Monday 4 November 2019

পৃথিবী সূর্যের তৃতীয় গ্রহ - পর্ব ১৬


জলবায়ুর পরিবর্তন

পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন হতে শুরু করেছে পৃথিবীর জন্মের পর থেকেই। শুরুতে প্রচন্ড উত্তপ্ত সাংঘাতিক ভয়ঙ্কর পরিবেশ ছিল পৃথিবীতে। তারপর পৃথিবী আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয়েছে। পৃথিবীর এখন গড় তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস - যা প্রাণ ধারণের জন্য উপযোগী।
            সূর্যের তাপ আমাদের জলবায়ুর উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। পৃথিবীর অক্ষ - উত্তর মেরু থেকে প্রায় সাড়ে তেইশ ডিগ্রি কোণে ডানদিকে হেলে আছে। এই হেলে থাকার কারণে পৃথিবী যখন সূর্যের চারপাশে বছরে একবার করে ঘুরে - তখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ওপর বছরের একেক সময়ে একেক রকমের সূর্যালোক ও তাপ পড়ে। এর প্রভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে একেক রকমের ঋতু আসে। যেমন ডিসেম্বরে বাংলাদেশে আমরা যখন একটা সোয়েটার পরেই শীতকাল কাটিয়ে দিতে পারি - কানাডা বা আমেরিকাতে তখন প্রচন্ড বরফ পড়ে। আবার অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকায় তখন প্রচন্ড গ্রীষ্মকাল।
            পৃথিবীর জলবায়ুর ওপর সমুদ্র ও বায়ুমন্ডলের ব্যাপক প্রভাব আছে। সমুদ্র সূর্যের তাপ শোষণ করে এবং সমুদ্রের স্রোত সেই তাপ প্রবাহিত করে। সে কারণে ইউরোপের শীত তুলনামূলকভাবে কানাডার শীতের চেয়ে কম। সমুদ্র থেকে দূরে যারা থাকে সেখানে অনেক বেশি গরম বা উগ্র আবহাওয়া। যে কোন মরুভূমিতে তাই গরমও বেশি - ঠান্ডাও বেশি।
            পৃথিবীর সমুদ্র ও মাটি সূর্যের তাপ শোষণ করলেও অনেক তাপ ফিরে যায় মহাকাশে। কিন্তু পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের গ্যাস এই তাপকে আটকে রাখে। এটা আমাদের পৃথিবীকে গরম করে দিচ্ছে বলে আমরা এখন ভয় পাচ্ছি। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণতার কথা খুব শোনা যাচ্ছে এখন। আবার এটা না থাকলে পৃথিবী কিন্তু খুবই ঠান্ডা হয়ে যেতো। তখন পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা হতো মাইনাস ১৫ ডিগ্রি। বরফে ছেয়ে যেতো পুরো পৃথিবী। তখন মানুষ বেঁচে থাকতো কীভাবে সেখানে? সে যাই হোক - আমাদের প্রকৃতি নিরবে অনেক আমাদের রক্ষা করে চলেছে বিরাট প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে।




পৃথিবীর জলবায়ু ক্রমশ পরিবর্তিত হলেও পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বছরের নির্দিষ্ট সময়ে জলবায়ু প্রধানত একই রকম ভাবে পরিবর্তিত হয়। যেমন বাংলাদেশে ডিসেম্বরে শীত কিন্তু একই সময়ে দক্ষিণ গোলার্ধে অস্ট্রেলিয়ায় তখন গ্রীষ্মকাল। মার্চ মাসে উত্তর গোলার্ধে বসন্তকাল, দক্ষিণ গোলার্ধে তখন শরৎকাল। জুন মাসে উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল, দক্ষিণ গোলার্ধে শীতকাল। সেপ্টেম্বরে উত্তর গোলার্ধে শরৎকাল, দক্ষিণ গোলার্ধে বসন্তকাল।
            জলবায়ুর তীব্রতা, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ইত্যাদি প্রকৃতিভেদে পৃথিবীকে নয়টি জলবায়ু অঞ্চলে ভাগ করা যায়।
            (১) মেরু বা তুন্দ্রা অঞ্চল (Tundra), (২) তুষার পাহাড় (Boreal forest), (৩) নাতিশীতোষ্ণ বনাঞ্চল (Temperate forest), (৪) তৃণভূমি (Grassland), (৫) ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল (Mediterranean),  (৬) মরুভূমি (Desert), (৭) উষ্ণ মৌসুমী অঞ্চল (Tropical seasonal), (৮) উষ্ণ তৃণভূমি (Tropical grassland), এবং (৯) উষ্ণ অরণ্যাঞ্চল (Tropical rainforrest)।




তুন্দ্রা অঞ্চল: এখানে জলবায়ু খুবই ঠান্ডা ও শুষ্ক। শীতকাল এখানে অতি দীর্ঘ এবং সেই সময় সূর্যের আলো একেবারে থাকেই না বলা চলে। এই অঞ্চলে তাপমাত্রা প্রায় সারাবছরই শূন্য ডিগ্রির নিচে থাকে। ফলে এখানে গাছপালা খুব একটা জন্মায় না।




তুষার পাহাড় : বরফাচ্ছাদিত পাহাড়ি অঞ্চল। তুন্দ্রা অঞ্চলের সামান্য দক্ষিণ থেকে শুরু করে উত্তর কানাডা, স্ক্যানডিন্যাভিয়া এবং রাশিয়ার অনেক জায়গায় এরকম অঞ্চল আছে। এই অঞ্চলের তাপমাত্রা বছরে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে শূন্য ডিগ্রির নিচে থাকে।





নাতিশীতোষ্ণ বনাঞ্চল: এই অঞ্চলে শীতকালে ঠান্ডা আর গরমকালে গরম। সারা বছরই এখানে হয় বৃষ্টি নয়তো তুষারপাত হয়। ফলে পানির কোন অভাব হয় না। প্রচুর গাছপালা জন্মে। শীতকালে অনেক গাছের পাতা ঝরে যায়।



তৃণভূমি: আবহাওয়া পরিবর্তনের তীব্রতা খুব বেশি এই অঞ্চলে। গরমকালে খুবই গরম, ঠান্ডা শীতকাল কিন্তু বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুবই কম। এখানে গাছপালা খুব একটা জন্মায় না। লাগালেও বাঁচে না। তবে প্রচুর ঘাস জন্মে এই অঞ্চলে।

ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল: এই অঞ্চলের আবহাওয়া খুব শুষ্ক। শীতকালে সামান্য বৃষ্টি হয়। কিন্তু গরমকালে প্রচন্ড গরম পড়ে। ভূমধ্যসাগরের সীমান্তবর্তী অঞ্চল, অস্ট্রেলিয়া ও ক্যালিফোর্নিয়ার বেশ কয়েকটি অঞ্চল গড়ে ওঠেছে এরকম।


মরুভূমি: মরুভূমিতে প্রায় সারাবছরই তপ্ত ও শুষ্ক আবহাওয়া। সারাবছরে ২৫ সেন্টিমিটার বৃষ্টিও হয় না সেখানে। সমুদ্র থেকে অনেক দূরে এই অঞ্চল। সাধারণত মহাদেশের মাঝখানে হয় মরুভূমির অবস্থান। পৃথিবীতে বেশ কিছু মরুভূমি আছে। সাহারার পর অস্ট্রেলিয়া পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মরুভূমি।



উষ্ণ মৌসুমী অঞ্চল: এই অঞ্চলের আবহাওয়া বেশ গরম। বাতাসের আর্দ্রতা অনেক বেশি। বৃষ্টিপাত হয় প্রচুর। গাছপালা খুব সবুজ হয়ে উঠে যখন বৃষ্টিপাতের মৌসুম চলে। তাপমাত্রা ২৭ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে। মেক্সিকো ও বলিভিয়ার এরকম সবচেয়ে বড় উষ্ণ মৌসুমী অঞ্চল আছে।

উষ্ণ তৃণভূমি: মরুভূমির অঞ্চল যেখানে সারাবছর প্রচন্ড গরম কিন্তু মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়। ফলে বেশ ঘাস জন্মায়। আফ্রিকায় এরকম অঞ্চল প্রচুর দেখা যায়।



উষ্ণ বনাঞ্চল: বিষুবীয় অঞ্চলে উষ্ণ বনাঞ্চল গড়ে ওঠে। সারাবছরই এখানে আবহাওয়া গরম থাকে এবং বৃষ্টিও হয় সারাবছর। তাপমাত্রা ২৭ - ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামে না কখনো। এখানে গভীর বনাঞ্চল গড়ে ওঠে। গাছগুলো প্রচন্ড গরমে বেঁচে থাকতে পারে।




No comments:

Post a Comment

Latest Post

The World of Einstein - Part 2

  ** On March 14, 1955, Einstein celebrated his seventy-sixth birthday. His friends wanted to organize a grand celebration, but Einstein was...

Popular Posts