Saturday 27 October 2018

শতাব্দীর মোহনায় সিডনি - ৪র্থ পর্ব



'আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি, তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী, ওগো মা -।' ঘুম ভেঙে যাবার পরেও চোখ খুলছি না। মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছি। চোখ খুললে যদি স্বপ্নটা মিলিয়ে যায়, যদি হারিয়ে যায় এই অপূর্ব রবীন্দ্রনাথ! চোখ না খুলেও বুঝতে পারছি জানালা জুড়ে ভোরের আলো। ক'টা বাজলো? হঠাৎ সময়ের কথা মনে হতেই তিড়িং করে লাফিয়ে উঠে বুঝতে পারলাম আজ আর কাজে যেতে হবে না, আমি এখন ছুটিতে, স্বপনদার বাড়িতে। রবীন্দ্রসঙ্গীত ভেসে আসছে লাউঞ্জরুম থেকে।
মাত্র সাতটা বাজে। এর মধ্যেই উঠে গেছেন স্বপনদা। বাইরের ঘরে এসে দেখি তিনি বেলকনিতে টবের ফুলগাছে পানি দিচ্ছেন। নীলিমাবৌদি রান্নাঘরে। জিভে পানি আসা সুগন্ধ আসছে রান্নাঘর থেকে। মনে হচ্ছে এমন অপরূপ সকাল অনেকদিন দেখিনি।
"গুড মর্নিং প্রদীপ। চলে এসো এদিকে।" - স্বপনদা ডাকলেন বেলকনি থেকে।
বেশ প্রশস্ত বেলকনি। থরে থরে সাজানো অসংখ্য টবে ফুটে আছে নানা রকমের ফুল। এখানে দাঁড়িয়ে বাম দিকে চোখ ফেরালেই ট্রেন স্টেশন দেখা যায়। বাড়ির পাশ দিয়ে চলে গেছে সাবার্বের রেসিডেনশিয়াল রোড। এদেশে রেসিডেনসিয়াল এরিয়ায় গাড়ি চলে প্রায় নিঃশব্দে।
স্বপনদা গাছ ভালোবাসেন। শুধু গাছ কেন, সব ধরনের ভালো জিনিসই মনে হয় ভালোবাসেন এই মানুষটি। ভালোবাসার আশ্চর্য ক্ষমতা তাঁর। আজ ছুটির দিন নয়, অথচ স্বপনদা কাজে যাচ্ছেন না। আমার জন্যই ছুটি নিয়েছেন তা বুঝতে পারছি, কিন্তু তিনি তা একবারও জানতে দিচ্ছেন না আমাকে। বাগানের কাজ শেষ হতে না হতেই নীলিমাবৌদি ডাক দিলেন রান্নাঘর থেকে।
রান্নাঘরের পাশেই ডাইনিং টেবিল। টেবিলে সাজানো ব্রেকফাস্টের আয়োজন দেখে আমার চোখ কপালে উঠে যাবার জোগাড়। নীলিমাবৌদির কি রান্নাতেও একটা পিএইচডি নেয়া আছে? কখন করলেন এত্তোসব? কাল এতদূর থেকে এত ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসার পরে একটুও বিশ্রাম না নিয়ে এতসব আয়োজন করতে লেগেছেন। আমার খুব লজ্জা লাগছে, কিন্তু কিছু বলতেও পারছি না। নীলিমাবৌদি বুঝতে পারলেন আমার অবস্থা। বললেন, "আজ সারাদিনের জন্য বেরিয়ে পড়বো। এখন ভালো করে খেয়ে না নিলে শেষে পথে কষ্ট পাবে।"
অনেকের কাছে শুনেছি, গল্প উপন্যাসেও পড়েছি - বিদেশে গেলে নাকি মানুষ বদলে যায়, যন্ত্র হয়ে যায়, কোন আন্তরিকতা থাকে না ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সেরকম কোন কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি না এখানে। বরং মনে হচ্ছে উন্নত দেশের উন্নত প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে আমাদের দেশজ সংস্কৃতিই আরো প্রাণ পাচ্ছে এই প্রবাসীদের কাছে। নাকি আমি যাদের দেখছি তাঁরা আসলেই ব্যতিক্রম।

"তোমার নিজের কোন প্ল্যান আছে ঠিক কী কী দেখতে চাও, বা কোথায় কোথায় যেতে চাও?" স্বপনদা জানতে চাইলেন।
আমার সেরকম নির্দিষ্ট কোন প্ল্যান নেই। সিডনি হারবার ব্রিজের নিউ মিলেনিয়াম ফায়ারওয়ার্ক্স দেখবো। কিন্তু সেটা তো কালকে।

"তবে আজ উলংগং-এর দিকে চলো।"
গাড়ির বুটে চিপ্‌স, সফ্‌ট ড্রিংকস আর এক ঝুড়ি ফল বোঝাই করে চেপে বসলাম স্বপনদার গাড়িতে। চালকের আসনে স্বপনদা, পাশের সিটে নীলিমাবৌদি আর পেছনে সিডনিতে নতুন আসা আমি। গাড়ি চলছে আস্তে আস্তে। ঘুরছে প্যারামাটা সাবার্বের বিভিন্ন রাস্তায়। গাড়ি চালাতে চালাতে স্বপনদা আমাকে দেখাচ্ছেন কোন্‌টা কী। আমার চোখ গাড়ির জানালায়।
এদেশের প্রত্যেকটি সাবার্ব প্রায় স্বয়ং-সম্পূর্ণ। স্কুল, শপিং সেন্টার, কমিউনিটি সেন্টার, সিনেমা থিয়েটার, জিমনেশিয়াম, সুইমিং পুল, পার্ক - কোন কিছুরই অভাব নেই। হাসপাতাল মানুষের জন্য তো আছেই, পশুদের জন্যও আছে কয়েকটা। ২০০০ সালের অলিম্পিক হবে এখানে, এই প্যারামাটায়। বেশ কাছেই সম্পূর্ণ নতুন তৈরি অলিম্পিক ভিলেজ।


সিডনি অলিম্পিক ভিলেজ। ছবি তুলেছেন: ড. স্বপন পাল

প্যারামাটা নদীর তীরে হোমবুশ বে। সিডনি সিটি সেন্টার থেকে মাত্র পনের কিলোমিটার পশ্চিমে। আজ যেখানে গড়ে উঠেছে অলিম্পিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অলিম্পিক ভিলেজ, সেখানে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ছিলো ময়লার ডিপো। শহরের সব ময়লা এনে ফেলা হতো এখানে। এখন সেখানে অলিম্পিক স্টেডিয়ামের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে একটা আধুনিক রিসাইক্লিং সেন্টার। ময়লা বিশুদ্ধকরন কারখানা। শত বছরের ময়লা যেগুলোকে সরিয়ে নেয়ার কোন উপায় নেই, সেগুলোকে পিরামিডের মতো করে জমিয়ে তার ওপর গাছ লাগিয়ে চমৎকার কৃত্রিম পাহাড় গড়ে তোলা হয়েছে। এখন পাহাড়টা দেখলে বোঝার উপায় নেই যে এটা এখানে আগে থেকে ছিল না।
প্রায় মাইল খানেক জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে খেলোয়াড় আর কর্মকর্তাদের থাকার জন্য আবাসিক এলাকা। বেশ কয়েকটা ছোটবড় স্টেডিয়াম পাশাপাশি। এই সিডনি অলিম্পিক স্টেডিয়ামে দর্শক ধারণক্ষমতা এক লাখ দশ হাজার। অলিম্পিকের ইতিহাসে এ পর্যন্ত এর চেয়ে বড় কোন স্টেডিয়াম তৈরি হয়নি। অলিম্পিক ইতিহাসের বৃহত্তম আটটি স্টেডিয়ামের কথা বিবেচনা করলে দেখা যায় সিডনির পরে ক্রমান্বয়ে আছে লস অ্যাঞ্জেলেস, সিউল, মস্কো, আটলান্টা, মুনিখ, মনট্রিয়েল ও বার্সিলোনা।


সিডনি অলিম্পিক ভিলেজে স্বপনদা ও নীলিমা বৌদি। ছবি তুলেছি আমি।


সিডনি অলিম্পিক স্টেডিয়াম তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় সত্তর কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার। বাংলাদেশের টাকায় প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। এই টাকার বেশির ভাগই অবশ্য এসেছে প্রাইভেট ফান্ড থেকে। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দিয়েছে প্রায় সাতান্ন কোটি ডলার। গোটা অলিম্পিক গেইমে খরচ হবে প্রায় পাঁচশো কোটি ডলার। বাংলাদেশের টাকায় কত হবে তা হিসেব করার কোন কারণ আছে বলে মনে হয় না। ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে কাজ শুরু হয়ে মাত্র তিন বছরের মধ্যেই এই স্টেডিয়াম তৈরি হয়ে বসে আছে। এ বছর মার্চের ছয় তারিখে এর উদ্বোধন হয়ে গেছে।


অলিম্পিক ভিলেজে সুইমিং পুলের সামনে। ছবি তুলেছেন: ড. স্বপন পাল

স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে স্বপনদা বলছিলেন স্টেডিয়াম সংক্রান্ত নানা কথা। পার্কিং লটে এখনো মিটার লাগানো হয়নি, ফলে গাড়ি পার্কিং এখনো ফ্রি। তবে কিছুদিন পর এই সুযোগ আর থাকবে না। বিরাট বিরাট হোটেল তৈরি হয়েছে অলিম্পিক ভিলেজের ভেতর। সুইমিং পুল খুলে দেয়া হয়েছে দর্শকদের জন্য। জনপ্রতি দুই ডলারের টিকেট লাগে সুইমিং পুলে সাঁতার কাটতে। এই পুলেই সাঁতার কাটবে পৃথিবীর সেরা সাঁতারুরা আর মাত্র কয়েক মাস পরেই। অস্ট্রেলিয়ান সাঁতারু ইয়ান থর্প অলিম্পিকে সোনা জিতবেই এরকম আশা করেন বেশির ভাগ অস্ট্রেলিয়ান।

অলিম্পিক ভিলেজ ট্রেনস্টেশন। ছবি তুলেছেন: ড. স্বপন পাল


দলে দলে লোক আসছে অলিম্পিক ভিলেজ দেখতে। একটা নতুন রেলওয়ে স্টেশন তৈরি করা হয়েছে। সিডনি থেকে রেল লাইন তৈরি করা হয়েছে। দিনের মধ্যে অনেক বার আসা যাওয়া করে ট্রেন সিডনি সিটি সেন্টার থেকে। কোন ট্রেনই খালি থাকে না।
স্টেডিয়ামের ডিজাইন আর গঠন দেখলে অবাক লাগে। ছাদ এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন স্টেডিয়ামের ছায়া বা চোখ ধাঁধানো সূর্যের আলো কোনটাই সরাসরি খেলার মাঠে না পড়ে। ছাদ দেয়া হয়েছে স্বচ্ছ পলিকার্বোনেটের টাইল্‌স। একেকটা টাইল্‌সের ক্ষেত্রফল দশ বর্গমিটার। স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি কাঠামো। বৃষ্টি হলেও ভয়ের কোন কারণ নেই। পুরো স্টেডিয়াম ঢেকে ফেলার মতো ছাদ আছে এই স্টেডিয়ামে। স্বাভাবিক অবস্থায় এই ছাদ খোলা থাকবে। দরকার হলে সুইচ টিপে দিলেই হলো। গ্যালারির উপর থেকে স্বচ্ছ ছাদ এগিয়ে এসে ঢেকে দেবে পুরো স্টেডিয়াম।
স্টেডিয়ামটা এত বড় যে খোলা অবস্থায় ছাদের ফাঁক দিয়ে চারটা জাম্বো জেট একসাথে নামতে পারবে পাশাপাশি। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ব্যবহার করা হয়েছে সর্বোচ্চ দক্ষতায়। পেইন্টের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ ভাবে তৈরি রঙ যাতে পরিবেশদূষণের মাত্রা সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকবে।
অলিম্পিক ভিলেজে লাগানো হয়েছে সারি সারি গাছ। অক্সিজেনের অভাব এখানে হবে না কখনো। পনেরো হাজার খেলোয়াড় আর কর্মকর্তাদের থাকার জন্য যে আবাসিক এলাকা তৈরি করা হয়েছে তার পুরোটাই সোলার এনার্জিতে চলছে। এত বিরাট আবাসিক এলাকার বিদ্যুৎ তৈরি হচ্ছে সূর্যের আলো থেকে। সিডনিতে বছরে গড়ে ৩৩৫ দিন সূর্যের আলো থাকে। অলিম্পিক শেষ হয়ে যাবার পর কী হবে এই আবাসিক এলাকার? প্রাইভেট প্রপার্টি হয়ে যাবে। যাদের টাকা আছে তারা কিনে নেবে এখানকার একেকটা বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট।
এখন থেকেই যে হারে মানুষ আসতে শুরু করেছে অলিম্পিক ভিলেজ দেখার জন্য, শুধুমাত্র ট্যুরিস্টদের কাছ থেকেই তো কয়েক লাখ ডলার আয় করতে পারবে অলিম্পিক অথরিটি অলিম্পিক শুরু হবার আগেই।

সিডনি সেন্টেনিয়েল পার্কে। ছবি তুলেছেন: ড. স্বপন পাল


স্বপনদা জানালেন তিনি অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের টিকেট পাচ্ছেন সেন্টেনিয়াল পার্কের কর্মকর্তা হবার সুবাদে। সেন্টেনিয়েল পার্ক অলিম্পিক ভিলেজের কাছেই। স্টেডিয়াম এলাকা থেকে বেরিয়ে কিছুদূর যাবার পরেই শুরু হয়েছে সেন্টেনিয়েল পার্ক। স্বপনদা এই পার্কের সায়েন্টিফিক অফিসার। পার্কের মাঝখান দিয়ে কিছুদূর যাবার পর স্বপনদা গাড়ি থামালেন। গাড়ির কাছে এগিয়ে এলো কয়েকজন তরুণ-তরুণী।
স্বপনদার সাথে তাদের কথা বলার ধরন দেখেই বুঝতে পারলাম স্বপনদা তাদের বস। বেশ হাসিমুখে কিছু নির্দেশ দিচ্ছিলেন স্বপনদা তাদের। তারা গদগদ হয়ে ইয়েস ইয়েস বলছে দেখতে আমার বেশ ভালোই লাগছিলো।
একটা মেয়ে কিছু কাগজপত্র এগিয়ে দিলো স্বপনদাকে গাড়ির জানালা দিয়ে। স্বপনদা বেশ মনযোগ দিয়ে দেখলেন আর সাইন করে দিলেন। সাইন করা কাগজটা হাতে পেয়ে মেয়েটার মুখ দেখে মনে হলো এত আনন্দ সে অনেকদিন পায়নি। হাত নেড়ে গাড়ি স্টার্ট দিলেন স্বপনদা।

"সুন্দরী মেয়েটি কে গো?"
"রোজলিন। বোটানিতে পিএইচডি করছে সিডনি ইউনিভার্সিটিতে। কিছু ডাটা কালেকশান করতে চায় আমাদের পার্কে।"
বাংলাদেশে মন্ত্রীর পাড়াতো ভাইরা নিজেদের যেরকম ক্ষমতাবান মনে করে, আমারো নিজেকে এখানে হঠাৎ সেরকম ক্ষমতাবান বলে মনে হচ্ছে। অবশ্য এদেশে মন্ত্রীর পাড়াতো ভাইতো দূরের কথা, নিজের ভাইকেও কেউ পাত্তা দেয় বলে মনে হয় না।
হাইওয়েতে উঠেই গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিলেন স্বপনদা। ঘন্টায় একশ' কিলোমিটার বেগে ছুটে চলেছে স্বপনদার বিশ্বস্ত টয়োটা। চলেছি উলংগং-এর দিকে। উলংগং সাউথ কোস্টের ছোট্ট একটা শহর। নিউ সাউথ ওয়েল্‌স-এর তৃতীয় বৃহত্তম শহর বলা হলেও সিডনির তুলনায় একটা গ্রামের সমান। ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি হিসেবে সুনাম আছে উলংগং-এর।
পাহাড়ি ইলাওয়ারা এরিয়ায় উলংগং-এর কাছেই মাউন্ট ক্যামব্লা আর মাউন্ট মেইরা। রাস্তা থেকেই দেখা যাচ্ছে পাহাড় আর সবুজ উন্মুক্ত প্রান্তর। অস্ট্রেলিয়ার প্রকৃতি যে কী অদ্ভুত সুন্দর।
উলংগং সিটির মেইন স্ট্রিট ক্রাউন স্ট্রিট। এখানে গাড়ি থামিয়ে একটা স্ট্রিট-ডাইরেক্টরি কিনলেন স্বপনদা। আমরা যাবো কায়ামা বিচের দিকে। রাস্তা ভুল করলে অনেকটা সময় নষ্ট হবে, তাই সাথে একটা ডাইরেক্টরি থাকা ভালো।
ছোট্ট শহর হলেও উলংগং বেশ সুন্দর। দুটো বিচ আছে এখানে - নর্থ বিচ আর সিটি বিচ। নর্থ বিচ সার্ফিংয়ের জন্য বিখ্যাত। সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে ভেলায় চড়ে ভেসে বেড়ানো। কাজটা দেখতে সুন্দর, কিন্তু ভয়ানক বিপজ্জনক।
দেখলাম ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকায় চড়ে বড়শিতে মাছ ধরছে অনেকে। বড়শিতে মাছ ধরার জন্যও নাকি লাইসেন্স লাগে এদেশে। পোস্ট অফিস থেকে নাকি কিনতে পাওয়া যায় এই লাইসেন্স। সমুদ্রের ধারে এসে অনেকে ছবিও আঁকে। বেশ কিছু আর্ট-গ্যালারিও আছে দেখলাম এই সৈকত শহরে।
একটু পরেই আবার চলতে শুরু করলাম আমরা। নীলিমাবৌদি কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিলেন গাড়িতে। আমি মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকাচ্ছি চারপাশে। অস্ট্রেলিয়াকে নতুন করে ভালো লাগতে শুরু করেছে।
রাস্তা আস্তে আস্তে একেঁবেঁকে যাচ্ছে। পাহাড়ি পথ শুরু হয়েছে। একপাশে প্রশান্ত মহাসাগর। মাঝে মাঝে রাস্তা চলে গেছে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে একেবারে সমুদ্রের কাছে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একটা রাস্তা ধরে চলে গেলাম অনেক ভেতরে। সেখানে দারুণ একটা পিকনিক স্পট। রেইন ফরেস্টের ভেতর ছোট্ট বিশ্রামাগার। গাড়িপার্কিং, বাথরুম, ছোট্ট রেস্টুরেন্ট সব আছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো - এখান থেকে সমুদ্রের দূরত্ব মাত্র কয়েক গজ।
পাহাড়ী রাস্তার পাশে লুক আউট। ছবি তুলেছেন: ড. স্বপন পাল

জায়গায় জায়গায় পাহাড় কেটে বেলকনির মতো করে রেলিং দেয়া আছে। সেখান থেকে নিচের দিকে তাকালে গা শিরশির করে। নিচে সাগরের ঢেউ। নিচে মানে অন্তঃত একশ' মিটার। সাগরের পানি আর আকাশ মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে এখানে। সৌন্দর্য দেখার ব্যবস্থা না থাকলে সে সৌন্দর্যের মূল্য কী? এ নিয়ে দার্শনিক বিতর্ক করা যেতে পারে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমাদের দেশের সমুদ্র পাহাড় মিলিয়ে সৌন্দর্য কম নেই, কিন্তু সেসব দেখার সুযোগ এদেশের মতো করে নেই বলেই 'এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি' আমরা কেবল মুখস্থই করতে থাকি।
কায়ামা বিচে পৌঁছাতে প্রায় একটা বেজে গেলো। সমুদ্রের ধার ঘেঁষে সৈকত ঘিরে গড়ে ঊঠেছে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, মোটামুটি আয়তনের একটা টাউনশিপ। আকাশ ঝলমল করছে। বেশ কিছু নতুন ঘরবাড়ি তৈরি হচ্ছে এদিকে। অবসরপ্রাপ্তরা অনেকেই এদিকে বাড়ি কিনে বাস করতে পছন্দ করছেন আজকাল।
বাঁধানো সাগরপাড়ে ক্যারাভানের সারি। ক্যারাভান - গাড়ি কাম বাড়ি। অনেকে নিজেদের ক্যারাভান নিয়ে এখানে এসে কাটিয়ে যায় কয়েকদিন। ক্যারাভান ভাড়াও পাওয়া যায় এখানে। পার্কিং লটে গাড়ি থামালেন স্বপনদা।
গাড়ি থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করলাম সাগরের পাশ ঘেঁষে বাঁধানো রাস্তা ধরে। অনেকেই পায়ে চাকাওয়ালা জুতো পরে সাঁ সাঁ করে চলে যাচ্ছে আমাদের পাশ কাটিয়ে।
রাস্তার পাশেই সবুজ ঘাসের লন। সেখানে রোদচশমা লাগিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে সারি সারি মানুষ। তাদের পরনে সামান্য একটু নেংটি ছাড়া আর কিছুই নেই। উলংগং-এর এই বিচে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হবার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা না থাকলে বোধহয় এই নেংটিটুকুও অবশিষ্ট থাকতো না। আমারও রোদচশমা নিয়ে আসা উচিত ছিলো। কালো চশমাটা রোদের পাশাপাশি চক্ষুলজ্জা নিবারণের কাজও করতে পারতো।
স্বপনদা হঠাৎ ঘাসের উপর শুয়ে পড়ে হাত-পা শূন্যে ছুড়তে লাগলেন। আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে তাকাতেই নীলিমাবৌদি বললেন, "ব্যায়াম করছে। অনেকক্ষণ একনাগাড়ে গাড়ি চালিয়েছে তো।"
আমি আশ্বস্ত হলাম। স্বপনদা যেভাবে ঘাসে শুয়ে হাত পা ছুড়ছেন, বাংলাদেশ হলে লোক জমে যেতো। মৃগিরোগী মনে করে জুতো শুঁকোতেও আসতো হয়তো। কিন্তু এখানে কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না। স্বপনদার হাতছোঁয়া দূরত্বে যে মহিলাটি শুয়ে আছেন কালো চশমায় চোখ ঢেকে, তিনিও মনে হয় একবারও তাকাননি স্বপনদার দিকে।

কায়ামা বিচের কাছে ব্লো হোল। ছবি তুলেছেন: ড. স্বপন পাল
একটু পরে শেষ হলো স্বপনদার ব্যায়ামপর্ব। কিছুদূর যাবার পর দেখা গেলো একটা জায়গা থেকে একটু পর পর প্রবল বেগে পানি উঠে যাচ্ছে আকাশের দিকে। এই সেই বিখ্যাত ব্লোহোল। প্রায় একশ' ফুট ব্যাসার্ধের একটা গর্ত এখানে। সাগরের পানি ঢেউয়ের সাথে এখানে এসে পড়ে আর গর্ত দিয়ে সবেগে উঠে যায় আকাশের দিকে প্রায় দুশো ফুট। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক শক্তিতেই এই প্রক্রিয়া চলে। বেশ আকর্ষণীয় এই প্রক্রিয়া। দেখার সুবিধার জন্য জায়গাটা লোহার রেলিং দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। খুব কাছে গেলে নিচে পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে বলে একটা সীমানার পরে আর যেতে দেয়া হয় না কাউকে। খুব বেশি সাহস দেখাতে গিয়ে কেউ কেউ নাকি মারাও গেছেন এখানে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম ব্লোহোলের সৌন্দর্য।
সাগরের স্বাস্থ্যকর হাওয়ার কারণেই হয়তো, ক্ষিধে পেয়ে গেলো খুব। গাড়ি নিয়ে ফেরার পথে কে-এফ-সিতে ঢুকে খেয়ে নিলাম একপেট। এদেশের হাইওয়েতে ফাস্টফুডের অভাব নেই। খাবারের মানও বেশ ভালো আর দামও কিছু বেশি নয়।
ফেরার পালা এবার। ফেরা মানে উলংগং এর দিকে ফেরা। উলংগং এর কাছে একটা বৌদ্ধ মন্দির খুব বিখ্যাত। রাস্তা থেকে একটু ভিতরের দিকে বিরাট এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে এই বৌদ্ধ মন্দির। ফকুয়ানসাং নান টিয়েন টেম্পল। ইন্দোনেশিয়ান এক বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ী মিলিয়ন ডলার খরচ করে এখানে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। মন্দিরের পার্কিং লটে গাড়ি পার্ক করে স্বপনদা আর মন্দিরের ভিতরে যেতে রাজি হলেন না। তিনি আগে এই মন্দির দেখেছেন বলে এখন একটু ঘুমিয়ে নিতে চাইলেন। আমি আর নীলিমা বৌদি চললাম মন্দিরের ভেতর।


ফকুয়ান্সাং নান টিয়েন টেম্পল। ছবি তুলেছেন: ড. নীলিমা পাল
চমৎকার ফুলের বাগান ঘেরা প্রশস্ত সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠে যেতে হয় মন্দিরের প্রধান চত্বরে যাবার জন্য। পাহাড়ের উপর মূল মন্দির। বৌধমন্দিরগুলো খুব গাঢ় রঙে রাঙানো থাকে কেন জানি না। বেশ উজ্জ্বল। এখানে যারা আসেন সবাই খুব ধার্মিক এটা ভাবার কোন কারণ নেই। মন্দিরটা খুব সুন্দর বলেই দেখতে আসেন অনেকে। অনেক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছেলেমেয়ে থাকে এখানে। মন্দিরে কাজ করার বিনিময়ে থাকতে আর খেতে পায়। কিছু শিক্ষাও নাকি পায়, তবে সেই শিক্ষা কেবল ধর্মীয় শিক্ষা বলেই মনে হলো আমার।
ফকুয়ান্সাং নান টিয়েন টেম্পল। ছবি তুলেছেন: ড. নীলিমা পাল

মন্দিরের ভিতরের চত্বরে ঢুকতে হলো জুতা খুলে। ভিতরের স্থাপত্য মাথা ঘুরিয়ে দেবার মত সুন্দর। ছবি তোলা নিষেধ এখানে। চমৎকার একটি মিউজিয়াম আছে মন্দিরের ভিতর। নানারকম বৌদ্ধমূর্তিতে ঠাসা এই মিউজিয়াম। মিউজিয়ামে ঢোকার জন্য একটা প্রবেশমূল্য দিতে হয়। অহেতুক ভিড় কমাবার জন্যই হয়তো এই ব্যবস্থা। ছোটবড় মোটাপাতলা অনেক পাথরের বুদ্ধ থরে থরে বসে আছেন প্রদর্শনী হয়ে। পাথরের হলেও এদের উপার্জন মনে হচ্ছে অনেক সুস্থ-সবল মানুষের চেয়ে বেশি। প্রত্যেকটা মূর্তির সামনে আশেপাশে হাতে-পায়ে পড়ে আছে অসংখ্য ডলার, মুদ্রায় আর নোটে। ঘুষ প্রথাটা হয়তো অত্যন্ত পুরোনো একটা প্রথা। মানুষ দেবতাদের টাকা পয়সা দিয়ে হলেও সন্তুষ্ট রাখতে চায়। দেশে থাকতে ট্রেনে কালুরঘাট ব্রিজ পার হবার সময় দেখেছি অনেকে পকেট থেকে পয়সা বের করে কপালে ঠেকিয়ে ফেলে দিচ্ছে কর্ণফুলিতে। এই পয়সা ভালো কাজে চাইলে কেউ দেবে না। নীলিমা বৌদিও দেখলাম একটা মূর্তির সামনে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে ব্যাগ খুলে কিছু কয়েন বের করে ছুঁড়ে দিলেন। বিনিময়ে কী চাইলেন কে জানে।
বিকেল পাঁচটায় মন্দিরের গেট বন্ধ হয়ে যায়। আমরা পাঁচটা বাজার কিছুক্ষণ আগে বেরিয়ে এলাম। মন্দিরের পাশে বেশ বড় একটা পদ্মবন আছে। সেদিকে ঘুরে দেখলাম কিছুক্ষণ। মন্দিরের বাইরেও বেশ কিছু বুদ্ধমূর্তি আছে। গৌতম বুদ্ধ নিজেকে কখনো ভগবান বলেননি, ভগবানে তাঁর বিশ্বাস ছিলো না। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা গৌতমকেই ভগবান বানিয়ে ফেলেছেন। গৌতম বলেছেন যে রকম কাজ সে রকম ফলের কথা। আর বর্তমানে অনেক বৌদ্ধ কাজের উপর নির্ভর না করে গৌতমের কাছে সব কিছু চাইতে শুরু করেছেন। মন্দিরের শ্রমণ আর ভিক্ষুদের শারীরিক স্থুলতা দেখলে মনেই হয় না এঁরা কোন ধরনের বৈরাগ্যের ভিতর দিয়ে যাচ্ছেন।
স্বল্পমেয়াদী ঘুম থেকে উঠে স্বপনদার চায়ের তৃষ্ণা পেয়ে গেলো। বললেন, "চলো, সুধীর স্যারের বাসা থেকে চা খেয়ে আসি।"
"চলো, তবে শুধু চা খেয়ে তুমি আসতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না" - নীলিমাবৌদির মন্তব্য।
"যাবো, এক কাপ চা খাবো, আর চলে আসবো" - বলতে বলতে গাড়ি চালু করলেন স্বপনদা।
সুধীর স্যার উলংগং ইউনিভার্সিটির অ্যাকাউন্টিং এর প্রফেসর। বাংলাদেশে থাকতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন। নীলিমাবৌদির সরাসরি শিক্ষক।
উলংগং-এর আবাসিক এলাকা বেশ নির্জন। মানুষজন খুব বেশি নেই। একটা রেল ব্রিজের নিচে গাড়ি পার্ক করে ছোট্ট রাস্তাটি পার হলেই সুধীর স্যারের বাড়ি। গাছপালাঘেরা খুব সুন্দর বাড়ি। নারকেল গাছ, কলাগাছ দেখে হঠাৎ বাংলাদেশের কোন বাড়ি বলে মনে হয়।

"বাড়িতে কেউ নেই? গাছে একটু জলটলও দেয় না!" বলতে বলতে স্বপনদা ঢুকে গেলেন বাড়ির পেছনের দিকের উঠানে। তাঁর পেছনে আমি, সাথে নীলিমাবৌদি।
সুধীর স্যার উঠানে একটা চেয়ারে বসে রিসার্চ পেপার দেখছিলেন। আমাদের দেখে হৈ চৈ করে অভ্যর্থনা করতে শুরু করলেন।

"আরে জামাই, এতোদিন পরে শ্বশুরকে মনে পড়লো! এসো এসো।"
নীলিমাবৌদির সূত্রে স্বপনদা সুধীর স্যারের জামাই হলেও মনে হচ্ছে শ্বশু-জামাইয়ের সম্পর্কটা অনেকটা বন্ধুত্বের। আমার দিকেও হাত বাড়িয়ে দিলেন সুধীর স্যার।
আমাদের কথা শুনে বাড়ির ভিতর থেকে হাসি মুখে বেড়িয়ে এলেন শ্যামলী ম্যাডাম - সুধীর স্যারের স্ত্রী। শুরু হয়ে গেলো আপ্যায়ন। কে বলবে এটা বাংলাদেশ নয়! কথায় কথায় জানা গেলো শ্যামলী ম্যাডামের বাড়ি চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের আমাকে পেয়ে অনেকের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। আমি তাদের কাউকে চিনি কাউকে চিনি না। কিন্তু তাতে কি, মানুষকে আপন করে নেবার ক্ষমতা এই পরিবারের মানুষদেরও আছে।
বিরাট উঠোন জুড়ে সবজি আর ফুলের বাগান। সুধীর স্যারের বাগানের শাকসবজি সিডনির বাঙালিদের অনেকের বাড়িতেই নিয়মিত পৌঁছে যায় সিজনাল উপহার হিসেবে। কচুর ফলন দেখে বুঝতে পারছি বেশ যত্ন করেই এই বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। ইউনিভার্সিটি আর গবেষণার পর যেটুকু সময় বাকি থাকে তার সবটাই সম্ভবত বাগানে দেন সুধীর স্যার। স্বপনদার 'এক কাপ চা খেয়ে চলে যাওয়া' আর হলো না। চায়ের আগে বিয়ার খাওয়া হলো। আমার বিয়ারও ভালো লাগে না শুনে একটু অবাক হলেও খুশি হলেন সুধীর স্যার।  বললেন, "তুমি ভাগ্যবান এ ব্যাপারে। এসব জিনিস একবার ভালো লেগে গেলেই মরেছো।"
সুধীর স্যার চমৎকার রাঁধেন। এক ঘন্টার মধ্যে তৈরি করে ফেললেন পাঁচটা তরকারি। তরকারির সংখ্যা পাঁচ না হলে নাকি অতিথি আপ্যায়ন সম্পূর্ন হয় না। আর অতিথি নাকি আমি, বাকি দু'জন ঘরের মানুষ। ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচু শাক, আরো মজার সবজি, দু'রকম মাছ, মাংস। মনে হচ্ছে সুধীর স্যারের হাতে রান্নার জাদু আছে। শ্যামলী ম্যাডাম আমাদের সাথে বসে গল্প করতে করতেই সুধীর স্যারের রান্না শেষ হয়ে গেলো।
শ্যামলী ম্যাডাম সমরেশ মজুমদারের সাতকাহন পড়ছেন এখন। সেটা নিয়ে আলাপ হলো কিছুক্ষণ যে আলাপে আমিও যোগ দিতে পারলাম। ঘরের ভিতর এক পর্যায়ে মনেই হচ্ছিলো না যে আমারা বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরের কোন দেশে আছি।
পরিচয় হলো পাপাই আর শর্মিলার সাথে। সুধীর স্যার আর শ্যামলী ম্যাডামের ছেলেমেয়ে। পাপাই আগামী বছর এইচ-এস–সি দেবে, আর শর্মিলা ক্লাশ ফোরে এখন। বেশ প্রাণবন্ত ছেলেমেয়ে। সুধীর স্যারের একটা অফার এসেছে সিডনি ইউনিভার্সিটি থেকে। এখন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন সেখানে যাবেন নাকি এখানেই থাকবেন। এইরকম সিদ্ধান্ত নিতে একটু সময়তো লাগেই। সেই সময়টা নিচ্ছেন এখন সুধীর স্যার।
সমুদ্রের গর্জন শোনা যাচ্ছে। এইদিকে খুব সুন্দর একটা বেলাভূমি আছে। সেটা না দেখে ফিরে যেতে ইচ্ছে করলো না। সামান্য একটু হাঁটলেই সাগরের পাড়। আবছা অন্ধকারে সাগর দেখতে দারুণ লাগছিলো। এখন জোয়ারের সময়। বড় বড় ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে পায়ের কাছে, আর তৃষ্ণার্থ বালি তা শুষে নিচ্ছে নিমিষেই।
কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ। সাগরের সম্মোহনী শক্তির কাছে হয়তো আমরা কিছুক্ষণের জন্য পরাজয় বরণ করে নিয়েছি। আকাশে লক্ষ লক্ষ তারার মেলা। চাঁদ নেই একটুও। তারার আলোতেই দেখা যাচ্ছে সামনের বিশাল সাগর। দিনের আলোর নীল পানি এখন কুচকুচে কালো। কেমন মন উদাস করে দেয়া একটা পরিবেশ।
চলে এলাম একটু পরে। আমরা গাড়িতে আর সুধীর স্যার চললেন বাড়িতে। গাড়িতে খুব একটা কথা হলো না আর। সবাই খুব টায়ার্ড বুঝতে পারছি। কেমন যেন ঘুম ঘুম লাগছে। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়লে চলবে না। কথা বলে বলে স্বপনদাকে জাগিয়ে রাখা দরকার। গাড়ি চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে পড়লে সাংঘাতিক বিপদে পড়তে হতে পারে। নীলিমাবৌদি ব্যাপারটা জানেন।
কথার পিঠে কথা চালিয়ে নেবার মোক্ষম অস্ত্র হলো ঝগড়া করা। কিন্তু কী বিষয় নিয়ে ঝগড়া করা যায়! ঝগড়া করাই যেখানে উদ্দেশ্য সেখানে বিষয় লাগে না। তেলাপোকা দিয়ে শুরু করে তিমিমাছ দিয়ে শেষ করা যায় ঝগড়া।
কিন্তু স্বপনদার সাথে খুব একটা সুবিধা করতে পারলেন না নীলিমাবৌদি। স্বপনদা কোন ভাবেই কোন প্রতিক্রিয়া দেখান না। মনে হচ্ছে স্বপনদা ঝগড়াপ্রুফ। কিন্তু তাতে কোন অসুবিধা নেই।  ভালোয় ভালোয়  বাড়ি পৌঁছে যাওয়াই উদ্দেশ্য এবং তা সফল হলো।
সারাদিন জার্নিতে সবাই বেশ টায়ার্ড যে হয়েছি তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বাসায় এসে টিভি খুলে জানতে পারলাম ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের একটা বিমান হাইজ্যাক করা হয়েছে।

[৫ম পর্ব পড়ার জন্য ক্লিক করুন এখানে]
___________________
এ কাহিনি আমার 'অস্ট্রেলিয়ার পথে পথে' বইতে প্রকাশিত হয়েছে।


No comments:

Post a Comment

Latest Post

The World of Einstein - Part 2

  ** On March 14, 1955, Einstein celebrated his seventy-sixth birthday. His friends wanted to organize a grand celebration, but Einstein was...

Popular Posts