Monday 4 November 2019

পৃথিবী সূর্যের তৃতীয় গ্রহ - পর্ব ১২


প্রাণের কথা

মহাবিশ্বে আমাদের পৃথিবীই একমাত্র গ্রহ যেখানে প্রাণের উদ্ভব হয়েছে এবং সেই প্রাণ শুধু টিকে আছে তা নয় বরং নানা বৈচিত্র্যে ভরপুর হয়ে দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। পৃথিবীতে ঠিক কোন্‌ দিন থেকে এবং কীভাবে প্রাণের উদ্ভব হয়েছে তা এখনো একেবারে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে প্রাকৃতিক উপাদান বিশ্লেষণ করে এবং বিভিন্ন সময়ে প্রাপ্ত জীবাশ্মের বয়স হিসেব করে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভবের একটা আনুমানিক সময় বের করেছেন। প্রায় সাড়ে তিনশ' কোটি বছর আগে এককোষী ব্যাকটেরিয়ার উদ্ভব হবার প্রমাণ বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন।
            সাড়ে তিনশ' কোটি বছর আগে পৃথিবীর বাতাসে কোন অক্সিজেন ছিল না। পৃথিবীর বাতাসে অক্সিজেন যোগ হতে শুরু করে যখন থেকে সালোক সংশ্লেষণ শুরু হয়। সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এককোষী প্রাণী সায়ানোব্যাকটেরিয়া[1]থেকে। তা থেকে বোঝা যাচ্ছে পৃথিবীর আদি-প্রাণ শুরু হয়েছিল অক্সিজেন ছাড়াই।
            প্রাণ ধারণের প্রধান উপাদান অ্যামিনো অ্যাসিড। সাড়ে তিন শ" কোটি বছর আগে পৃথিবীর বাতাসে ছিল মিথেন, অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন আর জলীয় বাষ্প। আমেরিকান রসায়নবিদ স্ট্যানলি মিলার ও হ্যারোল্ড উরেই পৃথিবীর সেই প্রাথমিক পরিবেশে প্রাণের উদ্ভব কীভাবে হয়েছিল তা দেখার জন্য ১৯৫২ সালে একটা পরীক্ষা করেন। তাঁরা একটা বায়ুনিরোধী পাত্রে এসব গ্যাস নিয়ে তার ভেতর বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ প্রবেশ করান এক সপ্তাহ ধরে। আদি পৃথিবীতে প্রচুর বজ্রপাত হতো। বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ হলো সেই সময়ের বজ্রপাতের বিকল্প। মিলার ও উরেই এক সপ্তাহ পরে পাত্রের দেয়ালে লালচে-বাদামি বস্তুর একটা আস্তরণ দেখতে পান। তাঁরা পরীক্ষা করে দেখেছেন সেই বাদামি বস্তুতে ১১ থেকে ২০টি অ্যামিনো এসিড আছে - যা জীবকোষের মৌলিক উপাদান। তার মানে দাঁড়ালো এই যে প্রাকৃতিকভাবে সংঘটিত অসংখ্য রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে জীবনের উপাদান সৃষ্টি হয়েছে এবং সেখান থেকে প্রাকৃতিক ভাবেই প্রাণের উদ্ভব হয়েছে।
            মিলার ও উরেই'র পর অনেক বিজ্ঞানী এই পরীক্ষা করে দেখেন বিভিন্ন গবেষণাগারে। সবাই একই রকমের ফলাফল পেয়েছেন। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন যে আদি পৃথিবীতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন ও জলীয় বাষ্প ছিল।
আধুনিক পরীক্ষণের মাধ্যমে এই গ্যাসগুলো নিয়ে পৃথিবীর প্রাথমিক অবস্থা তৈরি করে সেখানেও বিজ্ঞানীরা অ্যামিনো এসিড তৈরি করতে পেরেছেন। 
            ইতোমধ্যে ১৯৭৯ সালে সমুদ্রের গভীরে ডুবন্ত আগ্নেয়গিরির ছিদ্র থেকে বেরিয়ে আসা গরম কালো ধোঁয়ার মতো লাভা মিশ্রিত পানি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন সেখানে হাইড্রোজেন সালফাইডসহ আরো অনেক খনিজ পদার্থের মিশ্রণ আছে যা পৃথিবীর গভীর স্তর থেকে বেরিয়ে আসছে আগ্নেয়গিরির ফাটলের মধ্য দিয়ে। এই পানির তাপমাত্রা ৩০০ ডিগ্রির বেশি। অত গভীরতায় চাপ বেশি বলে পানি টগবগ করে ফুটছে না, কিন্তু প্রচন্ড গরম। আশ্চর্যের বিষয় হলো এই প্রচন্ড উত্তপ্ত সালফার মিশ্রিত অন্ধকার (এত গভীরে সূর্যের আলো ঢুকতে পারে না) বিষাক্ত পরিবেশে দিব্যি বেঁচে আছে লক্ষ লক্ষ ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো খেয়ে বেঁচে আছে আরো অনেক প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী যাদের মধ্যে আছে কাঁকড়া, নলাকৃতি কীট, এবং অনেক প্রজাতির ছোট ছোট মাছ।
            এ থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন যে আদি প্রাণের উৎপত্তি সমুদ্রের গভীরেও হতে পারে। পৃথিবীতে পানি এসেছে প্রাণের উদ্ভবের অনেক আগে, কিন্তু সেই পানিতে যৌগ অবস্থায় অক্সিজেন থাকলেও বাতাসে মুক্ত অক্সিজেন ছিল না।  সমুদ্রের গভীরে খুবই অস্থির বিশৃঙ্খলার মধ্যে এককোষী ব্যাকটেরিয়ার উৎপত্তি হয়েছে। সেই ব্যাকটেরিয়াগুলো দ্রুত বেড়ে সমুদ্রে প্রচুর শৈবালের সৃষ্টি করে।




            সাড়ে তিনশ' কোটি বছর আগে এককোষী প্রাণী সায়ানোব্যাকটেরিয়া (cyanobacteria) বা শৈবালগুলো সমুদ্রের উপরিভাগে সূর্যালোকের কাছে চলে আসে। সূর্যের আলোর সাথে সালোক-সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় তারা বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে অক্সিজেন ত্যাগ করতে শুরু করে। পৃথিবীর সমুদ্রে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়তে শুরু করলো। সেখানে লোহার উপাদানের সাথে অক্সিজেন মিশে লোহার অণুতে মরিচা পড়তে শুরু করে। গঠিত হতে থাকে ব্যান্ডেড আয়রনের স্তর। এভাবে সমুদ্রের অক্সিজেন সবগুলো লোহার পরমাণু শেষ করে ফেলার পর অতিরিক্ত অক্সিজেন বাতাসে ছাড়তে শুরু করে। বাতাসে মুক্ত অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়তে শুরু করে। ২৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর বাতাসে প্রচুর অক্সিজেন তৈরি হয়ে যায়।
            বাতাসে অক্সিজেন আসার পর জীববৈচিত্র্যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। সামুদ্রিক শৈবাল, সামুদ্রিক উদ্ভিদ, সামুদ্রিক প্রাণির বেশ কয়েকটা প্রজাতি আস্তে আস্তে বিবর্তিত হতে হতে ডাঙায় উঠে আসে। সাড়ে তিন শ' কোটি বছর আগে শুরু হওয়া সেই প্রক্রিয়া এখনো চলমান।
            শুধুমাত্র পৃথিবীতেই প্রাণ টিকে থাকতে পারে। এখানকার গড় তাপমাত্রা এমন যে তা খুব গরমও নয়, খুব ঠান্ডাও নয়। একটা চমৎকার ভারসাম্য আছে এখানে। শত কোটি বছর ধরে এই ভারসাম্য বজায় রয়েছে। সুর্যের তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু ভারসাম্য বজায় থাকার কারণ হলো প্রাণ। প্রাণের কারণেই পৃথিবীর বায়ুমন্ডল সূর্যের প্রভাবে এলোমেলো হয়ে যায়নি এখনো। ব্যাকটেরিয়া, শৈবাল, গাছপালা ইত্যাদি কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে আর অক্সিজেন দেয় বাতাসে। বেশিরভাগ প্রাণী অক্সিজেন গ্রহণ করে আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা পৃথিবীর প্রাণের বিস্তারের একটা প্রধান শর্ত।
            নিচের ছবিটি স্যাটেলাইট থেকে তোলা পৃথিবীর ক্লোরোফিল সেন্সর যা শৈবাল ও উদ্ভিদে ভরা পৃথিবীতে প্রাণের চিহ্ন দেখাচ্ছে।


            পৃথিবীতে প্রাণের বিস্তারের একটা মোটামুটি সময়চিত্র এখন আমাদের আছে। পৃথিবী গঠিত হবার সময় থেকে বর্তমান সময় - এই সাড়ে চারশো কোটি বছরকে চারটি প্রধান সময়কালে ভাগ করা হয়।  

·         প্রি-ক্যামব্রিয়ান যুগ (Precambrian): পৃথিবীর জন্ম থেকে শুরু করে ৫৪ কোটি বছর আগপর্যন্ত।
·         প্যালেওজোইক যুগ (Paleozoic): এটাকে পুরনো যুগ বলা হয়। এখন থেকে ২৫ কোটি বছর আগে থেকে ৫৪ কোটি বছরের আগপর্যন্ত সময়।
·         মেসোজোইক যুগ (Mesozoic): এটাকে সরিসৃপ যুগ বলা হয়। সাড়ে ছয় কোটি বছর থেকে শুরু করে ২৫ কোটি বছরের আগপর্যন্ত সময়।
·         সেনোজোইক যুগ (Cenozoic): এটাকে নতুন যুগ বা স্তন্যপায়ীদের যুগও বলা হয়। বর্তমান সময় থেকে শুরু করে সাড়ে ছয় কোটি বছরের আগপর্যন্ত সময়।

প্রি-ক্যামব্রিয়ান যুগপৃথিবী গঠিত হবার পর প্রায় চারশ' কোটি বছরে পৃথিবীতে ব্যাপক ভৌগোলিক পরিবর্তন হয়েছে। সাড়ে তিনশ' কোটি বছর আগে পৃথিবীতে জীবনের চিহ্ন এসেছে। প্রায় আড়াই শ' কোটি বছর আগে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে অক্সিজেন যোগ হয়েছে। পরের দুইশ' কোটি বছরে পৃথিবীতে নিম্নশ্রেণির উদ্ভিদ এবং অমেরুদন্ডী প্রাণীর বিস্তার ঘটেছে।

প্যালেওজোইক যুগ: ভূমিতে উদ্ভিদের বিস্তার ঘটেছে। উভচর প্রাণির উদ্ভব হয়েছে। সরিসৃপ এসেছে এই যুগে। কিন্তু আটাশ কোটি বছর আগে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে অনেক প্রজাতির প্রাণি ও উদ্ভিদ বিলুপ্ত হয়ে যায়। প্রচুর মরা উদ্ভিদ ও প্রাণি আস্তে আস্তে পৃথিবীর নিচের দিকের স্তরে চলে যায়। সেখানে কোটি বছরের ক্রমাগত চাপের ফলে সেগুলো থেকে তৈরি হয়েছে কয়লা, গ্যাস, তেল ইত্যাদি জীবাশ্ম জ্বালানি।

মেসোজোইক যুগ: এই যুগে প্রায় বিশ কোটি বছর সময়ের মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির বিরাটকায় ডায়নোসরের আবির্ভাব ঘটে। এক ধরনের ডায়নোসর বিবর্তিত হয়ে পাখিতে পরিণত হয়। বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বিস্তার ঘটে। কিছু কিছু উদ্ভিদে ফুল ফোটা শুরু হয়। সপুষ্পক উদ্ভিদের বিস্তার ঘটে। এই যুগের শেষে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ডায়নোসররা বিলুপ্ত হয়ে যায়। ডায়নোসর কেন বিলুপ্ত হলো সে সম্পর্কে একটু পরে আবার বলবো।

সেনোজোইক যুগ: এই যুগে আমরা যেসব প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী দেখতে পাই - তাদের উৎপত্তি হয়েছে। এই যুগে পৃথিবীতে মানুষ আস্তে আস্তে 'হোমো সেপিয়ানস' বা 'জ্ঞানী ব্যক্তি'তে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীতে বর্তমান প্রজাতির মানুষের বয়স দুই লক্ষ বছরের কাছাকাছি।
           
পৃথিবীতে প্রাণের বিস্তারের কিছু প্রধান ঘটনা ও তাদের সময়কাল নিচের সারণিতে দেয়া হলো।

যুগ

সময়
উল্লেখযোগ্য ঘটনা

প্রি-ক্যামব্রিয়ান

৩৫০ কোটি বছর আগে

এককোষী জীবের উদ্ভব
২৫০ কোটি বছর আগে
বাতাসে অক্সিজেন
৭০ কোটি বছর আগে
সরল বহুকোষী জীবের উদ্ভব




প্যালেওজোইক

৪২ কোটি বছর আগে

স্থলভূমিতে উদ্ভিদের বিস্তার শুরু
৩৭ কোটি বছর আগে
উভচর প্রাণির উদ্ভব
৩৬ কোটি বছর আগে
পতঙ্গের উদ্ভব
৩৪ কোটি বছর আগে
সরিসৃপের উদ্ভব
২৮ কোটি বছর আগে
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিপুল পরিমাণ প্রানী প্রাণ হারায়। অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়।




মেসোজোইক

২৩ কোটি বছর আগে

ডায়নোসর এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীর উদ্ভব।
১৯ কোটি বছর আগে
সরীসৃপ থেকে পাখির উদ্ভব।
১৪ কোটি বছর আগে
সপুষ্কক উদ্ভিদের আবির্ভাব।
৬ কোটি ৫০ লক্ষ বছর আগে
ডায়নোসর সহ অনেক প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের বিলুপ্তি।


সেনোজোইক

২৪ লক্ষ বছর আগে

বরফ যুগ
১৯ লক্ষ বছর আগে
হোমো ইরেকটাসের আবির্ভাব
২ লক্ষ বছর আগে
হোমো স্যাপিয়েন্‌স বা বুদ্ধিমান মানুষের উদ্ভব।



[1] নীল সবুজ সামুদ্রিক শৈবাল

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 6

  The habit of reading books was instilled in us from a young age, almost unknowingly. There was no specific encouragement or pressure for t...

Popular Posts