Tuesday 6 November 2018

মেরি কুরির কাহিনি - ১ম পর্ব


পিয়ের ও মেরি কুরি

১৯০২ সালের এক গভীর রাত। প্রচন্ড শীত পড়েছে প্যারিস শহরে। সারা শহরের মানুষ বিছানার ওমে সঁপে দিয়েছে শরীর। কিন্তু একটা স্যাঁতস্যাঁতে ভেঙেপড়া শেডের নিচে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন দুটো মানুষ। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। অথচ এ দু’জনকে ঘিরে রয়েছে একটা বিস্ময়কর নীলাভ উজ্জ্বল আভা। দুষ্প্রাপ্য তৃপ্তি এবং প্রশান্তি জ্বলজ্বল করছে তাঁদের চোখেমুখে। দীর্ঘ ৪৫ মাসের অক্লান্ত পরিশ্রম সার্থক হয়েছে তাঁদের। পাওয়া গেছে বিশুদ্ধ রেডিয়াম - যার আবিষ্কারক এই দু’জন মানুষ মেরি কুরি ও তাঁর স্বামী পিয়ের কুরি। পরের বছরই তাঁরা পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। বিজ্ঞান জগতে তাঁদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লেও তখনো তাঁদের ছিল না ভালো কোন চাকরি, গবেষণাগার বা সম্মানজনক সামাজিক স্বীকৃতি। 

বিয়ের এগারো বছরের মাথায় দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারিয়ে ছোট ছোট দুটো মেয়েকে নিয়ে নিজের যোগ্য সম্মান ও অধিকার অর্জনের জন্য ধরতে গেলে সারাজীবনই সংগ্রাম করতে হয়েছে মেরি কুরিকে। ফ্রান্সের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মেরির নামে কলংক রটিয়েছে - আর মেরি তখন তাঁর একক গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ অর্জন করেছেন দ্বিতীয় নোবেল পুরষ্কার। গবেষণা আর দুটো মেয়েকে বুকে ধরে এগিয়ে গেছেন নীরবে। গড়ে তুলেছেন বিশ্ববিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান - রেডিয়াম ইনস্টিটিউট। মৌলিক বিজ্ঞানের গবেষণায় মেয়েদের অংশগ্রহণের অগ্রদূত মেরি কুরি। তিনি ছিলেন বিশ্বের সর্বপ্রথম মহিলা যিনি বিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তিনিই প্রথম মহিলা যিনি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন এবং একমাত্র মহিলা বিজ্ঞানী যিনি দু’বার নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। শুধু তাই নয় - নিজের মেয়ে আইরিনকে গড়ে তুলেছেন বিজ্ঞানী হিসেবে। আইরিন কুরি ও তাঁর স্বামী ফ্রেদেরিক জুলিও রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন নিউক্লিয়ার কেমিস্ট্রিতে তাঁদের মৌলিক অবদানের জন্য। 

কুরি পরিবারের প্রতি বিজ্ঞানজগৎ বিশেষভাবে ঋণী। এই পরিবার ছয়টি নোবেল পুরষ্কার পাবার পাশাপাশি মানবকল্যাণে যে অবদান রেখে গেছেন তা অতুলনীয়। ক্যান্সার চিকিৎসায় তেজষ্ক্রিয়তার ব্যবহারের পথিকৃৎ মেরি কুরি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কিশোরী মেয়েকে সাথে নিয়ে মেরি ছুটে গিয়েছিলেন যুদ্ধাহত সৈনিকদের চিকিৎসায়। এক্স-রে ও রেডিয়াম ব্যবহার করে তাঁরা প্রাণ বাঁচিয়েছেন শত শত মানুষের। মানুষের প্রতি কুরিদের ভালোবাসা তেজষ্ক্রিয় শক্তির মতোই - যা সাধারণ চোখে দেখা যায় না কিন্তু অনুভব করা যায় তার ফলের মাধ্যমে। পিয়ের ও মেরি কুরির তেজষ্ক্রিয় ভালোবাসার পরিচয় পেতে হলে আমাদের জানতে হবে তাঁদের নিরন্তর সংগ্রামের কাহিনি, ব্যক্তিগত জীবন ও ভালোবাসার কাহিনি। 

পিয়ের কুরি

ডাক্তার ইউজিন কুরি ও মিসেস সোফিয়েক্লেরা দেপাউলি’র দ্বিতীয় সন্তান পিয়ের কুরির জন্ম প্যারিসে ১৮৫৯ সালের ১৫ই মে। পিয়েরের বড় ভাই জাকো পিয়েরের চেয়ে তিন বছরের বড়। ছোটবেলা থেকেই ভীষণ হাসিখুশি আনন্দ আর স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন পিয়ের। বাবা-মা ভীষণ উদার মুক্তমনা। ধর্মীয় বিধিনিষেধের কোন বালাই নেই কুরি পরিবারে। অথচ মানবিক গুণাবলীতে অতুলনীয় এ পরিবারের প্রত্যেকটি মানুষ। 

বাবা ইউজিন ডাক্তারি পাস করে প্যারিসের মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে কাজ শুরু করেন। ডাক্তারি প্র্যাকটিসের বদলে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষক হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেরকম কোন সুযোগ না পেয়ে জীবিকার তাগিদে রোগী দেখার কাজ শুরু করতে হলো। কিন্তু ডাক্তারিকে কাজে লাগিয়ে ধনসম্পদ বাড়ানোর প্রতি কোন ইচ্ছে কোনদিনই হয়নি ডাক্তার ইউজিনের। সমাজবদলের সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন সবসময়। ১৮৪৮ সালের ফ্রান্সের ‘ফেব্রুয়ারি বিপ্লব’-এ সরাসরি অংশগ্রহণ করে সরকারি সেনাবাহিনীর হাতে লাঞ্চিত হয়েছেন। সেনাবাহিনীরা তাঁর মুখে গুলি করেছিল। কোনরকমে বেঁচে উঠেছিলেন সেবার। তারপর প্যারিস শহরে যখন কলেরা মহামারীর রূপ নেয় - সারা শহরের সব ডাক্তার নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু ইউজিন নিজের কথা না ভেবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সাধারণ মানুষের প্রাণ বাঁচাতে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে চিকিৎসা শিবির খুলে শত শত মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। 

নিজের ব্যক্তিগত সুখের কথা কখনোই ভাবতেন না ডাক্তার ইউজিন। খুবই সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত ইউজিন নিজের ছেলেদের ভেতরও সেই পরার্থপরতার উন্মেষ ঘটাতে পেরেছিলেন। তখনকার ফ্রান্সের প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলের শিক্ষা-ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ছিল না ইউজিনের। তিনি তাঁর ছেলেদের স্কুলে পাঠাননি একদিনের জন্যও। বাড়িতেই তাদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন উন্মুক্ত পরিবেশে। ধরতে গেলে তাদের যা ভালো লাগে তাই পড়েছে তারা ছোটবেলায় এবং সেভাবে লেখাপড়ার প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়েছে। একই সাথে ভালোবাসা তৈরি হয়েছে প্রকৃতির প্রতিও। 

১৮৭১ সালে পিয়েরের বয়স যখন মাত্র বারো বছর - ফ্রান্সে কমিউন বিল্পব শুরু হলো। সাধারণ মানুষের বিপ্লবে সরকারি বাহিনী নির্বিচারে গুলি করছে। ডাক্তার ইউজিন সাধারণ মানুষের পক্ষ নিয়ে তাঁদের চিকিৎসার জন্য বাড়িতে সেবাকেন্দ্র গড়ে তোলেন। পিয়ের ও জাকো বিপদের ঝুঁকি নিয়ে আহতদের রাস্তা থেকে বয়ে নিয়ে আসতেন সেবাকেন্দ্রে। সামাজিক রাজনৈতিক বিপ্লবের সাথে এভাবেই হাতেখড়ি হয়েছে তাঁদের। 

চৌদ্দ বছর বয়সে পিয়ের বাড়িতে গণিতের শিক্ষক হিসেবে পেলেন ফ্রান্সের বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ আলবার্ট ব্যাজিলকে। প্রফেসর ব্যাজিল পিয়েরের মধ্যে গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তির প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলেন। পিয়েরের লেখাপড়া দ্রুতগতিতে চলতে শুরু করলো। ষোল বছর বয়সে এইচ-এস-সির সমতুল্য পরীক্ষায় পাস করে সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন পিয়ের। আঠারো বছরের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স ডিগ্রির সমতুল্য ডিগ্রি পেয়ে গেলেন। গবেষণা করার জন্য পিএইচডি কোর্সে ভর্তি হতে ইচ্ছে আছে, কিন্তু বাড়িতে টাকা-পয়সার অভাব খুব। বড়ভাই জাকো সরবোনের খনিজবিদ্যার ল্যাবোরেটরিতে টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করছেন। পিয়েরও পদার্থবিদ্যার ল্যাবোরেট অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে যোগ দিলেন। 


মা-বাবা ও ভাইয়ের সাথে পিয়ের কুরি

 বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজের শেষে নিজেদের গবেষণা শুরু করলেন পিয়ের ও জাকো। তিন বছরের মধ্যেই তাঁরা দু’ভাই মিলে পদার্থবিজ্ঞানের একটি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার ‘পাইজোইলেকট্রিক ইফেক্ট’ আবিষ্কার করে ফেললেন। গ্রিক শব্দ পাইজো - মানে চাপ দেয়া। কুরি ভাইয়েরা দেখলেন কিছু কিছু ক্রিস্টালে চাপ প্রয়োগ করলে বৈদ্যুতিক বিভব তৈরি হয়। আবার বিপরীতক্রমে যখন একই ক্রিস্টালকে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের মধ্যে রাখা হয় ক্রিস্টালের ওপর চাপ তৈরি হয়ে তা সংকুচিত হয়ে যায়। পদার্থবিজ্ঞানের

সাম্যতার তত্ত্বে এটা নতুন সংযোজন। পাইজোইলেকট্রিক থিওরি কাজে লাগিয়ে পিয়ের ও জাকো তৈরি করলেন কোয়ার্টজ ইলেকট্রোমিটার - যা অতি ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ-প্রবাহও মাপতে পারে। বর্তমানে কোয়ার্টজ ঘড়ি, মাইক্রোফোন, ট্রান্সডিউসার সহ অসংখ্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিতে পাইজোইলেকট্রিসিটি ব্যবহার করা হয়। 

সরবোন ইউনিভার্সিটির ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান হিসেবে পিয়ের কুরির বেতন যাচ্ছেতাই রকমের কম। তাছাড়া তাঁর কাজেরও কোন একাডেমিক স্বীকৃতি নেই। তিনি ভালো কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ খুঁজছিলেন যেখানে কমপক্ষে স্বাধীনভাবে গবেষণা করার সুযোগ থাকবে, থাকবে গবেষণাগারের সুবিধা। 

১৮৮৩ সালে ইকোল মিউনিসিপেল দ্য ফিজিক অ্যাট কিমিয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়েল্‌স (ইপিসিআই)-এ যোগ দেন পিয়ের। সরবোনের মত বড় প্রতিষ্ঠান এটা নয়। তবে কাজের স্বাধীনতা আছে। পরীক্ষামূলক কাজ করার সুযোগ বেশি না থাকাতে পিয়ের তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের কাজে হাত দিলেন। চৌম্বকত্ব নিয়ে কাজ শুরু করলেন তিনি। পদার্থের চৌম্বক ধর্ম ও তাপমাত্রার মধ্যে একটা সম্পর্ক আবিষ্কার করলেন তিনি। একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রার উপরে গেলে চৌম্বক পদার্থের ধর্মের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যায়। পদার্থবিজ্ঞানে এই তাপমাত্রাকে ‘কুরি তাপমাত্রা’ বলা হয়। এই ‘কুরি’ হলেন পিয়ের কুরি। 

পিয়ের কুরি ইপিসিআই-এ কাজ করেছেন বাইশ বছর - ১৮৮৩ থেকে ১৯০৪ পর্যন্ত। শুরুতে স্কুল অব ফিজিক্সের ল্যাবোরেটরি ডিরেক্টর হিসেবে, শেষের দু’বছর প্রফেসর হিসেবে। ধরতে গেলে তাঁর বৈজ্ঞানিক জীবনের পুরোটাই কেটেছে এই প্রতিষ্ঠানে। তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান থেকে তিনি আবার পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানের কাজ শুরু করেন ১৮৮৯ সালে। 

১৮৮৯ থেকে ১৮৯১ সালের মধ্যে তিনি তৈরি করেন পিরিয়ডিক প্রিসিশান ব্যালেন্স - যা দিয়ে অতিসূক্ষ্ম ভরের তারতম্য মাপা সম্ভব। মাইক্রোমিটারের কাঁটার সামান্য বিচ্যুতি -  যা খালি চোখে দেখা যায় না - তা মাপার জন্য মাইক্রোমিটারের সাথে মাইক্রোস্কোপের সংযোগ ঘটান তিনি। [পরবর্তীতে মেরি কুরির সাথে রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম আবিষ্কারের সময় বিশেষ কাজে লেগেছিলো এই ‘কুরি ব্যালেন্স’।] 

নিজের দেশ ফ্রান্সে তেমন কোন পরিচিতি না পেলেও উদীয়মান পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে পিয়ের কুরি আন্তর্জাতিক মহলে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করেছে। লর্ড কেলভিন পিয়ের কুরির কাজকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। 

১৮৯৪ সালে পিয়ের যখন চৌম্বক পদার্থের ধর্মের সাথে তাপমাত্রার সম্পর্ক নিয়ে কাজ করছিলেন, একদিন সরবোনের প্রফেসর জোসেফ কাওয়ালস্কি তাঁকে নিমন্ত্রণ করলেন তাঁর বাসায়। বললেন এক উদীয়মান পদার্থবিজ্ঞানীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেবেন। নির্দিষ্ট সময়ে পিয়ের গেলেন কাওয়ালস্কির বাসায়। সেখানে পরিচয় হলো সরবোনের কৃতী ছাত্রী মারিয়া স্ক্লোদভস্কা’র সাথে। 

এ কাহিনি আমার "রেডিয়াম ভালোবাসা" বইতে প্রকাশিত হয়েছে।



No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 6

  The habit of reading books was instilled in us from a young age, almost unknowingly. There was no specific encouragement or pressure for t...

Popular Posts