Wednesday, 20 January 2021

লাল গ্রহ মঙ্গল - পর্ব ৩

 



তৃতীয় অধ্যায়

মঙ্গলে অভিযান

 

১৯৬০ থেকে শুরু করে এপর্যন্ত মোট ৪৮টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে মঙ্গলের উদ্দেশ্যে। তার মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৭টি, আমেরিকা ২২টি, রাশিয়া ২টি, ইওরোপিয়ান ইউনিয়ন ৪টি, জাপান ১টি, চীন ১টি এবং ভারত ১টি মিশন পরিচালনা করেছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আরো অনেক মিশন পরিচালনা করা হবে। ২০৩৫ সালের মধ্যে মঙ্গল গ্রহে নভোচারী পাঠানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে আমেরিকা। মঙ্গল গ্রহে এপর্যন্ত পরিচালিত অভিযানগুলো কেমন ছিল দেখা যাক।

 

মঙ্গল গ্রহে অভিযান ১

উৎক্ষেপণের তারিখ

দেশ

মিশন/

মহাকাশযান

লক্ষ্য

ফলাফল

১০/১০/১৯৬০

সোভিয়েত

ইউনিয়ন

মার্সনিক-১

(Marsnik-1)

মঙ্গল গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া।

উৎক্ষেপণের ৩য় ধাপে (৩০০ সেকেন্ড পরে) মিশন ব্যর্থ হয়।

 

 

মঙ্গল গ্রহে অভিযান ২

উৎক্ষেপণের তারিখ

দেশ

মিশন/

মহাকাশযান

লক্ষ্য

ফলাফল

১৪/১০/১৯৬০

সোভিয়েত ইউনিয়ন

মার্সনিক-২

(Marsnik-2)

মঙ্গল গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া।

উৎক্ষেপণের ৩য় ধাপে (২৯০ সেকেন্ড পরে) মিশন ব্যর্থ হয়।

 

চিত্র: মার্সনিক-১ ও মার্সনিক-২ এর মহাকাশযান

 

মার্সনিক-১ ও মার্সনিক-২

মঙ্গল গ্রহের উদ্দেশ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় স্যাটেলাইট হলো মার্সনিক-১ ও মার্সনিক-২। ১৯৬০ সালের ১০ অক্টোবর উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল মার্সনিক-১ এবং তার চার দিন পর ১৪ অক্টোবর উৎক্ষেপণ করা হয় মার্সনিক-২। এই দুটো মিশনের লক্ষ্য ছিল পৃথিবী ও মঙ্গলের মধ্যবর্তী মহাকাশ-অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করা, মঙ্গল গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় গ্রহটির ছবি তুলে পৃথিবীতে পাঠানো, দীর্ঘ মহাকাশযাত্রায় স্যাটেলাইটের যন্ত্রপাতিগুলোর কাজে কোন পরিবর্তন হয় কি না দেখা, এবং দূর থেকে পৃথিবীতে বেতার তরঙ্গ পাঠানো। 

          দুটো মহাকাশযানের গঠন এবং কার্যপদ্ধতি ছিল একই রকমের। স্যাটেলাইটের উচ্চতা ছিল ২.৩৩ মিটার, ব্যাস ১ মিটার। জ্বালানিসহ এদের প্রতিটির ভর ছিল ৬৫০ কেজি। দুই বর্গমিটার ক্ষেত্রফলের দুটো সোলার প্যানেল যুক্ত ছিল । একটি দুই মিটার লম্বা অ্যান্টেনা যুক্ত ছিল তথ্য পাঠানোর জন্য। পে-লোডের ভর ছিল ১০ কেজি। পে-লোডে ছিল ম্যাগনেটোমিটার, কসমিক রে কাউন্টার, প্লাজমা-আয়ন ট্র্যাপ, রেডিওমিটার, মাইক্রোমেট্রিক ডিকেক্টর, স্পেকট্রোমিটার এবং ফটো-টেলিভিশন ক্যামেরা।  

          দুটো স্যাটেলাইটই উৎক্ষেপণের প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যেই মহাকাশে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। ধারণা করা হয় যে ফুয়েল ট্যাংকের কারিগরি সমস্যার কারণে উৎক্ষেপণের তৃতীয় পর্যায়ে যে থ্রাস্ট বা ধাক্কার দরকার হয় তা তৈরি হতে পারেনি। ফলে দুটো মিশনই পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।

 

মঙ্গল গ্রহে অভিযান ৩

উৎক্ষেপণের তারিখ

দেশ

মিশন/

মহাকাশযান

লক্ষ্য

ফলাফল

২৪/১০/১৯৬২

সোভিয়েত ইউনিয়ন

স্পুটনিক-২২

(Sputnik-22)

মঙ্গল গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া।

উৎক্ষেপণের ৪র্থ ধাপে মিশন ব্যর্থ হয়।

 

স্পুটনিক-২২

১৯৬২ সালের ২৪ অক্টোবর উৎক্ষেপণ করা হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের মঙ্গল যাত্রার তৃতীয় স্যাটেলাইট স্পুটনিক-২২। এই মিশনের উদ্দেশ্য ছিল মঙ্গল গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় ছবি তুলে পৃথিবীতে পাঠানো। পে-লোডে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ছিল। মহাকাশযানের মোট ভর ছিল ৮৯৪ কিলোগ্রাম। সোভিয়েত মলনিয়া রকেটের সাহায্যে যথাসময়ে উৎক্ষেপণ করা হয় স্পুটনিক-২২। রকেটের নিচের ধাপগুলো ঠিকমতোই কাজ করেছিল। পে-লোড আর স্যাটেলাইটের উপরের অংশ পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছে দিয়েছিল মলনিয়া রকেট। কিন্তু আবারো বিপর্যয় দেখা দিলো পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে যাবার সময়। মূল ইঞ্জিনে আগুন লেগে ধ্বংস হয়ে গেলো স্যাটেলাইট। আগের দুটো মিশনের মতো এই তৃতীয় মিশনও ব্যর্থ হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের।

 

মঙ্গল গ্রহে অভিযান ৪

উৎক্ষেপণের তারিখ

দেশ

মিশন/

মহাকাশযান

লক্ষ্য

ফলাফল

০১/১১/১৯৬২

সোভিয়েত ইউনিয়ন

মার্স-১

(Mars-1)

মঙ্গল গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া।

উৎক্ষেপণের পর মঙ্গলের পথে যেতে ব্যর্থ হয়।

 

মার্স-১

স্পুটনিক-২২ মিশন ব্যর্থ হবার আট দিনের মাথায় ১৯৬২ সালের ১ নভেম্বর উৎক্ষেপণ করা হয় মার্স-১। সোভিয়েত মার্স প্রোব প্রোগ্রামের প্রথম প্রোব মার্স-১। এই মিশনের উদ্দেশ্য ছিল মঙ্গলের ১১ হাজার কিলোমিটার দূরত্বের ভেতর দিয়ে উড়ে যাওয়া এবং যাবার সময় মঙ্গলের উপরিতলের ছবি তোলা এবং মহাজাগতিক বিকিরণ, মঙ্গলের উপর ছোটছোট গ্রহাণুর প্রভাব, মঙ্গলের ভূমিতে চৌম্বক ক্ষেত্র, তেজস্ক্রিয় বিকিরণ, জলবায়ুর গঠন, এবং জৈবযৌগের অস্তিত্ব নিরূপণ সংক্রান্ত উপাত্ত সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠানো।

          স্যাটেলাইটটির গঠন ছিল মার্সনিক-১ ও মার্সনিক-২-এর মতোই, তবে আরো বড়। সিলিন্ডার আকৃতির স্যাটেলাইটটি ছিল ৩.৩ মিটার লম্বা এবং ১ মিটার চওড়া। সোলার প্যানেল ও অ্যান্টেনাসহ যার দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ৪ মিটার। দুটো কম্পার্টমেন্টে বিভক্ত ছিল স্যাটেলাইটটি। উপরের কম্পার্টমেন্টের দৈর্ঘ্য ২.৭ মিটার। সেখানে ছিল অরবিটাল মডিউল, গাইডেন্স ও প্রপালসান সিস্টেম। নিচের কম্পার্টমেন্টে ছিল বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি। ১.৭ মিটার চওড়া অর্ধবৃত্তাকার অ্যান্টেনা ছিল পৃথিবীর সাথে যোগাযোগের জন্য। সাথে অমনি-ডিরেকশানাল অ্যান্টেনা ও সেমি-ডিরেকশানাল অ্যান্টেনাও ছিল দুটো। সৌরশক্তি উৎপাদনের জন্য দুটো সোলার প্যানেল ছিল যাদের মোট ক্ষেত্রফল ২.৬ বর্গমিটার।

 

চিত্র: মার্স-১ স্যাটেলাইট

 

নির্দিষ্ট সময়ে উৎক্ষেপণের পর প্রথম থেকে চতুর্থ ধাপ পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে রকেট থেকে স্যাটেলাইট বিচ্ছিন্ন হয়েছে। স্যাটেলাইটের সোলার প্যানেল খুলেছে। তারপর উপাত্ত পাঠানো শুরু করেছে। সেই সময় স্যাটেলাইটের দিকনির্ণায়ক যন্ত্রের একটি গ্যাস-ভাল্বে ছিদ্র দেখা দিল। ফলে স্যাটেলাইটটিকে নির্দিষ্ট দিকে ঘোরানো যাচ্ছিলো না। তবুও স্যাটেলাইটটি মঙ্গলের দিকে যাচ্ছিলো। প্রায় চার মাস ধরে কিছু কিছু তথ্য পাঠিয়েছে পৃথিবীতে। ১৯৬৩ সালের ২১ মার্চ এই স্যাটেলাইট থেকে সর্বশেষ তথ্য এসেছে। তখন এর অবস্থান ছিল পৃথিবী থেকে ১০ কোটি ৬৭ লক্ষ ৬০ হাজার কিলোমিটার দূরে। তারপর আর কোন তথ্য পাওয়া না গেলেও হিসেব করে দেখা গেছে ১৯৬৩ সালের ১৯ জুন মার্স-১ মঙ্গল গ্রহ থেকে ১ লক্ষ ৯৩ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে পৌঁছেছিল। তারপর স্যাটেলাইটটি হারিয়ে যায় মহাকাশে। মূল উদ্দেশ্য পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের এই মিশনটিকেও আরেকটি ব্যর্থ মিশন হিসেবে ধরা হয়।

মঙ্গল গ্রহে অভিযান ৫

উৎক্ষেপণের তারিখ

দেশ

মিশন/

মহাকাশযান

লক্ষ্য

ফলাফল

০৪/১১/১৯৬২

সোভিয়েত ইউনিয়ন

স্পুটনিক-২৪

(Sputnik-24)

মঙ্গল গ্রহে অবতরণ করা।

পৃথিবীর কক্ষপথেই মিশন ব্যর্থ হয়।

 

স্পুটনিক-২৪

মার্স-১ উৎক্ষেপণের তিন দিন পরেই ১৯৬২ সালের  ৪ নভেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন মঙ্গল গ্রহের উদ্দেশ্যে স্পুটনিক-২৪ প্রেরণ করে। এই মিশনের উদ্দেশ্য ছিল মঙ্গলের ভূমিতে অবতরণ করা। সবকিছু ঠিক থাকলে স্পুটনিক-২৪ হতে পারতো মঙ্গলের ভূমিতে পৃথিবী থেকে প্রেরিত প্রথম প্রোব। কিন্তু উৎক্ষেপণ রকেটের সমস্যার কারণে পৃথিবীর কক্ষপথ অতিক্রম করতে পারেনি স্পুটনিক-২৪। এ নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পরপর পাঁচটি মঙ্গল অভিযান ব্যর্থ হয়।

 

মঙ্গল গ্রহে অভিযান ৬

উৎক্ষেপণের তারিখ

দেশ

মিশন/

মহাকাশযান

লক্ষ্য

ফলাফল

০৫/১১/১৯৬২

আমেরিকা

 

ম্যারিনার-৩

(Mariner-3)

মঙ্গল গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া।

পে-লোড আলাদা করতে ব্যর্থ হয়। মিশন ব্যর্থ। 

 

 

ম্যারিনার-৩

মঙ্গল গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে যাবার সময় গ্রহটির ছবি তোলা এবং মঙ্গলের ভূমি ও পরিবেশ পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল ম্যারিনার-৩ স্যাটেলাইট। স্যাটেলাইটের ভর ছিল ২৬০.৮ কিলোগ্রাম। স্যাটেলাইটের বাসে ছিল চারটি সোলার প্যানেল। পে-লোডে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির মধ্যে ছিল টেলিভিশন ক্যামেরা, ম্যাগনেটোমিটার, প্লাজমা প্রোব, কসমিক রে টেলিস্কোপ, ট্র্যাপড রেডিয়েশন ডিটেকটর, কসমিক ডাস্ট ডিটেকটর, ও কসমিক রে আয়নাইজেশান চেম্বার। ১৯৬৪ সালের ৫ নভেম্বর ফ্লোরিডার কেইপ ক্যানাভেরাল লঞ্চিং স্টেশন থেকে অ্যাটলাস এলভি-৩ রকেটের সাহায্যে উৎক্ষেপণ করা হয় ম্যারিনার-৩।

 

চিত্র: ম্যারিনার-৩ স্যাটেলাইট

 

উৎক্ষেপণের সময় কোন সমস্যা হয়নি। উৎক্ষেপণের এক ঘন্টা পর ম্যারিনার-৩ থেকে যে সিগনাল আসে সেখান থেকে দেখা যায় স্যাটেলাইটের যন্ত্রপাতিগুলো ঠিকমত কাজ করছিল, কিন্তু সোলার প্যানেল সিস্টেম থেকে কোন সিগনাল আসছিল না। গ্রাউন্ড কন্ট্রোল থেকে কমান্ড পাঠিয়ে জ্বালানি সঞ্চয় করার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু তারপর স্যাটেলাইটকে আর মঙ্গলের ট্রানজিট অরবিটে ঠিকমতো নিয়ে যাওয়া যায়নি। উৎক্ষেপণের আট ঘন্টা পর স্যাটেলাইটের ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে যায়। মিশনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হয়। আমেরিকার প্রথম মঙ্গল মিশন ব্যর্থ হয়ে যায়।

 

মঙ্গল গ্রহে অভিযান ৭

উৎক্ষেপণের তারিখ

দেশ

মিশন/

মহাকাশযান

লক্ষ্য

ফলাফল

২৮/১১/১৯৬৪

আমেরিকা

ম্যারিনার-৪

(Mariner-4)

মঙ্গল গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া।

পৃথিবীর প্রথম স্যাটেলাইট যা মঙ্গলের পাশ দিয়ে উড়ে যেতে পারলো। মিশন সফল।

 

ম্যারিনার-৪

ম্যারিনার-৩ মিশন ব্যর্থ হওয়ার ২৩ দিন পর ১৯৬৪ সালের ২৮ নভেম্বর উৎক্ষেপণ করা হয় ম্যারিনার-৪। ম্যারিনার-৩ ও ম্যারিনার-৪ স্যাটেলাইট দুটো প্রায় একই ধরনের। তবে ম্যারিনার-৩ যেসব কারণে ব্যর্থ হয়েছিল সেগুলো যেন আবার না ঘটে সে ব্যবস্থা করা হয়েছিল ম্যারিনার-৪ এ। সাড়ে চার ফুট উঁচু ও সাড়ে নয় ফুট চওড়া এই স্যাটেলাইটের ভর ছিল ২৬০.৮ কিলোগ্রাম। এই মিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল খুব কাছ থেকে মঙ্গলের ছবি তোলা এবং ছবিগুলো পৃথিবীতে পাঠানো। মঙ্গলের পাশ দিয়ে উড়ে যাবার সময় মঙ্গলের পরিবেশ সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ছিল ম্যারিনার-৪ এর পে-লোডে। ১৭৬ সেন্টিমিটার লম্বা ও ৯০ সেন্টিমিটার চওড়া চারটি সোলার প্যানেলে ২৮,২২৪টি সোলার সেল লাগানো ছিল ম্যারিনার-৪এ। সূর্যালোক থেকে ৩১০ ওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদন করা হতো। রিচার্জেবল সিলভার-জিংক ব্যাটারির ব্যবস্থা ছিল ব্যাক-আপ হিসেবে।

          বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির মধ্যে ছিল হিলিয়াম ম্যাগনেটোমিটার। মঙ্গল গ্রহ এবং তার আশেপাশে চৌম্বকক্ষেত্র সনাক্ত করার জন্য এই ম্যাগনেটোমিটার ব্যবহার করা হয়েছে। চার্জিত কণার তীব্রতা পরিমাপ করার জন্য ছিল আয়নাইজেশান চেম্বার। কম শক্তিসম্পন্ন চার্জিত কণার উপস্থিতি শনাক্ত করার জন্য ছিল ট্র্যাপড রেডিয়েশান ডিটেকটর। মহাজাগতিক রশ্মিতে প্রোটন ও আলফা কণা শনাক্ত করার জন্য ছিল কসমিক রে টেলিস্কোপ। সূর্য থেকে আসা খুব কম শক্তির চার্জিত কণা শনাক্ত করার জন্য ছিল সোলার প্লাজমা প্রোব। মহাজাগতিক ধূলোর ভরবেগ, ঘনত্ব, এবং দিক নির্ণয় করার জন্য ছিল কসমিক ডাস্ট ডিটেকটর। স্যাটেলাইটের নিচের ভূমির দিকে মুখ করে বসানো ছিল টেলিভিশন ক্যামেরা যার সাহায্যে মঙ্গলের ভূমির ছবি তুলে পাঠানো হয়েছে পৃথিবীতে।

 

চিত্র: ম্যারিনার-৪ এর পাঠানো ছবিতে মঙ্গলের বুকে অসংখ্য ক্রেটার বা গর্ত

 

কোন ধরনের সমস্যা ছাড়াই মহাকাশে সবগুলো ধাপ অতিক্রম করে মঙ্গলের কাছে পৌঁছে যায় ম্যারিনার-৪ ১৯৬৫ সালের ১৪ জুলাই। মঙ্গলের সবচেয়ে কাছে যে দূরত্বে ম্যারিনার-৪ পৌঁছেছিল মঙ্গল থেকে সে দূরত্ব ছিল ৯,৮৪৬ কিলোমিটার। আর পৃথিবী থেকে সে দূরত্ব ছিল ২১ কোটি ৬০ লক্ষ কিলোমিটার। পৃথিবী থেকে মঙ্গল গ্রহের কাছাকাছি পৌঁছানো প্রথম স্যাটেলাইট ম্যারিনার-৪। স্যাটেলাইটের ক্যামেরা মঙ্গলের দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে ২১টি ছবি তুলে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। ছবিগুলোতে দেখা যায় মঙ্গলের বুকের অজস্র গর্ত আর ধুলো। তরল পানি নেই কোথাও। পৃথিবীর চাঁদের মতই একটি মৃতগ্রহ মঙ্গল। প্রথমবারের মত মঙ্গলের বায়ুমন্ডলের চাপ মাপা হলো। ৪.১ থেকে ৭ মিলিবার বায়ুচাপ যা পৃথিবীর বায়ুচাপের মাত্র ০.৭ শতাংশ। পৃথিবীর বায়ুচাপ ১০১৩.২৫ মিলিবার। মঙ্গলের দিনের বেলায় তাপমাত্রা হিসেব করে দেখা গেছে -১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কোন ধরনের চৌম্বকক্ষেত্রের অস্তিত্ব পায়নি ম্যারিনার-৪।

 

মঙ্গল গ্রহে অভিযান ৮

উৎক্ষেপণের তারিখ

দেশ

মিশন/

মহাকাশযান

লক্ষ্য

ফলাফল

৩০/১১/১৯৬৪

সোভিয়েত ইউনিয়ন

জন্ড-২

(Zond-2)

মঙ্গল গ্রহের গায়ে ধাক্কা দেয়া।

মঙ্গলে পৌঁছার আগেই হারিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মিশন ব্যর্থ।

 

জন্ড-২

১৯৬৪ সালের ৩০ নভেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়নের ষষ্ঠ মিশন জন্ড-২ উৎক্ষেপণ করা হয় মঙ্গলের উদ্দেশ্যে। এই মিশনের লক্ষ্য ছিল মঙ্গলের পাশ দিয়ে উড়ে যাবার সময় মঙ্গলের ভূমি জরিপ করা এবং শেষে মঙ্গলের গায়ে ধাক্কা দেয়া। এই স্যাটেলাইটটির মোট ভর ছিল ৮৯০ কিলোগ্রাম। এর পে-লোডের মধ্যে ছিল রেডিয়েশান ডিটেক্টর, চার্জড পার্টিক্যল ডিটেক্টর, ম্যাগনেটোমিটার, রেডিও টেলিস্কোপ, আলট্রাভায়োলেট ও এক্স-রে রেডিয়েশান ইমেজিং সিস্টেম।

 

চিত্র: জন্ড-২ স্যাটেলাইট

 

উৎক্ষেপণের ছয় মাস পর্যন্ত মহাকাশে মঙ্গলের অভিমুখে চলেছে জন্ড-২। কিন্তু ১৯৬৫ সালের মে মাসে পৃথিবীর সাথে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় জন্ড-২ এর। দুটো সোলার প্যানেলের একটি নষ্ট হয়ে যাওয়াতে স্যাটেলাইটের ক্ষমতা অর্ধেক হয়ে যায়। হিসেব করে দেখা গেছে ১৯৬৫ সালের ৬ আগস্ট মঙ্গল গ্রহের ১৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছেছিল জন্ড-২। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা ঠিক না থাকাতে কোন তথ্য পাঠাতে পারেনি জন্ড-২। সে হিসেবে এই মিশনকেও ব্যর্থ বলে ধরে নিতে হয়েছে।

লাল গ্রহ মঙ্গল - পর্ব ২

 



দ্বিতীয় অধ্যায়

সূর্যের চতুর্থ গ্রহ

 

সৌরজগতের আটটি গ্রহকে দুটো প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। সূর্যের কাছকাছি চারটি কঠিন গ্রহ - বুধ, শুক্র, পৃথিবী ও মঙ্গল। সে হিসেবে আমাদের পৃথিবীর দু'পাশের দুই প্রতিবেশী গ্রহ - শুক্র ও মঙ্গল। সূর্যের চারপাশে নিজ নিজ কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে শুক্র ও পৃথিবী সবচেয়ে কাছাকাছি যে দূরত্বে আসে সেটা হলো ৩ কোটি ৮০ লক্ষ কিলোমিটার। আবার একইভাবে মঙ্গল ও পৃথিবী পরস্পর সবচেয়ে কাছে যে দূরত্বে আসে তা হলো প্রায় ৫ কোটি ৪৬ লক্ষ কিলোমিটার। সূর্যের সবচেয়ে কাছের দুটো গ্রহ বুধ ও শুক্রের কোন চাঁদ নেই। পৃথিবী থেকে শুরু করে সূর্য থেকে দূরবর্তী গ্রহগুলোর একাধিক চাঁদ আছে। মঙ্গল গ্রহের পরে সূর্যের চারপাশে কয়েক শ' কোটি ছোট-বড় গ্রহাণু ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেই জায়গাটা জুড়ে এরা মহাশূন্যে ভেসে ভেসে সূর্যের চারপাশে ঘুরছে তাকে বলা হয় অ্যাস্টেরয়েড বেল্ট। অ্যাস্টেরয়েড বেল্টের বাইরের দিকের চারটি গ্রহের প্রত্যেকটিই বিশাল আকৃতির গ্রহ হলেও তাদের শরীরের পুরোটাই ঘন গ্যাস দিয়ে তৈরি, কোন কঠিন পদার্থ নেই সেখানে। কঠিন গ্রহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ছোট গ্রহ বুধ। আকার ও আয়তনের দিক থেকে দ্বিতীয় ছোট গ্রহ হলো মঙ্গল। পৃথিবীর আকাশে মঙ্গল গ্রহ খালি চোখে দেখা যায় - তবে সব সময় নয়। সূর্যের চারপাশে নিজ নিজ অক্ষে যে যার মতো ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবী ও মঙ্গল পরস্পর খুব কাছে চলে আসে। সেই সময় পৃথিবী থাকে মঙ্গল ও সূর্যের মাঝখানে। মঙ্গল তখন সূর্যের বিপরীতদিকে থাকে, তাই এ অবস্থাকে বলা হয় অপজিশান। ২৬ মাস পর পর অপজিশান আসে। অপজিশানের সময় পৃথিবীর আকাশে মঙ্গলকে খালি চোখেই দেখা যায়।

          এই অধ্যায়ে চলো দেখি মঙ্গল গ্রহের আকার, আয়তন, ভর, ঘনত্ব, সূর্য ও পৃথিবী থেকে দূরত্ব, কক্ষপথের গতিপ্রকৃতি, মাধ্যাকর্ষণ ইত্যাদি প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলি কেমন।

 

 


মঙ্গলের আকার-আকৃতি, ভর ও ঘনত্ব

সৌরজগতের গ্রহগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম গ্রহ মঙ্গল। সূর্যের আটটি গ্রহের মধ্যে শুধুমাত্র বুধ-ই মঙ্গলের চেয়ে ছোট, বাকি সবগুলি গ্রহ মঙ্গলের চেয়ে বড়। মঙ্গলের গড় ব্যাস ৬,৭৯২ কিলোমিটার, যা পৃথিবীর ব্যাসের প্রায় অর্ধেক। মঙ্গল গ্রহের সাথে পৃথিবীর চাঁদের আকৃতিগত মিল আছে অনেক। চাঁদের যেমন একপিঠ খানাখন্দে ভর্তি এবং অন্যপিঠ মসৃণ, মঙ্গলেরও এক গোলার্ধ খানাখন্দে ভর্তি, অন্য গোলার্ধ অপেক্ষাকৃত মসৃণ। পৃথিবীর যেমন উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর দিকটা কিছুটা চাপা, মঙ্গলেরও তাই। নিজের অক্ষের উপর পশ্চিম দিক থেকে পূর্বদিকে প্রচন্ডভাবে ঘুরছে বলে গ্রহের ভেতরের পদার্থগুলো গ্রহের পেট বরাবর বাইরের দিকে বেরিয়ে আসতে চায়। তাই পূর্ব-পশ্চিম বরাবর নিরক্ষীয়-ব্যাস  উত্তর-দক্ষিণ বরাবর মেরু-ব্যাসের চেয়ে কিছুটা বড় হয়। মঙ্গলের নিরক্ষীয় ব্যাস ৬,৭৯২ কিলোমিটার, এবং মঙ্গলের মেরু-ব্যাস ৬,৭৫২ কিলোমিটার।

 

চিত্র: মঙ্গল গ্রহের নিরক্ষীয় ব্যাসার্ধ ও মেরু ব্যাসার্ধ

 

মঙ্গলের পরিসীমা ২১,৩৪৪ কিলোমিটার, যা পৃথিবীর পরিসীমার শতকরা ৫৩ ভাগ। মঙ্গলের ক্ষেত্রফল ১৪,৪৭,৯৮,৫০০ বর্গ কিলোমিটার, যা পৃথিবীর মোট ক্ষেত্রফলের শতকরা মাত্র ২৮ ভাগ। মঙ্গল গ্রহের আয়তন ১৬,৩০০ কোটি ঘন কিলোমিটার - যা পৃথিবীর আয়তনের ছয় ভাগের এক ভাগ বা প্রায় ১৫%। অর্থাৎ আমাদের পৃথিবীর আয়তন ছয়টি মঙ্গল গ্রহের আয়তনের সমান।

          মঙ্গল গ্রহের ভর ৬৪২ কোটি কোটি কোটি কিলোগ্রাম (৬.৪২x১০২৩ কিলোগ্রাম)। মঙ্গলের আয়তন পৃথিবীর আয়তনের শতকরা ১৫ ভাগ হলেও মঙ্গলের ভর পৃথিবীর ভরের মাত্র ১০.৭%। দেখা যাচ্ছে পৃথিবী যে উপাদান দিয়ে তৈরি তা মঙ্গল গ্রহ যে উপাদান দিয়ে তৈরি তার চেয়ে ভারী।

          মঙ্গল গ্রহের গড় ঘনত্ব ৩,৯৪০ কিলোগ্রাম/ঘন মিটার বা ৩.৯৪ গ্রাম/ঘন সেমি। পৃথিবীর গড় ঘনত্ব ৫,৫১০ কিলোগ্রাম/ঘন মিটার বা ৫.৫১ গ্রাম/ঘন সেমি। মঙ্গল গ্রহের গড় ঘনত্ব পৃথিবীর গড় ঘনত্বের শতকরা ৭১.৫ ভাগ।    

 

 


পৃথিবীর সাথে মঙ্গল গ্রহের আকৃতিক বৈশিষ্ট্যের একটি তুলনামূলক চিত্র নিচের সারণিতে দেয়া হলো।

 

সারণি:  মঙ্গল ও পৃথিবীর আকারের তুলনা

বৈশিষ্ট্য

মঙ্গল

পৃথিবী

গড় ব্যাস

৬,৭৯২ কিমি

১২,৭৪২ কিমি

পরিসীমা

২১,৩৪৪ কিমি

৪০,০৭৫ কিমি

ক্ষেত্রফল

১৪,৪৭,৯৮,৫০০ বর্গ কিমি

৫১,০১,০০,০০০ বর্গ কিমি

আয়তন

১৬,৩০০ কোটি ঘন কিমি

১,০৮,০০০ কোটি ঘন কিমি

ভর

৬৪২ কোটি কোটি কোটি কিলোগ্রাম

৫,৯৭২ কোটি কোটি কোটি কিলোগ্রাম

ঘনত্ব

.৯৪ গ্রাম/ঘন সেমি

.৫১ গ্রাম/ঘন সেমি

 

 


অভিকর্ষজ ত্বরণ

মঙ্গল গ্রহের উপরের তলে অভিকর্ষজ ত্বরণের গড় মান ৩.৬৯ মিটার/বর্গ সেকেন্ড। পৃথিবীপৃষ্ঠে এই মান ৯.৮১ মিটার/বর্গ সেকেন্ড। অর্থাৎ মঙ্গলের অভিকর্ষজ ত্বরণের মান পৃথিবীর অভিকর্ষজ ত্বরণের মানের প্রায় ৩৮%। তার মানে পৃথিবীতে কোন কিছুর ওজন যদি ১০০ নিউটন হয়, মঙ্গলে তার ওজন হবে ৩৮ নিউটন। পৃথিবীতে কেউ যদি উচ্চলাফ দিয়ে দুই মিটার লাফাতে পারে, মঙ্গল গ্রহে সে ৫ মিটারেরও বেশি লাফাতে পারবে।

 

মঙ্গলের মুক্তিবেগ

পৃথিবী থেকে যখন মহাকাশে রকেট পাঠানো হয় তখন সেই রকেটের বেগ এমন হতে হয় যেন সেটা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলের টানে পৃথিবীতে ফিরে না আসে। মাধ্যাকর্ষণ বল থেকে মুক্তি পাবার জন্য সর্বনিম্ন যে বেগের দরকার হয় তাকে মুক্তিবেগ (escape velocity) বলে। পৃথিবীর মুক্তিবেগ ঘন্টায় ৪০,২৮৪ কিলোমিটার। মঙ্গলপৃষ্ঠের মাধ্যাকর্ষণ বলের টান অতিক্রম করতে হলে সর্বনিম্ন যে বেগের দরকার হয় অর্থাৎ মঙ্গলের মুক্তিবেগ হলো ৫.০৩ কিমি/সে বা ঘন্টায় ১৮,১০৮ কিলোমিটার।

 

থাকে কত দূরে

সূর্যের চতুর্থ গ্রহ মঙ্গল। সূর্য থেকে তার গড় দূরত্ব ২২ কোটি ৭৯ লক্ষ ৩৬ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার। মঙ্গলের একদিকে আছে পৃথিবী, আর অন্যদিকে গ্রহাণুর বেল্ট পার হয়ে বিশাল গ্রহ বৃহস্পতি। পৃথিবী ও বৃহস্পতির কক্ষপথের মাঝখানে মঙ্গলের কক্ষপথ। পৃথিবী থেকে মঙ্গলের ন্যূনতম দূরত্ব ৫ কোটি ৪৬ লক্ষ কিলোমিটার। বৃহস্পতি থেকে মঙ্গলের ন্যূনতম দূরত্ব ৫৮ কোটি ৮০ লক্ষ কিলোমিটার। মঙ্গলের নিকটতম প্রতিবেশী হলাম আমরা - আমাদের পৃথিবী।

 

চিত্র: সূর্য থেকে মঙ্গলের সবচেয়ে কাছের ও সবচেয়ে দূরের বিন্দুর দূরত্ব

 

মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথ খুবই উপবৃত্তাকার। সৌরজগতের গ্রহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উপবৃত্তাকার কক্ষপথ হলো বুধের (উৎকেন্দ্রিকতা ০.২০৫৬); তারপরেই মঙ্গলের কক্ষপথ। মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথ পৃথিবীর কক্ষপথের চেয়েও উপবৃত্তাকার। তাই সূর্যের চারপাশে উপবৃত্তাকার পথে ঘুরার সময় সূর্য থেকে মঙ্গলের দূরত্ব সবসময় সমান থাকে না। মঙ্গল সূর্যের একেবারে কাছে যে বিন্দু পর্যন্ত যেতে পারে সেখান থেকে সূর্যের দূরত্ব ২০ কোটি ৬৬ লক্ষ কিলোমিটার। সূর্য থেকে মঙ্গলের কক্ষপথের সবচেয়ে কাছের এই বিন্দুকে বলে পেরিহিলিয়ন (perihelion) বা অনুসুর বিন্দু। মঙ্গল গ্রহ সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরে যে বিন্দু পর্যন্ত যেতে পারে তার দূরত্ব ২৪ কোটি ৯২ লক্ষ কিলোমিটার। সূর্য থেকে মঙ্গলের কক্ষপথের সবচেয়ে দূরের এই বিন্দুকে বলে অ্যাপহিলিয়ন (aphelion) বা অপসুর বিন্দু। সূর্য থেকে মঙ্গল গ্রহে আলো আসতে সময় লাগে প্রায় ১২ মিনিট ৪০ সেকেন্ড।

 

কত বেগে ঘুরে

সূর্যের চারপাশে মঙ্গলের গড় গতিবেগ সেকেন্ডে ২৪১ কিলোমিটার বা ঘন্টায় ৮৬ হাজার ৭৬০ কিলোমিটার। অনুসুর বা পেরিহিলিয়ন বিন্দুতে মঙ্গলের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি; সেকেন্ডে ২৬. কিলোমিটার বা ঘন্টায় ৯৫ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। অপসুর বা অ্যাপহিলিয়ন বিন্দুতে এই গতিবেগ সবচেয়ে কম; সেকেন্ডে প্রায় ২২ কিলোমিটার বা ঘন্টায় ৭৯ হাজার ২০০ কিলোমিটার। কক্ষপথে মঙ্গলের গতিবেগ পৃথিবীর গতিবেগের চেয়ে কম।

 

মঙ্গলের বছর

মঙ্গলের কক্ষপথের পরিসীমা ১৪২ কোটি ৯০ লক্ষ কিলোমিটার। সূর্যের চারপাশে এই কক্ষপথ একবার অতিক্রম করতে মঙ্গলের সময় লাগে পৃথিবীর ৬৮৭ দিনের সমান। সুতরাং মঙ্গলের এক বছর পৃথিবীর ১.৮৮ বছরের সমান।

 

মঙ্গলের দিন

সৌরজগতের গ্রহগুলো সূর্যের চারপাশে কক্ষপথে যেরকম ঘুরছে, তেমনি ঘুরছে নিজের অক্ষের উপর। মঙ্গল গ্রহ নিজের অক্ষে পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে ঘুরছে। কোন গ্রহ তার নিজের অক্ষে একবার সম্পূর্ণ ঘুরে আসতে যে সময় নেয় তাকে বলা হয় গ্রহটির এক দিন। পৃথিবী ২৪ ঘন্টায় এক বার নিজের অক্ষে ঘুরে, তাই ২৪ ঘন্টায় পৃথিবীর এক দিন। নিজের অক্ষের উপর একবার সম্পূর্ণ ঘুরতে মঙ্গলের লাগে পৃথিবীর সময়ের মাপে ২৪ ঘন্টা ৩৯ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড। মঙ্গলের দিন পৃথিবীর দিনের চেয়ে মাত্র ৩৯ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড লম্বা। পৃথিবীর দিন আর মঙ্গলের দিনের দৈর্ঘ্য খুব কাছাকাছি হওয়ার কারণে পৃথিবীর দিন ও মঙ্গলের দিনের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রাখার জন্য বিজ্ঞানীরা মঙ্গলের দিনের নাম দিয়েছেন 'সোল' (sol)। এক সোল সমান ২৪ ঘন্টা ৩৯ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড ধরে নিয়ে মঙ্গল গ্রহের এক বছর সমান ৬৬৮ সোল।

 

মঙ্গলের ঋতু পরিবর্তন

কোন গ্রহ যদি তার কক্ষপথের তলের উপর লম্বভাবে ঘড়ির কাটার বিপরীত দিকে ঘুরে তাহলে ধরতে হবে ঐ গ্রহের কৌণিক নতি (obliquity) শূন্য ডিগ্রি। সৌরজগতের সবগুলো গ্রহেরই কমবেশি কৌণিক নতি আছে। পৃথিবীর কৌণিক নতি ২৩.৪৫ ডিগ্রি। মঙ্গলের কৌণিক নতি ২৫.২ ডিগ্রি। যে গ্রহের কৌণিক নতি যত কম, সূর্যের সাথে তার পারস্পরিক অবস্থানের পরিবর্তনও কম। ফলে জলবায়ুর পরিবর্তনও কম হয়। পৃথিবীর ২৩.৪৫ ডিগ্রি কৌণিক নতির কারণে পৃথিবীতে ঋতু পরিবর্তন হয়। মঙ্গলের কৌণিক নতি পৃথিবীর চেয়েও সামান্য বেশি। তাই এটা নিশ্চিত যে মঙ্গলে ঋতু পরিবর্তন ঘটে।

 

চিত্র: নিজের অক্ষে মঙ্গল ও পৃথিবীর ঘূর্ণন ও কৌণিক নতি


পৃথিবী ও মঙ্গলের কৌণিক নতি কাছাকাছি হলেও তাদের কক্ষপথ খুবই ভিন্ন। পৃথিবীর কক্ষপথ প্রায় বৃত্তাকার, তাই পৃথিবীর ঋতুগুলো উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে প্রায় সমানভাবে বিন্যস্ত থাকে। যেমন উত্তর গোলার্ধে যখন শীতকাল, দক্ষিণ গোলার্ধে তখন গ্রীষ্মকাল। এই শীতকাল ও গ্রীষ্মকালের দৈর্ঘ্য প্রায় সমান। কিন্তু  মঙ্গলের কক্ষপথ উপবৃত্তাকার হওয়াতে মঙ্গলের ঋতুপরিবর্তনের ধরনটা পৃথিবীর মত এত সমানভাবে বিন্যস্ত নয়। যেমন, মঙ্গলের উত্তর গোলার্ধে বসন্তকাল থাকে ১৯৯ দিন, শরৎকাল থাকে ১৪৭ দিন, শীতকাল থাকে ১৬০ দিন, আর গ্রীষ্মকাল থাকে ১৮২ দিন। দক্ষিণ গোলার্ধে বসন্তকাল থাকে ১৪৬ দিন, গ্রীষ্মকাল ১৬০ দিন, শরৎকাল ১৯৯ দিন, ও শীতকাল থাকে ১৮২ দিন।

          মঙ্গল গ্রহের অক্ষের কৌণিক নতি প্রতি ১ লক্ষ ২০ হাজার বছরে ১৫ ডিগ্রি থেকে ৩৫ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠানামা করে। মহাবিশ্বের গ্রহ-নক্ষত্রগুলোর পারস্পরিক মহাকর্ষ বলের কারণে এই পরিবর্তন ঘটে থাকে। পৃথিবীর অক্ষের কৌণিক নতির পরিবর্তন ঘটে অনেক কম। কারণ পৃথিবীর ঊপর চাঁদের আকর্ষণ বল পৃথিবীর অক্ষের কৌণিক নতির খুব বেশি পরিবর্তন ঘটতে দেয় না। 

 

 

চিত্র: মঙ্গল গ্রহের ঋতু পরিবর্তন

 

মঙ্গল গ্রহের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যগুলো দূর থেকে গ্রহটিকে পর্যবেক্ষণ করে জানা গেছে। বর্তমানে শক্তিশালী দূরবীক্ষণের সাহায্যে মঙ্গল গ্রহের গতিপ্রকৃতির সূক্ষ্ম পরিবর্তনও ধরা যায়। কিন্তু মঙ্গল গ্রহের অভ্যন্তরীণ গঠন, রাসায়নিক উপাদান, তাপমাত্রা, আবহাওয়া, চৌম্বকক্ষেত্র, এবং সর্বোপরি মঙ্গলে প্রাণ আছে কি না  ইত্যাদি জানার জন্য গ্রহ থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা দরকার।

          বিজ্ঞানীরা মঙ্গল গ্রহে স্বয়ংক্রিয় মহাকাশযান পাঠিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেছিলেন ১৯৬১ সালে। পরের অধ্যায়ে আমরা দেখবো মঙ্গল গ্রহে কী কী বৈজ্ঞানিক অভিযান চালানো হয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে আর কী কী অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তারপর আমরা এসব অভিযান থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলো সম্পর্কে আলোচনা করবো।

পর্ব ৩

Tuesday, 19 January 2021

লাল গ্রহ মঙ্গল - পর্ব ১

 


প্রথম অধ্যায়

ভয়ঙ্কর মঙ্গল

"এই ছবি তুই এঁকেছিস?" - সুব্রত'র চোখে অবিশ্বাসের চাউনি। আমি বুঝতে পারছি না আমার আঁকা ছবি দেখে এত আশ্চর্য হবার কী আছে।

          "হ্যাঁ আমি এঁকেছি। তাতে কী হয়েছে?"

          "এত্তো ভাল ছবি তুই কেমনে আঁকলি?"

          "কেন? তুই ছাড়া বুঝি আর কেউ ভালো ছবি আঁকতে পারবে না?" - সুব্রত'র প্রশ্ন শুনে ফুঁসে ওঠে নয়ন। সুব্রত ক্লাসের সবার ওপর খবরদারি করলেও নয়নকে খুব ভয় পায়। সে মিনমিন করে বললো, "না, মানে ছবিটা এমন জীবন্ত"

          "যে ছবি স্বাতী এঁকেছে সেই ছবি জীবন্ত হবে না তো কি তোর মতো মরন্ত হবে?"

          নয়নের গলার স্বর চড়ে যাচ্ছে। তাতে অবশ্য কোন সমস্যা নেই। নয়নের চড়া গলার সাথে ক্লাসের সবাই পরিচিত। ক্লাস শুরু হবার আগপর্যন্ত এরকম চিৎকার চেঁচামেচি আমাদের ক্লাসে চলতেই থাকে।

          লুনা ফিসফিস করে আমার কাছে জানতে চাইলো, "মরন্ত শব্দটি কি সঠিক?"

          আমি বললাম, "নয়ন যেহেতু বলেছে সেহেতু সঠিক।"

          "নয়ন, তুই কিছু না বুঝেই বেহুদা চিল্লাইতেছিস।" পেছনের বেঞ্চ থেকে অর্ক উঠে এসে সুব্রতর পাশে দাঁড়ায়। কিছুদিন আগেও সুব্রত অর্ককে দুই চোখে দেখতে পারতো না। সিক্স থেকে সেভেনে ওঠার সময় অর্ক তেমন ভালো রেজাল্ট করেনি। আর সুব্রত এখনো পর্যন্ত কোনদিন ফার্স্ট ছাড়া সেকেন্ড হয়নি। ক্লাসের ফার্স্টবয় হিসেবে প্রতি ক্লাসেই সে মনিটরের দায়িত্ব পালন করেছে। দায়িত্ব নয়, আসলে ক্ষমতা। ক্ষমতার দম্ভে সে ক্লাসের কাউকেই তোয়াক্কা করতো না। স্যার-ম্যাডামদের চোখে সুব্রত হিরের টুকরো ছেলে। কিন্তু আফতাব স্যার ক্লাসটিচার হয়ে আসার পর সুব্রতর আধিপত্য কিছুটা খর্ব হয়ে পড়েছে। কারণ আফতাব স্যার ক্লাসে কাউকেই আলাদা করে পাত্তা দেন না, অথবা বলা চলে সবাইকে সমান পাত্তা দেন। সবার মর্যাদা যদি সমান হয়ে যায় - তাহলে তো যারা এতদিন আলাদা মর্যাদা পেতো তাদের খারাপ লাগবে তাই না? আফতাব স্যার বিজ্ঞান পড়াতে এসে আস্তে আস্তে আমাদের সবার ভেতর বিজ্ঞানের প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা তৈরি করে ফেলেছেন। পরীক্ষার জন্য আলাদা করে বিজ্ঞানের প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করার যে দরকারই নেই তা আমরা কিছুদিন আগেই বুঝতে পেরেছি। অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় বিজ্ঞানে আমরা সবাই ভালো করেছি। ক্লাসের লাস্টবয় আবদুর রহমান পর্যন্ত বিজ্ঞানে একশ'র মধ্যে আশি পেয়েছে, অর্ক পেয়েছে ১০০। ফারজানা, নয়ন, সুব্রত, ইয়াসমিন, চিত্রা এবং আরো অনেকে পেয়েছে ৯৫। সেজন্য সুব্রতর খুবই মনখারাপ। এতদিন মার্কের দিক থেকে সে ছিল অনেকটা ধরাছোঁয়ার বাইরে। এখন তাকে অনেকেই ধরে ফেলেছে।

          সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো লুনাও বিজ্ঞানে ১০০'র মধ্যে ১০০ পেয়েছে। লুনা আমাদের ক্লাসে এসেছে মাত্র দু'মাস আগে। তার বাবার বিদেশে পোস্টিং থাকার কারণে সে এতদিন চীনে ছিল। তার কাছ থেকে আমরা বেশ কিছু চীনা শব্দও শিখে ফেলেছি। হাসিখুশি লুনা খুব দ্রুতই আমাদের বন্ধু হয়ে গেছে। আমি, ফারজানা, চিত্রা, আর নয়ন একেবারে কেজি-ওয়ান থেকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অর্ক আমাদের নাম দিয়েছে চতুরঙ্গ। কিন্তু এখন লুনাকে নিয়ে আমরা পাঁচ-জন হয়ে গিয়েছি। নয়ন অর্ককে জিজ্ঞেস করেছিল, 'এবার কী বলবি আমাদের?'

          অর্ক একটুও সময় না নিয়ে বলেছিল, 'তোরা এখন পঞ্চভূত।'

          "কী বললি? আমাদের তুই ভূত বললি? নয়ন, দ্যাখ অর্ক আমাদের ভূত বলছে।" আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। আমি আশা করেছিলাম নয়ন অর্কের দিকে তেড়ে যাবে। কিন্তু নয়ন আমার উপর রেগে গেলো - "চুপ কর তো স্বাতী। তুই পঞ্চভূতের অর্থ জানিস না?"

আমি চুপ করে গিয়েছিলাম। পঞ্চভূতের অর্থ আমি জানি না। অর্ক যখন আগে চতুরঙ্গ বলেছিল তখন আমি ভেবেছিলাম রঙ্গ-রসিকতার কথা বলছে। এখন পঞ্চভূত বলাতে মনে হয়েছে ভূত বলেছে। নয়ন পরে বলেছে পঞ্চভূত হলো - মাটি, পানি, আগুন, বাতাস, আর আকাশ। আমার মনে হয়েছে অর্ক আমাদের গ্রুপের সঠিক নামই দিয়েছে। অর্ক অনেক জানে। সারাক্ষণই বই পড়ে সে। বিজ্ঞানে তার উৎসাহই সবচেয়ে বেশি। আমরা অনেকগুলো গ্রহ-উপগ্রহ সম্পর্কে অনেককিছু জেনে ফেলেছি এর মধ্যে। আফতাব স্যার আমাদের ক্লাসে বিজ্ঞান ক্লাব তৈরি করে দিয়েছেন। আমাদের সবার মত নিয়ে ক্লাবের নাম রাখা হয়েছে জগদীশচন্দ্র বসু বিজ্ঞান ক্লাব। ক্লাবের সভাপতি কে হতে চায় জিজ্ঞেস করেছিলেন আফতাব স্যার। আমরা সবাই হাত তুলেছিলাম। স্যার তখন ক্লাসের রোল নম্বর অনুসারে সুব্রতকে সভাপতি, ফারজানাকে সহ-সভাপতি, ইয়াসমিনকে সাধারণ সম্পাদক, চিত্রাকে সহ-সম্পাদক ঘোষণা করেছিলেন। আর বাকিরা সবাই সদস্য। সুব্রত সভাপতি হলে কী হবে, এখন ক্লাবের কাজ সবচেয়ে বেশি করছে অর্ক। সুব্রত এখন অর্কের সাথে বন্ধুত্ব করেছে সেজন্যই। অর্ক সুব্রতর পাশে এসে বললো, "আসলে স্বাতীর আঁকা ছবি তো আমরা আগে দেখিনি, তাই। তাছাড়া স্বাতী - তুই তো ক'দিন আগেই ক্যারাতের ব্ল্যাক বেল্ট পেয়েছিস। যে হাত দিয়ে এরকম মারপিট করিস, সেই হাত দিয়ে এমন সুন্দর ছবিও আঁকিস - ওয়াও বস - জটিল।"

          পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে এলো। যে ছবির কথা বলা হচ্ছে সেটা আমি এঁকেছি আমাদের ক্লাসরুমের জন্য। কিছুদিনের মধ্যেই স্কুলে পরিদর্শক টিম আসবে। আফতাব স্যার আমাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন ক্লাসরুম কীভাবে সুন্দর করা যায়। তখন আমরা সবাই বলেছি - ক্লাসরুমের দেয়ালে আমরা বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের ছবি টাঙিয়ে দেবো। ইতোমধ্যে আমরা সূর্য, পৃথিবী, চাঁদ, বুধ ও শুক্রের পোস্টার তৈরি করে ফেলেছি। আমাদের মঙ্গল প্রজেক্টের কাজ শুরু হবে কয়েকদিনের মধ্যে। ক্লাসরুমের জন্য আমি কোন বিখ্যাত বিজ্ঞানীর ছবি আঁকতে চাচ্ছিলাম। আমার প্রিয় বিজ্ঞানী মেরি কুরি। আফতাব স্যার প্রতি বৃহস্পতিবার থার্ড ও ফোর্থ পিরিয়ডে বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের কাহিনি বলেন। তিনি বলেছেন মেরি কুরি ও তার পরিবারের কথা। মেরি কুরি পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম নারী তিনি যিনি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন। ১৯০১ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত মোট ২১৩ জন বিজ্ঞানী পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে মাত্র তিন জন নারী। ১৯০৩ সালে মেরি কুরির পর ষাট বছর আর কোন নারী পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পাননি। ১৯৬৩ সালে মারিয়া গোয়েপার্ট-মেয়ার পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পান। তারপর আবার ৫৫ বছর অপেক্ষার পর ২০১৮ সালে নোবেলবিজয়ী তৃতীয় নারী পদার্থবিজ্ঞানী হলেন ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড। আমি একই ক্যানভাসে মেরি কুরি, মারিয়া গোয়েপার্ট-মেয়ার ও ডোনা স্ট্রিকল্যান্ডের ছবি এঁকে এনেছি আজ। সুব্রত ছবিটা দেখেই প্রশ্ন করেছে, "এই ছবি তুই এঁকেছিস?"

          আফতাব স্যার ক্লাসে আসার পর ছবিটা দেখে খুব খুশি হয়ে বললেন, "চমৎকার ছবি হয়েছে। মেরি কুরির কথা আমরা অনেকে জানলেও মারিয়া গোয়েপার্ট-মেয়ারের কথা তেমন কেউ জানে না। আর ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড তো মাত্র গতবছর নোবেল পুরষ্কার পেলেন। তোমরা যে বিজ্ঞানীদের খোঁজখবর রাখো তা বোঝাই যাচ্ছে। এই ছবি কে এঁকেছো?"

          আমি হাত তুলে বললাম, "আমি একেঁছি স্যার।"

          "ভেরি গুড ভেরি গুড সাথী। অত্যন্ত চমৎকার।"

          "স্যার, আমার নাম সাথী নয়, স্বাতী।"

          "তোমার নাম সাথী নয়? ছাতি? মানে আমব্রেলা?"

          স্যারের কথা শুনে ক্লাসের সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। স্যারের উচ্চারণ ভয়াবহ রকমের খারাপ। চ ছ স শ এগুলো সব গুলিয়ে যায় স্যারের কথায়। আমরা হো হো করে হাসলে স্যারও হাসেন। আফতাব স্যারকে ক্লাসে গম্ভীর হয়ে থাকতে আমরা দেখিনি কখনো। তাই স্যারকে আমরা একটুও ভয় পাই না। বললাম, "স্যার, ছাতি নয়, স্বাতী - স্বাতী একটি নক্ষত্র স্যার।"

          "অবশ্যই। তুমি আমাদের উজ্জ্বল নক্ষত্র শাথি।" - স্যারের ত আর থ ঠিক হবার নয়।

          "তোমাদের এবারের প্রজেক্ট কী?"

          "স্যার মঙ্গল" - সুব্রতর ঝটপট উত্তর।

          "মঙ্গল বলতে কী বুঝ তোমরা?"

          আফতাব স্যারের এরকম প্রশ্নে আমরা এতদিনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। বিজ্ঞানের কোন প্রসঙ্গ অবতারণা করার আগে স্যার এরকম অনেক প্রশ্ন করেন। আমরা স্বতস্ফূর্তভাবে তার উত্তর দিই। অনেক সময় আমরা দুষ্টুমি করে অপ্রাসঙ্গিক উত্তরও দিই। স্যার তাতেও রাগ করেন না। মঙ্গল বলতে আমরা সবাই এখন মঙ্গল গ্রহ বুঝলেও অনেকে ইচ্ছে করে বিভিন্ন রকমের উত্তর দিতে শুরু করলো।

          "মঙ্গলবার"

          "মঙ্গলদীপ"

আমাদের ক্লাসের সঘোষিত সঙ্গীতবিশারদ জয়নাল আবেদিন বিদ্যুৎ বেসুরো গলায় গেয়ে উঠলো, "মঙ্গলদীপ জ্বেলে অন্ধকারে দুচোখ আলোয় ভরো প্রভু"। আমরা আবার সবাই হেসে উঠলাম।

          "আমরা বাঙালীরা মঙ্গল বলতে ভালো কিছু বুঝি - তাই না? যেমন বলে থাকি, তোমার মঙ্গল হোক, সবার মঙ্গল হোক। মঙ্গলদীপ, মঙ্গল শোভাযাত্রা এরকম অনেককিছু আমাদের সংস্কৃতিতে আছে। মঙ্গল গ্রহকে আমাদের সংস্কৃতিতে খুবই ভালো শুভ একটা গ্রহ হিসেবে ধরে নেয়া হয়। অথচ এই মঙ্গল গ্রহ বা মার্স যার নামে নামকরণ করা হয়েছে সে কিন্তু খুবই ভয়ঙ্কর দেবতা।"

          আমরা আগ্রহ নিয়ে শুনি মঙ্গল গ্রহ সম্পর্কে প্রাচীন মানুষের কী কী ধারণা ছিল। প্রাচীন মিশরীয়রা মঙ্গল গ্রহের লাল রঙ দেখে তার নাম দিয়েছিল 'হর দেখের' বা 'লাল রঙের'। ব্যাবিলনের মানুষের কাছে মঙ্গল গ্রহের নাম ছিল নের্গাল। নের্গাল ছিল তাদের যুদ্ধ ও ধ্বংসের দেবতা। যা কিছু ক্ষতিকর ও ধ্বংস ডেকে আনে - তার জন্য মঙ্গল গ্রহকে দায়ী করতো ব্যাবিলনের মানুষ। প্রাচীন গ্রিকদের যুদ্ধের দেবতার নাম ছিল অ্যারিস। তারা মঙ্গল গ্রহের নাম দিয়েছিল অ্যারিস। রোমানদের যুদ্ধের দেবতার নাম মার্স। রোমানরা মার্সকে খুবই ভয় ও মান্য করে। মঙ্গল গ্রহের নাম মার্স রেখেছে রোমানরা। পশুবলি দিয়ে পূজা করে তারা মার্স দেবতার। মার্স দেবতার এক হাতে বর্শা ও অন্য হাতে বর্ম। মঙ্গল গ্রহের প্রতীক নির্ধারণ করা হয়েছে মার্স দেবতার বর্শার ফলকের অনুকরণে।

 

চিত্র: মঙ্গল গ্রহের প্রতীক

 

হিন্দুদের যুদ্ধের দেবতা মঙ্গল, সংস্কৃত ভাষায় মঙ্গালা। আমাদের মঙ্গলবার এসেছে মঙ্গল গ্রহের নাম অনুসারে। ইংরেজি টুইস ডে শব্দটির উৎপত্তি টিউজ (Tiw's) থেকে। প্রোটো-ইন্দো-ইওরোপিয়ান ভাষায় দেবতা টিউজ হলো মঙ্গল গ্রহের দেবতা। গ্রহ-নক্ষত্রগুলোকে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে দেবতাজ্ঞানে ভক্তি করেই থেমে থাকলে কোন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারই হতো না। কিন্তু বিজ্ঞানে সবচেয়ে পুরনো শাখা হচ্ছে জ্যোতির্বিজ্ঞান। খালি চোখে শুধুমাত্র দেখে দেখেই জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা শুরু হয়েছিল। দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের পর জ্যোতির্বিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটে যায়।

          ১৬১০ সালে ইতালিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি তাঁর নিজের তৈরি টেলিস্কোপ তাক করলেন আকাশে। তিনি সূর্যের বুকের কালো কালো দাগ দেখলেন, চাঁদের পাহাড় দেখলেন, শুক্র গ্রহের বিভিন্ন দশা দেখলেন, বৃহস্পতির চাঁদ দেখলেন, আর দেখলেন মঙ্গল গ্রহ। কিন্তু গ্যালিলিওর দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি তেমন শক্তিশালী ছিল না বলে মঙ্গল গ্রহের কোন দশা তিনি দেখতে পাননি।

          সময়ের সাথে টেলিস্কোপ প্রযুক্তির উন্নতি হচ্ছিলো। যাদের সামর্থ্য আছে তাদের অনেকেই দূরবীণে চোখে রেখে আকাশের তারা দেখতে শুরু করলো। ইতালির আইনজীবী ফ্রান্সিসকো ফনটানা একটি দূরবীণ কিনে মঙ্গল গ্রহের দিকে তাক করলেন।  গ্যালিলিওর টেলিস্কোপের চেয়েও উন্নত ছিল তাঁর টেলিস্কোপ। নেপল্‌স শহর থেকে মঙ্গল গ্রহ পর্যবেক্ষণ করে ১৬৩৬ সালে মঙ্গল গ্রহের একটি চিত্র আঁকেন ফান্সিসকো ফনটানা। ওটাই ছিল মঙ্গল গ্রহের প্রথম স্কেচ। ফনটানা গোলাকার বৃত্তের মাঝখানে একটি গাঢ় কালো চাকতি এঁকেছিলেন। নেদারল্যান্ডের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্রিস্টিয়ান হাইগেনস ১৬৫৯ সালে তিনি মঙ্গল গ্রহের স্কেচ এঁকেছিলেন বৃত্তাকার গ্রহটির মাঝখানে ইংরেজি ভি অক্ষরের মত কালো কালো দাগ দিয়ে। মনে করা হয়েছিল সেগুলো মঙ্গলের সমুদ্র। ক্রিস্টিয়ান হাইগেন মঙ্গল গ্রহের নিজের অক্ষে ঘূর্ণনের সময়কাল হিসেব করেছিলেন। হাইগেনের হিসেবে নিজের অক্ষের উপর একবার ঘুরতে মঙ্গল গ্রহের সময় লাগে ২৪ ঘন্টা, যা পৃথিবীর ঘূর্ণন কালের সমান। পরে দেখা গেছে সেই সময়ে করা হাইগেনের হিসাব সঠিক হিসেবের খুব কাছাকাছি ছিল। মঙ্গল গ্রহ নিজের অক্ষে একবার ঘুরতে সময় নেয় ২৪ ঘন্টা ৩৭ মিনিট ২৩ সেকেন্ড। অর্থাৎ মঙ্গলের এক দিন পৃথিবীর এক দিনের চেয়ে ৩৭ মিনিট ২৩ সেকেন্ড লম্বা। হাইগেন মঙ্গল গ্রহের ব্যাসও নির্ণয় করেছিলেন যা ছিল পৃথিবীর ব্যাসের ৬০%।

          সেই সময় ফ্রান্সে মানমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অবজারভেটরি অব প্যারিসের প্রথম পরিচালক নিযুক্ত হয়েছিলেন ইতালিয়ান বংশোদ্ভূত জ্যোতির্বিদ জিওভান্নি দোমেনিকো ক্যাসিনি। ক্যাসিনি মঙ্গল গ্রহ পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেছিলেন ১৬৬০ সালে। ক্যাসিনি মঙ্গলের দিনের দৈর্ঘ্য হিসেব করে বের করেছিলেন - ২৪ ঘন্টা ৪০ মিনিট, যা সঠিক হিসেবের খুবই কাছাকাছি। ১৭৭৭ সালে ইংরেজ জ্যোতির্বিদ উইলিয়াম হার্সেল মঙ্গল গ্রহকে আরো সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি খুবই সঠিকভাবে মঙ্গল গ্রহের দিনের দৈর্ঘ্য হিসেব করেন ২৪ ঘন্টা ২৯ মিনিট ২১ সেকেন্ড।

          উনবিংশ শতাব্দীতে অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানীর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় মঙ্গল গ্রহের সঠিক ও বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।  মঙ্গল গ্রহের মানচিত্র তৈরির সময় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সবাই একমত হন যে মঙ্গলের কালো গাঢ় দাগগুলো হলো সমুদ্র, আর হালকা দাগগুলো হলো মহাদেশ। মঙ্গল গ্রহের বিভিন্ন জায়গার নাম দেয়া হয় প্রয়াত জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের নামে। যেমন, ক্যাসিনি ল্যান্ড, হারসেল স্ট্রেইট, মারাল্ডি সি, মাড়লার কন্টিনেন্ট ইত্যাদি। ১৮৬৯ সালে ইংল্যান্ডে জ্যোতির্বিজ্ঞানী রিচার্ড প্রক্টর একটি বিস্তারিত ম্যাপ প্রকাশ করেন যেখানে মঙ্গলে সমুদ্র ও নদীর অবস্থান দেখানো হয়েছে।

          ১৮৭৭ সালে ইউ এস নেভাল অবজারভেটরির টেলিস্কোপের সাহায্যে মঙ্গল গ্রহের দুইটি উপগ্রহের সন্ধান পেলেন আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী আসাফ হল। উপগ্রহ দুটোর নাম দেয়া হলো ফোবোস ও ডিমোস। ফোবোস শব্দের অর্থ ভয় ও ডিমোস শব্দের অর্থ আতঙ্ক। একই বছর ইতালিতে অবজারভেটরি অব ব্রেরার পরিচালক জিওভান্নি শিয়াপারেল্লি ২৫ সেন্টিমিটার ব্যাসের একটি শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে মঙ্গল পর্যবেক্ষণ করেন এবং আরো বিস্তারিত ম্যাপ তৈরি করেন। মঙ্গলের ভূমিতে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রতিবেশের বিভিন্ন জায়গার নাম দেয়ার সময় তিনি ল্যাটিন শব্দ এবং বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি ও বাইবেলের চরিত্রের নাম ব্যবহার করেন। যেমন, উত্তর গোলার্ধের সবচেয়ে উজ্জ্বল বিন্দুটির নাম দেন নিক্স অলিম্পিকা, অর্থাৎ অলিম্পিকের তুষার। পরে দেখা যায় এটা মঙ্গল গ্রহের সবচেয়ে বড় আগ্নেয়গিরি। এটার বর্তমান নাম অলিম্পাস মোন্‌স। অনুজ্জ্বল কালো দাগগুলোকে বিবেচনা করা হয় সমুদ্র, আর উজ্জ্বল অংশগুলোকে ধরা হয় কঠিন ভূমি। শিয়াপারেল্লি মঙ্গলে সাগর, উপসাগর, হ্রদ ইত্যাদির পাশাপাশি কালো কালো লম্বা সমান্তরাল অনেকগুলো রেখাকে মনে মনে করলেন চ্যানেল - ল্যাটিন ভাষায় যার নাম ক্যানালি। সেই ম্যাপ প্রকাশিত হবার পর ইংরেজি ভাষার সাংবাদিকরা ক্যানালি (cannale)-কে অনুবাদ করলেন ক্যানাল (canals) - যার অর্থ হলো খাল।

          মঙ্গল গ্রহের গবেষণায় বোস্টনের বিজ্ঞানী পারসিভ্যাল লাওয়েলের অবদান অনেক। খুবই ধনী পরিবারে জন্ম পারসিভ্যাল লাওয়েলের।  মঙ্গলের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নিজের ইচ্ছেমতো গ্রহ পর্যবেক্ষণ করার জন্য তিনি নিজস্ব একটি মানমন্দির তৈরি করলেন আরিজোনার ফ্ল্যাগস্টাফে। নিজের নামে নাম দিলেন মানমন্দিরের - লাওয়েল অবজারভেটরি। ১৮৯৪ সাল থেকে পরবর্তী অনেক বছর ধরে তিনি তাঁর মানমন্দিরে সেই সময়ের সবচেয়ে উন্নত টেলিস্কোপের সাহায্যে মহাকাশের গ্রহ পর্যবেক্ষণ করেছেন।      

          ১৯২৪ সালে আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী উইলিয়াম কোবলেন্টজ ও কার্ল ল্যামপ্ল্যান্ড মঙ্গল গ্রহের তাপমাত্রা মাপতে সক্ষম হন। তাঁরা হিসেব করে বের করেছেন- মঙ্গল গ্রহের দিনের তাপমাত্রা +১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর রাতের তাপমাত্রা -৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণ হিসেবে ধরে নেয়া হলো যে মঙ্গল গ্রহে পানি আছে বলেই বাতাসে প্রচুর জলীয় বাষ্প আছে। আর পানি আছে যেখানে প্রাণীও নিশ্চয় আছে। পরবর্তী চল্লিশ বছর পর্যন্ত মঙ্গল গ্রহে তরল পানি আছে কি নেই সে প্রশ্নের নিশ্চিত সমাধান পাওয়া যায়নি। ১৯৬০-এর দশকে শুরু হয়ে গেলো মহাকাশ জয়ের চেষ্টা। আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পাল্লা দিয়ে আকাশে স্যাটেলাইট পাঠানো শুরু করলো। ১৯৬২ সালে তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন মঙ্গলের উদ্দেশ্যে স্যাটেলাইট মার্স-১ পাঠালো শুরু হলো নতুন অধ্যায়।

Tuesday, 1 December 2020

এইসব দিনরাত্রি

 


“আশা ও আনন্দের যে অপরূপ দিন, তার উল্টো পিঠেই দুঃখ  ও বেদনার দীর্ঘ রজনী। আশা-আনন্দ, দুঃখ-বেদনা নিয়েই আমাদের এইসব দিনরাত্রি।“ - বিটিভিতে যখন এইসব দিনরাত্রি ধারাবাহিক শুরু হয়, তখন আমি চট্টগ্রাম কলেজে পড়ি। থাকি হোস্টেলে – শেরে বাংলা বি ব্লকে। এক পর্ব দেখার পর পরের পর্বের জন্য দুই সপ্তাহের অধীর অপেক্ষা। দর্শকদের মন জয় করতে একটুও সময় লাগেনি নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদের। কী চমৎকার সব সংলাপ, কী সূক্ষ্ম রুচিশীল হিউমার, আর ভালোবাসা-আনন্দ-বেদনার কী অপূর্ব সমন্বয়। বিটিভি আর্কাইভের কল্যাণে এই ধারাবাহিকের সবগুলি পর্ব আবার দেখার সুযোগ হলো। শুনেছি ইদানীং অনেকেই ভারতীয় সিরিয়ালে নিয়মিত বুঁদ হয়ে থাকেন। জানি না সেইসব মোটাদাগের অতিনাটকীয় উৎকট সংলাপ ও প্রসাধনসর্বস্ব সিরিয়ালের দর্শকদের  ক্ল্যাসিক শিল্পবোধের কিছুটাও অবশিষ্ট আছে কি না। যদি থাকে, তাহলে এইসব দিনরাত্রির সামান্য অংশও যদি দেখেন, বুঝতে পারবেন টিভি নাটকের গুণগত মান কী হতে পারে। সামান্য কিছু উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ছাড়া একথা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নাটকগুলির ক্ষেত্রেও খাটে। এমনকি স্বয়ং হুমায়ূন আহমেদও শেষের দিকে তাঁর নিজের কিছু নাটকের মান নিজেই নামিয়ে নিয়ে এসেছিলেন অনেকটা, কিন্তু সেটা অন্য প্রসঙ্গ।

লেখক হুমায়ূন আহমেদকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছিল বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত তাঁর নাটকগুলি। তাঁর রচিত উপন্যাসগুলির জনপ্রিয়তা অন্যসব লেখকের ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এইসব দিনরাত্রি উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯০ সালে, ধারাবাহিক নাটক প্রচারের বেশ কয়েক বছর পরে। নাটক ও উপন্যাসের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। এইসব দিনরাত্রি উপন্যাসের ঘটনাতেও কিছুটা পার্থক্য আছে। তবে নাটক দেখার পর উপন্যাসটি পড়লে পাঠকের কল্পনাশক্তি অনেকটাই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। কারণ গল্পের শফিক আর রফিকের কথা এলেই চোখে ভাসে বুলবুল আহমেদ ও আসাদুজ্জামান নূরের মুখ। এইসব দিনরাত্রি ধারাবাহিকের শেষের পর্বগুলিতে সারা দেশের দর্শক কেঁদেছে টুনীর জন্য। নাট্যকার চাইলেই টুনীকে বাঁচিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের যুক্তিবোধ প্রবল। তিনি বলেছেন, টুনীকে জার্মানিতে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসায় সুস্থ করে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হলে দর্শকদের অনেকের মনে একটা ধারণা তৈরি হতে পারতো যে – বিদেশে নিয়ে যেতে পারলেই ক্যান্সার রোগী সুস্থ হয়ে যায়। তাতে যাদের সামর্থ্য নেই – তারা ভাববেন, শুধুমাত্র দারিদ্র্যের কারণে তাদের প্রিয়জনকে বাঁচানো গেল না।

এইসব দিনরাত্রিতে হুমায়ূন আহমেদ কবীর মামার চরিত্রটি তৈরি করেছিলেন যুক্তিবাদী হিসেবে। নাটকের কোথায় উল্লেখ করেননি, কিন্তু উপন্যাসে সরাসরিই বলেছেন – কবীর মামা নাস্তিক। অথচ মানুষের জন্য কী নিঃস্বার্থ ভালোবাসা তাঁর। টুনীর অসুখের সময় কবীর মামার মুখে তিনি অত্যন্ত দরকারি একটি প্রশ্নের অবতারণা করেছিলেন – আমাদের দেশের ধনীরা সহজেই ভালো চিকিৎসার জন্য বিদেশের হাসপাতালে চলে যেতে পারেন। কিন্তু যাদের সামর্থ্য নেই – তাদের জন্য বিশ্বমানের কোন হাসপাতাল কি দেশে তৈরি করা সম্ভব নয়? আশির দশকের সেই প্রশ্ন – তিরিশ বছর পরেও আজো প্রশ্নই রয়ে গেছে।

হুমায়ূন আহমেদ খুব অল্প শব্দে এমন কিছু কথা বলেন – যা মানুষের মনের ভেতর ঢুকে বসে থাকে। যেমন - ভালোবাসার মানুষ পাশে থাকাটাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যাজিক। আমরা ভালোবাসাময় ম্যাজিকের জগতে বাস করতে পারছি আমাদের ভালোবাসার মানুষ আমাদের পাশে আছে বলেই।

“কিছু কিছু গল্প আছে যা কখনো শেষ হয় না। এইসব দিন-রাত্রির গল্প তেমনি এক শেষ না হওয়া গল্প। এই গল্প দিনের পর দিন বৎসরের পর বৎসর চলতেই থাকে। ঘরের চার দেয়ালে সুখ-দুঃখের কত কাব্যই না রচিত হয়। কত গোপন আনন্দ কত লুকানো অশ্রু। শিশুরা বড় হয়। বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা যাত্রা করে অনির্দিষ্টের পথে। আবার নতুন সব শিশুরা জন্মায়।“  নতুন প্রজন্মের দর্শকদের বলবো – যদি হাতে সময় থাকে, কোরিয়ান সিরিয়াল, জাপানী কার্টুন ইত্যাদি দেখার পরেও যদি কিছুটা সময় ম্যানেজ করা যায় – তাহলে ‘এইসব দিনরাত্রি’ দেখার জন্য। ধ্রুপদী শিল্প কখনো পুরনো হয় না।


Latest Post

Quantum Computers: Energy-Efficient or Power-Hungry?

  Only forty years ago, the number of mobile-phone users in the world was tiny. Consider the 1980s. Mobile phones were not yet part of peopl...

Popular Posts