Friday 11 September 2020

ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী - পর্ব ৪৭

47

“ইঁয়ান কন্‌অ পিকনিক অইয়ে নে বদ্দা? ইশকুলর পিছন্দি চুলা বানাই রান্ধি খঅন-“ – কৃষি-কাশেম স্যারের  কথা শেষ হবার আগেই সাঈদ স্যার বললেন, “পিকনিক ন অয়?”

সাঈদ স্যার মাঝে মাঝে যখন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় একটি দুটি বাক্য বলতে চেষ্টা করেন – খুব মজা লাগে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার শ্রুতিমাধুর্য খুব কম। কিন্তু চট্টগ্রামের বাইরের কেউ যখন শখ করে এই ভাষায় একটা দুটো শব্দ উচ্চারণ করে তখন শব্দগুলি কেমন যেন বদলে যায়; অনেক নরম এবং মিষ্টি হয়ে যায়।

কৃষি-কাশেম স্যারের বক্তব্য হলো- স্কুলের পেছনে চুলা বানিয়ে রান্না করা হচ্ছে, এটা কোন পিকনিক হলো? আমাদের এখন দু’জন কাশেম স্যার। একজন দাদাভাই, অন্যজন নবীন। নবীন কৃষিবিজ্ঞান পড়ান, তাই তাঁর নাম হয়ে গেছে কৃষি-কাশেম। পুরনো বিল্ডিং-এ টিচারদের পিকনিকের আয়োজন চলছে আজ। শনিবার ফোর্থ পিরিয়ডের পর শিক্ষার্থীদের ছুটি হয়ে যায়। এরপর সবাই দল বেঁধে হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছি পুরনো বিল্ডিং-এ। এখানে আয়া-পিয়নরা রান্না-বান্না খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করছে। আমাদের টিচারদের কেউ কেউ গিয়ে দেখে আসছেন আয়োজন। আমরা বসেছি আমাদের আগের টিচার্স রুমে। অনেকদিন পরে এলে পরিচিত জায়গাও কেমন যেন অচেনা মনে হয়। বসে বসে গল্প করা ছাড়া আপাতত আর কোন কাজ নেই। টিচারদের পিকনিক এরকম সাদামাটাভাবে হচ্ছে এটা দেখে অবাক হচ্ছেন যাঁরা নতুন জয়েন করেছেন। কাশেম স্যার জয়েন করেছেন গতবছর। কিন্তু কলেজে তাঁর এটাই প্রথম পিকনিক। ১৯৯৬ সালের শুরুটা এত বেশি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে গেছে যে কেউ পিকনিকের কথা চিন্তাও করতে পারেনি। এর আগে আমরা কাপ্তাই ও মেরিন একাডেমিতে পিকনিক করেছি। ১৯৯৭ সালের রাজনৈতিক অবস্থা এখনো শান্ত। জানুয়ারির ২য় সপ্তাহ থেকে ফেব্রুয়ারির  ২য় সপ্তাহ পর্যন্ত রমজান ও ঈদের ছুটি গেল। এরপর ক্রিড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা শেষ হতে হতে ফেব্রুয়ারি শেষ। এখন মার্চের প্রথম শনিবারেই আমাদের পিকনিক।

সাঈদ স্যার পিকনিক কমিটির চেয়ারম্যান। কৃষি-কাশেম স্যারের কথাটাকে তিনি বেশ সিরিয়াসলি নিয়েছেন।

“পাঁচ হাজার টাকা বাজেটে এর চেয়ে ভালো পিকনিক আপনি কীভাবে করবেন কাশেম সাহেব? কত জায়গাতেই তো যাবার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু টিচাররা তো নিজের পকেট থেকে একটা টাকাও দিতে রাজি নন।“

কলেজের পিকনিক নিয়ে টিচারদের মধ্যে অনেক কথাবার্তা হয়েছে। কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, ময়নামতি – অনেক জায়গার নামই করা হয়েছে। সব জায়গাই পছন্দ টিচারদের। কলেজ ফান্ড থেকে টাকা দিলে যে কোন জায়গাতেই যেতে রাজি, কিন্তু নিজের পকেট থেকে চাঁদা দিতে হলে প্রায় কেউই রাজি নন। তাছাড়া একটিমাত্র ছুটির দিন – শুক্রবার – সেটাও পিকনিকে গিয়ে ‘নষ্ট’ করতে রাজি নন কেউ কেউ। কিন্তু শিক্ষকদের পিকনিক করার জন্য কলেজ ছুটি দেবে – সেরকম ‘মামার বাড়ির আবদার’ এখানে চলে না। অতএব কলেজ ফান্ড থেকে পাঁচ হাজার টাকা পাওয়া গেছে। তা দিয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী সব মিলিয়ে প্রায় ষাট জনের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নতুন বিল্ডিং থেকে পুরনো বিল্ডিং-এ এসে আমাদের পিকনিক হচ্ছে – শনিবার ক্লাসের পর।

একটার মধ্যেই খাবার রেডি হয়ে গেল। ক্লাসরুমের বেঞ্চে বসে আমাদের খাওয়া-দাওয়া। হোসনে আরা ম্যাডাম সুনিপুণ হোস্ট। তিনি আমাদের সবাইকে নিজের বাড়ির অতিথি আপ্যায়ন করার মতো করে যত্ন করে খাওয়ালেন। দেড়টার মধ্যে কার্যক্রম শেষ করে আমরা নতুন বিল্ডিং-এ চলে এলাম। প্রিন্সিপাল স্যার এলেন রিকশায় – আর আমরা সবাই হেঁটে। ভরপেট খাবার পর মার্চ মাসের রোদে এতদূর হেঁটে আসা শাস্তিতুল্য।

শনিবারে শিক্ষার্থীদের এগারোটায় ছুটি হয়ে যায়। তারপর কেউই দেড়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে না বাসের জন্য। আজও কোন স্টুডেন্ট নেই। আমরা টিচাররা নিজেদের মধ্যে হাসিঠাট্টা করতে করতে শহরে চলে এলাম। স্যার-ম্যাডামদের কথা থেকে বোঝা গেল – কলেজের ব্যাকইয়ার্ডের এই পিকনিকে কারোরই মন ভরেনি। সবাই একমত হলেন যে নেক্সট ইয়ারে অবশ্যই দূরে কোথাও পিকনিকে যাওয়ার ব্যবস্থা করবেন সবাই মিলে নিজেরা চাঁদা দিয়ে। নেক্সট ইয়ার এলে এই মনোভাব অটুট থাকবে কি না তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

বাসার গলিপথে আজ অনেক মানুষ। আমার বাড়িওয়ালা সালাম সাহেব একতলা বাসাকে দোতলা বানাচ্ছেন। আজ ছাদ ঢালাই হচ্ছে। তিনি আমাকে বলে রেখেছেন দোতলা রেডি হলেই আমাকে দোতলায় উঠিয়ে দেবেন। অবশ্য তারজন্য মাসে চারশ’ টাকা বেশি দিতে হবে। দোতলায় উঠার সিঁড়িটা বানানো হয়েছে আমার দরজার সামনে। সেজন্য বাইরের রুমটাও এখন অন্ধকার হয়ে গেছে। তালা খুলে ভেতরে ঢুকে লাইট-ফ্যান চালু করে দরজাটা বন্ধ করতেই দরজায় ঠক্‌ ঠক্‌ করে তিনবার টোকা মারলো কেউ। জোরালো ছন্দোবদ্ধ টোকা। কোন এক গোয়েন্দা কাহিনিতে পড়েছিলাম – কীভাবে দরজা নক করছে সেটা দেখেই নাকি বোঝা যায় মানুষটার ব্যক্তিত্ব কেমন হবে। মনে হচ্ছে এই মানুষ তবলা বাজায়, ছন্দ ও তাল সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখে। দরজায় ঠক্‌ ঠক্‌ করা থেকেই বোঝা যাচ্ছে তা। এই বাসায় যারা মাঝে মধ্যে আসে তাদের মধ্যে গান-বাজনা জানে শুধু একজন – অসীম। নিজেকে শার্লক হোম্‌স ভাবতে ভাবতে “কী খবর অসীম” বলে দরজা খুললাম।

“আমি অসীম নই, সসীম।“– বলে লম্বা হাত বাড়িয়ে দিলো আগন্তুক।

আগন্তুকের পরনে খাকি পোশাক। কিছুটা অবাক হয়ে তার হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললাম, “একলা থাকার ইচ্ছা, এ কী অবস্থা তোমার?”

ইউনিভার্সিটিতে আমরা বন্ধুদের নাম নিয়ে অনেক শব্দের খেলা খেলতাম। যেমন বোতলে রাখার জল – বজল, একলা থাকার ইচ্ছা – একলাইছ্যা। আমাদের একলাইছ্যা – এখলাস এখন আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

এরপর ঘন্টাখানেক সময় যেন উড়ে চলে গেল। এইচএসসি থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত আমরা এক সাথে লেখাপড়া করেছি। ফতেয়াবাদে মেসেও আমরা একসাথে ছিলাম অনেক দিন। পাস করার পর সে এখন কাফকোতে জয়েন করেছে। গুরুত্বপূর্ণ কোন এক সেকশানের অফিসার। বললো সেখানে পদ পদবি ভিন্ন ভিন্ন হলেও সবাইকে একই পোশাক পরতে হয়। সাধারণত সে বাড়ি থেকেই অফিস করে। আজ শহরে এসেছে জরুরি ভিত্তিতে আমাকে একটা খবর দিতে। কাফকো স্কুল এন্ড কলেজে ফিজিক্সের টিচার নেবে।

“কয়েকদিনের মধ্যেই এডভার্টাইজ করবে তারা। তুমি অবশ্যই এপ্লাই করবা। আমি শিওর তোমার চাকরি হবে সেখানে।“

“আমি যেখানে আছি, ভালোই তো আছি।“

“কাফকোতে সুযোগ সুবিধা কত বেশি জানো? স্টুডেন্ট বেশি নেই, কাজ কম। অথচ এখন যে বেতন পাও – তার চার-পাঁচগুণ বেশি বেতন পাবে।“

“কিন্তু কলেজটার তো নামও শুনিনি তেমন।“

“এখনো তো নতুন। আস্তে আস্তে শুনবে নাম। আমাকে এখন যেতে হবে। বাট আই ওয়ান্ট টু সি ইউ দেয়ার।“

এখলাস এখন অনেক বেশি ইংরেজি বলছে। সম্ভবত বিদেশি কোম্পানিতে ইংরেজিতেই কথাবার্তা বলতে হয় তাকে।

এখলাস চলে গেলো একটু পরেই। এত কষ্ট করে সে আমাকে যে খবরটা দিতে এসেছে আমি সেই খবরে খুব একটা উৎসাহিত হতে পারছি না। শুধুমাত্র বেশি বেতন পাবো এই কারণে চাকরির জন্য দরখাস্ত করবো? কিন্তু সেখানে কি কাজের স্বাধীনতা অনেক বেশি থাকবে? বুঝতে পারছি না। শহর ছেড়ে আনোয়ারায় গিয়ে চাকরি করবো? কিন্তু স্টাফদের জন্য নাকি শহর থেকে বাস যায় অনেকগুলি। জাপান নাকি অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছে এই কর্ণফুলি ফার্টিলাইজার কোম্পানিতে। মূলত কোম্পানির স্টাফদের ছেলেমেয়েদের জন্যই তৈরি করা হয়েছে কাফকো স্কুল এন্ড কলেজ। কিছুদিন পর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি আমার চোখে পড়েছে। সত্যিই বেশ আকর্ষণীয় সুযোগ সুবিধা। দরখাস্ত করলেই যে চাকরি হবে তার তো কোন গ্যারান্টি নেই। আর চাকরি হলেই যে সেখানে যেতে হবে তারও কোন বাধ্যবাধকতা নেই। ভাবলাম দরখাস্ত একটা করে দেখা যেতে পারে।

>>>>>>>> 

“প্রদীপবাবু, আপনি আমার সাথে দেখা করেন না কেন?”

প্রিন্সিপাল স্যার পিয়ন মিজানকে দিয়ে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন একটু আগে। আমি ক্লাস শেষ করে টিচার্স রুমে না গিয়ে প্রিন্সিপালের রুমে এসে ঢুকেছি। প্রিন্সিপাল স্যার আমাকে দেখেই প্রশ্ন করলেন আমি কেন তাঁর সাথে দেখা করি না। এটা কি ঘটমান বর্তমান? তাঁর সাথে কি আমার প্রতিদিন দেখা করার কথা? কোন দরকার ছাড়া প্রিন্সিপালের সাথে প্রতিদিন দেখা করতে হবে এমন কি কোন নিয়ম জারি হয়েছে?

বললাম, “আপনি ডাকলেই তো আসি স্যার।“

“ডাকতে হবে কেন? আসবেন, কথাবার্তা বলবেন, তবেই না জানাশোনা হবে।“

প্রিন্সিপাল স্যার কী জাতীয় জানাশোনার কথা বলছেন বুঝতে পারছি না।

“বসেন বসেন। অনেক কথা আছে আপনার সাথে।“

“আমার স্যার এখন আরেকটা ক্লাস আছে।“ – যথাসম্ভব বিনীতভাবে বললাম।

“যাবেন আর কি ক্লাসে। কলেজের ক্লাসে দশ মিনিট পরে গেলেও কোন অসুবিধা নেই।“ – প্রতিষ্ঠানের প্রধানের মুখে এ কী কথা শুনছি!

“আমার স্যার স্কুলে ক্লাস। ক্লাস নাইনে।“

“ক্লাস নাইনে? আমাদের এওসি স্যারের মেয়ে আছে না ক্লাস নাইনে? যান তাহলে তাড়াতাড়ি যান। পরে আমার সাথে দেখা করবেন। আপনার এমপিও হয়নি এখনো।“

প্রিন্সিপালের স্যারের রুম থেকে বের হয়ে ক্লাসে ছুটলাম। ক্লাসে এওসি স্যারের মেয়ে থাকলে ঠিক সময়ে যেতে হবে, নইলে দেরি করে গেলেও চলবে – এটা কোন্‌ ধরনের নীতি? শিক্ষকের কাছে ক্লাসের সব শিক্ষার্থী তো সমান হবার কথা।

আমি গতবছর ভাইস-প্রিন্সিপাল ম্যাডামকে অনুরোধ করেছিলাম আমাকে ক্লাস নাইনের ফিজিক্স ক্লাস দেয়ার জন্য। তিনি গতবছর ক্লাস নাইনের ত্রিসীমানায় আমাকে যেতে দেননি। এমনকি কোন এডজাস্টমেন্ট ক্লাসেও না। এবছর আমাকে ক্লাস নাইনের ফিজিক্স ক্লাস দেয়া হয়েছে। ক্লাস ফাইভের গণিতও আছে। একই সাথে প্রাইমারি, সেকেন্ডারি ও হায়ার-সেকেন্ডারির শিক্ষক হওয়ার মধ্যে বেশ মজা আছে। নিজের পারফরম্যান্সের রেঞ্জ বোঝা যায় তাতে।

ক্লাস শেষে আবার গেলাম প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে। তিনি জানালেন আমাকে ঢাকায় যেতে হবে ডিজি অফিসে। আমিসহ আরো কয়েকজনের এমপিও হয়নি এখনো। আমাদের বেতনের যে অংশ সরকার দেয় সেই অংশ এখনো দেয়া হচ্ছে না। আমাদের পুরো বেতনই দেয়া হচ্ছে শাহীনের তহবিল থেকে। এমপিও হবার পর সরকার আমাদের এতদিনের সব বেতন এক সাথে দিয়ে দেবে। এসব প্রশাসনিক ব্যাপারের কিছুই আমি জানি না। কীভাবে কী করতে হবে তার কিছুই তো আমি জানি না। আমি ঢাকায় গিয়ে কী করবো?

“আপনাকে কিছু করতে হবে না। আমার লোক আছে সেখানে। আপনি গিয়ে শুধু কাগজপত্রগুলি তার হাতে হাতে দিয়ে আসবেন। সে-ই সব করবে। আগামী সোমবার আপনি যাবেন।“

প্রিন্সিপাল স্যারের কথা শুনে মনে হচ্ছে এ জাতীয় কাজের মতো আনন্দজনক কাজ আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু আমার কেবলই মনে হচ্ছে – কলেজে এত মানুষ থাকতে আমি কেন? আবার এটাও তো ঠিক – আমার নিজের এমপিও হয়নি বলা হচ্ছে। কিন্তু এমপিও মানে কী?

প্রিন্সিপাল স্যারের রুম থেকে বের হয়ে অফিস রুমে ঢুকলাম। অ্যাকাউন্ট্যান্ট কাদের সাহেব বিশাল সাইজের খাতা খুলে কী যেন লিখছেন। তিনিও বাঁশখালির মানুষ, আমার পাশের গ্রামের মানুষ হিসেবে খাঁটি চট্টগ্রামের ভাষায় বাতচিত চলে আমাদের।

“এমপিও হইল স্যার মান্থলি পে অর্ডার। গর্ভমেন্টের মান্থলি পে অর্ডারের তালিকায় নাম থাকলে মাসে মাসে সরকারি অংশটা অটোম্যাটিক চলে আসবে স্যার।“– কাদের সাহেব সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিলেন।

“আপনি তো আমার কাগজপত্র জমা নিয়েছিলেন প্রায় দুই বছর আগে। এতদিনেও আমার এমপিও হলো না?”

“আপনার এমপিও হয়নি কে বললো?”

“প্রিন্সিপাল স্যার বললেন। বললেন আমাকে ঢাকা যেতে হবে।“

কাদের সাহেবের মুখে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠলো। বললেন, “প্রিন্সিপাল স্যার যখন আপনাকে পাঠাতে চাচ্ছেন, আপনি যান স্যার। সব ঠিক হয়ে যাবে। এমপিও হোক না হোক – আপনাদের বেতন কি একদিনের জন্যও দেরি হয়েছে স্যার?”

কাদের সাহেবের কথাবার্তা বেশ ডিপ্লোম্যাটিক। কিছু কিছু বিষয় এমনভাবে উপস্থাপন করেন যে অস্বীকার করার উপায় থাকে না।

অফিস রুম থেকে বের হতেই খান সাহেব পাকড়াও করলো।

“দোস্ত, তোমাকে খুঁজতেছি।“

“বলো।“

“আমাকে একটু সময় দিবা?”

“বলো।“

“একটু কনফিডেন্সিয়াল। চলো ঐদিকে যাই।“

টিচার্স রুমের পাশের রুমটা খালি। খান সাহেবের গোপনীয় কথা শোনার কৌতূহল হচ্ছে।

“দোস্ত, তুমি কি কাফ্‌কোর এডভার্টাইজটা দেখছো?”

“দেখেছি তো। তুমি কি অ্যাপ্লাই করবা?”

“তোমারে খুলে বলি ব্যাপারটা। আমার এই চাকরিটা হবে। এখন তুমি আমার দরখাস্তটা লিখে দাও। ইংরেজিতে লিখতে হবে তো। আমি মোটামুটি লিখছি। তুমি একটু চেক করে দিবা।“

খান সাহেব যখন বলছে তার চাকরিটি হবে – তখন আমি নিশ্চিত যে চাকরিটি তারই হবে। সে যতটুকু দেখায় তার চেয়ে অনেক বেশি জোর আছে তার খুঁটিতে।

>>>>>>>>>>> 

স্টেশন রোডে বিআরটিসি মার্কেটের কাছে পরপর অনেকগুলি বাসকাউন্টার। আগে টিকেট করে রাখিনি। হানিফ পরিবহনের বাস এখনই ছেড়ে দেবে। এই সকাল ছ’টায় খুব বেশি যাত্রী নেই। টিকেট নিয়েই বাসে উঠে পড়লাম। সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। নিম্নচাপ আছে, তিন নম্বর সিগনাল দেয়া হয়েছে। আকাশ কুচকুচে কালো। এ অবস্থায় ঢাকায় যেতে হচ্ছে। কাল রাতে চলে গেলেই হতো। কিন্তু কয়েক মিনিটের একটি কাজের জন্য রাত জেগে ভ্রমণ করার  চেয়ে ভোরের বাসে যাওয়াই বেটার বলে মনে করেছিলাম। কিন্তু রাতের ভেতর আবহাওয়া এত খারাপ হয়ে গেল।

কাল কলেজ ছুটির একটু আগে প্রিন্সিপাল স্যার একটি মুখবন্ধ মোটা খাম ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “আপনি ডিজি অফিসে গিয়ে তিন তলায় উঠে আবুল হোসেনকে এই খামটা দেবেন। আর আমার নাম করে বলবেন যে আমি তার ভাইয়ের সচিবালয়ে ভালো জায়গায় পোস্টিং পাইয়ে দেবো।“

“ডিজি অফিসটা কোথায় স্যার?”

“তোপখানা রোডে সচিবালয়ের কাছেই। শিক্ষা অধিদপ্তর। যে কোন রিকশা বা ট্যাক্সিওয়ালা আপনাকে নিয়ে যাবে। আপনি গেলেই চিনতে পারবেন।“

“খামটা দিয়ে এলেই হবে? আবুল হোসেন সাহেব কি আমাকে কিছু দেবেন?”

“না। কিছু দেবেন না।“

ঢাকার আবুল হোসেন হয়তো কিছু দেবেন না। কিন্তু আমার বন্ধু আবুল হোসেন খানও একটি খাম ধরিয়ে দিয়েছে আমাকে।

“দোস্ত, পরশুদিন লাস্ট ডেট। আমি ক্যুরিয়ার করলেও পৌঁছাবে না। তুমি তো যাচ্ছো ঢাকায়। আমার এপ্লিকেশানটা তুমি হাতে হাতে দিয়ে আসবা কাফকোর কর্পোরেট অফিসে।“

“অফিসটা কোথায়?”

“অ্যাড্রেস লেখা আছে খামের উপর। দোস্ত এই উপকারটা তুমি করবা।“

দুটো খাম নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছি। ঘটনাক্রমে দুটো খামের সাথে জড়িত দু’জন ভিন্ন ভিন্ন আবুল হোসেন।

বাস যত জোরে ছুটছে বাতাসের বেগ ততই বাড়ছে। রাস্তায় জ্যামে না পড়লে দুপুর বারোটার মধ্যে পৌঁছে যাবার কথা। জ্যামে পড়লে সমস্যা হয়ে যাবে। ডিজি অফিস নাকি দুপুর দুটার পর খালি হয়ে যায়। তখন আবুল হোসেনকে না পেলে ঝামেলা হবে।

প্রচন্ড বৃষ্টি আর বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে যে গতিতে ছুটছে বাস – যে কোন মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বৃষ্টির তোড়ে জানালার বাইরে কিছু দেখাই যাচ্ছে না। ড্রাইভার কীভাবে রাস্তা দেখছে, সামনের দিক থেকে ছুটে আসা গাড়ি দেখছে আমি জানি না। আশেপাশের যাত্রীদের সবার ভেতর বেশ নির্বিকার ভাব। আমার সামনের সিটের যুবক যাত্রী হঠাৎ জানালা খুলে বাইরে মুখ বাড়াতে উদ্যত হলেন। বৃষ্টির ঝাপটা এসে লাগলো বাসের ভেতর। সবাই হৈ হৈ করে উঠলো। বাসের হেল্পার ছুটে এলেন পলিথিনের ব্যাগ নিয়ে। নিত্যদিনের অভিজ্ঞতায় তারা বুঝতে পারেন। একটু পরেই বমির শব্দ আর বাজ পড়ার শব্দ মিশে গেলো একটানা বৃষ্টির ঝমঝমানির সাথে।

কমলাপুরে যখন বাস থেকে নামলাম তখনো বৃষ্টি থামেনি। ফোল্ডিং ছাতাটি শুধু মাথাটা বাঁচালো কোনরকমে, বাকিটা ভিজে গেল। এখান থেকে শিক্ষাভবন খুব বেশি দূরে নয়। কাকভেজা রিকশাওয়ালা পর্দা উঁচিয়ে ধরলেন। আমি ছাতা মুড়ে ঢুকে পড়লাম রিকশার অন্দরে।

ঝড়বৃষ্টি বন্যাখরা যাই হোক রাজধানী শহর কাবু হয় না কিছুতেই। এই বৃষ্টিতে রাস্তায় পানির স্রোত যত, তার চেয়েও বেশি গাড়ি ও রিকশার স্রোত, মানুষের ঢল। প্রিন্সিপাল স্যার ঠিকই বলেছিলেন। শিক্ষাভবন খুঁজে পাওয়া কোন কঠিন কাজ নয়।

ভবনের উচ্চতার তুলনায় সিঁড়ির প্রস্থ বেশ কম। তিন তলায় উঠে ডানে ঢুকতেই মনে হলো কোন কাঁচাবাজারে ঢুকে গেলাম। গিজগিজ করছে মানুষ একটা রুমের ভেতর। রেয়াজউদ্দিন বাজারের অনেক আড়তে দেখা যায় লোকজন মুঠো মুঠো টাকা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে জিনিস নেয়ার জন্য। এখানেও দেখলাম একটা টেবিল ঘিরে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছেন অনেক মানুষ। প্রত্যেকের হাতেই কাগজপত্র আর তাড়া তাড়া টাকা। আমার হাতে কোন টাকা নেই। আমি ব্যাগ থেকে প্রিন্সিপাল স্যারের দেয়া খামটা বের করলাম।

“এটা কি আবুল হোসেন সাহেবের ডেস্ক?”

ফিসফিস করে একজনকে জিজ্ঞেস করতেই তিন চারজন একসাথে জবাব দিলেন, “জি জি, ঠিক জায়গাতেই আসছেন।“

ফেলে দেয়া আমের আঁটিকে যেভাবে মাছিরা গা ঘেঁষাঘেষি করে ঘিরে থাকে, এখানেও আবুল হোসেনের টেবিলের তিন পাশে সেরকম মাছির মতো ভীড়। অন্যপাশে দেয়াল। আবুল হোসেন সাহেবকে দেখা যাচ্ছে না। কী পদ্ধতিতে এখানে কাজ হচ্ছে বুঝতে পারছি না। কিন্তু বেশ দ্রুতই কাজ হচ্ছে মনে হচ্ছে। একজন দু’জন করে বের হচ্ছেন, আর আমি পেছন থেকে একটু একটু করে সামনে এগোচ্ছি। ঘন্টাখানেক পর পৌঁছে গেলাম আবুল হোসেন সাহেবের কাছে। ছোট্ট একটা টেবিল - ক্লাস ফাইভ-সিক্সের বাচ্চাদের পড়ার টেবিলের মতো। আন্দাজ করা যায় – আবুল হোসেন সাহেব এই দপ্তরের একজন কেরানি। কোথাও তার নাম-পরিচয় লেখা নেই। কিন্তু তাঁকে সবাই চেনে। মাথার চুল পাতলা হয়ে এসেছে। চেয়ারে বসে মাথা ঝুঁকে তিনি  টাকা গুণে নিচ্ছেন। গোণার সময় এত দ্রুত হাত চলছে যে মনে হচ্ছে তাঁর হাত এই কাজের জন্য বিশেষভাবে ট্রেনিংপ্রাপ্ত। টাকা গুণে নেয়ার পর হাতের কাগজপত্রের কোণায় সাংকেতিক চিহ্নের মতো করে কিছু চিহ্ন দিয়ে পাশে রেখে দিচ্ছেন। এরকম প্রকাশ্যে ঘুষ-কার্যক্রম আমি আগে কখনো দেখিনি। আমার আগে আরেকজন আছেন। তারপরেই আমার পালা। মনে হচ্ছে আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে টাকা আনেনি।

“ভাই গভমেন্ট কলেজ কোন্‌ রুমে?” পেছনে কেউ একজন জিজ্ঞেস করলেন। সাথে সাথে কয়েকজন একসাথে উত্তর দিলেন, “গভমেন্ট কলেজ চার তলায়।“

আমার পালা এলো।

“আমি চিটাগং শাহীন কলেজ থেকে এসেছি। প্রিন্সিপাল মোয়াজ্জেম হোসেন স্যার আমাকে পাঠিয়েছেন। এই খামটা আপনাকে দিতে বলেছেন।“

আবুল হোসেন সাহেব ভাবলেশহীন মুখে খামটা হাতে নিয়েই একটানে একপাশটা ছিঁড়ে ফেললেন। ভেতরে সাদা কাগজ মোড়ানো অনেকগুলো একশ’ টাকার নোট। আমি একবারও ভাবিনি যে খামে টাকা থাকবে। আমার ভালো লাগছে না। শিক্ষাজীবনের নানা পর্যায়ে ল্যাবের দাদু থেকে শুরু করে অনেককেই বিশ পঞ্চাশ টাকা দিতে হয়েছে চা-খাওয়ার জন্য। কলেজেও পিয়নদের মাঝেমধ্যেই টাকা-পয়সা দিই। ওগুলোকে বখশিস বা টিপ্‌স হিসেবে ধরেছি। ফলে কখনোই ঘুষ দেয়ার গ্লানিবোধ করিনি। কিন্তু আজ প্রিন্সিপাল স্যার আমাকে না জানিয়ে আমার হাত দিয়ে ঘুষের টাকা পাঠিয়েছেন। তিনি কি কোন কারণে বুঝতে পেরেছিলেন যে টাকা বললে আমি আসতে রাজি হবো না? মুখবন্ধ খামের গোপনীয়তা রক্ষা করার নীতিবোধ কীভাবে যেন ঢুকে আছে মাথার মধ্যে। নইলে খামে কী আছে তা দেখে নেয়া এমন কোন কঠিন কাজ ছিল না। নিজের কাছেই নিজে ছোট হয়ে গেলাম আজ।

“এটা বদলে দ্যান।“– একটা ছেঁড়া একশ’ টাকার নোট আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে যান্ত্রিক গলায় বললেন আবুল হোসেন।

“খামের মধ্যে কী ছিল আমি জানি না। আপনি মোয়াজ্জেম স্যারের কাছ থেকে বদলে নিয়েন এই নোট। তিনি বলেছেন আপনার ভাইকে সচিবালয়ে ভালো জায়গায় পোস্টিং পাইয়ে দেবেন।“ – আমি অনেকটা নাটকের মুখস্ত সংলাপের মতো বলে গেলাম।

আবুল হোসেন সাহেব টাকার সাথে দেয়া কাগজে লেখা চার লাইনের চিঠিটি পড়লেন। তারপর নিজের পশ্চাৎদেশ চেয়ার থেকে একটু আলগা করে এক টান দিয়ে একটা ফাইল বের করলেন। দেখলাম তিনি অনেকগুলি ফাইলের উপর বসে তা দিচ্ছেন। এই ফাইলগুলি তিনি ছাড়া আর কারো পক্ষে খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। যেগুলির উপর আজ বসেছেন – সেগুলির লোক নিশ্চয় আজ আসবে। নইলে মোয়াজ্জেম হোসেন স্যার আমাকে আজকেই আসতে বললেন কেন, আর সেই ফাইলও এই আবুল হোসেনের পশ্চাৎদেশে অবস্থিত কেন।

“আচ্ছা, এটা কার এমপিওর ফাইল?” – কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলাম।

“মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন, প্রিন্সিপাল, বি এ এফ শাহীন কলেজ, চট্টগ্রাম।“

“আর কারো ফাইল নেই?”

“না।“

তার মানে আমাকে যে বলা হয়েছে আমার এমপিও হয়নি – সেটাও মিথ্যা কথা। আমার রাগ হচ্ছে না, কিন্তু খুবই কষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয় যে প্রতিষ্ঠান থেকে – সেখানে এভাবে প্রকাশ্যে ঘুষ-বাণিজ্য চলছে। উচ্চশিক্ষিত মানুষ, প্রতিষ্ঠান-প্রধানরা কেন এভাবে একজন কেরানিকে টাকা দিচ্ছেন? সবকিছু নিয়মমোতাবেক চললে কি কারোরই কোন কাজ হবে না? আমি জানি না।

রুম থেকে বের হয়ে মনে হলো একবার সরকারি কলেজের দপ্তরে গিয়ে দেখি। সেখানে হয়তো এরকম কিছু নেই। চারতলায় উঠলাম। সেখানে ভীড় কিছুটা কম। কিন্তু লেনদেন সেখানেও হচ্ছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলাম। দেখলাম একজন ভদ্রলোক চেয়ারে বসা কেরানির সামনে দাঁড়িয়ে কাঁচুমাচু হয়ে বলছেন, “আমি রাজশাহী সরকারি কলেজের গণিতের সহযোগী অধ্যাপক। আমাকে…”

চলে এলাম। এই দৃশ্যগুলি আমার কাছে খুবই অপমানজনক; সহ্য করা কঠিন।

শিক্ষাভবন থেকে বের হয়ে আবুল হোসেন খানের ঠিকানাটা খুঁজে বের করলাম রিকশায় ঘুরতে ঘুরতে। তার দরখাস্ত জমা দিয়ে আমার কাজ শেষ।

বাতাসের বেগ ক্রমশ বাড়ছে। রাতেই ফিরে যাবো, নাকি ঢাকায় থেকে যাবো? কাকরাইলে অজিতের অফিসে যাওয়া যাক। তাকে পেলে থেকে যাবো। রিকশা নিয়ে গেলাম সেখানে। রিসিপশানিস্ট জানালেন সে চিটাগং গেছে। আর সময় পেলি না ব্যাটা। আমি ঢাকায় এলাম, আর তুই চিটাগং গেলি? ঢাকায় থেকে যাবার আর কোন যুক্তি নেই। ফিরে যাওয়াই ভালো।

এস আলমের বাস ছাড়লো সন্ধ্যা ছ’টায়। রাত বারোটার মধ্যে পৌঁছে যাবার কথা। কিন্তু কুমিল্লা পার হবার পর বাতাসের বেগ এত বেশি। যাত্রীদের কাছে জানা গেলো সাত নম্বর সিগনাল চলছে। বাতাসের বেগ এত বেশি গাড়ির গতি বাড়লেই রাস্তা থেকে ছিটকে পড়ে যাবে। কিছুদূর থেমে, কিছুদূর চলে শেষপর্যন্ত রাত তিনটায় চট্টগ্রাম এসে পৌঁছলাম।

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 2

  In our childhood and even in our adulthood, there was no tradition of celebrating birthdays. We didn't even remember when anyone's...

Popular Posts