Sunday 26 July 2020

সত্যেন্দ্রনাথ বসু - পর্ব ৭



সত্যেন্দ্রনাথ বসু: বোসন কণার জনক

সপ্তম অধ্যায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান প্রসঙ্গে সত্যেন বসু 'আমার বিজ্ঞানচর্চার পুরাখন্ড' প্রবন্ধে লিখেছেন, "১৯২১-এ কলকাতাতে রয়েছি - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। হার্টগ সাহেব এসেছেন প্রথম ভাইস-চ্যান্সেলর হয়ে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীন শিক্ষক সংগ্রহের কথা ভাবছেন। একদিন কলকাতায় ডেকে পাঠালেন। আমার কথা তাঁকে নাকি বলেছেন কোন উচ্চপদস্থ ব্যক্তি। সেই দেখা-শুনার ফলে চিঠি পেলাম - ১৯২১ সালে ঢাকায় রীডারের পদ পাবার জন্য ডাক পড়লো।"[1]

          ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে। প্রথম উপাচার্য নিযুক্ত হয়েছিলেন ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ (পি জে হার্টগ)। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়কে শুরু থেকেই শিক্ষা ও গবেষণায় বিশ্বের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে খুবই সচেষ্ট ছিলেন তিনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় মেধাবীদের খুঁজে খুঁজে নিয়ে এসেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও স্যার হার্টগ সেভাবে খুঁজে বের করেছেন সম্ভাবনাময় শিক্ষকদের। তারই অংশ হিসেবে তিনি সত্যেন বসুর সাথে কথা বলেছিলেন।

 

চিত্র: স্যার পি জে হার্টগ - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য


সত্যেন বসু স্যার হার্টগের কাছে তাঁর বায়োডাটা পাঠিয়েছিলেন। হার্টগের কাছে পাঠানো বায়োডাটার সাথে সংযুক্ত  চিঠিতে সত্যেন বসু লিখেছিলেন যে তিনি এক্সপেরিমেন্টাল ফিজিক্স কিংবা ম্যাথমেটিক্যাল ফিজিক্সের রিডার পদে মাসিক ৪০০ রুপি বেতনে কাজ করতে রাজি আছেন। সম্পূর্ণ চিঠিটি ছিল নিম্নরূপ:

 

22, Iswar Mill Lane,

Calcutta

Dated the 15th Jan., 1921

 Dear Mr Hartog,

In compliance to your wishes, I am sending you the reprints by post. I also enclose herewith a brief statement of my career.

 I am quite willing to go as a Reader in Experimental, or Mathematical Physics, on an initial salary of Rs. 400, with the prospect of increment according to any reasonable scale, provided my first appointment be at least for three years, with the assurance that it will be made permanent, if my work there prove satisfactory.

I remain,

Yours sincerely,

Satyendranath Bose

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক জার্নালেও। মেঘনাদ সাহা তখন ইওরোপে। তিনিও দরখাস্ত পাঠিয়েছিলেন সেখান থেকে। ইতোমধ্যে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে যোগ দিয়েছেন ওয়াল্টার জেনকিন্‌স। তাঁকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তাঁর ডিপার্টমেন্টের রিডার পদের জন্য সত্যেন বসু ও মেঘনাদ সাহার মধ্যে কে উপযুক্ত হবেন সে ব্যাপারে মত দেয়ার জন্য। তিনি দুটো দরখাস্তই দেখলেন খুঁটিয়ে। সত্যেন বসুর চেয়েও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে মেঘনাদ সাহার। তাঁর ডিএসসি ডিগ্রিও আছে। স্কলারশিপ নিয়ে ইওরোপে গেছেন দু'বছরের জন্য। এর সবগুলোই মেঘনাদ সাহার অনুকুলে। আবার অন্যদিকে সত্যেন বসুর গবেষণাপত্র যেটা ফিলসফিক্যাল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে সেটা খুবই সম্ভাবনাময়। তাছাড়া মেঘনাদ সাহা এপর্যন্ত যেসব সুযোগ পেয়েছেন - সত্যেন বসু সেসব এখনো পাননি। পেলে তিনি হয়তো আরো ভালো করতে পারবেন। সত্যেন বসু অন্যান্য সহকর্মীদের সাথে বেশ সহজেই কাজ করতে পারবেন। তাই ওয়াল্টার জেনকিন্‌স সত্যেন বসুর পক্ষেই রায় দিলেন। প্রফেসর ওয়াল্টার জেনকিনের চিঠিটি ছিল নিম্নরূপ:

 

Physics Department

Dacca

Jan 17, 1921.

To

The Vice-Chancellor of the University,

Dacca.

 

Dear Mr Hartog,

 

I have looked over the applications and carefully read through the research work of the people who may possibly be elected to the Readership in Physics and in my opinion the most suitable appointment would be that of S N Bose or Meghnad Saha. Both are able and original workers and while Saha has done more and perhaps better work than Bose, the latter's last paper in the Phil Mag shows him to be extremely capable. He has not so far had the opportunities that Saha has had and I should be inclined personally to support his claims. From what I know and have heard of Bose I should say that he would work enthusiastically and easily with other people and I think an effort should be made to secure his services.

 

I remain,

Yours sincerely,

Walter A Jenkins

 

 

১৯২১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের অফিস থেকে নিয়োগপত্র পাঠানো হলো সত্যেন বসুকে। ১৪ ফেব্রুয়ারি সত্যেন বসু তাঁর সম্মতিজ্ঞাপক চিঠি পাঠান ভিসি হার্টগের কাছে। ভিসিকে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি জানান যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের রিডার পদে ৪০০-৫০-১২০০ রুপি স্কেলের বেতনে যোগদানের জন্য তিনি সম্মত। দুয়েক দিনের মধ্যে তিনি স্যার আশুতোষের সাথে দেখা করবেন এবং আশা করছেন যে এপ্রিলের মাঝামাঝি তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্র নিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে জুন কিংবা তারও আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়া সম্ভব হবে।

          ভিসি হার্টগকে লেখা সম্পূর্ণ চিঠিটি ছিল নিম্নরূপ: 

 

22, Iswar Mill Lane,

Calcutta,

The 14th February, 1921.

To

P J Hartog Esq., MA, C I E

Vice-Chancellor, University of Dacca.

 

Dear Mr Hartog,

 

I am glad to receive your letter of the 10th instant offering me the post of a Reader in Physics in the University of Dacca. (Rs. 400-50-1200). I accept the offer with thanks. I shall see Sir Ashutosh Mukherjee in a day or two and I hope to be released from here by the middle of April. I believe there will be no difficulty in my joining your University in June or even earlier.

 

In the meantime I shall be glad to render such assistance in setting the courses etc. in Physics as can be done by correspondence.

 

l am

Yours truly,

S N Bose

 

১৯২১ সালের মে মাসে ঢাকায় এলেন সত্যেন বসু। আবাল্য শহর কলকাতায় বেড়ে ওঠা সত্যেন বসুর জন্য ঢাকা ছিল একটি গ্রামের মত। এই প্রথম নিজের শহরের বাইরে যাওয়া সত্যেন বসুর। কলকাতা থেকে ঢাকার দূরত্ব খুব বেশি নয়। এখন ফ্লাইটে আধ ঘন্টায় যাওয়া যায়। কিন্তু সেই ১৯২১ সালে কলকাতা থেকে ঢাকায় যেতে হলে ট্রেনে যেতে হতো গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত। সেখান থেকে স্টিমারে নারায়ণগঞ্জ। নারায়ণগঞ্জ থেকে আবার ট্রেনে ঢাকা। প্রায় সারাদিন লেগে যেতো কলকাতা থেকে ঢাকা পৌঁছাতে।

          রমনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা তখন মূল শহর থেকে অনেক দূরের পথ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল এলাকা দেখে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হলো সত্যেন বসুর। উত্তর কলকাতায় যেখানে তাঁদের বাড়ি সেখানকার সরু অলিগলিতে অভ্যস্ত তিনি। কিন্তু এখানে মাইলের পর মাইল খালি জায়গা। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় প্ল্যান করা হয়েছে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে। শিক্ষার্থীদের জন্য তো বটেই, সব শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্যও আবাসিক বন্দোবস্ত আছে। 

          বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় সত্যেন বসুর বাসস্থানের ব্যবস্থা হলো। কলকাতায় তাঁদের একান্নবর্তী বাড়ির অতগুলো মানুষের সাথে তুলনা করলে শুধুমাত্র তিনি এবং তাঁর পরিবারের থাকার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাড়িটি অনেক বড়। বাড়ির চারপাশে প্রচুর খালি জায়গা যেখানে পরবর্তীতে চমৎকার বাগান তৈরি করেছিলেন সত্যেন বসু।

 

চিত্র: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যেন বসুর বাসা


এই বাড়িটির কোন চিহ্ন এখন নেই। ১৯৭০ সালে বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়। সেখানে নির্মিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবন। সরদার ফজলুল করিম এই বাড়িটি সম্পর্কে ১৯৭০ সালে এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন,

 

"এখন সেখানে পঁচিশ হাত লম্বা আর পনের হাত পাশে একটা ফিলিপ্‌স টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন আছে। কিছুদিন পরেই এখানে, এই ফিলিপস   টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনের পেছনে বহুতলার দালান উঠবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবন নির্মিত হবে। সে জন্যই লাল টালির দোতলা ঝোপ-ঝাপ ঘেরা এই বাড়িখানা ভেঙে ফেলা হয়েছে।

            তোমরা আজকের তরুণরা যারা ঢাকায় থাকো তারা জায়গাটি  অনায়াসে চিনতে পারবে। কার্জন হল আর হাইকোর্টের মাঝখানে রাস্তা ধরে পশ্চিম দিকে এগুতে গেলে চক্করটার পাশ দিয়ে উত্তর দিকে ময়মনসিংহ রোডে পা দিতে পশ্চিম পাশে কিংবা সোজা পশ্চিমে মেডিকেল কলেজ আর শহীদ মিনারের দিকে এগুতে রাস্তার উত্তর পাশে ছিল সেই বাড়িখানা।"[2]

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাজকর্ম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল ১৯২১ সালের ১ জুলাই। শুরুতে তিনটি ফ্যাকাল্টির ১২টি বিভাগে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৮৪৭ জন। সায়েন্স ফ্যাকাল্টির অফিস ও ক্লাস শুরু হলো কার্জন হলে।

          ঢাকায় টাউন হল তৈরির জন্য এই ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন ১৯০৪ সালে। তারপর ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আইন এবং সেটা নিয়ে আন্দোলন শুরু হলে এই ভবন আর টাউন হল হয়নি। ভবনটি প্রস্তুত হবার পর ১৯১১ সাল থেকে ঢাকা কলেজের ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিলো কার্জন হল।[3] ১৯২১ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ হয়ে যায় কার্জন হল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যেন বসুর অফিস ছিল এই কার্জন হলে। এখানেই তিনি কাটিয়েছেন পরবর্তী চব্বিশ বছর।

 

চিত্র: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল। এখানেই ছিল সত্যেন বসুর কাজ


সত্যেন বসুর সাথে  ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে সেই সময় শিক্ষক ছিলেন একজন প্রফেসর -  ডাব্লিউ এ জেনকিন্স,  দু'জন রিডার (অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর) - সত্যেন বসু এবং আর এন ঘোষ, ও একজন লেকচারার - কাজী মোতাহার হোসেন।  ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথম ব্যাচ পাস করে বের হয় ১৯২৪ সালে।

            শুরু থেকেই সত্যেন বসু ছিলেন ছাত্র-অন্তপ্রাণ। ডিপার্টমেন্টের উন্নতির জন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করতেন। কীভাবে শিক্ষার্থীদের উন্নতি হবে, কীভাবে পড়ালে তাদের বুঝতে সুবিধা হবে এসবের দিকে তাঁর ছিল সজাগ দৃষ্টি। বিভাগের সহকর্মীদের প্রতিও ছিল তাঁর অফুরন্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যেন বসুর শুরু থেকেই ছিলেন। তিনি তাঁকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে। সত্যেন বসু সম্পর্কে তিনি লিখেছেন:

 

"তখন আমি ছিলাম পদার্থবিদ্যার অধ্যক্ষ জেনকিন্স সাহেবের প্রিয় ছাত্র এবং নবনিযুক্ত অ্যাসিস্ট্যান্ট লেকচারার। কিছুদিন পরে ১৯২১ সালেই জেনকিন্‌স কলিকাতায় এডুকেশন ডাইরেক্টরেটে চলে যাওয়াতে রিডার সত্যেনবাবু পদার্থবিদ্যা বিভাগের কর্তৃত্ব লাভ করেন। জেনকিন্‌স সাহেব সত্যেনবাবুকে বিশেষ করে বলে গিয়েছিলেন, আমার যাতে বিদ্যার উন্নতি হয় সে বিষয়ে যত্ন করতে। আমাকে বলে গিয়েছিলেন, "সত্যেনবাবু অতিশয় বিদ্বান লোক, যে কোনও বিষয় বুঝতে না পারলে ওর কাছ থেকে বুঝিয়ে নেবে।" আমি এ উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও আলোকবিজ্ঞানে আমার অনুরক্তি ছিল। জীন্‌স এর বৃহৎ ইলেকট্রিসিটি পুস্তকের সমুদয় বিষয়বস্তু (উদাহরণ ও প্রশ্নমালাসহ) তাঁর কাছ থেকে ভাল করে বুঝে নিয়েছিলাম। এই বইয়ের প্রায় সাড়ে তিনশ' অংকের মধ্যে প্রায় ১০০টা তাঁকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছিলাম। তিনি তাতে কখনও বিরক্ত হননি। তাঁর কোনও ছাত্র তাঁকে এত প্রশ্ন করে নাই। সুতরাং আমি দাবি করতে পারি, আমি তাঁর সবচেয়ে বড় ছাত্র - অর্থাৎ শুধু 'ছাত্র' নই, 'ছাত্রতর'ও নই, একেবারে 'ছাত্রতম'।

            একদিনের কথা বলি। অতি প্রত্যুষ, তখনও সূর্যোদয় হয়নি। আমি খাতাপত্র-বই নিয়ে তাঁর পদার্থবিদ্যার বসবার ঘরে গিয়ে হাজির। দেখলাম তিনি আগেই এসে আপনমনে অংক কষছেন। আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন এত সকালে কেন এসেছি। আমি জানালাম, 'দুই দিন ধরে একটা অংক মিলাতে পারছিনে, তাই সকালেই আসলাম।' তিনি অংকটা দেখেই বললেন, "হ্যাঁ এটা তো ম্যাক্সওয়েল করেছেন, mutual induction-এর (পরস্পর প্রবর্তন সংক্রান্ত) অংক।" এই বলে অংকটা কষতে আরম্ভ করলেন, কিছুতেই মেলে না। এইভাবে সকাল গেল, দুপুর গেল, বিকাল গেল, অংক হয় না। ওখানে বসেই আমাদের সকালের নাস্তা, দুপুরের খানা, বিকালের টিফিন খাওয়া হল। বিকালে বললেন, "বেয়ারারা উশখুশ করে, ওরা বাড়ি যাবে। চল আমরা তোমাদের টিচার্স কমনরুমে গিয়ে বসি।" সেখানে বসে সাঁঝের চা হল, দুপুররাত্রের খানাও হল, কিন্তু অংকটা হল না। রাত ১২টার ঘন্টা বেজে গেল, তখন তিনি বললেন, "চল, আমার বাড়িতে। চল, সেখানে ম্যাক্সওয়েল-এর বই আছে।" গেলাম তাঁর বাড়িতে। তিনি দ্রুতপদে দোতলা থেকে বই নিয়ে এলেন। দেখা গেল প্রমাণটার মধ্যে রয়েছে একটা পরীক্ষালব্ধ তথ্য। সে কথাটা আমাদের কারোরই মনে হয়নি। তাই অসম্পূর্ণ তথ্য দিয়ে বৃথাই চেষ্টা করা হয়েছে। তারপর আমাকে উপদেশ দিলেন, "দেখ কাজী, কোনও সমস্যা সমাধানের বারংবার চেষ্টা করবে, ধৈর্য হারায়ো না। অনেক সময় অকস্মাৎ একটা সমাধানের সংকেত মনে পড়ে যায়; তখন সমাধানটা সহজ হয়। এটাই বোধহয় 'inspiration', নবী-পয়গম্বরদের inspiration-কেও হেসে উড়িয়ে দেয়া যায় না। দৈবযোগেই inspiration পাওয়া যায়।"

            তাঁর ছাত্রদের পড়াবার পদ্ধতি ছিল: আগে পদার্থবিদ্যার প্রাসঙ্গিক গণিত কিছুটা পড়িয়ে নিয়ে পরে ছাত্রদের আসল পাঠ হুড়মুড় করে শেষ করিয়ে দেয়া। একবার বিএ বিএসসি অনার্স ক্লাসের ফাইনাল পরীক্ষা আরম্ভ হওয়ার দুই মাস-আড়াই মাস বাকি থাকতে একদিন হঠাৎ আমাকে ডেকে বললেন, "দেখ কাজী, আজকাল দেখছি ছেলেরা ঠিকমতো ক্লাসে আসছে না, আমাকে দেখলে আরও দূর দিয়ে যায়। বোধ হয় অধিকাংশ ছেলে গণিতের সম্মুখীন হতেই ডরায়। পরীক্ষার তো আর ১০/১২ সপ্তাহ বাকি আছে, কিন্তু ওদের আসল কোর্সটা আরম্ভই হয়নি। যা হোক তুমি এই সময়ের মধ্যে ওদের কোর্সটা শেষ করে পড়িয়ে দাওতো। আমি নোটিশ দিয়ে দিচ্ছি। আমি জানি তুমি পারবে।" আমি বেশ পরিশ্রম করে ওদের নির্দিষ্ট পাঠ্যবিষয় শেষ করে পড়িয়ে দিয়েছিলাম। আসল ব্যাপার এই - প্রফেসর বোস উচ্চমার্গের পাখি, তাঁর কাছে গণিতের সব বিষয়ই সমান সহজ। এ কারণে আমাদের মত সাধারণ লোকের কথা ওরা বুঝতে পারে, আর সবটা না বুঝলেও আরেকটু চেষ্টা করেই বুঝে নেয়।

            এ সম্পর্কে একটা কৌতুককর কথা মনে পড়ছে - একটি ফুটবল-ক্রিকেট খেলুড়ে প্রিয় ছাত্র, দিগেন দাস, হঠাৎ এসে জিজ্ঞাসা করলো, "স্যার, একটা কথা বলবো স্যার?"

            "তা কেন বলবিনে বল, কী বলতে চাস?"তখন সে বললো, "স্যার, আপনার আর শশাংকবাবুর পড়ানো আমরা খুব পরিষ্কার বুঝতে পারি।"

            ভাবলাম, যা হোক আজ একটি ছাত্রের প্রশংসা পেলাম। কিন্তু তখনও ওর বক্তব্য শেষ হয়নি - বাক্যের শেষার্ধ হল, "কিন্তু স্যার সত্যেনবাবু এত সুন্দর পড়ান যে তা একটুও বুঝতে পারিনে।"

            তখনই গুমর ফাঁক হয়ে গেল। বুঝলাম, এ বক্তব্যের সারমর্ম হল - "আপনি আর শশাঙ্কবাবু কী কচু পড়ান! ও তো আমরা এমনিই বুঝতে পারি।" বুঝলাম অনেক ছাত্র দেবদেবীর ভক্ত, সাধারণ মানুষের কথা তারা গ্রাহ্য করে না, তাতে রহস্য নেই। বুঝলাম, ওতো ঠিকই বলেছে, - আমরা তো ধর্ম ও সে সম্পর্কীয় অনেক উপদেশ, হিতকথা ও আখ্যায়ন, বিনা বিচারেই মেনে নিয়ে থাকি। উচ্চমার্গের কথা স্বতন্ত্র, তা বুঝবার ও ভাববার দরকার হয় না। যাক, ওরা নিরীহ প্রাণী, সুখে থাক।

            সত্যেনবাবু তাঁর অনুষদের প্রত্যেকটি শিক্ষকের মন-মানসের কলকাঠি বুঝতে পারতেন এবং অনেক সময় তা পরীক্ষাও  করে নিতেন। আমি একবার কেমন পরীক্ষায় পড়েছিলাম বলছি। একবার এক পরীক্ষার প্রশ্নে কোনো অসতর্ক প্রশ্নকারক একটি প্রশ্নে অসম্পূর্ণ তথ্য থেকে সম্পূর্ণ উত্তর চেয়েছিলেন। আমি প্রশ্নটা নিয়ে ওর কাছি গিয়ে বলেছিলাম, "মডারেটরদের হাত থেকে এমন প্রশ্ন টিকলো কেমন করে?" তিনি অবশ্যই প্রশ্নটা দেখে ব্যাপার বুঝে ফেলেছিলেন, তবু আমাকে বুঝাতে লাগলেন, "না, প্রশ্ন ঠিকই আছে।" আর মোটা একখানা বই দেখিয়ে বললেন, "এই তো দেখ, এখানে এইরূপ প্রশ্ন আছে, পড়ে দেখ।" আমি বললাম, "স্যার, মোটা বই দেখে কী করব? তিনটে পরস্পর অনির্ভর ঋজু তথ্য, আর চারটে নির্ণেয় অজ্ঞাত রাশি! কোন অলিখিত শর্তও নেই। এর সমাধান কেমন করে হবে? আমি কিন্তু, এ প্রশ্নটা যারা চেষ্টা করে সময় নষ্ট করেছে তাদের প্রত্যেককেই পুরো নম্বর দেব।" তিনি একটু হেসে উত্তর দিলেন, "যাও তোমার যা ইচ্ছা হয় কর।" তবু আমার কথাটা ঠিক হয়েছে না বেঠিক হয়েছে তার কোনো ইঙ্গিত দিলেন না। বুঝলাম, উনি মনে মনে খুশি হয়েছেন - আর আমাকে একটু বাজিয়ে নিলেন, খাঁটি না মেকি!"[4]

 

সবকিছু ঠিকমতই চলছিল। সত্যেন বসু মন লাগিয়ে কাজ করছিলেন দিন রাত। কিন্তু দু'বছর পর হঠাৎ ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়ে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল সত্যেন বসুর। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবেদিতপ্রাণ স্থায়ী রিডারকে যদি চিঠি দিয়ে জানানো হয় যে তাঁর স্থায়ী নিয়োগপত্র বাতিল করে তাকে এক বছরের জন্য অস্থায়ী পদে নিয়োগ দেয়া হলো - তাতে মেজাজ তো খারাপ হবারই কথা। ১৯২৩ সালের ১২ এপ্রিল রেজিস্ট্রারের অফিস থেকে চিঠি দিয়ে সত্যেন বসুকে জানানো হলো যে কঠোর অর্থনৈতিক নীতিমালার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে তাঁর নিয়োগ পুনর্বিবেচনা করছে। পরবর্তী এক বছরের জন্য তাঁর নিয়োগ হবে অস্থায়ী ভিত্তিতে মাসিক ৫০০ রুপি করে। কোন ইনক্রিমেন্ট বা বোনাস থাকবে না।

          হঠাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কী হলো যে এরকম কঠোর অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রয়োগ করতে হলো? ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারও সেই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ছিলেন। তিনি তাঁর স্মৃতিকথায়[5] বর্ণনা করেছেন সেই কঠোর অর্থনৈতিক নীতিমালার কারণ। প্রাদেশিক সরকার ১৯১৯ সালে একটি নতুন আইন পাস করে যে বাংলার শিক্ষামন্ত্রী হবেন একজন ভারতীয়। সেই আইনের আওতায় প্রথম শিক্ষামন্ত্রী হন প্রভাসচন্দ্র মিত্র। দায়িত্ব নিয়েই তিনি ঘোষণা করলেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তুলনায় অনেক বেশি। বাংলার প্রাদেশিক সরকারের এত বেশি বেতন দেয়ার সামর্থ্য নেই। তাই শিক্ষকদের বেতন কমাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এর বিরুদ্ধে যুক্তি দেখালেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হবার সময়েই সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা ফান্ড গঠন করেছিল। সেই ফান্ডে ১৯২১ সালে পঞ্চান্ন লক্ষ রুপি আছে। সরকার সেই ফান্ড ইউনিভার্সিটিকে দিয়ে দিলে ইউনিভার্সিটি নির্বিঘ্নে চলতে পারে। সরকার যুক্তি দেখালো যে সেই ফান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্য নয়, কারণ সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি এবং বিল্ডিং তৈরি করে দিয়েছে। ভাইস চ্যান্সেলর হার্টগ শিক্ষকদের ব্যাপারে খুবই আন্তরিক। তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন সরকারকে বোঝাতে যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন কমানো সম্ভব নয়। কারণ তাঁদের প্রত্যেকের নিয়োগপত্রে তাঁদের পে-স্কেলের কথা উল্লেখ করা আছে। তার অন্যথা হলে চুক্তিভঙ্গ করা হবে। প্রদেশিক সরকার যুক্তি দেখালো যে শিক্ষকদের সাথে যে পে-স্কেলের চুক্তি হয়েছে তা কেন্দ্রীয় সরকারের আওতায়। ভিসি হার্টগ কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে কথা বললেন। কেন্দ্রীয় সরকার জানালো যে তাদের এ ব্যাপারে কিছুই করার নেই। প্রাদেশিক সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বাৎসরিক বরাদ্দ দিলো পাঁচ লক্ষ রুপি। সেখান থেকেই সব চালাতে হবে। সুতরাং শিক্ষকদের বেতন কমানো ছাড়া আর কোন উপায় রইলো না তাঁর হাতে।

          সত্যেন বসু এমনিতে হাসিখুশি উদারচিত্তের নরম মনের মানুষ। কিন্তু নীতির প্রশ্নে তিনি সাংঘাতিক দৃঢ়। তাঁকে রেজিস্ট্রারের অফিস থেকে অনুরোধ করা হয়েছিল তিন দিনের ভেতর জানাতে যে তিনি নতুন নিয়োগপত্রের ব্যাপারে সম্মত কি না। সত্যেন বসু খুব রেগে গিয়ে কড়া চিঠি লিখলেন ভাইস চ্যান্সেলর হার্টগ-কে। তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানালেন যে তাঁকে যে চিঠিটি দেয়া হয়েছে তা অন্যায়। হার্টগকে তিনি সরাসরি প্রশ্ন করেন যে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসার সময় যে নিয়োগপত্র দেয়া হয়েছিল সেটার শর্ত তিনি ঠিক বুঝেছিলেন কি না। তিনি আরো লিখলেন, "আমি জানাতে চাই যে আপনার বিশ্ববিদ্যালয় আমার সাথে ভালো ব্যবহার করেনি। আমি একটা চমৎকার স্থায়ী পদে ছিলাম, আপনি সেখান থেকে আমাকে অফার দিয়ে আপনি এখানে নিয়ে এসেছেন, আর এখন আপনি তা ভুলে যাচ্ছেন। যদি দুই বছরের নিরলস কাজের স্বীকৃতি এভাবে আপনার ইউনিভার্সিটি আমাকে দেয় তাহলে কারো পক্ষে বুঝতে অসুবিধা হবে না যে বাংলার শিক্ষার ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কী ধরনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে। আশা করি আপনি আপনার সিদ্ধান্ত দ্রুত জানাবেন যেন আমি কলকাতা ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিতে পারি।"

          সত্যেন বসুর লেখা চিঠির মূল অংশ ছিল নিম্নরূপ:

 

. . . Thus the letter from the office has been an unpleasant surprise to me. The short term within which I am asked to make up my mind is distinctly unfair. I shall like to think on it and I want to find out how far my original impressions about my appointment letter were correct; whether my interpretation was a reasonable one, the only interpretation which will suggest itself to an honest man.

          Of course I hasten to add that I do not want to cling to my post here simply on the strength of my original letter of appointment, if I feel that the university does not think my services worth having in the original terms.

          I would like to point out however that1 have not been fairly treated by your University. I have been drawn away from an honourable post by offers which you are now so eager to forget. If after two years of honest and conscientious work this is the only recognition by your University, I think it will not be very difficult for any one to see how the University is ushering forth a new regime in the educational history of Bengal.

          May I hope to hear from you, soon, so that I can at any rate make up my mind before I go away to Calcutta. . .

 

সত্যেন বসু প্রায়ই তাঁর চিঠিতে তারিখ লিখতে ভুলে যেতেন। ভিসির কাছে পাঠানো চিঠিটাতেও তারিখ ছিল না। ১২ এপ্রিল, ১৯২৩ তারিখে ভিসি হার্টগ সত্যেন বসুর চিঠির উত্তর দিলেন। চিঠিতে তিনি তাঁর অবস্থান এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে ব্যক্তিগত ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করেছেন। ভিসি হার্টগের চিঠিটি ছিল এরকম:

12th April, 1923

To

S N Bose, Esq. M Sc

Reader in Physics

 

Dear Mr Bose,

I have receivedyour letter (undated) today. In view of the change in the financial condition in Bengal, the University gave notice to all teachers who-were engaged for an indefinite term or whose appointments terminated during the present year that such appointments should come to an end on June the 30th, 1923 and you duly received such a notice. When you were originally engaged, I had no reason whatever to think the original plans in regard to the University would not be carried out and you were offered your original engagement in perfect good faith. The Executive Council have decided, as I informed the Court, to offer engagements for one year only to a large number of teachers this year including yourself but they hope to be in a position in the first term of the next session to offer permanent engagements in accordance with the scheme approved by the Academic and Executive Councils. Had you attended the meetings of the Academic Council at which this matter was discussed, you would have been fully aware of what was done. It is my desire, and I feel sure, it is the desire of the Executive Council to retain your services on the new terms offered. I think that it is entirely unfair to suggest that the University is eager to forget the terms originally offered to you. These terms were fixed not by the Executive Council but by the Chancellor on the advice of the officers of the Education Department and it is not the fault of the University that it is at present not placed in a position to carry out the original permanent scheme.

      You have during the past two years received a higher salary than that which you received in the University of Calcutta. The terms offered are not equal to those which were originally contemplated but they are certainly not inferior to those offered to the Post-Graduate staff of the University of Calcutta.

      I should be very glad to see you at the earliest possible moment and if you do not wish to accept these terms it will be clearly necessary to take immediate steps specially in view of the fact that Professor Jenkins will not be returning to the University until after the Puja Holidays.

      I think I ought to remind you that you have been given every facility possible to carry out your own research work and the University has not been unappreciatiue of the work which you have done.

I am,

Yours sincerely,

Vice-Chancellor

  

চিঠিটার মুল বিষয়ের ভাবানুবাদ করলে দাঁড়ায়, "বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ীপদে যারা নিযুক্ত আছেন কিংবা যাদের চুক্তি এবছর শেষ হয়ে যাচ্ছে তাদের সবার নিয়োগই এ বছর ৩০ জুন শেষ হয়ে যাবে। এদের সবাইকে চিঠি দেয়া হয়েছে। সে হিসেবে আপনিও চিঠি পেয়েছেন। শুরুতে আপনাকে যখন নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তখন যে এরকম হবে তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানতো না। কার্যকরী পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আপনিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষককে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেয়া হচ্ছে এখন। আমি আশা করছি যে আগামী অধিবেশনেই আপনারা সবাই স্থায়ী নিয়োগপত্র পেয়ে যাবেন। একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিং-এ আপনি উপস্থিত থাকলে এই ব্যাপারটা আগে থেকেই জানতে পারতেন। আমার এবং কার্যকরী পরিষদের একান্ত ইচ্ছা যে আপনি নতুন প্রস্তাবটি গ্রহণ করুন। আপনাকে নিয়োগের সময় যে স্থায়ী পদ দেয়া হয়েছিল সেটা ছিল চ্যান্সেলরের অফিসের সিদ্ধান্ত। এখন শিক্ষা বিভাগ যে সিদ্ধান্ত আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে তাতে আমরা আগের চুক্তির বাস্তবায়ন করতে পারছি না। বিগত দুই বছরে আপনাকে যে বেতন দেয়া হয়েছে তা আপনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে যত পেতেন তার চেয়ে বেশি। আপনাকে এখন যে বেতনের প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে তা এখন আপনি যা পাচ্ছেন তার চেয়ে কম হতে পারে, কিন্তু কলকাতার চেয়ে কম নয়। আপনি যদি বর্তমান প্রস্তাবে রাজি না থাকেন তাহলে শীঘ্র আমার সাথে দেখা করে আপনার সিদ্ধান্ত জানান, কারণ আমাদের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, বিশেষ করে প্রফেসর জেনকিন্‌স যখন পূজার ছুটি শেষ হবার আগে ফিরছেন না। আমি আপনাকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে আপনার নিজস্ব গবেষণা চালিয়ে যাবার জন্য সব রকম সুযোগ সুবিধা যথাসম্ভব দিয়েছে।"

          ভিসি হার্টগ যে সত্যেন বসুর চিঠিতে কিছুটা রেগে গেছেন তা বোঝা যাচ্ছে তাঁর কলকাতার বেতনের সাথে তুলনা করা দেখে এবং সত্যেন বসুর নিজস্ব গবেষণার কথা মনে করিয়ে দেয়া দেখে। হার্টগ সত্যেন বসুকে বেশি বেতন দেবেন এবং উচ্চতর স্থায়ী পদ দেবেন বলে ঢাকায় নিয়ে এসেছেন। দুবছর সেভাবে চলার পর এখন বলছেন  - আপনাকে বেশি বেতন দিচ্ছি! আর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন অধ্যাপক যখন গবেষণা করেন - সেটা নিজস্ব গবেষণা হয় ঠিক, কিন্তু তার কৃতিত্ব তো যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে। সত্যেন বসুর নামে যে বোসন কণার নামকরণ হয়েছে - তাতে কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ উজ্জ্বল হয়নি?

          সত্যেন বসু সহজে ছেড়ে দেবার পাত্র নন। হার্টগ ও বসুর মধ্যে অনেকগুলো উত্তপ্ত চিঠি বিনিময় হলো। হার্টগ কিছুতেই চাচ্ছিলেন না সত্যেন বসুকে হারাতে। তিনি জানেন ডিপার্টমেন্টের জন্যে এরকম শিক্ষক ও গবেষক সহজে পাবেন না তিনি। এক পর্যায়ে হার্টগ সত্যেন বসুর কাছে জানতে চাইলেন কী কী শর্তে সত্যেন বসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে রাজি আছেন জানাতে। সত্যেন বসু তখন গরমের ছুটিতে কলকাতায় গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তিনি লিখলেন যে তিনি নতুন কোন শর্ত দিতে চান না। কেবল শুরুতে তাঁর সাথে যে বেতন স্কেলে চুক্তি হয়েছিল সেই স্কেলের স্থায়ী পদই তিনি চান যেটা কয়েক বছর পর শেষ হয়ে যাবে না। আপাতত কার্যনির্বাহী পরিষদের বর্তমান সিদ্ধান্ত স্থগিত করলে তিনি থাকতে পারেন, তবে কথা দিতে পারছেন না যে অক্টোবরের পরে আর থাকতে পারবেন কি না। কারণ এর মধ্যে তিনি যদি স্থায়ী পদের নিশ্চয়তা না পান তাহলে তাকে অন্য জায়গায় চাকরি খুঁজতে হবে। ১ মে ১৯২৩ তারিখে লেখা চিঠিটির মূল অংশ ছিল নিম্নরূপ:

 

I have received your letter of April 27. You have asked me to state the terms on which I shall be willing to stay on in Dacca. May I reiterate once more that the decision of the Ex. Council has been quite unjust in my case. I am not asking for fresh terms. I shall be satisfied if the Executive Council recognizes that my original term of appointment is of a permanent nature and as such cannot be said to have terminated after two years. I don't know whether the other Readers are all in positions similar to mine. But as for myself I think I am asking only what has been originally offered to me and nothing more.

          I shall be in Dacca after the vacation and shall stay on pending the decision of the Executive Council. But I am afraid I can't give any undertaking to serve till 8th October. If the University authorities persist in their unjust decision, I shall have to seek for job elsewhere.

 

সত্যেন বসুর ব্যাপারটি আলাদাভাবে বিবেচনা করার জন্য একটি কমিটি করা হলো - 'বোস কমিটি'। কমিটির সদস্যরা হলেন ভিসি হার্টগ, রসায়নের অধ্যাপক জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, ব্যারিস্টার পি কে ঘোষ, এবং প্রফেসর জেনকিন্‌স। কমিটি সত্যেন বসুকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু সত্যেন বসু তাঁর সিদ্ধান্তে অনড়। কমিটির সদস্য জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ তাঁর প্রেসিডেন্সি কলেজের বন্ধু। ইওরোপ থেকে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন। এক পর্যায়ে কমিটির কাছে সত্যেন বসু প্রস্তাব দিলেন তাঁকে যেন দুবছরের জন্য শিক্ষা-ছুটি দেয়া হয়। কমিটি অনেকদিন ধরে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারছিল না। কিছুটা বিরক্ত হয়ে ১৯২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রারের কাছে একটি চিঠি পাঠালেন। তিনি লিখলেন, "ছুটির পর আমি কাজে যোগদান করেছি। আমাকে বলা হয়েছিল যে নির্বাহী পরিষদ যত শীঘ্র সম্ভব একটা সিদ্ধান্ত জানাবেন আমাকে। কিন্তু প্রায় তিন মাস হয়ে গেলো, এখনো কোন সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি আমাকে।"

          অবশেষে আরো তিন মাস পর ১৯২৪ সালের ২ মার্চ বোস কমিটি একটি সিদ্ধান্তে আসতে সমর্থ হলো। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে (১) সত্যেন বসু ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের রিডার পদে যে বেতন স্কেল শুরু থেকে দেয়ার কথা ছিল সেই বেতন স্কেলে কাজ করতে থাকবেন। (২) ১৯২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শুরু থেকে তাঁকে দু'বছরের শিক্ষাছুটি মঞ্জুর করা হবে। (৩) তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অগ্রিম বেতন বাবদ ১৩,৮০০ রুপি দেয়া হবে।

          এই সিদ্ধান্তে সত্যেন বসু কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেলেন। তিনি দু'বছরের জন্য ইওরোপে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন।

          ১৯২৩ সালের ১২ এপ্রিল রেজিস্ট্রারের চিঠি পাওয়ার পর থেকে ১৯২৪ সালের ২ মার্চ বোস কমিটির সিদ্ধান্ত জানা পর্যন্ত এই প্রায় এক বছর সময় সত্যেন বসুর মনের ওপর কত বড় চাপ গিয়েছে তা আমরা বুঝতে পারছি। চাকরি নিয়ে যেখানে টানাটানি হয় সেখানে মানুষ কি স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে? তাও যদি হয় গবেষণার কাজ? অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে সত্যেন বসুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র - যেখান থেকে সৃষ্টি হয়েছে বোসন কণার ধারণা - সেই গবেষণাপত্রগুলো লেখা হয়েছিল এই অস্থির সময়ে। কাজের বেলায় কী রকমের নিষ্ঠাবান ছিলেন সত্যেন বসু তা এখান থেকে বোঝা যায়।

          মাস্টার্সের ক্লাসে থার্মোডায়নামিক্স আর ম্যাক্সওয়েলের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক থিওরি পড়াতেন সত্যেন বসু। কোয়ান্টাম থিওরি এবং থিওরি অব রিলেটিভিটিও পড়ছিলেন গভীরভাবে। ইওরোপে পদার্থবিজ্ঞানের এই নতুন তত্ত্বগুলো ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দেবেন্দ্রমোহন বসু জার্মানি থেকে আসার সময় ম্যাক্স প্ল্যাংকের মূল বই নিয়ে এসেছিলেন। জার্মান ভাষায় লেখা সে বই পড়ার জন্য জার্মান ভাষা শিখেছিলেন সত্যেন বসু। ১৯০০ সালে ম্যাক্স প্ল্যাংকের হাতে সৃষ্টি হয় প্ল্যাংকের ধ্রুবক h যা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মূল চাবিকাঠি। ম্যাক্স প্ল্যাংক সূচনা করেন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের শক্তি ও কম্পাঙ্কের মধ্যে সম্পর্ক , যেখান থেকে আমরা জেনেছি, যে তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের কম্পাঙ্ক যত বেশি তার শক্তি তত বেশি। আবার যার কম্পাঙ্ক যত বেশি - তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য তত কম। সত্যেন বসু প্ল্যাংকের কৃষ্ণবস্তুতে শক্তির বিকিরণ সংক্রান্ত পেপারটি গভীর মনযোগ দিয়ে পড়লেন। সেখানে প্ল্যাংকের ধ্রুবকের মান যেভাবে বের করা হয়েছে - সত্যেন বসু তার সাথে একমত হতে পারছিলেন না।

          এমন সময় ১৯২৪ সালের শুরুতে মেঘনাদ সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন। বহুদিন পর দুই বন্ধুতে দেখা হলো আবার। সত্যেন বসু কলকাতায় থাকতেই মেঘনাদ সাহা ইওরোপে গিয়েছিলেন শিক্ষাভ্রমণে। সেখান থেকে ফিরে এসে ১৯২১ সালের নভেম্বরে যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে 'খয়রা প্রফেসর' পদে যোগ দিয়েছেন, সত্যেন বসু তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯২৩ সালে মেঘনাদ সাহা চলে গেছেন এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটিতে। সেখান থেকে এতদিন পর ঢাকায় এসে দেখা করলেন সত্যেন বসুর সাথে। পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণার সব খবর রাখেন মেঘনাদ সাহা। দুই বন্ধু ও সহকর্মীর মধ্যে আলোচনা হলো কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সাম্প্রতিকতম পেপার নিয়ে।

          মেঘনাদ সত্যেন বসুকে ১৯২৩ সালে প্রকাশিত উলফ্‌গং পাউলি[6], এবং আইনস্টাইন ও পল ইরেনফেস্টের[7] গবেষণাপত্রের কথা বললেন। এই পেপার দুটোর কপিও তিনি সত্যেন বসুকে দিয়ে আসেন। পাউলির পেপারে কিছু অদ্ভুত ব্যাপার আছে বলে উল্লেখ করেন মেঘনাদ সাহা।

          সত্যেন বসু গভীর মনযোগ দিয়ে পেপারগুলো পড়লেন। তারপর নিজের গাণিতিক দক্ষতা ও পদার্থবিজ্ঞানের বোধ প্রয়োগ করে দ্রুত লিখে ফেললেন একটি গবেষণাপত্র 'Planck's Law and the Light-Quantum Hypothesis'। এই গবেষণাপত্রটি তিনি প্রকাশ করার জন্য পাঠিয়ে দিলেন লন্ডনের ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে। ঐ পেপারটি পাঠিয়ে দিয়েই তিনি কয়েক দিনের মধ্যে আরেকটি পেপার 'Thermal Equilibrium in the Radiation Field in the Presence of Matter' লিখে ফেললেন। পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাস রচিত হলো।

 

চিত্র: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যেন বসু ও মেঘনাদ সাহা (১৯২৪)



[1] সত্যেন্দ্রনাথ বসু, আমার বিজ্ঞানচর্চার পুরাখন্ড, সাপ্তাহিক বসুমতী (শারদীয়), ১৩৭৪। বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত 'সত্যেন্দ্রনাথ বসু রচনা সংকলন'-এ পৃষ্ঠা ২৩৮।

[2]  সরদার ফজলুল করিম, ঠিক এইখানে, টাপুর টুপুর ১৯৭০।

[3] Banglapedia, National Encyclopedia of Bangladesh. Online. Last Modified 12 August 2014. Accessed 1 Jan 2019

[4] ড. কাজী মোতাহার হোসেন, বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বোসকে যেমন দেখেছি, ত্রৈমাসিক লোকসাহিত্য পত্রিকা, ১৯৮৫। সত্যেন্দ্রনাথ বসু স্মারকগ্রন্থে পুনপ্রকাশিত। পৃষ্ঠা ৩৯।

[5] রমেশচন্দ্র মজুমদার, জীবনের স্মৃতিদীপে, জেনারেল প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৭৮।

[6] W Pauli, Über die Gesetzmäßigkeiten des anomalen Zeemaneffektes

 (About the regularities of the anomalous Zeeman effect), Zeitschrift f’ür Physik 16, 155 (1923).

[7] A. Einstein and P. Ehrenfest, On the Quantum Theroy of the Radiative Equilibrium, Zeitschrift f’ür Physik 19, 301 (1923).

অষ্টম অধ্যায়

ষষ্ঠ অধ্যায়

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Hendrik Lorentz: Einstein's Mentor

  Speaking about Professor Hendrik Lorentz, Einstein unhesitatingly said, "He meant more to me personally than anybody else I have met ...

Popular Posts