Tuesday 8 May 2018

ডেভেনপোর্টের অলিভিয়া



জানালার দিকে একটা আঙুল তুলে প্রফেসর স্ট্যাম্প বললেন, ওই যে সামনে দ্বীপের মত দেখা যাচ্ছে অথচ সত্যিকারের দ্বীপ নয় ওটাই ডেভেনপোর্ট। এই সামারটা আমরা ওখানে কাটাচ্ছি। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে বেরিয়ে পড়বো। সাড়ে পাঁচটার পর আর কোন কাজ রেখো না হাতে। আমি ডেকে নেবো তোমাকে তোমার অফিস থেকে

ইংরেজি ভাষায় আমাদের মত তুমি আপনির সমস্যা নেই। তবে প্রফেসর স্ট্যাম্প বাংলা জানলে আমাকে তুমি করেই বলতেন বলে আমার ধারণা। অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটির ফিজিক্সের বুড়ো প্রফেসর অ্যালেন স্ট্যাম্প আমার হোস্ট। তাঁর আমন্ত্রণে ভিজিটিং সায়েন্টিস্ট হিসেবে এখানে যোগ দিয়েছি গতকাল। ঠিকমত একটা রিসার্চ ডিগ্রি হয়নি এখনো অথচ ‘সায়েন্টিস্ট’! কিছুটা লজ্জা তো লাগছেই। ফিজিক্যাল সায়েন্স বিল্ডিংয়ের চার তলায় একটা রুম দেয়া হয়েছে আমাকে। এত বড় রুম আমার কী কাজে লাগবে জানি না। দেড় মাসের জন্য এসেছি - নিউজিল্যান্ডে ঘুরে বেড়াতেই তো সময় চলে যাবে। মেলবোর্ন থেকে আসার সময় সেরকমই কথা হয়েছে কেনের সাথে। কেন্‌  - মানে প্রফেসর কেনেথ অ্যামোস আমার সুপারভাইজার। গতবছর প্রফেসর স্ট্যাম্প মেলবোর্নে গিয়েছিলেন কেনের আমন্ত্রণে। তখন নিউট্রন-নিউক্লিয়াস স্ক্যাটারিং এর একটা সিম্পল ফাংশনাল ফর্ম নিয়ে কাজ করছিলাম আমরা। প্রফেসর স্ট্যাম্প খুব আগ্রহ দেখিয়েছিলেন কাজটার প্রতি। ফলে তাঁর ডিপার্টমেন্টে আমার আমন্ত্রণ। মেলবোর্নে থিসিস জমা দিয়েই চলে এসেছি এখানে। এসেই কাজে মন দেয়ার মত পাগল নিশ্চয়ই আমি এখনো হইনি। কিন্তু প্রফেসর স্ট্যাম্প কাজ-পাগল মানুষ। সুতরাং কাজ না করলেও কাজের ভান করতে এসেছি সকালে তাঁর অফিসে।

আমাকে যে রুমটা দেয়া হয়েছে তার চেয়ে আয়তনে অনেক ছোট প্রফেসর স্ট্যাম্পের অফিস। কাগজপত্র বই খাতা কম্পিউটার প্রিন্টার সব মিলিয়ে গুদামের মত ঠাসা। দুটো টেবিলের ভেতরের দিকে মোট তিনটে চেয়ার। একটা চেয়ারে তিনি বসে আছেন, আর অন্য দুটো চেয়ারে এলোমেলো বইখাতার স্তূপ। বোঝাই যাচ্ছে তিনি তাঁর অফিসে কাউকে বসতে বলেন না। বসে গল্প করার সময় বা ইচ্ছে যে তাঁর নেই তা যে কেউ বুঝবে। অফিসের পশ্চিম দিকের দেয়ালের অর্ধেক জুড়ে কাচের জানালা। জানালার পর্দা এখন সরানো। মনে হচ্ছে অক্টোবরের ঝকঝকে নীল আকাশ আর সাগর এসে মিশে গেছে সেখানে।

প্রফেসরের তর্জনি অনুসরণ করে জানালার দিকে চোখ তুলে তাকাতেই চোখে পড়লো সাগরের বুকে জেগে ওঠা এক চিলতে রেখার মত ডেভেনপোর্ট। নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট ভিক্টোরিয়ার বুকে সকালের মসৃণ রোদ লেগে অপরূপ হয়ে উঠেছে। আমার অফিস থেকেও সাগর দেখা যায় তবে এতটা কাছে বলে মনে হয় না। প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম তিনি পড়াশোনায় ডুবে গেছেন। আস্তে করে দরজাটা টেনে দিয়ে চলে এলাম।

নিউজিল্যান্ডের সামাজিক নিয়ম কানুন কিছুই জানি না এখনো। ডিনারে যাবার সময় সঙ্গে কিছু নিয়ে যাওয়ার রেওয়াজ কি এখানেও আছে? থাকলে কী নিয়ে যাওয়া যায়? নিউজিল্যান্ডে এই প্রফেসর ছাড়া আর কাউকে চিনি না এখনো। স্বয়ং হোস্টকেই তো আর জিজ্ঞেস করা যায় না - আপনার বাসায় যাবার সময় কী নিয়ে যাবো? অফিসে বসে ভেবে ভেবে কোন কূল কিনারা পেলাম না। এখানেও অস্ট্রেলিয়ার মত সবাই সবাইকে নাম ধরে ডাকে। মনে হচ্ছে অন্যান্য ব্যাপারেও মিল থাকবে। কলোনিয়াল ব্রিটিশ ভদ্রতায় যা হয় আর কি। হঠাৎ মনে হলো কেন্‌কে ফোন করে জেনে নিলেই হয়। অফিসের টেলিফোন থেকে চেষ্টা করলাম। কিন্তু ওভারসিজ লাইন ব্লকড। ডিপার্টমেন্টের অফিসে এসে মিগ্যানের সাথে কথা বলতেই আমার সমস্যার সমাধান হয়ে গেলো।

মিগ্যান প্রফেসর স্ট্যাম্পের সেক্রেটারি। কাল বিকেলে মিগ্যানই আমাকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করে নিয়ে এসেছে ইউনিভার্সিটির অ্যাপার্টমেন্ট হাউজে যেখানে আমার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। চটপটে প্রাণবন্ত তরুণী মিগ্যান জানেন প্রফেসর স্ট্যাম্প কী পছন্দ করেন। কিন্তু মিগ্যানের মতে প্রফেসর কী পছন্দ করেন তার চেয়েও জরুরি হলো তাঁর স্ত্রী সিনথিয়া কী পছন্দ করেন। কারণ যেহেতু ডিনার করার জন্য বাড়িতেই যাচ্ছি সেহেতু আসল হোস্ট হলেন সিনথিয়া। ডিনারে সিনথিয়ার একটা বিশেষ ব্রান্ডের অস্ট্রেলিয়ান মদ পছন্দ। কিন্তু আমি তো জানি না এখানে কোথায় পাওয়া যায় সেই মদ। মিগ্যান বললো – “ডোন্ট ইউ ওয়ারি, আই উইল ম্যানেজ ইট ফর ইউ”।

আড়াইটার দিকে রঙিন কাগজে মোড়া একটা বোতল হাতে মিগ্যান এলো অফিসে।
- থ্যাংক ইউ মিগ্যান। ইউ সেভ মাই লাইফ। হাউ মাচ আই অউ ইউ?
- ইউর লাইফ - অ্যাজ ইউ জাস্ট সেড। হাঃ হাঃ হাঃ
তরল হাসিতে ভেঙে পড়ছে মিগ্যান। মনে হচ্ছে মদ শুধু নিয়েই আসেনি, এক গাদা খেয়েও এসেছে। ঈষৎ মদমত্ত মিগ্যানকে দেখতে ভালো লাগছে। আমাকে হাবলার মত তাকিয়ে থাকতে দেখে মিগ্যান বলল্‌
- “আই ওয়াজ জোকিং - জাস্ট জোকিং। ইট্‌স থার্টি নাইন ডলার্‌স”।
পঞ্চাশ ডলারের একটা নোট বের করে দিতেই তা হাতে নিয়ে থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ বলে চলে গেলো মিগ্যান। ভেবেছিলাম এগারো ডলার ফেরৎ নিয়ে ফিরে আসবে সে। কিন্তু তার দেখা পাওয়া তো দূরের কথা গলার শব্দও আর শোনা গেলো না।
         
প্রফেসর স্ট্যাম্পের ঘড়ি সম্ভবত আমার ঘড়ির চেয়ে মিনিট পাঁচেক ফার্স্ট। পাঁচটা পঁচিশে তিনি আমার দরজায় নক করে ডাকতেই বেরিয়ে পড়লাম। অকল্যান্ড শহরটি অনেকগুলো মৃত আগ্নেয়গিরির উপর অবস্থিত বলে সমতল রাস্তা খুব কমই আছে। বিল্ডিংগুলোও সব ছোটবড় টিলার উপরে বসে আছে। দক্ষিণ গোলার্ধে দিন এখন বড় হচ্ছে। পৃথিবীর সবচেয়ে আগে সূর্য উঠে এখানে নিউজিল্যান্ডে। সূর্য ডোবার কথাও আগে। কিন্তু এই সাড়ে পাঁচটাতেও মনে হচ্ছে দুপুরের কড়া রোদ। ডাউন টাউনেই অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস। পশ্চিম দিকে সামান্য কিছুদূর হাঁটলেই ফেরিঘাট। এখান থেকে ডেভেনপোর্ট ছাড়াও আরো অনেক জায়গায় ফেরি যায়। অকল্যান্ডে গাড়ি পার্ক করার জায়গা পাওয়ার খুব সমস্যা। তাই অনেকেই অফিসে আসার সময় গাড়ি বাড়িতে রেখে আসে। এরকম সমস্যা বড় বড় সব শহরেই আছে। কিন্তু নিউজিল্যান্ড আবার  এ ব্যাপারে এক কাঠি সরেস। মোট চল্লিশ লাখ মানুষের বাস এদেশে। আর গাড়ির সংখ্যা মনে হয় ত্রিশ লাখ হবে। এক বাড়ি থেকে দু’জন যদি একই কাজে একই সময়ে একই জায়গায় যায় তারা নাকি দুটো আলাদা আলাদা গাড়িতে যায়। জানি না ঠিক কিনা। কেন্‌ হয়তো বাড়িয়ে বলেছেন।

ডেভেনপোর্টে যাওয়ার জন্য ফেরির টিকেটের দাম এগারো ডলার। পনের মিনিটের জার্নির জন্য এগারো ডলার ভাড়া! প্রফেসর আমাকে টিকেটের দাম দিতে দিলেন না বলে তেমন একটা গায়ে লাগলো না। দেশের বাইরে আসার আগপর্যন্ত ফেরি বলতে আমার ধারণা ছিল যেটাতে করে গাড়িটাড়িসহ লোকজন পারাপার করা হয়। কিন্তু এখানে যেগুলোকে ফেরি বলা হচ্ছে আমাদের দেশে হলে আমরা বলতাম লঞ্চ বা ইস্টিমার। বেশ সুন্দর দোতলা একটা ফেরিতে উঠে বসলাম। ফেরির গায়ে লেখা আছে যাত্রী ধারণক্ষমতা একশ দশ জন। ফেরির গেটে টিকেট চেক করার সময় একটা কাউন্টিং মেশিন দিয়ে যাত্রীসংখ্যার হিসেবও রাখা হচ্ছে। একশ দশ জনের বেশি একজনকেও উঠতে দেবে না। এরা আইন বানালে তা মেনে চলার জন্যই বানায়। কিছুদিন আগে ভুল জায়গায় গাড়ি পার্ক করার অপরাধে প্রধানমন্ত্রী হেলেন ক্লার্ককেও পার্কিং টিকেট ধরিয়ে দিয়েছেন একজন পার্কিং-অফিসার। প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে অপরাধ স্বীকার করে জরিমানা পরিশোধ করেছেন।





অফিস ছুটির সময় এখন। ফেরি ভর্তি হয়ে গেলো কয়েক মিনিটের মধ্যেই।  বসার সিট খালি নেই একটাও। দোতলায় খোলা ডেকের উপর রেলিং ধরে দাঁড়ালাম। সূর্যের আলো পড়ে সাগরের পানি ঝলমল করছে। অকল্যান্ড শহরের আকর্ষণীয় বিল্ডিংগুলো ঝলমল করছে প্রতিফলিত আলোতে। ফেরি চলতে শুরু করেছে। আশেপাশে অনেকগুলো ছোট ছোট স্পিডবোট। হারবারে একটু পর পর ছোট বড় জেটি। নানা রকম ফেরির আনাগোনা। আস্তে আস্তে পেছনের দিকে সরে গিয়ে গতি বাড়তে শুরু করেছে আমাদের ফেরির। এবার পুরো অকল্যান্ড সিটির স্কাইলাইন পাওয়া গেলো ক্যামেরার ফ্রেমে। মনে হচ্ছে পানির উপর জেগে উঠেছে একটা চমৎকার শহর। দেখা যাচ্ছে অকল্যান্ড টাওয়ার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দূরে শহরের দক্ষিণ দিকে বিশাল লম্বা এক সেতু। কোথায় যায় ওই সেতু দিয়ে? প্রশ্নটা করে ঘাড় ফিরিয়ে প্রফেসর স্ট্যাম্পের দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি একটু দূরে সরে গিয়ে মোবাইলে কথা বলছেন।

-“ওটা হারবার ব্রিজ। নর্দান ফ্রিওয়ে গেছে ওটার উপর দিয়ে”। আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন একজন মহিলা। দেখেই বুঝতে পারছি অফিস থেকে ফিরছেন। ঝকঝকে শার্ট-প্যান্টের সাথে ফলায় চমৎকার একটা স্কার্ফ বাঁধা। তার চেয়েও চমৎকার তাঁর গলার স্বর ও মিষ্টি হাসি। অকল্যান্ডের সব মানুষই মনে হচ্ছে হাসিখুশি মিষ্টভাষী।

পনের মিনিটের মধ্যেই ফেরি ডেভেনপোর্টের ঘাটে এসে ভিড়লো। চমৎকার ছবির মত সুন্দর ছোট্ট সাবার্ব ডেভেনপোর্ট। অকল্যান্ডের প্রাচীন সাবার্বগুলোর একটি নাকি ডেভেনপোর্ট – সবচেয়ে ব্যয়বহুলও বটে। ফেরিঘাট থেকে কয়েক গজের মধ্যেই পাকা রাস্তা। গাড়ি চলার রাস্তার পাশে সাগরের ধার ঘেঁষে পায়ে চলা পথ আর সাইকেলট্র্যাক। প্রফেসর জানালেন মিনিট পাঁচেক  হাঁটতে হবে এখান থেকে।

আধ মিনিট হেঁটে বড় রাস্তায় উঠেই দেখি জুলিয়া রবার্টসের মত সুন্দরী এক মহিলা এগিয়ে এসে দ্রুত চুমু খেলেন প্রফেসরের মুখে। আর প্রায় সাথে সাথেই আমার দিকে ফিরে হাসিমুখে হাতজোড় করে নমষ্কারের ভঙ্গিতে মাথা নোয়ালেন। বললেন, ওয়েলকাম টু ডেভেনপোর্ট প্রদীপ। আই এম সিনথিয়া। অ্যালেন ইজ মাই হাজবেন্ড

আমি হতবাক হয়ে গেছি। সিনথিয়াকে দেখে তাঁর বয়স বোঝার উপায় নেই। ছিপছিপে লম্বা পরিপাটি পোশাকে একটা স্নিগ্ধ আভিজাত্য ঘিরে রেখেছে তাঁকে। এই প্রথম কোন ইংরেজিভাষীকে দেখলাম আমার নাম শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করছেন। আরো অবাক হলাম তাঁর হাতজোড় করে নমষ্কার করা দেখে। সিনথিয়া আমার পাশে পাশে হাঁটছেন। রাস্তায় সুন্দর একতলা ছোট ছোট বাড়িগুলো সমুদ্রের দিকে মুখে করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকটি বাড়ি পরেই রাস্তা পার হয়ে সাদা একটা বাড়ির বারান্দায় উঠে এলাম প্রফেসর স্ট্যাম্প আর ম্যাডাম সিনথিয়ার সাথে। বাড়ির সামনে ছোট্ট একটা ফুলের বাগান। বাড়ির কোন সীমানা প্রাচীর নেই। বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আবার ওয়েলকাম  জানালেন সিনথিয়া।

ঘরের মেঝেতে পুরু লাল রঙের কার্পেট মোড়া। জুতো খুলতে যাচ্ছিলাম, মানা করলেন সিনথিয়া। বললেন, "পরিচয় করিয়ে দিই- আমাদের মেয়ে অলিভিয়া। আর অলিভিয়া এই হলো প্রদীপ”। আমি অলিভিয়া নামের মেয়েটার দিকে তাকাবার সাথে সাথে মনে হলো একটা ইলেকট্রিক শক খেলাম। এই মেয়ে কীভাবে সিনথিয়ার মেয়ে হতে পারে?

অলিভিয়া একটা ছোটখাট পর্বত। বয়স বিশ থেকে পঁচিশের মধ্যে। ফুটবলের মত গোল মুখে গোঁফ লাগিয়ে দিলে বাংলাদেশের সিনেমা অভিনেতা জাম্বুর মত লাগবে। বিরাট বিরাট মোটা মোটা হাত-পা। পেটে বুকে ঘাড়ে গলায় তালতাল মেদ থলথল করছে। কিন্তু সবচেয়ে যেটা চোখে পড়ে তা হলো কপালের বাম দিক থেকে গাল পর্যন্ত নেমে আসা একটা লম্বা গভীর ক্ষতচিহ্ন। অলিভিয়ার মুখের দিকে তাকাতেই কেমন একটা গা শির শির করা অনুভূতি হলো। আমার দিকে তাকিয়ে অলিভিয়া নিরুত্তাপ গলায় বললো, “হাই প্রদীপ”। তার গলার স্বরও সিনথিয়ার মত মিষ্টি, আমার নাম সেও শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করেছে। কিন্তু তারপরও আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে অলিভিয়া সিনথিয়ার মেয়ে। প্রফেসরের দিকেও আরেকবার তাকালাম। তিনিও যথেষ্ট সুদর্শন। অলিভিয়ার চেহারার সাথে কোন মিল নেই তাঁরও। অলিভিয়াকে দেখতে অনেকটা নিউজিল্যান্ডের আদিবাসি মাওরিদের মত লাগছে। কিন্তু মাওরিদের গায়ের রঙ তো এত কালো হয় না।

বসার ঘরে আসবাবের আড়ম্বর নেই। কিন্তু সবকিছু এমন নিখুঁতভাবে সাজানো যে মনে হচ্ছে কোন একটা জিনিস কম বা বেশি হলেই সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাবে। বসার ঘর আর রান্নাঘরের মধ্যে কোন আড়াল নেই। ঘরের একপাশে খাবার টেবিল। প্রফেসর ঘরে ঢুকে আমাকে বসতে বলে ভেতরে চলে গেলেন। সিনথিয়া আমাকে বসালেন বসার ঘরে। অলিভিয়া কিচেন এরিয়াতে কাজে লেগে গেলো। মিগ্যানের মদের বোতল পেয়ে খুব উচ্ছ্বাস দেখালেন সিনথিয়া। ভদ্রতার উচ্ছ্বাস হলেও তা এতটাই আন্তরিক যে ভালো লাগলো খুব। কয়েক মিনিট পরে প্রফেসর স্ট্যাম্প ফিরে এলেন।

গল্পে গল্পে কেটে গেলো কয়েক ঘন্টা। সিনথিয়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাইলেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা, সর্বজনীন উৎসবের কথা, বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় আচার আচরণের কথা। জানা গেলো কোন ধরনের ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না প্রফেসর স্ট্যাম্প। তাঁর সংস্পর্শে এসে সিনথিয়াও নাস্তিক হয়ে গেছেন অনেক বছর আগেই। তবে অলিভিয়া নাকি এখনো মন ঠিক করতে পারেনি ঈশ্বরের ব্যাপারে। গল্প করতে করতে টেবিলে খাবার সাজিয়ে ফেললেন সিনথিয়া ও অলিভিয়া। প্রফেসরও হাত লাগালেন মাঝে মাঝে।

খাবারের আয়োজন দেখে অবাক হবার পালা আমার। টেবিল জুড়ে বাঙালি খাবার। মাছভাজি, ডাল, একটা বড়ার মত জিনিস, ভাত, মাংসের তরকারি - টেবিল ভর্তি আয়োজন। কীভাবে সম্ভব এসব? আমার অবাক হওয়া দেখে ব্যাখ্যা করলেন সিনথিয়া। আমার আসার কথা ঠিক হয়েছে মাস খানেক আগে। তখন থেকেই চলছে সিনথিয়ার এই প্রস্তুতি। নিজে তিনি অকল্যান্ড মিউজিয়ামের উঁচুপদে কাজ করেন। আমার ডিটেইল্‌স জেনেছেন আমার সিভি থেকে। তারপর বাংলাদেশের খাদ্যাভ্যাস জানার জন্য মিউজিয়ামে খোঁজ করেছেন কোন বাংলাদেশি কাজ করেন কিনা। বাংলাদেশের কাউকে পাননি তবে পশ্চিম বাংলার এক বাঙালিকে পেয়েছেন। তাঁর কাছ থেকে জেনে নিয়েছেন কিছু কিছু জিনিস। শরবতের মত মিষ্টি ডাল খেয়ে বুঝতে পারছি ডালের পশ্চিমবঙ্গীয় চিনি-সংস্করণ তৈরি হয়েছে। আমার মত সামান্য একজন মানুষকে এত গুরুত্ব দেয়া হবে আমি কখনো ভাবতেই পারিনি। মনটা ভরে গেলো আনন্দে।

গল্প করতে করতেই খাওয়া শেষ হলো। এঁটো প্লেট বাটি চামচ ডিশওয়াশারে ঢুকিয়ে দিয়ে চটপট খাবার টেবিল পরিষ্কার করে ফেললো অলিভিয়া। একটু পর পরই আমার চোখ চলে যাচ্ছে অলিভিয়ার মুখের দিকে। প্রত্যেকবারই দেখি সে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তার মুখের তুলনায় চোখদুটো খুবই ছোট ছোট। কপাল থেকে মুখ পর্যন্ত কাটা দাগটি অনেক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে আমার মনে। কিন্তু প্রথম দিনের আলাপেই এরকম ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা ভদ্রতার সীমানা অতিক্রম করতে পারে ভেবে জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠে না।

আস্তে আস্তে সন্ধ্যা নামছে। এবার ফেরার পালা। ফেরি ধরার কথা বলতেই অলিভিয়া বললো- “আমি তোমাকে পৌঁছে দেবো”। অবাক হয়ে প্রফেসরের দিকে তাঁকালাম। তাঁর মুখে অস্বস্তির চিহ্ন। তিনি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন সিনথিয়ার দিকে। সিনথিয়া হাসিমুখে বললেন – “দ্যাট্‌স গুড। আমাদের স্পিডবোটটাও দেখা হবে প্রদীপের”।

সিনথিয়া আর প্রফেসরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অলিভিয়ার পিছুপিছু বেরিয়ে এলাম। সূর্য ডোবার এই অপরূপ সময়ে মনে হচ্ছে সাগর ডাকছে আমাকে। অলিভিয়া তার ভারী শরীরের তুলনায় বেশ জোরেই হাঁটছে বলা চলে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ঘাটে বাঁধা সারি সারি স্পিডবোটের কাছে চলে এলাম।

“হেই আলিভিয়া, ইউ গট আ ভিজিটর টুডে” – স্পিডবোটে বসা এক আধবুড়ো ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন। অলিভিয়া ‘হু’ বলে সামনে এগিয়ে গেলো। “ডোন্ট গিভ হিম হার্ড টাইম, ওকে?”। লোকটির কথা শুনে চমকে উঠলাম আমি। ‘হার্ড টাইম’ মানে কী? অলিভিয়া তাঁর কথার কোন উত্তর না দিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে আরো সামনে। আমি তাকে অনুসরণ করছি। একটা সাদা স্পিডবোটের কাছে এসে জেটিতে বাঁধা দড়ি খুলতে শুরু করলো অলিভিয়া। বেশ সুন্দর ছোট্ট স্পিডবোট তাদের।

অলিভিয়া স্পিডবোটে উঠার সাথে সাথে বোটটা প্রায় কাৎ হয়ে গেলো। ধাম করে বসে পড়লো সে চালকের আসনে। পাশে আরেকটা সিট থাকার কথা, কিন্তু সেটারও বেশির ভাগ এখন অলিভিয়ার দখলে। “বসে পড়ো বসে পড়ো” বলতে বলতে ইঞ্জিন চালু করে দিলো অলিভিয়া। সে একটু নড়াচড়া করলেই স্পিডবোট ভীষণ দুলতে শুরু করলো। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। পেছনের সিটের ওপর লাইফ জ্যাকেট দেখে পরে নিলাম। আমার মুখে ভয়ের চিহ্ন দেখে অলিভিয়ার ফুটবল মুখে সামান্য হাসির রেখা দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। ভয় পাচ্ছি দেখে বিদ্রুপ করছে? “লাইফ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক নয় এখানে?” উত্তরে অলিভিয়া ঠোঁট উল্টে বললো- “হু কেয়ার্‌স?” প্রচন্ড শব্দ করে স্পিডবোট ছুটতে শুরু করেছে। আমি অলিভিয়ার পেছনে বসে ভয়ে কাঁপছি।

পশ্চিম আকাশ লাল হয়ে যাচ্ছে, সূর্য ডুবছে। পানিতে কাঁপছে লালচে কালো আকাশ। মুগ্ধ বিস্ময়ে আমি তাকিয়ে আছি পশ্চিম আকাশের দিকে। চোখের সামনেই সূর্য আস্তে আস্তে ডুবে গেলো ডেভেনপোর্টের সাগরে। আকাশে এখনো তার সোনালী স্মৃতি। সূর্য ডোবার সময় স্পিডবোটের গতি কিছুটা কমিয়েছিল অলিভিয়া, কিন্তু মিনিট খানেক পরেই ঝড়ের বেগে ছুটতে শুরু করলো ওটা। এমন বেপরোয়া গতিতে চালানোর জন্য তো তার লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবার কথা। আসলে লাইসেন্স কি আছে তার?

“চলো, তোমাকে একটা মজার দৃশ্য দেখাই”- বলতে বলতে হঠাৎ একশ আশি ডিগ্রি ঘুরে গেলো স্পিডবোট। উল্টে যেতে যেতে কোন রকমে সোজা হলো। তারপর আবার ঝড়ের গতি। আমার বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটানোর শব্দ হচ্ছে। যদি স্পিডবোট উল্টে যায় - আর আমি যদি ঘটনাক্রমে অলিভিয়ার নিচে চাপা পড়ি তাহলে সাঁতার দেয়ার চেষ্টাও করতে পারবো না।

অলিভিয়ার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে দেখলাম। কোন ভাবান্তর নেই তার। আরো গতি বাড়াচ্ছে সে স্পিডবোটের। বেশ কিছু স্পিডবোট এখানে সেখানে, একটু পর পর ফেরি আসছে, যে কোন সময় ধাক্কা লেগে যেতে পারে যে কোনটার সাথে। মনে হচ্ছে আমার প্রাণটা মুখের কাছে এসে কোনরকমে আটকে আছে, মুখ খুললেই তা বেরিয়ে যাবে। দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইলাম। অলিভিয়া স্পিডবোট ঘুরিয়ে নিয়ে এসেছে ডেভেনপোর্টের পশ্চিম পাশে। 

সাগরের এমন প্রশান্ত রূপ আমি আগে দেখিনি কোনদিন। এদিকের আকাশে সূর্য দেখা যাচ্ছে আবার। জ্বলজ্বলে সোনার মত রঙ নিয়ে অপেক্ষা করছে কোন বিদায় বাঁশির। যতদূর চোখ যায় কেবল পানি আর পানি, আর দিগন্তে সূর্য রাশি রাশি সোনা ছড়িয়ে দিয়েছে এই অসীম জলরাশির উপর। ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলো অলিভিয়া। কখন মন থেকে মৃত্যুভয় সরে গিয়ে একটা সীমাহীন ভালো লাগা এসে ভিড়েছে সেখানে। অলিভিয়ার দিকে চোখ তুলে তাকালাম। সে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তার মুখে সূর্যের আভা, জ্বলজ্বল করছে ছোট ছোট চোখ দুটো। কয়েক সেকেন্ডেই আমি চোখ ফিরিয়ে নিয়েছি। তার মুখের দিকে তাকালেই কাটা দাগটির কারণে কেমন জানি গা ছমছম করে।

চারপাশে তাকালাম। দূরে আরো কয়েকটা বোটে বসে সূর্যাস্ত দেখছে মুগ্ধ ট্যুরিস্টের দল। ডুবন্ত সূর্যের সোনালী আলোয় তিরতির করে কাঁপছে সাগরের পানি। এই অপরূপ সুন্দরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য অলিভিয়াকে ধন্যবাদ দেয়া উচিত ভেবে ঘাড় ফেরাতেই চমকে উঠলাম।

অলিভিয়া কাঁদছে। হঠাৎ চারপাশটা কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে উঠল। তাকাতেই চোখ ফিরিয়ে নিল সে। মানুষ যখন হাসে তখন তাতে সহজেই অংশ নেয়া যায়। কিন্তু কান্না খুবই ব্যক্তিগত ব্যাপার। কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক না গলানোই সভ্যতার শিক্ষা। চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম। দক্ষিণ গোলার্ধের আকাশে ধূসর মেঘের আনাগোনা।

কতক্ষণ এভাবে কেটেছে জানি না। ইঞ্জিনের শব্দে সম্বিত ফিরে পেলাম। “চলো এবার যাওয়া যাক” - বলতে বলতেই স্পিডবোটের গতি যেন লাফ দিয়ে বেড়ে গেলো। হারবার ব্রিজের দিকে নিয়ে যাচ্ছে স্পিডবোট। ব্রিজের দিকে কিছুদূর গিয়েই শহরের দিকে ঘুরলো অলিভিয়া। অকল্যান্ড শহরের দিকে তাকিয়ে চোখ ফেরানো যায় না এখন। হাজার আলোয় উজ্জ্বল অকল্যান্ডের প্রতিবিম্ব সাগরের ঢেউয়ের সাথে সাথে দুলছে। তাকে আরো দুলিয়ে দিয়ে ফেরিঘাটের পাশে স্পিডবোট ভিড়ালো অলিভিয়া। আমার লাইফ জ্যাকেটটা খুলে নিতে নিতে বললো, "সরি প্রদীপ, আই ওয়াজ লিটল আপসেট। তুমি কিছু মনে করোনি তো?"
          "তোমাকে অনেক ধন্যবাদ অলিভিয়া এরকম সুন্দর একটা সন্ধ্যার জন্য।"
          ঘাটে উঠে দাঁড়ালাম।
          "আবার দেখা হবে।"  
          অলিভিয়া আমার হাতটা ঝাঁকিয়ে দিয়ে স্পিডবোট নিয়ে উধাও হয়ে গেলো।

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 6

  The habit of reading books was instilled in us from a young age, almost unknowingly. There was no specific encouragement or pressure for t...

Popular Posts