Thursday, 25 April 2019

ইয়ারার তীরে মেলবোর্ন - দ্বাবিংশ পর্ব


২৭ জুলাই ১৯৯৮ সোমবার

মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির ফ্যাকাল্টি অব আর্কিটেকচার, বিল্ডিং এণ্ড প্ল্যানিং বা সংক্ষেপে এবিপির বেশ নামডাক আছে। অস্ট্রেলিয়ার অনেক বড় বড় স্থাপনা গড়ে ঊঠেছে এ ফ্যাকাল্টি থেকে পাস করা স্থপতিদের হাতে কিংবা এর শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে। অথচ কেন জানি না- পুরো ইউনিভার্সিটির কয়েকশ বিল্ডিং এর মধ্যে হাতে গোনা যে কটা বিশ্রী বিল্ডিং আছে- আর্কিটেকচার বিল্ডিং-টাই হলো তাদের সেরা। আমার ধারণা অবশ্য ভুলও হতে পারে। তোমার মতে আমার সৌন্দর্যজ্ঞানতো টেরিবল। সে যাই হোক- এই বিল্ডিংটাকে এড়িয়ে চলার কোন উপায় নেই আমার। কারণ এর নিচের তলার একদিকে পোস্ট অফিস আর অন্যদিকে কমনওয়েলথ ব্যাংক। সকালে চিঠি পোস্ট করে ফেরার পথে ব্যাংকে ঢুকলাম।
            সোমবারের সকাল। ব্যাংকে মোটামুটি ভীড়, পাঁচটা কাউন্টারেরই ব্যস্ততা। গত চৌদ্দ তারিখ একাউন্ট খোলার পর একটা কাগজে একাউন্ট নাম্বার লিখে দিয়েছিল। বলেছিল চারদিন পর এসে ব্যাংক-কার্ড নিয়ে যেতে। অথচ এলাম তেরো দিন পর। একাউন্ট নম্বরটা দ্রুত টাইপ করলেন বুড়ো ভদ্রলোক- জুলিয়ান। মনিটরে চোখ রেখেই প্রশ্ন করলেন-গট এন এড্রেস নাউ?
            বাংলাদেশের ঠিকানা দিয়েই একাউন্ট খুলেছিলাম। এখন বাসার ঠিকানা জানিয়ে দিলাম। জুলিয়ান একটা ড্রয়ার থেকে কয়েকটি খাম বের করে এগিয়ে দিলেন আমার দিকে- ব্যাংকের চিঠি। বললেন, কী-কার্ড আর পিন নম্বর আছে আলাদা আলাদা খামে। পিন নম্বর কাউকে বলো না
            স্কলারশিপের টাকা জমা হয়েছে কি না দেখা দরকার। জিজ্ঞেস করলাম। ব্যাংকিং সম্পর্কে আমি যে কিছুই জানি না তা বুঝতে জুলিয়ানের সময় লাগলো না একটুও। হাসিমুখে বললেন, ইউ ক্যান চেক ইট ফ্রম এনি কমনওয়েল্‌থ এ-টি-এম। এ-টি-এম থেকে একাউন্ট ব্যালেন্স দেখে নিতে পারো, অথবা ফোন ব্যাংকিং। যে কোন ফোন থেকে ১৩২২২১ নম্বরে ফোন করে ফোন ব্যাংকিং করা যাবে
            ব্যাপারটা সম্পূর্ণ নতুন আমার কাছে। জুলিয়ান বুঝতে পারলেন আমার অবস্থা। কাউন্টারের পাশে দেয়ালে লাগানো টেলিফোনটা দেখিয়ে বললেন, ওটা থেকে ডায়াল করো ১৩২২২১ নম্বরে
            মজা লাগলো যান্ত্রিক কন্ঠস্বর শুনে। যন্ত্রের নির্দেশ মত নম্বর টিপতে টিপতে ফোন ব্যাংকিং সেট হয়ে গেলো। এটার জন্যও একটা ছয় অংকের পিন নম্বর সেট করতে হলো। একাউন্ট ব্যালেন্স জেনে খুশি হলাম। পাঁচ ডলার জমা দিয়ে একাউন্ট খুলেছিলাম- সেখানে এখন পাঁচশ ডলারেরও বেশি জমা হয়েছে। জুলিয়ানকে ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে এলাম।
            প্লাস্টিকের ছোট্ট একটা কার্ড- পেছনে ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ লাগানো। ফটোকপি কার্ডের সমান মাপের। ঝকঝকে নতুন কার্ডে সতেরো অংকের নম্বরের নিচে আমার নাম খোদাই করা। দেখেই ভালো লেগে গেলো। নিজেকে কিছুটা হলেও গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে।
            অটোম্যাটেড টেলার মেশিন বা এ-টি-এম ব্যবহার করলাম আজ প্রথম। এদেশে এগুলো হয়তো অনেক দিন ধরেই আছে, কিন্তু এই আটানব্বই সালেও বাংলাদেশে এ-টি-এম পৌঁছায়নি। এখানে যেমন যেখানে-সেখানে এ-টি-এম, বাংলাদেশে কি তা সম্ভব হবে? মেশিন ভরা টাকার জন্য অস্ত্রধারী প্রহরীও লাগবে আমাদের। কোন রকমের ট্রেনিং ছাড়াই এ-টি-এম ব্যবহার করতে পেরে নিজেকে বেশ ইস্‌মাট মনে হচ্ছে। (শব্দটির কথা মনে আছে?) পঞ্চাশ ডলারের কিছু কড়কড়ে নোট পকেটে ভরে ডিপার্টমেন্টে ফেরার সময় মনটা খারাপ হয়ে গেল। শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে যতবারই স্কলারশিপের টাকা পেতাম- বন্ধুরা হৈ চৈ করে ধরে নিয়ে যেতো রেস্টুরেন্টে। সবাই তখন রাজা হয়ে উঠতাম কিছু সময়ের জন্য। টাকার একটা অংশ উড়ে যেতো কয়েক ঘন্টার মধ্যেই। অথচ আজ! কেউই কাছে নেই যার সাথে হৈ চৈ করা যায়। তাছাড়া আমাদের আনন্দ আর এদের আনন্দেও কত পার্থক্য। এখানে অনেকে একসাথে খেতে যায় বটে, কিন্তু কেউ কাউকে খাওয়ায় না।
            অফিসের সামনে এসে একটু তাকাতেই চোখাচোখি হয়ে গেল কেনের সাথে। মর্নিং প্রাডিব
            মর্নিং কেন্‌
            হ্যাড এ গুড উইকএন্ড?এ জাতীয় প্রশ্ন ভদ্রতার ব্র্যাকেটে বন্দী। সপ্তাহান্তে আমি কী করেছি তা আসলেই জানতে চাচ্ছেন ভাবার কোন কারণ নেই। তাই ইয়েস বলার পরই প্রসঙ্গ পরিবর্তন।
            বাই দি ওয়ে, লেসের সাথে কি তোমার পরিচয় হয়েছে?
            না
            লেস- মানে লেস অ্যালেন। আমাদের গ্রুপেরই একজন। সে আবার পোস্টগ্রাজুয়েট রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর। ৬০২ নম্বর রুমে তার অফিস
            আমি কি দেখা করবো তাঁর সাথে?
            দেখো সে অফিসে আছে কি না। আরেকটা কথা, লেস ফোর্থ-ইয়ারের একটা কোর্স পড়াচ্ছে এ সেমিস্টারে। স্ক্যাটারিং থিওরির কোর্সটা তোমার কাজে আসবে। তুমি চাইলে তার লেকচারে যোগ দিতে পারো
            এ রকম কোন কোর্সের কথা আমিও ভাবছিলাম। কেন্‌ ঠিকই বুঝতে পেরেছেন আমার কী লাগবে। কেন্‌কে ধন্যবাদ দিয়ে এগিয়ে গেলাম করিডোরের শেষ প্রান্তে। ৬০২ নম্বর রুমের দরজায় লেখাঃ এসোসিয়েট প্রফেসর লেস অ্যালেন। বন্ধ দরজায় মৃদু টোকা দিলাম। কোন সাড়াশব্দ নেই। তার মানে তিনি অফিসে নেই। ফিরে এলাম নিজের ডেস্কে।
            ম্যান্ডি এখনো আসেনি। ইমাজিন হয়তো ক্লাসে গেছে। তার ডেস্কের পাশে দেয়ালে ঠেকানো একটা সাইকেল দেখা যাচ্ছে। ডেস্কের ওপর ময়লা ব্যাকপ্যাক। পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে ইমাজিন যথেষ্ঠ উদাসীন। পিটারও মনে হয় আসেননি আজ। হিগ্‌স কম্পিউটার খালি পড়ে আছে। গত কয়েকদিনের রপ্ত করা ইউনিক্স অপারেটিং অনুশীলন করা যাক।
            ইন্টারনেটের সাথে প্রত্যক্ষ পরিচয় হয়েছে কিছুদিন হলো। বাংলাদেশে থাকতে আমার বন্ধু অঞ্জন আর টিটুর ইন্টারন্যাশনাল কম্পিউটার সার্ভিস-এ গিয়ে ই-মেইল করতে হয়েছিল কয়েকবার। তখন ইন্টারনেটের সাথে পরোক্ষ পরিচয় হয়েছিল। কিন্তু সে অভিজ্ঞতা তেমন কোন কাজে লাগলো না এখানে। স্টুডেন্ট ডায়েরিতে ইন্টারনেট ইউজার গাইড দেয়া আছে। ওটা কাজে লাগিয়ে নেটস্কেপ ব্যবহার করতে করতে মনে হলো অন্যরকম একটা নতুন জগতের দরজা খুলে গেছে আমার সামনে। গবেষণা শিক্ষার্থী হবার সুবাদে আন-লিমিটেড ইন্টারনেট। ঘরে বসেই সারা-দুনিয়া ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ এখন আঙুলের ডগায়। ওয়েব এড্রেস টাইপ করে এন্টার করলেই হলো।
            ঘন্টা দেড়েক সময় যে কীভাবে কেটে গেলো টেরও পেলাম না। অন্তর্জালের ঘোর কাটলো দরজা খোলার শব্দে। ম্যান্ডির প্রবেশ। দ্রুত এসে ডেস্কের ওপর ব্যাকপ্যাকটা ছুড়ে ফেলে আমার মাথাটা ধরে ঝাঁকিয়ে দিলো। ম্যান্ডির যে একটু গায়ে-পড়া ভাব আছে তা এ কদিনে বুঝতে পেরেছি।
            হোয়াট ইউ ডুয়িং? সার্ফিং!- সার্ফিং শব্দটা নতুন আমার কাছে। নতুন নতুন প্রযুক্তির সাথে যুক্ত হয়ে পুরনো শব্দের নতুন অর্থবোধক ব্যবহার শুরু হওয়াটা স্বাভাবিক। আমি কিছু বলার আগেই ম্যান্ডি ব্যস্ত হয়ে বললো, উহ্‌ বারোটা বেজে গেছে। আমার হেয়ার-ড্রেসারের সাথে এপয়ন্টমেন্ট আছে। বাই বাই ঝড়ো হাওয়ার মত চলে গেল ম্যান্ডি রুমের দরজা খোলা রেখেই। দরজা খোলা রেখে কাজ করে এখানে সবাই। কোন দরজাতেই পর্দা নেই। আমরা রক্ষণশীল দেশের মানুষ, আড়াল পছন্দ করি। উঠে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দেবো ভাবছি- এমন সময় লেসের প্রবেশ।
            লাল চুল আর লাল দাড়ির এই ভদ্রলোকই যে প্রফেসর লেস অ্যালেন তা দেখামাত্রই বুঝতে পারলাম। একটু আগেই আমি আমাদের থিওরি কিউ গ্রুপের ওয়েবসাইটে গিয়ে কেনের পাশাপাশি লেসের বায়োডাটাও পড়েছি, ছবি দেখেছি। ওই ওয়েবসাইটে ইতোমধ্যেই আমার নাম ও রিসার্চ টপিক যুক্ত হয়েছে। অবশ্য ছবি এখনো দেয়া হয়নি।
            হাই প্রাডিব। আই এম লেস
            দাঁড়িয়ে লেসের সাথে হ্যান্ডশেক করতে গিয়ে খেয়াল করলাম তিনি খোসা-ছাড়ানো একটা বড় কলা ডান হাত থেকে বাম হাতে হস্তান্তরিত করে ডান হাতটা এগিয়ে দিলেন আমার দিকে। মনে হলো ভদ্রলোক ঠিকমত কলা খেতে জানেন না। সম্পূর্ণ খোসা একেবারে ফেলে দিয়ে এভাবে কলা খেতে এর আগে শাহীন কলেজে দেখেছিলাম আমার একজন সহকর্মীকে। অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ায় কি সবাই এভাবেই কলা খায়? কলা অস্ট্রেলিয়ান ফল নয়। পাঞ্জাবী শিখরা এসে প্রথম কলার চাষ শুরু করে এখানে প্রায় দেড়শ বছর আগে। তবে কি শিখরাও এভাবে কলা খায়? জানি না তো।
            লেস দক্ষিণ আফ্রিকার সাদা রঙের মানুষ। চোখ দুটো স্বচ্ছ নীল। মুখে যদিও একটা হাসির রেখা লেগে আছে- আমার কেন যেন মনে হচ্ছে প্রয়োজনে ভীষণ হিংস্র হয়ে উঠতে পারেন এই লোক। এরকম মনে হওয়ার পেছনে একটাই মাত্র কারণ খুঁজে পেয়েছি তা হলো- গান্ধী সিনেমায় দেখা দক্ষিণ আফ্রিকার যে পুলিশ অফিসার গান্ধীর হাতে লাঠির বাড়ি মেরেছিল সেই পুলিশ অফিসারের চেহারার সাথে লেসের চেহারার হুবহু মিল।
            সো প্রাডিব, আই হোপ ইউ সেটেল্ড ইন- আশা করি তুমি সব গুছিয়ে নিয়েছো
            হ্যাঁ, একপ্রকার গুছিয়ে নিয়েছি
            স্কলারশিপ চালু হয়েছে?
            হ্যাঁ
            ভেরি গুড। তাহলে এখানে একটা স্বাক্ষর করে দাও
            স্কুল অব গ্রাজুয়েট স্টাডিজের একটা ফর্ম। আমার রিসার্চ প্রজেক্ট, সাথে আরো সব তথ্য। আশ্চর্য হয়ে গেলাম এই দেখে যে রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর নিজে এসেছেন শিক্ষার্থীর কাছে সাইন নেয়ার জন্য। মনে মনে বললাম, লেস স্যার, আপনি যদি আমাদের দেশের রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর হতেন, এই কাজটা হতো এভাবেঃ আপনি আপনার সহকারীকে বলতেন আমাদের খবর দেয়ার জন্য। আমরা সব কাজ ফেলে আপনার অফিসের সামনে গিয়ে অপেক্ষা করতাম। আপনার সহকারী আমাদের বেশ কয়েকবার ধমক দিয়ে বলতেন- পরে আসবেন, স্যার এখন ব্যস্ত আছেন। আমরা আপনার সহকারীকে খুশি করে আপনার ব্যস্ততা কমানোর চেষ্টা করতাম। মাস্টার্সের গবেষণা প্রস্তাবের দরখাস্তে স্যারের সাইন নেয়ার জন্য স্যারের সহকারী আমাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে পঞ্চাশ টাকা করে নিয়েছিলেন।
            কেন্‌ বলছিলো তুমি নাকি আমার স্ক্যাটারিং থিওরির লেকচারে যোগ দিতে চাও?
            হ্যাঁ, যদি আপনি অনুমতি দেন
            স্বচ্ছন্দে। সপ্তাহে তিনটা লেকচার। মঙ্গল, বৃহস্পতি আর শুক্রবার। সকাল দশটা থেকে বারোটা। গত সপ্তাহে তিনটা লেকচার হয়ে গেছে। কাল সকালে চার নম্বর লেকচার। ফিজিক্স পোডিয়ামের ১১ নম্বর লেকচার রুমে
            থ্যাংক ইউ স্যার
            কল মি লেস্‌। কোন সমস্যা হলে আমাকে জানাবে। আমাকে এখন লাঞ্চ করেই ছুটতে হবে একটা মিটিং-এ বলে হাতে ধরা কলায় কামড় দিয়ে চিবুতে চিবুতে চলে গেলেন।
            তাহলে কাল থেকে ক্লাস শুরু হচ্ছে। এদেশের পাঠ-পদ্ধতি কেমন কাল কিছুটা বুঝতে পারবো।
            ডিপার্টমেন্টাল একাউন্টে দিঠুনের কোন ই-মেইল না পেয়ে কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়েছি। আজ তার এস-এস-সির রেজাল্ট বেরোনোর কথা ছিল। মনে হয় পিছিয়ে গেছে। গতকাল দিদিভাইর সাথে তাকেও ইমেইল করেছিলাম। টিটু ইমেইলে জানিয়েছে সে আমার ইমেইল প্রিন্ট করে দিদির বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে। এখানে আসার সময় অঞ্জন আর টিটুকে বলে রেখেছিলাম আমি যদি ই-মেইল করি তা যেন প্রিন্ট করে দিদির বাসায় পাঠিয়ে দেয়।  অথবা ফোন করে জানালে বাসা থেকে কেউ এসে নিয়ে যাবে।  সামান্য প্রিন্টিং খরচের বিনিময়ে তারা যে আমার এতবড় উপকার করছে- কীভাবে তাদের ধন্যবাদ দেবো জানি না।
            সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পথে সেফওয়েতে গেলাম। এখানে জিনিস-পত্রের দাম মনে হচ্ছে প্রতিদিনই উঠানামা করে। আলুর দাম দেখে একটু অবাক লাগলো। কিছু আলু একেবারে পরিষ্কার করে ধোয়া- ধবধবে সাদা। দাম এক ডলার নব্বই সেন্ট মানে সাতান্ন টাকা কেজি। তার পাশেই রাখা আছে অপরিষ্কার আলু- চামড়ায় যাদের মাটি লেগে আছে এখনো- দাম  মাত্র পঞ্চাশ সেন্ট অর্থাৎ পনেরো টাকা কেজি। হয়তো একই মাঠের আলু- শুধুমাত্র পরিচ্ছন্নতার কারণে দামের এত পার্থক্য। বুঝতে পারছি এদেশে শ্রমমূল্য অনেক ক্ষেত্রে দ্রব্যমূল্যের চেয়েও বেশি।      রান্না করেছি ডিম আলু আর মিষ্টিকুমড়া। রান্নাঘর থেকে বেরোবার সময় ডেভিডকে দেখেছি একটু করে। মনে হলো আমাকে দেখেই দ্রুত চলে গেলো নিজের রুমে। আমার বিশ ডলার ফেরৎ দেয়ার কথা কি ভুলে গেল সে?
            খাওয়া শেষ করে লিখতে বসেছিলাম। বাইরে ডেভিড, জোয়ানা আর ফিলের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সিরিয়াস কোন বিষয়  নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। মাঝে মাঝে বেশ জোরে শোনা যাচ্ছে ফা.. ইউ। পিতা-পুত্রের মাঝে এরকম কুৎসিত বাক্যবিনিময় আমাদের দেশের বস্তিতেও শোনা যায়। কি আশ্চর্য মানুষের শরীর-ভাবনা। কত সুন্দর সুন্দর বিশেষণ আমরা আবিষ্কার করেছি শরীরের বর্ণনা দেয়ার জন্য, আবার সবচেয়ে কুৎসিত কথাগুলোও তৈরি হয়েছে এই শরীরকে ঘিরেই।
____________________

ইয়ারার তীরে মেলবোর্ন - একবিংশ পর্ব


২৬ জুলাই ১৯৯৮ রবিবার
ফিজিক্স রিসার্চ লাইব্রেরি

লাইব্রেরিয়ান কমলা লিকাম্‌জি যেদিন আমাকে রিসার্চ লাইব্রেরির কোথায় কী আছে দেখিয়েছিলেন, সেদিন কাচের দেয়াল ঘেরা এই স্পেশাল রিডিং রুমটা দেখিয়ে বলেছিলেন বাইরের শব্দ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন যদি হয়ে যেতে চাও তবে এই রুমে ঢুকে পড়ো। আজ সকাল দুপুর ইয়ারার তীরে কাটিয়ে এসে একটু আগে ঢুকে পড়েছি এখানে- শব্দ এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পাঠকক্ষে।
            ছুটির দিন। লাইব্রেরিতে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। এ রুমে ঢোকার পর বাইরের কোন শব্দও শোনা যাচ্ছে না। সারি সারি ছাদছোঁয়া তাকভর্তি বইয়ের মাঝখানে এসে কী যে ভালো লাগছে। এখানে আসার সুযোগ না পেলে হয়তো কোনদিনই জানতাম না যে ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিগুলো এরকমও হতে পারে।
            চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় লাইব্রেরি থেকে একটা বইও ধার করতে পারিনি কখনো। বই বাসায় নিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, বইয়ের তাক থেকে নিজের হাতে বই বাছাই করার সুযোগও ছিল না। লাইব্রেরিতে বসে বই পড়ার জন্যও কত ঝামেলা করতে হতো। নিজের বই-পত্র ব্যাগ সব লাইব্রেরির বাইরে রেখে শুধুমাত্র কাগজ কলম নিয়ে লাইব্রেরিতে ঢুকতে হতো। তারপর বইয়ের রেফারেন্স কার্ড দেখে কল নাম্বার লিখে লাইব্রেরি কার্ড সহ কাউন্টারে জমা দিলে লাইব্রেরির কর্মচারীদের কেউ একজন ধীরে-সুস্থে তাক থেকে বই খুঁজে নিয়ে আসতেন। বেশির ভাগ সময়েই দেখা যেতো বই পাওয়া যাচ্ছে না। বলা হতো কোন শিক্ষক হয়তো ইস্যু করে নিয়ে গেছেন। কোন নির্দিষ্ট লেখকের বই পাওয়া না গেলে একই বিষয়ের ওপর অন্য কোন লেখকের বই যে একটু খুলে দেখবো সে উপায়ও ছিল না।
            মাস্টার্সের শেষের দিকে নতুন লাইব্রেরি ভবন তৈরি হবার পর অবস্থার সামান্য উন্নতি হলো। না, বই ধার করার সুযোগ নয়, তাক থেকে নিজের হাতে বই বাছাই করার সুযোগ হলো। কিন্তু তাতে নতুন সমস্যা দেখা দিলো। বইয়ের মাঝখান থেকে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উধাও হয়ে যেতে শুরু করলো। অভিযোগ কাকে করবো- বইয়ের পাতা যারা কাটছে তারাও তো আমার মত শিক্ষার্থী। অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের কারণে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে প্রচুর বই নেই, আর মানসিক দৈন্যতার কারণে আমরা বইয়ের পাতা কাটি।  
            মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির যে কোন শিক্ষার্থী এক সাথে তিরিশটা, আর গবেষণা শিক্ষার্থী এক সাথে ষাটটা বই ধার করতে পারে। এই ইউনিভার্সিটির বিশটা লাইব্রেরির মোট তিরিশ লাখ বইয়ের মধ্যেও যদি কোন একটা দরকারি বই না থাকে- তবে লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ বইটি কেনার ব্যবস্থা করে। একেবারে শূন্য থেকে হঠাৎ এত বেশি সুযোগ হাতে এসে গেলে আনন্দের সাথে কিছুটা কষ্ট লাগাও স্বাভাবিক। সুখের দিনেই তো দুখের বাতাস বুকের কপাট নাড়ায়।
            কাল কয়েকটা বই নিয়ে এসেছিলাম বিলিউ লাইব্রেরি থেকে। অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস কিছুই তো জানি না। বই পড়ে যদি কিছুটা জানা যায়। কিন্তু জানোই তো- পৃথিবীর বেশির ভাগ ইতিহাস পক্ষপাতদুষ্ট। একই ঘটনার কত ভিন্ন ভিন্ন বিশ্লেষণ, কত ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। আপাততঃ ঘটনা জানা যাক। বিশ্লেষণ পরে জানলেও চলবে।
            পৃথিবীর অনেক জাতিকেই স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিতে হয়েছে। তিরিশ লাখ শহীদের রক্তে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা পেয়েছি। অস্ট্রেলিয়ার সে রকম গর্ব করার মত কোন স্বাধীনতার ইতিহাস নেই। শুরু থেকেই এটা ব্রিটিশদের কলোনি ছিল। স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার একশ বছর পার হয়ে গেছে অথচ এখনো ব্রিটেনের রাণীকে এখানেও রাণীর সম্মান দেয়া হয়। তবে অস্ট্রেলিয়ার অস্ট্রেলিয়া হয়ে ওঠার ইতিহাস বেশ মজার।
            টেরা অস্ট্রালিস নন্‌ডাম কগ্‌নিটা (terra australis nondum cognita) বা দক্ষিণ মেরুর অচিনভূমি হিসেবে ম্যাপের নিচের দিকে অবহেলায় পড়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন মহাদেশটি। খ্রিষ্টের জন্মের চারশ বছর আগেই মানুষ এই মহাদেশটার অস্তিত্ব অনুমান করেছিল। সাধারণ যুক্তিবোধ থেকেই ভেবেছিল যে উত্তর গোলার্ধে যখন এতগুলো দেশ- এত বড় ভূখন্ড, ভারসাম্য রক্ষার জন্য দক্ষিণ গোলার্ধেও সে পরিমাণ ভূমি থাকবেই।
            ল্যাটিন শব্দ অস্টার (auster) মানে দক্ষিণ। অস্টার থেকে অস্ট্রাল- দক্ষিণ মেরু। শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে গেছে অথচ সভ্যতার আঁচ লাগেনি এই টেরা অস্ট্রালিস মানে দক্ষিণ মেরুর অচিনভূমিতে।
            আনুমানিক ১৫৩৬ থেকে ১৫৪৬ সালের মধ্যে আঁকা একটি ম্যাপ ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখা আছে। সেখানে দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি এই ভূ-খন্ড চিহ্নিত হয়েছে জাভা লা গ্রঁদ (Java La Grande)বা বৃহৎ জাভা নামে। ইন্দোনেশিয়ার কয়েক হাজার দ্বীপের বেশ কিছু আবিষ্কৃত হয়ে গেছে ততদিনে। জাভা দ্বীপের নামানুসারেই বৃহৎ জাভা
            অস্ট্রেলিয়া নামটা এসেছে অস্ট্রিয়ালিয়া ডেল ইস্পিরিতা সান্তো (Austrialia del Espirita Santo)বা সাউদার্ন ল্যান্ড অব হলি গোস্ট থেকে। (বাংলায় হলি গোস্ট-এর সঠিক প্রতিশব্দ কী হবে বুঝতে পারছি না। আমাদের সংস্কৃতিতে তো পবিত্র ভূত বা পবিত্র গাভীর আনাগোনা খুব একটা নেই।) পর্তুগিজ নাবিক ফার্নান্দেজ ডি কুইরোস সর্বপ্রথম এই নামটি ব্যবহার করেন ১৬০৬ সালে। ডি কুইরোস কাজ করতেন স্পেনের রাজা তৃতীয় ফিলিপের অধীনে। রাজা ফিলিপের জন্ম হয়েছিল অস্ট্রিয়ায়। ফার্নান্দেজ ডি কুইরোস রাজাকে খুশি করার উদ্দেশ্যেই টেরা অস্ট্রালিসকে অস্ট্রিয়ালিয়া নাম দিয়েছিলেন। রাজা যে খুশিই হয়েছিলেন তা বোঝা যায়। ডি কুইরোসকেই দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল অস্ট্রিয়ালিয়া খুঁজে বের করার।
            ১৬০৬ সালে পাল তোলা জাহাজ নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন ডি কুইরোস। প্রশান্ত মহাসাগরের অনেক অজানা দ্বীপ আবিষ্কৃত হলো। কিন্তু অস্ট্রিয়ালিয়া আবিষ্কার করার সুযোগ পান নি ডি কুইরোস। মাসের পর মাস পানিতে ভাসতে ভাসতে অসুস্থ হয়ে পড়তে শুরু করলো ডি কুইরোসের জাহাজের শ্রমিকেরা। শারীরিক অসুস্থতা থেকে মানসিক অস্থিরতা, অসন্তোষ। বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়লো জাহাজ জুড়ে। সেকেন্ড ইন কমান্ড লুই ভেজ ডি টরেস শ্রমিকদের পক্ষ নিয়ে কথা বলতেই প্রবল ঝগড়া হয়ে গেল ডি কুইরোসের সাথে। প্রচন্ড রেগে গিয়ে ক্যাপ্টেন ডি কুইরোস কাউকে কিছু না বলে ছোট একটা জাহাজে চড়ে চলে যান পেরু হয়ে স্পেনের দিকে। ক্যাপ্টেন ডি টরেস কয়েকদিন অপেক্ষা করলেন ডি কুইরোসের জন্য। কিন্তু ডি কুইরোস ফিরলেন না।
            ডি টরেস জাহাজ নিয়ে নিউ গিনির উত্তর দিক দিয়ে এগোবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু এমন ঝড়-বাতাস শুরু হলো যে তিনি গতিপথ বদলাতে বাধ্য হলেন। নিউ গিনির দক্ষিণ দিক দিয়ে ফিরে আসার সময় কেইপ ইয়র্কের অংশ বিশেষ দেখা গিয়েছিল, কিন্তু ক্যাপ্টেন টরেস ভেবেছিলেন ওটা ছোটখাট কোন দ্বীপ। তাই খুব একটা মনযোগ দেননি সেদিকে। দিলে হয়তো তিনিই হতে পারতেন উত্তরপূর্ব অস্ট্রেলিয়ার আবিষ্কারক। (কেইপ ইয়র্ক অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের অংশ)।
            ক্যাপ্টেন ডি টরেস নিউগিনির দক্ষিণে প্রায় শদুয়েক ছোট ছোট দ্বীপ দেখেছিলেন। ডি টরেসের অভিযানের ১৮০ বছর পর ব্রিটিশ সরকার এই দ্বীপগুলোর নাম রাখে টরেস স্ট্রেইট আইল্যান্ড। দ্বীপগুলো এখন অস্ট্রেলিয়ার অধীনে।
            ইউরোপিয়ানদের মধ্যে ডাচরাই প্রথম পা রাখেন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে। ১৬০৬ সালে ক্যাপ্টেন উইলেম জ্যান্‌স, তারপর ১৬১৬ সালে ক্যাপ্টেন ডার্ক হার্গট ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পশ্চিম সমুদ্রতীরে নোঙর ফেলেন। পরবর্তী কয়েক দশক ধরে আরো অনেক ডাচ জাহাজ এসেছে এখানে। এ কারণেই অস্ট্রেলিয়া নিউ হল্যান্ড নামে পরিচিত ছিল পরবর্তী অনেক বছর।
            জনমনুষ্যহীন এত বড় দ্বীপটির বেশিরভাগ অংশ তখনো অনাবিষ্কৃত। ইস্ট ইন্ডিজের ডাচ গভর্নর জেনারেল এন্থনি ফন ডাইমেন ব্যাপক পরিসরে দক্ষিণ গোলার্ধে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেন। কমান্ডার নিযুক্ত হলেন ক্যাপ্টেন আবেল তাসমান। ১৬৪২ সালের ১৪ আগস্ট তাসমানের জাহাজ জাকার্তা থেকে দক্ষিণ দিকে যাত্রা শুরু করে। দক্ষিণ মেরুর যতটা কাছাকাছি যাওয়া যায়। প্রায় তিন মাস ধরে চলার পর ২৪ নভেম্বর দুটো পাহাড়চূড়া দেখতে পেলেন ক্যাপ্টেন তাসমান। কিন্তু এমন ঝড়-তুফান চলছিলো সে সময়- অস্ট্রেলিয়া রয়ে গেল চোখের আড়ালে। তাসমান চলে গেলেন আরো প্রায় পাঁচশ কিলোমিটার দক্ষিণে ছোট্ট দ্বীপটির দিকে। নোঙর করলেন সেখানে। ক্যাপ্টেন তাসমান তাঁর গভর্নর জেনারেলের নামে দ্বীপটির নাম রাখলেন ডাইমেনস ল্যান্ড। (আরো দুশ বছর পর ১৮৫৬ সালে ক্যাপ্টেন তাসমানের সম্মানে দ্বীপটির নাম রাখা হয় তাসমানিয়া।)
            তাসমানিয়া আবিষ্কারের আটদিন পর আবিষ্কৃত হলো আরো আড়াই হাজার কিলোমিটার দক্ষিণের দ্বীপ নিউজিল্যান্ড। এর দুবছর পর ক্যাপ্টেন তাসমান আবারো এসেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার দিকে। ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পশ্চিম তীর ধরে ঘুরে গেছেন।
            অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূ-খন্ডে প্রথম যে ইংরেজ পা রাখেন বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- তিনি হলেন একজন দুর্ধর্ষ নাবিক উইলিয়াম ড্যাম্পিয়ার। জলদস্যুদের দেখলেই তাড়া করতেন ড্যাম্পিয়ার। ফলে তাঁর শত্রুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছিল। শেষে অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে ড্যাম্পিয়ার নিজেই শত্রুদের কাছ থেকে পালিয়ে যেতে চাইলেন যত দূরে যাওয়া সম্ভব। একটানা জাহাজ চালিয়ে চলে এসেছিলেন ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার ব্রুম-এর কাছে। প্রায় দুমাস ছিলেন সেখানে। অস্ট্রেলিয়ার অদ্ভুত সব জীবজন্তু গাছ-পালা দেখে অবাক হয়েছেন। পেটের থলিতে বাচ্চা নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলা এমন অদ্ভুত প্রাণী আগে দেখা তো দূরের কথা শোনেনও নি কখনো।
            ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার রুক্ষ আবহাওয়া সহ্য হয়নি ড্যাম্পিয়ারের। পথে শত্রুর হাতে পড়ার ভয় থাকা সত্ত্বেও ফিরে গেলেন ইংল্যান্ডে। ফিরে গিয়ে লিখে ফেললেন তাঁর ভ্রমণকাহিনি এ নিউ ভয়েজ রাউন্ড দি ওয়ার্ল্ড। লেখাটি প্রকাশিত হবার পর ব্রিটিশ সরকার ক্যাপ্টেন ড্যাম্পিয়ারকেই দায়িত্ব দিলো নতুন করে নিউ হল্যান্ড অভিযানের। ১৬৯৯ সালে পুরো চার মাস ধরে অভিযান চালিয়েও খুব বেশি নতুন কিছু আবিষ্কার করতে পারলেন না ড্যাম্পিয়ার।
            এরপর বছরের পর বছর ধরে অনেক অভিযান চলেছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার প্রধান অংশ আবিষ্কৃত হয় আরো সত্তর বছর পর। ১৭৭০ সালে দক্ষিণের কলম্বাস নামে খ্যাত ক্যাপ্টেন জেম্‌স কুক। তাঁর জাহাজ এনভেভার নোঙর করলো বোটানি বের সৈকতে। গ্রেট ব্রিটেনের পতাকা উড়িয়ে জায়গাটার নাম রাখা হলো নিউ সাউথ ওয়েল্‌স। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় আনুষ্ঠানিক ব্রিটিশ রাজ শুরু হয় আরো কয়েক বছর পর। জেম্‌স কুক্‌কে বীরের সম্মান দেয়া হয় অস্ট্রেলিয়ায়। ক্যাপ্টেন কুকের কটেজ আছে মেলবোর্নেই। যেতে হবে একদিন।
            ১৭৭৬ সালে আমেরিকা স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৭৮৩ সালে যুদ্ধ শেষ হবার পর উত্তর আমেরিকার সবগুলো কলোনি হারিয়ে ব্রিটেনের অবস্থা খারাপ। অর্থনৈতিক অবস্থার সাথে সাথে সামাজিক অবস্থাও ভীষণ খারাপ হতে শুরু করলো। চুরি ডাকাতি বেড়ে গেলো। স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক সমস্যা সহ আরো নানারকম অস্থিরতা তো আছেই। কয়েক মাসের মধ্যেই ব্রিটেনের কারাগারগুলোতে জায়গার সংকট দেখা দিলো। এতদিন বছরে এক হাজারেরও বেশি কয়েদীকে পাঠিয়ে দেয়া হতো ভার্জিনিয়া ও মেরিল্যান্ডে। ওগুলো এখন আমেরিকার দখলে।
            কয়েদী সমস্যার সমাধানের জন্য ব্রিটেন সরকার উঠেপড়ে লাগলো। অস্ট্রেলিয়া হয়ে উঠলো ভার্জিনিয়া ও মেরিল্যান্ডের বিকল্প। খুন-খারাবির মত জঘন্য অপরাধীদের নিয়ে তেমন কোন সমস্যা ছিল না। কারণ তাদের ধরে ফাঁসিতে ঝোলানো হতো। সমস্যা ছিলো ছোটখাট অপরাধী আর রাজনৈতিক বন্দীদের নিয়ে। তাদের সবাইকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো।
            ১৭৮৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ক্যাপ্টেন আর্থার ফিলিপের নেতৃত্বে ১৪৮৭ জন কয়েদী ভর্তি এগারোটি জাহাজ এসে ভিড়লো সিডনি কোভে। আট মাসেরও বেশি সময় লেগেছে তাদের ব্রিটেন থেকে অস্ট্রেলিয়ায় এসে পৌঁছাতে। কয়েকজন সৈন্য আর কিছু অফিসার ছাড়া বাকি সবাই চোর-ডাকাত। পরের বছরগুলোতে অনেক স্কটিশ আর আইরিশ রাজবন্দীকেও পাঠিয়ে দেয়া হয় অস্ট্রেলিয়ায় কোন রকম বিচার ছাড়াই।
            তারপর দুশ বছর ধরে কীভাবে নানা জাতির সমন্বয়ে ধীরে ধীরে একটা নতুন দেশ নতুন অস্ট্রেলিয়া তৈরি হয়েছে সে কাহিনি এখনো পড়া হয়নি। কাল রাতে আরো কিছুটা পড়তে পারতাম, কিন্তু ডেভিডের কারণে হলো না। ডেভিডের কথা কি তোমাকে বলেছিলাম?
            ফিলের ছেলে ডেভিডের সাথে দুএকবারের বেশি দেখা হয়নি। প্রথমবার দেখেই মনে হয়েছিল সে ড্রাগ নেয়। আর সিগারেট তো সারাক্ষণ মুখে লেগেই থাকে। মনে মনে তাকে এড়িয়ে চলতে চেয়েছি। কিন্তু কাল রাত সাড়ে নটার দিকে দরজায় টোকা পড়ার পর দরজা খুলে দেখি সিগারেট মুখে দাঁড়িয়ে আছে ডেভিড আর তার গায়ের সাথে লেপ্‌টে আছে একজন তরুণী।
            হাই প্রাডিব, হাউ ইউ ডুয়িং?
            গুড ডেভিড। হাউ আর ইউ?
            গুড। মিট জোয়ানা, মাই গার্লফ্রেন্ড। এন্ড জোয়ানা- হি ইজ প্রাডিব
            ডেভিডকে যতই এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি, ভদ্রতার দায় তো এড়াতে পারি না। ভদ্রতার দাঁত বের করে জোয়ানার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। জোয়ানা আমার হাতটা টেনে নিয়ে হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে দুগালে চুমু খেলো। এটা হয়তো এদেশের সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু আমি আশাও করিনি জোয়ানা এরকম কিছু করবে। ভালো করে তাকালাম জোয়ানার দিকে। মাধুর্য বলতে যা বোঝায় তার কিছুই নেই তার মুখে। সামান্য গোল মুখ আর বিড়ালের চোখের মত চোখ। উচ্চতায় প্রায় আমার সমান। একটা ব্যাপারই জোয়ানার মধ্যে বড় বেশি স্পষ্ট- তা হলো শরীর। ডেভিডের একটা হাত জোয়ানার কোমর জড়িয়ে রেখেছে।
            প্রাডিব খুব ভালো ছেলে। ইউনিভার্সিটিতে পড়তে এসেছে ইন্ডিয়া থেকে- ডেভিড প্রশংসা করছে আমার। আমার ভদ্রতা হঠাৎ বেড়ে গেলো। মুখের হাসি আরো বিস্তৃত করে বললাম, এসো এসো, ভেতরে এসো
            রুমে ঢুকেই জোয়ানা বসে পড়লো আমার বিছানায়, আর ডেভিড হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ার ভঙ্গিতে বললো, তুমি কিছু মনে না করলে একটা অনুরোধ করতাম তোমাকে
            আমার চোখ ডেভিডের মুখ ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে জোয়ানার পায়ের দিকে। আমার বিছানাটির উচ্চতা সম্ভবত স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। নইলে জোয়ানার পা দুটো ফ্লোরে না লেগে এরকম দুলছে কীভাবে। স্কার্ট নামক যে বস্তুটা সে পরে আছে তা উঠে গেছে হাঁটুর উপরে।
            আমরা পিৎজার অর্ডার দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমাদের কাছে ক্যাশ নেই। ডেলিভারিম্যান কার্ড নিচ্ছে না। তোমার কাছে যদি ক্যাশ থাকে তাহলে লোকটাকে দিতে পারি। সে দাঁড়িয়ে আছে বাইরে
            ডেভিডের উদ্দেশ্য বোঝা যাচ্ছে। তার কথা বিশ্বাস করবো কি করবো না ভাবার আগেই জোয়ানার দিকে চোখ গেলো আবার। সে ইতোমধ্যে বিছানায় এলিয়ে পড়ে পা নাচাতে নাচাতে বলছে, প্রাডিবের বিছানাটা ডেভিডের বিছানার চেয়ে অনেক বেশি আরাম
            তেল দেবার কত রকমের আর্ট জানে মানুষ। কিন্তু তেল দিচ্ছে জানার পরেও যারা তৈলাক্ত হয় তাদের তুমি কী বলবে? যেমন সেই মুহূর্তের আমি? বললাম, কত লাগবে?
            বিশ ডলার
            ওয়ালেট খুলে বিশ ডলারের একমাত্র নোটটা তুলে দিলাম ডেভিডের হাতে।
            এক ঘন্টার মধ্যেই আমরা এ-টি-এম থেকে ডলার তুলে ফেরত দেবো তোমাকে
            না, না, পরে দিলেও চলবে। এই ঠান্ডায় আবার বাইরে যাবার দরকার কী?- আমার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিলো না যে আমি এরকম দাতা কর্ণের মত বাণী দিচ্ছি।
            থ্যাংক ইউ প্রাডিব। ইউ আর গ্রেট। সি ইউ টুমরো বলে বেরিয়ে গেলো ডেভিড আর জোয়ানা। আমি ওয়ালেটটা নিয়ে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। লন্ডনের ছাপমারা সুন্দর ওয়ালেটটা পিয়া আমাকে দিয়েছে। তার আব্বু এনেছিলেন লন্ডন থেকে। ওটাতে এখন পাঁচ ডলারের একটা নোট আছে। স্কলারশিপের প্রথম কিস্তি গতকাল মানে শুক্রবার জমা হবার কথা ছিল। যদি না হয় খবর আছে আমার।
            আজ সকাল সাড়ে সাতটার দিকে একবার উঠতে চেষ্টা করেছিলাম। কম্বলের ভেতর থেকে মাথাটা বের করতেই মনে হলো ডিপ-ফ্রিজের দরজা খুললাম। কোন মানে হয় না এত ঠান্ডায় এত সকালে ওঠার। ছুটির দিনের শীতের সকালের আলাদা একটা মর্যাদা আছে। যত দেরি করে বিছানা ছাড়া যায় ততই মর্যাদা বাড়ে। ঘুমের দ্বিতীয় পর্ব শুরু করলাম ঠিকই, কিন্তু ঘুম এলো না। এলো সব এলোমেলো চিন্তা। বাড়িতে মাঘ মাসের শীতের তাপমাত্রা কখনো নয়-দশ ডিগ্রির নিচে নামেনি। তাতেই মনে হতো- জমে যাবো ঠান্ডায়। অথচ এখানে এখন চার ডিগ্রির সকাল।
            অস্ট্রেলিয়ায় আসার আগে উত্তর গোলার্ধ আর দক্ষিণ গোলার্ধের জলবায়ুর পার্থক্য নিয়ে কখনো ভেবেও দেখিনি। অথচ দেখো স্কুলের ভূগোল বইতে এসব আমাকে পড়তে হয়েছিল। মুখস্ত করে পরীক্ষার খাতার লিখেওছিলাম। তখন কি জানতাম নাকি ওই জ্ঞান কখনো কাজে লাগবে?
            বেরোলাম দশটার পরে। লাইগন স্ট্রিট ধরে হাঁটতে হাঁটতে রয়েল এক্সিবিশান সেন্টার হয়ে পার্কের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পার্লামেন্ট স্ট্রিটে এসে সোজা ভিক্টোরিয়ার পার্লামেন্টের সামনে। ভিক্টোরিয়া রাজ্যটির আয়তন দুই লাখ সাতাশ হাজার ছয়শ বর্গ কিলোমিটার। বাংলাদেশের প্রায় দ্বিগুণ। অথচ এ রাজ্যের মোট জনসংখ্যা মাত্র পয়ঁত্রিশ লাখ। একেবারে রাস্তার সাথে লাগানো পার্লামেন্ট হাউজের সিঁড়ি। কোন রকম নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আছে বলে মনে হলো না। মাত্র দুজন পুলিশকে দেখলাম। তাদের একজন আবার একদল ট্যুরিস্টের ছবি তুলে দিচ্ছেন।

হাঁটতে হাঁটতে ট্রেজারি বিল্ডিং ছাড়িয়ে ফিট্‌জরয় গার্ডেন বামে রেখে ফ্লিন্ডার স্টিটে পৌঁছে গেলাম। সামনেই ইয়ারা। দক্ষিণ তীরে মেলা বসেছে- সানডে মার্কেট। ঘুরতে ঘুরতে জিনিস দেখলাম, মানুষ দেখলাম, নদী দেখলাম। তারপর পেটে টান পড়তেই চলে এসেছি। বিগ-ম্যাক খাবো কি না ভেবেছিলাম একবার। কিন্তু ডেভিড যদি বিশ ডলার ফেরত না দেয়, স্কলারশিপের টাকা যদি এ সপ্তাহেও জমা না হয়, তবে মাত্র পাঁচ ডলারে চলতে হবে।
            ফেরার পথে সোয়ান্সটন স্ট্রিট। মানুষ দেখতে দেখতে ফেরা। ঘোড়ার গাড়ির ভীড় আর দুর্গন্ধ আজকেও আছে। ঠান্ডা হাওয়ার সাথে মেঘ-মাখা কিছু রোদও আছে। বার্ক স্ট্রিটের ফুটপাত-শিল্পীদের ছবি আঁকা আছে, ডেভিড-জোন্স আর মায়আরের সামনে আদিবাসীদের নাচ আছে, গান আছে, সারা গায়ে রঙ মেখে যন্ত্রসাজা মানুষ আছে, ট্রাম আছে, বাস আছে, সারি সারি গাড়ি আছে, হাসি আছে, হুল্লোড় আছে, রোববারের মেলবোর্নে যা যা থাকার সবই আছে- অথচ মনে হচ্ছে কিছু একটা নেই- তীব্রভাবে নেই।
_____________
PART 22


ইয়ারার তীরে মেলবোর্ন - বিংশ পর্ব




২৫ জুলাই ১৯৯৮ শনিবার

স্কুল অব ফিজিক্স বিল্ডিং এর বাইরের রঙটা কেমন যেন ম্লান ধূসর। তার ওপর একটা অংশে ঘন লাল রঙের ইট লাগানো। ধূসর শাড়ির লাল পাড়ের মত উঠে গেছে সাত তলার কার্নিশ পর্যন্ত। পড়ন্ত বিকেলে সূর্যের আলো পড়েছে সেই লাল পাড়ে। আলোর অনিয়মিত প্রতিফলনের সূত্র মেনে কিছুটা উপচে পড়া লাল আলো এখন আমার অফিসের জানালায়। শনিবারের ছুটির দিনেও যারা কাজের নেশায় ছুটে আসে তাদেরও অনেকেই চলে গেছে এর মধ্যে। আমি বসে আছি আমার ডেস্কে। মনটা কেমন যেন অনুভূতিহীন ভোঁতা হয়ে আছে। তুমি আমার এই অনুভূতিহীন অনুভূতিটার নাম দিয়েছো রাইনো-সাইকোসিস। গণ্ডার-মানসিকতা, নাকি গন্ডার-প্রবণতা?     
            তুমি যে মাঝে মাঝে আমাকে গণ্ডারের সাথে তুলনা করো তার সঠিক কারণ কখনো ব্যাখ্যা করোনি। মাথার সামনের দিকে বেরিয়ে আসা শিং-টা বাদ দিলে গণ্ডারের যে চেহারা হয় তার সাথে আমার মুখের অনেক সাদৃশ্য আছে ঠিকই, কিন্তু শুধুমাত্র সেজন্যই আমাকে গণ্ডার বলে ডাকবে অতটা ছেলেমানুষী যুক্তি তোমার নয়। মান-অপমান-অভিমান জাতীয় আবেগ অনুভূতি গুলোর ব্যাপারে আমার প্রতিক্রিয়ার অতিধীর গতির কারণেই যে আমার গণ্ডার উপাধি প্রাপ্তি তা আমি জানি। কিন্তু গণ্ডারের চামড়া ঠিক কতটা পুরু তা কি তুমি জানো? গণ্ডারের চামড়াবাক্যাংশটা ছাড়া গন্ডারের আর কোন ব্যবহার আমাদের জীবনে নেই। গণ্ডার তো আর আমাদের দেশের প্রাণী নয় যে আমরা তাদের পুষবো, আর মাঝে মাঝে কোন না কোন অলৌকিক কৃপা প্রাপ্তির আশায় একটা দুটো বলি দেবো, তারপর তাদের মাংস খাবো আর চামড়ার পুরুত্বের সদ্ব্যবহার করবো। গণ্ডার প্রসঙ্গটা মনে পড়ার কারণ হলো আজ নিজেকে সত্যি সত্যিই গন্ডার মনে হচ্ছে। ছোটখাট একটা কাজের জন্য এতদিন এতভাবে ব্যর্থ হয়েও আমার শিক্ষা হলো না। আজকেও আরো কয়েকটা পিলার অব সাকসেস অর্জন করলাম।
            সকাল থেকেই শুরু করি। ঘুম ভাঙতেই জানলায় ঝকঝকে রোদ। মেঘের কোলে রোদ হেসেছে, বাদল গেছে টুটি, আজ আমাদের ছুটি, ও-ভাই আজ আমাদের ছুটি। কত প্রিয় কত মিষ্টি একটা শব্দ- ছুটি। কদিন আগেও দিনগুলো কত অন্যরকম ছিল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হতো বন্ধুদের সাথে আড্ডা। তারপর মামামের সাথে গল্প, দিদিভাইর সাথে নতুন কোন বই বা কলেজের কোন ঘটনা নিয়ে মজার মজার তর্ক বাধিয়ে ভরপেট খেয়ে মাঝরাতে বাসায় ফেরা। শুক্রবার এগারোটা পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমানো। তারপর দিদির বাসায় গিয়ে সোজা খাবারের টেবিলে বসে যাওয়া। ছোট ছোট দস্যি দুটোর সাথে সারা দুপুর বিকেল হুল্লোড় করা। মনে হচ্ছে এক যুগ কেটে গেছে প্রবাসের নির্বাসনে এসেছি। মনটা খারাপ হয়ে গেলো। ছুটির দিন এখানে কত অন্যরকম।
            টা বাজার আগে থেকেই প্রচন্ড জোরে শব্দ হচ্ছিলো দরজার বাইরে। কাঠে পেরেক ঠোকার শব্দ, ড্রিল মেশিনের শব্দ। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখলাম ফিল লাউঞ্জ আর কিচেনে যাবার মাঝখানে একটা পার্টিশান দিচ্ছেন। নিজেই মিস্ত্রি। চক্ষুলজ্জা হয়েছে তাহলে? কাল রাতে কিচেন থেকে বেরিয়ে কী যে একটা অস্বস্তিকর দৃশ্যের সামনে পড়েছিলাম। ফিল মনে হয় মাতাল হয়েই ফিরেছিল ক্যাথিকে নিয়ে। নইলে এতটা নির্লজ্জ হতে পারতো না। ফিলের সাথে আমার চোখাচোখি হয়েছে, হাত তুলে হাইও বলেছেন আমাকে। আমি দেখেও না দেখার ভান করে চলে এসেছি। নিজের এপার্টমেন্টে সঙ্গিনীর সামনে নিরাবরণ ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতা ফিলের নিশ্চয় আছে। তবে সেটা লাউঞ্জে না করে বেডরুমে করলে হয় না?
            নেশা কেটে যাবার পর ফিল যে কিছুটা লজ্জিত হয়েছে তা বুঝতে পারলাম সকালের একটা ঘটনায়। এ বাসায় প্রথম শনিবার আজ। ময়লা জামাকাপড় জমে গেছে অনেক। ধোয়া দরকার। প্লাস্টিকের একটা বালতি কিনে এনেছিলাম, কাজে লেগে গেলো। বাথটাবে বসে উদয়দার দেয়া হুইল সাবানে প্রচুর ফেনা তুলে কাপড় কাচতে গিয়ে হয়তো একটু বেশি শব্দ করে ফেলেছিলাম। বাথরুমের দরজায় ধুম-ধুম শব্দ আর ফিলের চিৎকার এক সাথে শোনা গেল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। বাথরুমে কি কাপড়-কাচা নিষেধ? নিষেধ থাকলে দেয়ালে নোটিশ লাগানো থাকতো। যেমন রান্নাঘরের দেয়াল এখন হরেক রকমের নোটিশে ভর্তি। কিন্তু বাথরুমে কাপড়-কাচা সংক্রান্ত কোন নোটিশ চোখে পড়ে নি। বাথরুমের আয়নায় যে স্টিকারটা দেখা যাচ্ছে তাতে লেখা আছে হোয়াট ইউ ক্যান ডু টুমরো, নেভার ডু ইট টু-ডে- যে কাজ কাল করলেও চলবে তা কিছুতেই আজকে করো না। কিন্তু তার সাথে কাপড়-কাচার কোন সম্পর্ক নেই।
            বাথরুমের দরজা খুললাম।
            হোয়াট ইউ ডুয়িং? হাসিমুখে জানতে চাইলেন ফিল। ভয়ের কিছু নেই তাহলে।
            ওয়াশিং ক্লথ্‌স
            কাম উইথ মি। আই উইল শো ইউ সামথিং
            আমার পরনে ভেজা লুঙ্গি, নিজেও আধভেজা। এ অবস্থায় বেরোতে ইতস্তত করছি দেখে ফিল বললেন, তোমাকে লন্ড্রি রুম দেখাতে চেয়েছিলাম। ওয়াশিং মেশিন, ড্রায়ার সব আছে সেখানে
            প্লিজ গিভ মি ফাইভ মিনিট্‌স
            পাঁচ মিনিটের মধ্যে জামাকাপড় বদলে, কাচা কাপড়গুলো বালতিতে ভরে ফিলের সাথে বেরোলাম এপার্টমেন্টের বাইরে। বিল্ডিং এর মাঝখানে যেখানে লিফ্‌ট- তার অপরদিকে কমন লন্ড্রিরুম। দুদিকের দুটো দরজা তালাবদ্ধ থাকে সবসময়। প্রত্যেক এপার্টমেন্টেই চাবি আছে। ফিল দরজা খুলে দিলেন। কমার্শিয়াল সাইজের দুটো ওয়াশিং মেশিন আর দুটো ড্রায়ার- বিশটা ফ্যামিলির জন্য যথেষ্ঠ। বিল্ডিং এর প্রত্যেক ফ্লোরেই একটা করে আছে। একেবারে বিনামূল্যে এমন সুবিধা আর কোথায় পাওয়া যায়? কিন্তু ফ্রি জিনিসের যে যত্ন থাকে না তার প্রমাণ পেয়ে গেলাম প্রথম দিনেই। একটা ড্রায়ার খুলে দেখা গেলো ভেতরে একজোড়া কাপড়ের জুতা আর একটি পাপোষ। সুযোগের অপব্যবহার তো দেখছি ইউনিভার্সাল।
            ফিল খুব উৎসাহ নিয়ে আমাকে শেখাচ্ছেন কীভাবে ওয়াশিং মেশিন ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে কাপড় শুকাতে হয়, ড্রায়ার এনগেজ্‌ড থাকলে কী করতে হবে। লন্ড্রি রুমের পাশে আরেকটি রুম আছে। লন্ড্রির চাবিতেই খোলা যায়। সেখানে কাপড় মেলে দেয়ার ব্যবস্থা আছে। ফিলের এরকম হাসিখুশি আন্তরিক ব্যবহার আগে কখনো দেখিনি। মানুষ যখন অপরাধবোধে ভোগে- তখন হঠাৎ এরকম ভালো ব্যবহার শুরু করে।
            সাড়ে দশটার মধ্যে বেরিয়ে পড়লাম। জুলাই মাসের রোদ কতক্ষণ থাকবে কেউ জানে না। সেফ-ওয়েতে গেলাম। কাল রাতে একটা ফরম নিয়ে এসেছিলাম। আজ জমা দিয়ে এলাম। খন্ডকালীন কাজের দরখাস্ত। কাউন্টারের মেয়েটি বলেছে- স্টোর ম্যানেজার ফোন করে জানাবেন কখন ইন্টারভিউ ইত্যাদি। দরখাস্তে ফিলের ফোন নম্বর দিয়েছি। সন্ধ্যাবেলা ফোন করলে ফিল আমাকে নিশ্চয় ডেকে দেবেন।
            শনিবারের এজ পত্রিকা কেনা ছেড়ে দিয়েছি। পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপন দেখে কাজ জোগাড় করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না বলে মেনে নিয়েছি। গতকাল স্টুডেন্ট সেন্টার থেকে আরো কিছু কাজের খবর টুকে এনেছি। ভিন্ন ভিন্ন রকমের কাজ। পার্ট-টাইম একটা কাজের জন্য ছটফট করার পেছনে কেমন যেন একটা জেদ কাজ করছে বুঝতে পারছি। কাজ না করলে যে একেবারে না খেয়ে মরতে হবে তা কিন্তু নয়। বাস্তব হিসেব করে দেখেছি স্কলারশিপের টাকা দিয়ে টিউশন ফি কভার হয়ে যাবে। আর ডিপার্টমেন্টে পড়িয়ে যা পাওয়া যাবে তাতে থাকা-খাওয়া চলবে। কিন্তু কথা সেটা নয়। কথা হলো সবাই কাজ পাচ্ছে, আমি পাবো না কেন। যে কোন একটা কাজ পেয়ে গেলেই দেখা যাবে কাজ খোঁজার ইচ্ছেটাই চলে গেছে আমার।
            প্রথম ফোনটা করলাম ঠিক এগারোটা পাঁচ মিনিটে। কী কী বলবো আগে থেকে ঠিক করে রেখেছি। কিন্তু শুধুমাত্র মুখস্ত করা সংলাপে যে হবে না তাও জানি।
            গুড মর্নিং। ক্যান আই স্পিক টু মিস স্কাইলা প্লিজ
            ইয়েস, স্পিকিং
            পরবর্তী সংলাপগুলো বাংলায় বললে এরকম শোনাতোঃ
            আমার নাম প্রদীপ। শুনেছি আপনাদের কোম্পানিতে নাকি ক্লিনার নিচ্ছেন? আমি ওই কাজের জন্য আগ্রহী
            আপনার গাড়ি আছে?
            একটু অবাক হলাম। গাড়ি থাকলে আমি ক্লিনারের চাকরি খুঁজি? কিন্তু প্রশ্নের বদলে প্রশ্ন করা যায় ইন্টারভিউ নেবার সময়, দেবার সময় নয়। বললাম- না ম্যাডাম, আমার গাড়ি নেই
            সরি। গাড়ি না থাকলে এ কাজ আপনি করতে পারবেন না
            আমি বুঝতে পারছি না ম্যাডাম। গাড়ির সাথে এ কাজের কী সম্পর্ক?
            হাঃ হাঃ হাঃ ওপ্রান্তে জোরে হাসির শব্দ। মনে হচ্ছে স্কাইলা ম্যাডাম এরকম প্রশ্ন আগে কখনো শোনেন নি। স্কাইলার কথায় একটা অদ্ভুত টান আছে- ঠিক কোন্‌ অঞ্চলের টান বুঝতে পারছি না। তবে তিনি যে অস্ট্রেলিয়ান নন তাতে কোন ভুল নেই। বললাম, সরি ম্যাডাম। আমি আসলে নতুন এসেছি এই দেশে। ঠিক জানি না ক্লিনিং এর জন্য কেন গাড়ি লাগবে
            সব সময় যে লাগবে তা নয়। তবে আমাদের কোম্পানিতে লাগবে। কারণ আমাদের বেশির ভাগ কাজ থাকে এয়ারপোর্টে। ভোর চারটা থেকে শুরু হয়। তখন পাবলিক ট্রান্সপোর্ট থাকে না। নিজের গাড়ি না থাকলে কাজে আসবেন কীভাবে?
            থ্যাংক ইউ ম্যাডাম। থ্যাংক ইউ ফর ইওর টাইম
            ও-কে। বাই
            যে সমস্ত কাজকে আমি খুব বেশি সহজ বলে ভেবেছিলাম- সেগুলোই দেখছি সবচেয়ে কঠিন। আরেকটা সহজ কাজের খবর হাতে আছে-গার্ডেনিং।
            বাগান করার ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা মারাত্মক। গ্রামের ছেলে হলেও বাগান করার প্রতি তেমন উৎসাহ আমার কোন কালেই ছিল না। কারণ আমাদের বাড়িতে বাগান করার জায়গা তো দূরের কথা, ঠিকমত একটা উঠোনও নেই। বাড়ির জায়গাটাও বাবাকে কত পরিশ্রম করে অন্যের কাছ থেকে চড়া সূদে টাকা ধার করে কিনতে হয়েছে। তাই নেই বলে কোন অভিযোগ আমাদের পক্ষ থেকে ছিল না কোন দিনই। তবুও মাঝে মাঝে দাদাকে দেখতাম কোথা থেকে জবা ফুলের একটা ডাল কেটে এনে যেন তেন ভাবে একটা কোণে পুঁতে দিচ্ছে। কিছুদিন পরে দেখা গেলো ওটাতেই নতুন পাতা গজাচ্ছে, ফুল ফুটছে। তার দেখাদেখি আমিও মাঝে মাঝে ওরকম করতাম। একবার কাঠ-গোলাপের একটা ডাল পুঁতেছিলাম। একটা-দুটো নতুন পাতাও গজিয়েছিল, কিন্তু বাঁচেনি। আম খেয়ে আমের আঁটি পুঁতে রাখতাম মাটিতে। কিছুদিন পর গাছ জন্মালে আনন্দ হতো খুব। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এগুলোকে নিশ্চয় বাগান-করা বোঝায় না। বড় হবার পর ছোটবেলায় যেটুকু উৎসাহ ছিল তাও গেছে। দাদার বিয়ের পর বৌদিকে দেখলাম সিরিয়াসলি বাগান করতে। সে বড় হয়েছে বাগানময় পরিবেশে। কত রকমের গোলাপ যে আছে তাদের বাগানে। আমাদের বাড়িতে আসার সময় তার সাথে এলো অনেকগুলো গোলাপের টব। ছুটিতে বাড়িতে গিয়ে তার সাধের ছাদের গোলাপ বাগানে কাজ করলাম একদিন। টবের মাটি কুপিয়ে দেয়া, কিছুটা গোবর মেশানো, আর পানি দেয়া। এগুলো নিশ্চয় কঠিন কোন কাজ নয়। খুব আন্তরিক ভাবেই করলাম। পরদিন ছুটি শেষ, চলে এসেছি। পরের সপ্তাহে খবর পেলাম যে কটা গোলাপ গাছের সেবা আমি করেছিলাম তার সবগুলোই জীবনের মায়া ত্যাগ করেছে। বুঝতেই পারছো আমার গার্ডেনিং-এর অভিজ্ঞতা কতটা মারাত্মক। কিন্তু এসব কথা বলা যাবে না মিসেস অনিতা রুথকে।
            অনিতা রুথ- ভারতীয় নাম মনে হচ্ছে। ফোন করলাম। খুব মিষ্টি গলা অনিতা রুথের। গার্ডেনিং এর ব্যাপারে ফোন করেছি শুনে বললেন, আমি সেই সকাল থেকে অপেক্ষা করছি। ওরা বলেছিল দশটায় আসবে। এখনো তো দেখা নেই। কোথায় থাকো তুমি?
            কার্লটন
            তাহলে তো খুব কাছে। এখন আসতে পারবে?
            ইয়েস ম্যাডাম। এখুনি আসতে পারবো। ঠিকানাটা যদি আবার বলতেন
            ব্রাঞ্চউইকের ঠিকানা। বাসা খোঁজার সময়ের এরিয়া ম্যাপটা কাজে লেগে গেলো। আধঘন্টা লাগলো ০১ নম্বর ট্রামে যেতে। কোবার্গে যে বাসা খুঁজতে গিয়েছিলাম সেদিকেই অনিতা ম্যাডামের বাসা। সুন্দর ঝকঝকে সাবার্ব। প্রায় সব বাড়ির সামনেই বাগান। বাসা খুঁজে পেতে দেরি হলো না।
            লাল ইট আর টালির ছাদের ছোট ছিমছাম সুন্দর বাড়ি। বাড়ির সামনেই লোহার রেলিং ঘেরা বাগান। অনেক রকম ফুল। হলুদ কুমড়ো ফুলের মত দেখতে ফুলগুলোই যে ড্যাফোডিল তা জেনেছি মাত্র কদিন আগে। অথচ ড্যাফোডিলের নাম শুনছি ছোটবেলা থেকে। গোলাপের সিজন নয় এটা। গাছগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছে সাইজ করতে হবে ওদের। ডাল কাটতে হবে, মাটি কোপাতে হবে, তৈরি করে রাখতে হবে আগামী সিজনের জন্য। শীত শেষ হতে না হতেই তো মৌসুম শুরু হয়ে যাবে। কিন্তু গোলাপ সম্পর্কিত পূর্ব-অভিজ্ঞতার কারণে কিছুটা ভয়ও লাগছে। বৌদির অতগুলো গোলাপ গাছ হত্যা করেও বেঁচে গেছি তার স্বামীর ছোটভাই হবার সুবাদে। কিন্তু অনিতা ম্যাডামের সাধের গোলাপের কিছু হলে আমাকে আস্ত রাখবেন? তাছাড়া গার্ডেনিং এর জন্য কোন লাইসেন্স লাগে কি না তাও তো জানি না। এদেশে তো শুনি বড়শি দিয়ে মাছ ধরার জন্যও লাইসেন্স লাগে।
            লোহার ছোট্ট গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই বাড়ির বারান্দা থেকে বাগানে নেমে এলেন একজন বয়স্ক মহিলা। পরনে একটা লম্বা ওভারকোট। পায়ে নরম তুলোর জুতো।
            গুড ডে ম্যাম
            গুড ডে
            গলার স্বর শুনে বুঝলাম ইনিই মিসেস অনিতা রুথ। আমার কল্পনার সাথে যার একটুও মিল নেই। যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি বয়স্ক এই মহিলা। গায়ের রঙ ধবধবে সাদা। চেহারা, উচ্চতা, গড়ন সব মিলিয়ে স্নিগ্ধ একটা ভাব। ভারতীয় হবার কোন সম্ভাবনা নেই।
            একটু আগে আমিই ফোন করেছিলাম জেনে বললেন, খুব ভালো হয়েছে তুমি এসেছো। এই হলো বাগান। আজকের মধ্যে ঠিক করে ফেলতে পারবে না?
            কী কী করতে হবে?
            তুমি নিশ্চয় জানো কী কী করতে হবে। গোলাপগুলোকে ঠিক করে দিতে হবে। আর ওদিকে ছয়টা নতুন বেড হবে। কী রকম চার্জ করো তোমরা?
            জ্বি ম্যাডাম?
            তুমি কি ইন্ডিপেন্ডেন্টলি কাজ করো, নাকি কোন কোম্পানির হয়ে কাজ করছো? তোমার এসিস্ট্যান্ট নেই কেউ?
            জ্বি না ম্যাডাম, আমি একা
            নট এ প্রোব্লেম। কত নেবে পুরোটা করতে?
            আপনি যা দেন ম্যাডাম
            ঠিক আছে। পুরোটার জন্য পঞ্চাশ ডলার পাবে। রাজী হলে কাজে লেগে যাও
            ও-কে ম্যাডাম
            বাম দিকের কোণা থেকে শুরু করো
            ও-কে ম্যাডাম। যন্ত্রপাতি কোথায়?
            ইন ইওর কার, আই বিলিভ
            আমার গাড়ির মধ্যে যন্ত্রপাতি! বিপদের গন্ধ পাচ্ছি। অনিতা ম্যাডাম আমাকে পেশাদার গার্ডেনার মনে করেছেন। বোকার মত তখনো দাঁড়িয়ে আছি দেখে অনিতা বুঝে গেলেন আমার অবস্থা।
            ইউ আর নট প্রফেশনাল
            সরি ম্যাডাম
            তোমার গার্ডেনিং ইকুইপমেন্ট কিছুই নেই
            না ম্যাডাম
            দেশ কোথায়?
            বাংলাদেশ
            অস্ট্রেলিয়ায় কত দিন?
            সতের দিন
            মিসেস অনিতা রুথ কয়েক সেকেন্ড আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ঘরের ভেতর চলে গেলেন। পালিয়ে আসার এই সুযোগ। কিন্তু কিছু না বলে চলে আসাটা অভদ্রতা। তাছাড়া হয়তো তিনি যন্ত্রপাতি আনতে গেছেন।
            একটু পরেই বেরিয়ে এলেন অনিতা। হাতে কোন যন্ত্রপাতি নেই। সামনে এসে মুখটা হাসি হাসি করে বললেন, তোমার অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু দুঃখিত, পেশাদারী দক্ষতা ছাড়া এ জাতীয় কাজ তুমি করতে পারবে না। করা উচিতও নয়। এই নাও দশ ডলার।
            কাজ দিতে পারছেন না বলে টাকা দিতে চাইছেন। মিসেস রুথের উদারতায় আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। কিন্তু কাজ না করে টাকা নেয়া আর ভিক্ষা নেয়ার মধ্যে পার্থক্য কী? বললাম, অনেক ধন্যবাদ ম্যাডাম। আমাকে টাকা দেয়ার দরকার নেই।
            না, না। রাখো এটা। আমি তোমাকে আসতে বলেছি। আমার উচিত ছিল তোমাকে সব জিজ্ঞেস করা
            ঠিক আছে ম্যাডাম। টাকা লাগবে না। আপনার সময় নষ্ট করার জন্য দুঃখিত
            চলে এলাম। ট্রামের টিকেটের মেয়াদ আছে আরো ঘন্টাখানেক। ইউনিভার্সিটির স্টপে না নেমে চলে গেলাম ফ্লিন্ডার স্ট্রিট পর্যন্ত। ট্রাম থেকে নেমে এগোলাম ইয়ারার দিকে। অনেকগুলো ঘোড়ার গাড়ি আজ সোয়ান্সটন স্ট্রিট আর ফ্লিন্ডার স্ট্রিট স্টেশনের সামনে। ট্যুরিস্টদের অনেকেই চড়ছে ঘোড়ার গাড়িতে।
            ইয়ারার দুই তীরে অনেক ভীড় আজ। শনিবারের দুপুরে এরকম ভীড় স্বাভাবিক। আকাশে একটু একটু মেঘ জমতে শুরু করেছে। সন্ধ্যার আগেই হয়তো বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে। কিছুক্ষণ লক্ষ্যহীন হাঁটলাম ইয়ারার  তীর ধরে। ঠান্ডা দমকা হাওয়ায় বেশিক্ষণ হাঁটা গেলো না, ফিরে এলাম। ট্রামে চড়ার মানে হয় না। দশ মিনিটের মধ্যে চলে এলাম মেলবোর্ন সেন্ট্রালের সামনে।
            দুটো বাজতে মিনিট পাঁচেক বাকি। সেন্ট্রালের বড় ঘড়িটার বাজনা শুরু হবে দুটো বাজলেই। দেখা যেতে পারে। নিউজ এজেন্টের পাশ দিয়ে যাবার সময় কাচের দরজায় লাগানো বিজ্ঞাপ্তিটা চোখে পড়লো- পার্ট-টাইম সেল্‌স পজিশান এভয়েলেভল, আস্ক এট দি কাউন্টার
            জাপান সরকারের দেয়া বিশাল ঘড়িটায় গান বাজনা শুরু হয়ে গেলো একটু পরেই। অনেকে ছবি তুলছে, ভিডিও করছে। আমার মাথায় ঘুরছে পার্ট-টাইম সেল্‌স পজিশান। পেপার, ম্যাগাজিন, স্টেশনারির বিরাট ব্যস্ত দোকানের সেল্‌স পার্সন। সহজ কাজ- কাউন্টারে দাঁড়িয়ে স্ক্যান করো আর ক্যাশ রেজিস্ট্রারের হিসেব মত টাকা নাও। কিন্তু প্রধান সমস্যা তো কমিউনিকেশান। অনেক চেষ্টায় কয়েকটা ইংরেজি বাক্য বলতে পারি ঠিকই, কিন্তু অন্যের বাক্য তো বুঝতে পারি না। তবে চেষ্টা করে দেখতে তো অসুবিধে নেই। আরো একটা ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা হবে।
            পাশাপাশি তিনটি ক্যাশ রেজিস্ট্রার। দুজন তরুণী আর একজন মধ্যবয়সী পুরুষ কাজ করছেন সেখানে। মোটামুটি ভীড়। পুরুষটার পরনে কোট-টাই। গম্ভীর চাউনিতে প্রবল ম্যানেজারিয়্যাল ভাব। সামনে যেতেই মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?
                পার্ট-টাইম সেল্‌স পজিশানের জন্য আগ্রহী শুনে আমার আপাদমস্তক দেখলেন কয়েক বার। শেভ করিনি, জামাকাপড়ের যা অবস্থা- ইচ্ছে করছে এক ছুটে পালিয়ে যাই। কিন্তু উপায় নেই। বল এখন ম্যানেজারের কোর্টে। তাঁর ঠোঁটের কোণায় বিদ্রুপের হাসি ক্রমশঃ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
                ডু ইউ নো এনিথিং এবাউট সেলিং?
                নাথিং মাচ, বাট আই থিংক আই ক্যান
                ইউ থিংক সো? ও-কে। ফিল-আপ দিস ফর্ম। উই উইল লেট ইউ নো
            সাথে কলম নিয়ে বেরোই নি। ফর্ম হাতে নিয়ে ম্যানেজারের দিকে তাকাতেই তিনি একটা বলপয়েন্ট এগিয়ে দিলেন। নাম, ঠিকানা, ইমেইল, ফোন নাম্বার আর সপ্তাহের কোন্‌ কোন্‌ দিনের কোন্‌ কোন্‌ সময়ে কাজ করতে আগ্রহী- জানতে চাওয়া হয়েছে ফর্মে।
            ম্যানেজারের হাতে ফরম আর কলম ফেরত দেয়ার সময়ও দেখলাম তাচ্ছিল্যের ভাবটা যায়নি তাঁর চাউনি থেকে। কী জানি, হয়তো তাঁর চেহারাটাই এরকম। আমারই আত্মবিশ্বাসের অভাবে মনে হচ্ছে আমাকে তিনি তুচ্ছ করছেন। সে যাই হোক। আমার মন বলছে এখান থেকে কখনোই ফোন করা হবে না আমাকে।
            বেরিয়ে দ্রুত হেঁটে চলে এসেছি অফিসে। হাঁটতে হাঁটতে ভেবেছি- যথেষ্ঠ হয়েছে। চাকরি খোঁজায় ক্ষান্ত দেয়া দরকার এবার। এভাবে চলতে থাকলে তো আত্মবিশ্বাস মাথা থেকে হাঁটুতে নেমে আসবে।
            সকাল থেকে খাওয়া হয়নি কিছুই। সকালে সেফওয়ে থেকে বিস্কুট কিনেছিলাম দুপ্যাকেট। সাত তলায় উঠে দেখলাম- স্টাফ-রুম খোলা। কাবার্ড থেকে মগ নিয়ে চা বানালাম। টেবিলে কিছু ডোনাট্‌স দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিনই কোন না কোন গ্রুপের মিটিং সেমিনার থাকে। সে উপলক্ষে খাবারও থাকে। ডোনাট্‌সগুলো হয়তো কালকের কোন মিটিং এর অবশিষ্ট। দুটো ডোনাটেই পেট ভর্তি হয়ে গেলো। স্টাফ রুমের চার পাশের তাকে রাখা সাম্প্রতিক রিসার্চ জার্নালগুলোতে কিছুক্ষণ চোখ বুলিয়ে ফিরে এসেছি নিজের ডেস্কে। তারপর এই তো এতক্ষণ বক বক করলাম তোমার সাথে। একটা ফোন করতে পারলে ভালো লাগতো। কিন্তু উপায় তো নেই।
____________________
PART 21


Latest Post

Quantum Computers: Energy-Efficient or Power-Hungry?

  Only forty years ago, the number of mobile-phone users in the world was tiny. Consider the 1980s. Mobile phones were not yet part of peopl...

Popular Posts