Friday, 10 January 2025

বিশ্বজিত সাহার "হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো"

 



বাংলাদেশের লেখকদের মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে যে হুমায়ূন আহমেদের অবস্থান সে নিয়ে কারোরই কোন দ্বিমত নেই। ২০১২ সালে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর আরো এক যুগ কেটে গেছে। এখনো হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। তাঁর বই এখনো পাওয়া যাচ্ছে, এখনো মানুষ তাঁর বই পড়ছে। অবশ্য তাঁর নতুন প্রজন্মের কোন পাঠক তৈরি হয়েছে কি না আমি জানি না। কারণ আমাদের দেশের পাঠকদের মন এবং পাঠাভ্যাস নিয়ে নির্ভরযোগ্য তেমন কোনো গবেষণা হয় না।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হুমায়ূন আহমেদের ক্যান্সার শনাক্ত হবার পর যখন তিনি চিকিৎসার্থে আমেরিকায় গেলেন তখন থেকে প্রায় প্রতিদিনই তাঁর চিকিৎসার অগ্রগতি সম্পর্কে নানারকম সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশের প্রায় সবগুলি সংবাদপত্রে। হুমায়ূন আহমেদ নিজেও লিখেছেন তাঁর নিজের চিকিৎসা এবং অন্যান্য আনুসঙ্গিক প্রসঙ্গ নিয়ে নিয়মিত কলাম “নিউইয়র্কের আকাশে ঝকঝকে রোদ”সহ আরো অনেক লেখা। তাঁর লেখা এবং তাঁর সম্পর্কে খবরগুলি নিয়মিত পড়েছি অনলাইনে পাওয়া বাংলাদেশের সংবাদপত্রে।

২০১২ সালের ১৯ জুলাই যখন তাঁর মৃত্যু হলো – দুঃখে বুক ভেঙে গেছে তাঁর লক্ষ লক্ষ পাঠকের। হুমায়ূন আহমেদের কট্টর সমালোচকরাও কেউ তাঁর এরকম মৃত্যুতে অবিচল থাকতে পারেননি। এটাই স্বাভাবিক।

তাঁর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বেশ কিছু অপ্রিয় বাদানুবাদ, আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে যা কিছুতেই অভিপ্রেত ছিল না। তাঁকে কোথায় কবর দেয়া হবে – তা নিয়েও হূমায়ূন আহমেদের পরিবারের ভেতরই মতভিন্নতা দেখা দিয়েছিল – এবং প্রচারমাধ্যম তা খুবই বিস্তারিতভাবে, অনেকক্ষেত্রে ফুলিয়ে ফাঁপিয়েও প্রচার করেছে। সর্বযূগে সর্বদেশে প্রচারমাধ্যমের ভূমিকা এরকমই।

নিউইয়র্কের মুক্তধারার মালিক বিশ্বজিত সাহার সাথে লেখক হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক অনেক বছরের। হুমায়ূন আহমেদের বই, নাটক, চলচিত্রের উত্তর আমেরিকার পরিবেশক মুক্তধারা। বিশ্বজিত সাহা হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবসময়েই কাছে ছিলেন এবং আমেরিকায় হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসার ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিয়ে অনেক কিছু করেছেন। তাই ‘হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো’ সম্পর্কে স্বয়ং বিশ্বজিত সাহাই যখন একটি বই লিখলেন – তখন সেই বই সম্পর্কে পাঠকের আগ্রহ জন্মাবে সেটাই খুব স্বাভাবিক।

২০১৩ সালের বইমেলায় এই বই প্রকাশিত হবার পর সেটা নিয়ে হৈচৈ যেমন হয়েছে – তেমনি মেহের আফরোজ শাওনের সাথে বিশ্বজিত সাহার মনোমালিন্যও প্রকাশ্যে এসেছে। শাওন তথা মিসেস হুমায়ূন আহমেদ ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে বইটির প্রকাশককে উকিল নোটিশ পাঠান যেন বইটি বইমেলা থেকে প্রত্যাহার করে নেন এবং প্রচার ও বিক্রয় করা থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু তাতেও কাজ না হলে পুলিশ পাঠিয়ে বইমেলা থেকে সেই বইয়ের অনেকগুলি কপি বাজেয়াপ্ত করান। তাতে বইয়ের কাটতি অনেক বেড়ে যায়। সেই সময় বিশ্বজিত সাহা ইত্তেফাক পত্রিকায় এবং আরো কয়েকটি পত্রিকায় হুমায়ূন আহমেদের শেষের দিনগুলি সম্পর্কে বেশ কয়েকটি লেখা লিখেছিলেন। সেইসময় সেগুলিও পড়েছিলাম।

এতবছর পর ‘হূমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো’ পড়ে আবারো মনে হলো হুমায়ূন আহমেদের মতো মানুষের শেষ দিনগুলি বিশেষ করে শেষের এক মাস ভীষণ যন্ত্রণাময় ছিল। এই যন্ত্রণা তাঁর পাবার কথা ছিল না।

হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজের জন্য পুত্রশোক সহ্য করা ভীষণ কঠিন ছিল। অসহনীয় শোকের মধ্যেও তিনি কয়েক লাইনের একটি মন্তব্য করেছেন এই বইটি সম্পর্কে যে তিনি এই বইটি পড়ার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন, কারণ বিশ্বজিত সাহা হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হুমায়ূন আহমেদের কাছে ছিলেন।

লেখক আয়েশা ফয়েজের এই কথাগুলি খুবই গুরুত্বের সাথে বইয়ে সংযুক্ত করেছেন ভূমিকারও আগে প্রাক-ভূমিকা হিসেবে। আমার মনে হয়েছে লেখক এর মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেয়েছেন এই বইয়ের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। লেখক নিজের ভুমিকাতেও উল্লেখ করেছেন আরো অনেক লেখকের এই বিষয়ে অনেক লেখা এবং বই প্রকাশের কথা। সেসব লেখার চেয়েও তাঁর নিজের লেখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশ্বাসযোগ্য এটা প্রমাণের জন্য লেখক পুরো বইতে ডিটেলস এর প্রতি এত বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন – যেমন ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, ওষুধের নাম, সময়, হাসপাতালের ডিটেলস – যা বইটিকে করে তুলেছে অনেকটাই ফ্যাক্ট ফাইল এর সংকলন।

হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিগত অভ্যাস থেকে শুরু করে তাঁর পরিচিত, ভক্ত, বন্ধুবান্ধব, হিতৈষীদের অনেকের – বিশেষ করে যারা প্রবাসে সেই সময়ে হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছেন সবার কথা উঠে এসেছে।

লেখকের নিজের ভূমিকা এবং তাঁর স্ত্রী রুমা সাহার কথা স্বাভাবিকভাবেই এসেছে প্রতিটি অধ্যায়ে কারণ হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বিশ্বজিত সাহা যতটুকু ভূমিকা রেখেছেন, প্রতিদিন হাসপাতালে যাওয়া, হুমায়ূন আহমেদের শিশুপুত্রদের দেখাশোনা করা, মেহের আফরোজ শাওনকে সঙ্গ এবং সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া সবই করেছেন রুমা সাহা।

প্রবাসী লেখক এবং বিজ্ঞানী পূরবী বসুও অনেক কিছু করেছেন হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করার ব্যাপারে।

আমেরিকায় ক্যান্সার চিকিৎসার খরচ অনেক। মুক্তধারার মাধ্যমে চিকিৎসার বেশিরভাগ খরচ স্পন্সর করেছেন বিশ্বজিত সাহা। তিনি কম খরচে চিকিৎসা যেন হয় সেজন্য হুমায়ূন আহমেদকে একটি মেডিক-এইড কার্ডেরও ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এই কার্ড সাধারণত আমেরিকার স্বল্প-আয়ের মানুষদের জন্য ফেডারেল সরকারের স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্পের অধীনে আমেরিকানদের দেয়া হয়। যদিও কার্ডটি দেয়া হয়েছে চিকিৎসার মাঝামাঝি সময়ে – তারপরও অনেক হাজার ডলার খরচ হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারও বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকের জন্য যা যা করা সম্ভব সব করেছে। হুমায়ূন আহমেদকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে অবৈতনিক একটি পদ দেয়া হয়েছিল – যেন যতদিন দরকার হয় তিনি আমেরিকায় থাকতে পারেন, আমেরিকার বাংলাদেশ দূতাবাসের সুযোগ-সুবিধা দরকার হলে নিতে পারেন। অনেক সময় বেশ কিছু সুযোগ সুবিধা নিয়েছেনও তিনি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হুমায়ূন আহমেদকে দেখতে গিয়েছিলেন তাঁর নিউইয়র্কের বাসায়। অর্থ সহায়তাও দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ অর্থ সাহায্য নেননি।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের সাথে বাস্তববাদী হুমায়ূন আহমেদ ভালোভাবেই মানিয়ে নিয়েছিলেন। তিনি সেইসব দিনগুলি নিয়ে বই লিখেছেন। নিয়মিত রসিকতা করেছেন। ছবি এঁকেছেন। তাঁর আঁকা ছবির ফ্রেম করেছেন লেখকের স্ত্রী রুমা সাহা। নিউইয়র্কে হুমায়ূন আহমেদের আঁকা ছবির প্রথম প্রদর্শনীও হয়েছে। শুরুতে পরিকল্পনা ছিল ছবি বিক্রি করে চিকিৎসার খরচ ওঠানো হবে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত বদলান। তিনি ছবির প্রদর্শনী করতে রাজি হলেও বিক্রি করতে রাজি হননি।

২০১২ সালের জুন মাসের ১৯ তারিখ সকাল আটটায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে হুমায়ূন আহমেদ হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরেন। পরবর্তী ফলো আপের তারিখ দেয়া হয়েছিল ১৫ আগস্ট। কিন্তু দুদিনের মধ্যেই ঘটে যায় ভয়ংকর ঘটনা এবং ঘটনা কিছুটা রহস্যময়ও হয়ে ওঠে।

১৯ তারিখ রাতেই নাকি হুমায়ূন আহমেদের নিউইয়র্কের বাসায় পার্টি হয়, সেখানে ঠিক কী কী হয় জানা যায় না। হুমায়ূন আহমেদ নাকি চেয়ার থেকে পড়ে যান, যদিও সেটা গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বলে লেখক দাবি করেছেন। গোপন করেছেন মিসেস হুমায়ূন আহমেদ এবং প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম।

বিশ্বজিত সাহাকে খবর দেয়া হয় দুদিন পর – যখন হুমায়ূন আহমেদকে জ্যামাইকা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরপর অনেকগুলি অপারেশন করাতে হয়। ডাক্তাররা শনাক্ত করেছেন হয়তো পড়ে গিয়ে আগের অপারেশনের সেলাই ছিড়ে যায়। কিন্তু সাথে সাথে হাসপাতালে না নিয়ে গিয়ে পুরো একদিন বাসায় রেখে দেয়াতে তাতে ইন্টারন্যাল হেমারেজ হয় এবং ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে।

জুনের ২০ তারিখ থেকে জুলাইর ১২তারিখ পর্যন্ত অনেকগুলি অপারেশন, লাইফ সাপোর্ট এবং আমেরিকার হাসপাতালের সর্বোচ্চ চেষ্টাতেও বাঁচানো যায়নি হুমায়ূন আহমেদকে।

লেখকের কাছে সেই সময়ে শাওন ও মাজহারুল ইসলামের ব্যবহার এবং ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। অনেকগুলি প্রশ্নের উদয় হয়েছে সেখানে। সেই প্রশ্নগুলির কোন নৈব্যক্তিক উত্তর আজও পাওয়া যায়নি।

হুমায়ূন আহমেদের মরদেহও একদিন বেশি আমেরিকায় রেখে দিতে হয় – শুধুমাত্র শাওন প্রথম শ্রেনির বিমান টিকেট ছাড়া দেশে ফিরবেন না বলে জেদের কারণে। শাওনের মা সরকার দলীয় এমপি হওয়াতে বেশ প্রভাব খাটিয়েছেন সেটাও স্পষ্ট।

হুমায়ূন আহমেদকে কোথায় দাফন করা হবে সেটা নিয়েও হুমায়ূন আহমেদের প্রথম পক্ষের সন্তানসন্ততি এবং ভাইবোন বনাম শাওনের মধ্যে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত নুহাশ পল্লীতেই দাফন করা হয়।

এই বইটি শাওন কেন নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর এই বইয়ের পাঠক হিসেবে আমি যতটুকু বুঝেছি তা হলো – শাওন চাননি তাঁর ব্যবহারের অসংলগ্নতা কেউ জানুক, কিংবা কেউ তাঁকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করান।

হুমায়ূন আহমেদের ছবিগুলি লেখক বইতে দাবি করেছেন হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। ছবিগুলি নিয়ে পরে কোনো ঝামেলা হতে পারে এটা কি তিনি টের পেয়েছিলেন?

বই প্রকাশের অনেক বছর পর সম্ভবত ২০২১ সালে মেহের আফরোজ শাওন হুমায়ূন আহমেদের ছবি চুরির অভিযোগে মামলা করেছিলেন রুমা চৌধুরি ও মঞ্জুরুল আজিম পলাশের বিরুদ্ধে। এগুলি বইয়ের বাইরের ঘটনা। আমি বেশ হতবাক হয়েছি বিশ্বজিত সাহা ও  রুমা সাহার বিবাহবিচ্ছেদ এবং রুমা সাহার মঞ্জুরুল আজিম পলাশকে বিয়ে করে আমেরিকা ছেড়ে বাংলাদেশে এসে বাস করার সংবাদে। ২০১২ সালে নাকি চব্বিশটি ছবির মধ্যে বিশটি ফেরত দেয়া হলেও চারটি ছবি ফেরত দেয়া হয়নি। রুমা সাহা নাকি বলেছিলেন সেগুলি হারিয়ে গেছে। ২০২১ সালে কুমিল্লায় এক প্রদর্শনীতে হুমায়ুন আহমেদের সেই হারিয়ে যাওয়া ছবিগুলি দেখা যায় – যে প্রদর্শনী করছিলেন রুমা চৌধুরি ও পলাশ। শাওন মামলা করেছিলেন এদের বিরুদ্ধে। দুবছর পর ছবিগুলি উদ্ধার করে শাওনের হাতে তুলে দেয়া হয়।

বিশ্বজিত সাহার বইটি হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলোর ক্রমানুগতিক ঘটনাপঞ্জি তাতে সন্দেহ নেই। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়েছে লেখক যেন পাঠকের কাছে কৈফিয়ত দিচ্ছেন তিনি হুমায়ূন আহমেদের জন্য কী কী করেছেন এবং কতখানি করেছেন। ভবিষ্যতের হুমায়ূন গবেষকদের তো বটেই, হুমায়ূনের শিশুপুত্রদ্বয় নিষাদ ও নিনিতও যদি কোনোদিন কৌতূহলী হয়ে জানতে চায় – এই বই থেকে জানতে পারবে অন্য একটা ভার্সন যেটা হয়তো তাদের মা তাদেরকে অন্যভাবে বলেছেন।

বইটি দুঃখদিনের ঘটনা, তাই সুখপাঠ্য হবার দাবি রাখে না। কিন্তু তবুও বেশ কিছু ঘটনা এবং বর্ণনার পুনরুক্তি আছে। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের ইতিহাসের অংশ। সে হিসেবে এই বইও ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে।

------------

হুমায়ূন আহমেদের ছবি আঁকার হাতও যে এত চমৎকার তা আমরা জানতে পেরেছি তাঁর জীবনের একেবারে শেষের দিকে। এখানে তাঁর আঁকা কিছু ছবি রেখে দিলাম। 





Tuesday, 7 January 2025

প্রবীর মিত্র: বড় ভালো লোক ছিল এবং অন্যান্য

 


অভিনেতা প্রবীর মিত্র মারা গেছেন ৫ জানুয়ারি ২০২৫।

১৯৪১ সালের ১৮ আগস্ট তাঁর জন্ম। সে হিসেবে তিরাশি বছর বয়সে জীবনাবসান কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। প্রবীর মিত্র  চার শ’র বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন এটা নিসন্দেহে একটি বিরাট গৌরবের বিষয়। চারশ সিনেমায় চারশ টি ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের চিত্রায়ণ। শুধুমাত্র অভিনেতারাই এক জীবনে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে হাজির হতে পারেন মানুষের সামনে। [অবশ্য নষ্ট রাজনীতির কিছু কিছু মানুষ অভিনেতাদের চেয়েও বড় অভিনেতা, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।]

আমি যখন থেকে সিনেমা দেখতে শুরু করেছি – তখন থেকেই প্রবীর মিত্রের অভিনয় দেখেছি। একক নায়ক হিসেবে তিনি বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। একেবারে শুরুর দিকে ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমায় কবরীর বিপরীতে নায়ক হিসেবেই অভিনয় করেছিলেন প্রবীর মিত্র। অবশ্য সেই চরিত্রে তেমন বিশেষ কিছু করার ছিল না তাঁর। হঠাৎ করে কবরীকে বিয়ে করে ফেলা, নৌকায় ডাকাতের আক্রমণ হওয়া, কবরীকে হারিয়ে পাগল হয়ে যাওয়া। অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ জেলেদের সরল জীবন নিয়ে লেখা হলেও সরল উপন্যাস বলা যাবে না কিছুতেই। তাকে সিনেমায় রূপান্তরকরণ ঋত্বিক ঘটকের পক্ষেই সম্ভব। তিনি যাকে দিয়ে যা আদায় করতে পারবেন – ঠিক ঠিক তাকে তাকেই সেসব চরিত্রের জন্য বেছে নিতেন। প্রবীর মিত্র ঋত্বিক ঘটকের চোখে পড়েছিলেন – এটা অবশ্যই তাঁর অভিনয় জীবনে বড় প্রভাব রেখেছিল। তখন প্রবীর মিত্রের ক্যারিয়ার সবে শুরু হচ্ছে।




তিতাস একটি নদীর নাম – আমি দেখেছি অনেক পরে। ততদিনে সিনেমার অভিনয় সম্পর্কে আমার ভালোলাগার ধরন বদলে গেছে। কৈশোরে এই সিনেমা দেখলে আমার সম্ভবত মোটেও ভালো লাগতো না। সেই সময় অতিনাটকীয় মেলোড্রামাই বেশি ভালো লাগতো।

বাংলাদেশে একক নায়ক হিসেবে বেশ কয়েকটি সিনেমায় তিনি অভিনয় করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে বেবী ইসলাম তৈরি করেছিলেন ‘চরিত্রহীন’। না, শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের গল্প নয়। মীনা খান নামে এক নতুন নায়িকার বিপরীতে প্রধান নায়ক ছিলেন প্রবীর মিত্র। কিন্তু সিনেমাটি খুব একটা ব্যবসাসফল হয়েছিল বলে মনে হয় না। ঐ নায়িকাকেও পরে আর বেশি দেখা যায়নি।


শাবানার বিপরীতে তিনি নায়ক হয়েছিলেন এইচ আকবরের ‘জালিয়াত’ সিনেমায়। ১৯৭৬ সালে মুক্তি পেয়েছিল সিনেমাটি। কেমন ব্যবসা করেছিল জানি না। তবে একক নায়ক হিসেবে প্রবীর মিত্রকে যে কোন পরিচালকই আর সেভাবে সুযোগ দেননি তা বোঝা যায়।


আমি যখন থেকে বাছবিচারহীনভাবে সিনেমা দেখতে শুরু করেছি – সেই আশির দশকের শুরুতে – সিনেমার পোস্টারে প্রবীর মিত্রের নাম তখন সাধারণত থাকতো তিন কিংবা চার নাম্বারে। সহনায়ক হিসেবে কিংবা অন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে প্রবীর মিত্র অভিনয় করতেন। চরিত্রাভিনেতা হিসেবে তিনি খুবই নির্ভরযোগ্য ছিলেন। সেই সময়ে অন্য সবার মতো তিনিও খুব লাউড অভিনয় করতেন। অভিব্যক্তিতেও তেমন কোন স্বাতন্ত্র্য ছিল না। তিনি যেসব চরিত্রে অভিনয় করেছেন, আমার কখনোই তাঁকে সেইসব চরিত্রের জন্য অপরিহার্য বলে মনে হয়নি। তবে সেই সময় বেশিরভাগ অভিনেতাই খুব টাইপড হয়ে গিয়েছিলেন। যেমন আনোয়ার হোসেন – সৎ, গরীব, দুঃখী টাইপ। এটিএম শামসুজ্জামান – খল এবং কৌতুক। অভিনেতা দেখেই আমরা দর্শকরা শুরু থেকেই চরিত্র সম্পর্কে একটা ধারণা করে নিতাম, এবং সেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মিলে যেতো। কিন্তু প্রবীর মিত্র সেক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। তিনি নেগেটিভ রোলেও অভিনয় করেছেন মাঝে মাঝে।

এ জে মিন্টুর প্রায় সব সিনেমাতেই প্রবীর মিত্র অভিনয় করেছেন বেশ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে। সিনেমাগুলি খুবই ব্যবসাসফল হয়েছিল – কারণ দেখতাম সিনেমাহলে সেগুলি কয়েক সপ্তাহ ধরে হাউজফুল হতো। বলিউডের হিন্দি সিনেমা ‘জনি মেরা নাম’-এর হুবহু নকল করে এ জে মিন্টু তৈরি করলেন ‘মিন্টু আমার নাম’। সেখানে সোহেল রানার সাথে সমানে সমানে অভিনয় করেছেন প্রবীর মিত্র  এবং মাঝে মাঝে সোহেল রানাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছেন। মারপিট নাচগান আর অত্যন্ত উচ্চস্বরে বলা নাটকীয় সংলাপ ছিল এসব ‘নকল’ সিনেমার প্রাণ। তখনো কিন্তু জানতাম না যে এই সব সিনেমা কোনো ধরনের কৃতজ্ঞতাস্বীকার ছাড়াই ফ্রেমের পর ফ্রেম হিন্দি সিনেমা থেকে নকল করে বানিয়েছেন বাংলাদেশের পরিচালকরা। অভিনেতারা কি জানতেন? জানলে কি অভিনয় করতেন? জানি না।


মিন্টু আমার নাম-এ রাগী, পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যুবকের চরিত্র থেকে এ জে মিন্টুর পরের সিনেমা ‘প্রতিজ্ঞা’য় প্রবীর মিত্র সম্পূর্ণ আলাদা হাবাগোবা এক কৌতুকপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করলেন। এই সিনেমা দুটো আমি দেখেছি পুরনো হয়ে যাবার পর পটিয়ার সিনেমা হলে – তৃতীয় শ্রেণির টিকেট কেটে ছারপোকা সমৃদ্ধ কাঠের চেয়ারে বসে।

চট্টগ্রাম কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়ার সময় চট্টগ্রাম শহরের এমন কোন সিনেমা হল ছিল না যেখানে আমি সিনেমা দেখিনি। প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে একটি সিনেমা দেখতাম, মাঝে মাঝে একাধিক। সেই অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি – বেশিরভাগ সিনেমাতেই কোনো না কোনোভাবে প্রবীর মিত্র থাকতেন। এ জে মিন্টুর ‘প্রতিহিংসা’ ছবিতে যদিও সোহেল রানাকেই নায়ক বলা হচ্ছে, আমার মতে সেখানে আসল নায়ক প্রবীর মিত্র। এই সিনেমাটি এ জে মিন্টু কোন্‌ সিনেমা থেকে নকল করেছেন জানি না, তবে কাহিনি, মেকিং বেশ চমৎকার ছিল। জসীম সেই সময় খলনায়ক থেকে ক্রমশ নায়ক হয়ে উঠতে শুরু করেছেন।

প্রতিহিংসা সিনেমায় জসীম একজন কুখ্যাত ডাকাত। বিচারক বিচার করার সময় মন্তব্য করেন যে ডাকাতের ছেলে ডাকাতই হবে – এর কোন ব্যতিক্রম হতে পারে না। জসীম তার সদ্যোজাত ছেলের সাথে বিচারকের সদ্যোজাত ছেলেকে বদলে ফেলে। বিচারকের ছেলে ডাকাতের ছেলে হিসেবে বড় হয়ে ঠিকই গুন্ডা প্রকৃতির হয় – যে চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন প্রবীর মিত্র। আর ডাকাতের ছেলে বিচারকের ছেলে হিসেবে সৎ পুলিস অফিসার হয় (আশির দশকে বাংলাদেশের কোন সিনেমায় পুলিসকে অসৎ দেখানো যেতো না।) – যে চরিত্রে অভিনয় করেন সোহেল রানা। সিনেমাতে সোহেল রানার চেয়েও প্রবীর মিত্রের অভিনয় অনেক বেশি ডায়নামিক ছিল।


এ জে মিন্টুর ঈদের ছবি ছিল মানসম্মান। তখন আমাদের এইচএসসি পরীক্ষা বেশ কাছে চলে এসেছে। কিন্তু তাতে সিনেমা হলে যাওয়া বন্ধ হয়নি আমার। মানসম্মান দেখে ফেলেছিলাম ঈদের দিন মর্নিং-শোতে। সেই সময় শুক্রবার সকাল সাড়ে নয়টা থেকে একটি শো চলতো। বঙ্কিমচন্দ্রের দেবী চৌধুরানি উপন্যাস থেকে সৈয়দ শামসুল হক ‘মান সম্মান’-এর চিত্রনাট্য তৈরি করেছিলেন তা এখন চিন্তা করলে কেমন যেন অস্থির লাগে। অথচ তখন কী দারুণ উত্তেজনা নিয়ে মানসম্মান দেখেছি। প্রবীর মিত্র সেখানে রাগী পুলিস অফিসার – যে ডাকু শাবানাকে ধরার জন্য দিনরাত এক করে ফেলে। কিন্তু ধরতে পারে না।


প্রবীর মিত্রের আরো কিছু সিনেমার কথা মনে পড়ছে যেগুলি দেখে খুব আনন্দ পেয়েছিলাম। সুচন্দা তাঁদের তিনবোনকে নিয়ে একটি সিনেমা বানিয়েছিলেন – তিনকন্যা। সেখানে সুচন্দা, ববিতা, চম্পা অভিনয় করেছিলেন। সুচন্দার নায়ক হয়েছিলেন প্রবীর মিত্র।


 আঁখি মিলন নামে একটি সিনেমা তৈরি হয়েছিল – যেখানে সুরকার ছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। সেই সিনেমার একটি গান – ‘আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে…’ এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে অনেকে ঐ গানটি দেখার জন্যও একাধিকবার সিনেমাটি দেখেছে। আমি সিনেমাটি দেখেছি নতুন সিনেমা এলেই দেখতাম বলে। সিনেমার গল্প আমার কাছে বেশ নতুন মনে হয়েছিল সেই সময়। [পরে অবশ্য জেনেছি এটাও একটি হিন্দি সিনেমার নকল।] রানী নামে নতুন একজন নায়িকা এসেছিলেন সেই সময়। এই সিনেমায় রানীর নায়ক হয়েছিলেন প্রবীর মিত্র। সিনেমায় প্রবীর মিত্রের সাথে রানীর বিয়ে হয়। প্রবীর মিত্রের ছোটভাই ইলিয়াস কাঞ্চনের সাথে রানীর ছোটবোন সুচরিতার প্রেম হয়ে যায়। রানী দুর্ঘটনায় মারা যায়। রানীর ছোট্ট শিশুকে মাতৃস্নেহ দেয়ার জন্য সুচরিতার সাথেই প্রবীর মিত্রের আবার বিয়ে ঠিক হয়। ইলিয়াস কাঞ্চন বা সুচরিতা কেউই মুখ ফুটে বলতে পারে না তাদের প্রেমের কথা। ইত্যাদি ইত্যাদি। খুবই মেলোড্রামাটিক হলেও প্রবীর মিত্রের অভিনয় খুব ভালো লেগেছিল সেখানে।


প্রবীর মিত্র অভিনীত আরো তিনটি সিনেমার কথা বলতেই হবে যেগুলি দেখে আমার ভীষণ ভালো লেগেছিল। কামাল আহমেদ রাজ্জাক শাবানাকে নিয়ে তৈরি করেছিলেন পুত্রবধু। কামাল আহমেদের সিনেমাগুলি পারিবারিক মেলোড্রামায় ভরপুর থাকে। গরীব গানের মাস্টারের মেয়ে শাবানাকে পরিবারের অমতে বিয়ে করে বড়লোকের ছেলে রাজ্জাক। রাজ্জাকের মা কিছুতেই পুত্রবধু হিসেবে মেনে নেন না শাবানাকে। রাজ্জাক বিদেশে গেলে সন্তানসম্ভবা শাবানাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। নানা পথ ঘুরে বিভিন্ন ঘটনার পর শাবানার আশ্রয় হয় এক বুটপালিসওয়ালার কাছে। এই বুটপালিসওয়ালা প্রবীর মিত্রের চরিত্রটি আমার খুবই পছন্দ হয়েছিল। তখনও আমার গ্রুপ থিয়েটারে হাতেখড়ি হয়নি। সিনেমা দেখে দেখে আমি অভিনয় শিখতাম। পুত্রবধু সিনেমায় প্রবীর মিত্রের চরিত্রটি আমার এতই পছন্দ হয়েছিল যে তার অনেক সংলাপ আমি খাতায় লিখে রেখেছিলাম – যেন ভুলে না যাই। সেই খাতাটি অনেক বছর পর আমার অনুপস্থিতিতে আরো অনেক কিছুর সাথে উঁইপোকার পেটে গেছে।

১৯৮৪ সালে মুক্তি পেয়েছিল বেলাল আহমেদের ‘নয়নের আলো’। অন্যরকম একটি প্রেমের সিনেমা, গানের সিনেমা। আহমদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুর করা এই সিনেমার সবগুলি গান ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল। কাহিনিও চমৎকার। গ্রামের গায়ক জাফর ইকবাল শহরে আসে। গ্রামে রেখে আসে তার প্রেমিকা কাজরীকে। শহরে এসে অনেক সংগ্রাম করতে হয় তাকে। শহরে তার আশ্রয় হয় ট্যাক্সি ড্রাইভার প্রবীর মিত্রের বাসায়। প্রবীর মিত্রের ছোটবোন সুবর্ণা মুস্তফা মনে মনে ভালোবেসে ফেলে জাফর ইকবালকে। অনেক ঘটনা ঘটতে থাকে। আমার যে অংশটা খুব বেশি মনে দাগ কাটে সেটা বেশ করুণ। ঘটনাচক্রে কাজরীও বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে শহরে চলে আসে। সেখানে পরিচয় হয় রাইসুল ইসলাম আসাদের সাথে। দুর্ঘটনায় কাজরী অন্ধ হয়ে যায়। এদিকে সুবর্ণার ক্যান্সার ধরা পড়ে। এই সময় সুবর্ণা আর প্রবীর মিত্রের অভিনয় ভীষণ অন্যরকম লেগেছিল আমার। সুবর্ণা মোস্তফা তখন আস্তে আস্তে সিনেমায় নিয়মিত হচ্ছেন। কিন্তু অন্যদের মতো অতিঅভিনয় করেন না বলে তাঁর সাথে অভিনয় করতে গিয়ে প্রবীর মিত্র ভীষণ ভালো অভিনয় করেছেন সেখানে। তাঁর অভিনয়ে আমি কেঁদে ফেলেছিলাম।

এ টি এম শামসুজ্জান যে সিনেমার কাহিনি চিত্রনাট্য লিখতেন তা আমার জানা ছিল না, কিংবা আগে কখনো খেয়াল করিনি। তাঁর লেখা কাহিনি, সংলাপ চিত্রনাট্যের সিনেমা ‘সীমার’ খুব ভালো লেগেছিল। সেই সিনেমায় প্রবীর মিত্রকে আলাদাভাবে ভালো লেগেছিল। সিনেমায় ফারুক একজন রাজনৈতিক গুন্ডা (ক্যাডার)। নেতাদের কথায় এমন কোন অপরাধ নেই যা সে করে না। প্রবীর মিত্র একজন বাম রাজনৈতিক সৎ নেতা। প্রবীর মিত্রের সংস্পর্শে আসার পর ফারুককে সৎ পথে নিয়ে আসার চেষ্টা করে প্রবীর মিত্র। এই চরিত্রটিকে চমৎকার অভিনয় করেছিলেন তিনি।

সেই সময় বাংলাদেশের চলচিত্র পরিচালকদের মধ্যে আর্ট ফিল্ম নির্মাতা ছিলেন আলমগীর কবির। আলমগীর কবিরের সিনেমায় অভিনয় করার সুযোগ পাওয়া সবার পক্ষে সহজ ছিল না। শরৎচন্দ্রের পরিণীতা সিনেমাকে গল্প না বদলে ছবি তৈরি করেছিলেন আলমগীর কবির। [এর আগে শরৎচন্দ্রের কাহিনি নিয়ে ‘স্বামী’ এবং ‘বড়বাড়ির মেয়ে’ সিনেমা তৈরি হলেও সেখানে হিন্দু চরিত্রগুলিকে মুসলমান চরিত্র বানানো হয়েছিল। কারণ পরিচালকরা মনে করতেন বাংলাদেশের দর্শকদের মধ্যে হিন্দুবিদ্বেষ বর্তমান। পরে অবশ্য চাষী নজরুল ইসলাম ‘দেবদাস’ তৈরি করার পর সিনেমায় হিন্দু চরিত্রের মুসলমানিকরণ বন্ধ হয়।]

আলমগীর কবির পরিণীতায় ললিতা চরিত্রে অঞ্জনা, শেখরের চরিত্রে ইলিয়াস কাঞ্চন এবং গিরীনের চরিত্রে প্রবীর মিত্রকে নিয়েছিলেন। ইলিয়াস কাঞ্চন ও অঞ্জনা জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছিলেন এই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য। প্রবীর মিত্রের চরিত্রটির দৈর্ঘ্য ইলিয়াস কাঞ্চনের চেয়ে কম হলেও প্রবীর মিত্র ইলিয়াস কাঞ্চনের চেয়ে সপ্রতিভ ছিলেন এই সিনেমায়।


সিনেমায় অভিনয়ের জন্য একবারই জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছেন প্রবীর মিত্র। সেটা হলো ‘বড় ভালো লোক ছিল’ সিনেমায়। এই সিনেমাটি গতানুগতিক সিনেমার বাইরে। সৈয়দ শামসুল হক এই সিনেমার কাহিনি, সংলাপ, চিত্রনাট্য, গান রচনা করেছেন। মোহাম্মদ মহিউদ্দিন এই সিনেমাটি খুব যত্ন করে তৈরি করেছেন। প্রবীর মিত্র এই সিনেমায় রাজ্জাকের সহনায়ক। সিনেমা শুরু হয় প্রবীর মিত্রের হাহাকারের মধ্য দিয়ে। প্রথম দৃশ্যেই বোঝা যায় ট্রাক ড্রাইভার প্রবীর মিত্রের ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে একজন ফকিরবাবা মারা গেছেন। প্রবীর মিত্র গাড়ি চালাচ্ছিলেন না, তার হেলপার চালাচ্ছিল। চাপা দিয়ে হেলপার পালিয়ে গেছে। গল্প দানা বাঁধে ভিন্ন ভাবে। এই ফকিরের উপর জনগণের খুব বিশ্বাস ছিল। ফকির পানিপড়া দিলে লোকের অসুখ ভালো হয়ে যেতো। ফকিরের ছেলে রাজ্জাক এতদিন ফুফুর কাছে থেকে শহরে লেখাপড়া করেছে। বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে গ্রামে আসে। প্রবীর মিত্র ধরা পড়ার ভয়ে কাউকে জানতে দেয় না যে তার ট্রাকের নিচেই প্রাণ গেছে ফকিরের। এদিকে রাজ্জাক খুঁজে বের করতে চায় তার বাবাকে কে মারলো। গ্রামের লোকজন ক্রমশ তাকেই ফকিরের সম্মান দিতে শুরু করে এবং তার কাছ থেকেই ফকিরি কেরামতি আশা করে। কিছু কিছু কাকতালীয় ব্যাপার ঘটেও যায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের ঘটনাকাল। সিনেমার শেষে মুক্তিযুদ্ধও চলে আসে। কিন্তু ১৯৮২ সালে এরশাদের শাসনামলে তৈরি বলে সিনেমায় একবারও উচ্চারিত হয় না পাকিস্তানের কথা কিংবা রাজাকার বা মুক্তিযোদ্ধা। এই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য রাজ্জাক সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় পুরষ্কার পান, প্রবীর মিত্র পেয়েছেন সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে। পুরষ্কার পেয়েছেন তা অবশ্যই তাঁর অভিনয়ের স্বীকৃতি। কিন্তু এরচেয়েও অনেক ভালো অভিনয় প্রবীর মিত্র করেছেন আরো অনেক ছবিতে যেগুলির কয়েকটির কথা উল্লেখ করেছি।


পরিচালক চাইলে যে ভালো অভিনয় আদায় করে নিতে পারেন – তা এই সিনেমার অঞ্জু ঘোষের অভিনয় দেখলেই বোঝা যায়। অঞ্জু ঘোষ সেই সময় সিনেমাতে এসে প্রচন্ড নাচগানের চটুল চরিত্রে অভিনয় শুরু করেছিলেন। কিন্তু বড় ভালো লোক ছিল সিনেমায় তাঁর অভিনয় খুবই সংযত এবং সাবলিল। রাজ্জাক, প্রবীর মিত্র, গোলাম মোস্তফার মতো দক্ষ অভিনেতার সাথে কী চমৎকার স্বাভাবিক অভিনয় করেছিলেন তিনি। 

পরিণত বয়সেও অনেক সিনেমায় বয়স্ক চরিত্রে অভিনয় করেছেন প্রবীর মিত্র। সেই সিনেমাগুলি অবশ্য দেখিনি। তাঁকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে রেখে আজহারুল ইসলাম তৈরি করেছিলেন ‘রিক্সাওয়ালা’।



এরকম আরো অনেক সিনেমায় অভিনয় করে করেই তিনি চার শ সিনেমা অতিক্রম করেছিলেন। একজন অভিনেতার জন্য এটুকু নিশ্চয় অনেক তৃপ্তির।

কিন্তু অতৃপ্তির মাঝেই বেঁচে থাকে প্রকৃত শিল্পীর শিল্পসত্ত্বা। প্রবীর মিত্র সেরকম কোনো অতৃপ্তির কথা কোথাও বলেছেন কি না জানি না।   

============

সিনেমার পোস্টারগুলি বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ থেকে প্রকাশিত 'সিনেমার পোস্টার' বই থেকে নেয়া। 

Sunday, 5 January 2025

হায় সজনি - প্রেম বিরহের উপাখ্যান

 


সমরেশ মজুমদারের জীবনের শেষের দিকের উপন্যাস ‘হায় সজনি’ প্রকাশিত হয়েছে ২০২০ এর ডিসেম্বরে। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে একটানা পড়ে ফেলার মতো ছোট্ট উপন্যাস। উত্তরাধিকার, কালবেলা, কালপুরুষ, গর্ভধারিনী কিংবা সাতকাহনের সমরেশ মজুমদার – তাই প্রত্যাশা একটু বেশিই ছিল। 

উপন্যাসের ঘটনার সময়কাল দীর্ঘ। শুরু হয়েছে সেই সময় থেকে যখন কলকাতার কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়েও ছেলে-মেয়েতে মেলামেশা তো দূরের কথা – কথা বলাটাকেও দোষের বলে ধরা হতো। গল্পের নায়িকা মৃণালিনী বড়লোকের মেয়ে, গাড়িতে করে কলেজে যায়। সারাক্ষণ মা-মাসীর নজরদারিতে থাকে। এরমধ্যে হঠাৎ একদিন মৃণালিনীর ইচ্ছে হলো স্বাধীনভাবে বাসে চড়তে। বাসস্টপে ‘টু বি’ নম্বর বাসের জন্য দাঁড়ালে অমিত তাকে বাস স্টেশনে দেখেই নাটকীয় কায়দায় “টু বি অর নট টু বি” বলে একটা মনলোগ আউড়ে দেয়। 

সেই তিল থেকেই তাল। না, সরাসরি মৃণালিনী কিংবা অমিতের কথাও হয় না, মেলামেশার তো প্রশ্নই ওঠে না। মৃণালিনীর মাসী খোঁজখবর নিয়ে অমিতের হোস্টেলে হাজির হন গোয়েন্দার মতো। অমিতকেই ভার দেন মৃণালিনীর ওপর নজরদারি করার জন্য। 

সময় গড়ায়। মৃণালিনীর বিয়ে হয়ে যায়, আবার অকালে বিধবাও হয়ে যায় সে। অমিত গল্প লেখে। তার গল্প থেকে সিনেমা হয়। মৃণালিনী সিনেমায় অভিনয় করতে চায়, আবার একটি সিনেমায় অভিনয় করেই হারিয়ে যায়। 

বছরের পর বছর কেটে যায়। অমিত বিখ্যাত সাহিত্যিক হয়। কিন্তু তার মনের ভেতরে মৃণালিনীর জন্য একটা জায়গা রয়েই যায়। শেষ অধ্যায় শেষ হয় নাটকীয় বিরহের মধ্য দিয়ে। একটু বেশি নাটকীয়ই বলা যায়। 

উপন্যাসে সব উপাদানই আছে। সমরেশ মজুমদার অভিজ্ঞ বিখ্যাত লেখক। কোনো উপাদানের ঘাটতি রাখেননি। কিন্তু উপাদানগুলি কেমন যেন একটু ছাড়া ছাড়া খাপছাড়া রয়ে গেছে। হতে পারে প্রত্যাশার পরিমাণ বেশি ছিল বলেই কেমন যেন অতৃপ্তি রয়ে গেছে। 


Saturday, 4 January 2025

তাহার নামটি অঞ্জনা

 


তখন সবে ক্লাস নাইনের বার্ষিক পরীক্ষা দিয়েছি। বাড়িতে যান্ত্রিক বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল একটি এক ব্যান্ড ফিলিপস রেডিও। ছুটির দিনের দুপুর কাটতো সেই রেডিওতে কান লাগিয়ে বিজ্ঞাপন তরঙ্গ শুনতে শুনতে। সেই সময় সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত কিংবা সহসা মুক্তি পাবে এরকম সিনেমাগুলির উপর বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো। সেই অনুষ্ঠানগুলি ছিল আমার খুবই প্রিয়। বৌরানি সিনেমা তখন সদ্য মুক্তি পেয়েছে। বিজ্ঞাপনে প্রচারিত সেই সিনেমার অনুষ্ঠান শুনতে শুনতে সবকিছু মুখস্থ করে ফেলেছি। রাজ্জাক, বুলবুল আহমেদ, শাবানা, অঞ্জনা, গোলাম মোস্তফা – সবার যে ক’টা সংলাপ বিজ্ঞাপনে উচ্চারিত হয়েছে সেগুলি সব মুখস্ত হয়ে গেছে। ইত্তেফাক পত্রিকায় তখন সিনেমার অনেক বিজ্ঞাপন ছাপানো হতো। সেগুলি দেখতে দেখতে অনেক নায়ক নায়িকা চিনে ফেলেছিলাম। অঞ্জনার চেহারাও আমার চেনা হয়ে গেছে ততদিনে।  

বার্ষিক পরীক্ষার পর একবার শহরে যাবার সুযোগ হয়। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি কখন বাবা শহরে নিয়ে যাবেন। অবশেষে সেই সুযোগ এলো। তবে সরাসরি শহরে নয়। শহরের আগে এক রাত পটিয়ায় থাকতে হলো। আমার বড়ভাই তখন পটিয়া কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়ার জন্য ভর্তি হয়েছে। কলেজের হোস্টেলে থাকে। আমি প্রথমবারের মতো গেলাম তার হোস্টেলে। আগের সপ্তাহে সে শহরে গিয়ে বৌরানি সিনেমা দেখে এসেছে। এজন্যও খুব ঈর্ষা হলো আমার।  

পরদিন ভোরে উঠেই ট্রেন ধরে শহরে। বাবার কাজকর্ম অনেক। তাঁর সাথে আন্দরকিল্লার বইয়ের দোকান থেকে কোর্টবিল্ডিং, বাংলাদেশ ব্যাংক – সবকিছু ঘুরতে ঘুরতে আমি অধৈর্য হয়ে পড়ছিলাম কখন সিনেমা হলে ঢুকবো। আমার বাবার প্রিয় সিনেমা হল ছিল সিনেমাপ্যালেস এবং খুরশিদ মহল। লালদিঘীর কাছাকাছিই তাঁর স্বাচ্ছন্দ্যের এলাকা। আগের সপ্তাহে তিনি দাদাকে এই সিনেমা দেখিয়েছেন সিনেমাপ্যালেসে। কিন্তু এসপ্তাহে বৌরানির বদলে অন্য একটি সিনেমা চলছে সেখানে। যে কোনো সিনেমাই আকর্ষণীয়, কিন্তু আমাকে দেখতে হবে বৌরানি। সিনেমাটি আমার বাবারও এত ভালো লেগেছে যে আমাকে সাথে নিয়ে আবার দেখবেন তিনিও। 

স্টেশন রোডে নুপুর সিনেমা তখন চট্টগ্রামের অভিজাত সিনেমা হলগুলির একটি। জীবনের প্রথমবারের মতো ঢুকলাম সেখানে এবং মগ্ন হয়ে দেখলাম – বৌরানি। অঞ্জনা অভিনীত ওটাই আমার দেখা প্রথম সিনেমা। 





রাজ্জাকের বিপরীতে অঞ্জনা, আর বুলবুল আহমেদের বিপরীতে শাবানা। রাজ্জাক গ্রাম থেকে শহরে পড়তে আসে। কলেজের প্রিন্সিপাল শওকত আকবর তার চাচার বন্ধু। তাই প্রিন্সিপালের বাসায় তার থাকার জায়গা হয়। প্রিন্সিপালের মেয়ে অঞ্জনা। বাসায় কলেজে পড়ুয়া মেয়ে আছে বলে জোয়ান কোন ছেলেকে বাসায় থাকতে দেবেন না অঞ্জনার মা। তাই প্রিন্সিপাল রাজ্জাককে বিবাহিত হিসেবে পরিচয় দেন। এ নিয়ে নানারকম মজার ঘটনা ঘটতে থাকে। নেচে নেচে গান করা, প্রেম করা, অভিমান করা ছাড়া অঞ্জনার আর তেমন বিশেষ কিছু করার ছিল না সিনেমায়, তবুও ঐটুকুতেই আমার তাকে শাবানার চেয়েও বড় অভিনেত্রী বলে মনে হলো। 

কয়েক মাস পরেই আমার আরো অনেক সিনেমা দেখার সুযোগ এসে গেল। অঞ্জনা অভিনীত পরের সিনেমা যেটা দেখলাম সেটা হলো ‘সুখের সংসার’। নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত ভীষণ মেলোড্রামাটিক সিনেমা। তখন আমি সবেমাত্র বাঁশখালির অজপাড়া থেকে মহকুমা শহর পটিয়ায় এসে সেখানকার মডেল হাইস্কুলে ক্লাস টেনে ভর্তি হয়েছি। থাকি বড়ভাইয়ের হোস্টেলে। পটিয়াতে একটি সিনেমা হল আছে – শুধুমাত্র এই কারণেই পটিয়াকে নির্দ্বিধায় শহর বলে মেনে নিয়েছি। হাতে কোনরকমে পাঁচ টাকা জমলেই তৃতীয় শ্রেণির টিকেট কেটে সিনেমা হলে ঢুকে পড়া যেতো। শুধুমাত্র পুরনো সিনেমাগুলিই সেই হলে মুক্তি পেতো – তাতে আমার কোনো সমস্যা ছিল না। কারণ আগে না দেখা যেকোনো সিনেমাই আমার কাছে নতুন এবং আকর্ষণীয়। সেই সময় আমি যে মনযোগ দিয়ে সিনেমা দেখতাম – অত মনযোগ দিয়ে লেখাপড়া করলে জীবনটা অন্যরকম হতো। সিনেমার প্রত্যেকটি সংলাপ, গান, এমনকি আবহসঙ্গীত পর্যন্ত আমার মুখস্থ হয়ে যেতো। শুধুমাত্র নায়ক-নায়িকা নয়, সিনেমার ছোট-বড় সব চরিত্রই মনে গেঁথে যেতো নাটকীয় সংলাপের কারণে। এখন যেসব সংলাপকে অতিনাটকীয় বলে মনে হয়, সেই সময় সেইসব সংলাপসর্বস্ব চরিত্রগুলোকেই আমার কাছে ভীষণ আকর্ষণীয় মনে হতো। 

সেই সময় প্রতি সপ্তাহের শুক্রবারে একাধিক নতুন সিনেমা মুক্তি পেতো। ঢাকায় মুক্তি পাবার পরের সপ্তাহে চট্টগ্রামের সিনেমা হলে নতুন সিনেমা আসতো। পটিয়ায় সেই সিনেমা আসতো আরো কয়েক মাস পর। সুখের সংসার দেখার জন্য ততদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। বড়ভাই তার বন্ধুদের সাথে সিনেমা দেখার জন্য শহরের বাসে ওঠার সময় নির্লজ্জভাবে একপ্রকার জোর করেই আমি বাসে উঠে গিয়েছিলাম। পটিয়া থেকে বাস আসতো তখন অনেক ঘুরে কালুরঘাটের ব্রিজ পার হয়ে। বহদ্দার হাট, মুরাদপুর পার হয়ে চকবাজারের গুলজার সিনেমার সামনে দিয়ে কলেজ রোড ধরে আন্দরকিল্লা চলে যেতো বাসগুলি। মনে আছে, গুলজার সিনেমার সামনে প্রায় চলন্ত বাস থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম সিনেমার টিকেট কাউন্টারে। 





সুখের সংসার-এর নায়ক ফারুক এমএ পরীক্ষা দিয়ে পত্রিকার হকারি করছে। বড়লোক নায়িকা রোজিনার সাথে পরিচিত হচ্ছে তাদের বাড়িতে পেপার দিতে গিয়ে ঝগড়ার মাধ্যমে। নাটকীয়তায় ভরপুর। সেখানে অঞ্জনা ছিল ফারুকের ছোট বোন। তার বিয়ে হয় বড়লোকের ছেলে প্রবীর মিত্রের সাথে। প্রবীর মিত্র সারাক্ষণ বই পড়ে। বিয়ের পর স্ত্রীর সাথে কীভাবে কথা বলবে সে বিষয়েও সে বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করে। এত বইপড়া মানুষ এত হাবাগোবা কীভাবে হতে পারে সেই প্রশ্ন সেদিন মনেও আসেনি। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো সেই সিনেমার অনেক সংলাপ আমার এখনও মনে আছে। অঞ্জনার অভিনয় দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। অঞ্জনার অভিনয়ের প্রতি আমার মুগ্ধতা এরপর আরো যত সিনেমায় তাঁর অভিনয় দেখেছি – কোনোটাতেই কমেনি। যেকোনো চরিত্রেই অঞ্জনা তাঁর অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতেন। 





প্রধান নায়িকা হিসেবেও তিনি অনেক সিনেমায় অভিনয় করেছেন। নায়করাজ রাজ্জাকের সাথেও তিনি তিরিশটির বেশি সিনেমায় নায়িকা হয়েছেন। প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের জন্য দুবার জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছেন। তিনি যে তিন শ’র বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন সেই তথ্য আমার জানা ছিল না। আজ অঞ্জনার মৃত্যুসংবাদ পাবার পর আমার নিজের সেই কৈশোরের সিনেমা দেখার দিনগুলির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। অঞ্জনা অভিনীত অনেকগুলি চরিত্রের কথাই মনে পড়ছে। তিনি খারাপ অভিনয় করেছেন এরকম কোন চরিত্র মনে পড়ছে না। বাংলাদেশের সেরা ক্ল্যাসিক নির্মাতা আলমগীর কবীর অঞ্জনাকে নিয়ে তৈরি করেছিলেন শরৎচন্দ্রের পরিণীতা। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছেন তিনি পরিণীতায় ললিতার চরিত্রে অভিনয় করে। এর আগে ১৯৮১ সালেও তিনি জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছিলেন ‘গাংচিল’ সিনেমায় ‘নীলা’ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। [অঞ্জনার মৃত্যুর খবর পেয়ে ইউটিউবে গাংচিল দেখলাম কিছুক্ষণ আগে। নীলা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য কেন অঞ্জনাকে জাতীয় পুরষ্কার দেয়া হলো বুঝতে পারলাম না। চরিত্রটিতে বিশেষ কিছু করার ছিল না।]

বাংলাদেশের সিনেমায় যাঁরা অভিনয় করতেন সেই সময়  প্রায় প্রত্যেকেই অতিঅভিনয় করতেন। সেক্ষেত্রে আমার কাছে মনে হয়েছে অঞ্জনা ছিলেন অনেকটাই ব্যতিক্রম। তিনি যথাসম্ভব স্বাভাবিক অভিনয় করার চেষ্টা করতেন। অঞ্জনার অভিনয় প্রতিভার যথাযথ মূল্যায়ন হয়েছে কি না আমি বলতে পারছি না। কারণ আমাদের দেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে দীর্ঘদিন ধরে অন্যদেশের সিনেমার সাথে কোন ধরনের প্রতিযোগিতা করতে হয়নি। তারপরও ইন্ডাস্ট্রিটি ধ্বংস হয়ে গেছে। শুনেছি ২০০৮ সালের পর অঞ্জনা আর কোন সিনেমাতে অভিনয় করেননি। অভিনয় করার মতো হয়তো তেমন কোন সুযোগই ছিল না। আমাদের পরের প্রজন্মের কেউ অঞ্জনার অভিনয় দেখেছেন বলেও মনে হয় না। সুতরাং অভিনয় শিল্পী হিসেবে তিনি অমর হয়ে থাকবেন এরকম দুরাশা আমি করি না। তবে আমার মনে থাকবে তাঁর অভিনয়ের কথা। 

Wednesday, 1 January 2025

ক্লাসিক্যাল ফিজিক্সের নায়ক - লর্ড র‍্যালে

 


লর্ড র‍্যালে নামটি আমাদের কাছে যতটা পরিচিত, জন উইলিয়াম স্ট্রুট ততটা নয়। অথচ নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী লর্ড র‍্যালের আসল নাম হলো জন উইলিয়াম স্ট্রুট। ইংল্যান্ডের এসেক্স কাউন্টির একটি শহরের নাম র‍্যালে। সেখানকার লর্ড ছিলেন বলেই জন উইলিয়াম স্ট্রুটকে সবাই লর্ড র‍্যালে বলে ডাকতো। তিনি ছিলেন তৃতীয় লর্ড র‍্যালে। ক্লাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞানের অনেক কিছুর সাথেই লর্ড র‍্যালের নাম যুক্ত হয়ে আছে তাঁর আবিষ্কার এবং অবদানের জন্য। শব্দ, তাপ, আলোক, তড়িৎচুম্বক, এবং নিষ্ক্রিয় গ্যাস – সবকিছুরই অনেক তত্ত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে লর্ড র‍্যালের হাতে। নিষ্ক্রিয় গ্যাস আর্গন আবিষ্কারের জন্য তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেছেন ১৯০৪ সালে। লর্ড র‍্যালেকে আমরা এই উপমহাদেশের মানুষ হিসেবে আরো একটি কারণে বিশেষভাবে স্মরণ করি – সেটা হলো তাঁর কাছে পদার্থবিজ্ঞানের পাঠ নিয়েছিলেন আমাদের স্যার জগদীশচন্দ্র বসু। 

জন  উইলিয়াম স্ট্রুটের জন্ম ১৮৪২ সালের ১২ নভেম্বর ইংল্যান্ডের এসেক্সে। তাঁর বাবা জন জেমস স্ট্রুট ছিলেন দ্বিতীয় লর্ড র‍্যালে। র‍্যালে শহরের ব্যারন বা লর্ডশিপ পদটি সৃষ্টি করা হয়েছিল ইংল্যান্ডের রাজা চতুর্থ জর্জের ইচ্ছায়। তাঁর রাজত্বের সময় কর্নেল জোসেফ হোল্ডেন স্ট্রুট ছিলেন সাসেক্স কাউন্টির পার্লামেন্ট মেম্বার। নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের যুদ্ধে খুব বীরত্ব দেখিয়েছিলেন কর্নেল জোসেফ হোল্ডেন স্ট্রুট। রাজা চতুর্থ জর্জ কর্নেলকে পুরষ্কার স্বরূপ র‍্যালে শহরের ব্যারন করতে চাইলেন। ব্যারন পদটি ছোটখাট আঞ্চলিক রাজার মতো - খুব সম্মানজনক, এবং পুরুষানুক্রমিকভাবে অধিকারযোগ্য। অর্থাৎ একবার কেউ ব্যারন হলে তার পরবর্তী প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই পদের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ও উপাধি ভোগ করবে। কিন্তু কর্নেল জোসেফ হোল্ডেন স্ট্রুট নিজে ব্যারন হতে চাইলেন না। কারণ ব্যারন হয়ে গেলে পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করতে হবে। তিনি ভোটের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন। আবার রাজার দেয়া সম্মান ঠেলে ফেলতেও চাইলেন না। তিনি অনুরোধ করলেন তাঁর বদলে পদটি যেন তাঁর স্ত্রীকে দেয়া হয়। রাজা চতুর্থ জর্জ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করলেন। প্রথম ব্যারনেস র‍্যালে হলেন শার্লট মেরি গারট্রুড। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর প্রথম সন্তান জন জেমস স্ট্রুট হলেন দ্বিতীয় লর্ড র‍্যালে। ১৮৭৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর প্রথম সন্তান জন উইলিয়াম স্ট্রুট হলেন তৃতীয় লর্ড র‍্যালে – যিনি আমাদের আজকের আলোচ্য পদার্থবিজ্ঞানী। [তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে রবার্ট জন ছিলেন চতুর্থ লর্ড র‍্যালে, রবার্ট জনের ছেলে জন আর্থার ছিলেন পঞ্চম লর্ড র‍্যালে, আর বর্তমানে ষষ্ট লর্ড র‍্যালে হয়েছেন জন আর্থারের ছেলে জন জেরাল্ড স্ট্রুট।]

সাত হাজার একরের একটি বিশাল স্টেটের মালিক এবং ব্যারনের  ছেলে হওয়াতে খুবই আরাম আয়েশে কেটেছে জন উইলিয়ামের ছোটবেলা। কিন্তু এত বিত্তবৈভব আরাম-আয়েশের মধ্যে থেকেও খুব একটা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন না জন উইলিয়াম। বাড়িতে গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পড়ালেখার শুরু। দশ বছর বয়সে বিখ্যাত ইটেন কলেজে ভর্তি করানো হয়েছিল তাকে। কিন্তু হুপিং কাশিতে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তাকে স্কুল ছাড়তে হয় এক টার্মের পরেই। তারপর একটু সুস্থ হয়ে উইম্বলডনের ছোট্ট একটা বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা ১৮৫৪ থেকে ১৮৫৬ পর্যন্ত। এখান থেকে তাঁকে ভর্তি করানো হলো ইংল্যান্ডের বিখ্যাত হ্যারো স্কুলে। কিন্তু দুই টার্ম পরে সেখান থেকেও চলে আসতে হলো শারীরিক অসুস্থতার কারণে। এরপর তার লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা হয় ইংল্যান্ডের দক্ষিণে সমুদ্রতীরবর্তী ডেভন কাউন্টির একটি প্রাইভেট স্কুলে যার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন রেভারেন্ড জর্জ টাউনসেন্ড ওয়ার্নার। ১৮৬০ সালে স্কুল ফাইনাল পাস করলেন জন উইলিয়াম। 

১৮৬১ সালে ভর্তি হলেন কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির ট্রিনিটি কলেজে। স্কুলে থাকতে তেমন কোন বিশেষ মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারেননি জন উইলিয়াম। খুবই সাধারণ মানের ছাত্র ছিলেন তিনি। কিন্তু কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ বোধ করতে শুরু করলেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের গাণিতিক দক্ষতা প্রমাণের জন্য প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা আছে যা ম্যাথমেথিক্যাল ট্রাইপোস নামে পরিচিত। অনেকগুলি অত্যন্ত জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে হয় এই প্রতিযোগিতায়। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য পাঁচ বছর কঠোর পরিশ্রম করলেন জন উইলিয়াম। এসময় তাঁর গণিতের প্রশিক্ষক ছিলেন কেমব্রিজের বিখ্যাত গণিতজ্ঞ এডোয়ার্ড জন রাউথ। ১৮৬৫ সালে ম্যাথমেথিক্যাল ট্রাইপোস পরীক্ষায় সর্বোচ্চ র‍্যাংক “সিনিয়র র‍্যাংলার” অর্জন করলেন। সেই সময়ের বিশাল অর্জন এটা জন উইলিয়ামের জন্য। কারণ তাঁর সিনিয়র জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল কিংবা লর্ড কেলভিনও ম্যাথমেটিক্যাল ট্রাইপোসে “সিনিয়র র‍্যাংলার” পাননি, পেয়েছিলেন “সেকেন্ড র‍্যাংলার” র‍্যাংক। একই বছর গণিত ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে বিশেষ দক্ষতার পুরষ্কার “স্মিথ প্রাইজ” লাভ করলেন জন উইলিয়াম। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রাক্তন অধ্যাপক রবার্ট স্মিথের টাকায় এই পুরষ্কার প্রবর্তিত হয়েছিল। 

১৮৬৬ সালে জন উইলিয়াম ট্রিনিটি কলেজের ফেলো নির্বাচিত হন। তখনো পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শুধুমাত্র তাত্ত্বিক গবেষণাই হতো। পরীক্ষণ গবেষণা যা হতো সবই ব্যক্তিউদ্যোগে নিজেদের বাড়িতে বা অন্য কোন ব্যক্তিগত গবেষণাগারে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়েও কোন পরীক্ষাগার ছিল না। ১৮৬৮ সালে জন উইলিয়াম আমেরিকা ভ্রমণে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষণ গবেষণাগারের কাজকর্ম দেখে এসেছেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষাগার তৈরি করার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। কিন্তু তিনি নিজের টাকায় বৈজ্ঞানিক গবেষণার যন্ত্রপাতি কিনে নিজের বাড়ি টার্লিং প্যালেসে ব্যক্তিগত গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করে গবেষণা শুরু করলেন। 

১৮৬৯ সালে প্রকাশিত হলো তড়িতচুম্বকের ধারণার উপর তাঁর প্রথম গবেষণাপত্র। পরবর্তী দুবছরের মধ্যে শব্দের রেজোন্যান্স, আলোর বর্ণ, বিচ্ছুরণ ও প্রতিফলন সংক্রান্ত আরো এগারোটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।

কেমব্রিজে জন উইলিয়ামের সহপাঠী ছিলেন আর্থার ব্যালফোর, যিনি পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। আর্থার ব্যালফোরের বোন ইভলিনের সাথে প্রেম হয় জন উইলিয়ামের। ১৮৭১ সালে ইভলিন ও জন উইলিয়াম বিয়ে করেন। বিয়ে করার সাথে সাথে জন উইলিয়ামের ট্রিনিটি কলেজের ফেলোশিপ বাতিল হয়ে গেল। কারণ বিবাহিতদের জন্য ঐ ফেলোশিপ নিষিদ্ধ ছিল। 

এদিকে তাঁর শরীরও হঠাৎ প্রচন্ড খারাপ হয়ে গেল। রিউম্যাটিক ফিভারে আক্রান্ত হয়ে প্রচন্ড কাহিল হয়ে গেলেন জন উইলিয়াম। ডাক্তারের পরামর্শে ইওরোপের শীত থেকে বাঁচতে ১৮৭২ সালের ডিসেম্বরে তিনি স্ত্রীকে সাথে নিয়ে চলে গেলেন মিশরে। সেখানে নীল নদের উপর একটি নৌকা ভাড়া করে থাকতে শুরু করলেন। নৌকায় বসেই তিনি লিখতে শুরু করলেন শব্দবিজ্ঞানের উপর প্রথম পূর্ণাঙ্গ বই “দ্য থিওরি অব সাউন্ড”। ১৮৭৭ সালে দ্য থিওরি অব সাউন্ডের প্রথম খন্ড এবং ১৮৭৮ সালে দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে অনেক বছর ধরে অনেকগুলি সংস্করণ প্রকাশিত হয় এই বইয়ের। 

১৮৭৩ সালে মিশর থেকে ইংল্যান্ডে ফিরে এলেন জন উইলিয়াম। তার কিছুদিন পরে তাঁর বাবা দ্বিতীয় লর্ড র‍্যালে মৃত্যুবরণ করলে উত্তরাধিকারসূত্রে তৃতীয় লর্ড র‍্যালে হলেন জন উইলিয়াম স্ট্রুট। এরপর থেকে ইংল্যান্ডের প্রথা অনুযায়ী আসল নামের পরিবর্তে উপাধিতেই তিনি পরিচিতি লাভ করতে শুরু করলেন – লর্ড র‍্যালে হিসেবে। 

১৮৭৩ সালে রয়েল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হলেন লর্ড র‍্যালে। আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক গবেষণাও চালিয়ে গেছেন তিনি সমান দক্ষতায়। তখনো পর্যন্ত তিনি তাঁর স্টেটের উপার্জন ছাড়া অন্য কোন প্রতিষ্ঠান থেকে কোন সম্মানী নেননি। বৈজ্ঞানিক গবেষণার সবকিছুই করছিলেন নিজের বাড়ির গবেষণাগারে নিজের টাকায়। সবকিছু ঠিকই চলছিল। ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত শব্দ, আলো, তাপ, তড়িৎচুম্বক ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর ষাটটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়ে গেছে। 

কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরপর তিন বছর পর্যাপ্ত ফসল না হওয়াতে র‍্যালে স্টেটের উপার্জন কমে গেলো। লর্ড র‍্যালে বাধ্য হলেন প্রাতিষ্ঠানিক কাজের বিনিময়ে সম্মানী গ্রহণ করতে। 

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের প্রথম গবেষণাগার ‘ক্যাভেন্ডিস ল্যাব’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৮৭৩ সালে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন চ্যান্সেলর উইলিয়াম ক্যাভেন্ডিসের নিজস্ব অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত এই গবেষণাগারের প্রথম ‘ক্যাভেন্ডিস প্রফেসর’ হিসেবে যোগ দিয়েছেন বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। কিন্তু ১৮৭৯ সালে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে ম্যাক্সওয়েলের মৃত্যু হলে ক্যাভেন্ডিস প্রফেসরের পদ খালি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুরোধে এবং কিছুটা আর্থিক প্রয়োজনে ক্যাভেন্ডিস প্রফেসর পদে যোগ দিতে রাজি হন লর্ড র‍্যালে। নিতান্ত প্রয়োজন না হলে কাজের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণের পক্ষপাতি ছিলেন না তিনি। তাই তাঁর এস্টেটের উপার্জন প্রয়োজনীয় স্তরে পৌঁছানোর সাথে সাথে ১৮৮৪ সালে তিনি ক্যাভেন্ডিস প্রফেসর পদে ইস্তফা দিয়ে নিজের এস্টেটে ফিরে যান স্বাধীন গবেষণায়। 

মাত্র পাঁচ বছরের জন্য ক্যাভেন্ডিস প্রফেসর এবং ল্যাবের পরিচালক হিসেবে কাজ করলেও – এই পাঁচ বছরের মধ্যেই লর্ড র‍্যালে কেমব্রিজের ক্যাভেন্ডিস ল্যাবের যুগান্তকারি পরিবর্তন ঘটান। এতদিন বিজ্ঞানের ক্লাস ও গবেষণাগারে মেয়েদেরকে ঢুকতে দেয়া হতো না। লর্ড র‍্যালে মেয়েদের জন্য সমস্ত বিজ্ঞান ক্লাস ও গবেষণাগার উন্মুক্ত করে দিলেন। গবেষকদের ভেতর সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য চালু করেন বৈকালিক চায়ের ব্যবস্থা – যেখানে চা খেতে খেতে গবেষকরা একে অন্যের সাথে বৈজ্ঞানিক ধারণা বিনিময় করেন। লর্ড র‍্যালের তত্ত্বাবধানে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম চালু হয় তাপ, বিদ্যুৎ, চুম্বক, আলো, শব্দ, এবং পদার্থের ধর্ম সংক্রান্ত পরীক্ষণ পদার্থবিজ্ঞানের পাঠদান। ক্যাভেন্ডিস ল্যাবের পাঁচ বছরে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে ৫৪টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। 

লর্ড র‍্যালের সময়ে ১৮৮০ সালে কেমব্রিজে পড়তে এসেছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু। লর্ড র‍্যালের কাছ থেকেই তিনি উৎসাহ পেয়েছিলেন পরীক্ষণ পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায়। 

১৮৮৪ সালে ক্যাভেন্ডিস প্রফেসরের পদ ত্যাগ করে নিজের স্টেটে ফিরে গিয়ে নিজস্ব গবেষণাগারে আজীবন স্বাধীনভাবে গবেষণা চালিয়ে গেছেন লর্ড র‍্যালে। ক্লাসিক্যাল ফিজিক্সের এমন কোন শাখা নেই যেখানে লর্ড র‍্যালের উল্লেখযোগ্য অবদান নেই। প্রায় সাড়ে চার শ গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন তিনি। আবিষ্কার করেছেন পদার্থবিজ্ঞানের অনেক সূত্র এবং তত্ত্ব। 

গ্যাসের উপাদান ও ঘনত্ব সম্পর্কে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন লর্ড র‍্যালে। স্কটিশ রসায়নবিদ উইলিয়াম রামজির সাথে যৌথভাবে তিনি আবিষ্কার করেছেন নিষ্ক্রিয় গ্যাস আর্গন। এজন্য ১৯০৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন লর্ড র‍্যালে, এবং রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন উইলিয়াম রামজি। সেই ১৯০৪ সালের নোবেল পুরষ্কারের সাত হাজার পাউন্ড (বর্তমানের দশ লক্ষ পাউন্ড) পুরোটাই তিনি দান করে দিয়েছিলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে। পাঁচ হাজার পাউন্ড দিয়েছিলেন ক্যাভেন্ডিস ল্যাবের উন্নয়নের জন্য, বাকি দুই হাজার পাউন্ড দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির জন্য। 

পৃথিবীর আকাশ নীল কেন – এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর প্রথম দিয়েছিলেন লর্ড র‍্যালে। আজ আমরা সবাই জানি বাতাসের ধূলিকণার সাথে আলোর স্ক্যাটারিং বা বিক্ষেপনের কারণে আকাশে নীল রঙ বেশি ছড়িয়ে পড়ে বলে দিনের বেলা আকাশ নীল থাকে। এই স্ক্যাটারিং – র‍্যালে স্ক্যাটারিং নামে পরিচিত। 

ব্ল্যাক-বডি রেডিয়েশন বা কালো পদার্থের বিকিরণ সংক্রান্ত র‍্যাইলে-জিনস সূত্র আবিষ্কৃত হয়েছে ১৮৮৯ সালে। মূলত এই সূত্র থেকেই ১৯০১ সালে ম্যাক্স প্ল্যাংক আলোর কোয়ান্টাম তত্ত্বের ধারণা পেয়েছেন। সে হিসেবে বলা চলে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সূচনা হয়েছে র‍্যালের আবিষ্কার থেকে। 

অণুবীক্ষণ, দূরবীক্ষণ, প্রিজম ইত্যাদি আলোকসংবেদী যন্ত্রপাতির রিজলভিং পাওয়ার সংক্রান্ত র‍্যালের আবিষ্কারের ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে আলোকবিজ্ঞানের কারিগরি দিক। মাইক্রোস্কোপের সাহায্য এত ছোট বস্তু কীভাবে এত বড় আকারে দেখা যায়, কিংবা টেলিস্কোপের সাহায্যে এত দূরের গ্রহ-নক্ষত্র কীভাবে এত কাছে দেখা যায় – অর্থাৎ এসব সূক্ষ্ম আলোকসংবেদী যন্ত্রপাতিতে কীভাবে ছবি তৈরি হয় – সে সংক্রান্ত প্রথম তত্ত্ব দেন লর্ড র‍্যালে। 

বৈজ্ঞানিক সংগঠক হিসেবেও পদার্থবিজ্ঞানের অনেক উন্নয়ন ঘটিয়েছেন লর্ড র‍্যালে। ১৮৮৫ থেকে ১৮৯৬ পর্যন্ত তিনি রয়েল সোসাইটির সেক্রেটারি এবং ১৯০৫ থেকে ১৯০৮ পর্যন্ত রয়েল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন লর্ড র‍্যালে। ১৮৮২ থেকে ১৯০৫ পর্যন্ত রয়েল ইন্সটিটিউশানের ন্যাচারাল ফিলোসফির চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। ১৯০৮ সাল থেকে ১৯১৯ সালে তাঁর মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। 

এত আবিষ্কার, সম্মান, পুরষ্কার সবকিছুর চেয়েও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক হিসেবে নিজের কাছে ভালোলাগা। তিনি সারাজীবন গবেষণা করে গেছেন নতুন কিছু জানার প্রতি ভালোবাসা থেকে। ১৯১৯ সালের ৩০ জুন তাঁর মৃত্যু হয়।


তথ্যসূত্র

১। রবার্ট ব্রুস লিন্ডসে, লর্ড র‍্যালে দ্য ম্যান অ্যান্ড হিজ ওয়ার্ক, পারগ্যামন প্রেস, অক্সফোর্ড, ১৯৭০।

২। ব্যারি আর মাস্টার্স, লর্ড র‍্যালে অ্যা সায়েন্টিফিক লাইফ, ওপিএন জুন ২০০৯।

৩। পিটার ওয়েল্‌স, লর্ড র‍্যালে জন উইলিয়াম স্ট্রুট থার্ড ব্যারন র‍্যালে, আইইই ট্রানজেকশান, সংখ্যা ৫৪(৩), মার্চ ২০০৭। 

_______________
বিজ্ঞানচিন্তা নভেম্বর ২০২৪ সংখ্যায় প্রকাশিত







Latest Post

এলিয়েনের সম্ভাবনা ও বিজ্ঞান

  পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহ বা উপগ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ এখনো নিশ্চিতভাবে পাওয়া না গেলেও, অনেকেই বিশ্বাস করেন যে ভিন গ্রহেও প্রাণ...

Popular Posts