Monday 14 March 2022

সত্যেন বসুর আবিষ্কার: বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

 



আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর অবদান কী? শুধুমাত্র একটি শব্দ ব্যবহার করে যদি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় – আমরা বলবো ‘বোসন’। মহাবিশ্বে যত মৌলিক কণা আছে তাদের সবগুলোকে প্রধানত দুইভাগে ভাগ করা যায়। স্টিফেন হকিং তাঁর বিখ্যাত 'ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম' বইতে খুব সহজভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে মহাবিশ্বের সবকিছুকেই (পদার্থ, শক্তি, আলো, অভিকর্ষ সবকিছু) কণার ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। মৌলিক কণাগুলোকে যে দুভাগে ভাগ করা যায় তাদের একভাগের নাম ফার্মিয়ন (Fermion), অন্যভাগের নাম বোসন (Boson) । ফার্মিয়ন কণার নাম দেয়া হয়েছে ইতালিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মির নাম অনুসারে। ফার্মি থেকে ফার্মিয়ন। আর বোসন কণার নাম দেয়া হয়েছে আমাদের সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নাম অনুসারে। বোস থেকে বোসন। ফার্মিয়ন কণাগুলো ‘ফার্মি-ডিরাক স্ট্যাটিসটিক্স’ মেনে চলে, আর বোসন কণাগুলো মেনে চলে ‘বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিসটিক্স’। ইলেকট্রন হলো ফার্মিয়ন, আর ফোটন হলো বোসন।

বিজ্ঞানের জগতে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর প্রতি এটা যে কতবড় সম্মান তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যে আবিষ্কারের জন্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে এই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে সেই আবিষ্কারটি তিনি করেছিলেন ১৯২৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার সময়। সে হিসেবে বোসন কণার জন্মস্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ বছর ১৯০০ সালে ম্যাক্স প্ল্যাংক  তাঁর black-body radiation law প্রকাশ করেন। প্রকাশিত হয় কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সবচেয়ে প্রভাবশালী গাণিতিক উপাদান প্ল্যাংকের ধ্রুবক, প্রতিষ্ঠিত হয় শক্তির কোয়ান্টাইজেশান - যেখান থেকে শুরু হয় কোয়ান্টাম মেকানিক্স। নিউটনের ক্ল্যাসিক্যাল মেকানিক্স দিয়ে বিজ্ঞানের অনেক সূক্ষ্ম ব্যাপার-স্যাপার ঠিকমতো ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিলো না। কোয়ান্টাম মেকানিক্স সেসব বিষয়ের সমাধান করতে শুরু করলো কিছুটা অদ্ভুত পদ্ধতিতে। ম্যাক্স প্ল্যাংকের পথ ধরে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দশকেই আলবার্ট আইনস্টাইন পদার্থবিজ্ঞানে বিপ্লব নিয়ে এলেন। ১৯০৫ সালে তিনি প্রকাশ করলেন চারটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্র। তিনি ব্যাখ্যা করলেন কেন এবং কীভাবে ফটো-ইলেকট্রিক ইফেক্ট ঘটে। তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ তথা আলোর কণা ফোটনের প্রাণ প্রতিষ্ঠা হলো। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন যখন ফটো-ইলেকট্রিক ইফেক্ট সম্পর্কিত গবেষণাপত্র প্রকাশ করছিলেন তখন কলকাতায় সত্যেন বসুর বয়স মাত্র ১১। আইনস্টাইনের নামও তিনি শোনেননি তখনও। সেদিন কেউ জানতো না যে একদিন আইনস্টাইনের নামের সাথে জুড়ে যাবে একজন বাঙালির নাম - সত্যেন্দ্রনাথ বসু। ইলেকট্রন ও ফোটনের মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য আছে তার গাণিতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর হাতে এবং তা করতে গিয়ে তাঁর নাম আইনস্টাইনের সাথে জুড়ে গিয়েছে চিরদিনের জন্য। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সাথে কাজের উল্লেখ না করে আইনস্টাইনের কোনো পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জীবনী লেখা অসম্ভব।

সত্যেন বসু গবেষণা শুরু করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয়ার পর। তাঁর প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় ১৯১৮ সালে, এবং শেষ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে। এই ৩৭ বছরে তিনি মাত্র ৩০টি মৌলিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। সংখ্যাগত হিসাবে এই সংখ্যা খুবই কম। এত কম প্রকাশনার প্রধান কারণ হলো সত্যেন বসু গবেষণাপত্র প্রকাশে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। গবেষণার ফলাফল জানার ব্যাপারে তাঁর উৎসাহ যতটা ছিল, সেই গবেষণালব্ধ ফলাফল গবেষণাপত্রে প্রকাশ করে জানানোর ব্যাপারে ততটা উৎসাহ ছিল না। ১৯৫৫ সালের পরে তিনি আরো বিশ বছর বেঁচেছিলেন, অনেক বিষয়ে গবেষণাও করেছেন সেই বিশ বছরে। কিন্তু কোন গবেষণাপত্র প্রকাশ করেননি। অনেকে মনে করেন, ১৯৫৫ সালের ১৮ এপ্রিল আলবার্ট আইনস্টাইনের মৃত্যুর পর সত্যেন বসু আর কোন গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে রাজি হননি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর তিনি ১৯২১ সালে নবপ্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সেখানে অধ্যাপনা করেছেন। এরপর আবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন। ১৯৫৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেয়ার পর তিনি রাজ্যসভার সদস্য হয়েছিলেন,  বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন, এরপর আমৃত্যু জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এই পুরো সময়টাতেও তিনি বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেছেন, গবেষকদের গবেষণা তত্ত্বাবধান করেছেন। কিন্তু ছাত্রদের গবেষণাপত্রে তিনি কখনো নিজের নাম প্রকাশ করেননি। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেছেন, বোসন কণার সংখ্যায়নের মতো বিশ্বজনীন আবিষ্কারের পরেও তিনি সেইসব বিষয়ে আরো বিস্তৃত গবেষণায় আগ্রহী হননি। পরবর্তীতে তাঁকে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি অনেকটা ধুমকেতুর মতো। যে ধুমকেতু একবার এসে চলে যায়, আর ফিরে আসে না।“

প্রকাশিত গবেষণাপত্রের ভিত্তিতে সত্যেন বসুর গবেষণাকে বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। ইংরেজি ছাড়াও তাঁর পৃথিবীবিখ্যাত গবেষণাপত্রগুলি তিনি লিখেছিলেন জার্মান এবং ফরাসি ভাষায়। তিনি এসব ভাষায় পারদর্শী ছিলেন।

সত্যেন বসুর প্রথম গবেষণা ছিল গ্যাসের গতিতত্ত্বের সমীকরণ সম্পর্কে। মেঘনাদ সাহার সাথে যৌথভাবে তাঁর প্রথম গবেষণাপত্র ‘অন দি ইনফ্লুয়েন্স অব দি ফাইনাইট ভল্যুম অব মলিকিউলস অব দি ইকুয়েশান অব স্টেট’ প্রকাশিত হয় ১৯১৮ সালে। এরপর তিনি আরেকটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন এই বিষয়ে ১৯২০ সালে। এর মাঝখানে ক্লাসিক্যাল মেকানিক্সের সাম্যতার সমীকরণ সম্পর্কে দুটো গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন ১৯১৯ সালে।

সত্যেন বসু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক অবদান রেখেছেন কোয়ান্টাম তত্ত্বে। আইনস্টাইন যেমন মাত্র চারটি গবেষণাপত্র দিয়ে মহাবিশ্বের ধারণা বদলে দিয়েছেন, তেমনি সত্যেন বসু মাত্র দুইটি গবেষণাপত্রেই বদলে দিয়েছেন কণা-পদার্থবিজ্ঞানের ভিত। কোয়ান্টাম তত্ত্বের উপর সত্যেন বসু মাত্র চারটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। ১৯২০ সালে প্রকাশ করেছিলেন কোয়ান্টাম তত্ত্বের বর্ণালী নির্গমনের রাইডবার্গের নিয়ম সম্পর্কে। এরপর ১৯২৪ সালে আলবার্ট আইনস্টাইনের সাথে যৌথভাবে জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বিখ্যাত গবেষণাপত্রদুটো – যাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বোসন কণার ‘বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিস্‌টিক্স’।

এই গবেষণাপত্রেই সত্যেন বসু প্ল্যাংকের বিকিরণ সূত্র নতুনভাবে বের করার জন্য ফোটনগুলোকে কণা হিসেবে গণ্য করেছেন। শক্তি বিকিরণের হিসেব করার সময় তিনি হিসেব করেছেন এক একটা সেল বা কোষে কতটা করে ফোটন বিন্যস্ত হতে পারে। সেল বা কোষ - একটা ধারণা। সবচেয়ে ছোট আকারের যে জায়গা সম্ভব - পদার্থবিজ্ঞানে সেরকম সম্ভাব্য ছোট জায়গাকে সেল বা কোষ বলা হচ্ছে (এর সাথে জীববিজ্ঞানের কোষের সম্পর্ক নেই)। প্ল্যাংকের মান h দিয়েই সবচেয়ে ছোট দৈর্ঘ্যের হিসাব করা হয়। একটি সেলের আয়তন হিসেব করতে গেলে তাই h x h x h = h3 ধরে নেয়া হয়। সত্যেন বসু দেখিয়েছেন যে কোনো দশা-স্থানে (phase-space)  যদি A সংখ্যক সেল থাকে তাহলে সেই সেলের সংখ্যা সবগুলো দশা-স্থানের সম্ভাবনা থেকে নির্ণয় করা যায়। এই সম্ভাবনা বা probability নির্ণয় করার জন্য তিনি বোল্টজম্যানের ক্ল্যাসিক্যাল পদ্ধতিতে যেখানে বস্তুকণা ব্যবহার করা হয়েছে সেখানে তিনি কোষ-এর ধারণা ব্যবহার করলেন। ক্ল্যাসিক্যাল মেকানিক্সে প্রত্যেকটি বস্তুকণা স্বতন্ত্র। তারা দেখতে একই রকম হতে পারে, কিন্তু তারা স্বতন্ত্র। নীতিগতভাবে প্রত্যেকটিকেই অন্যটি থেকে আলাদা করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে দুটো বস্তুকণাকে স্থান পরিবর্তন করালে তা আলাদা অবস্থার সৃষ্টি করবে। যে কয়টি শক্তিগুচ্ছ (কোয়ান্টা) আছে তা দিয়ে দশা-স্থান পূরণ করলেই প্ল্যাংকের নীতি প্রতিষ্ঠা পায়।

প্রথম গবেষণাপত্রটি লন্ডনের ফিলসফিক্যাল ম্যাগাজিনে প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু জার্নাল-রেফারিরা সত্যেন বসুর নাম কিংবা তাঁর আবিষ্কৃত একেবারে নতুন ধরনের গণিতের সাথে পরিচিত ছিলেন না বলে গবেষণাপত্রটি প্রকাশের যোগ্য মনে করলেন না। এতে দমে না গিয়ে সত্যেন বসু সেই পেপারটি পাঠিয়ে দিলেন আলবার্ট আইনস্টাইনের কাছে। এর পরের ইতিহাস আমরা সবাই জানি। আইনস্টাইন সেই পেপারটি পড়ে এতটাই সম্ভাবনাময়তা খুঁজে পেলেন যে তিনি জার্মান ভাষায় পেপারটি অনুবাদ করে নিজের নামসহ পাঠিয়ে দিলেন জার্মানির বিখ্যাত জার্নালে প্রকাশের জন্য। এর পরের পেপারটিও জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হলো আইনস্টাইনের হাত দিয়ে। ১৯২৫ সালে এসংক্রান্ত আরো একটি গবেষণাপত্র রচনা করেছিলেন তিনি, কিন্তু আইনস্টাইন সেটার ব্যাপারে তেমন কোন আগ্রহ না দেখানোতে সত্যেন বসু নিজেই এব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি সেই পেপারটি আর প্রকাশ করেননি।

এরপর সত্যেন বসুর গবেষণা থেকে কালজয়ী সব ধারণার জন্ম হতে থাকে। ১৯২৫ সালের জানুয়ারি মাসে আইনস্টাইন যখন পেপারগুলোর কাজ শেষ করেন, তখন মৌলিক কণা বলতে শুধুমাত্র ইলেকট্রন, প্রোটন ও ফোটনকেই বোঝানো হতো। তখনো নিউট্রন আবিষ্কৃত হয়নি। প্রোটন যে ভাঙা যায় - সেটাও কারো মাথায় আসেনি তখনো। আইনস্টাইন দেখলেন যে শুধুমাত্র ফোটনই সত্যেন বসুর প্রস্তাবিত পরিসংখ্যান মেনে চলে। ফোটনের নতুন বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। ফোটনের সংখ্যা সংরক্ষিত নয়, এবং ফোটনের কোন স্থিরভর (rest mass) নেই।

১৯২৪-২৫ সালে বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিস্‌টিক্স যখন প্রকাশিত হয় - তখনো কিন্তু ফার্মি-ডিরাক স্ট্যাটিস্‌টিক্সের জন্ম হয়নি। কোয়ান্টাম স্ট্যাটিস্‌টিক্স বলতে তখনো বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিসটিক্‌সকেই বোঝানো হতো। (তখনো কিন্তু এর নামকরণ হয়নি)। ১৯২৫ সালের শেষের দিকে উলফগং পাউলি ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে এক্সক্লুশান প্রিন্সিপাল বা বর্জন নীতি আবিষ্কার করেন। সে নীতি অনুসারে পরমাণুর কোন শক্তিস্তরে একই রকমের ইলেকট্রন একটির বেশি থাকতে পারে না।  এর কিছুদিন পরেই ১৯২৬ সালের শুরুতে এনরিকো ফার্মি পাউলির বর্জন নীতি কাজে লাগিয়ে প্রকাশ করেন যেসব কণা পাউলির বর্জন-নীতি মেনে চলে সেসব কণার স্ট্যাটিসটিক্‌স। এই স্ট্যাটিসটিক্‌স আলাদা এবং এর নামও দেয়া হয়নি তখনো। একই বছর পল ডিরাক এই দুই প্রকার স্ট্যাটিস্‌টিক্সের সমন্বয় করে প্রথম প্রকার স্ট্যাটিসটিক্‌স যেসব কণা মেনে চলে সেই কণার নাম দেন 'বোসন', আর দ্বিতীয় প্রকার স্ট্যাটিস্‌টিক্স অর্থাৎ ফার্মির স্ট্যাটিসটিক্স যেসব কণা মেনে চলে তাদের নাম দেন ফার্মিয়ন।  কিছুদিনের মধ্যেই বিজ্ঞানীরা এই মত গ্রহণ করেন যে - বোসন কণা মেনে চলে বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিসটিক্স, আর ফার্মিয়ন কণা মেনে চলে ফার্মি-ডিরাক স্ট্যাটিস্‌টিক্স। একই কোয়ান্টাম-স্টেটে অসংখ্য বোসন থাকতে পারে, কিন্তু একই কোয়ান্টাম-স্টেটে একটার বেশি ফার্মিয়ন থাকতে পারে না।

জার্মানি ও ইংল্যান্ডে এই ব্যাপারগুলো যখন ঘটছিলো সত্যেন বসু তখন শারীরিকভাবে ঘটনাস্থলের খুবই কাছে ছিলেন। তিনি ছিলেন তখন জার্মানির বার্লিনে। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এত বড় ভিত্তি গড়ে ওঠার পেছনে তাঁর প্রথম পেপারটি থাকলেও আর কোন কিছুতে তাঁর বৈজ্ঞানিক অংশগ্রহণ ছিল না। বলা চলে তাঁকে না জানিয়েই তাঁর নামে মৌলিক কণার নামকরণ করা হলো, স্ট্যাটিস্‌টিক্‌সের নামকরণ করা হলো, পদার্থের নতুন অবস্থার নামকরণ করা হলো। এসব জানার পরেও সত্যেন বসু এই ব্যাপারে একেবারে নির্লিপ্ত হয়ে গেলেন। তিনি এসংক্রান্ত আর কোন গবেষণা করেননি। অনেক বছর পরে ১৯৪৩ সালে ডিরাক সমীকরণ ও জিম্যান ইফেক্টের উপর একটি ছোট্ট প্রবন্ধ প্রকাশ করা ছাড়া – নিজের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার সম্পর্কে তিনি আর কোন গবেষণায় আগ্রহী হননি।

আইনস্টাইন আদর্শ গ্যাসের কোয়ান্টাম তত্ত্ব থেকে একটি সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্তে আসেন। কোনো গ্যাসের তাপমাত্রা একটি সংকট-তাপমাত্রার (critical temperature) নিচে নিয়ে যেতে পারলে গ্যাসের পরমাণুগুলোর গতি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি চলে যায়। তখন তারা একে অপরের প্রতি কোন আকর্ষণ অনুভব করে না। তাদের কোন ফ্রি-এনার্জি থাকে না। অনেকগুলো পরমাণু তখন একই শক্তিস্তরে চলে আসার ফলে গ্যাসের সেই কণাগুলোকে একটি থেকে অন্যটি আলাদা করে চেনা যায় না। অর্থাৎ তারা বোসন কণার মতো আচরণ করে। তখন মনে হয় যেন সবগুলো পরমাণু ঘনীভূত হয়ে এক জায়গায় এসে গেছে।  এই অবস্থায় গ্যাসের একটি অংশ ঘনীভূত হয়ে যায়, অন্য অংশ সম্পৃক্ত আদর্শ গ্যাস (saturated ideal gas) হিসেবে থেকে যায়। এই অবস্থার নাম হয়েছে বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট বা বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবন। ১৯২৫ সালে প্রকাশিত এই ধারণা আস্তে আস্তে বাস্তবে রূপ নিতে থাকে। ১৯৩৮ সালে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রিটজ লন্ডন  ধারণা দেন যে সুপারফ্লুইড হিলিয়াম-৪ এর আচরণের মূল কারণ বোস-আইনস্টাইন-কনডেনসেশানের সাথে সম্পর্কিত।

বোস-আইনস্টাইন-কনডেনসেশানের এর আধুনিক ধারণা অনুসারে উচ্চ তাপমাত্রায় বোসন গ্যাসে কণাগুলোর শক্তির বন্টন বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিসটিক্‌স মেনে চলে। সংকট তাপমাত্রার নিচে গ্যাসের কণাগুলোর একটা বড় অংশ একই শক্তিস্তরে গিয়ে ঘনীভূত হয়ে যায় এবং বোস-আইনস্টাইন-কনডেনসেট তৈরি করে। এই অবস্থায় গ্যাসের কোয়ান্টাম আচরণ পর্যবেক্ষণ করা যায়, এবং পদার্থের অনেক মৌলিক ধর্মের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব।

সত্যেন বসুর আবিষ্কারের উপর ভিত্তি করে পরীক্ষাগারে প্রথম বোস-আইনস্টাইন-কনডেনসেট তৈরি করা সম্ভব হয় ১৯৯৫ সালে। এজন্য ২০০১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পান তিন জন আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী - এম-আই-টি'র উলফ্‌গ্যাং কেটেরলি, এবং কলরাডোর এরিক কর্নেল ও কার্ল ওয়াইম্যান। প্রমাণিত হয় যে এখন পদার্থের পাঁচ অবস্থা: কঠিন, তরল, বায়বীয়, প্লাজমা এবং বোস-আইনস্টাইন-কনডেনসেট। এছাড়াও হিলিয়াম-৩ আইসোটোপের সুপারফ্লুইডিটি আবিষ্কার করে ১৯৯৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পান  তিন জন আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী -  কর্নেল ইউনিভার্সিটির ডেভিড লি ও রবার্ট রিচার্ডসন, এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ডগলাস ওসারফ। হিলিয়াম পরমাণুর সুপারফ্লুইডিটি আসে বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেশান বা বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবন থেকে। ১৯৯৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পান দুজন আমেরিকান - স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির স্টিভেন চু ও ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেকনোলজির উইলিয়াম ফিলিপ্‌স, এবং একজন ফরাসী পদার্থবিজ্ঞানী - প্যারিসের কলেজ ডি ফ্রান্সের ক্লদে কোহেন-তানোজি। লেজার আলোর সাহায্যে পরমাণুকে ঠান্ডা করে আটকে ফেলার পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য তাঁরা নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় পরমাণুগুলো কিন্তু ঘন্টায় প্রায় চার হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটোছুটি করে। তাদেরকে এরকম ছুটন্ত অবস্থায় সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয় না। পরমাণুকে ক্রমাগত ঠান্ডা করতে থাকলে তাদের গতিবেগ ক্রমশ কমতে থাকে। দেখা গেলো যে এই আবিষ্কারও বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেশানকে সমর্থন করছে।

‘বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিস্‌টিক্স” এর শতবর্ষপূর্তি হবে ২০২৪ সালে। সত্যেন বসু জীবদ্দশাতেই নির্লিপ্ত ছিলেন তাঁর সাফল্যে। কিন্তু বর্তমান এবং ভবিষ্যতে বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবনের ব্যবহার ও গবেষণার অনেক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে পদার্থবিজ্ঞানের জগতে। এখন বিজ্ঞানীরা হাইড্রোজেন, লিথিয়াম, পটাশিয়াম, সিজিয়াম, স্ট্রনশিয়াম, ক্রোমিয়াম এবং ইটারবিয়াম থেকে বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবন উৎপন্ন করতে সমর্থ হয়েছেন। হিলিয়াম-৪ এর সুপার-ফ্লুইড তৈরি করেছেন। সত্যেন বসুর আবিষ্কার এই ক্ষেত্রে আরো অনেক বছর বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। ব্ল্যাকহোলের কার্যকর মডেল তৈরি থেকে শুরু করে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এ বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবন ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখছেন বিজ্ঞানীরা।

সত্যেন বসু শুধুমাত্র তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ছিলেন না। পরীক্ষণ বিজ্ঞানের প্রতিও তাঁর সমান আগ্রহ ছিল। তিনি রসায়নের পরীক্ষাগারে বসে অনেক গবেষণা করেছেন পরীক্ষামূলক রসায়নে। তাঁর তত্ত্বাবধানে অনেক রসায়নের গবেষক পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি জৈবরসায়ন পরীক্ষাগার স্থাপন করেছিলেন এবং সেখানেই প্রয়োজনীয় ঔষধ তৈরির পথ দেখিয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠিত গবেষণাগারকে আমাদের দেশের ঔষধ শিল্পের প্রথম সূতিকাগার হিসেবে ধরে নেয়া যায়। ১৯২৭ এবং ১৯৪৩ সালে রসায়নের উপর দুটো গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন তিনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক্স-রে গবেষণাগার স্থাপন করেছিলেন তিনি। তিনিই প্রথম ভারতীয় উপমহাদেশে মৃত্তিকা গবেষণার সূত্রপাত করেছিলেন। সত্যেন বসু আমাদের পথ দেখিয়েছেন সেমিকন্ডাক্টর – বিশেষ করে ট্রানজিস্টারের গবেষণায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ১৯২৬ সালে স্থাপন করেছিলেন স্পেকট্রোস্কোপিক ল্যাবরেটরি। সেই গবেষণাগারে গবেষণা করে তিনি ১৯২৯ সালে তিনি বেরিলিয়ামের বর্ণালী সম্পর্কিত গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। আমাদের দেশের এসংক্রান্ত গবেষণার পথ দেখিয়েছেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগ খোলা হয় সত্যেন বসুর উদ্যোগে। কাজী মোতাহার হোসেনকে তিনি উদবুদ্ধ করেন এবং পরিসংখ্যানে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করেন। ১৯৩৬ এবং ১৯৩৭ সালে পরিসংখ্যান বিষয়ে দুটো গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন সত্যেন বসু। আমরা এখন পরিসংখ্যানের যত গবেষণা করছি আমাদের দেশে – তার সূত্রপাত হয়েছিল সত্যেন বসুর হাতে।

পৃথিবীর আবহাওয়ামন্ডল সম্পর্কেও গবেষণা করেছেন সত্যেন বসু। আয়োনস্ফিয়ার সম্পর্কিত দুটো গবেষণাপত্র তিনি প্রকাশ করেছেন ১৯৩৭ এবং ১৯৩৮ সালে।

বিশুদ্ধ গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানের তিনটি গবেষণাপত্র সত্যেন বসু প্রকাশ করেছিলেন ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার সময়। হাইড্রোজেন পরমাণুর সমীকরণের ক্যালকুলাস সম্পর্কে খুবই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন তিনি।

আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব প্রকাশ করার পর আমৃত্যু কাজ করেছেন ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরি বা সমন্বিত ক্ষেত্রতত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টায়। কিন্তু সফল হননি। সত্যেন বসু এই বিষয়ে খুব আগ্রহ নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন ১৯৫৩ সালে। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৫ সালের মধ্যে তিনি পাঁচটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন সমন্বিত ক্ষেত্রতত্ত্ব বিষয়ে। ১৯২৫ সালে গবেষণাসংক্রান্ত পত্রযোগাযোগের ২৭ বছর পর আইনস্টাইনের কাছে তিনি আবার চিঠি পাঠিয়েছিলেন ১৯৫২ সালে।

 সমন্বিত ক্ষেত্রতত্ত্ব সম্পর্কে সত্যেন বসু যতটা আগ্রহ দেখিয়েছিলেন – এত আগ্রহ এর আগে তিনি আর কোন বিষয়ে দেখাননি। বেশ কিছু সম্ভাব্য সমাধানের ব্যাপারে তিনি আইনস্টাইনের সাথে পত্রযোগে আলোচনা করেছিলেন। আইনস্টাইনও আগ্রহ সহকারে তাঁর সাথে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু ১৯৫৫ সালে আইনস্টাইনের মৃত্যুর পর সত্যেন বসু এসংস্ক্রান্ত সব গবেষণা বন্ধ করে দেন। এরপর অন্যান্য বিষয়ে গবেষণা অব্যাহত রাখলেও – তিনি আর কোন গবেষণাপত্র প্রকাশ করেননি। আমরাও বঞ্চিত হয়েছি সমন্বিত ক্ষেত্রতত্ত্বের সম্ভাব্য সমাধান থেকে। কিন্তু আইনস্টাইন-সত্যেন বসুর পথ ধরে আরো অনেক বিজ্ঞানী এই সমন্বিত তত্ত্বের গবেষণা চালু রেখেছেন। স্টিফেন হকিংও এ ব্যাপারে অনেক গবেষণা করেছেন। এই গবেষণাও চলতে থাকবে আরো অনেক বছর।


তথ্যসূত্র:

১। দেবীপ্রসাদ রায় ‘সত্যেন্দ্রনাথ বসু চেনা বিজ্ঞানী অজানা কথা’, আনন্দ প্রকাশনী, কলকাতা, ২০১২।

২। প্রদীপ দেব, ‘সত্যেন্দ্রনাথ বসু বোসন কণার জনক’, মীরা প্রকাশন, ঢাকা ২০১৯।

৩। স্টিফেন ওর্‌নিস, ‘হাউ বোস-আইনস্টাইন কনডেন্‌সেটস কিপ রিভিলিং উইয়ার্ড ফিজিক্স’, পিএনএএস, ১১৪ (২৩), ২০১৭। 

__________________

বিজ্ঞানচিন্তা ডিসেম্বর ২০২১ সংখ্যায় প্রকাশিত








No comments:

Post a Comment

Latest Post

ডাইনোসরের কাহিনি

  বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণি কী? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলবো নীল তিমি – যারা দৈর্ঘ্যে প্রায় তিরিশ মিটার, আর ওজনে প্রায় ১৯০ টন পর্যন্ত...

Popular Posts