Saturday, 25 April 2026

বাবা - ৮

 



অনেক বছর আগের কথা। তখন বাংলাদেশে শিক্ষাবোর্ড ছিল মাত্র চারটি। আর এসএসসি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা ছিল মাত্র ২১ শতাংশ। বিজ্ঞান বিভাগে মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ছয় শতাংশেরও কম ছিল মেয়েদের সংখ্যা। সেই সময় গ্রামের বেশিরভাগ মেয়েরই বিয়ে হয়ে যেতো ক্লাস সেভেন-এইটে বা তার চেয়েও নিচের ক্লাস থেকে। অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে যারা যত পিছিয়ে থাকতো – তাদের মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেতো তত আগে। বিয়ে না হলেও পড়াশোনা হতো না অনেক মেয়ের। সেই সময়ের ঘটনা।

প্রত্যন্ত এক গ্রামের স্কুল থেকে  নিম্ন-মধ্যবিত্ত এক বাবার মেয়ে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করে ফেললো। গ্রামের জন্যও বটে, সেই স্কুলের জন্যও বটে – এটি প্রথম ঘটলো যে একটি মেয়ে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করলো।

অন্যসব গ্রামের মতো সেই গ্রামেও মোড়ল ছিল, সমাজপতি ছিল – যারা বাড়ি এসে পরামর্শের মোড়কে আদেশ দিয়ে যেতো।

“তোমার মেয়ে তো গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করেছে। আমরা সবাই খুব খুশি হয়েছি। এবার একটি ভালো ছেলে দেখে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দাও।“

বাবা চুপ করে থাকে। পূর্ব-অভিজ্ঞতা থেকে বাবা শিখেছে – মোড়লের মুখের উপর না বলতে নেই, মনের কথা মুখে আনতে নেই।

“আমার হাতে একটি ভালো ছেলে আছে। তুমি রাজি থাকলে আমি কথা বলে দেখতে পারি। তোমার মেয়ে তো কালো। তবু বলে দেখতে পারি – মেট্টিক পাস মেয়ে কালো হলেও রাজি হয়ে যেতে পারে।“

রাগে গা জ্বলে গেলেও চুপ করে থাকার মতো বুদ্ধি বাবার আছে। মোড়ল তো আর জোর করে তার মেয়ের বিয়ে দিতে পারবে না।  

এর কিছুদিন পর মোড়ল আবার আসে। এবার বাবার কয়েকজন আত্মীয় মুরুব্বিকে সাথে নিয়ে।

“তুমি তো আমাদের কারো কথা শুনছ না। মেয়েকে শহরে নিয়ে গেছ কলেজে ভর্তি করানোর জন্য?”

“মেয়ে আবদার করেছে। সরকারি কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে। না টিকলে আর পড়াবো না।“ বাবা হাত কচলে উত্তর দেয়।

“যদি টিকে?

“সরকারি কলেজ। পড়ার কোনো খরচ লাগবে না। পড়তে চাইলে পড়বে।“ – অনেকটা ফিসফিস করে বলে বাবা। মনে জোর থাকলে গলায় জোর দেখানোর দরকার হয় না।

মুরুব্বিরা বেজার মুখে চলে যায় অসন্তুষ্ট মোড়লের সাথে।

ক্ষমতাহীন মানুষ দরকারি কোনকিছুই বিনামূল্যে পায় না। কিন্তু বিনামূল্যে প্রচুর উপদেশ ও পরামর্শ পায় – দরকার না থাকলেও। লোকে যেচে এসে উপদেশ দিয়ে যায়। তাই কিছুদিন পর উপদেশদাতারা আবার আসে। 

“মেয়েকে যে শহরের কলেজে ভর্তি করে দিয়েছো, থাকবে কোথায়? তোমার তো শহরে কোন আত্মীয়স্বজন নাই।“

“মেয়েদের কলেজ। হোস্টেল আছে।“ বিরক্তি চেপে রাখে বাবা।

“বিরাট ভুল করলে তুমি। আফসোস করবে। তখন কপাল চাপড়ালেও কোন কাজ হবে না, যখন মেয়ে কারো সাথে চলে যাবে।“ মোড়ল বলে।

যত ছোট মোড়লই হোক, কিছু না কিছু মোসাহেব থাকেই। তারা কোরাস ধরে, “তখন আমাদের কিছুই করার থাকবে না।“

তারপরও অসংখ্যবার কত ধরনের বিষয়ে কতজন এসে উপদেশ দিয়ে যায়। বাবা চুপ করেই থাকে।

দশ বছর কেটে যায়। মোড়লরা মোসাহেবরা আবার আসে। এবার তাদের অন্যসুর।

“বড্ড খুশি হয়েছি। আমরা সবাই জানতাম। তোমার মেয়ে যে আমাদের গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করবে, আমরা বলেছিলাম না সেদিন!“

“এবার কি মেয়ের বিয়ে দেবে? আমার হাতে একটি ভালো ছেলে আছে। কালো হলেও বিসিএস মেয়ে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যাবে।“

বাবা এবারও চুপ করে থাকে। বাবা জানে নিরবতা হিরন্ময়।


No comments:

Post a Comment

Latest Post

বাবা - ৮

  অনেক বছর আগের কথা। তখন বাংলাদেশে শিক্ষাবোর্ড ছিল মাত্র চারটি। আর এসএসসি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা ছিল মাত্র ২১ শতাংশ। বিজ্ঞান বি...

Popular Posts