Thursday 15 November 2018

মেরি কুরির কাহিনি - ১০ম পর্ব



এদিকে সেন্ট্রাল প্যারিসে গুস্তাভ টেরির প্রতিবেদনটি চোখে পড়েছে জাঁ পেরির। তিনি দ্রুত ছুটে গেলেন এমিল ও মার্গারিট বোরেলের কাছে। তারপর সবাই মিলে ছুটলেন মেরির বাড়ির উদ্দেশ্যে। তাঁরা যখন স্‌সোতে গিয়ে পৌঁছালেন - দেখলেন শত শত ‘প্যারিস-বীর’ ‘প্যারিসের সম্মান রক্ষার্থে’ মেরি কুরিকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে ঢিল ছুঁড়তে ছুঁড়তে মেরির বাড়ির জানালার কাচ ভাঙছে। 

মার্গারিট দ্রুত বাড়ির ভেতরে গিয়ে ভয়ার্ত অপমানিত মেরি, ইভ ও গৃহকর্মীকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন। গাড়িতে চেপে ছুটলেন আইরিনের স্কুলের দিকে। স্কুলে আইরিনের এক বান্ধবী সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় মেরি ও লাঁজেভির ছবি দেখে তাঁরা আবার নতুন কিছু আবিষ্কার করেছেন ভেবে আইরিনকে দিয়েছে পেপারটি। চতুর্দশী আইরিন প্রতিবেদনের কিছুটা অংশ পড়েই অপমানে জ্ঞান হারিয়ে ফেললো। মার্গারিটরা যখন আইরিনের স্কুলে পৌঁছালেন আইরিন কিছুটা সুস্থ হয়ে চুপচাপ বসে ছিল ক্লাসে। গাড়িতে উঠে আইরিন মা ও বোনকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এমিল ও মার্গারিট বোরেলের ইকোল নরমালে সুপেরিয়রের সরকারি কোয়ার্টারে সন্তানদের নিয়ে আশ্রয় নিলেন মেরি। প্রফেসর এমিল বোরেল তাঁর সরকারি বাসায় ‘বিদেশিনী’ মেরিকে আশ্রয় দিয়েছেন বলে শোরগোল তুললো ডানপন্থী সরকারের আমলারা। শিক্ষামন্ত্রী থিওডর স্টিগ তাঁর অফিসে ডেকে পাঠালেন বোরেলকে।

“প্রফেসর বোরেল, আপনি ইকোল নরমাল সুপেরিয়রের ভাইস প্রেসিডেন্ট। আপনার এমন কিছু করা উচিত নয় যা সরকারি সিদ্ধান্তের বাইরে যায়। সরকারি বাসায় আপনি মাদাম কুরিকে এসময় আশ্রয় দিতে পারেন না যেখানে তাঁর নামে এরকম অভিযোগ উঠেছে।”

“মাদাম কুরি আমাদের পারিবারিক বন্ধু। তাঁর বিপদে আমরা তাঁর পাশে দাঁড়াবোই।”

“তাহলে কিন্তু রাষ্ট্রবিরোধী কাজের অপরাধে আপনার চাকরি চলে যাবে। চাকরি চলে গেলে বাসাও আপনার থাকবে না। ঠান্ডা মাথায় আপনার স্ত্রীর সাথে আলোচনা করে তারপর সিদ্ধান্ত নেন কী করবেন। আপনাকে একদিন সময় দেয়া হলো।”

“আচ্ছা তাই হবে।”

এদিকে মার্গারিটকে ডেকে পাঠিয়েছেন তাঁর বাবা সরবোন ইউনিভার্সিটির সায়েন্স ফ্যাকাল্টির ডিন প্রফেসর পল আপ্পেল। মার্গারিট ভাবলেন তাঁর বাবা মেরিকে কীভাবে সাহায্য করতে পারেন তা আলোচনা করার জন্যই ডেকেছেন। দ্রুত গেলেন বাবার বাসায়। কিন্তু বাবার গম্ভীর থমথমে মুখ দেখে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন মার্গারিট। 

“মার্গারিট, তুই মেরিকে নিজের বাসায় নিয়ে এলি কোন আক্কেলে?”
“এসব তুমি কী বলছো বাবা? সবাই মিলে মেরিকে মেরে ফেলতে বলছো? এত বড় বিজ্ঞানী, দু দুটো নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন মেরি।”
“থাম্‌ মেরির জন্য যা করা উচিত তার চেয়ে অনেক বেশি করেছি আমরা। এখন তার জন্য সরবোনের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। মেরিকে আমরা আর সরবোনে রাখতে পারবো না। তুই তাকে বল রিজাইন করতে। নয়তো বরখাস্ত করতে হবে তাকে।”
“মেরির প্রতি এমন অবিচার তুমি করতে পারবে না বাবা।”
“আমি কোন অবিচার করছি না। ফ্রান্সে থেকে মেরি আর কিছুই করতে পারবে না। তাকে পোল্যান্ডে ফিরে যেতে বল। আমি সেখানে তার জন্য চাকরি আর ল্যাবের ব্যবস্থা করে দেবো।”
“মেরির সম্পর্কে এরকম মিথ্যা বানোয়াট কথাগুলো তুমি বিশ্বাস করছো বাবা? এগুলো যে সব ধর্মান্ধদের অপপ্রচার তা কি তুমি বুঝতে পারছো না?”
“বুঝতে পারলেও আমার করার কিছু নেই। আমাকেও তো আমার চাকরি বাঁচাতে হবে।”
“তাহলে আমার কথাও তুমি শুনে রাখো বাবা। মেরির বিরুদ্ধে তুমি যদি কোন ব্যবস্থা নাও - মনে করবে তোমার সাথে আমার সম্পর্ক শেষ। তুমি জীবনে আর আমার মুখ দেখতে পাবে না।”
“এমন কথা বলিস না মা। আমার ক্ষমতা খুব সীমাবদ্ধ। আমার ওপর চাপ আছে।”
“চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে বাবা? তুমি আমাকে যে আদর্শের শিক্ষা দিয়েছো তা তুমি নিজেই ভাঙবে? আমি যে তা সহ্য করতে পারবো না বাবা। প্লিজ বাবা, দরকার হলে তুমি চাকরি ছেড়ে দাও। বাবা প্লিজ।”

মেয়ের কান্না কোন বাবাই সহ্য করতে পারেন না। প্রফেসর আপ্পেলও পারলেন না। তিনি মার্গারিটকে আশ্বস্ত করলেন, “ঠিক আছে। দেখি কী করতে পারি। আর যাই হোক - আমার হাত দিয়ে মেরির কোন ক্ষতি হবে না। তুই বাড়ি যা।”

প্যারিসের প্রগতিশীল সাংবাদিকেরা গুস্তাভ টেরির বিষাক্ত প্রতিবেদনের প্রতিবাদ করতে শুরু করলেন সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় কলামে। প্রগতিশীল ও প্রতিক্রিয়াশীলদের মধ্যে কলমযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। কিন্তু যুদ্ধ শুধু কলমে সীমাবদ্ধ থাকলো না। ব্রিটিশ কায়দায় তলোয়ার-যুদ্ধও হলো কারো কারো মধ্যে। 

গুস্তাভ টেরি তাঁর লেখার সমালোচনা করার কারণে ‘গিল ব্লাস’ পত্রিকার চিফ এডিটর পিয়ের মর্টিয়েরকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে আহ্বান করলেন। স্থানীয় স্টেডিয়ামে তাঁদের তলোয়ার যুদ্ধ হলো। গুস্তাভ টেরি কয়েকবার আহত করলেন পিয়ের মর্টিয়েরকে। 

এদিকে টেরির ওপর ভীষণ রেগে আছেন পল লাঁজেভি। তিনি দ্বন্দ্ব যুদ্ধে আহ্বান করলেন টেরিকে। নির্দিষ্ট দিনে স্টেডিয়ামে হাজির হলেন টেরি ও লাঁজেভি। তলোয়ারের বদলে পিস্তল নিয়ে যুদ্ধ করবেন বললেন লাঁজেভি। পিস্তল হাতে টেরি ও লাঁজেভি মুখোমুখি দাঁড়ালেন পরস্পর থেকে পঁচিশ ফুট দূরত্বে। লাঁজেভি পিস্তল তাঁক করলেন টেরির দিকে - কিন্তু টেরি পিস্তল উঠালেন না। টেরির সেকেন্ড ম্যান হয়ে গিয়েছিলেন লাঁজেভির শ্যালিকার স্বামী হেনরি বোর্গেস, আর লাঁজেভির সেকেন্ড ম্যান হয়ে গিয়েছিলেন গণিতবিদ পল পয়েনলেভি। [পল পয়েনলেভি কয়েক বছর পরে ফ্রান্সের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন]। টেরি বা লাঁজেভির কেউই যখন গুলি ছুঁড়লেন না, তাঁদের সেকেন্ডম্যান বোর্গেস ও পয়েনলেভি পিস্তল হাতে নিয়ে শূন্যে গুলি ছুঁড়ে দ্বন্দ্বযুদ্ধ শেষ করলেন। 

পরের দিন গুস্তাভ টেরি তাঁর পেপারে লিখলেন যে তিনি চাইলেই লাঁজেভিকে পিস্তলের গুলিতে শেষ করে দিতে পারতেন। কিন্তু তা করেননি - কারণ তাতে ফ্রান্স লাঁজেভির মত একজন মেধাবী বিজ্ঞানীকে হারাতো। টেরি এটাও বললেন যে ফ্রান্সের সোনার ছেলেদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই তাঁর, তিনি কেবল মাদাম কুরির মত ‘স্বামী ছিনতাইকারি’র হাত থেকে প্যারিসের মেয়েদের ঘর বাঁচাতে চান। 

পল লাঁজেভি আর পারছেন না। তিনি তাঁর স্ত্রীর কাছ থেকে আইনগতভাবে আলাদা হবার জন্য আদালতে মামলা করলেন। প্রতিদিন নানারকম গুজব কুৎসা প্রকাশিত হতে থাকলো বিভিন্ন সংবাদপত্রে। বেশিরভাগই বিষাক্ত তীর ছুঁড়ছে মেরির দিকে। 

প্যারিসে মেরি কুরিকে জড়িয়ে এতকিছু ঘটনার খবর সুইডেনের নোবেল একাডেমির কাছে পৌঁছাচ্ছে। কমিটির সদস্যরা বুঝতে পারছেন না এ অবস্থায় মাদাম কুরির নোবেল পুরষ্কার নিতে স্টকহোমে যাওয়াটা ঠিক হবে কিনা। নোবেল কমিটি চিঠি লিখে পরামর্শ দিলো মেরি যেন প্যারিসের ‘ঘটনা-প্রবাহ’ থামার আগে নোবেল পুরষ্কার নিতে স্টকহোমে না যান। 

চিঠি পেয়ে কিছুক্ষণ ভাবলেন মেরি। প্রথমবার নোবেল পাওয়ার পর অসুস্থতার জন্য যেতে পারেন নি পিয়ের বা মেরি কেউই। যদিও ১৯০৫ সালে তাঁরা স্টকহোমে গিয়ে নোবেল কমিটির সংবর্ধনা নিয়ে এসেছিলেন, নোবেল-বক্তৃতাও দিয়েছিলেন পিয়ের। কিন্তু এবার কেন যাবেন না মেরি? তিনি তো কোন অন্যায় করেননি। প্রেসের ভয়ে ঘরে বসে থাকবেন? মেরি নোবেল কমিটিকে জানিয়ে দিলেন - তিনি ডিসেম্বরে স্টকহোমে যাচ্ছেন নোবেল পুরষ্কার নিতে। 

ডিসেম্বরের আট তারিখ বড় মেয়ে আইরিন ও বড় বোন ব্রোনিয়াকে সাথে নিয়ে স্টকহোমে পৌঁছালেন মেরি। দশ তারিখ নোবেল পুরষ্কার গ্রহণ করলেন সুইডেনের রাজা গুস্তাভের হাত থেকে। এগারো তারিখ স্টকহোম কনসার্ট হলে নোবেল বক্তৃতা দিলেন মেরি কুরি। পোলোনিয়াম ও রেডিয়াম আবিষ্কারে তাঁর পাশাপাশি যে পিয়েরও সারাক্ষণ ছিলেন তা বলতে ভুললেন না তিনি। 

সাফল্যের মুকুটে নতুন পালক গুঁজে প্যারিসে ফিরলেন মেরি। আদালতের রায়ে পল লাঁজেভি ও তাঁর স্ত্রী জেনির মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে গেছে। উনিশ বছর বয়স পর্যন্ত ছেলে-মেয়েরা জেনির দায়িত্বে থাকবে। তার জন্য খোরপোশ দিতে হলো লাঁজেভিকে। মেরির সাথে আমৃত্যু বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল লাঁজেভির। লাঁজেভি আর বিয়ে করেননি - তবে ইলি মন্টেল নামে তাঁর একজন প্রাক্তন ছাত্রীর সাথে তাঁর বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক তৈরি হয় এবং ইলির গর্ভে লাঁজেভির একটা সন্তানও জন্মেছিল। সেই সন্তানের নামও রাখা হল পল। [প্যারিসের রক্ষণশীল সমাজ এব্যাপারে কিন্তু কোন হৈ চৈ করেনি।] বড় হলে লাঁজেভির অনুরোধে মেরি তাঁর রেডিয়াম ইনস্টিটিউটে পল লাঁজেভি-মন্টেলকে একটা চাকরিও দিয়েছিলেন। সে অনেক পরের ঘটনা। 

১৯১১ সালের ডিসেম্বরে স্টকহোম থেকে ফিরে মেরি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়লেন যে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো। দিনরাত তেজষ্ক্রিয় পদার্থের সংস্পর্শে থাকতে থাকতে মেরির শরীরের অনেকগুলো কোষ মারা গেছে। তাঁর লিভার মারাত্মক রকমের ক্ষতিগ্রস্ত।

১৯১২ সালে তাঁর অপারেশান করাতে হলো। প্রেস মিডিয়া এড়ানোর জন্য হাসপাতালে নিজের নাম ব্যবহার না করে স্ক্লোদভস্কা নামে কেবিন বুক করেছেন। সুস্থ হয়ে না ওঠা পর্যন্ত গোপন রাখা হলো মেরির অবস্থান। কিন্তু সাংবাদিকরা দিনকে রাত করতে পারেন। মেরি সিক-লিভ নিয়েছেন শুনে এবং প্যারিসের কোন হাসপাতালে মেরির হদিস না পেয়ে ডানপন্থি সাংবাদিকরা লিখলেন - মেরি লাঁজেভি’র অবৈধ সন্তানের মা হতে যাচ্ছিলেন - তাই গোপনে গর্ভপাত করাতে গেছেন। 

এত ঝড়ঝঞ্ঝার পরেও মাথা উঁচু করেই কাজে ফিরলেন মেরি। রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের ভবন তৈরি হতে শুরু করলো। ১৯১৩ সালে দ্বিতীয় সল্‌ভে কনফারেন্সে যোগ দিতে গেলেন ব্রাসেল্‌সে। ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের নির্মাণ কাজ শেষ হলো। মাদাম কুরি রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর নিযুক্ত হলেন। 

১৯১৪ সালে জার্মানি ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। দেশের প্রতি ভালোবাসার কর্তব্য করতে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন মেরি। তাঁর অস্ত্র এক্স-রে মেশিন ও রেডিয়াম। তাঁর লক্ষ্য অগণিত যুদ্ধাহতদের চিকিৎসাসেবা দেয়া। সতেরো বছরের মেয়ে আইরিনকে সাথে নিয়ে ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ পর্যন্ত যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রায় দশ-লক্ষাধিক যুদ্ধাহত মানুষের চিকিৎসায় সহায়তা করেছেন মেরি। নিজের চেষ্টায় প্রাথমিক পর্যায়ের এক্স-রে মেশিন তৈরি করান মেরি। যুদ্ধাহতদের সহায়তার জন্য তহবিল সংগ্রহে পিয়ের ও তাঁর পাওয়া তিনটি নোবেল স্বর্ণপদকই তিনি দান করে দেন। 

যুদ্ধশেষে আবার ইনস্টিটিউটের গবেষণাকাজে ফিরে এলেন মেরি। কিন্তু শরীর ভেঙে পড়ছে তেজষ্ক্রিয়তার প্রভাবে। বড়মেয়ে আইরিন মায়ের ইনস্টিটিউটেই গবেষণা করতে শুরু করেছে। রেডিয়াম ইনস্টিটিউটে গবেষণা করার মত যথেষ্ট রেডিয়াম নেই। রেডিয়াম ইনস্টিটিউটে মোট রেডিয়াম আছে মাত্র এক গ্রাম। রেডিয়াম আবিষ্কারের স্বত্ব সংরক্ষণ করেননি পিয়ের ও মেরি। পিয়ের নিজেই রেডিয়াম সংগ্রহের পদ্ধতি জানিয়ে দিয়েছিলেন আমেরিকান ইঞ্জিনিয়ারদের। এখন সেই আমেরিকা বাণিজ্যিক পদ্ধতিতে রেডিয়াম সংগ্রহ করে ফেলেছে প্রায় পঞ্চাশ গ্রামেরও বেশি। ১৯২১ সালে প্রতি গ্রাম রেডিয়ামের বাজার দর ছিল এক লক্ষ ডলার। 

১৯১৯ সালে আমেরিকার বিখ্যাত সাংবাদিক ও নারী আন্দোলনের নেত্রী মেসি মেলোনি ফ্রান্সে আসেন ইউরোপের প্রগতিশীল নারীর রোল-মডেল মেরি কুরির সাথে দেখা করার জন্য। রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের প্রধান মাদাম কুরির অসাধারণ সাধারণত্বে মুগ্ধ হয়ে যান মেলোনি। তিনি মেরিকে আমেরিকা নিয়ে গিয়ে সংবর্ধনা দেয়ার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিলেন। 




যে কুরিদের কল্যাণে আজ সারাবিশ্ব রেডিয়াম সংগ্রহ করে ব্যবহার করছে, উপার্জন করছে প্রচুর ডলার - সেখানে মেরির ইনস্টিটিউটে মাত্র এক গ্রাম রেডিয়াম থাকবে! মাদাম কুরিকে এক গ্রাম রেডিয়াম আমেরিকান জনগণের পক্ষ থেকে উপহার দেয়ার উদ্দেশ্যে ফান্ড সংগ্রহ করতে শুরু করলেন মেলোনি। ১৯২০ সালে মেলোনির ফান্ড রাইজিং কমিটি প্রয়োজনীয় এক লক্ষ ডলার সংগ্রহ করে ফেললো। 




১৯২১ সালের মে মাসে আইরিন ও ইভকে সাথে নিয়ে আমেরিকা গেলেন মাদাম কুরি। বিপুল সংবর্ধনা দেয়া হলো মেরিকে। হোয়াইট হাউজের সংবর্ধনায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওয়ারেন হার্ডিং আমেরিকান জনগণের পক্ষ থেকে উপহার স্বরূপ এক গ্রাম রেডিয়াম তুলে দেন মাদাম কুরির হাতে।


আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হার্ডিং ও মেরি কুরি

আমেরিকান সংবর্ধনা নিয়ে দেশে ফেরার পর মেরি কুরিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করার সাহস হয়নি আর কারো। নিরুপদ্রবে কাজ করেছেন পরবর্তী তেরো বছর। তাঁর গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে তৈরি হয়েছে শত শত গবেষক। তাঁর গবেষণাগারেই সৃষ্টি হয়েছে কৃত্রিম তেজষ্ক্রিয়তা, তাঁর মেয়ে আইরিন ও জামাতা ফ্রেডেরিক জুলিও-কুরির হাতে। 




শরীরে অতিরিক্ত তেজষ্ক্রিয়তার প্রতিক্রিয়ায় শেষজীবনে ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হন মেরি। রেডিয়াম জননী মেরি রেডিয়ামের কারণেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেন। ১৯৩৪ সালের ৪ঠা জুলাই ছেষট্টি বছর বয়সে মৃত্যু হয় মেরি কুরির। 

তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাঁর মৃতদেহ কফিনে ভরে কবর দেয়া হয় পিয়েরে কবরের ওপর। পোল্যান্ড থেকে কিছু মাটি নিয়ে এসেছিলেন ব্রোনিয়া। বোনের কবরের ওপর তিনি পরম মমতায় ছড়িয়ে দিলেন পোল্যান্ডের মাটি - যে মাটির টানে ফিরতে চেয়েছিলেন মেরি কিন্তু পিয়েরের ভালোবাসার টানে ফিরতে পারেননি। মৃত্যুর পর এভাবেই মেরি পোল্যান্ডের মাটি মেখে বিলীন হয়ে গেলেন পিয়েরের বুকের ওপর। 
______________
এ কাহিনি আমার "রেডিয়াম ভালোবাসা" বইতে প্রকাশিত হয়েছে।



No comments:

Post a Comment

Latest Post

ডাইনোসরের কাহিনি

  বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণি কী? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলবো নীল তিমি – যারা দৈর্ঘ্যে প্রায় তিরিশ মিটার, আর ওজনে প্রায় ১৯০ টন পর্যন্ত...

Popular Posts