Monday, 4 November 2019

পৃথিবী সূর্যের তৃতীয় গ্রহ - পর্ব ৭


পৃথিবীর আকাশ নীল

সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে সামনের অথৈ পানির দিকে তাকালে মনে হয় অনেক দূরে আকাশ আর সমুদ্র মিশে গেছে। মনে হয় আকাশ নেমে এসেছে সমুদ্রের পানিতে। আমাদের ছাদ থেকে আকাশের দিকে তাকালেও মনে হয় আকাশের কিনারা নেমে এসেছে আমাদের কলোনির শেষ সীমানায়। এর কারণ কী? যতদূরই যাই আকাশের দূরত্ব কিন্তু কমে না। এর কারণ কী? আকাশ বলে আমরা যেটাকে জানি - সেটা আসলে কী? আকাশ হলো আমাদের দৃষ্টির সীমা। যেটুকু আমরা দেখতে পাই। কিন্তু কেন নীল দেখি দিনের বেলায়? সেটা হয় সূর্যের আলো আর পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের কারণে। সূর্যের আলোতে আমরা যেসব রঙ দেখতে পাই সবগুলো রঙই মিলেমিশে আছে।  পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের ভেতর দিয়ে যাবার সময় সূর্যের আলো বিভিন্ন রঙের তরঙ্গে আলাদা হয়ে যায়। নীল রঙের তরঙ্গ বায়ুমন্ডলের সূক্ষ্ম ধূলিকণায় প্রতিফলিত হয়ে সব জায়গায় ছড়িয়ে যায়। যত পরিষ্কার বাতাসই হোক সেখানে খুবই ছোট ছোট ধুলিকণা আছে যেগুলো খালি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু আলোর তরঙ্গের আকার ওই ধুলিকণার চেয়েও ছোট। তাই তারা ধুলিকণার গায়ে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ে চারদিকে নীল রঙে ভরে যায়। তাই আকাশ নীল দেখি।



পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের বাইরে গেলে আকাশ আর নীল থাকবে না। কারণ তখন সূর্যের আলো প্রতিফলিত হতে পারবে না কোথাও। আর রাতের বেলায় সূর্যের আলো নেই বলে কোন রঙই নেই। আর কালো রঙ মানে হলো - কোন রঙ নেই।
            পৃথিবীর বায়ুমন্ডল কীভাবে হলো জানলাম। নীল আকাশ কোথায় পেলাম তা জানলাম। এবার দেখা যাক পৃথিবীতে এত পানি কোত্থেকে এলো।  



পানি এলো কোথা থেকে?

প্রচন্ড জোরে বৃষ্টির সময় আমরা মাঝে মাঝে কাব্য করে বলি 'আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছে'। সত্যিই কি আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ে? আকাশের মেঘ থেকে বৃষ্টি হয়। তবে মেঘ তো সৃষ্টি হয় পৃথিবী থেকে সূর্যের তাপে যে পানি বাষ্প হয়ে যাচ্ছে তা জমে গিয়ে। শুধুমাত্র মেঘ থেকে বৃষ্টি হয়ে এত বড় বড় সাগর মহাসাগর সৃষ্টি হয়ে গেছে? কিন্তু বৃষ্টি হবার জন্য যে মেঘ দরকার সেই মেঘ হবার জন্য তো সাগরে পানির দরকার - শুরুতে তা এসেছিলো কোত্থেকে?
            পৃথিবীর মোট ক্ষেত্রফলের সত্তর ভাগ দখল করে আছে পানি। পৃথিবীর সব পানিকে এক জায়গায় জড়ো করে একটা বলের মধ্যে রাখলে বলটির আয়তন হবে চাঁদের আয়তনের অর্ধেক। ব্যাস হবে ১৩৮৫ কিলোমিটার। এখন প্রশ্ন হলো এত পানি কোত্থেকে এলো পৃথিবীতে?
            পৃথিবীর শৈশবে[1] অর্থাৎ পৃথিবীর বয়স যখন দশ বা বিশ কোটি বছর তখন পৃথিবীজুড়ে প্রচুর আগ্নেয়গিরির উদ্‌গীরণ ঘটছিল। সেখান থেকে  নাইট্রোজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড ক্রমশ যোগ হচ্ছিলো নতুন পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে। তখন কিন্তু সত্যিই মহাকাশ থেকে পানি এসে পড়েছিলো পৃথিবীর ওপর। মহাকাশ থকে বরফ-ঠান্ডা ধূমকেতুগুলো এসে আছড়ে পড়ছিলো পৃথিবীর বুকে। ওগুলো এত বেশি পরিমাণে পড়েছে যে পৃথিবীর বুকে সমুদ্র হয়ে গেছে। সৌরজগতের বাইরের বলয়ে কুইপার বেল্টে যেসব ধুমকেতু এবং অন্যান্য গ্রহাণু আছে (প্লুটোও তাদের একটি) সেগুলোতে যে পানি আছে তার প্রমাণ পেয়েছেন পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা।




পৃথিবী সূর্যের উপাদান থেকে তৈরি এবং জন্ম থেকেই প্রচন্ড বেগে ঘুরছে সূর্যের চারপাশে এবং নিজের অক্ষের ওপর। শুরুতে পৃথিবীর তাপমাত্রা যত বেশি ছিল ঘূর্ণনের বেগও ছিল তত বেশি। পৃথিবী তখন নিজের অক্ষের ওপর প্রায় পনেরো ঘন্টায় একবার ঘুরতো। তার মানে তখন পৃথিবীতে ১৫ ঘন্টায় এক দিন হতো। তাপমাত্রা কমতে শুরু করলো বাইরের দিক থেকে। বাইরের দিকটা ঠান্ডা হতে হতে শক্ত হতে শুরু করলো। ভারী পদার্থগুলো ভেতরের দিকে চলে গেলো - ভেতর থেকে গরম বাতাস ও জলীয় বাষ্প বাইরের দিকে চলে আসতে শুরু করলো। এভাবে পৃথিবীর ভেতর থেকে জলীয় বাষ্প বেরিয়ে এসেও পৃথিবীর পিঠে প্রচুর পানি জমা হলো। পৃথিবীর বাইরে থেকে ধুমকেতুর মাধ্যমে আসা পানি এবং পৃথিবীর গায়ের ভেতর থেকে পিঠে বেরিয়ে আসা পানি মিলে পৃথিবীতে এত পানি হয়ে গেলো।
            আগেই বলেছি পৃথিবী ঠান্ডা হতে হতে পৃথিবীর কেন্দ্রে একটা বিশাল আকৃতির শক্ত লোহার গোলক তৈরি হয়েছে। এবার দেখা যাক পৃথিবীর ভেতরটা কী রকম। কী কী আছে সেখানে এবং কীভাবে তা তৈরি হলো।



[1] পৃথিবীর বর্তমান বয়স সাড়ে চারশ' কোটি বছর। বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখেছেন পৃথিবী আরো সাড়ে চারশ' কোটি বছর টিকে থাকবে। সে হিসেবে ৯০০ কোটি বছর হবে পৃথিবীর পুরো জীবন। মানুষের বয়সের সাথে তুলনা করলে মোটামুটি মানুষের এক বছর সমান পৃথিবীর ১০ কোটি বছর। 

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Fusion Energy: Present and Future

  What is the source of energy of this vast, dynamic universe in which such enormous activity is taking place — billions of galaxies racing ...

Popular Posts