Wednesday, 27 March 2019

ইয়ারার তীরে মেলবোর্ন - তৃতীয় পর্ব


০৯ জুলাই ১৯৯৮ বৃহস্পতিবার
ভিক্টোরিয়া ভিস্‌তা হোটেল

ঢং ঢং ঢং। খুব কাছেই কোন গীর্জার ঘন্টাধ্বনি। রাত বারোটা বাজলো মেলবোর্নে। তোমার সাথে এখন আমার সময়ের দূরত্ব চার ঘন্টা, আর ভৌগোলিক দূরত্ব এক মহাদেশ। আজ একদিনেই যেন সবকিছু অন্যরকম হয়ে গেছে। সকালে সিডনি এয়ারপোর্টে যখন নামলাম তখন আমার ঘড়িতে রাত ৩টা ২০ আর সিডনিতে সকাল ৭টা ২০। সময় হঠাৎ করেই এগিয়ে গেলো চার ঘন্টা। প্লেন থেকে নামার সময় শুধুমাত্র পাসপোর্ট আর টিকেট হাতে নিয়েই নেমে পড়েছি। কেবিন ব্যাগ কেবিনেই রয়ে গেছে। নামার সময় মেলবোর্নের ট্রানজিট কার্ড দিয়েছে একটি। সুন্দর প্লাস্টিকের কার্ড।
            সিডনি এয়ারপোর্টটা বেশ বড়। এয়ারপোর্টের  বিভিন্ন জায়গায় সুন্দর বুক-স্ট্যান্ডে সিডনির সিটিগাইড সাজিয়ে রাখা আছে। স্ট্যান্ডের মাথায় বড় করে লেখা- প্লিজ টেক ওয়ান। নিলাম একটা। সিডনি শহরের ম্যাপ সহ যাবতীয় তথ্য আছে এই গাইডে। ট্যুরিস্টদের জন্য কত সুন্দর ব্যবস্থা। ৫৩ নম্বর গেট দিয়ে প্লেনে উঠতে হবে আমাকে। শুরুতেই গেটটা খুঁজে বের করলাম। ট্রানজিট কার্ড হাতে গেটের কাছে ঘোরাঘুরি করছি দেখে থাই এয়ারলাইন্‌সের একজন বললেন- বোর্ডিং শুরু হবে নটায়। তার মানে দেড় ঘন্টার মত সময় হাতে আছে। একটু ঘুরে দেখা যাক।
            এত সকালেও প্রচন্ড ব্যস্ত এই এয়ারপোর্ট। এয়ারপোর্টের ভেতর ঝলমলে সব দোকানপাট। বিশাল বইয়ের দোকান দেখে অবাক হয়ে গেলাম। প্লেনে পড়ার জন্য অনেকেই বই কিনছেন। দোকানে যত খুশি যতক্ষণ খুশি বই নাড়াচাড়া করা যায়। আমার দৃষ্টি ঘুরছে এখান থেকে ওখানে। প্রচুর চায়নিজ দেখা যাচ্ছে এখানে। হবে নাই বা কেন। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ছয় ভাগের এক ভাগ চায়নিজ। সে হিসেবে অবশ্য সমান সংখ্যক ইন্ডিয়ান থাকারও দরকার ছিল। কিন্তু ভারতীয়রা মনে হয় এখনো সেভাবে আসতে শুরু করে নি।
            অনেক ডিউটি ফ্রি শপ এখানে। এদিক সেদিক ঘুরে দোকান পাটে ঢু মেরে বই ম্যাগাজিন উল্টিয়ে সময় কাটালাম। বই এর দোকানে বেস্টসেলার বইগুলো সাজানো আছে একটা শেল্‌ফে। সেখানে আমার পাশে দাঁড়িয়ে বই দেখছে একজোড়া তরুণ-তরুণী। হঠাৎ তারা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে শুরু করলো।  আমার প্রথম সাংস্কৃতিক ধাক্কা।
            নটা বেজে গেছে। আস্তে আস্তে ৫৩ নম্বর গেটের দিকে এগিয়ে গেলাম। গেটে দাঁড়িয়ে একজন পেটমোটা অফিসার যাত্রীদের নামের তালিকা মিলিয়ে নিচ্ছেন। কম্পিউটার প্রিন্ট-আউটে নিজের নাম দেখে ভালো লাগলো। এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ প্লেন ছাড়ার আগেই যাত্রীদের নামের তালিকা পাঠিয়ে দেয় সংশ্লিষ্ট এয়ারপোর্টে। একটা রুটিন কাজ। তবুও আনন্দ হলো। শিশুতোষ ভালো লাগা।
            আবার একই প্লেন, একই সিট। তেমন কিছুই বদলায়নি। আমার ব্যাগদুটো যেখানে রেখে গিয়েছিলাম সেখানেই আছে। শুধু পাশের খালি সিটে একজন নতুন যাত্রী উঠেছেন। আর এয়ার হোস্টেজরা সব বদলে গেছে। আরেক ঝাঁক নতুন মুখ। আবার আকাশে ওড়া। একটু পরেই আবার খাদ্য সরবরাহ। প্রাতঃরাশ। এখানে দশটা বেজে গেলেও আমার বায়োলজিক্যাল ক্লকে এখনো সকাল ছটা। খেতে পারলাম না কিছুই। হয়তো একটু টেনশানও হচ্ছে। মনে হচ্ছে- মেলবোর্ন তো এসে গেলাম। এবার যে কাজে এসেছি পারবো তো তা শেষ করতে? আমি পারবো তো?
                ১১টা ১৫ মিনিটে প্লেন এসে নামলো মেলবোর্ন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে আস্তে আস্তে নেমে এলাম প্লেন থেকে। ইমিগ্রেশানের দিকে এগোবার পথে জমজমাট ডিউটি ফ্রি শপ। আর একটু পর পরই ওয়েলকাম টু মেলবোর্ন লেখা নিয়ন সাইনের পাশে সাজিয়ে রাখা মেলবোর্ন ভিজিটর্‌স গাইড।
                হাতে পাসপোর্ট আর কাস্টম্‌স ডিক্লারেশান ফরম, কাঁধে দুটো ব্যাগ আর হৃৎপিন্ডের কিছুটা দ্রুত স্পন্দন নিয়ে ইমিগ্রেশানের লাইনে এসে দাঁড়ালাম। অনেকগুলো কাউন্টার। আমি যে লাইনে দাঁড়িয়েছি সে অফিসারটি দাড়িওয়ালা অস্ট্রেলিয়ান। সবাইকে বেশ জেরা করছেন। এত জেরা করছে কেন? আমাকেও কি এতগুলো প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে? অন্য লাইনে চলে যাবো কিনা ভাবছি- এসময় ডাক পড়লো আমার। পাসপোর্ট আর কাস্টম্‌স ফরম এগিয়ে দিলাম।
                এনিথিং টু ডিক্লেয়ার?
                নো
                এনি ফুড আইটেম?
                নো
                আমার পাসপোর্ট খুলে ভিসাটা একটা মেশিনের সামনে ধরলেন, তারপর কম্পিউটারের কয়েকটা বোতাম টিপলেন। ধাম করে একটা সিল লাগালেন পাসপোর্টে।
                ওয়েলকাম টু অস্ট্রেলিয়া
                থ্যাংক ইউ
                এবার ব্যাগেজ। কনভেয়ার বেল্টের কাছে এসে দাঁড়ালাম। কয়েক শ সুটকেস বেল্টের উপর ঘুরছে। মনে হচ্ছে মাটির নিচ থেকে উঠে আসছে একের পর এক নানারকম সুটকেস। যেদিকে চোখ যাচ্ছে কাস্টমস্‌-এর বিরাট বিরাট নোটিশ চোখে পড়ছে ডিক্লেয়ার ইট, অর ডেস্ট্রয় ইট। ইংরেজি লেখার পাশাপাশি ছবির মাধ্যমেও দেখানো হচ্ছে যে এখানে খাদ্যদ্রব্য নিয়ে আসা যাবে না। একজন কাস্টম্‌স অফিসার একটা কুকুর নিয়ে ঘুরছেন। কুকুরটি সবার ব্যাগ শুঁকে দেখছে। আমার ব্যাগগুলো শুঁকে নাক ফিরিয়ে নিতেই স্বস্তি পেলাম। ততক্ষণে আমার সুটকেস এসে গেছে বেল্টে। সুটকেসটা টেনে নেয়ার সময় দেখলাম বেল্টের অন্যপাশে দাঁড়িয়ে আছেন বিরক্তি বেগম। চোখে চোখ পড়তেই তার শ্যামলা মুখটা একেবারে কালো হয়ে গেল। কেন যে তিনি এত বিরক্ত হচ্ছেন কিছুতেই বুঝতে পারছি না।
            একটা ট্রলিতে সবগুলো ব্যাগ চাপিয়ে এগিয়ে গেলাম কাস্টমস এর দিকে। কোন কিছু ডিক্লেয়ার করার নেই। চটপটে মহিলা অফিসার হাতের ফরমটি নিয়ে ব্যাগগুলো স্ক্যানারে চালান করে দিলেন। ছোট ব্যাগগুলো বেরিয়ে এল। বড়টা মেশিনে রেখেই মনিটরে চোখ রাখা দশাসই পুরুষ অফিসার জিজ্ঞেস করলেন ব্যাগে কোন সাবান আছে কিনা। আছে, ছয়টি লাক্স সাবান নিয়ে এসেছি উদয়দার পরামর্শে। দাদা সহ কত কসরত করে সুটকেসটি গুছিয়েছি সোমবার রাতে। একজোড়া জুতা ঢুকানো হয়েছে- আর জুতার ভেতর সাবানগুলো। স্ক্যানারে আমার জুতাজোড়াও দেখা যাচ্ছে নিশ্চয়।  অফিসারটির পুরু লাল গোঁফের ফাঁক দিয়ে হাসি দেখা গেলো একটু।  
            সুটকেস বেরিয়ে এলো। ট্রলি নিয়ে একটু এগোতেই হঠাৎ যেন দেয়াল ফাঁক হয়ে দরজা হয়ে গেলো। চমকে উঠলাম আমি। এরকম কিছুর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আলিবাবার সিসেম ফাঁক এর মতো  মেলবোর্ন এয়ারপোর্টের অটোম্যাটিক দরজা খুলে গেলো আমার জন্য। আমি মেলবোর্নে পা রাখলাম।   
            ট্রলি নিয়ে একটু এগিয়ে যেতেই দেখতে পেলাম অনেক মানুষের ভীড়। কারো কারো হাতে নাম লেখা বোর্ড। আমাকেও রিসিভ করতে আসার কথা ইউনিভার্সিটি থেকে। একটু দূরেই হলুদ একটা বোর্ডে TOGOTO লেখা দেখে বুঝতে পারলাম আমার জন্যই এসেছেন তাঁরা। দুজন বয়স্ক মহিলা। পরিপাটি দাঁত বের করে অভ্যর্থনার হাসি হাসছেন দুজনই। কাছে যেতেই দুজন একসাথে হাত বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে।
                দুজনের বয়সই ষাটের কাছাকাছি হবে। চুলের লাল রঙ দেখে বোঝার উপায় নেই চুল পেকেছে কিনা। মুখের চামড়া কুঁচকে গেছে, ঠোঁটে গাঢ় লিপিস্টিক, কানে আর গলায় জমকালো গয়না। পুরু ওভারকোট দেখে বোঝা যাচ্ছে এখন শীতকাল। তবে ঠান্ডা লাগছে না একটুও।
                হ্যাড এ নাইস ফ্লাইট? হ্যান্ডশেক করতে করতে প্রশ্ন করলেন একজন।
                ইয়েস, ইয়েস। আমার সংক্ষিপ্ত উত্তর।
                ইউ আর মিস্টার ডেব, রাইট?
                ইয়েস, ইয়েস। মনে হচ্ছে ইয়েসশব্দটি ছাড়া আর কোন শব্দ আমার জানা নেই।
                আই এম সুজান, এন্ড সি ইজ লিয়ানা
                সুজান হাতে ধরা লিস্টে আমার নামের পাশে একটা টিক চিহ্ন দিয়ে জানালেন আরো দুজনের আসার কথা ইন্দোনেশিয়া থেকে। তাদের জন্য একটু অপেক্ষা করতে হবে। তাদের প্লেন এসে গেছে, মিনিট দশেকের মধ্যেই তারা এসে পড়বে।
                দশ মিনিট সময় হাতে পাওয়া গেলো। একটা টেলিফোন করা দরকার বাংলাদেশে। এসে পৌঁছানোর খবর না পাওয়া পর্যন্ত দিদিরা উৎকন্ঠায় থাকবে। টেলিফোন কার্ড কেনার কথা মনে হওয়াতে মনে পড়লো অস্ট্রেলিয়ান ডলার নেই আমার কাছে। আসার সময় দিদি একটা আমেরিকান একশ ডলারের নোট পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। জাপানে পাওয়া তার স্কলারশিপ থেকে অনেক কষ্টে বাচানো এই ডলার। মানি এক্সচেঞ্জ থেকে নোটটা ভাঙিয়ে নিলাম। ১৫৪ অস্ট্রেলিয়ান ডলার পাওয়া গেলো। বিশ ডলার দিয়ে একটা ফোন কার্ড কিনলাম। টেলেস্ট্রা ফোন এওয়ে কার্ড।
                ইন্দোনেশিয়ান দুজন চলে এসেছে। একজন ছেলে ও একজন মেয়ে। কারো বয়সই আঠারো উনিশের বেশি হবে বলে মনে হচ্ছে না। সুজান আর লিয়ানার পিছু পিছু বেরোলাম এয়ারপোর্ট থেকে।  কাচের দরজার বাইরে পা রাখতেই কনকনে ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা এসে কুঁচকে দিলো আমাকে। এমন ঝকঝকে রোদ অথচ এমন বিদ্ঘুটে ঠান্ডা!
                ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে চলেছি গাড়ি পার্কে। বিশাল এক সাদা গাড়ি নিয়ে এসেছেন সুজান আর লিয়ানা। লিয়ানা ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলেন। সুজান গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে পেছনে সুটকেস উঠাতে লাগলেন। ইন্দোনেশিয়ান ছেলে-মেয়ে দুটো গাড়িতে উঠে বসলো। তাদের সুটকেস দুটোর সাইজ আমার সুটকেসের দ্বিগুণ হবে। এত বড় সুটকেস গাড়িতে উঠানো সুজানের পক্ষে সম্ভব নয়। হাত লাগালাম। আমার হ্যান্ডব্যাগটা দেখে সুজান জানতে চাইলেন ওটার ভেতর কম্পিঊটার আছে কি না। অবাক হয়ে গেলাম আমি। কম্পিঊটার কি এখন ব্যাগে নিয়ে ঘোরা যায়?
            গাড়িতে বসে সহযাত্রীদের সাথে আলাপ জমাতে চেষ্টা করলাম। তাদের কথ্য-ইংরেজি আমার ইংরেজির চেয়েও খারাপ। ওরা একই দেশ থেকে এলেও কেউ কাউকে চেনে না। দুজন একই ভাষায় কথা বলে- অথচ এখানে কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। আমি আলাদা আলাদা ভাবে কথা বললাম তাদের সাথে। ছেলেটা এসেছে ইংলিশ কোর্স করতে। সুমাত্রা থেকে। থাকবে একটি অস্ট্রেলিয়ান পরিবারের সাথে। পেয়িং গেস্ট। এটাকে নাকি হোম স্টে বলা হয় এখানে। মেয়েটি এসেছে জাকার্তা থেকে। ট্রিনিটি কলেজে ফাউন্ডেশান কোর্স করতে। ট্রিনিটি কলেজ কোথায় আমি জানি না। সে থাকবে হোস্টেলে। দুজনের চেহারাতেই একটু চায়নিজ চায়নিজ ভাব আছে। নাক বোঁচা, রঙ হলুদ।
            গাড়ি চলছে প্রচন্ড গতিতে। বিশাল মসৃণ রাস্তা। সারি সারি গাড়ি দ্রুত বেগে ছুটে চলেছে। দেখতে দেখতে পার হয়ে যাচ্ছে কত দোকান-পাট। একটু পরেই ট্রাম চোখে পড়লো। ইন্দোনেশিয়ান ছেলে-মেয়ে দুটো জানে তারা কোথায় থাকবে। আমি কিন্তু জানিও না আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। শুধু জানি ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ আমার দুসপ্তাহ থাকার ব্যবস্থা করেছে।
            একটু পরে মূল রাস্তা ছেড়ে একটা ছোট রাস্তায় ঢুকে পড়লো গাড়ি। সুন্দর ছিমছাম একতলা সব বাড়ি রাস্তার দুপাশে। বেশির ভাগ বাড়ির ছাদই টালির। সামনে সুন্দর বাগান, রাস্তার দুপাশে সারি সারি গাছ। সবকিছু পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি। একটা বাড়ির সামনে গাড়ি থামলো। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন লাল সোয়েটার পরা একজন সাদা বুড়ি। সাদা বুড়িবলেছি বলে রেগে যাচ্ছো তুমি। ঠিক আছে- শ্বেত বৃদ্ধা। মাথার চুল ধবধবে সাদা। সুজান গাড়ি থেকে নেমে দরজা খুলে দিলেন। ইন্দোনেশিয়ান ছেলেটিকে বললেন এখানেই তার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছেলেটি চুপচাপ নেমে গেলো। সুটকেস নামানোর দিকে কোন খেয়াল নেই তার। মনে হচ্ছে বড়লোক মা-বাবার সন্তান। নিজের কাজ নিজে করতে অভ্যস্ত হয়নি এখনো। সুজানকে সাহায্য করলাম- সুটকেসটি নামিয়ে দিলাম। গাড়িতে উঠে জানালা দিয়ে দেখলাম শ্বেত বৃদ্ধা প্রাণপনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বিশাল সুটকেস আর তার পেছন পেছন চলেছে সুমাত্রা থেকে আসা ইন্দোনেশিয়ান তরুণ।
            গাড়ি আবার চলতে শুরু করেছে। একটু আগেও আকাশ নীল ছিলো, ঝলমলে রোদ ছিলো। এখন হঠাৎ আকাশের মুখ গোমড়া হতে হতে কুচকুচে কালো হয়ে গেলো। মিনিট খানেকের মধ্যেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। প্রথমে টিপটিপ- একটু পরেই ঝুম ঝুম।  
            মেলবোর্ন শহরে এসে গেছি। বিশাল বিশাল বিল্ডিং রাস্তার দুপাশে। শহরের রাস্তা যে এত বড় হতে পারে ধারণা ছিল না। একটু পরে একটা বাড়ির সামনে থামলো গাড়ি। রাস্তার নাম চোখে পড়ল- ব্যুভেরি স্ট্রিট। বৃষ্টি কিছুটা কমেছে, কিন্তু থামেনি এখনো। গাড়ির দরজা আবার খুলে গেলো। এখানেই কি থাকার ব্যবস্থা আমার? না, সুজান তার হাসিমুখ বাড়িয়ে বললেন, ইট্‌স ইওর হোস্টেল জুন। মেয়েটির নাম তাহলে জুন। জুন নেমে গেলো। গাড়ি আবার চলতে শুরু করলো। চোখে পড়লো সোয়ান্সটন স্ট্রিট, কিছুদূর গিয়ে রাস্তার বামপাশে রয়েল মেলবোর্ন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির বিশাল বিল্ডিং। বিল্ডিং এর গায়ে জ্বলজ্বল করছে আর-এম-আই-টি
            খুব আস্তে আস্তে চলছে গাড়ি। ট্রাম চলছে পাশাপাশি। ট্রাম থামলে গাড়িও থেমে যাচ্ছে। কিছুদূর গিয়ে গাড়ি কলিন স্ট্রিটে ঢুকে গেলো। আমি রাস্তার নাম পড়ছি। একটু পরেই রাসেল স্ট্রিটে ডানে মোড় নিলো। আবার ডানে ঢুকে গেলো। লিটল কলিন স্ট্রিট। ছোট্ট একটা গলি। ওয়ান ওয়ে বলে রক্ষা। গাড়ি থেমে গেলো একটা দালানের বারান্দায়- ভিক্টোরিয়া ভিস্‌তা হোটেল
            সুটকেস আর ব্যাগ নিয়ে নেমে গেলাম। হোটেলের কাচের দরজা খুলে গেল আপনা-আপনি। আবার বিস্ময়ের পালা আমার। স্বয়ংক্রিয় দরজার সুবিধা অনেক। দুহাতে ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে কোন সমস্যা হয় না। সুজান কাউন্টারে গিয়ে রিসেপশানিস্টকে বললেন, ইট্‌স প্রাডিব ফ্রম ব্যাংলাডেশ। উই হ্যাভ আ রিজার্ভেশান ফর হিম। চটপটে মেয়েটি কম্পিউটারের পর্দায় খুঁজতে লাগলো আমাকে। সুজান আমার দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললেন, দে উইল টেক কেয়ার অব ইউ। হ্যাভ আ নাইস টাইম। দ্রুত চলে গেলেন সুজান।
            ক্যান আই সি ইওর পাসপোর্ট প্লিজ
            হোটেলে পাসপোর্ট কী কারণে দেখাতে হবে বুঝতে পারলাম না। কিন্তু জিজ্ঞেস করে দেখার মত ইংরেজি আমার ঘটে নেই। পাসপোর্ট এগিয়ে দিলাম। মেয়েটি পাসপোর্ট খুলে দেখলো আমি আসলেই আমি কিনা। সন্তুষ্ট হয়ে পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে বললো, তোমার নামে একটি রুম বুক করা হয়েছে দুসপ্তাহের জন্য। দুসপ্তাহের ভাড়া ৪২২ ডলার। তুমি কি ক্যাশ দেবে নাকি ক্রেডিট কার্ড?
            বিরাট একটা ধাক্কা খেলাম আবার। ভেবেছিলাম ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ আমার দুসপ্তাহের থাকার ব্যবস্থা করবে- মানে আমাকে কোন টাকা-পয়সা দিতে হবে না। এখনতো হোটেল ভাড়া দিতেই ফতুর হয়ে যাব আমি। প্রতিরাতের ভাড়া ৩০ ডলার করে হলে  ৪২০ ডলার হয়। আরো দুডলার কী কারণে দিতে হচ্ছে জানি না। ট্রাভেলার্স চেক ভাঙাতে হলো। কিছু অস্ট্রেলিয়ান নোট আর কয়েন ফেরৎ পাওয়া গেল। এবার একটা ফরমে সাইন করতে হলো। রুমের চাবি এগিয়ে দিয়ে মেয়েটি হাসিমুখে বললো, রুম নাম্বার টু হান্ড্রেড এন্ড সিক্সটি ফাইভ- টেক দি এলিভেটর অন ইওর রাইট। ডায়াল নাইন ইফ ইউ নিড এনিথিং
            ব্যাগ টানতে টানতে কাহিল হয়ে গেছি। ঢাকা চট্টগ্রামের হোটেলে দেখেছি ব্যাগ নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করে হোটেলের কর্মচারীরা, কার আগে কে নিয়ে যাবে। আর এখানে- রিসেপশানের মেয়েটি ছাড়া দ্বিতীয় কোন কর্মচারী চোখে পড়ল না। লিফ্‌টেও কোন লিফ্‌টস-ম্যান নেই। একটু নার্ভাস লাগলেও কোন সমস্যা হলো না। সেকেন্ড ফ্লোরের বোতাম টিপতেই লিফ্‌টের দরজা বন্ধ হয়ে গেল- একটু পরেই দোতলায়। রুম খুঁজে পেতে দেরি হলো না।
            ছোট্ট একটা রুম। একটা সিংগেল বিছানা। একপাশে টেবিল-চেয়ার। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালাম। বৃষ্টি হচ্ছে এখনো। জানালার পাশে একটা বেসিনও আছে। ঘরের একটা কোণ জুড়ে ওয়াড্রোব। নিচু টেবিলের উপর ইলেকট্রিক কেতলি, চা-কফি ও চিনির অনেকগুলো ছোট ছোট প্যাকেট। এক প্যাকেট দুধও আছে। সবকিছু আছে কিন্তু বাথরুম নেই। বাংলাদেশে ফকিরাপুলের একশ টাকা ভাড়ার একেবারে নিম্নমানের হোটেলেও এটাস্টড বাথরুম থাকে। অথচ এখানে রাত প্রতি প্রায় নয়শ টাকা ভাড়া দিয়েও রুমের ভেতর বাথরুম নেই! হতাশ হয়ে গেলাম। রুমের চাবির সাথে দেয়া অন্য চাবির গায়ে লেখা আছে বাথরুম
            রুমের বাইরে লম্বা করিডোর পেরিয়ে ডানদিকে গেলে তালাবদ্ধ বাথরুম। ভেতরে দুটো টয়লেট আর দুটো শাওয়ার। কতজন মানুষের জন্য এ ব্যবস্থা জানি না। টয়লেটে পানির ব্যবস্থা নেই। শুধু টয়লেট পেপার। যস্মিন দেশে যদাচার।
            রুমে এসে বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করার সাথে সাথে মনে হলো সারাঘর দুলছে। ভূমিকম্প নাকি? দ্রুত উঠে বসলাম। ভূমিকম্প নয়। শোয়ার সাথে সাথে আবার দুলুনি। প্লেনের গতিজড়তা মাথার ভেতর রয়ে গেছে। রয়ে গেছে আরো সব স্মৃতি- যা এক এক করে আসতে শুরু করেছে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি খালি লাগছে। এই বিশাল শহরে আমি এখনো কাউকে চিনিনা।
            কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো টেলিফোনের শব্দে। বিছানার পাশেই টেলিফোন। আমাকে কে টেলিফোন করবে এখানে? আমার হোটেলের নম্বারতো কারো জানার কথা নয়। ধরবো কি ধরবো না করতে করতে রিসিভার তুলে হ্যালো বলতেই শোনা গেল- ক্যান আই স্পিক টু মিস্টার প্র্যাডিব কিউমার ড্যাব?
            আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমার নামের যে এরকম উচ্চারণও হতে পারে কখনো ভাবিনি। আমাকে কে চাইতে পারে? উচ্চারণ শুনে মনে হচ্ছে অবাঙালি কেউ। ভাঙা ভাঙা উচ্চারণ। সুতরাং ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ ইংরেজি নয়। বললাম, ইয়েস। প্রদীপ স্পিকিং
            তার নাম পিটার। মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি তাকে দায়িত্ব দিয়েছে আমাকে ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য। জানতে চাচ্ছে আমি তাকে আগামীকাল সময় দিতে পারবো কি না। না পারার কোন কারণ নেই। কথা হলো কাল দুপুর দুটোয় দেখা হবে তার সাথে- ইউনিভার্সিটিতে।
            ক্যাম্পাসটি কোথায় আমি এখনো জানি না। কীভাবে যাবো- কতদূরে- পিটারকে আমি কীভাবে চিনবো এসব কিছুই বলেনি পিটার। ফোন রেখে দিলো। আমার উঠে বসার শক্তি নেই। চব্বিশ ঘন্টার জার্নিতে কাহিল হয়ে গেছি। আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।
            যখন জেগে উঠলাম- ঘুটঘুটে অন্ধকার। লাইট জ্বেলে ঘড়ি দেখে চমকে উঠলাম। এগারোটা বেজে গেছে। এতক্ষণ ঘুমিয়েছি! বাংলাদেশে এখন সন্ধ্যা সাতটা। দুদিন আগেও এই সময়টাতে আমি মামামের কাছে থাকতাম। মনে হচ্ছে কতদিন কথা হয় না কারো সাথে। অথচ মাত্র ছত্রিশ ঘন্টা কেটেছে।
            ফোন করা দরকার। ফোন কার্ড কীভাবে ব্যবহার করতে হয় জানি না। তবে শিখে নিতে দেরি হলো না। কার্ডে একটা ফোন নাম্বার দেয়া আছে। রুমের ফোন থেকে ওই নম্বরে ফোন করলাম। ওপাশে ইলেকট্রনিক নারী কন্ঠঃ
            ফর ইংলিশ প্রেস ওয়ান। বলেই অন্য কয়েকটি ভাষায় ইনস্ট্রাকশান শুরু হলো। বাংলা আছে কিনা দেখার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। না, বাংলা নেই। একটু পরে আবার ইংরেজি শোনা গেল। তাড়াতাড়ি 1 টেপার পর বলা হলো বারো ডিজিটের পিন নাম্বার প্রেস করতে। করার পর বললো কার্ডে বিশ ডলার ব্যালেন্স আছে।
            দিদিভাইরা এখনো ঢাকা থেকে ফিরেনি। তার বাসায় ফোন করে কাউকে পাবো না। অজিতের নাম্বারে ডায়াল করলাম। যান্ত্রিক নারীকন্ঠ জানালো- যে ব্যালেন্স আমার আছে তাতে পনের মিনিট কথা বলতে পারবো। একটু পরেই ওপ্রান্তে অজিত। সে হোটেলের নম্বরটা জেনে নিয়েই লাইন কেটে দিলো।
            একটু পরে সে-ই ফোন করলো। অনেকক্ষণ কথা হলো। আমি কেমন আছি কোথায় আছি জেনে নিয়ে দিদিদের জানাবে। অজিতের কাছে আমার ঋণ বাড়ছে তো বাড়ছেই।
            সকালে প্লেন থেকে নামার পর আর কিছুই খাওয়া হয়নি। কিন্তু এতরাতে খাবার কোথায় পাবো? পেটে প্রচন্ড ক্ষুধা। পরশু রাতে এসময় কস্তুরী রেস্তোঁরায় ডিনারের আয়োজন করেছিল অজিত। মাছ মাংস পোলাওয়ের সমারোহ আর তার আতিথেয়তায় অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। অথচ এখন খাদ্যের মধ্যে আছে মাত্র একশ মিলিলিটার দুধ। তুমি জানো দুধ খেতে আমার ভালো লাগে না। কিন্তু আর কিছুই যে নেই।
_____________



Sunday, 24 March 2019

ইয়ারার তীরে মেলবোর্ন - দ্বিতীয় পর্ব




আকাশের মাঝখানে কোথাও
রাত নিঝুম, চাঁদের আলোর বান ডেকেছে
           
আকাশের সীমানা কীভাবে ভাগ করে জানি না। প্লেনের সিটে লাগানো ছোট টেলিভিশনের মত যন্ত্রটাতে দেখতে পাচ্ছি প্লেন অস্ট্রেলিয়ার সীমান্তে ঢুকছে। কিন্তু ঠিক বুঝতে পারছি না কোথায় আছি। ভূমি থেকে সাঁয়ত্রিশ হাজার ফুট উচ্চতায় আছি। বাইরের তাপমাত্রা মাইনাস চল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস। স্কুলে ফিজিক্সের একটি অংক খুব মজা করে করতাম। কোন্‌ তাপমাত্রায় সেন্টিগ্রেড ও ফারেনহাইট স্কেল সমান? উত্তরটা মনে পড়লো মাইনাস চল্লিশ ডিগ্রি দেখে। এত ঠান্ডা আকাশ! আজ মনে হয় পূর্ণিমা। আকাশ ভরা চাঁদের আলো। কেমন যেন কুয়াশা মাখা। অথচ এত উঁচুতে কুয়াশা থাকার কথা নয়। বাতাসের ঘনত্ব তো খুবই কম হবার কথা এখানে। সারা প্লেন ঘুমাচ্ছে। আমার পাশের দুটো সিট খালি। বেশ আরাম করে একটা ঘুম দিয়ে উঠেছি। আমার কব্জিতে এখনো তোমার সময়- রাত ১২টা পঞ্চাশ। অনেক ঘটনা ঘটে গেছে গত কয়েক ঘন্টায়। বলছি তোমাকে।
            আটটার দিকে বোর্ডিং কার্ড হাতে নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। সামনের ভদ্রলোক হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে বললেন, গরম জামা-কাপড় কিছু আনোনি? কেউ বলে দেয়নি যে অস্ট্রেলিয়াতে খুব ঠান্ডা এখন?
            অস্ট্রেলিয়াতে এখন যে খুব ঠান্ডা তা আমাকে কে বলবে? ব্যাগে একটা সোয়েটার আছে। উদয়দা নিজের ব্যবহারের জন্য এনেছিলেন ইন্ডিয়া থেকে। আমাকে দিয়ে দিয়েছেন। ওটা বের করে পরে নিলেই হবে। বললাম, খুব বেশি ঠান্ডা পড়ে নাকি স্যার?
            ভদ্রলোকের বয়স খুব একটা বেশি হবে না। তাঁর স্যুট-কোট দেখেই হোক, কিংবা আমাকে তুমি-তুমি করছেন দেখেই হোক মুখ দিয়ে স্যার বেরিয়ে গেল। মনে হলো তাতে স্যার খুশিই হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, পড়াশোনা করতে যাচ্ছো? সিডনিতে?
            জ্বি। সিডনিতে না, মেলবোর্নে
            একটু সমস্যায় পড়ে গেলাম। এই প্লেন কি সিডনি যাচ্ছে? আমি তো মেলবোর্নে যাচ্ছি। সিডনিতে কি আমাকে প্লেন বদলাতে হবে?  টিকেটে এবং বোর্ডিং কার্ডে তো মেলবোর্নই লেখা আছে।
                স্যার, আমি তো মেলবোর্নে যাচ্ছি। এই প্লেন কি সিডনি যাবে? তাহলে মেলবোর্নে যাবো কীভাবে?
                আই ডোন্ট নো। তুমি কাউন্টারে জিজ্ঞেস করো
                ভদ্রলোকের সামনে দুজন শ্বেতাঙ্গ। তাদের সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন বিরক্তি বেগম। বার দুয়েক পেছন ফিরে তাকালেন। আমাকে দেখলেই তাঁর মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে- অথচ বার বার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছেন এটাই আশ্চর্যের। হয়তো আমাদের কথোপকথন তাঁর কানে গেছে। তিনি নিশ্চয় মেলবোর্নে যাচ্ছেন না। গেলে আমার প্রশ্ন শুনে নির্বিকার থাকতেন না। লাইন থেকে বেরিয়ে কাউন্টারে গিয়ে থাই মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম- সিডনিতে গিয়ে প্লেন চেঞ্জ করতে হবে কি না। জানা গেলো প্লেন চেঞ্জ করতে হবে না। সিডনিতে গিয়ে প্লেন থামবে, তারপর একই প্লেন আবার মেলবোর্নে যাবে। যাক্‌, ভালোই হলো। সিডনি এয়ারপোর্টটাও দেখা হয়ে যাবে।
                প্লেনে উঠে আমার চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসার জোগাড়। প্লেন যে এত বড় হতে পারে ভাবিনি। বোয়িং ৭৪৭। প্রায় সাড়ে চারশ মানুষ নিয়ে উড়তে পারে। আমার সিট নাম্বার 60K। একটু পেছনের দিকে জানালার পাশে। পাশের দুটো সিট 60I60J খালি। চোখের সামনে ছোট্ট টেলিভিশন স্ত্রিন। সব মিলিয়ে কেমন যেন স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে। যথাসময়ে প্লেন ছাড়লো। শূন্যে উঠে যাবার একটু পরেই খাবার দেয়া হলো। থাই পোশাক পরা এয়ার হোস্টেজরা যাত্রীদের প্রয়োজন মেটাতে ব্যস্ত। পাশের দুটো সিট খালি হওয়াতে বেশ আরাম হলো আমার। পেটভর্তি করে খেলাম। চকলেট, কেক কতকিছু দিয়েছে। সব শেষ করতে পারলাম না। কিছু ব্যাগে নিয়ে নিয়েছি। পরে কাজে লাগবে। টিভিতে বিশ্বকাপ ফুটবলের কিছু অংশ দেখাচ্ছে। খেলার দিকে মনযোগ নেই আমার। আরেকটি চ্যানেলে দি নিউ এডভেঞ্চার অব সুপারম্যান দেখাচ্ছে। কোন প্রোগ্রামেই মন দিতে পারছি না। কম্বল মুড়ি দিয়ে তিনটি সিটে লম্বা হয়ে দিলাম ঘুম।
            কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। চোখ বন্ধ করতেই স্বপ্নের মত ভেসে এসেছে ফেলে আসা কত ঘটনা কত স্মৃতি। আমার প্রিয় সব মানুষেরা। হাত বাড়াতেই স্বপ্নভাঙা ছন্দপতন। চোখ মেলে দেখি আবছা আলোয় প্রায় সবাই ঘুমুচ্ছে। জানালার আবরণ একটু তুলতেই জোছনার প্লাবন। সাঁয়ত্রিশ হাজার ফুট উঁচুতে বায়ুযানে ভেসে যাচ্ছি ঘন্টায় নয়শো কিলোমিটার স্পিডে। অনেক নিচে মেঘের আস্তরণ জোছনার আলোতে শাদা। কত গ্রাম কত নদী কত পাহাড় পেরিয়ে যাচ্ছে আমাদের থাই এয়ার-ওয়েজের ফ্লাইট TG981
                আস্তে আস্তে ভোর হয়ে যাচ্ছে। অথচ ঘড়িতে এখনো মধ্যরাত্রি। রোদ উঠলো। কী চমৎকার সোনালী আলো - সাদা মেঘের উপর পিছলে পড়ছে। প্লেন অনেক নিচে নেমে এসেছে। মেঘের নিচে নীল রেখার মতো একটি নদী। কী নদী কে জানে।
                 কেবিন ক্রুরা একটি ফরম দিল পূরণ করার জন্য। কাস্টম্‌স ডিক্লারেশান ফরম। টিভিতে দেখানো হচ্ছে ফরমটি কীভাবে পূরণ করতে হবে। অস্ট্রেলিয়া খাদ্যদ্রব্য সম্পর্কে খুবই স্পর্শকাতর। কোন ধরণের খাবার সাথে থাকলে তা ডিক্লেয়ার করার কথা বলা হচ্ছে। দুগ্ধজাত বা ফলমূল হলে তা ফেলে দিতে বলা হচ্ছে। প্লেনের কোন খাবার যেন সাথে না থাকে। আমি প্লেনে দেয়া যে খাবারগুলো  ব্যাগে ভরে নিয়েছিলাম - বের করে নিলাম। দুডলারের খাবারের জন্য একশ ডলার ফাইন দেয়ার সামর্থ্য আমার নেই।
                প্লেন আরো নিচে নেমে এলো। মনে হচ্ছে ঘাসের উপর দিয়ে উড়ে চলেছি। ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম- ঘাস নয়। ঘন সবুজ বিরাট বিরাট গাছ। একটু পরেই সবুজ ঘাসের চাদর। আর যেন সেই চাদরের ওপর মসৃণভাবে নেমে এলো আমাদের বায়ুযান। প্লেন সিডনি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করলো। এখানে সবাইকে নেমে যেতে হবে। আবার এই প্লেনেই উঠবো। রাখছি এখন।


ইয়ারার তীরে মেলবোর্ন - প্রথম পর্ব




অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করতে এসেছিলাম ১৯৯৮ সালের জুলাই মাসে। তারপর আশা নিরাশা আনন্দ বেদনা আর ব্যস্ততায় দ্রুত কেটে যায় অনেকগুলো বছর। মেলবোর্ন শহরের পাশ দিয়ে যে ছোট্ট নদীটি বয়ে চলেছে তার নাম ইয়ারা। প্রবাস দিনে আমার কাছে এই ইয়ারাই হয়ে ওঠে কখনো কর্ণফুলী কখনো ইছামতি। ইয়ারার তীরে মেলবোর্ন আমার প্রথম প্রবাসের প্রথম মাসের স্মৃতিকথা।



৮ জুলাই ১৯৯৮ বুধবার
ব্যাংকক ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট

বাংলাদেশ থেকে ব্যাংককের ভৌগোলিক দূরত্ব কত তুমি জানো? সময়ের দূরত্ব যে একঘন্টা- তা এয়ারপোর্টের ঘড়ি দেখে বুঝতে পারছি। আমার হাতঘড়িতে এখন বিকেল পাঁচটা। এয়ারপোর্টের ঘড়িতে ছটা বেজে গেছে। সময় ঠিক করে নেয়া দরকার। কিন্তু ইচ্ছে করছে না। মেলবোর্নে গিয়ে তো আবার এডজাস্ট করতে হবে। মেলবোর্নের ফ্লাইট আটটা বিশে। এখনো দুঘন্টা হাতে আছে।
            ভেবেছিলাম দেশের বাইরে এসে যখন খুব মিস করবো তোমাকে, তখন লিখবো। কিন্তু সেটা যে এখনই শুরু হবে- ভাবিনি। মাত্র তিনঘন্টা হয়েছে তোমার কাছ থেকে এসেছি। অথচ মনে হচ্ছে এক যুগ কেটে গেছে।
            ১২ নম্বর গেটের কাছে বসে লিখছি। এ গেট দিয়েই আমাকে প্লেনে উঠতে হবে। ব্যাংকক থেকে মেলবোর্ন। প্ল্যান মাফিক প্লেন ভ্রমণ। একটু আগে প্ল্যানের একটি অংশ শেষ হয়েছে- ঢাকা থেকে ব্যাংকক। আরো কত দীর্ঘ এ প্ল্যান! যে যাত্রা আজ শুরু হলো- কতদূরে গিয়ে শেষ হবে আমি জানি না। একবার যখন বেরিয়ে পড়েছি মাঝপথে থেমে যাবার উপায় নেই। সলিল চৌধুরির গানের মতো আমি তো বলতে পারি না এই রোখ রোখ পৃথিবীর গাড়িটা থামাও, আমি নেমে যাবো
            কিন্তু এ মুহূর্তে কী মনে হচ্ছে জানো? মনে হচ্ছে- ফিরে গেলে কেমন হয়? যদি অপরাজিতর অপুর ট্রেন ফেল করার মত প্লেন ফেল করে বাড়ি ফিরে যাওয়া যেতো! কিন্তু উপায় নেই। আমার টিকেট ওয়ান-ওয়ে, নো রিটার্ন। 
            এই এয়ারপোর্টটি বিশাল। মনে হচ্ছে প্রকান্ড এক কাচের ঘরে বসে আছি। বাইরে অনেকগুলো বিমান উড়ার অপেক্ষায়। এত কাছ থেকে এতগুলো বিমান দেখা আজই প্রথম। ছোটবেলায় বিমানের শব্দ পেলেই আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠতাম- বোন্‌জান, বোন্‌জানব্যোমযান শব্দটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ঢুকে হয়ে গেছে বোন্‌জান। আজ সকালে ঢাকায় বিমান বন্দরে পা দেবার পর থেকেই শব্দটি মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। খুব ইচ্ছে করছে ছোটবেলার মত বোন্‌জান’ ‘বোন্‌জান বলে চিৎকার করে উঠি। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে ইচ্ছেমতো আনন্দ প্রকাশের স্বাধীনতা চলে যায়। নানারকম বাধা-নিষেধের বেড়াজালে আটকে পড়ে আমাদের আনন্দ-বেদনার প্রকাশভঙ্গি।
            একদিন গ্রাম থেকে শহরে এসেছিলাম পড়ালেখা করে মানুষ হবার জন্য। তারপর কেটে গেছে কত বছর। ইউনিভার্সিটির পড়ালেখা শেষ করে চাকরিও করলাম সাড়ে চার বছর এই শহরে। কিছুটা শিঁকড় তো গজিয়েছিল। গতকাল সকালে সে শিঁকড় ছিঁড়ে ট্রেনে উঠেছি। সুবর্ণ এক্সপ্রেস। ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে অঞ্জন, মৃণাল, সুব্রত, আর লিটন এসেছিল স্টেশনে বিদায় জানাতে। প্রিয়জনকে বিদায় দেয়া যত কষ্টের, প্রিয়জনের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার কষ্ট তার চেয়েও বেশি।
            অজিত একটা গাড়ি ভাড়া করে নিয়ে এসেছিল কমলাপুর স্টেশনে। সেখান থেকে হোটেল। তারপর মনে হচ্ছে নিমেষেই চলে গেলো সময়। আমার প্রিয় সব মানুষেরা সবাই এক সাথে এত কাছাকাছি আগে কখনো থাকেনি। আর সেই সুখের সময়টি দেখতে না দেখতেই কেটে গেলো।
            দুপুর বারোটার মধ্যেই এয়ারপোর্টে পৌঁছে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল সময়ের চাকায় উঠে পড়েছি। যেদিকে গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেদিকেই যাচ্ছি। তবে কি সময়ের কাছে আমরা বন্দী? দার্শনিকতা দেখানোর সময় এটা নয়। সেকারণেই হয়তো দার্শনিক সব প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে।
            ডিপার্চার টার্মিনালে দাঁড়িয়ে ছিলেন নিউটনদা। নিউটনদা আমাদের ছোটবেলার হিরো। গ্রামে আমরা সব ছেলেরাই বড় হয়ে নিউটনদার মতো হতে চাইতাম। কত নতুন নতুন জায়গায় ঘুরে বেড়ান নিউটনদা । সেখান থেকে সুন্দর সুন্দর ভিউকার্ড পাঠান, চিঠি লেখেন। সেগুলো পেয়ে স্বপ্ন দেখতাম- একদিন আমিও-।  
            আজ এয়ারপোর্টে ডিউটি ছিলো না নিউটনদার। শুধুমাত্র আমার কারণেই এসেছেন। এয়ারপোর্ট ট্যাক্স জমা দেয়া, চেক ইন করা, বোর্ডিং পাস নেয়া সবকিছু তিনিই করে দিলেন।
            একটু পরেই ইমিগ্রেশান এরিয়ার কাচের দরজা আমাকে বিচ্ছিন্ন করে দিলো আমার প্রিয়জনদের কাছ থেকে। তারা হাত নেড়ে কী বলছে শুনতে পাচ্ছি না। আমার চোখ আমার সাথে প্রতারণা করতে চাইছে। কাল থেকে নিজের সাথে বোঝাপড়া করছি- একদম শক্ত হয়ে থাকবো, কোন কান্নাকাটি নয়। ফিরে তাকানোর প্রচন্ড ইচ্ছেটাকে চাপা দিয়ে এগিয়ে চলেছি নিউটনদার পিছু পিছু। কিন্তু পেছনে না তাকিয়েও বুঝতে পারছি আমাকে অনুসরণ করছে জোড়া জোড়া চোখ, আমার প্রিয় মানুষদের। তাদের ভালোবাসা আমার সাথে যাবে যেখানেই আমি যাই।
            লিকলিকে ইমিগ্রেশান অফিসার বেশ গোমড়া মুখে তাকালেন আমার দিকে। পাসপোর্টের ছবির সাথে মিলিয়ে নিচ্ছেন আমাকে। চোখে মুখে বিরক্তির চিহ্ন স্পষ্ট। এ চাকরিটাই হয়তো বিরক্তিকর।  
            কোথায় যাচ্ছেন?
            অস্ট্রেলিয়া
ভিসার ওপর তীক্ষ্ণ নজর দিয়ে দেখতে  দেখতে প্রশ্ন করলেন, ভিসা কোত্থেকে নিয়েছেন?
            হাই কমিশন ছাড়া আর কোথাও ভিসা পাওয়া যায় বলে তো শুনিনি। বললাম, অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশন থেকে
            শুনে আরো গম্ভীর হয়ে গেলেন তিনি। অনেকক্ষণ কোন কথা বললেন না। একটা ছোট্ট টর্চলাইট বের করে ভিসা স্ট্যাম্পের উপর বিভিন্ন দিক থেকে আলো ফেলে পরীক্ষা করতে লাগলেন। নকল ভিসা নিয়ে যাচ্ছি কিনা পরীক্ষার পদ্ধতিটাকে খুব লাগসই মনে হলো না।
            চাকরি করেন কোথাও?
            শাহীন কলেজে পড়াতাম। ছেড়ে দিয়েছি
            তাদের ক্লিয়ারেন্স নিয়েছেন?
            ছাড়পত্রটা হাতের কাছেই ছিলো। এগিয়ে দিলাম তাঁর দিকে। তিনি একটু চোখ বুলিয়েই ফেরৎ দিলেন। এবার কী? ভর্তির কাগজপত্র, স্কলারশিপের কাগজপত্র দেখতে চাইতে পারেন। সবকিছু আমার হাতেই আছে।
            পেছনে অনেক যাত্রীর লম্বা লাইন। একবার তাদের দিকে তাকালাম। সবাই খুব গম্ভীর। অফিসারের মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার উপায় নেই তিনি আমার ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। চোখেমুখে বিরক্তি লেগেই আছে। মনে হচ্ছে কোন ভুল খুঁজে না পেয়ে আরো বিরক্ত হয়ে গেছেন। ইমিগ্রেশান অফিসারদের মনে হয় বিরক্তি প্রকাশের ট্রেনিং নিতে হয়। হাসিমুখে ডিউটি করা কি ইমিগ্রেশান আইনে নিষেধ?  পাসপোর্টটার বিভিন্ন পাতা উল্টেপাল্টে দেখার পর হঠাৎ ধাম ধাম করে দুটো সিল বসিয়ে দিলেন পাসপোর্ট আর বোর্ডিং কার্ডে। তারপর নিতান্ত অবহেলায় ঠেলে দিলেন আমার দিকে।
            এগিয়ে চলেছি নিউটনদার পিছু পিছু। তিনি আমাকে এয়ারপোর্টের কাজকর্মের বিবরণ দিচ্ছেন। বলছেন, পৃথিবীর সব এয়ারপোর্ট বেসিক্যালি একই এভিয়েশান সিস্টেম মেনে চলে। নইলে এক দেশের বিমান অন্যদেশে অপারেট করতে পারতো না। যে কোন এয়ারপোর্টের টার্মিনালেই কোন্‌দিকে কী তা এরকম চিহ্ন দিয়ে দেখানো হয়। কেউ পড়তে না জানলেও কোন অসুবিধায় পড়বে না। আমি হ্যাঁ হুঁ করে যাচ্ছি। কিন্তু মনে হচ্ছে কানে কিছুই ঢুকছে না। কেবল একটি শব্দই মাথার ভেতর বেজে চলেছে, বোন্‌জান’ ‘বোন্‌জান
            ফাইনাল সিকিউরিটি চেক পার হওয়ার পারমিশান নেই নিউটনদার। এখান থেকে বিদায় নেবার সময় তিনি বললেন, টেক কেয়ার। আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বেরোল না। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। ততক্ষণে সিকিউরিটি অফিসাররা কাজ শুরু করে দিয়েছেন। হাতের ব্যাগ কাঁধের ব্যাগ সব চেক করা হলো। পকেটে হাত দিয়ে দেখা হলো। মেটাল ডিটেক্টার দিয়ে তন্ন তন্ন করে খোঁজা হলো। ঠিক কী খুঁজলেন আমি জানি না।
            এবার আরেকটি বড় রুমে বসে থাকতে হলো কিছুক্ষণ। কাচের দেয়ালের ওপাশে থাই এয়ারলাইন্‌স এর ফ্লাইট অপেক্ষা করছে। ব্যাংকক থেকে আসা যাত্রীদের চলে যেতে দেখলাম এই রুমের পাশ দিয়ে। একটু পরে বোর্ডিং শুরু হলো। আমার জীবনের প্রথম ব্যোমযান থাই এয়ার লাইন্‌স এর ফ্লাইট TG-322।
            বাংলা সিনেমার নায়ক-নায়িকারা প্লেনে উঠা-নামার সময় সিঁড়ি ব্যবহার করে। প্লেনের দরজায় দাঁড়িয়ে হাত নাড়ে, রুমাল নাড়ে। কিন্তু এখানে সেরকম কোন ব্যাপার ঘটলো না। মনে হলো একটা সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে হেঁটে চলে এলাম প্লেনের দরজায় যেখানে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে দুজন থাই তরুণী। দুহাত জোড় করে নমষ্কার করছে যাত্রীদের।
            প্লেনের ভেতর সম্পূর্ণ নতুন একটি জগত। মিষ্টি একটা গন্ধ চারদিকে। সবকিছু ঝকঝকে পরিষ্কার। আমার সিট 37A- জানালার পাশে। জানালা দিয়ে তাকানোর চেষ্টা করলাম। কাউকে দেখতে পাবার আশা অবান্তর। তবুও তাকিয়ে আছি। প্লেনের ডানা ছাড়িয়ে রানওয়ে পেরিয়ে টার্মিনালের দিকে- যার বাইরে রেখে এসেছি আমার সবকিছু। মনে পড়ছে একদিন প্রেমাকে বলেছিলাম, তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও, এই বাংলার পরে আমি রয়ে যাবো। এরপর প্রেমার সাথে দেখা হলে নিশ্চয় খোঁচা দেবে।
            ঠিক দুটোয় প্লেনের  চাকা ঘুরতে শুরু করলো। একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে টার্মিনাল। প্লেনের গতি বাড়ছে। একসময় প্রচন্ড বেগে ছুটে গিয়ে আকাশে উঠে গেলো। জানালার কাছে সাদা সাদা মেঘ দেখে হঠাৎ ভুলে গেলাম সবকিছু। এত সুন্দর আকাশ- এমন ঝকঝকে নীল। মেঘের সাদা আস্তরণ এখন কত নিচে।
                আমার পাশে বসেছেন একজন বাংলাদেশী মহিলা। তাঁর দিকে তাঁকিয়ে একটু ভদ্রতার হাসি হাসলাম। তিনি পাত্তাই দিলেন না। হয়তো ভাবছেন উট্‌কো ঝামেলা। তাঁর দিকে তাকালেই তিনি দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছেন অন্যদিকে। হয়তো বুঝতে চেষ্টা করছেন সহযাত্রী হিসেবে আমি কতটা উপযুক্ত। মনে হচ্ছে তিনি আমাকে পাস-মার্ক দিলেন না। একটু পরেই উঠে চলে গেলেন প্লেনের পেছনের দিকে। আমার মুখ দেখেই হয়তো বুঝে গেছেন যে জীবনে এই প্রথম প্লেনে উঠেছি। নিয়ম-কানুন কিছুই জানি না, একটু প্রশ্রয় দিলেই হয়তো নানারকম প্রশ্ন করে বিরক্ত করবো।
                একটু পরে খাবার দেয়া হলো। সকালে দিদিদের অনেক সাধাসাধিতেও কিছু খেতে ইচ্ছে করে নি। আর প্লেনে খাবার দেখার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুধার্ত হয়ে গেলাম। যা পেলাম তা-ই খেলাম। ছুরি কাঁটাচামচ দিয়ে খেতে সামান্য অসুবিধা হলো। তাতে কিছু যায় আসে না। পাশের সিটের মহিলা উঠে যাওয়াতে আমার জন্য ভালোই হয়েছে। তিনি পাশে থাকলে হয়তো অস্বস্তি লাগতো। অনেকে দেখলাম চিৎকার চেঁচামেচি করছে খাবার দেবার সময়। এই যে সিস্টার, এদিকে, এদিকে বলে বাংলায় ডাক দিচ্ছে হাত তুলে। থাই তরুণীরা বিরক্ত হলেও করার কিছু নেই। মুখটা হাসি হাসি করে রাখছে।
            আমি অবাক হয়ে এদের পেশাদারী দক্ষতা দেখছিলাম। এয়ার হোস্টেজ হবার জন্য কত রকমের ট্রেনিং নিতে হয়েছে তাদের। কত রকম মানুষের সাথে প্রতিদিন দেখা হচ্ছে, হাসিমুখে তাদের সামলাতে হচ্ছে। আবার নিজেদেরও নিশ্চয় সামলে রাখতে হচ্ছে নানারকম অন্যায় প্রলোভন থেকে। লাঞ্চের পর প্লেনের ভেতর ব্যস্ততা কিছুটা বেড়ে গেলো। অনেকে নিজের সিট ছেড়ে অন্যের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছেন। টয়লেটের কাছে লম্বা লাইন। এর মধ্যেই থাই বিমান-বালিকারা সবার এঁটো খাবার দাবার পরিষ্কার করে নিয়ে গেছে। কারো চা-কফি-মদ লাগবে কি না জিজ্ঞেস করছে। দেখলাম আমার বাংলাদেশী ভাইদের মধ্যে অনেকেই বেশ আয়েশ করে মদের পাত্রে চুমুক দিচ্ছেন। ব্যাংকক পৌঁছাবার আগেই তো এরা মাতাল হয়ে যাবে!
            কিছুক্ষণ পর একটা সাদা ফর্ম দেয়া হলো। এম্বারকেশান ও কাস্টম্‌স ডিক্লারেশান। যারা থাইল্যান্ড যাচ্ছেন তাদের জন্য এটা পূরণ করা বাধ্যতামূলক। ইংরেজি আর থাই ভাষাতে ছাপানো ফরমটি উল্টে- পাল্টে দেখলাম। আমি থাইল্যান্ডে ঢুকছি না, তাই এই ফরম আমাকে পূরণ করতে হবে না। মেলবোর্নের ফ্লাইটে নিশ্চয় এরকম একটি অস্ট্রেলিয়ান ফরম দেয়া হবে। ভাবতে ভাবতে জানালায় চোখ রাখলাম।
                বাইরে তাকিয়ে প্লেনের গতি বোঝা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে ঝকঝকে নীল আকাশে শুধুমাত্র ভেসে আছি। আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি অনুসারে অন্য কোন রেফারেন্স ফ্রেমের সাথে তুলনা করা যাচ্ছে না বলেই গতি বোঝা যাচ্ছে না। টিভির পর্দায় দেখা যাচ্ছে প্লেন এগিয়ে চলেছে ঘন্টায় নয়শো কিলোমিটার বেগে। কিন্তু আমার মন ছুটে চলেছে তার চেয়ে অনেক বেশি বেগে, পেছনের দিকে। কত চেষ্টা আর কষ্টের ফসল আজকের এই দিন। তবে এখনো বুঝতে পারছি না এ ফসল ভালো না মন্দ।
                আমার বাবা মাঝে মাঝে বাংলা মেশানো সংস্কৃতে একটা শ্লোক বলেন। যার অর্থ- অঋণী অপ্রবাসীই হলো সত্যিকারের সুখী মানুষ। সে হিসেবে সুখী হবার কোন রাস্তাই আমার খোলা নেই। আমি আকন্ঠ ঋণগ্রস্ত।  মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির এক সেমিস্টারের টিউশন ফি থেকে শুরু করে প্লেনভাড়াটার জন্যও আমাকে ঋণ করতে হয়েছে। অর্থঋণ হয়তো শোধ হবে এক সময়। কিন্তু ভালবাসার ঋণ শোধ হয় না কিছুতেই।        
                থ্যাংক ইউ ফর ট্রাভেলিং উইথ থাই এয়ারওয়েজ- পাইলটের কথার এই শেষ লাইনটি ছাড়া আর কোন কিছুই কানে ঢোকেনি এতক্ষণ। প্লেন ব্যাংকক এয়ারপোর্টের কাছে আসতে না আসতেই শুরু হয়েছে এই ঘোষণা। আমার চোখ প্লেনের জানালায়, কাচের আবরণ পেরিয়ে আকাশের মেঘে, মেঘ ফুঁড়ে হয়তো আরো দূরে। কিছু দেখেছি বলে মনে হয় না, কেবল তাকিয়েই থেকেছি সারাটা সময়। মনে হচ্ছে একটা ঘোরের মধ্যে আছি।
            রানওয়ের মাঝখানে থেমে গেছে প্লেন। সিট বেল্ট সাইন অফ হয়ে গেছে। যাত্রীরা প্রায় সবাই দাঁড়িয়ে গেছেন। ওভারহেড কেবিন খুলে যার যার ব্যাগ নিচ্ছেন। আমার দুটো ক্যাবিন ব্যাগ। দুটোই খুব ভারী। ভারী ব্যাগটা আরো ভারী করেছি এয়ারলাইন্‌সের দুটো ম্যাগাজিন নিয়ে। প্রায় সবাই বাংলায় কথা বলছেন। মনে হচ্ছে এখনো বাংলাদেশেই আছি। একজন সর্দার টাইপের লোক বেশ উচ্চস্বরে বলছেন, শোনেন ভাইরা, এইটা ব্যাংকক এয়ারপোর্ট। এইটা এত বড় যে একটু এদিক ওদিক গেলেই হারাইয়া যাইবেন। তখন আবার সেই বাংলাদেশেই ফিরত যাইতে হইবো, দুবাই যাওয়া আর হইব না। এখন সিধা আমার পিছে পিছে আইয়া পড়েন। এটা ঠিক কোন্‌ অঞ্চলের ভাষা বুঝতে পারছি না। সম্ভবত টিভি নাটকের জগাখিচুড়ি আঞ্চলিক ভাষা। সামনের দিকের মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি বক্তৃতা দিচ্ছেন বলে পেছনের যাত্রীরা বেরোতে পারছেন না। একজন ক্রু এসে তাঁকে সরতে বলার পর তিনি নেমে গেলেন। তাঁকে অনুসরণ করলেন নীল ড্রেস পরা পাঁচ-ছয় জন মানুষ। এদেরকেই হয়তো দুবাই নিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
            প্লেনের দরজার সাথে সিঁড়ি লাগানো। নেমে এলাম রানওয়েতে। বেশ কিছু ছোট-বড় প্লেন দাঁড়িয়ে আছে সামনের টার্মিনালের কাছে। প্রচন্ড গরম এখানে। মনে হচ্ছে আগুনের আঁচ লাগছে। এতক্ষণ প্লেনের ভেতর এয়ার কন্ডিশানে ছিলাম বলেই গরমটা একেবারে চামড়ায় বসে যাচ্ছে। সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে গার্ড টাইপের কয়েকজন হাত তুলে ইঙ্গিত করে দেখাচ্ছেন সামনের বাসে উঠতে।  
            বাসে ঠাসাঠাসি ভিড়, ভ্যাপসা গরম। রানওয়ের মাঝখান দিয়ে বাস এসে থামলো টার্মিনালের কাছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে টার্মিনালের পেছন দিকের একটি দরজা। এখানেও কাঁধে কালো স্ট্রাইপ আঁকা সাদা ইউনিফরম পরা এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি। ট্রাফিক পুলিশের মত হাত তুলে দেখাচ্ছেন কোন দিকে যেতে হবে।
            সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম দোতলায়। মোজাইক করা ধবধবে মেঝে আলোয় ঝলমল করছে। একটু পর পর হলুদ সাইন দেখা যাচ্ছে। কোন কিছু খুঁজতে হলে সাইনগুলো দেখলেই বোঝা যাবে কোন দিকে যেতে হবে। নিউটনদার কথা কানে বাজছে, পৃথিবীর সব এয়ারপোর্টই ধরতে গেলে একই নিয়মে চলে। একই রকম বোর্ডিং ব্রিজ, একই রকম এভিয়েশান সিস্টেম    
            আমার সাথে একই প্লেনে যারা এসেছেন তাঁদের বেশির ভাগই ব্যাংককের যাত্রী। দল বেঁধে চলে গেলেন ইমিগ্রেশানের দিকে। ওদিকেই ব্যাগেজ ক্লেম সাইন দেখা যাচ্ছে। আমাকে যেতে হবে অন্যদিকে। ট্রানজিট সাইন দেখতে দেখতে থাই এয়ারলাইন্‌সের কাউন্টারে এসে থামলাম। ডোমেস্টিক, ইন্টারন্যাশনাল সব কাউন্টারই খোলা। এখানে-ওখানে সিলিং থেকে ঝুলছে টিভি মনিটর- বিভিন্ন ফ্লাইটের এরাইভ্যাল ও ডিপার্চার টাইম দেখানো হচ্ছে সেখানে। আমার কানেক্টিং ফ্লাইট টিজি৯৮১ - ছাড়ার কথা রাত সাড়ে আটটায়।
            কাউন্টারে কর্মব্যস্ত থাই তরুণ তরুণীরা হাসিমুখে সামলাচ্ছে যাত্রীদের ভিড়। লাইনে আমার সামনের জনের কাজ মিটে যেতেই এগিয়ে গেলাম।       
            পাসপোত এন তিকেত প্লিজ!
            থাই উচ্চারণে ইংরেজি শুনতে একটু অন্যরকম লাগে। হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে আমার পাসপোর্ট আর টিকেট নিয়েই কম্পিউটারের কি-বোর্ডে ঝড় তুললো মেয়েটি। ফ্যাকাসে হলুদ গোলগাল মুখ, চ্যাপ্টা নাক আর ছোট ছোট চোখ।
            দু ইউ লাই উইন্দো অ আই?
            বুঝতে পারছি না মেয়েটি কী জানতে চাচ্ছে। তার অন্যরকম উচ্চারণ আর আমার ইংরেজি জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণেই এরকম হচ্ছে। বাক্যটি আরো কয়েকবার বলার পর বুঝতে পারলাম- “ডু ইউ লাইক উইনডো অর আইল? জানালার পাশের সিট নাকি অন্য পাশের সিট চাচ্ছি জানতে চাচ্ছে। অবশ্যই জানালার ধারের সিট। একটু পরেই বোর্ডিং কার্ড নিয়ে থ্যাংক ইউ বলে চলে এলাম।              
            কাউন্টারের একপাশে একটি ক্যাফে। সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছেন বেশ কিছু মানুষ। ক্যাফের পাশে ছোট্ট একটি রুমে কম্পিউটার গেম আর নানারকম ভেন্ডিং মেশিন। এর কোনটাই আমি আগে কখনো দেখিনি। নয়-দশ বছরের একটি বাচ্চা এসে মেশিনে কয়েন ঢুকিয়ে কিছু একটা করতেই একটা কোকের বোতল বেরিয়ে এলো মেশিন থেকে। ইচ্ছে করছিলো আমিও একবার চেষ্টা করে দেখি। কিন্তু আমার কাছে কোন থাই কয়েন নেই।
            একটু সামনে গিয়ে দেখি ফ্লোরে চাদর বিছিয়ে শুয়ে বসে আছেন অনেকে। বাংলাদেশ থেকে আসা নীল পোশাকের মানুষদের দেখলাম ফ্লোরের একদিকে গোল হয়ে বসে নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। প্রত্যেকের চোখে-মুখে উদ্বেগের চিহ্ন স্পষ্ট। আমার দিকে তাকালে তাঁরাও হয়তো সেরকম চিহ্নই দেখবেন আমার ভেতর। সবাই নিজের দেশ ছেড়ে বিদেশে যাচ্ছেন একটু উন্নত জীবনের আশায়। বিদেশে বেড়াতে যাওয়া মানুষ আর কাজ করতে যাওয়া মানুষের মধ্যে কত পার্থক্য। যারা বেড়াতে যান তাদের চোখে-মুখে থাকে উৎসাহ আনন্দের চিহ্ন। আর যারা কাজ করতে যান তাদের থাকে উদ্বেগ। এই লাউঞ্জে যারা বসে আছেন, তাঁদের চেহারা দেখেই বলে দেয়া যায় কে কোন্‌ কারণে যাচ্ছেন।
            লাউঞ্জের  মাঝে মাঝে বেশ কয়েকটি টিভি স্ক্রিনে সি-এন-এন চ্যানেল চলছে। লাউঞ্জের দুপাশে বেশ কিছু দোকান। গিফ্‌ট শপ, ফ্রুট শপ, ফুট-মাসাজ। ফুট-মাসাজ পার্লারে ছোট ছোট বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছেন অনেকে, আর তাদের পদসেবা করছে কিছু থাই তরুণী।
            আমাকে যেতে হবে ১২ নম্বর গেটে। হলুদ সাইন দেখে বুঝতে পারছি- যেতে হবে তিনতলায়। দোতলা থেকে তিনতলায় উঠার সিঁড়ির বাম পাশে ইমিগ্রেশান অফিসারদের ঘর। এখান থেকে অন দ্যা স্পট ভিসাও ইস্যু করা হয়। কয়েকজন অলস থাই পুলিশ দেখলাম সেখানে- পেট-মোটা গম্ভীর।
            লোহার গেট পেরিয়ে বামদিকে গেলেই তিনতলায় উঠার চলমান সিঁড়ি। তারপাশে এমনি সিঁড়িও আছে। জীবনে প্রথম এস্কেলেটরে পা রাখলাম। একদিনেই অনেক নতুন ব্যাপার ঘটে যাচ্ছে আজ।
            তিনতলায় উঠে হকচকিয়ে গেলাম। মনে হচ্ছে বিশাল এক শপিং সেন্টারে ঢুকে পড়েছি। অসংখ্য যাত্রীর আনাগোনা। ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে কেউ হাঁটছে, কেউ ছুটছে। কাঁধের ব্যাগটা অসম্ভব ভারী মনে হচ্ছে এখন। প্রায় সবার ব্যাগেই দেখি চাকা লাগানো আছে। তরতর করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এরকম চাকাওয়ালা ব্যাগও এর আগে দেখিনি আমি। আসলে তেমন কিছুই তো দেখার সুযোগ আমার ঘটেনি। আমাদের চৌদ্দগোষ্ঠীতে আমরাই একটু পড়ালেখা করার সুযোগ পেয়েছি। আমার আগে দিদি দেশের বাইরে গেছে একবার- জাপানে। আমার তো তবু একটা চলনসই ব্যাগ কাঁধে আছে। দিদি গিয়েছিলো একটি চটের থলে হাতে নিয়ে।
            স্ট্যান্ড থেকে ট্রলি নেবো কিনা ভাবছি। ট্রলির জন্য টাকা দিতে হয় কিনা জানি না। কাউকে জিজ্ঞেস করতেও সংকোচ হচ্ছে। একজন যাত্রী ট্রলি-স্ট্যান্ড থেকে বেশ দূরে একটি ট্রলি ফেলে গেলো। আমি সেটা দখল করলাম। কাঁধের বোঝা হালকা হওয়াতে কিছুটা ভালো লাগছে। হলুদ সাইন দেখতে দেখতে এগোচ্ছি ১২নং গেটের দিকে। দুপাশে অসংখ্য মনোহারি দোকান। স্থায়ী দোকানের পাশাপাশি অনেকগুলো অস্থায়ী দোকান। চাকা লাগানো দোকানগুলো মনে হচ্ছে ঠেলে ঠেলে নিয়ে যায় যেদিন যেখানে খুশি। বেশির ভাগ দোকানীই অল্পবয়সী মেয়ে।
                ১২নং গেটে যাবার জন্য এদিক থেকে আবার দোতলায় নামতে হলো। এখানে ট্রলি নিয়ে যাওয়া নিষেধ। ব্যাগ দুটো কাঁধে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতেই সিকিউরিটি চেক। তেমন ভীড় নেই এদিকে।
                ইন্সপেক্টর টাইপের একজন ছেলে বসে আছে বিরাট স্ক্যানারের সামনে। আর মেটাল ডিটেক্টর লাগানো গেটের কাছে হাত খানেক লম্বা কালোমতন একটি যন্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মহিলা। কোমরের বেল্ট, ঘড়ি, চশমা সব খুলে প্লাস্টিকের ঝুড়িতে রাখতে হলো। দুপুরে ঢাকা এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি পার হবার সময় এসব খুলতে হয়নি। সেখানেও মেটাল ডিটেক্টর ছিল, কিন্তু চেক করা হয়েছে সারাগায়ে হাত বুলিয়ে।
                মেটাল ডিটেক্টরের ভেতর দিয়ে হেঁটে এলাম। কোন শব্দ হলো না। স্ক্যানারের ভেতর থেকে আমার ব্যাগ বেরিয়ে এলো। ইন্সপেক্টর ছেলেটার ইচ্ছে হলো আমার ব্যাগদুটো খুলে দেখবে। ধীরে সুস্থে ব্যাগ খুলে এদিক ওদিক হাত ঢুকিয়ে চেক করছে। মহিলা ইন্সপেক্টর হাতের যন্ত্রটি আমার শরীরের কাছে এনে দেখছেন কোন শব্দ হয় কিনা। মনে হচ্ছে এ কাজটি করতে খুব মজা পাচ্ছেন তিনি। নিজেদের ভাষায় কথা বলতে বলতে একটু পর পর হেসে উঠছেন। আমাকে নিয়ে মজা করছেন কিনা জানি না। করলেও করতে পারেন। আমাদের দেশ সম্পর্কে থাইদের ধারণা কীরকম জানি না, তবে মনে হচ্ছে খুব একটা সম্মানজনক নয়।
                একটু পরেই ও-কে বলে ছেড়ে দিলো আমাকে। থ্যাংক ইউ বলে এসে বসেছি এখানে। গেটের কাছে কাউন্টার খুলেছে। আস্তে আস্তে ভীড় বাড়ছে। যে ভদ্রমহিলা ঢাকা থেকে আসার সময় প্লেনে আমার পাশের সিট থেকে উঠে গিয়েছিলেন তাঁর সাথে চোখাচোখি হতেই তিনি মুখটা কঠিন করে চোখ সরিয়ে নিলেন। মনে হচ্ছে এখানেও আমাকে দেখে তিনি খুব বিরক্ত। তাঁর নাম দেয়া যাক বিরক্তি বেগম। বিরক্তি বেগমের বিরক্তি দেখে আমার খুব মজা লাগছে। আচ্ছা তাঁর এ বিরক্তির কারণ কী বলতে পারো?



Latest Post

Quantum Computers: Energy-Efficient or Power-Hungry?

  Only forty years ago, the number of mobile-phone users in the world was tiny. Consider the 1980s. Mobile phones were not yet part of peopl...

Popular Posts