Sunday, 26 April 2026

সন্দীপ রায়ের বাবা সত্যজিৎ রায়

 


সত্যজিৎ রায়ের জীবনদর্শনের নির্যাস সত্যজিৎ রায় নিজেই দিয়ে গেছেন তাঁর শেষ চলচ্চিত্র আগন্তুক-এ। ব্যক্তি মানুষের জীবদ্দশায় জীবনদর্শন বদলাতে পারে অনেকবার। আমরা অনেক বিখ্যাত মানুষের ভেতরই দেখেছি এরকম ঘটতে। যৌবনে নিখুঁত যুক্তিবাদী বার্ধ্যক্যে এসে অলৌকিক ধর্মের পায়ে আছড়ে পড়েছেন এরকম অহরহ দেখা যায়। মুক্তিযোদ্ধা রাজাকারে রূপান্তরিত হতেও দেখেছি অনেক। তাই একজন মানুষের সামগ্রিক জীবনদর্শন তাঁর জীবন শেষ হয়ে যাবার পরেই ঠিকমতো বিশ্লেষণ করা যায়। সত্যজিৎ রায়কে যতটুকু দূর থেকে দেখা যায় – দেখলে বোঝা যায় এই ঋজু মানুষটি যে মানবিক দর্শনের মানবিক বোধের প্রচার করেছেন তাঁর সিনেমায়, লেখায়, সুরে, রঙ-তুলিতে – নিজের ভেতর তা সত্যিই ধারণ করেছেন সারাজীবন।

আগন্তুক দেখেছিলাম ১৯৯২ সালে – তাঁর মৃত্যুর পরের বছর। সেইসময় খুব একটা খোঁজখবর রাখার সুযোগও ছিল না বাংলাদেশে বসে। ভিডিও ক্যাসেটের দোকান থেকে ভিএইচএস ক্যাসেট ভাড়া করে এনে – যাদের বাসায় ভিসিআর আছে তাদের বাসায় বসে সময়সুযোগ করে নিয়ে সিনেমা দেখতে হতো। আগন্তুক প্রথম বার দেখার পর থেকে এপর্যন্ত আরো অনেক বার দেখেছি। প্রতিবারই একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে মনে – সত্যজিৎ রায় কি আসলেই মনমোহন মিত্র হতে চেয়েছিলেন জীবনে? চেয়েছিলেন তেমনই বিশ্বভ্রমণ করতে? সংসারত্যাগী নির্মোহ দার্শনিক হতে? প্রচলিত ধর্ম যে তিনি মানেন না তা তিনি শুধু এই সিনেমাতেই নয়, গণশত্রু এবং অন্যান্য আরো সিনেমাতেও দেখিয়েছেন।

ব্যক্তি সত্যজিৎ রায় বাবা হিসেবে কেমন ছিলেন – এটি জানার মোক্ষম উপায় হলো সরাসরি তাঁর ছেলের কাছ থেকে জেনে নেয়া। তাই সন্দীপ রায়ের “আমার বাবা সত্যজিৎ রায়” বইটি যখন প্রকাশিত হলো – এটি আবশ্যিক পাঠের তালিকায় উঠে এলো।

বিখ্যাত মানুষদের প্রতিভার বেশিরভাগই তাঁদের জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়ে পড়ে। সত্যজিৎ রায় এমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তাঁর সম্পর্কে যেকোনো সংবাদের বিশেষ মূল্য ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর বিজয়া রায় লিখেছেন “আমাদের কথা” – যেখানে সত্যজিৎ রায়ের স্ত্রী হিসেবে তিনি স্বামীকে যেভাবে দেখেছেন – লিখেছেন। শুধুমাত্র স্ত্রী হিসেবে নয়, বিজয়া রায় ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের মামাতো বোন। বয়সে বড় হিসেবে – বলা যায় বিজয়া রায় সত্যজিৎ রায়কে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে দেখেছিলেন। “আমাদের কথা”-য় তিনি যতটুকু সম্ভব সম্পূর্ণ সত্যজিৎ রায়কে তুলে ধরেছেন। তাই সন্দীপ রায়ের বই থেকে এটুকু জানার প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই থাকে – যে বাবা হিসেবে কেমন ছিলেন তিনি।

‘আমার বাবা সত্যজিৎ রায়’ পড়তে পড়তে সন্দীপ রায়ের প্রতি এক ধরনের ঈর্ষা লাগে। ইস্‌ সত্যজিৎ রায়ের ছেলে, সুকুমার রায়ের নাতি হওয়া কী যে সুখের। শৈশব থেকেই শিল্প-সাহিত্যের জগতে বেড়ে ওঠার সুযোগ কি সবার হয়?

আবার একটু কষ্টও লাগে সন্দীপ রায়ের জন্য। নিজে যা কিছুই সৃষ্টি করুন তিনি, সবাই তাঁর সৃষ্টিকে তুলনা করবেন তাঁর বাবার সৃষ্টির সাথে। বিখ্যাত ব্যক্তির সন্তানদের ওপর কেন যেন একটা অলিখিত দাবি থাকে সমাজের – তাদেরকে ছাপিয়ে যেতে হবে, ছাড়িয়ে যেতে হবে তাদের পিতাকে, মাতাকে। যেন সন্তানকে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই প্রতিযোগিতায় নামতে হবে তাদের পিতামাতার সাথে। সন্দীপ রায় তাঁর পিতার ছায়া থেকে সরে দাঁড়ানোর যতই চেষ্টা করুন, সমালোচকরা তা কিছুতেই হতে দেবেন না।

এই বইতে সন্দীপ রায় কীভাবে ধাপে ধাপে তাঁর বাবার কাজের সাথে পরিচিত হয়েছেন, মিশেছেন, কাজের দলের একজন হয়ে ওঠেছেন তার সচিত্র বর্ণনা আছে। কীভাবে বাবার সাথে আউটডোর শুটিং-এ গিয়ে ক্যামেরার কাজ দেখেছেন – সেই ‘অপুর সংসার’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র সময় থেকেই।

সত্যজিৎ রায় পরিবারকেন্দ্রিক মানুষ ছিলেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে আউটডোর শুটিং-এ যেতেন। দূরের শুটিং সম্ভব হলে এমনভাবে রাখতেন যেন সেই সময় স্কুলের ছুটি থাকে – যেন সন্দীপ সাথে যেতে পারে। দেশের বাইরে যাবার সময়ও পরিবারকে সাথে নিয়েই যেতেন। ইওরোপের বেশ কিছু শহরের

ঝকঝকে সব ছবি (বেশ কিছু পূর্বে অপ্রকাশিত) এই বইয়ের মান সমৃদ্ধ করেছে। সন্দীপ রায়ের বর্ণনা ঝরঝরে, নির্মেদ। কোথাও একটিও বাড়তি শব্দ নেই। আনন্দমেলায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল বলে মাঝে মাঝে মনে হয় কিশোর পাঠকদের জন্যই বিশেষভাবে লেখা। তবে তাতে তথ্য সন্নিবেশের কোন ঘাটতি হয়নি কোথাও।

বাঙালীর প্রিয় গোয়েন্দা ফেলুদার শ্রষ্টা সত্যজিৎ রায় গোয়েন্দা গল্প তেমন একটা পড়েননি, আর শুরুতে তাঁর কোনো পরিকল্পনাও ছিল না সিরিজ গোয়েন্দাগল্প লেখার! জেনে অবাকই হতে হয়।

খুব ভালো লাগলো বইটি পড়ে। তবে যে জিনিসটির অভাব বোধ করেছি সেটা হলো – বিখ্যাত মানুষটির একেবারে ভেতরের ছেলেমানুষ একজন ‘বাবা’র। সত্যজিৎ রায় সম্ভবত কোনোদিনই সেই অর্থে ‘ছেলেমানুষ’ ছিলেন না।

 

আমার বাবা সত্যজিৎ রায়

সন্দীপ রায়

সাক্ষাৎকার অনুলিখন ও সম্পাদনা: সিজার বাগচী

প্রথম সংস্করণ: মে ২০২৫

প্রকাশক: আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড

মূল্য: ১২০০ রুপি


No comments:

Post a Comment

Latest Post

সন্দীপ রায়ের বাবা সত্যজিৎ রায়

  সত্যজিৎ রায়ের জীবনদর্শনের নির্যাস সত্যজিৎ রায় নিজেই দিয়ে গেছেন তাঁর শেষ চলচ্চিত্র আগন্তুক-এ। ব্যক্তি মানুষের জীবদ্দশায় জীবনদর্শন বদলাতে পা...

Popular Posts