Sunday 16 May 2021

স্বপ্নলোকের চাবি - ২০

 


স্বপ্নলোকের চাবি – ২০

 

“কী খবর কুদ্দুস মিয়া?”

কুদ্দুসের এক চোখে মোটা ব্যান্ডেজ, অন্য চোখ আমার টেবিলে রাখা টেলিভিশনের দিকে। টেলিভিশন থেকে চোখ না ফিরিয়েই সে উত্তর দিলো, “জি বদ্দা ভালা।“

“ব্যাথা আছে এখনো?”

“আছে বদ্দা।“

চোখে-মাথায় ব্যাথা নিয়েও কুদ্দুস মনযোগ দিয়ে টেলিভিশন দেখছে। কী দেখছে সে-ই জানে। আউটডোর অ্যান্টেনা না থাকার কারণে টিভির পর্দায় লক্ষ লক্ষ ঝিরঝিরে আলোকবিন্দু উঠানামা করছে। কোন মুখই ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। শব্দ শুনে বুঝতে পারছি টিভিতে প্রেসিডেন্ট এরশাদের রাজকীয় কবিতার আসর বসেছে। বঙ্গভবন থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার করছে রাজকবিদের কবিতা। রাজার অনুগ্রহ পাবার জন্য অনেক বিখ্যাত কবিই এরশাদের ছাতার ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। সৈয়দ আলী আহসান এরশাদের কবিতার ভুয়সী প্রশংসা করে কবিতা পাঠের আসর সঞ্চালনা করছেন। অনেক নতুন নতুন প্রসাধনচর্চিত মুখ আবির্ভূত হচ্ছেন টিভির পর্দায়। দেশের সবগুলি সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় বক্স আইটেম করে ছাপানো হচ্ছে প্রেসিডেন্ট এরশাদের কবিতা। অনেক বিখ্যাত সুরকার এরশাদের কবিতায় সুর দিচ্ছেন, বিখ্যাত সংগীতশিল্পীরা সেই গান গেয়ে আরো বিখ্যাত হচ্ছেন। রাজার দাক্ষিণ্য পাবার আকাঙ্খা সেই প্রাচীন যুগ থেকেই ছিল। সেই যুগে তবুও কিছুটা চক্ষুলজ্জা ছিল, কিন্তু এখন তৈলমর্দনকারীদের মধ্যে নির্লজ্জতার প্রতিযোগিতা চলছে। কুদ্দুসের এসব বোঝার কথা নয়। যদি বুঝতো তাহলে এরশাদের উপর তার ক্ষোভ তৈরি হবার কথা। আজ সকালেই তাকে বন্দুকের বাঁট দিয়ে মেরে চোখ ফাটিয়ে দিয়েছে এরশাদের মিলিটারিরা। অথচ সন্ধ্যাবেলা সে হা করে এরশাদের কবিতা গিলছে।

১৯৮৮ শুরু হয়েছে জরুরি অবস্থার ভেতর। সাতাশির নভেম্বরের শেষে জরুরি অবস্থা জারি করার পর থেকে দেশের নাগরিকদের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার স্থগিত করা হয়েছে। অবশ্য জরুরি অবস্থা জারি না করলেও বন্দুকের নলের সামনে কোন্‌ নাগরিকের কী অধিকার আছে সেই প্রশ্ন তোলার সাহস তো কারো নেই। ‘সাপ্তাহিক রোববার’-এর এক সাংবাদিক খুব সামান্য একটা প্রশ্ন করেছিল একটি লেখায়। ম্যাগাজিনটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় যে বিদেশী সংবাদমাধ্যম সঠিক খবরাখবর জুগিয়েছিল – সেই বিবিসি’র বাংলাদেশী সংবাদদাতাদের ঘুম হারাম করে ফেলেছে মিলিটারি গোয়েন্দারা। আতাউস সামাদকে গ্রেফতার করার খবর তো তবু প্রচারিত হয়েছে। অন্য সংবাদদাতাদের কী অবস্থা হচ্ছে কেউ জানে না। বিবিসি সেই প্রশ্ন তোলার পর বাংলাদেশে বিবিসির কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। ১৯৮৬’র সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নিয়েছিল। বিএনপি অংশ নেয়নি সেই নির্বাচনে। কিন্তু বিএনপির অনেক নেতাই এরশাদের দলে ভীড়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সরকারের অংশ হয়েছে। নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ সংসদ বর্জন করেছে। এরশাদ এখন জরুরি অবস্থা দিয়ে জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করে দিয়েছে। নতুন নির্বাচন দেবে বলে শোনা যাচ্ছে। জরুরি অবস্থার ভেতর নির্বাচন যে কেমন হবে তা তো জানা কথাই। আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি কেউই এরশাদের অধীনে আর কোন নির্বাচনে অংশ নেবে না সেটা সবাই বুঝতে পারছে। এখন রাজনীতিসচেতন মানুষ মাত্রেই চাচ্ছে স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্তি পেতে। সারাদেশে ধর-পাকড় যেমন চলছে, তেমনি প্রতিবাদ-হরতালও হচ্ছে। জরুরি অবস্থা দিয়েও তেমন আরামে ‘রাজ্যশাসন’ করতে পারছেন না ‘রাজা’ এরশাদ। এত কিছুর মধ্যেও তাঁর প্রমোদ-বিলাসের অভাব নেই। সম্রাট নিরো যেভাবে সংগীতচর্চা করতেন, অনেকটা সেরকমভাবে তিনি কবিতার আসর বসাচ্ছেন। বলা হয়ে থাকে – যে কবিতা ভালোবাসে – সে নাকি মানুষ খুন করতে পারে না। এরশাদ সেই আপ্তবাক্য মিথ্যা প্রমাণিত করেছেন। এখন তিনি রাস্তায় রাস্তায় মিলিটারি নামিয়েছেন।

বালুছড়া ক্যান্টনমেন্ট থেকে মিলিটারিরা রাস্তার উপর দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে নন্দীর হাট পর্যন্ত যায় প্রতিদিন। আজ সকালে এরকম মিলিটারির দল রাস্তা দিয়ে যাবার সময় কুদ্দুস তাদের লাইনের ভেতর দিয়ে দ্রুত রাস্তা পার হচ্ছিলো। এটা সহ্য হয়নি এক মিলিটার জওয়ানের। সেই গ্রিক কিংবা রোমান যুগের সেনাদল থেকেই চালু আছে সেই প্রথা – রাস্তা দিয়ে রাজার সৈন্যরা যাবার সময় প্রজারা রাস্তার দুপাশে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকবে। আর সৈন্যরা যেতে যেতে যার যা খুশি – ধন-সম্পদ-নারী ইচ্ছেমতো তুলে নিয়ে যাবে। কেউ প্রতিবাদ করলেই মেরে শেষ করে দেবে তাকে। সেযুগের সৈনিকদের তলোয়ার-বর্শা এখন বন্দুক-পিস্তলে রূপান্তরিত হয়েছে, কিন্তু মানসিকতা এখনো একই আছে। বাচ্চা একটা ছেলে তাদের লাইনের মাঝখান দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলো তাতেই তাদের মানে লাগলো। রাইফেলের বাঁট দিয়ে মেরে রাস্তায় ফেলে দিয়েছে কুদ্দুসকে। স-মিলের শ্রমিকরা ধরাধরি করে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে এসেছে তাকে। কপাল আর চোখে প্রচন্ড চোট লেগেছে। আমি তখন রুমে ছিলাম। বাইরে হৈ চৈ শুনে গিয়ে দেখলাম কুদ্দুসকে সবাই ঘিরে ধরেছে।

কুদ্দুস সারাদিন মিলে ফাইফরমাস খাটে। ঠেলাগাড়িওয়ালা সাহেব মিয়ার সহকারি হিসেবেও কাজ করে সে। আমিও মাঝে মাঝে তাকে কাজে লাগাই। টয়লেটের কোণায় মাটি জমে গেলে সেটা পরিষ্কার করে সে। গতকাল আমার রুমে আরেকটি খাট ঢুকিয়েছে সে আর মিস্ত্রি দু’জনে মিলে। মিস্ত্রি এই খাটটা অন্য কারো জন্য বানিয়েছিল, হয়তো তার পছন্দ হয়নি। তাই আমার কাছে এসে এটা-সেটা বলে খাটটা গছিয়ে গেছে। দেড়শ টাকার খাট। দশ টাকা পেয়েই কুদ্দুস কী যে খুশি হয়েছিল। সেই খাটে বসে এখন কুদ্দুস টিভি দেখছে। কিন্তু ঘন্টা দুয়েক আগেও তার অবস্থা খুব খারাপ ছিল। সকালে সবাই তাকে পানি-টানি দিয়ে রক্ত মুছে সেখানে কী একটা পাতার রস লাগিয়ে দিয়েছিল। তারপর কুদ্দুস স্বাভাবিকভাবেই কাজকর্ম শুরু করে দিয়েছিল। সন্ধ্যাবেলা দেখলাম কুদ্দুস মাহমুদ মিয়ার খাটে বসে কুঁইকুঁই করছে। তার চোখ ফুলে কোটর থেকে বের হয়ে আসার অবস্থা হয়েছে। মিলের কাজকর্ম শেষ করে সবাই যে যার মতো চলে গেছে। তাকে তো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া দরকার। বিল্ডিং-এ কেউ নেই। এখলাস থাকলে সে নিজেই কুদ্দুসকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতো। কিন্তু এখলাস বাড়িতে গেছে গতকাল। মাহমুদমিয়াকে দিনের বেলা দেখা যায় না ইদানীং। একটা রিকশা ডেকে কুদ্দুসকে নিয়ে চললাম চৌধুরিহাট – ডাক্তার শাহাদাতের চেম্বারে।

ঘন্টাখানেক লাগলো কুদ্দুসের কপালে-চোখে ব্যান্ডেজ করে আনতে। ওষুধপত্র কিনে তাকে তার বাড়িতে দিয়ে আসতে চাইলাম। কিন্তু সে রাজি হলো না। তাকে এভাবে দেখলে নাকি তার আব্বা পিটিয়ে আরেকটি চোখও বের করে ফেলবে।

“তাই বলে বাড়ি যাবে না তুমি?”

“যাবো, আরো ‘রাইত’ হলে। আব্বা ঘুমাই পড়লে।“

কুদ্দুস এখন রাত হবার জন্য অপেক্ষা করছে। এখলাস টিভি রেখে গেছে আমার রুমে। ওটা চালিয়ে দিয়েছি। সেখানে হিজিবিজি এরশাদীয় কবিতা হচ্ছে। কুদ্দুস দেখছে। আমি হিটার জ্বালিয়ে রান্না শুরু করেছি। ডাল বসিয়ে দিয়েছি। হয়ে গেলে ভাত বসাবো।

জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার পর কিছুদিন বাড়িতে চলে গিয়েছিলাম। জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ইউনিভার্সিটি খোলার কথা আছে। ডিসেম্বরের শেষে বাড়ি থেকে চলে এসেছি। আমাদের বিল্ডিং-এ এখন নিচের তলায় আমি ছাড়া আর একজন মাত্র ছাত্র আছেন। আর দোতলায় এখলাস ছাড়া আর কেউ নেই। গতকাল থেকে অবশ্য এখলাসও নেই। আমাদের মেস-ম্যানেজার ইদ্রিসভাই অনির্দিষ্টকালের জন্য মেস বন্ধ করে বাড়ি চলে গেছেন। আমাদের কেয়ারটেকার কাম কুক কাম নাইটগার্ড মাহমুদমিয়া সারাদিন কোথায় থাকেন জানি না। রাতের বেলা দেখা যায় বাইরের বারান্দায় তাঁর খাটে ঘুমাচ্ছেন।

ইউনিভার্সিটি বন্ধ থাকার কারণে দিনের বেলা কেটে যায় এখানে ওখানে ঘুরে ফিরে। মাঝে মাঝে প্রদীপ আর বিপ্লব আসে সকালের দিকে। তাদের সাথে অনেক সময় চলে যাই চৌধুরিহাটে। বিপ্লবদের বাড়ি সেখানে। বিপ্লব প্রদীপের সাথে ইউনিভার্সিটি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়তো। কিন্তু সেখান থেকে পরীক্ষা ড্রপ দিয়ে হাটহাজারি কলেজ থেকে পাস করেছে পরের বছর। এখন ইউনিভার্সিটিতে পাবলিক এডমিনে ভর্তি হয়েছে। বিপ্লবের ভেতর বিপ্লবী চেতনা অনেক বেশি। প্রচুর বই পড়ে। মহাশ্বেতা দেবী তার প্রিয় লেখক। নকশাল আন্দোলনের সশস্ত্র বৈপ্লবিক দিকটা তাকে খুব টানে। তার সাথে মহাশ্বেতা দেবীর বইগুলির বিভিন্ন চরিত্র নিয়ে কথা হয়। সমরেশ মজুমদারের উত্তরাধিকার নিয়ে কথা নয়। আবার তাদের বাড়িতে গেলে তার ক্যাকটাস সম্পর্কিত উচ্ছ্বাসও দেখতে হয়। নানারকমের ক্যাকটাস সংগ্রহ করার ব্যাপারে তার আগ্রহ সীমাহীন। এমনিতে তার নীতিবোধ বেশ প্রবল। কিন্তু ক্যাকটাস সংগ্রহের ব্যাপারে তার নৈতিকতা শিথিলও হয়ে যায় অনেক সময়। কারো কাছে পছন্দের ক্যাকটাস দেখলে সে সেই ক্যাকটাস সংগ্রহের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ভদ্রভাবে চেয়ে না পেলে – সে চুরির পরিকল্পনা করতেও পিছপা হয় না।

সকাল দশটার মধ্যে কেউ না এলে শহরে চলে যাই। দিদির বাসায় গিয়ে তার ছেলেটার সাথে কিছুক্ষণ আগডুম-বাগডুম করে আসি। সে এখন আমার কোল থেকে নামতে চায় না। দিদি এখনো সাভারে ফাউন্ডেশান ট্রেনিং করছে। ফেব্রুয়ারিতে ফিরে আসবে। প্রতি দুই সপ্তাহে একদিন ছুটি ম্যানেজ করে সারারাত ট্রেন জার্নি করে সকালে বাসায় আসে। তারপর সারাদিন ছেলেটাকে কোলে করে কাটায়। সন্ধ্যাবেলা আবার ট্রেন ধরে চলে যায়। আর ক’দিন পরেই ছেলেটার প্রথম জন্মদিন – অথচ সে থাকতে পারবে না। একজন মায়ের জন্য এটা কী যে কষ্টের। কর্মকর্তারা যত বেশী নিষ্ঠাবান হন, তাদের সন্তানরা তত বেশি স্নেহ-মমতা-সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয়। সারাদিন টো টো করে সন্ধ্যাবেলা ফেরার পথে ফতেয়াবাদে নেমে টিউশনিতে যাই। সেখান থেকে ফেরার পথে ফতেয়াবাদ স্কুলের সামনে ‘বিসমিল্লাহ হোটেল’ থেকে ভাত খেয়ে হাঁটতে হাঁটতে রুমে ফিরি। দোতলায় এখলাস থাকলে তার রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ গল্প করি – টিভি দেখি। মাহমুদভাই বাড়ি যাবার সময় টিভিটা এখলাসের রুমে রেখে গেছেন।

এভাবে ভালোই চলছিলো দিন। ক’দিন আগে টিউশনি শেষ করে চলে আসার জন্য উঠতেই মুন্নি ও নতুন একসাথে বলে উঠলো, “বসেন স্যার, যাবেন না।“

“মানে কী?”

“মানে কিছু না। ভাত খেয়ে তারপর যাবেন।“ – মুন্নি টেবিলের বইপত্র দ্রুত সরাতে শুরু করলো। নতুন এক দৌড়ে ভেতরে চলে গেলো। কয়েক মিনিটের মধ্যেই টেবিল ভর্তি হয়ে গেলো ভাত আর হরেক রকমের লোভনীয় তরকারিতে। এরকম আন্তরিকতায় আমি মুগ্ধ হই ঠিকই, কিন্তু আমার ভীষণ অস্বস্তি হয়, কেমন যেন লজ্জা লাগে। আবার এভাবে বাড়া ভাত না খেয়ে চলে আসাটাও ভীষণ অভদ্রতা। এত আগ্রহ নিয়ে তারা আমাকে খেতে বলছে, না খেলে খুব কষ্ট পাবে নিশ্চয়।

“হঠাৎ এত আয়োজন কেন?”

“আপনি এখান থেকে গিয়ে হোটেলে খাবেন – এটা আমার ভালো লাগবে না।“ – খুব মায়াময় শোনালো মুন্নির গলা।

“আমি হোটেলে খাবো তোমাকে কে বললো?”

“ছোট ভাইয়া বলেছে। সে আপনাকে দেখেছে কালকে হোটেলে খাচ্ছেন। মাহমুদমিয়া এখন রান্নাবান্না করছে না সে খবরও আমি পেয়েছি।“

“হোটেলে খেলে সমস্যা কী?”

“এখানে খেলে সমস্যা কী?” – প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন করা নতুনের স্বভাব।

“না, কোন সমস্যা নেই। তবে শুধু আজকে খাবো। কাল কিন্তু এরকম কিছু করবে না।“

“আচ্ছা, ঠিক আছে। এখন খান।“

“কেউ তাকিয়ে থাকলে আমি খেতে পারি না।“

“তাকিয়ে থাকবো কেন? আমরাও খাবো।“

তারাও প্লেট নিয়ে বসাতে ব্যাপারটা আমার জন্য কিছুটা সহজ হয়ে গেলো। চমৎকার রান্না। অস্বস্তিটা না থাকলে আরো চমৎকার লাগতো।

ফেরার সময় ভাবছিলাম – পড়ার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি খারাপ না। আমাদের বিল্ডিং-এ এখলাসসহ আরো অনেকে সন্ধ্যাবেলা টিউশনি শেষ করে সেখান থেকে খেয়েও আসে। ওরকমই চুক্তি তাদের সাথে। কিন্তু আমার কাছে ব্যাপারটা খুবই অস্বস্তিকর।

পরের দিন আবারো একই ব্যাপার ঘটলো।

“তোমাদের না কালকে বললাম – এরকম কিছু না করতে।“

“কালকের মতো করিনি তো স্যার। আজকে সব অন্যরকম। কাল ছিল রূপচাঁদা মাছ, আজ রুই মাছ। কাল ছিল মুরগির মাংস, আজ ছাগলের মাংস।“ নতুন একটুও না হেসে সিরিয়াসলি ফাজলামি করছে। ইচ্ছে করছিলো ধরে একটা থাপ্পড় দিই। কিন্তু সেটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। তাই হাত ধুয়ে খেতে শুরু করাই ভালো।

চলে আসার সময় জিজ্ঞেস করলাম, “কাল বিকেল চারটায় তোমরা ফ্রি আছো?”

“জ্বি স্যার।“

“তাহলে কাল বিকেল চারটায় আসবো।“

সন্ধ্যা ছ’টায় পড়া শেষ করে আসার সময় নিশ্চয় কেউ ভাত খেতে বলবে না। নিজের বুদ্ধিতে নিজেই খুশি হয়ে গেলাম।

পরদিন চারটায় গেলাম। তারা দুজন’ই রেডি হয়ে পড়ার টেবিলে বসে ছিল। ছ’টার দিকে পড়া শেষ করে চলে আসার জন্য উঠে দাঁড়াতেই নতুন দৌড়ে ভেতরে চলে গেল এবং কয়েক সেকেন্ডের ভেতর ফিরে এলো একটা তিন তাকের টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে।

“এটা নিয়ে যান।“

“এটা কী?”

“আপনার রাতের খাবার।“

এ কী যন্ত্রণায় পড়লাম। মুন্নিকে বললাম, “দেখো, একটু বুঝতে চেষ্টা করো। আমার খুব অস্বস্তি লাগে। অস্বস্তি নিয়ে কোনকিছু কি করা ঠিক?”

“ঠিক আছে। আর করবো না। এটা নিয়ে যান। রেডি করে ফেলেছি তো।“

“না।“

তারপর থেকে রুমেই রান্না শুরু করেছি। রান্না ব্যাপারটা খুবই আপেক্ষিক। চাহিদাভেদে এটা খুবই জটিল হতে পারে, আবার সহজও হতে পারে। আমার রান্নার পদ্ধতি খুবই সহজ। যেমন আজকের রান্না – ডাল সিদ্ধ হবার পর সেখানে দুটো ডিম ভেঙে দিলাম। সন্ধ্যাবেলা দোকান থেকে কয়েকটা সিঙাড়া নিয়ে আসার সময় কুদ্দুসকে দেখে তাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হয়েছিল। তখন সিঙাড়াগুলি খাবার সময় পাইনি। এখন সেগুলি ডালের ভেতর দিয়ে দিলাম। আর সাদা ভাত। খুব দ্রুত হয়ে গেল। প্লেটে বেড়ে কুদ্দুসকে দেয়ার পর খেতে খেতে কুদ্দুস বললো, “মজা হইয়ে বদ্দা। সিঙ্গারা দি ডাইল কনদিন ন খাই।“

জানুয়ারির নয় তারিখ আমাদের ইউনিভার্সিটি খোলার কথা ছিল। কিন্তু সাত তারিখে জানা গেলো – বিশ্ববিদ্যালয় খোলার আগেই আবার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শোনা যাচ্ছে ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর মোহাম্মদ আলী নাকি অনেকটা একক সিদ্ধান্তেই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়েছেন। এখলাসের কাছে জানা গেলো আরো ভেতরের খবর। ইউনিভার্সিটি বন্ধ থাকার সময় এরশাদের জরুরি অবস্থার সুযোগ নিয়ে জাতীয় পার্টির কিছু ছেলে নাকি আলাওল হল পুনর্দখল করার চেষ্টা চালিয়েছিল। এই অনির্দিষ্টকালের ছুটির ফাঁদ থেকে আমরা কবে মুক্তি পাবো জানি না। উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর তিন বছর চলে গেছে। শুধুমাত্র ফার্স্ট ইয়ার শেষ করতে পেরেছি। তিন বছরের অনার্স শেষ করতে আরো কয় বছর লাগবে জানি না।

ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ নতুন সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ জোট এবং বিএনপি জোট জানিয়ে দিয়েছে তারা এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন যতই জোরদার হচ্ছে – এরশাদের মিলিটারি বাহিনী ততই বেপরোয়া হয়ে বিরোধীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। জানুয়ারির ২৪ তারিখ চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার মিটিং ছিল। আমি সেদিন শহরে গিয়েছি। নিউমার্কেটের মোড়েই শুরু হলো গুলি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আট দলের মিছিলে পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী গুলি চালিয়েছে ইচ্ছেমতো। রেয়াজউদ্দিন বাজারের অলিগলি ধরে দৌঁড়তে দৌঁড়তে টাইগার-পাস হয়ে দৌড়তে দৌড়তে মুরাদপুর এসে তিন নম্বর বাসে উঠে কোন রকমে রুমে ফিরেছি। কেউ বলছিল কমপক্ষে পঞ্চাশ জন মারা গেছে, কেউ বলছে তিরিশ জন। পরের দিন সরকারি ভাষ্যমতে নয় জন নিহত হয়েছে বলা হলো। আইন জারি করা হলো – নির্বাচন-বিরোধী কোন তৎপরতা চলবে না।

দেশের প্রগতিশীল মানুষ একজোট হয়ে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট গঠন করলো। পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকার শহীদ মিনারে শুরু হলো প্রতিবাদী কবিতা উৎসব। এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা, গান, মঞ্চ-নাটক, পথ-নাটকের জোয়ার আসতে শুরু করেছে সারাদেশে। এটা খুবই আশা-জাগানিয়া। এর মধ্যে ২ ফেব্রুয়ারি কবিতা উৎসবে সভাপতিত্ব করার সময় “দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে” স্কেচ আঁকতে আঁকতেই শিল্পী কামরুল হাসানের মৃত্যু হয়।

অবশেষে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি আমাদের ইউনিভার্সিটি খুললো। কিন্তু আমাদের সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাস শুরু হবার কোন লক্ষণ দেখা গেলো না। ক্যাম্পাসে গিয়ে জানতে পারলাম আমাদের রেজাল্ট দিয়েছে। পাস করেছি। 

পরের পর্ব>>>>>>>>>>>>>>>>>

<<<<<<<<<<<<আগের পর্ব

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Hendrik Lorentz: Einstein's Mentor

  Speaking about Professor Hendrik Lorentz, Einstein unhesitatingly said, "He meant more to me personally than anybody else I have met ...

Popular Posts