দিকে হ্যানা ও আইজাকের বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের ছয়-সাত মাস পরেই হঠাৎ মৃত্যু হয় আইজাক নিউটনের। হ্যানা তখন সন্তানসম্ভবা। ১৬৪২ সালের ২৫ ডিসেম্বর হ্যানা খুব রোগা এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। এই সন্তান তার বাবাকে কোনদিন দেখেনি। সন্তানের বাবার নাম অনুসারেই তার নাম রাখা হলো আইজাক নিউটন।

সময় হবার আগেই জন্ম নেয়া রুগ্ন শিশুটিকে অনেক যত্নে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনেন হ্যানা। কিন্তু তিনি খুবই বাস্তববুদ্ধিসম্পন্না। তিনি জানেন এত বড় ফার্ম তিনি একা সামলাতে পারবেন না। সব দেখাশোনা করার জন্য শক্ত অভিভাবক দরকার। ১৬৪৫ সালে হ্যানা ৬৩ বছর বয়সী প্রভাবশালী রেভারেন্ড বারনাবাস স্মিথকে বিয়ে করে নর্থ উইথামে চলে যান।

হ্যানা তাঁর তিন বছর বয়সী শিশু আইজাক নিউটনকে রেখে যান তাঁর মা-বাবার কাছে। নানা-নানীর কাছে আদর-যত্নের অভাব না থাকলেও মাতৃস্নেহের অভাবে এবং সৎ-বাবার প্রতি আক্রোশে খুবই বদরাগী শিশু হিসেবে বড় হতে থাকে আইজাক। তার কোন বন্ধু ছিল না। একা একা বড় হতে থাকে সে।

হ্যানার ভাই উইলিয়াম কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছিলেন। তাদের পরিবার শিক্ষিত পরিবার। আইজাক নিউটনকে লেখাপড়া শেখানোর ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু তাও বেশ দেরিতে। বারো বছর বয়সে নিউটনকে বাড়ি থেকে সাত মাইল দূরে গ্রান্থাম গ্রামের কিং স্কুলে ভর্তি করানো হয়। ক্লার্ক নামের একজন ফার্মাসিস্টের বাড়িতে তার থাকার ব্যবস্থা করা হলো। অনেকটা যন্ত্রের মতো সেখানে বাস করে নিউটন। স্কুলেও নিউটনের কোন বন্ধু হয়নি। সে কারো সাথেই মেশে না। লেখাপড়া নিজে নিজেই করে। হাতের কাজে বেশ দক্ষতা অর্জন করে ফেলেছে ইতোমধ্যে।

এদিকে ১৬৫৬ সালে নিউটনের মায়ের দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যু হয়। দুইটি কন্যা একটি পুত্রসন্তান নিয়ে নিউটনের বাবার ফার্মেই ফিরে আসেন হ্যানা। দ্বিতীয় স্বামীর বিষয়সম্পত্তির মালিকও হন তিনি। ফার্ম আরো বড় হয়। তাঁর মনে হলো বড় ছেলে নিউটনকে নিজের কাছে এনে ফার্মের কাজে লাগিয়ে দেবেন। ১৬৫৮ সালে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিউটনকে ফার্মে নিয়ে আসেন তিনি। নিউটন ফার্মের কোন কাজই ঠিকমতো করতে পারে না। মায়ের কাছে এলেও মায়ের প্রতি কোন টান অনুভব করা তো দূরের কথা বরং আক্রোশে জ্বলতে থাকেন তিনি। নিউটনের মামার পরামর্শে নিউটনকে আবার স্কুলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে থেকে সে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য তৈরি হতে থাকে।

১৬৬১ সালে ১৯ বছর বয়সে কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে ভর্তি হন নিউটন। তার সহপাঠীরা সবাই বয়সে তার চেয়ে তিন চার বছরের ছোট। ট্রিনিটি কলেজের বেতন আর হোস্টেলের ফি মেটানোর জন্য নিউটনকে একটা অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ দেয়া হয়। তার বদলে তাকে সিনিয়র ছাত্রদের ফাইফরমাশ খাটতে হয়। স্কলারশিপ পেলে এধরনের কোন কাজ করতে হয় না। নিউটন চেষ্টা করলেন ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষায় ভালো করে সেকেন্ড ইয়ারে একটা স্কলারশিপ জোগাড় করার। কিন্তু নিউটন সিলেবাসের পড়াশোনা বাদ দিয়ে নিজের ইচ্ছে মতো পড়াশোনা করছিলেন। সেইসময় ইউরোপের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও আর কেপলারের নতুন তত্ত্বগুলি পড়ানো শুরু হয়ে গেলেও কেমব্রিজের পড়াশোনা তখনো এরিস্টোটলের পৃথিবীকেন্দ্রিক পদার্থবিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ রয়ে গিয়েছিল। নিউটন নিজে নিজে নতুন তত্ত্বগুলি পড়তে শুরু করেছিলেন। ফলে ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষায় জ্যামিতিতে ফেল করলেন। তখন কেমব্রিজের শিক্ষকরা ভাবতেও পারেননি যে এই জ্যামিতিতে ফেল করা ছেলেটাই কয়েক বছরের মধ্যে মহাবিশ্বের নতুন জ্যামিতি সৃষ্টি করবেন।

১৬৬৫ সালে ইংল্যান্ডে বুবোনিক প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। প্রায় ৭৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় প্লেগে। স্কুল-কলেজ সব বন্ধ হয়ে যায় দুই বছরের জন্য। ১৬৬৫-৬৬ – এই দুই বছর নিউটন তাদের উল্‌সথর্পের ফার্মে কাটান। এই দুই বছরের নিভৃতবাসের সময় তিনি আবিষ্কার করেন তাঁর যুগান্তকারী সূত্রগুলি। তিনি আবিষ্কার করেন – ক্যালকুলাস, আলোর প্রকৃতি, মহাকর্ষ সূত্র। গ্যালিলিও এবং কেপলারের প্রকাশিত গবেষণার উপর বিস্তারিত কাজ করেন তিনি। এই দুই বছরে তিনি যতকিছু আবিষ্কার করেছেন – সেগুলিই পরবর্তী দুই শ বছর ধরে নির্ভুলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের পাঠে এবং গবেষণায়। কিন্তু এসব আবিষ্কারের কথা  অপ্রকাশিতই ছিল পরবর্তী বাইশ বছর। ১৬৮৭ সালে প্রিন্সিপিয়া প্রকাশিত হবার পরেই সবাই জানতে পারে নিউটনের আবিষ্কার সম্পর্কে।

১৬৬৭ সালে আবার কেমব্রিজে ফিরলেন নিউটন – অনেক আত্মবিশ্বাসী হয়ে। এবার একটা স্কলারশিপ পেলেন তিনি। ১৬৬৩ সালে কেমব্রিজে লুকাসিয়ান প্রফেসর পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। পার্লামেন্ট মেম্বার হেনরি লুকাস এই পদের জন্য তদ্বির করেছেন এবং ১৬৬৪ সালে রাজা দ্বিতীয় চার্লস আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদের সূচনা করেন। প্রথম লুকাসিয়ান প্রফেসর হিসেবে নিয়োগ পেলেন আইজাক ব্যারো। ব্যারো নিউটনকে খুবই পছন্দ করতেন। আইজাক ব্যারোর সংস্পর্শে এবং সহায়তায় আইজাক নিউটন কেমব্রিজে স্থায়ী পদ লাভ করেন। ইতোমধ্যে তিনি ডিগ্রি অর্জন করে ফেলেছেন। সেই সময় কেমব্রিজে ভর্তি হলেই একটা নির্দিষ্ট সময় পর ডিগ্রি দিয়ে দেয়া হতো। আইজাক ব্যারো ট্রিনিটি কলেজের মাস্টার এবং রাজকীয় পদে অভিষিক্ত হবার পর লুকাসিয়ান প্রফেসরের পদটা নিউটনকে দিয়ে দেন। আইজাক নিউটন ১৬৬৯ সালে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির লুকাসিয়ান প্রফেসর পদে যোগ দেন। পরবর্তী ৩৩ বছর তিনি সেই পদে কাজ করেছেন।

লুকাসিয়ান প্রফেসর হিসেবে নিউটন প্রথম লেকচার দেন ট্রিনিটি কলেজে ১৬৭০ সালের জানুয়ারিতে। মাত্র কয়েকজন ছাত্র আগ্রহী ছিলেন তাঁর লেকচার শোনার ব্যাপারে। নিউটন তখন আলোকবিদ্যা সম্পর্কে গবেষণা করছেন। লুকাসিয়ান লেকচারে তিনি সেসব তত্ত্বই আলোচনা করছিলেন। কিন্তু কোন ছাত্রই আগ্রহী হয়নি তার লেকচারে। প্রথম লেকচারে কয়েকজন উপস্থিত থাকলেও দ্বিতীয় লেকচারে কেউ উপস্থিত হয়নি। নিউটন খালি থিয়েটারেই লেকচার দিলেন। পরবর্তী সতেরো বছর ধরে নিউটন লুকাসিয়ান লেকচার দিয়েছেন খালি থিয়েটারে। প্রফেসর হিসেবে বড়ই অবহেলিত ছিলেন আইজাক নিউটন। তাঁর অধ্যাপক জীবনে মাত্র তিন জন ছাত্র তাঁর কাছে পড়তে এসেছিল। ছাত্র হিসেবে তারা কেউই তেমন কোন কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে পারেনি। নিউটনের আলোক-সংক্রান্ত গবেষণাগুলি তিনি প্রকাশ করেন ‘অপটিক্‌স’ বইতে – তিরিশ বছর পর ১৭০৪ সালে।

নিউটন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি তৈরিতে দক্ষ ছিলেন। আলোকের পরীক্ষার জন্য দরকারি যন্ত্রপাতি তিনি নিজেই তৈরি করতেন। আলোক-যন্ত্রপাতি তৈরি করতে করতে তিনি একটি শক্তিশালী রিফ্লেক্টিং টেলিস্কোপ তৈরি করেন। এই টেলিস্কোপের কথা রয়েল সোসাইটিতে জানাজানি হয়ে যায়। বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েলের নেতৃত্বে রয়েল সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৬৬০ সালে। রয়েল সোসাইটির আগ্রহে নিউটন তাঁর টেলিস্কোপের একটি মডেল রয়েল সোসাইটিতে পাঠান। পরীক্ষণ পদার্থবিজ্ঞানে নিউটনের কৃতিত্ব সম্পর্কে আলোচনা চলতে থাকে সর্বত্র। ১৬৭২ সালে রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ লাভ করেন নিউটন। রয়েল সোসাইটির নিয়ম অনুযায়ী নিউটনকে একটি বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা দিতে হলো। সেখানে তিনি অপ্‌টিকস সংক্রান্ত তাঁর গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করলেন।

১৬৬৫/৬৬ সালে প্লেগের সময় ফার্মে বসে নিউটন আবিষ্কার করেছিলেন আলোর কণাতত্ত্ব। প্রিজমের ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করিয়ে তিনি দেখেছেন প্রিজমের ভেতর দিয়ে বের হবার সময় আলো বিভিন্ন বর্ণে আলাদা আলাদা ভাবে বেগুনি, নীল, আকাশী, সবুজ, হলুদ, কমলা, ও লাল – এভাবে রঙধনুর রঙে প্রতিসৃত হয়ে বের হয়। আরেকটি প্রিজমের ভেতর দিয়ে এই বর্ণালী প্রবেশ করিয়ে দেখা গেল যে প্রিজমের অন্যদিকে সবগুলি রঙ একসাথে মিলে সাদা রঙের আলো বের হচ্ছে। আমরা কীভাবে রঙ দেখি তার পদার্থবৈজ্ঞানিক উত্তর পাওয়া গেল। আমরা যখন লাল দেখি – তখন লাল ছাড়া বাকি সব রঙ শোষিত হয়। আর যখন সাদা দেখি – তখন সব রঙের মিশ্রণ দেখি, কালো মানে সব রঙেরই শোষণ।

কিন্তু নিউটনের গবেষণায় সন্তুষ্ট হতে পারলেন না রবার্ট হুক। তিনি দাবি করেন নিউটন তাঁর মডেল অনুসরণ করে এই যন্ত্র বানিয়েছেন, সুতরাং মূল কৃতিত্ব নিউটনের নয়। ক্রিশ্চিয়ান হাইগেন্‌স দাবি করলেন নিউটন তাঁর তত্ত্ব নিয়েই কাজ করছেন। নিউটন ক্রমশ বিরোধে জড়িয়ে পড়তে শুরু করলেন। এই বিরোধ চলতেই থাকলো পরবর্তী এক দশক ধরে।

১৬৭৯ সালে নিউটনের মা মারা যান। নিউটন একেবারেই একা হয়ে গেলেন। ছোটবেলায় মায়ের প্রতি বিতৃষ্ণা থেকে সমগ্র নারীজাতির প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মে গিয়েছিল নিউটনের। সারাজীবন তিনি নারীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলেছেন।

১৬৮৪ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডমন্ড হ্যালি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে নিউটনের সাথে দেখা করেন। হ্যালি নিউটনকে উদ্বুদ্ধ করেন তাঁর গবেষণাকর্ম প্রকাশ করার জন্য। ১৬৮৪ থেকে ১৬৮৬ সাল পর্যন্ত দিনরাত পরিশ্রম করে নিউটন তাঁর যুগান্তকারী বইয়ের পান্ডুলিপি তৈরি করেন। ১৮৮৬ সালের জুন মাসে তিনি রয়েল সোসাইটিতে উপস্থাপন করেন ‘ফিলোসপিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথাম্যাথিকা’। পরের বছর তিন খন্ডে এই বই প্রকাশিত হয়। তিনি ইচ্ছে করেই বইটাতে অনেক বেশি গাণিতিক সূত্র দিয়ে ভর্তি করে ফেলেন যেন খুব বেশি মানুষ এই বই পড়ে বুঝতে না পারেন। তাঁর ধারণা ছিল – কেউ কিছু বুঝতে না পারলে সমালোচনাও করতে পারবে না। তিনি মানুষের সমালোচনা সহ্য করতে পারতেন না।  

১৬৮০ সাল থেকে ট্রিনিটি কলেজে ভীষণ অর্থাভাব দেখা দেয়। এই অবস্থা কাটিয়ে উঠার জন্য ভাইস চ্যান্সেলরের নেতৃত্বে ১৬৮৭ সালে আট জনের একটি কমিটি গঠন করা হয়। নিউটন ছিলেন সেই কমিটির অন্যতম সদস্য।

১৬৮৯ সালে নিউটন পার্লামেন্টের সদস্য মনোনীত হন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে। এক বছর তিনি পার্লামেন্টের মেম্বার ছিলেন। কিন্তু কথিত আছে এই এক বছরে তিনি একটি মাত্র বাক্য বলেছিলেন পার্লামেন্টে – সেটা হলো একজন সহকারিকে ডেকে বলেছিলেন – ‘জানালাটা খুলে দাও’।

১৬৯৩ সালে নিউটনের প্রচন্ড মানসিক সমস্যা দেয়। প্রায় চার মাস তিনি মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভোগেন। এরপর তিনি সুস্থ হলেও আর কোনদিন কোন মৌলিক গবেষণা করেননি। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লুকাসিয়ান প্রফেসর পদে ছিলেন ১৭০২ সাল পর্যন্ত।

১৬৯৬ সালে নিউটন ইংল্যান্ডের জাতীয় টাকশাল ‘রয়েল মিন্ট’-এ গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ দেন। এরপর ১৭২৭ সাল পর্যন্ত আমৃত্যু তিনি এখানেই ছিলেন। পদোন্নতি হতে হতে তিনি ‘মাস্টার অব দি মিন্ট’ হয়েছিলেন। টাকা জাল করা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল নিউটনের দক্ষ ব্যবস্থাপনায়।

রবার্ট হুকের সাথে বিরোধ চললেও ১৭০৩ সালে বরার্ট হুকের মৃত্যুর পর নিউটন রয়েল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি রাজনৈতিক এবং অন্যান্যভাবে প্রভাব খাটানোতে খুব দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। ১৭০৩ সাল থেকে আমৃত্যু তিনি রয়েল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট পদ ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি কখনো কোন প্রেস-কনফারেন্স বা ঘোষণাপত্র পাঠ করেননি। জনসমাবেশে কিছু বলতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না।

১৭০৫ সালে নিউটন নাইটহুড লাভ করেন। তাঁর আগে আর কোন বিজ্ঞানী এই সম্মান পাননি।

নিউটন খুবই বদমেজাজী মানুষ ছিলেন। তাঁকে কখনো হাসতে দেখা যায়নি। নিজের সমালোচনা একটুও সহ্য করতে পারতেন না। তাঁর বন্ধু বলতে তেমন কেউ ছিলেন না। যাদেরকে বন্ধু মনে করতেন, তারাও যদি তাঁর পক্ষে কথা না বলতেন, তাহলে তাদের সাথে ঝগড়া লাগিয়ে দিতেন।

নিউটনের প্রিন্সিপিয়া ম্যাথম্যাথিকা পদার্থবিজ্ঞানে সর্বকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী রচনাগুলির একটি তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এই রচনা প্রকাশ করে বিখ্যাত হবার পরেই তিনি প্রধান রাজকীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী – ‘অ্যাস্ট্রোনোমার রয়েল’ জন ফ্ল্যামস্টিডের সাথে ঝগড়া লাগালেন। ফ্ল্যামস্টিডের সাথে নিউটনের খুবই ভালো বন্ধুত্ব ছিল। প্রিন্সিপিয়া প্রকাশের সময় জ্যোতির্বিজ্ঞানের যেসব ডাটা উপাত্ত দরকার হয়েছিল – তার সবগুলিই তিনি পেয়েছিলেন ফ্ল্যামস্টিডের কাছ থেকে। কিন্তু নিউটন অপ্রকাশিত ডাটা চাইলে ফ্ল্যামস্টিড ডাটা দিতে অস্বীকার করলে নিউটনের মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। তিনি কোন কিছুতেই না শুনতে পছন্দ করতেন না। নিউটন নিজের প্রভাব খাটিয়ে রয়েল অবজারভেটরির পরিচালনা পরিষদের কর্তা হয়ে গেলেন এবং ডাটা দিতে বাধ্য করলেন। শুধু ডাটা পেয়েই সন্তুষ্ট হলেন না নিউটন। তিনি ফ্ল্যামস্টিডের নাম-নিশানা মুছে দিতে চাইলেন। ফ্ল্যামস্টিড যে ডাটা সংগ্রহ করেছিলেন তার সবগুলি বাজেয়াপ্ত করা হলো। ফ্ল্যামস্টিড যেসব গবেষণাপত্র প্রকাশ করার জন্য রেডি হচ্ছিলেন – সেগুলিকে ফ্ল্যামস্টিডের শত্রু এডমন্ড হ্যালি’র নামে প্রকাশ করার ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু ফ্ল্যামস্টিডও ছেড়ে দেবার মানুষ নন। তিনি কোর্টে মামলা করলেন এবং দ্রুত কোর্ট অর্ডার পেলেন নিজের কাজের পক্ষে। ফ্ল্যামস্টিডের রচনা হ্যালির নামে প্রকাশে বাধাপ্রাপ্ত হয়েও নিউটন দমে গেলেন না। তিনি তাঁর প্রিন্সিপিয়া গ্রন্থের পরবর্তী সংস্করণ থেকে ফ্ল্যামস্টিডের সবগুলি রেফারেন্স মুছে দিলেন।  

নিউটন অত্যন্ত প্রতিশোধ-পরায়ন মানুষ ছিলেন। জার্মান দার্শনিক গটফ্রিড লিবনিজের সাথে ক্যালকুলাস আবিষ্কারের কৃতিত্ব নিয়ে বিরোধে সাংঘাতিকভাবে রেগে যান নিউটন। নিউটন আর লিবনিজ দু’জনই আলাদা আলাদাভাবে গণিতের এই নতুন শাখাটি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু নিউটন লিবনিজের আগেই এই কাজ করলেও – প্রকাশ করেছেন আরো অনেকদিন পর। কিন্তু লিবনিজ প্রকাশ করেছেন নিউটনের আগে। ক্যালকুলাস আবিষ্কারের কৃতিত্ব কাকে বেশি দেয়া হবে – এ নিয়ে বিজ্ঞানীরা দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেলেন। লিবনিজের সমর্থনে একদল বিজ্ঞানী লিখলে, নিউটনের পক্ষে লিখছেন আরেকদল।  নিউটনের বন্ধু সংখ্যা কম হলেও তিনি অন্যপথ নিলেন। নিজেই নিজের পক্ষ সমর্থন করে লিখে তা বন্ধুদের নামে প্রকাশ করতে শুরু করলেন। এভাবে নিয়মিত লিবনিজ-বিরোধী চিঠি প্রকাশিত হতে থাকলে লিবনিজ এই ব্যাপারটার একটা স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে রয়েল সোসাইটির কাছেই বিচার দিলেন। কিন্তু লিবনিজ ভুলটা করলেন সেখানেই। নিউটন নিজেই তখন রয়েল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট। তিনি ‘নিরপেক্ষ’ তদন্ত কমিটি গঠন করবেন বলে নিজের বন্ধুদের দিয়ে একটা কমিটি গঠন করলেন। তাতেও শান্তি নেই তাঁর। নিজেই কমিটির রিপোর্ট লিখলেন এবং রয়েল সোসাইটিকে দিয়ে তা প্রকাশ করালেন। সেই রিপোর্টে লিবনিজকে সরাসরি দায়ি করা হয় নিউটনের কাজ চুরি করেছেন বলে। তাতেও সন্তুষ্ট না হয়ে এই রিপোর্টের পক্ষে অনেক সুনাম করে বেনামে একটা চিঠিও প্রকাশ করলেন রয়েল সোসাইটির জার্নালে। ১৭১৬ সালে লিবনিজের মৃত্যুর পর নির্লজ্জভাবে আনন্দ প্রকাশ করেছেন নিউটন।

১৭২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শেষ বারের মত রয়েল সোসাইটির মিটিং-এ সভাপতিত্ব করেছেন নিউটন। তার এক মাস পরে ১৭২৭ সালের ২০ মার্চ ৮৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁকে রাজকীয় সম্মান দিয়ে ওয়েস্ট মিনিস্টার অ্যাবে-তে সমাহিত করা হয়।

তথ্যসূত্র: ১। স্টিফেন হকিং – ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম; ২। আইওয়ান জেমস – রিমার্কেবল ফিজিসিস্ট; ৩। পিটার মুর – সায়েন্স; ৪। স্টিভ পার্কার – আইজাক নিউটন অ্যান্ড গ্র্যাভিটি; ৫। লয়েড মর্টজ অ্যান্ড জেফারসন ওয়েভার – দ্য স্টোরি অব ফিজিক্স; ৬। জন গ্রিবিন – দ্য সায়েন্টিস্টস। 

___________________

বিজ্ঞানচিন্তা আগস্ট ২০২১ সংখ্যায় প্রকাশিত







Saturday, 1 January 2022

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ৫৩

 



#স্বপ্নলোকের_চাবি_৫৩

“এই রেলস্টেশনের স্থপতি কে ছিলেন?” 

কমলাপুর রেলস্টেশনের বিশাল ছাতার আকৃতির ছাদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো প্রদীপ নাথ। “দেখি তোদের বিসিএস পাস করার সম্ভাবনা কতটুকু আছে।“ মুখ থেকে সিগারেটের ধোঁয়া বের করতে করতে আবার বললো সে। তার কাছাকাছি আমরা যারা আছি সবাই প্রশ্নটা শুনেছি। কিন্তু কেউই উত্তর দিচ্ছি না। বিসিএস পাস করার সম্ভাবনা মনে হচ্ছে আমাদের কারোরই নেই। 

ট্রেন থেকে নেমে আমরা সবাই যে যার ব্যাগ হাতে-কাঁধে নিয়ে এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। একপাশে সারি সারি টিকেটঘরের সামনে যাত্রীদের ঠেলাঠেলি চলছে। অন্য পাশে একটা চায়ের দোকান, তার পাশে ফ্লোরের অনেকটুকু জায়গা দখল করে পত্রিকা আর ম্যাগাজিন সাজিয়ে বসেছে হকার। সকাল সাড়ে সাতটার কমলাপুর স্টেশন এমনিতেই ব্যস্ত। তার উপর শতাধিক শিক্ষার্থী একসাথে এসে ভীড় করে দাঁড়িয়েছি স্টেশনের বারান্দাজুড়ে। কোলাহল তীব্র থেকে তীব্রতর হতে শুরু করেছে। 

মেইল ট্রেনে আমাদের সাথের অন্যান্য যাত্রীরা যে যার মতো চলে গেছে। আমরা অপেক্ষা করছি বাসের জন্য। ঢাকায় বাসের দায়িত্ব শাকিল আর আমানের। ওরা একদিন আগে ঢাকা চলে এসেছে বাস ঠিক করে রাখার জন্য। এখনো বাস আসেনি বলে কেউ কেউ বিরক্তি প্রকাশ করতে শুরু করলো। কোন কিছুর দায়িত্ব না নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করাটা খুবই সহজ কাজ, এবং আমরা সেই সহজ কাজে খুবই অভ্যস্ত। 

একটু পরেই ছুটতে ছুটতে এলো আমান। বাস এসে গেছে। দুটো বিশাল আকৃতির বাস নিয়ে আসা হয়েছে আমাদের জন্য। এই বাসগুলি আগামী তিন দিন আমাদের বিভিন্ন জায়গায় আনা-নেয়া করবে। শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কথা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামে ছাত্রদের থাকার ব্যবস্থা করা হবে, আর রোকেয়া হলে ছাত্রীদের। 

কমলাপুর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামে যেতে বেশিক্ষণ লাগলো না। কিন্তু সেখানে কেউ নেই। গেটে তালা। দারোয়ানও নেই। শিক্ষার্থীরা অধৈর্য। অনেকে হৈচৈ করে নেমে গেল বাস থেকে। দেখলাম আমাদের ক্লাসের শিবিরের যে ক’জন নেতা-কর্মী আছে তারা খুবই উচ্চকন্ঠে বিরক্তি প্রকাশ করছে। হামিদাবানু ম্যাডাম আমাদের থাকার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব নিয়েছেন এটা তাদের পছন্দ হয়নি। 

অবশ্য একটু পরেই তারা সবাই চুপ করে গেল – যখন খেলার মাঠ থেকে একজন দু’জন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এসে আমাদের উদ্দেশ্যে ব্যাঙাত্মক বাক্য নিক্ষেপ করতে শুরু করলো – “সব তো দেখি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।“ “সাহস তো কম নয়, ব্যানার লাগিয়ে চলে এসেছে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে!” “সবগুলাই তো শিবির!” 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি সেটা আমরা জানি। সেজন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলি অবশ্যই ধন্যবাদ পেতে পারে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের দখলে। কিন্তু তার অর্থ কি এই যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীই শিবিরের প্রতিনিধিত্ব করছে! 

আমাদের থাকার ব্যবস্থা কোথায় হয়েছে আমরা কেউ জানি না। বাসের সামনের সিটে শংকরলালস্যার আর রশীদুন্নবীস্যার চুপচাপ বসে আছেন। তাঁদের কাছাকাছি সিটগুলিতে বসেছে মেয়েরা। রোকেয়া হলে তাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে কি না সে ব্যাপারে তারাও এখনো নিশ্চিত নয়। 

বাস দুটো এখানে রেখে আমান আর শাকিল চলে গেছে একটা ট্যাক্সি নিয়ে। প্রায় আধঘন্টা পরে শাকিল এলো শেষ খবর নিয়ে। আমাদের যেতে হবে বুয়েটের প্যাভেলিয়নে। যাবার পথে মেয়েদের নামিয়ে দেয়া হলো রোকেয়া হলে – সেখানেই তাদের থাকার ব্যবস্থা। 

বুয়েটের বিশাল খেলার মাঠের এক পাশে দোতলা প্যাভেলিয়নের দোতলায় বেশ বড় বড় তিনটা পাশাপাশি রুম। কোন আসবাবপত্র নেই। ফ্লোরে যে যার মতো শোবে। অনেকেই বেডশিট নিয়ে এসেছে। আগের দিনের ইন্ডিয়ান বাংলা সিনেমাতে দেখা যায় - কোথাও যাবার সময় বিছানাপত্র সাথে নিয়ে যায়। এখানে এভাবে থাকতে হবে আগে জানলে বিছানাপত্র নিয়ে আসা যেতো, একটা বেডশিট অন্তত নিয়ে আসতে পারতাম। কিন্তু দেখলাম অনেকেই বেডশিট নিয়ে এসেছে। ফ্লোরে বেডশিট পেতে জায়গা দখল করা হলো। ‘যদি হও সুজন, তেঁতুল পাতায় ন’জন’ – দেখা গেলো এখানে প্রায়-সবাই সুজন। 

কিন্তু এখানে এভাবে থাকাটা শিবিরের নেতাদের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। তারা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। তাদের কয়েকজন কর্মী বেশ উচ্চস্বরে হৈচৈ করে বলে উঠলো যে তারা এখানে থাকবে না। 

হামিদাবানুম্যাডাম প্যাভেলিয়নের অফিসে বসেছিলেন বুয়েটের একজন কর্মকর্তার সাথে। শিবিরের হৈচৈ তাঁর কানে গেল। ম্যাডাম অফিস থেকে বের হয়ে বেশ স্পষ্টভাষায় বললেন, “এখানে যারা থাকতে চাও না, তোমরা ইচ্ছে করলে নিজ দায়িত্বে যেখানে খুশি থাকতে পারো। হোটেল কিংবা বাসা – যেখানে খুশি। যেদিন যেখানে যাবার কথা আছে সেখানে তোমরা সময়মতো পৌঁছে গেলেই হবে।“

আমাদের ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ম্যাডামের উপর শিবিরের ক্যাডাররা আক্রমণ করার সাহস দেখিয়েছিল। কিন্তু এখানে ম্যাডামের কথার উপরে কথা বলার সাহস তাদের নেই। যারা এখানে থাকবে না বলে এতক্ষণ লম্ফঝম্প করছিলো তারা সবাই রয়ে গেল। তবে শিবিরের কিছ উঁচুপর্যায়ের নেতা চুপচাপ কোথায় যেন চলে গেল। তাদেরকে আর কোন কার্যক্রমে দেখা যায়নি। 

শিক্ষাসফরের শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হলো একটু পরেই। রাতে একটুও ঘুমানোর সুযোগ হয়নি। ইচ্ছে করছে এখনই ফ্লোরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু সেই সুযোগ নেই। একের পর এক প্রোগ্রাম সেট করা আছে। বুয়েটের ক্যান্টিনে নাস্তা করে একটু ফ্রেশ হয়েই বাসে উঠলাম আবার। 

প্রথম গন্তব্য আণবিক শক্তি কমিশন। শাহবাগের মোড়ে বেশ বড় জায়গা নিয়ে বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের মূল অফিস। অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের বাংলা পারমাণবিক শক্তি কমিশন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু দেখলাম আণবিক শক্তি কমিশন লেখা আছে। 

দোতলার প্রশস্ত সিঁড়ি দিয়ে উঠে বেশ ছিমছাম চুপচাপ অনেকগুলি ঘরের প্যাসেজ মাড়িয়ে বেশ বড় একটি হলঘরে এসে বসলাম। কিছুক্ষণ পর সম্ভ্রান্ত, সৌম্যদর্শন এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক এলেন। তিনি কমিশনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিলেন। হামিদাবানু ম্যাডামের কাছে জানলাম ভদ্রলোকের নাম ডক্টর ওয়াজেদ আলী মিয়া। শেখ হাসিনার স্বামী। 

ব্রিফিং শেষে আমরা কমিশনের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট – হেল্‌থ ফিজিক্স, থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, নন-ডেসট্রাকটিভ টেস্টিং ডিভিশান, ভ্যান-ডি-গ্রাফ এগুলি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে অনেকটা ছুটোছুটি করে ভিড়ের মধ্যে ক্লান্ত হয়ে কোনরকমে প্রথম পর্ব শেষ করলাম। 

এরপরই বাসে উঠে রওনা দিলাম সাভারের উদ্দেশ্যে। আণবিক শক্তি কমিশনের রি-অ্যাক্টর দেখার জন্য। 

ক্ষিধেয় পেট জ্বলে যাচ্ছিলো। চোখভর্তি ঘুম। এর মধ্যেই প্রোগ্রামের পর প্রোগ্রাম। আড়াইটার দিকে সাভার বাজারে বাস থামানো হলো দুপরের খাবারের জন্য। খাবার ব্যবস্থা যারটা তার। এখানে অনেকগুলি রেস্টুরেন্ট আছে। খাবার পেতে সমস্যা হলো না। 

সাভারের নিউক্লিয়ার এনার্জি রিসার্চ সেন্টারে আমাদের শিডিউল করা ছিল সকাল সাড়ে এগারটায়। আমরা পৌঁছলাম বিকেল চারটায়। গেটে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন মিলিটারিরা। আনুষঙ্গিক কাগজপত্র চেক করতে এবং আমাদের পেছনের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে করতে আরো কিছুক্ষণ দেরি হলো। 

ভেতরে অনেক জায়গা নিয়ে রি-অ্যাক্টর বিল্ডিং – অনেক বেশি চুপচাপ। চারদিকে প্রচুর খালি জায়গা। রি-অ্যাক্টর বিল্ডিং-এর বড় প্যাসেজ ধরে আমরা উঠে এলাম মূল রিঅ্যাক্টর এর একেবারে উপরে। নিচ থেকে তিন-তলার সমান উঁচু। মূলত রেডিও-আইসোটোপ তৈরি করা হয় এখানে। হলুদ আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে রি-অ্যাক্টর এর চারপাশ। 

এখানকার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা ব্রিফিং দিচ্ছিলেন কী কী গবেষণা হচ্ছে ইত্যাদি সম্পর্কে। কিন্তু ভালোভাবে কিছু শুনতে পেলাম না। আমরা সংখ্যায় এত বেশি যে সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করে বোঝানো সহজ নয়। তাছাড়া এসব ব্যাপারে আমাদের আগে থেকে কোন তাত্ত্বিক প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি। এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলি সম্পর্কে আমাদেরকে যদি ডিপার্টমেন্টেই কিছু তথ্য দেয়া হতো – আমাদের শিক্ষাসফর আরো কার্যকরী হতো। 

হামিদাবানুম্যাডাম বললেন এখলাসস্যারসহ তিনি এখানে আট বছর চাকরি করেছিলেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার আগে। তাঁর বড়ছেলেও এখানে দেড় বছর চাকরি করার পর এখন আমেরিকায় পিএইচডি করছেন। 

নিউক্লিয়ার সেন্টার থেকে বের হয়ে পড়ন্ত বিকেলে পৌঁছে গেলাম জাতীয় স্মৃতিসৌধে। বিশাল এলাকাজুড়ে এই স্মৃতিসৌধ। সামনে বিস্তীর্ণ চত্বর – লাল ইটে বাঁধানো। এই স্মৃতিসৌধ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত স্মারক। একটা ভাবগম্ভীর পরিবেশ থাকার কথা এখানে। কিন্তু আয়োজন করে শোক প্রকাশ করতে গেলেও তা উৎসবে পরিণত হয়। আমাদের স্মৃতিসৌধও হয়ে গেছে একটা বেড়ানোর জায়গা। ছবি তোলার জায়গা। ভয়ে ভয়ে ছিলাম প্রদীপ নাথ আবার এই স্মৃতিসৌধের স্থপতির নাম জিজ্ঞেস করে কি না। কিন্তু সে স্যার-ম্যাডামদের চোখ এড়িয়ে সিগারেট খাওয়ার ব্যবস্থা করতে করতে স্থপতির নাম জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিল। 

প্যাভেলিয়নে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। সারাদিনের ক্লান্তির পর ফ্লোরে পিঠ ঠেকাতেই ঘুম। সবাই এত ক্লান্ত ছিলাম যে কে কার পাশে ঘুমাচ্ছে তারও কোন হিসেব ছিল না। 

পরদিন আরো টাইট শিডিউল। দুই গ্রুপে ভাগ করা হলো। একটা গ্রুপ যাবে বাংলাদেশ টেলিভিশনে, অন্যগ্রুপ গাজীপুর মেশিন টুল্‌স ফ্যাক্টরি দেখার জন্য। শংকরস্যার আর রশীদুন্নবীস্যারের তত্ত্বাবধানে একটি বাস চলে গেল রামপুরা টেলিভিশনে। আমরা হামিদাবানুম্যাডামের তত্ত্বাবধানে চললাম গাজীপুরের মেশিন টুল্‌স ফ্যাক্টরিতে। 

বিশাল জায়গা নিয়ে এই কারখানা। এদিকে এখনো অনেক খালি জায়গা। ঢাকা থেকে আসার পথের দুই পাশে অনেক গাছপালা – বেশ সুন্দর। ভিজিটরদের তালিকায় আমাদের ইউনিভার্সিটির নাম লেখা আছে। প্রবেশে কোন সমস্যা হলো না। ফ্যাক্টরি অফিস থেকে আমাদের জন্য গাইড দেয়া হলো। তিনি আমাদের সবকিছু দেখালেন। আজ সংখ্যায় অর্ধেক হওয়াতে সুবিধা হয়েছে। অন্য গ্রুপ আগামীকাল আসবে এখানে। 

এই ফ্যাক্টরি উৎপাদন শুরু করেছে ১৯৮১ থেকে। বছরে প্রায় ১৫০০ মেট্রিক টন উৎপাদন। মোট জনশক্তি অফিসারসহ ১১২ জন। দুটো সেকশানের একটিতে বিভিন্ন প্যাটার্নের যন্ত্রপাতি – বিশেষ করে রেলওয়ে, শিপিং, টেক্সটাইল ইত্যাদির যন্ত্রপাতি তৈরি করে। অন্য সেকশানে তৈরি হয় রড় আর স্ক্রু। এখানে কাজের ক্ষেত্রে বিরাট ঝুঁকি আছে দেখলাম। টকটকে লাল গরম লোহা চিমটার সাহায্যে হাতে ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে শ্রমিকরা। ঢালাই মেশিনে গলন্ত লোহা ছিঁটকে পড়ছে। শ্রমিকদের গায়ের শার্টে অসংখ্য ছিদ্র। শরীরেও হয়তো প্রতিদিন ফোসকা পড়ছে। 

মেশিন টুল্‌স ফ্যাক্টরি থেকে বের হয়ে আবার বাস। এবার গেলাম স্পারসো – বাংলাদেশ স্পেস রিসার্চ অ্যান্ড রিমোট সেন্সিং অর্গানাইজেশান। বাংলাদেশের মহাকাশ বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রে। ১৯৮০ সালে এই প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে। মহাকাশ নিয়ে আমাদের দেশে কী কী গবেষণা হচ্ছে সে সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না আমার। এখানকার একজন অফিসার ওবায়দুল কাদের – আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে পাস করেছিলেন অনেক বছর আগে। তিনি আমাদের বিভিন্ন সেকশান ঘুরিয়ে দেখালেন। স্পারসো বিল্ডিং-এর সামনে বেশ বড় একটা গোলাকার অ্যান্টেনা আছে। ওটার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলাতেই বেশি আগ্রহ দেখা গেল সবার। 

স্পারসোর পাশেই আবহাওয়া অফিস। আমাদের অন্যদল যারা সকালে টেলিভিশন ভবনে গিয়েছিল – তারা ফিরে এসে আমাদের সাথে যোগ দিলো। সবাই মিলে ঢুকলাম আবহাওয়া অফিসে। রাডার সম্পর্কে আমরা ক্লাসে পড়েছি। এখানে তার কাজকর্ম দেখার সুযোগ। রাডার দশতলার উপরে। কিন্তু লিফ্‌ট বন্ধ। রশীদুন্নবীস্যার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলেন। তিনি এই বয়সে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাবেন দশ তলা পর্যন্ত? সম্ভবত উঠেই যেতেন। কিন্তু তিন তলায় ওঠার পর ওখান থেকে লিফ্‌ট চালু আছে। দশ তলায় উঠে রাডার রুমে ঢুকলাম। এই রাডারটার রেঞ্জ চারশ কিলোমিটার। এখান থেকে নেমে আরেকটি বিল্ডিং-এ গেলাম। এখান থেকে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়। আড়াইটায় এই অফিস ছুটি হয়ে যায়। কিন্তু আমরা পৌঁছেছি আড়াইটার পর। তারপরও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা আমাদের অনেককিছু দেখালেন। কিন্তু স্যাররা তাগাদা দিয়ে আমাদেরকে বের করে নিয়ে এলেন। 

সন্ধ্যায় আরো প্রোগ্রাম আছে। আগারগাঁও-এ বেতারভবনে গেলাম। গেটে সবার ব্যাগ চেক করা হলো। সব ক্যামেরা রেখে দেয়া হলো। নতুন একটি মিলনায়তন তৈরি করা হয়েছে। আমাদেরকে সেখানে বসানো হলো। রেডিও বাংলাদেশ ঢাকার আঞ্চলিক পরিচালক ফখরুল ইসলাম আমাদের সাথে বাংলাদেশ রেডিও’র বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বললেন। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দিলেন। সুযোগ পেয়ে তাঁকে প্রশ্ন করলাম – বাংলাদেশের রেডিও-টেলিভিশনের স্বায়ত্বশাসনের কতদূর কী হলো? তিনি সরাসরি বললেন, “আমি সরকারি চাকরি করি। আমার পক্ষে এই ব্যাপারে কথা বলা সম্ভব নয়।“ এখান থেকেই বোঝা গেল স্বায়ত্বশাসনের অবস্থা কী। রেডিওর বিভিন্ন সেকশান ঘুরে দেখলাম। রেকর্ডিং স্টুডিওতে দেখা হলো ফরিদুর রেজা সাগরের সাথে। সন্ধা ছ’টার খবর প্রচার দেখলাম। রেহানা পারভীন খবর পড়লেন। ঘোষক সাইফুল ইসলাম রেজার সাথে পরিচয় হলো। 

পরদিন অর্থাৎ তৃতীয় দিন রাতের ট্রেনে আমাদের ফিরে আসার কথা। কিন্তু সারাদিনে অনেক প্রোগ্রাম আছে। সকালে গেলাম রামপুরা টেলিভিশনে। গেটেই আমাদের সব জিনিসপত্র দেখে দেয়া হলো। টিভি ভবনের কোথাও ছবি তোলা যাবে না। দোতলায় একটা মিটিং রুমে নিয়ে যাওয়া হলো আমাদের। প্রোগ্রাম ম্যানেজার এ কে কোরেশী সাহেব এলেন। টেলিভিশনে তাঁকে অনেকবার দেখেছি। তিনি খুব সুন্দর করে কথা বলেন। বিটিভির ইতিহাস তিনি খুব সংক্ষেপে অথচ চমৎকারভাবে বললেন। 

এরপর টেলিভিশনের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরিয়ে দেখানোর ব্যবস্থা করা হলো। লাইব্রেরি, শ্যুটিং, এডিটিং, নিউজ সেকশান – সব ঘুরে ঘুরে অনেক ক্লান্ত হয়ে গেলাম। মনে করেছিলাম টেলিভিশনের নায়ক-নায়িকাদের দেখা পাবো। তাদের কাউকেই দেখলাম না কোথাও। 

আমাদের এর পরের প্রোগ্রাম টঙ্গিতে টেলিফোন শিল্প সংস্থা দেখা। যখন পৌঁছলাম তখন প্রচন্ড রোদ। টঙ্গীর বাজারে বাস থামিয়ে রেস্টুরেন্টে ঢুকে দ্রুত দুপুরের খাওয়া সেরেই টেলিফোন শিল্প সংস্থায়। টেলিফোনের স্ক্রু থেকে শুরু করে তার পর্যন্ত সবকিছুই এখানে তৈরি করা হয়। টি এন্ড টি থেকে একটা টেলিফোন সংযোগ পেতে হলে কত কাঠখড় যে পোড়াতে হয়। এখানে এত এত টেলিফোন সেট তৈরি করা হচ্ছে – এগুলির বাজার কোথায় কে জানে। 

মূলভবনে ঢুকার জন্য আমাদের সাথে একজন গাইড দেয়া হলো। গাইড ভদ্রলোক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। দেখলাম তিনি দ্রুতপদস্থও বটেন। এত দ্রুত হাঁটেন, এত দ্রুত কথা বলেন – আমরা তাঁর পেছনে হাঁটতে হাঁটতেই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি, তাঁর কথা কিছুই বুঝতে পারিনি। 

ফ্যাক্টরি দেখানোর পর আমাদেরকে অডিটরিয়ামে বসিয়ে চা-বিস্কুট খাওয়ানো হলো। তার সাথে আরো কিছু তথ্যও দেয়া হলো। বাংলাদেশে এই ১৯৯২ সালেও কোন ডিজিটাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জ নেই। যতগুলি টেলিফোন আছে সবগুলিই অ্যানালগ এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে চলে। ডিজিটাল সিস্টেম চালু হলে এই শিল্প সংস্থার ভবিষ্যৎ কী হবে জানি না। 

এর পরেও প্রোগ্রাম ছিল শাহবাগের জাদুঘর দেখার। জাদুঘরের সামনে গিয়ে দেখি জাদুঘর বন্ধ। বৃহস্পতিবার, সাপ্তাহিক ছুটি। কিন্তু আহসান হাবীব দীপকের দায়িত্ব ছিল ছুটির দিনেও জাদুঘর দেখানোর ব্যবস্থা করার। সে ব্যবস্থা করার জন্য ভেতরে গিয়েওছিল। কিন্তু সবাই অধৈর্য হয়ে বাস থেকে নেমে যে যার মতো গ্রুপ করে এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়লো। শিক্ষাসফরের নাম দিয়ে আমরা পিকনিক করতে পছন্দ করি। সেখানে একটার পর একটা শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম ভালো লাগে? 

Latest Post

পাইজোবিদ্যুৎ, তেজস্ক্রিয়তা এবং পিয়ের কুরি

  নোবেল পুরষ্কারের ইতিহাসে বিশেষ সম্মানের স্থানে অধিষ্ঠিত আছে ফ্রান্সের কুরি পরিবার। কারণ এই পরিবারের পাঁচজন সদস্য ছয়টি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছ...

Popular Posts