Wednesday 2 September 2020

ম্যান্ডেলার দেশে - পর্ব ১৩

 



রুবেন আইল্যান্ড

 নেলসন ম্যান্ডেলা গেটওয়ের সামনে পৌঁছে পেছনের ক্লকটাওয়ারের দিকে তাকালাম। সাড়ে আটটা বেজে গেছে। ফেরিতে ওঠার সময় হয়ে গেছে।

          ওয়াটারফ্রন্টে এসেছি আটটার মধ্যেই। রোদ ঝলমল সকাল, কিন্তু ঠান্ডা বাতাস। কেইপ টাউনের শীতকালের সাথে মেলবোর্নের শীতকালের কিছু মিল আছে। দক্ষিণ গোলার্ধের দেশ আর সমুদ্রের কাছাকাছি হওয়াই এর কারণ।

          ভিক্টরিয়া বেসিনের আশেপাশে ঘুরে ঘুরে দেখলাম সকালের স্নিগ্ধ সাগর। ক্লকটাওয়ারের কাছে পানিতে দুটো সিল মাছ সিঁড়ির ওপর এসে বসে আছে। গায়ে বোঁটকা গন্ধ। ঘাটে ফেরি দেখা যাচ্ছে- নাম ডিয়াস। লোকজন উঠতে শুরু করেছে।

          নেলসন ম্যান্ডেলা গেটওয়ের ভেতর দিয়ে ফেরিতে ওঠার পথ। টিকেট স্ক্যান করার পর ব্যাকপ্যাক ক্যামেরা সবকিছু এক্স-রে স্ক্যানারের ভেতর দিয়ে চেক করে ফেরৎ দেয়া হলো। এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি চেকিং এর মতো।

          রেলিং ধরে উঠে এলাম ফেরিতে। ফিশিং ট্রলারের মতো অগোছালো একটা ফেরি DIAS.ডিয়াস নামটা যুৎসই পর্তুগিজ নাবিক ব্যাটোলোমেউ ডিয়াস দ্বীপটি আবিষ্কার করেছিলেন ১৪৮৮ সালে যখন তিনি টেবল বেতে তাঁর জাহাজ নোঙর করেছিলেন প্রথমবারের মতো।

          ফেরির ছাদে উঠে এলাম। নাবিকের রুমের পেছনে দুটো লম্বা বেঞ্চ। আসলে ঠিক বেঞ্চ নয়, লঞ্চের জিনিসপত্র রাখার বাক্সের মতো। তার উপর বসার ব্যবস্থা। নিচের তলায় অবশ্য চেয়ারের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু সেখান থেকে সমুদ্র ভালো দেখা যাবে না। আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। বাতাস ঠান্ডা হয়ে আসছে। এই লক্ষণ ভালো নয়। মাঝখানে বৃষ্টি এলে ভিজতে হবে।

 

 


 

         ওয়াটারফ্রন্ট থেকে রুবেন আইল্যান্ডের দূরত্ব সাড়ে এগারো কিলোমিটার। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগে ফেরিতে যেতে।

          ডাচ শব্দ রুবেন এর অর্থ হলো সিল মাছ। রুবেন আইল্যান্ডে হয়তো অনেক সিল মাছ পাওয়া যায়।

          পাশে এসে বসলেন এক চায়নিজ ভদ্রমহিলা। বসার পর একটা বড় ব্যাগ রেখে দিলেন পাশে।

     আর কেউ আসবে?

     আই হ্যাভ আ ফ্রেন্ড।

          ভদ্রমহিলা নিজে বসে বন্ধুর জন্য জায়গা রেখেছেন। এদিকে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন বয়স্ক ভদ্রলোক।

          নটার একটু পরে লঞ্চ আস্তে আস্তে নড়তে শুরু করলো। চায়নিজ ভদ্রমহিলা একটা ফোন পেয়ে ব্যাগ নিয়ে চলে গেলেন নিচে। বয়স্ক ভদ্রলোক বসলেন আমার পাশে। নিচের তলার রেলিং থেকে উচ্চস্বরে কথাবার্তা ভেসে আসছে। ঠিক হিন্দি নয়- তবে অনেক শব্দ হিন্দির মতো শোনাচ্ছে। সম্ভবত উর্দু। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম। বোরকা পরা দুজন মহিলা আর লম্বা জোব্বা দাড়িটুপির এক মোটাসোটা মানুষ - বাজখাই গলায় টেলিফোনে কথা বলছেন কারো সাথে। টেলিফোনে এত জোরে কথা বলতে কেন হবে বুঝতে পারছি না। হয়তো নেটওয়ার্ক দুর্বল।

          ওয়াটারফ্রন্ট দূরে সরে যাচ্ছে ক্রমশ। সাগরের পানি কেমন যেন ঘন সবুজ। আকাশ গোমড়া। কয়েকটা ফিশিং ট্রলার ছাড়া আর কোন জলযান চোখে পড়লো না।

          রুবেন আইল্যান্ড পুরোটাই এখন একটা মিউজিয়াম। রুবেন আইল্যান্ড মিউজিয়ামের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে চালিত ফেরি ছাড়া আর কোন প্রাইভেট কোম্পানির জলযানের সেখানে যাবার অনুমতি নেই। সেহিসেবে এই রুবেন দ্বীপে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ।

          রুবেন আইল্যান্ডের নাম পৃথিবীর অনেক মানুষই এখন জানেন নেলসন ম্যান্ডেলার কারণে। নেলসন ম্যান্ডেলার ২৭ বছরের জেল-জীবনের ১৮ বছর কেটেছে এই রুবেন আইল্যান্ডের জেলখানায়। রুবেন আইল্যান্ড সেই সময় ছিল একটি জেলখানা। সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধী রাখা হতো এখানে।

          রুবেন আইল্যান্ডের ঘাটে ভিড়লো ডায়াস হারবারের নাম মারি'স হারবার উনিশ শতকের তিমি শিকারী ছিলেন জন মারি

 



         হারবারের বাইরের দেয়ালে দক্ষিণ আফ্রিকার গণতন্ত্রে উত্তরণের ইতিহাসের সচিত্র বিবরণ ফেরি থেকেই দেখা যায় নেলসন ম্যান্ডেলার হাস্যোজ্জ্বল ছবির সাথে বড় বড় অক্ষরে লেখা FREEDOM CANNOT BE MANACLED”- স্বাধীনতা বেঁধে রাখা যায় না

          কাছেই কয়েকটি বড় বড় বাস মাইক্রোফোনে ঘোষণা করা হলো এই বাসগুলো আমাদের পুরো দ্বীপ ঘুরিয়ে দেখাবে। পায়ে হেঁটে নিজের ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ানোর কোন সুযোগ নেই কারো।

          ট্যুর-গাইডের নির্দেশনা মেনে নির্দিষ্ট বাসে উঠে বসলাম। এই বাসগুলো এই দ্বীপে আনা হয়েছে অনেক বছর আগে। বাসের মডেল দেখলেই বোঝা যায়।

        ট্যুর-গাইড মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে মিনিট দশেক রুবেন আইল্যান্ডের ইতিহাস বললেন। অনেক অজানা তথ্য জানা গেলো।

          ১৪৮৮ সালে রুবেন আইল্যান্ড আবিষ্কারের পর থেকে অনেক জাহাজ এখানে আসতে শুরু করে। বিশেষ করে খাবার পানি, সিল মাছের মাংস ও পেঙ্গুইনের মাংস সংগ্রহের জন্য। প্রচুর সিল ও পেঙ্গুইনের কলোনি ছিল এই দ্বীপ।

          উত্তর-দক্ষিণ বরাবর সোয়া তিন কিলোমিটার দৈর্ঘ্য আর প্রস্থে মাত্র দুই কিলোমিটার মিলিয়ে এই দ্বীপের ক্ষেত্রফল মাত্র পাঁচ বর্গকিলোমিটারের চেয়ে সামান্য একটু বেশি।

          পুরো দ্বীপটি সমতল, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র কয়েক মিটার উঁচু। ১৬৫২ সাল পর্যন্ত যেসব জাহাজ দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে ইস্ট ইন্ডিজের দিকে যেতো তাদের অনেকগুলোই এসে ভিড়তো এই দ্বীপে। জাহাজ থেকে জাহাজে চিঠিপত্র আদান প্রদানের কেন্দ্রও হয়ে উঠলো এই দ্বীপ।

          ১৬৫২ সালে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে একটা স্টেশন তৈরি করে। জাহাজে মাংস সরবরাহের জন্য পশুপালন শুরু হয় এখানে।

          মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদীদের দ্বীপান্তরে পাঠানোর কথা মাথায় ঢুকলো ডাচদের।

          ১৬৭১ সাল থেকে শুরু হলো যাবজ্জীবন জেলপ্রাপ্ত কয়েদীদের এখানে নিয়ে আসা। পরে আস্তে আস্তে রাজনৈতিক বন্দীদেরও এখানে পাঠানো শুরু হলো। ডাচদের সবচেয়ে কঠিন জেলখানায় পরিণত হলো রুবেন আইল্যান্ড।

          ১৭৯৫ সালে ব্রিটিশরা ডাচদের কাছ থেকে দখল করে নেয় কেইপ টাউন ও রুবেন আইল্যান্ড। তখন তারাও এই দ্বীপকে জেলখানা হিসেবে ব্যবহার করে। ডাচরা ১৮০২ সালে কেইপ পুনরুদ্ধার করে নেয়। কিন্তু ১৮০৬ সালে ব্রিটিশরা আবার দখল করে নেয় কেইপ। সেই থেকে ব্রিটিশদের দখলেই থাকে এই দ্বীপ ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত।

          ১৮০৬ সাল থেকে টেবল বে বা টেবিল উপসাগরের তিমি শিকার শুরু হয়। রুবেন আইল্যান্ড একটা তিমি শিকারকেন্দ্র স্থাপিত হয়। কিন্তু তিমি শিকারের নৌকায় করে গোপনে কয়েদীদের কেউ কেউ পালিয়ে যেতে শুরু করে। ফলে ১৮২০ সালে তিমি শিকারকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হয়।

          ১৮১২ সালে কয়েদীদের পাশাপাশি মানসিক রোগীদেরও এখানে এনে রাখা শুরু হয়। নামমাত্র চিকিৎসার আড়ালে এসব রোগীদের পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হতো এখানে। তারা ধুঁকে ধুঁকে মরতো এই নির্জন দ্বীপের তথাকথিত হাসপাতাল নামক জেলখানায়।

          ১৮৪৩ সালে এর মাত্রা বাড়তে থাকে। মানসিক রোগীর পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকার মূল ভূখন্ড থেকে এখানে এনে রাখা শুরু হয় কুষ্ঠ রোগীদের। যৌনরোগী, মুমূর্ষু রোগীদেরও এখানে এনে জড়ো করা হয়। তাদের জন্য জায়গা বাড়ানোর লক্ষ্যে কয়েদীদের আবার মূল ভূখন্ডে সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সুস্থ কয়েদীদের দিয়ে কেইপ টাউনের রাস্তা নির্মাণ ছাড়াও আরো অনেক কাজে লাগানো হয়। ১৮৬৫ সালে এখানে একটা বাতিঘর তৈরি করা হয় জাহাজ চলাচলের সুবিধার জন্য।

          ১৮৭৫ সালে রুবেন আইল্যান্ডের লোকসংখ্যা ছিল ৫৫২ জন। ১৮৯১ সালে ৭০২ জন এবং ১৯০৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৪৬০। ডাক্তার নার্স আর কিছু সরকারি কর্মচারী ছাড়া এদের বেশিরভাগই ছিল দুরারোগ্য রোগী।

          ১৯৩১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে ব্রিটিশরা এই দ্বীপে মিলিটারি-ক্যাম্প স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেয়। সব রোগীকে সরিয়ে নেয়া হয় মূল ভূ-খন্ডে। মিলিটারি-ক্যাম্প স্থাপিত হয়। রাস্তা তৈরি হয়, কামান স্থাপন করা হয় দ্বীপের বিভিন্ন জায়গায়। বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি সরবরাহ এবং অফিসার ও জওয়ানদের থাকার জন্য কিছু ঘরবাড়িও তৈরি হয়। সেই বাড়িগুলোর কিছু এখনো আছে।

          ১৯৬১ সাল থেকে রাজনৈতিক বন্দীদের দ্বীপান্তরে পাঠানো শুরু হয় এই দ্বীপে। ১৯৬৪ সালের ১২জুন শ্বেতাঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন নেলসন ম্যান্ডেলা, ওয়াল্টার সিসুলু, ডেনিস গোল্ডবার্গ, গোভান আমবেকি, আহমেদ ক্যাথরাডা, র‍্যামল্ড মাহলাপ, ইলিয়াস মটসালেদি এবং অ্যান্ড্রু ম্ল্যানগেনি। তাঁদের সবাইকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়। পরের দিনই সবাইকে রুবেন আইল্যান্ডের ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়।

          ১৯৬১ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত পুরো ত্রিশ বছর রাজবন্দীদের জেলখানা ছিল এখানে। ১৯৯৫ পর্যন্ত ছিল সাধারণ কয়েদীদের জেলখানা। নেলসন ম্যান্ডেলা প্রেসিডেন্ট হবার পর রুবেন আইল্যান্ডকে একটি জাদুঘরে পরিণত করা হয়। জাতিসংঘ এই দ্বীপকে ন্যাশনাল হ্যারিটেজ ঘোষণা করে।

          বাস চলতে শুরু করেছে প্রথমে পুরো দ্বীপটি ঘুরিয়ে দেখাবে তারপর নিয়ে আসবে জেলখানার সামনে - যেখানে নেলসন ম্যান্ডেলাসহ আরো রাজবন্দীদের রাখা হয়েছিল

          ১৪১৮ একর ক্ষেত্রফল এই দ্বীপের এখন এখানকার সামুদ্রিক উদ্ভিদ ও বিভিন্ন পাখীর প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তাই বাইরের কোন মাটি, মাছ বা পশুপাখি এখানে আনতে দেয়া হয় না আবার এখানকার কোন গাছ, মাটি, পাখি সাথে করে নিয়ে যাবার উপায়ও নেই পর্যটকদের হেঁটে বেড়ানোর অনুমতি নেই বাসে করে সব দেখানো হবে। তারপর শুধু একটা নির্দিষ্ট এলাকায় নিজের মতো করে হেঁটে দেখার সুযোগ আছে।

 

 

রুবেন আইল্যান্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি প্রিজন


এখানে সৈকত বলতে যেন কিছু নেই। পাথর আর সামুদ্রিক শেওলায় ভর্তি সৈকতের পুরোটা। এখানকার চারপাশ এতটা পাথুরে যে অনেক মাছধরার নৌকা ধ্বংস হয়ে গেছে এই দ্বীপের পাড়ের পাথরে আছড়ে পড়ে। একটা নৌকার ধ্বংসাবশেষ দেখা গেলো। গাইড বললেন ওটা ধ্বংস হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। তাইওয়ানের মাছধরা নৌকা ছিল ওটা।

          সেই ১৬১১ সাল থেকে শুরু করে ১৯৭৭ পর্যন্ত প্রায় শখানেক নৌকা বিধ্বস্ত হয়েছে এই দ্বীপের উপকূলের পাথরে। বন্দীদের অনেকেই সাঁতরে পালাতে গিয়ে ডুবে মরেছে পানিতে।

          অফিসার্স ক্লাবের পরিত্যক্ত বাড়ি দেখা গেলো। একসময় এটা ছিল কসাইখানা। মাংস তৈরি হতো এখানে। এই জায়াগাটার নাম লেডিজ রক। সিস্টার মে হার্ডির স্মরণে এই নামকরণ। লেডি হার্ডি ছিলেন কুষ্ঠরোগীদের নার্স। পানিতে ডুবে মরেছিলেন তিনি এই জায়গায়।

          ১৮৫০-এর দিকে এই অফিসার্স ক্লাব ছিল মূলত এখানকার হাসপাতালের সুপারের বাসভবন। কাছেই গেস্ট হাউজ১৮৯৫ সালে এই ভবন তৈরি হয়েছিল দ্বীপের গভর্নরের থাকার জন্য। ভবনটি এখনো মাঝে মাঝে ব্যবহৃত হয় উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কনফারেন্সের জন্য।

          দ্বীপের এক পাশে কোন গাছপালা নেই। অনেকদূর পর্যন্ত সামুদ্রিক পাথর আর পেঙ্গুইন। ১৬৫২ সালে ডাচরা যখন প্রথম আসে এখানে দ্বীপভর্তি সিল, পাখি, কচ্ছপ আর পেঙ্গুইন ছিল। ১৬৫৪ সালে তারা এখানে খরগোশ নিয়ে এসে ছেড়ে দেয়। কী এক অজানা কারণে ১৮০০ সালের মধ্যে আফ্রিকান পেঙ্গুইন নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এই দ্বীপ থেকে।

          ১৯৮৩ সাল থেকে আবার পেঙ্গুইনের দেখা মেলে। এখন এটা তাদের জন্য নিরাপদ প্রজননক্ষেত্র। ২০০৪ সালে প্রায় ষোল হাজার পেঙ্গুইন ছিল এখানে। কিন্তু সেই সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে আবার। এখন মাত্র তিন হাজারের মতো পেঙ্গুইন আছে এই দ্বীপে। এর সঠিক কারণ এখনো অজানা। তবে ধারণা করা হচ্ছে যে সমুদ্রে ছোট মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে পেঙ্গুইনরা যথেষ্ট খাবার পাচ্ছে না। খাদ্যাভাবে তাদের বংশবৃদ্ধি হচ্ছে না। কিন্তু দিন দিন বেড়ে চলেছে খরগোশের সংখ্যা। এই দ্বীপে এখন প্রায় ত্রিশ হাজার খরগোশ আছে।

          দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্থাপিত কামান আর মিলিটারি ক্যাম্পের পরিত্যক্ত কিছু অংশ দেখা গেলো। পাখিদের অভায়রণ্য এখন সেখানে।

          কিছু মানুষকে দেখলাম চাষের কাজ করছে। কতজন মানুষ থাকে এই দ্বীপে এখন? এখন নাকি প্রায় দুশর মত মানুষ বাস করে এই দ্বীপে। তারা সবাই দ্বীপের কর্মচারি-কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের লোকজন। দ্বীপে কোন স্কুল নেই। খাবারদাবার নিয়ে আসার জন্য প্রতিদিন সকালে সাড়ে ছটায় একটা ফেরি যায় কেইপ টাউনে। স্কুলশিক্ষার্থীরা সেই ফেরিতে চলে যায়। স্কুল শেষে আবার বিকেলের ফেরিতে ফিরে আসে।

          দ্বীপের চারপাশ ঘুরে বাস এসে দাঁড়ালো রুবেন আইল্যান্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি প্রিজনের সামনে। আমাদের আগের বাস এখনো সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সেই গ্রুপটা চলে যাবার পর আমরা যাবো। গাইড জানালেন বাস থেকে নামার পর জেলগেটে আমাদের গাইড করবেন যিনি তিনি একসময় জেল খেটেছেন এখানে। তিনিই সব ঘুরিয়ে দেখাবেন জেলের ভেতরে বাইরে।

          দ্বীপের ভেতর এত বড় বড় বাস কীভাবে আনা হয়েছে? একজন পর্যটকের এই প্রশ্নের উত্তরে জানা গেলো ১৯৯৬ সালের দিকে বড় বড় ফেরিতে করে নিয়ে আসা হয়েছে এই বাস। জেলখানা বন্ধ করে দিয়ে পুরো দ্বীপটাকে জাদুঘরে পরিণত করার সময়।

          ১৯৯৭ সালে তখনকার আমেরিকান ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটন এই দ্বীপ সফরে আসেন। হিলারির জন্য একটা আলাদা নতুন বাস আনার ব্যবস্থা করা হয়। একটি হেলিকপ্টারের সাথে বেঁধে বাস নিয়ে আসার ব্যবস্থা হয় কেইপ টাউন থেকে। কিন্তু মাঝপথে আসার পর বাসটি দড়ি ছিঁড়ে সাগরে পড়ে যায়। তাই হিলারি ক্লিনটনকেও এই বাসগুলোর একটিতে চড়ে এই দ্বীপ দেখতে হয়েছে

          জেলখানার গেটে আমাদের নামিয়ে দিয়ে বাস চলে গেলো। স্টিলের তারের বেড়াঘেরা বিশাল এলাকা। পাথরের দেয়াল আর টিনের ছাউনির একতলা বাড়ি অনেকগুলো। সবগুলোই দেখতে প্রায় একই রকম। সামনের চত্বরে দুটো কামান বসানো। ফ্লাগস্ট্যান্ডে উড়ছে দক্ষিণ আফ্রিকান পতাকা।

          আমাদের অভ্যর্থনা করলেন লাল টুপি আর নীল জ্যাকেট পরা ষাটোর্ধ এক আফ্রিকান। তাঁর প্রথম বাক্যটি হলো, তোমরা সবাই আমার বন্দী। এই জেলখানায় ঢোকার সময় থেকে বের হবার সময় পর্যন্ত আমার নির্দেশ তোমাদের মানতে হবে। আমি চলতে বললে চলবে, থামতে বললে থামবে।

          আমরা সবাই সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছি দেখে হেসে বললেন, নইলে অন্য গ্রুপের সাথে মিশে গিয়ে হারিয়ে যাবে।

          বিশাল বিশাল আকৃতির বিলবোর্ডে মুক্তির দিনের ছবি। একটা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, "এইদিনে আমিও এখান থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম।"

          ছবিতে দেখলাম পঁচিশ বছর আগে এই মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন আরো সব সহযোদ্ধাদের সাথে মুক্তির আনন্দে।

 

আমাদের গাইড: প্রাক্তন রাজবন্দী


রাজবন্দীদের অনেকেই এখন এখানে থাকেন। গাইডের কাজ করেন। তাঁদের নিজেদের অভিজ্ঞতা বলেন। প্রাণের তাগিদে বলেন, জীবিকার তাগিদেও।

          যে জেলখানা-চত্বরে আমরা ঢুকলাম সেটা ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি জেলখানা। রাজবন্দীদের রাখার জন্য এটা। সাধারণ কয়েদীদের পুরনো জেলখানা আমরা বাসে করে দেখে এসেছি।

          একটা ব্রিফিংহলে ঢুকানো হলো আমাদের। ঠান্ডা পাকা মেঝে। টিনের ছাউনি। গরমে আগুন হয়ে উঠবে এই ঘর, আর শীতে ডিপফ্রিজ।

          লোহার তৈরি ছোট ছোট খাট। তোষক বলতে কিছুই নেই। এক টুকরো ছোট পাপোষের মতো চটের উপর শোয়া।

          সারি সারি কারাকক্ষ। আলো ঢোকার জন্য অনেক উঁচুতে এক চিলতে জানালা। আর শক্ত শিকের লোহার দরজা ঘেরা পাঁচ ফুট বাই আট ফুটের কুঠুরি। তাতেই যাবজ্জীবন জেল বাস।

          একেকটা বিল্ডিং থেকে অন্য বিল্ডিং এর মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় বেশ কিছু ক্যাকটাস, এবং আরো কিছু নান্দনিক বাগান। রাজবন্দীরা তৈরি করেছেন বাগান, ফুটিয়েছেন ফুল। কাঠ কেটে বানিয়েছেন বাগানে বসার টুল-টেবিল।

           লন পেরিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা যেখানে বন্দী ছিলেন সেখানে এলাম। সব বন্দীদের মতোই ছোট্ট কুঠুরি। ৫ নং সেল। এখানেই কেটেছে তাঁর ২৭ বছর জেলজীবনের প্রথম আঠারো বছর। তারপর তাঁকে টোকাই-এর পোল্‌সমুর জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ভিক্টর ভারস্টার জেলখানায় - যেখান থেকে মুক্তি পান ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি।

          ১৯৬০ এর দশকের সেই দিনগুলোতে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের নেতাদের সবাইকে নাশকতার ষড়যন্ত্রের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। কিন্তু নেতারা জানেন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। চালিয়ে যাবার জন্য রাজনৈতিক নেতা তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পেয়ে যারাই এই জেলখানায় এসেছিলেন, তাঁরা সবাই আরো শিক্ষিত হয়ে রাজনৈতিক আদর্শে আরো দীক্ষিত হয়ে বেরিয়ে যেতেন। এইভাবে তখনকার নেতারা এই জেলখানাকে রাজনৈতিক শিক্ষার অলিখিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করে ফেলেছিলেন। “Each one teach one” এই ছিলো তাঁদের নীতি প্রত্যেক প্রবীণ রাজনৈতিক বন্দী এক একজন নবীন রাজবন্দীকে রাজনীতি শিখিয়েছেন, দর্শন শিখিয়েছেন, আদর্শের বীজ বুনে দিয়েছেন মনের ভেতর; বাগানে ফুলের বীজ রোপন করার জন্য মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে

          নেলসন ম্যান্ডেলা তাঁর লং ওয়াক টু ফ্রিডম বইটার অনেকটুকু লিখেছেন এই জেলে বসে কয়েক পৃষ্ঠা লেখা হবার পর তা লুকিয়ে রাখা হতো বাগানের মাটির নিচে সেইসব কষ্ট, ত্যাগ ও সংগ্রামের কথা বলতে পারার মধ্যেও এক ধরনের গৌরবদীপ্ত আনন্দ থাকে সেই আনন্দ দেখছিলাম আমাদের গাইডের চোখে মুখে গণতান্ত্রিক আফ্রিকার এপর্যন্ত যে তিন জন প্রেসিডেন্ট হয়েছেন - নেলসন ম্যান্ডেলা, কিগালেমা মটলান্‌থে, জ্যাকব জুমা প্রত্যেকেই এই জেলখানায় বন্দী ছিলেন।

 

রুবেন আইল্যান্ড জেলের অভ্যন্তর। এখানেই কেটেছে নেলসন ম্যান্ডেলার ১৮ বছর         


হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে এলাম হারবারে। ফেরার সময় হয়ে এলো। ডিয়াসের সিঁড়ি লাগানো হয়েছে। উঠে বসলাম ছাদের ওপর ক্যাপ্টেনের ঘরের বাইরের বেঞ্চিতে। আরেকটি ফেরি ভিড়ছে পাড়ে। আমাদের ফেরির লোকজনকে ফেরিতে উঠতে অনুরোধ করা হচ্ছে লাউড স্পিকারে। সবাই এখনো আসেননি। আরো মিনিট দশেক লাগবে ফেরি ছাড়তে।

          রুবেন আইল্যান্ডের প্রবেশপথে এখন লেখা আছে “We Serve With Pride”. গৌরব করার মতো কাজই তো করেছেন এ দেশের নেতৃবৃন্দ, গণতন্ত্রকে শৃঙ্খলমুক্ত করেছিলেন

          ভেবে দেখার চেষ্টা করলাম - ঠিক কোত্থেকে শুরু হয়েছিল এই সংগ্রাম? মানবসভ্যতার শুরু থেকেই আফ্রিকার অংশগ্রহণ আদি মানবসম্প্রদায় তো সুখেই ছিল এদেশে সমস্যার সূত্রপাত হয় দখলদারদের কারণে

          ডাচরা দক্ষিণ আফ্রিকায় উড়ে এসে জুড়ে বসেছে, স্থানীয় লোকজন তাতে অসুখি হননি তেমন তারপর ব্রিটিশরা এলো এদেশকে তাদের কলোনিতে পরিণত করলো। অন্যান্য দেশ থেকে লোকজন নিয়ে আসা হলো তাদের সুবিধার্থে।

তাও মেনে নিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষ। কিন্তু মূল সমস্যা শুরু হলো দক্ষিণ আফ্রিকায় হীরার খনি, সোনার খনি পাওয়া যাবার পর থেকে।

 

রুবেন আইল্যান্ডের প্রবেশপথ


নিউজিল্যান্ডের মাওরি উপজাতিদের একটা প্রবচন আছে: মানুষ মানুষকে খুন করে মূলত দুইটি কারণে; সম্পদের লোভে অথবা নারীর লোভে। দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশরা যা করেছে সবই করেছে সম্পদের লোভে।

          আফ্রিকার মানুষ বিশ্বাস করতো জমি হলো সৃষ্টিকর্তার দান। বাতাস ও পানি যেমন সৃষ্টিকর্তার দান - কিনে খেতে হয় না, তেমনি জমিও সৃষ্টিকর্তার। একে চাষ করে খাও, কিন্তু ভাগ করো না। কেনাবেচার তো প্রশ্নই ওঠে না।

          আফ্রিকার মানুষ থাকতো গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে। মূলত শিকারী বা কৃষিজীবী। একেকটা গোষ্ঠীর একজন সর্দার থাকতো। সর্দার ঠিক করে দিতেন কে কোন জমির কতটুকু চাষ করবে। প্রয়োজনের ভিত্তিতে জমির পরিমাণ বাড়তো বা কমতো। প্রথম দিকে শ্বেতাঙ্গরাও যখন চাষবাদ শুরু করলো গোষ্ঠীনেতা তাদেরকেও জমি দিলেন চাষ করার জন্য। কিন্তু শ্বেতাঙ্গরা বুঝতে পারতো না বা বুঝতে চাইতো না যে এগুলো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। তারা জমির মালিকানা দাবি করতে শুরু করলো। অসন্তোষের সূত্রপাত হলো।

          শিক্ষাদীক্ষা প্রযুক্তি ও চাতুরিতে শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের চেয়ে এগিয়ে। তারা চাইলো কালোদের সব জমি দখল করে নিতে।

          ১৮৬৭ সালে হীরা পাওয়া গেলো দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে। ১৮৮৬ সালে পাওয়া গেলো সোনার খনি। শ্বেতাঙ্গরা দেখলো শুধুমাত্র চাষী হয়ে থাকার দিন শেষ। শুরু হলো ব্যবসা-বাণিজ্যের হীরকযুগ, স্বর্ণযুগ।

          কৃষ্ণাঙ্গরা যেন আর কোনদিন কোন জমির মালিকানা দাবি করতে না পারে সেজন্য আইন পাশ করা হলো। ১৯১৩ সালের ল্যান্ড অ্যাক্ট বা ভূমি আইনে বলা হলো - আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গরা কোন শ্বেতাঙ্গের কাছ থেকে জমি কিনতে পারবে না বা লিজ নিতেও পারবে না। কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য কিছু জমি আলাদা করে দেয়া হলো। তারা শুধু সেখানেই থাকতে পারবে বা চাষাবাদ করতে পারবে।

          এ সংক্রান্ত ৮৬টি ভূমি-আইন পাস হলো যাতে অশ্বেতাঙ্গরা কোনদিনই ভূমির মালিক হয়ে মাথা তুলতে না পারে।

          অশ্বেতাঙ্গদের মধ্যে ভারতীয় হিন্দু এবং আরো কিছু উপজাতিও ছিল। তারাও যেন সবাই একজোট হতে না পারে সেজন্য তাদেরকেও বিচ্ছিন্ন করে ফেলার আইন হলো। অ্যাপার্টেড (APARTHEID)-এর আওতায় ন্যাশনালিস্ট সরকার ৩৫ লক্ষ অশ্বেতাঙ্গকে তাদের এতদিনের বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ করে বিচ্ছিন্ন করে ফেললো। ডিস্ট্রিক্ট সিক্স ছিলো তারই একটা ক্ষুদ্র অংশ।

          ১৯৫০ সালে সরকার সাউথ ওয়েস্টার্ন টাউনশিপ বা সোয়েটা নামক কিছু শহুরে বস্তি তৈরি করে জোহানেসবার্গের সব কৃষ্ণাঙ্গকে সেখানে থাকতে বাধ্য করে। এ সমস্ত কাজে তখনকার সরকারের প্রায় চারশ কোটি র‍্যান্ড খরচ হয়। অথচ ওগুলো উন্নয়নকাজে খরচ করলে দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থাই বদলে যেতো। কিন্তু সরকারের উদ্দেশ্য তো দক্ষিণ আফ্রিকার উন্নয়ন নয় - শ্বেতাঙ্গদের উন্নয়ন।

          দক্ষিণ আফ্রিকার মোট জনসংখ্যার ৭৪ ভাগ ছিল অশ্বেতাঙ্গ। তাদের জন্য মোট জমির মাত্র ১৩ ভাগ রাখা হলো। এই ১৩ ভাগেরও বেশির ভাগ ছিল অনাবাদী জমি।

          ১৯৪৮ সালে নির্বাচন হয়। নির্বাচনে শ্বেতাঙ্গ আফ্রিকানার পার্টি জেতে। শ্বেতাঙ্গ বলার দরকার নেই আসলে। কারণ অশ্বেতাঙ্গদের ভোটে দাঁড়ানোর বা ভোট দেয়ার কোন অধিকার ছিল না সেই সময়। তারা অনেকগুলো আইন পাশ করে যেগুলো আজকালকার বিচারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চূড়ান্ত। যেমন: শ্বেতাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গের মধ্যে বিয়ে হতে পারবে না, অন্য কোন সম্পর্কও থাকতে পারবে না। একত্রে বাস করতে পারবে না, ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্ত্বা অভিন্ন এলাকায় থাকতে পারবে না।

          ১৯১৩ সালে ভূমি আইন পাস হবার পরপরই অশ্বেতাঙ্গদের অধিকার রক্ষায় গঠিত হয়েছিল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস। শুরু হয় ধারাবাহিক সংগ্রাম।

          ১৯৬১ সালে সংগঠনের সামরিক শাখা গঠিত হয় সরকারের বিরুদ্ধে। কিন্তু দুবছরের মধ্যেই ন্যাশনাল কংগ্রেসের শীর্ষনেতা নেলসন ম্যান্ডেলাসহ অনেককে গ্রেফতার করে বিচারে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়। ন্যাশনাল কংগ্রেস আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়।

          কত দীর্ঘ এই সংগ্রামের পথ। এত মানুষ মেরে এত অত্যাচার করেও কি শেষরক্ষা হলো? দক্ষিণ আফ্রিকা এখন অশ্বেতাঙ্গদের সরকার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তৈরি হয় এরকম সব আইন বিলুপ্ত করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার জাতির পিতা নেলসন ম্যান্ডেলা।

          ১৯৯৪ সালের ১০মে গণতান্ত্রিক দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার পর প্রথম ভাষণেই নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, "Never, never and never again shall it be that this beautiful land will again experience the oppression of one by another and suffer the indignity of being the shunk of the world."

          ডিয়াস চলতে শুরু করেছে। যাবার সময়ে যে উর্দুভাষী গ্রুপটি নিচে ছিলো - তারা এখন আমার আশেপাশে। এত জোরে জোরে কথা বলছে যে মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এরা পাকিস্তানি। এদের হাত থেকে মুক্তির জন্যও আমাদের বলি দিতে হয়েছে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ।

     ব্রাদার, ফটো ফটো -

          দাড়িওয়ালা খোঁচা দিলেন আমার কাঁধে। পাথরের আংটিযুক্ত মোটা লোমশ হাতে সোনালি স্যামসং। বোরকানপরা দুই মহিলাকে দুপাশে নিয়ে ছবি তোলার জন্য পোজ দিলেন। লাল পান খাওয়া দাঁতে হাসি লিকলিক করছে।

          আকাশ মেঘে ঢেকে গেছে। বৃষ্টি হলে পুরোটাই ভিজে যাবো। সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা বাড়তে শুরু করেছে। বাতাসের বেগও বাড়ছে সময়ের সাথে। ঝড় উঠবে কি?

          এমন সময় একটু দূরে দেখা গেলো তিমি। একটার পেছনে আরেকটা। ফেরির কাছাকাছি কয়েকটা ডলফিনও সাঁতার কাটলো কিছুক্ষণ। বড় বিচিত্র এই সামুদ্রিক জীবন।

          ফেরি যখন ঘাটে ফিরলো দেখলাম পরের ট্রিপের যাত্রীরা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। ক্লক টাওয়ারের ঘড়িতে পৌনে একটা। তার গোড়ায় যেতে না যেতেই বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। শুরুতে টিপ টিপ। দৌড়ে গিয়ে শপিং মলে আশ্রয় নিতে না নিতেই চরাচর অন্ধকার। এমন ঝুমবৃষ্টি অনেক দিন দেখিনি।

পর্ব ১৪

No comments:

Post a Comment

Latest Post

ডাইনোসরের কাহিনি

  বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণি কী? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলবো নীল তিমি – যারা দৈর্ঘ্যে প্রায় তিরিশ মিটার, আর ওজনে প্রায় ১৯০ টন পর্যন্ত...

Popular Posts