বাসের সিঁড়িতে লাফ দিয়ে উঠতেই তৃতীয় সারির সিটে বসা মানুষটার সাথে চোখাচোখি হল সুজনের। দুজনেই দুজনার দিকে তাকিয়ে রইল এক মুহূর্ত। মানুষটা চোখ ফিরিয়ে নিলেন। কিন্তু সুজনের মনে হলো ক্ষণকাল নয় অনন্তকাল তিনি এভাবে তাকয়ে আছেন তার দিকে। মাথা নিচু করে সিঁড়িতে স্থবির হয়ে রইল, তারপর পেছনের যাত্রীর ‘পথ ছাড়েন’ শুনে কোনমতে পা দুটোকে টেনে ওপরে তুলল। একটু আগে পা দুটোতে যে তুরঙ্গম গতি ছিল এখন মনে হচ্ছে সেগুলো অসাড় অবশ। ব্যাকপ্যাকটা মাথার ওপরের রাখার জায়গায় রেখে সিটে বসল। কাঁধটা এত সোজা হয়ে আছে। মনে হচ্ছে এ জীবনে আর ঘাড় বাঁকাতে পারবে না সে। সামনের দিকে চোখ রেখেই বসে থাকতে হবে। তার একসিট পিছনে বসা মানুষটির চোখ তীরের ফলার মত তার শরীরে বিঁধছে। জানালার পাশের সিট হলে তবু বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকা যেত, কিন্তু সাইড রো-তে সিট হওয়ার কারণে পাশে তাকাতেও সমস্যা। উফ্! জীবনে এমন পরিস্থিতিতে পড়বে সুজন কি কখনও ভেবেছিল! একদা তার সবচেয়ে প্রিয় (সবচেয়ে আদর্শ) মানুষটিকে এত কাছে পেয়েও সে তাঁর কাছে ছুটে যাওয়া দূরে থাক, তার দিকে তাকাতেই পারছে না। এভাবে পাঁচ-ছ’ঘন্টার জার্নি কীভাবে করবে – ভাবতেই শরীরটা অসাড় হয়ে আসে তার। গেটম্যান গাড়ির গেট বন্ধ করে মানুষ গুণে টিকেট চেক করা শেষ করলে গাড়ি চলতে শুরু করল।
সুজনের মাথার ভিতর সিনেমার রিলের মত একের পর এক ছবি ভেসে উঠতে থাকে। শৈশব-কৈশোর স্কুল-কলেজ তারপর বিশ্ববিদ্যালয়। কানে গমগম করে বাজছে একটি কথা – তোমাদের বলি, কলেজে অনার্স পড়া আর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়ার মাঝে অনেক পার্থক্য। বিশ্ববিদ্যালয় – ইউনিভার্সিটি অর্থাৎ ইউনিভার্স-এর সাথে যার সম্পর্ক। যেখানে গেলে তোমার মনটাও বিশ্বের সাথে সংযুক্ত হবে, বিশালতা অর্জন করবে। আরো একটা সুবিধা আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাৎ সরকার যেগুলো আমাদের দেশের ছাত্রদের জন্য তৈরি করেছে সেগুলোতে পড়ার খরচও অনেক কম। তাই তোমরা এখন থেকে টারগেট নিয়ে লেখাপড়া কর যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পার। হ্যাঁ, সেই কথাগুলো এমনকি তার প্রতিটি শব্দ সুজনের মাথায় গেঁথে আছে। অথচ যে কথাগুলো একসময় সে জীবনের মূলমন্ত্র বলে সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করে লক্ষে এগিয়ে গেছে এখন তার প্রতিটি শব্দ মাথায় পেরেকের মত ঠুকছে। দুহাতে মাথাটা চেপে ধরলে হয়তো একটু শান্তি হত। নাকি চুলগুলো টেনে ছিঁড়ে ফেললে। কিন্তু হাত দুটো যে অবশ হয়ে আছে। একটু আগের তীব্র সচল হাত দুটো মুহূর্তে পাথরের মত ভারী আর নিশ্চল হয়ে আছে।
চতুর্থ শ্রেণির সরকারী কর্মচারী বাবার ঘরে সুজনরা আটটি ভাইবোন ছিল। সরকারের দেয়া ছোট্ট একটা দুই রুমের পাকা ঘরে কোন রকমে থাকত। এরই মাঝে এক রুমে রান্না, খাওয়া। একপাশে মা-বাবার চৌকি। মিটসেফ, মায়ের বাবার বাড়ি থেকে দেয়া মিটসেফ সাইজের একটা স্টিল আলমারি, আরো যে কত হাবিজাবি। ছোটবেলায় আলো-আঁধারির ওই ঘরটাকে সুজনের কাছে গুহার মত মনে হত। সুজনের জন্মও এ গুহাঘরেই। পাশের রুমটাতে একটা চৌকিতে বড় দুই বোন আর তারা ক্রমান্বয়ে অন্যান্য ভাইবোন একটা বড় চৌকিতে পাশাপাশি থাকত। সবসময় সবচেয়ে ছোটজন অর্থাৎ কোলের ভাইবোনটা মা-বাবার সাথে থাকত। ঘরের সামনে লম্বা টানা বারান্দা চলে গেছে সবার ঘরের সামনে দিয়ে। যার যার ঘরের সীমানা অনুযায়ী তার তার বারান্দার অধিকার। এর বাইরে খেলার মাঠ, একপাশে পুকুর। তারও পরে বেশ খানিকটা তফাতে একপাশে কর্মচারী আর অন্যপাশে অফিসারদের কোয়ার্টার। সবকিছু ভাগ করা ছিল। এ টাইপ, বি টাইপ, ডি টাইপ এভাবে। সুজনদের ডি টাইপ কোয়ার্টারেই আবার কেউ কেউ সাবলেট দিত। স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে গ্রামের বাড়িতে রেখে এক রুম নিজে রেখে আরেক রুমে কয়েকজনকে মেসের মত ভাড়া দিত। এসব ঘরে নতুন চাকরি নেয়া চ্যাংড়া ছেলেরা থাকত। তারা অবসর সময়ে মাঠে বসে কোয়ার্টারের উঠতি বয়সী মেয়েদের সাথে টাংকি মারত। এসব নিয়ে কোয়ার্টারের মায়েরা নিজেদের মেয়ে নিয়ে উৎকন্ঠায় থাকত। যদিও প্রতিবাদের ক্ষমতা তাদের ছিল না। তাদের কাজ ছিল সংসারের ভার বহন করা আর ইচ্ছা অনিচ্ছায় স্বামীর দেহ-ক্ষুধা মিটিয়ে সাময়িক মেয়াদান্তে একটি করে সন্তানের জন্ম দেয়া।
সুজনের মনে
পড়ে প্রায় প্রত্যেক ঘরেই এন্ডি-গেন্ডি অনেকগুলো করে বাচ্চা থাকত। কোন না কোন ঘরে বছরের
সবসময়ে প্রসূতি মা আর সদ্যোজাত শিশু থাকত। প্রতিবেশিরাই তাদের দেখাশোনা করত। গ্রাম
থেকে আত্মীয়-স্বজন এনে রাখার সংগতিও কারো ছিল না। তাই একটু সুস্থ হলেই সন্তান কোলে
নিয়ে মায়েরা আবার সংসারের কাজে নেমে পড়তেন। তার মাকে অবশ্য বড় দুবোন রান্না-বান্না
সবকাজে সাহায্য করত, ছোট ভাইবোনদের দেখাশুনা করত। তারপর আবার স্কুলে যেত। লেখাপড়ায়
তাদের মন ছিল না। থাকবে কী করে, বাসায় পড়া বুঝিয়ে দেবার মত কেউ ছিল না। চতুর্থ শ্রেনীর
কর্মচারী বাবারও সামর্থ ছিল না প্রাইভেট পড়ায় বা কোচিং-এ দেয়। মেজবোন যাও একটু লেখাপড়া
করত, বড়বোনের একদম মন ছিল না। ঘুপচি ঘরটার জানালায় পুরনো আয়না রেখে সে ফেয়ার এন্ড লাভলী
মাখত। ফেরিওয়ালা থেকে কেনা লিপস্টিক আর কাজলে সাজত আর ঘুরেফিরে নিজেকে দেখার ইচ্ছায়
বারবার বলত – আহা! ঘরে যদি একটা বড় আয়না থাকত, আরো একটু আলো আসত! শুনে মেজবোন খিলখিলিয়ে
হেসে বলত – তুইতো এমনিতেই সুন্দরী, আর কত সাজবি।
- হু সুন্দর। দেখিস না অফিসারদের মেয়েগুলো কী সুন্দর। আর বিকেলে যখন সেজেগুকে মাঠে ঘুরে বেড়ায় তখন একেকটাকে পরীর মত লাগে। আর আমরা। এমন বাপ-মার ঘরে জন্মেছি গরীব তো গরীব তার মধ্যে বছর বছর খালি বিড়াল-কুকুরের মত বাচ্চা দেয়।
- ছি আপা, কী বলছিস। বাপ-মাকে কেউ এমন কথা বলে!
- বলব না তো কী করব। দেখিস না বড়লোকদের ঘরে ঘরে মাত্র দুটো করে বাচ্চা। আর সরকারও বলেছে, ‘ছেলে-হোক, মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ট’। আর ওনারা বছর না ঘুরতেই বাচ্চা। তুইই বল মায়ের এসব সামলাতে গিয়ে আমাদের কি কম কষ্ট হয়। স্কুলে যেতে পারি না, পড়তে বসতে পারি না। শুধু এটা করো, ওটা করো। তুই দেখিস এই বাসা ছেড়ে আমি ঠিক একদিন পালিয়ে যাব।
- কী বলছ আপা! – মেজবোন আর্তচিৎকার করে উঠত। আব্বা শুনলে তোমাকে মেরে ফেলবে।
- হুঁ! মেরে ফেলবে – মুখ ভেঙচিয়ে বড়বোন বলত। আসুকতো আমার গায়ে হাত তুলতে – হাত ভেঙে দেব। ভাত-কাপড় দিতে পারে না, খালি বাবাগিরি ফলায়। এমন বাপের ভিটায় লাত্থি দিয়ে আমি একদিন ঠিকই পালামু দেখিস।
- আহা্ আপা, তোমরা কী শুরু করেছ। আমার পড়ার ডিসটার্ব হচ্ছে।
- চুপ। একদম চুপ। ডিসটার্ব হলে মাঠে গিয়ে পড়। আমাদেরতো বাইরে যেতে দেয় না। তাহলে কোথায় বসে কথা বলব রে – বলতে বলতে এসে সুজনের কান ধরে টান দেয়। এত জোরে টান দেয় যে সে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে। মেজবোন মনি তাড়াতাড়ি এসে ওকে আড়াল করে। তারপর ওড়নায় মুখ মুছে দিয়ে বলে যা বাইরে আলো আছে, ঘাসের ওপর বসে পড়।
ওদিকে ছেলের
কান্না শুনে মা ফিরোজা জানতে চান – সুজন কান্দে ক্যানরে।
- সুজন কান্দে না, হাসে। তুমি চুপ করে থাক। তোমার কোলের বাচ্চারে দুধ দাও। তারপর বিড়বিড় করে বলে – আজকে রাতে আরেকটা পেটে ঢুকাও।
- আপা, তুই একটা বেয়াদব। মায়েরে মানুষ এসব কথা বলে!
- বলব না তো কী করব বল। বছর বছর এই বাচ্চার জ্বালায় না শরীরে শান্তি পাই, না পেট ভরে খাইতে পাই – বলতে বলতে হু হু করে কেঁদে ফেলে বড়বোন আমিনা। সুজন অপ্রস্তুত হয়ে বইখাতা নিয়ে মাঠের দিকে চলে যায়।
মা একসময় মনে হয় সুন্দরী ছিলেন। ভাঙা স্বাস্থ্য দেখে বোঝা যেত না। বড় আপা ছিল অনেকটা মায়ের মত। পিঠ ঝাপানো চুল, ফর্সা গায়ের রঙ, ত্যানা ত্যানা কাপড়েও তাকে অনেক সুন্দর লাগত। আর মেজ আপা তার উলটো। আব্বার মত। বেঁটে খাট, গায়ের রঙ কালো। চ্যাপ্টা-চুপ্টো চেহারা – যেন আব্বার মুখটাই বসানো। স্বভাবে শান্ত। সংসারের বেশিরভাগ কাজ সে-ই করত। তবু বড় আপার ক্ষোভের কমতি ছিল না। মাকে গরম পানি করে দিত, ছোট ভাই-বোনকে নাইয়ে খাইয়ে দিত। এভাবেই তো দিনগুলি কাটছিল তাদের। কিন্তু ক্লাস ফাইভে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়ায় আব্বা সুজনকে জেলাস্কুলে ভর্তি করে দিলেন। শহরের সবচেয়ে ভাল স্কুল। সুজন জীবনে এই প্রথম কলোনির ঘুপচি ঘরে বাসার সামনের মাঠ ছাড়িয়ে রাজপথে পা দিল। বাবা-ছেলে দুজনের চোখেই স্বপ্ন।
জেলাস্কুলটি
ঐতিহ্যবাহী হলেও বেশিরভাগ শিক্ষকই প্রাইভেট কোচিং করাতেন। সুজনের পক্ষে সম্ভব ছিল না
কোচিং করার। তারপরও যখন প্রথম মেয়াদী পরীক্ষায় প্রায় সব বিষয়ে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েও
ইংরেজিতে খারাপ করল, তখন হেডস্যার বাবাকে ডাকলেন। ক্লাসে পিয়ন মোমিনভাই যখন এসে বলল,
সুজন রহমান কে? হেডস্যার তারে ডাকতেছেন, সুজনের বুকটা ধক্ করে উঠলো। ইংরেজি পরীক্ষায়
খারাপ করার কারণে তাকে কি টি-সি দেবে! পা দুটো অসম্ভব ভারী মনে হচ্ছিল। সিট থেকে উঠতে
পারছিল না। হঠাৎ পাশের জন ধাক্কা দিল, অ্যাই সুজন, যাস না ক্যান। মোমিন ভাই না বলল,
হেডস্যার তোকে ডেকেছে।
ক্লাসের ম্যাডামও
খেঁকিয়ে উঠলেন, ‘যাচ্ছ না কেন, কানে শুনতে পাও না নাকি। যা-ও।“
সুজনের পা দুটো
চলছে না। তবু পায়ে পায়ে স্যারের রুমের বাইরে গিয়ে দাঁড়াল।
-
স্যার,
সুজন আসছে। ডিতরে আনমু?
-
তোমাকে
আনতে হবে না। ও নিজেই আসবে। এসো সুজন।
পর্দা ফাঁক
করতেই দেখল আব্বা বসে আছেন স্যারের সামনের চেয়ারে। আব্বাকে এরকম চেয়ারে বসতে সুজন এর
আগে কখনো দেখেনি। কেমন অবাক লাগল। আকৃতিতে খাটো আব্বার পা দুটো মাটি থেকে বেশ উপরে
ঝুলছে আর তিনি জড়োসড়ো হয়ে বসে আছেন। আব্বার পরনের পুরনো মলিন পোশাকটা সেই মুহূর্তে তাকে আরো অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিল। রুমে
ঢুকে ছাদ পর্যন্ত উঁচু বইয়ের তাকের পাশে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াল – আসসালামুয়ালাইকুম স্যার।
-
ওয়ালাইকুম
সালাম।
সুজন দেখল তার
পরীক্ষার ইংরেজি প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রের খাতা দুটো স্যারের সামনে খোলা। হায় আল্লাহ।
আমাকে টি সি দিয়ে দেবে। আব্বাকে কেন ডেকেছেন স্যার। তার ক্লাসে যেখানে সবাই ইংরেজিতে
আশির উপরে নম্বর পেয়েছে সেখানে সে পেয়েছে ৩৫ আর ৩৭। স্কুলের পাস নম্বর ৪০। কী হবে তাহলে?
ছোটবেলায় একবার দাদার কাছে হাশরের ময়দানের গল্প শুনেছিল। হঠাৎ তার মনে হল আজকেই তার
শেষ বিচার।
-
সুজন,
আমি তোমার বাবার সাথে তোমার বিষয়ে কথা বলেছি। গাইড মুখস্থ করে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি
পেলেও তুমি ইংরেজিতে ভীষণ কাঁচা। আমি তোমার উত্তরপত্র দেখলাম। এখন কী করবে বল। তোমার
কী করা উচিত বলে তুমি মনে কর?
আব্বা
স্থির হয়ে বসে আছেন। কিন্তু চেয়ারের হাতলে রাখা তার হাতদুটো তিরতির করে কাঁপছে। একটা
ভীষণ ভয় বুকের মাঝে বোমা ফাটালো যেন। ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠল বারো বছরের সুজন।
হেডস্যার
ডাকলেন – এদিকে এসো।
শব্দ
করে কাঁদতে কাঁদতেই জামার হাতায় মুখ মুছতে মুছতে স্যারের টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
স্যার আমাকে টিসি দেবেন না। আমি ভাল করব স্যার। ভাল করব।
-
আরে,
বোকা ছেলে। টিসি দেব কেন? আমি তোমাকে পড়াব।
-
স্যার,
- কিশোর সুজনের মুখে সেদিন আর কোন কথা ফোটেনি।
আব্বা
এক লাফে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হু হু করে কেঁদে উঠেছিলেন। হেডস্যার আব্বাকে হাত ধরে
বসতে বললেন।
-
ও
না হয় বাচ্চা মানুষ। আপনি এত ইমোশনাল হয়ে পড়লে কেমন করে হবে।
আচমকা সুজনের মনে হল আব্বা কি সেদিন স্যারের বলা ইমোশনাল শব্দটার অর্থ বুঝতে পেরেছিলেন? আর সেদিন কে বেশি ইমোশনাল ছিলেন – আব্বা না হেডস্যার সেটা আজো পরিষ্কার হয়নি সুজনের কাছে।
স্কুলের অঙ্ক, ইংরেজি, বিজ্ঞান এমনকি বাংলার স্যার ম্যাডামরা পড়াতেন। কিন্তু তাদের কাছে পড়তে গেলে মাসে মাসে যে টাকা গুণতে হবে আব্বার তো সে সামর্থ নেই। আর হেডস্যার যদি পড়ান তাহলে তো অনেক টাকা।
আব্বা
হাত দুটো কচলাতে কচলাতে কাঁচুমাচু করে বলেছিলেন, স্যার, আমি কি পারবো?
-
কী
পারবেন? ভারী চশমার আড়াল থেকে প্রশ্ন করেছিলেন হেডস্যার।
-
জ্বী,
মানে আপনারে সম্মান করতে।
-
কী
সম্মান করবেন। ও আপনার সন্তান হলেও আমারও দায়িত্ব আছে।
তারপর সুজনের
দিকে তাকিয়ে বললেন, আগামী পরশু থেকে ভোর ছটায় তুমি আমার বাসায় আসবে। একেবারে স্কুলের
জন্য তৈরি হয়ে। এক দেড়-ঘন্টা পড়বে। তারপর স্কুলে আসবে। এখনতো গ্রীষ্মকাল। ছ’টা বাজার
আগেই সূর্য ওঠে। কি পারবে না?
- পারব স্যার।
এতদিন
পরেও মনে পড়ে নিজের সেই উচ্ছ্বসিত কন্ঠস্বর।
তারপর থেকে শুরু হল ভোরবেলা বাবার মরচেপড়া সাইকেলে চড়ে নতুন পথে তার যাত্রা। না, শুধু সুজন নয়, তারমত আরো কিছু দুর্বল ছাত্র আসত। কোনদিন স্যার পড়াতেন, কোনদিন স্যারের কলেজে পড়ুয়া মেয়ে মৌটুসী আপু পড়াতেন। শেষ হলে আসত রুটি-আলুভাজি। কী যে স্বাদ ছিল সেই রুটি ভাজির। আজও রুটি-ভাজি খেতে গেলে সুজন নাকে সে গন্ধটা পায়।
দ্বিতীয় মেয়াদীতে ইংরেজির ফলাফল একদম বদলে গেল। ৩৫ থেকে ৭০ আর ৩৭ থেকে ৬৮। পড়াতে পড়াতে স্যার এই কথাটা বার বার বলতেন, লেখাপড়ায় জীবনে সবসময় ওপরের দিকে দৃষ্টি দেবে। ভাল করতে হবে, জীবনকে বদলাতে হবে। শিক্ষা ছাড়া জীবন কখনো বদলায় না।
স্কুলের সমাবেশেও বলতেন, এই যে শপথ করছ, এ শপথ যেন শুধু মুখের কথা হয়েই থেকে না যায়। এই প্রতিজ্ঞাকে বাস্তবে রূপ দিতে মনুষ্যত্বের চর্চা করতে হবে। দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। তোমরা শুধু মা-বাবার সন্তান নও। তোমরা আমার সন্তান, আমার দেশের সন্তান। দেশমাতৃকার সুসন্তান হয়ে তার গৌরব বাড়াতে হবে – এরকম আরো কত কথা। সেই জলদ গম্ভীর কন্ঠনিসৃত কথাগুলো সুজনকে তখন এক অনাস্বাদিত সুখের আকাঙ্খায় উদ্বেলিত করে তুলত।
উচ্চমাধ্যমিকে শহরের সেরা কলেজে চান্স পেয়েছিল সুজন। তার সহপাঠীদের অনেকেও পেয়েছিল। সবাই মিলে দুরন্ত এক জীবন। সেরা কলেজের ছাত্র হওয়ায় অহংকারী সে জীবন। এরই মাঝে আশেপাশে বেশ কিছু টিউশনি করতে শুরু করেছিল। তার ভালো রেজাল্ট করার কারণে আরো দুটি ভাই জিলা স্কুলে পড়েছিল। হেডস্যার সবসময় তাদের পাশে ছিলেন।
উচ্চমাধ্যমিকে ভাল ফলাফলের পর সুজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইন্যান্সে টিকে যেদিন স্যারকে সালাম করতে এসেছিল – সেদিনও মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, মানুষ হও। ভাল মানুষ। লেখাপড়া তো করছ – সে বিষয়ে আর নতুন কিছু বলার নেই।
মফস্বল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ সারা শরীরে। এরই মাঝে এসে গেছে ডিজিটাল যুগ। মিলেনিয়ামের অপূর্ব উত্তেজনা। রাজনীতির হাতছানি। নিজেকে বুঝাত সুজন – এসব তার জন্য নয়। তাকে লেখাপড়া করে দাঁড়াতে হবে। তার পিছনে পুরনো মালগাড়ির মত একটা বিশাল পরিবার। দারিদ্র্যই যাদের সম্পদ।
অথচ
মাথা ঘুরে গেল সেদিন – যেদিন বন্ধু সজীবের হাতে দামী মোবাইলটা দেখল। এত দিন যা কাবু
করতে পারেনি এক মুহূর্তে সেই লোভ সুজনের ভিতরে এক উন্মত্ত চাহিদা তৈরি করল। এমন একটা
মোবাইল! নিজের সস্তা পুরনো মোবাইলটা পকেটে লুকিয়ে প্রশ্ন করল – কত দাম রে এটার?
-
কেন,
কিনবি নাকি? পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা।
কিছুটা কি বিদ্রুপের সুর ছিল সজীবের কন্ঠে? পাত্তা দিল না সুজন। দিন-রাত মাথার মধ্যে শুধু সেই স্মার্টফোনটা ধাক্কা দিতে লাগল।
অফিসিয়াল চিঠিগুলো
ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ একটা ব্যক্তিগত চিঠির দিকে চোখ পড়ল হেডস্যারের। আরে! এটাতো সুজনের
হাতের লেখা। অন্য চিঠি রেখে কৌতূহলে সেটাই আগে খুললেন।
শ্রদ্ধেয় স্যার,
আমার শ্রদ্ধাপূর্ণ
সালাম নেবেন। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে হলে উঠেছি। পড়াশোনা করতে চেষ্টা করছি। কিন্তু অত্যন্ত
দুঃখের সাথে আপনাকে জানাচ্ছি, সাম্প্রতিক সময়ে আমার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। ডাক্তার
পরীক্ষা করে বলেছেন আমার পিত্তথলিতে পাথর হয়েছে, প্রচন্ড ব্যথা। ডাক্তার বলেছেন, অপারেশান
করাতে হবে। কিছু খেতে গেলেই বমি হয়। মাঝে মাঝে মনে হয় মরে যাব। এদিকে আব্বাও রিটায়ার
করে বাড়ি চলে গেছেন। আমি ভীষণ বিপন্ন ও অসহায় স্যার। আপনি যদি আমাকে কিছু সাহায্য করতেন,
আমি কথা দিচ্ছি, ভবিষ্যতে চাকরি করে আমি সবার আগে আপনার ঋণ শোধ করব। যদিও আমার ক্ষুদ্র
জীবনে আপনার ঋণ শোধ করার কথা বলা স্পর্ধা মাত্র। তবুও বিপদে পড়ে আপনাকেই স্মরণ করছি।
আপনি শুধু আমার গুরুই নন, দ্বিতীয় পিতাও বটে। মাফ করবেন স্যার। বাধ্য হয়ে আপনাকে বিরক্ত
করলাম।
ইতি
চিরকৃতার্থ
সুজন রহমান।
চিঠি হাতে স্থির হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। হায় খোদা! এটা কেমন বিচার। ওদের জীবনের আঁধার কি ঘুচবে না। এত মেধাবী ছেলেটা অসুস্থ হয়ে পড়ল।
-
কী
হয়েছে তোমার? এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?
খেতে
বসে প্রশ্ন করলেন হাসনা বেগম।
-
এঁ
– কই না।
-
কই
না কী। আজকে স্কুল থেকে আসার পর থেকেই দেখছি তুমি অন্যমনস্ক। কিছু একটাতো ভাবছ নিশ্চয়।
-
আচ্ছা
হাসি, তোমার সুজনের কথা মনে আছে?
-
কোন্
সুজন, তোমার ছাত্রদের কতজনের নামই তো সুজন।
-
হ্যাঁ,
তা ঠিক। কিন্তু আমার কাছে পড়তে আসত, বাবা একটা সার কারখানায় পিয়ন ছিলেন।
-
হ্যাঁ,
মনে পড়ছে। কত রুটি বেলে খাওয়ালাম তোমার এসব ছেলেদের মনে থাকবে না।
প্লেটের ভাত
খুঁটতে খুঁটতেই জেলাস্কুলের হেডস্যার বললেন, সেই সুজন ছেলেটা অসুস্থ। আজকে ওর একটা
চিঠি পেয়েছি তোমাকে দেখাব।
-
কী
অসুখ এত বাচ্চা ছেলের – উদ্বিগ্ন কন্ঠে প্রশ্ন করলেন হাসনা বেগম।
-
পিত্ত
থলিতে পাথর। খুব নাকি ব্যথা হচ্ছে। অপারেশন করতে হবে।
-
ও
মা! এই বাচ্চা ছেলের পিত্তে পাথর! আগে তো এসব রোগ বুড়োদের হত।
-
সবারই
হত। তখন চিকিৎসা ছিল না। মানুষ বুঝতে পারত না। এখন চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। রোগনির্ণয়
অনেক সহজ। কিন্তু কথা সেটা নয়। আসল কথা হচ্ছে চিকিৎসার জন্য টাকার দরকার।
-
তো
– হাসনা বেগম এই ছোট্ট শব্দটা বলে স্বামীর মুখের দিকে তাকালেন।
-
তো,
তাই-ই ভাবছি। এত মেধাবী ছেলেটা। টাকার জন্য চিকিৎসা করাতে পারবে না।
-
কিন্তু
তুমি কি ভাবছ সেটা আমাকে বল – স্বামীর মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে তিনি প্রশ্ন
করলেন।
-
হাসি
তুমি তো আমাকে বোঝ, তারপরও প্রশ্ন করছ কেন?
-
প্রশ্ন
করছি এ জন্যে যে, তোমারও ছেলে-মেয়ে আছে। তারা পড়াশোনা করছে। মাস শেষে আমাদেরও টানাটানি
হয়। তবুও তোমার কষ্টের কথা ভেবে আমি কাউকে সাহায্য করতে না করি না। বুয়া না এলে এই
বয়সেও হাতের ব্যথা নিয়ে আমাকে রুটি বানাতে হয় তোমার ছেলেদের জন্য। কিন্তু এই যে ফ্রি
পড়ানো, তার ওপর বিনি পয়সার ভোজ। কত এল গেল, প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। কিন্তু ক’জন মনে রেখেছে
শুনি!
-
আমি
কি মনে রাখার জন্য করেছি হাসি? – কিছুটা আহত স্বরে প্রশ্ন করলেন হেড স্যার।
-
তা
করোনি। কিন্তু কর্তব্য বা কৃতজ্ঞতা ওদের দিক থেকেও তো থাকা উচিত।
-
ওরা
এখন জীবন যুদ্ধে ব্যস্ত। আমাদের সময় টানাটানি ছিল। কিন্তু জীবন অনেক সুস্থির আর সুস্থ
ছিল। এখন সবাই রেসের ঘোড়া। একটু পিছনে তাকালেই পিছিয়ে পড়বে।
স্বামীর গলার স্বরে বিষন্নতা টের পেলেন হাসনা। তাড়াতাড়ি বললেন, আমিও সেটা বুঝি। তোমার সাথে এত বছরের সংসার, এত দেখলাম, তারপরও বললাম কথার কথা।
হেডস্যার আবদুল মান্নান উদাসীনভাবে চুপ করে রইলেন। হাসির কথায় অভিযোগ থাকলেও সবটুকু সত্যি নয়। এই জেলাশহরে দীর্ঘদিন তিনি আছেন। সরকারি চাকরি হলেও যতবার বদলির আদেশ হয়েছে এলাকাবাসি আবেদন করে তার বদলি স্থগিত করেছেন। যেখানে যান তার কাজটা করে দেবার জন্য সবাই এগিয়ে আসে। বাজারের মাছওয়ালা পর্যন্ত তার মাছের ডালা ফেলে রেখে স্যারের বাজারের ব্যাগটা রিক্সায় তুলে দেয়। ডাক্তারের চেম্বার, ব্যাংক বা স্কুলের কাজে বোর্ডে গেলে সবার আগে তার কাজটা করে দেবার জন্য সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মান্নান সাহেব এই সুবিধা নিতে চান না। কিন্তু মানুষ বলেই সম্মানটুকু উপভোগ করেন।
দিন দুয়েক অনেক ভাবনার পর সিদ্ধান্ত নিলেন প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে কিছু টাকা তুলবেন। সঞ্চয়পত্রে কিছু টাকা আছে বটে সেটা থেকে এত টাকা পাওয়া যাবে না। আর অসময়ে ভাঙাতে গেলে লস হবে। তারচেয়ে প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে কিছু টাকা নিলে মাসে মাসে কিছু কিছু কাটা গেলে সংসারে তেমন আঁচ লাগবে না। সুজন বলেছে, চল্লিশ হাজার টাকার মত লাগবে।
অফিসের একাউন্ট্যান্টকে
ডেকে দরখাস্তটা হাতে দিতে সে কিছুটা অবাক হয়ে হেডস্যারের মুখের দিকে তাকান। তিনিও তাকিয়ে
ছিলেন তার মুখের দিকে। প্রত্যাশাই ছিল বেচারা অবাক হবে। কারণ তাঁর ফাইলপত্রে অতীতে
কখনও লোন নেওয়ার কোন ডকুমেন্ট নেই। সংসারের গৃহিনীও মিতব্যয়ী হওয়ার কারণে কখনও ধার
দেনায় জড়াতে হয়নি। রংপুরে পূর্বপুরুষের সূত্রে প্রাপ্ত একটা একতলা বাড়ি আর গ্রামে কিছু
ফসলী জমি আছে। বাড়িটা ভাড়া দিয়ে যা পান তা সংসারে, ছেলে-মেয়ে দুটোর পড়াশোনাতে চলে যায়।
কিন্তু জমি থেকে তেমন কোন আয় আসে না। নিস্ফলা জমি। কোন কোন বছরতো বন্যাতেই সব শেষ।
তখন উলটো বর্গাদারদের কিছু সাহায্য করতে হয়।
-
স্যার।
-
কী
মিনহাজ। ও আচ্ছা, তোমাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছি।
-
জি
না, তা না স্যার।
- হ্যাঁ, টাকাটা আমার লাগবে। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রসেস কর।
স্নেহের
সুজন,
তোমার
চিকিৎসার টাকাটা জোগাড় করেছি। যদিও কিছুটা দেরি হয়ে গেল। তোমার নিশ্চয় অনেক কষ্ট হচ্ছে।
এবার চিকিৎসা করে সুস্থ হয়ে যাবে আশা করি। এখন যত দ্রুত সম্ভব তোমার ব্যাংল একাউন্ট
নম্বর পাঠালে আমি টাকাটা টিটি করে দেব। চিকিৎসা ও তৎপরবর্তী সংবাদ আমাকে জানিও।
শুভার্থী
আবদুল
মান্নান
প্রধান
শিক্ষক
ময়মনসিংহ
জিলা স্কুল
ময়মনসিংহ
চিঠিটা হাতে নিয়ে একরকম উড়ে উড়ে রুমে এল সুজন। স্যার যে এভাবে এতগুলো টাকা পাঠাবেন সে জীবনেও ভাবতে পারেনি। চিঠির খামের ওপর দুবার চুমু খেল।
-
কি
রে সুজইন্যা, এত খুশি ক্যান? লটারির টিকিট পাইছস, নাকি প্রাইজবন্ডের ড্র!
- ঐসব কিচ্ছু না – আলাদিনের চেরাগ বুঝলি ব্যাটা – আ-লা-দি-নের চে-রা-গ।
স্যারের চিঠির
শেষ লাইনটা আবার পড়ল – ‘চিকিৎসা ও তৎপরবর্তী সংবাদ আমাকে জানিও।
চিকিৎসা! কিসের চিকিৎসা স্যার! এই চিকিৎসা শরীরের নয়, মনের। আপনি দাম দিয়েছিলেন বলে সবাই কি তা দেয়। এখানে চকমকি, ঝকমকি না থাকলে কেই পাত্তা দেয় না। ফ্যাশন দুরস্ত পোশাক না থাকলে একটা ভাল টিউশনিও পাওয়া যায় না। শুধু ভাল ছাত্র দিয়ে কিচ্ছু হয় না। দিন বদলে গেছে স্যার। আপনার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন আর আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেক তফাৎ। আপনার ছিল আদর্শ, আর আমাদের দরকার চাকচিক্য।
টাকাটা হাতে আসতেই রুমমেট হাসিবকে নিয়ে শপিং-এ গেল সুজন। একটা স্মার্ট ফোন কিনতে হবে প্রথমেই। তারপর কিছু ভাল প্যান্ট-শার্ট, স্যান্ডেল আর একটা দামি পারফিউম। ঘড়ি আছে একটা দামী। ইউনিভার্সিটিতে টিকেছে শুনে সৌদি-আরব থেকে মামা পাঠিয়েছিল। এবার সুজন রহমানকে ঠেকায় কে? বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ছেলে বুয়েটে পড়ি বলে কত টুশনি করায়। হেডস্যারের অবদানে কমার্সের ছাত্র হয়েও তার ইংরেজির ভিতটা পাকা। চাইলে ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রও দু-চারটা পড়ানো যাবে। আর ইউনিভার্সিটির মেয়েগুলো তার হাতের মোবাইলটা দেখে নিশ্চয় পাত্তা দেবে।
দুমাস অপেক্ষায়
কেটে গেল। প্রতিদিনই পিয়ন অফিসিয়াল চিঠিগুলো নিয়ে এলে একটা ব্যক্তিগত চিঠি আশা করেন।
নেড়েচেড়ে দেখেন। না আসে না সে চিঠি। যে মোবাইল নম্বর থেকে ব্যাংক একাউন্ট নম্বর এসেছিল
সেখানে একদিন ফোন করেছিলেন।
-
এটা
কি সুজনের নাম্বার?
-
কি
বলছেন? কোন সুজন? এটা তো মোবাইল ফোনের দোকান। - বলেই কেটে দিয়েছিল।
অফিস ক্লার্ককে
দিয়ে পুরনো ফাইল ঘাঁটিয়ে সুজনের স্থায়ী ঠিকানা বের করে তার বাবাকে চিঠি লিখলেন,
জনাব,
আসসালামালাইকুম। আমি জেলাস্কুলের হেডস্যার। দীর্ঘদিন আপনার পুত্র সুজনের কোন খবর জানি না। একবার শুনেছিলাম তার পিত্তথলিতে পাথর হয়েছে। অপারেশন করাতে হবে। করানো হয়েছে কি? তার শরীর স্বাস্থ্য এখন কেমন? আপনি কেমন আছেন ইত্যাদি সর্ববিধ কুশল জানিয়ে পত্রের উত্তর দিলে বাধিত হব।
চিঠিখানা রেজিস্ট্রি ডাকে দিলেন। খুব দ্রুত জবাব এলো।
শ্রদ্ধেয় স্যার,
আমার সালাম
জানিবেন। আপনার চিঠির জবাব লিখিতে সংকোচ বোধ করিতেছি। আমি লেখাপড়া বিশেষ জানি না। স্যার
আশ্চর্য হইলাম এই কারণে – কে আপনাকে এরকম একটি মিথ্যা সংবাদ দিয়াছে। সুজন আল্লার রহমতে
ভাল আছে এবং সামনে তাহার অনার্স পরীক্ষা। দোয়া করিবেন স্যার। আপনার সাহায্য এবং দোয়া
ব্যতীত সে জীবনে এতটুকু আসিতে পারিত না। আমি সকল নামাজের ওয়াক্তে আপনার জন্য আল্লার
নিকট খাস দিলে দোয়া করি।
ইতি
চিরকৃতজ্ঞ
আব্দুর রহমান
চিঠিটা হাতে নিয়ে কতক্ষণ পাথর হয়ে বসেছিলেন হেডস্যার। এরকম প্রতারণা! যে শিশুটিকে পরম যত্নে একটা চারাগাছের মত পরিচর্যা করে দিনে দিনে বড় করেছেন, সেই ছেলেটি তাকে এত বড় ধোঁকা দিল। কথাটা হাসিকে বলতেও তার লজ্জা লাগছে। কত হাজার হাজার ছাত্র কিন্তু এরকম তো আর কখনও ঘটেনি। দেশটা কোথায় যাচ্ছে! কাদের মানুষ বানাচ্ছেন! তারা কি সত্যিই মানুষ হচ্ছে! পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিলেন। সবাইকে একরকম ভাবা ঠিক নয়। কত ভাল ভাল ছাত্র আছে তার যারা আজ দেশে বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত। আবার সুজনের মতোও হয়তো আছে।
যাত্রাবিরতিতে গাড়িটা এসে থামল একটা হোটেল কাম রেস্টুরেন্টের সামনে। একে একে যাত্রীরা নেমে গেল ফ্রেশ হওয়ার জন্য। হেড স্যার নামলেন না। কখনও নামেনও না। বাসা থেকে দুটুকরো স্যান্ডউইচ আর এক বোতল পানি সাথে নিয়েই তিনি গাড়িতে চড়েন।
ওয়াশরুমের ঝাপসা আয়নার সামনে দাঁড়াতেই সুজনের মনে হলো প্রতিবিম্বে একটা কিম্ভূত জানোয়ারের ছবি দেখা যাচ্ছে। গলা দিয়ে একটা অবোধ আর্তস্বর বের হল। জানোয়ারের মত সেই স্বরটাকে ভয় পেয়ে সুজন তাড়াতাড়ি বের হয়ে এল। একটা খালি টেবিল পেয়ে বসল। বয় আসতেই শুধু এক কাপ চা অর্ডার দিল। চায়ের কাপে স্যারের মুখটা ভেসে উঠতেই চমকে উঠল সুজন। কাপটা ঠেলে দিল। না, এই চা খাওয়া যাবে না। ডানহাতে মাথার চুলগুলো মুঠি করে টানল। ইস্ বাবা যেদিন তাকে চিঠির কথা জানিয়েছিল তখন মনে হয়েছিল, স্যার তাকে আর কোথায় পাবে? জীবনের রাজপথের আলোকোজ্জ্বল সড়কবাতিগুলো তাকে ডাকছিল। কেবলই ডাকছিল সামনে যেতে। পেছনে অন্ধকার, পেছনে ফেরার দরকার নেই। তাকায়নি বলেই তো আজ সুজন রহমান একটি বহুজাতিক কোম্পানির চিফ মার্কেটিং অফিসার।
গাড়ি গন্তব্যের কাছাকাছি আসতে এটেন্ডেন্ট ঘোষণা দিল আর কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা সিলেট শহরে পৌঁছে যাব। যাত্রাপথের কোন অসুবিধা হলে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আমি আবদল আহাদ আপনাদের নিকট ক্ষমাপ্রার্থী। আশা করি আগামীতেও আপনাদের যাত্রাপথে আমরা সাথী থাকব। সবাই ভাল থাকবেন। আল্লাহ হাফেজ।
বাসস্ট্যান্ডে থামতেই দীর্ঘ যাত্রায় অস্থির যাত্রীদের মাঝে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। কেউ কেউ বক্সের জিনিস খুঁজে নিতে তাড়াতাড়ি নামার জন্য অস্থির হলেন। হেডস্যার বসে আছেন। ভিড় কমলে তিনি নামবেন। সুজনও বসে আছে একঠাঁয়।
বাস প্রায় খালি
হতে ডান হাতে লাঠিটা দৃঢ় করে ধরে বাঁ হাতে ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। এটেন্ড্যান্ট এগিয়ে
এল তাকে সাহায্য করতে। তিনি অসম্মতি জানিয়ে নেমে এলেন।
-
স্যার
-
কে?
-
আমি
– আমি সুজন স্যার।
পেছন ফিরে তাকালেন
না হেডস্যার। শুধু বললেন – কী চাও?
-
আমি
– আমি মাফ চাই স্যার। আমি ভুল করেছিলাম। বুঝতে পারিনি। আমাকে মাফ করে দিন স্যার।
সুজন হাতজোড়
করে সামনে এসে দাঁড়ালো।
-
সরে
যাও। গর্জে উঠলেন হেড স্যার। ভুল তুমি করনি। ভুল করেছি আমি। মানুষ চিনতে পারিনি।
লাঠিটা শক্ত
হাতে ধরে স্যার এগিয়ে যান। সুজন পিছনে দাঁড়িয়ে থাকে।

No comments:
Post a Comment