Thursday, 23 April 2026

বিশ্ব গ্রন্থ এবং মেধাসত্ত্ব দিবস

 


২৩ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী বেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয় গ্রন্থ এবং মেধাসত্ত্ব দিবস। বইপড়ায় উদ্বুদ্ধ করা, প্রকাশনা শিল্পের উন্নয়ন, এবং লেখকদের মেধাসত্ত্ব সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালে ইউনেসকো প্রতিবছর ২৩ এপ্রিল সারাবিশ্বে বই এবং মেধাসত্ত্ব দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

২৩ এপ্রিলকে বই দিবস হিসেবে বেছে নেয়ার পেছনে স্পেনের অনেক দিনের পুরনো একটি ঐতিহ্য কাজ করেছে। সেখানে ২৩ এপ্রিল সেইন্ট জর্জ দিবস পালিত হয়ে আসছে অনেক অনেক বছর থেকে –

যেদিন প্রেমিক গোলাপ তুলে দেয় প্রেমিকার হাতে। স্প্যানিশ প্রকাশকরা মিলে সেই দিনের তাৎপর্য আরেকটু বাড়িয়ে দিলেন – গোলাপের সাথে বই দেয়ার প্রথা চালু করে। বিখ্যাত স্প্যানিস লেখক মিগুয়েল দ্য কারভান্তেস-এর মৃত্যুদিবস যদিও ২২ এপ্রিল, প্রকাশকরা সেইন্ট জর্জ দিবসের সাথে মিলিয়ে তাঁর সম্মানে বইদিবস পালন করতে শুরু করলেন ২৩ এপ্রিল। প্রকাশকরা চালু করলেন, ২৩শে এপ্রিল প্রেমিক যখন প্রেমিকাকে গোলাপ দেবে, প্রেমিকা প্রেমিককে দেবে বই। কারভান্তেসের লেখা ‘ডন কিয়োতে’ উপন্যাসের কিছু অংশ আমরা ক্লাস নাইন-টেনের ইংরেজিতে পড়েছিলাম। ২৩ এপ্রিল উইলিয়াম শেকসপিয়ারেরও মৃত্যুদিবস। ১৯৯৫ সালে ইউনেসকো ২৩ এপ্রিলকে বিশ্বব্যাপী বই ও মেধাসত্ত্ব দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলো। ২৩ এপ্রিল সত্যজিৎ রায়েরও মৃত্যুদিবস। সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় ইউনেসকোর কর্মকর্তারা সত্যজিৎ রায়ের কথা বিবেচনা করেছিলেন কি না জানি না। তবে আমরা বাঙালী পাঠকরা তো জানি সত্যজিৎ রায় বিশ্বজয়ী চলচ্চিত্র পরিচালকের পাশাপাশি কী অসাধারণ লেখক ছিলেন।

বই পড়ার সূচক মাপার কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নেই। তবে কোন্‌ দেশে বছরে কয়টি বই প্রকাশিত হয় – তার হিসেব থেকে এটুকু বোঝা যায় কোন্‌ দেশে বইয়ের কদর কেমন। সাম্প্রতিক হিসেব থেকে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকাতে বছরে আড়াই লক্ষেরও বেশি নতুন বই প্রকাশিত হয়। চীনে দুই লক্ষের বেশি, ইংল্যান্ডে এক লক্ষ আশি হাজার, জাপানে এক লক্ষ চল্লিশ হাজার, ইন্দোনেশিয়াতে এক লক্ষ পয়ত্রিশ হাজার, রাশিয়াতে এক লক্ষ পনের হাজার, ফ্রান্সে এক লক্ষ, ভারতে নব্বই হাজার, স্পেনে নব্বই হাজার, জার্মানিতে সত্তর হাজার, অস্ট্রেলিয়ায় ত্রিশ হাজার নতুন বই প্রকাশিত হয় প্রতি বছর। বাংলাদেশে বছরে বড় জোর পাঁচ হাজার বই প্রকাশিত হয়।

মোট সংখ্যার হিসেব করলে পাঠকের সাথে বইয়ের যোগাযোগের ব্যাপারটি ঠিক বোঝা যায় না। চীন ও ভারত প্রত্যেকেই একশ কোটির বেশি জনসংখ্যার দেশ। সেখানে যথাক্রমে দুই লক্ষ ও নব্বই হাজার বই প্রতিবছর প্রকাশিত হওয়াটা এমন বিরাট কিছু নয়। জনসংখ্যার অনুপাতে কোন্‌ দেশ থেকে কী পরিমাণ নতুন বই প্রকাশিত হয় – সেই হিসেব থেকে বই পড়ার জাতিগত একটি পরোক্ষ পরিসংখ্যান পাওয়া গেলেও যেতে পারে।

জনসংখ্যার অনুপাতে সবচেয়ে বেশি বই প্রকাশিত হয় যুক্তরাজ্য থেকে। প্রতি দশ লক্ষ মানুষের বিপরীতে সেখানে বছরে তিন হাজার বই প্রকাশিত হয়। আইসল্যান্ডে ২৮০০, নরওয়েতে ২৪০০, ফিনল্যান্ডে ২৩০০, ডেনমার্কে ২২০০, স্পেনে ২০০০, সুইডেনে ১৮০০, ফ্রান্সে ১৭০০, কানাডায় ১৫০০, অস্ট্রেলিয়ায় ১৪০০, দক্ষিণ কোরিয়াতে ১৪০০, জাপানে ১২০০, জার্মানিতে ৯০০, আমেরিকায় ৮০০, রাশিয়ায় ৭০০, ইন্দোনেশিয়ায় ৫০০, ব্রাজিলে ৪০০, চীনে ১৫০, ভারতে ৮০টি নতুন বই প্রকাশিত হয় প্রতি বছর প্রতি দশ লক্ষ নাগরিকের বিপরীতে।

বাংলাদেশে বাৎসরিক বই প্রকাশের হার প্রতি দশ লক্ষ মানুষের বিপরীতে মাত্র ত্রিশটি। এই সংখ্যা মোটেও আশাপ্রদ নয়। কিন্তু যদি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের (এবং অবশ্যই বিসিএস ও এফসিপিএস/এমডি পরীক্ষার্থীদের) মোট পড়াশোনার সময় হিসেব করি – তাহলে তা নিঃসন্দেহে আকাশছোঁয়া। শিক্ষার্থীদের মাথার ওপর শত শত পরীক্ষার ভার না থাকলে আমার মনে হয় – মনের আনন্দে পড়াশোনা করতো অনেকেই।

আনন্দময় পাঠক এবং পাঠের আনন্দ দুটোরই প্রত্যাশায় বই দিবসের শুভেচ্ছা সবাইকে।


No comments:

Post a Comment

Latest Post

বিশ্ব গ্রন্থ এবং মেধাসত্ত্ব দিবস

  ২৩ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী বেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয় গ্রন্থ এবং মেধাসত্ত্ব দিবস। বইপড়ায় উদ্বুদ্ধ করা, প্রকাশনা শিল্পের উন্নয়ন, এবং লেখকদের মে...

Popular Posts