Tuesday 30 October 2018

শতাব্দীর মোহনায় সিডনি - ৭ম পর্ব



হোটেলের ভাড়ার সাথে কন্টিনেন্টাল ব্রেকফাস্ট ইনক্লুডেড। বিছানায় শুয়ে শুয়ে দেখছিলাম হোটেলের নিয়ম কানুন লেখা কাগজটা। ব্রেকফাস্ট খেতে চাইলে ন'টার ভিতর যেতে হবে ডাইনিং হলে। পোশাকের ব্যাপারে লেখা আছে অবশ্যই জুতো পরে যেতে হবে। আর কিছু লেখা নেই পোশাক সম্পর্কে। অস্ট্রেলিয়ানরা পোশাকের ব্যাপারে মোটেই খুঁতখুঁতে নয়। এখানে কেন যে জুতোর কথা লিখেছে জানি না। কোন জামাকাপড় ছাড়া শুধুমাত্র পায়ে জুতো গলিয়ে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে হাজির হলে কেমন হয়? আইনত কোন অসুবিধা নেই, কিন্তু সভ্যতার সব নিয়ম তো আর লিখে দিতে হয় না। এখন বাজে সাড়ে আটটা। নটার ভিতরে ডাইনিং রুমে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ছুটির দিনে শুধুমাত্র ফ্রি ব্রেকফাস্ট করার জন্য কেউ এত তাড়াতাড়ি উঠবে না ঘুম থেকে। আসলে উইকডেতে এখানে যারা আসে বেশির ভাগই আসে প্রশাসনিক বা বাণিজ্যিক প্রয়োজনে। তাদের জন্য রেডি ব্রেকফাস্ট খুবই জরুরি।
হোটেল রুমটা বেশ সুন্দর করে সাজানো।  কাল রাতে এত সব চোখে পড়েনি। জানালার পর্দা সরিয়ে দিতেই দিনের আলোয় ভরে গেলো সারাঘর। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে ক্যাপিটাল হিল। যেখানে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস। বাংলাদেশের হাই কমিশনও সেখানে। অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পার্লামেন্ট দেখতে যেতে হবে সেখানে।
সিডনি ফিরে যাবার বাসের টিকেট করা আছে সাড়ে বারোটায়। হাতে কয়েক ঘন্টা সময় আছে ঘুরে বেড়ানোর। রেডি হয়ে হোটেলের চাবি জমা দিয়ে বের হয়ে গেলাম। পা রাখলাম অস্ট্রেলিয়ার রাজধানীতে। চোখের সামনে উড়ছে অস্ট্রেলিয়ান পতাকা। ক্যাপিটাল হিলে পার্লামেন্ট হাউজের উপর থেকে উড়ছে পতপত করে।
ছোট্ট শহর ক্যানবেরা। মাত্র তিন লাখ মানুষের বাস এখানে। দু'হাজার চারশ’ স্কয়ার কিলোমিটারের ছোট্ট টেরিটরি। এ-সি-টি বা অস্ট্রেলিয়ান ক্যাপিটাল টেরিটরি। নিউ সাউথ ওয়েলস ষ্টেটের মাঝখানে এই টেরিটরিতে সম্পূর্ণ পরিকল্পিত এই রাজধানী শহর। ক্যানবেরা সিটির চারপাশে একটা কৃত্রিম হ্রদ, নাম লেক বার্লি গ্রিফিন।
অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রফলের সাথে তুলনা করলে ক্যাপিটাল টেরিটরিকে একটা বিন্দুর মতো মনে হবে। উত্তর দক্ষিণে মাত্র ৮৮ কিলোমিটার লম্বা আর পূর্ব পশ্চিমের দূরত্ব মাত্র ত্রিশ কিলোমিটার। এই শহরের প্রায় সবকিছুই পূর্ব পরিকল্পিত। এখানকার প্রত্যেকটি গাছও নাকি পরিকল্পনা মতো লাগানো। এ সিটির শতকরা চল্লিশ ভাগ জায়গা জুড়ে আছে ন্যাশনাল পার্ক। মুরামব্রিজ নদী বয়ে গেছে শহরের দক্ষিণ পূর্ব দিক থেকে উত্তর পশ্চিম দিকে। ক্যাপিটাল হিলকে কেন্দ্র করে শহরের বিভিন্ন অঞ্চল গড়ে উঠেছে অর্ধচন্দ্রাকৃতিতে। এলাকার নামও তাই নানারকম ক্রিসেন্ট। ঝলমলে সূর্যের আলোয় এত সবুজ ভরা ক্যানবেরা দেখে বোঝাই যায় না যে এখানের সমস্ত প্রাকৃতিক দৃশ্যকেও মানুষের শাসনে বেড়ে উঠতে হয়েছে।
ক্যানবেরার বয়স এখনো একশ বছরও হয়নি। ১৯০১ সালে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন গঠিত  হবার পরে একটা ন্যাশানাল ক্যাপিটাল তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সমস্যা হলো কোথায় হবে তা নিয়ে। মেলবোর্ন চায় তাদের ওখানেই হোক, আর সিডনি চায় তাদের শহরেই  হোক ফেডারেল ক্যাপিটাল। শেষ পর্যন্ত ১৯০৮ সালে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো মেলবোর্ন বা সিডনি কোথাও না হয়ে এই দুই শহরের মাঝামাঝি কোন জায়গায় হবে রাজধানী শহর।
শহরের ডিজাইন করার জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হলো। প্রতিযোগিতায় জিতলো একজন আমেরিকানের ডিজাইন। আমেরিকান স্থপতি ওয়ালটার বার্লি গ্রিফিনের ডিজাইন অনুসারে গড়ে তোলা হয়েছে এই ক্যানবেরা শহর। নতুন শহরের নাম কী হবে তা নিয়েও কম বিতর্ক হয়নি। ১৯২৭ সালে নাম ঠিক করা হয় ‘ক্যানবেরা’। আদিবাসীদের শব্দ ক্যানবেরা যার অর্থ হলো মিটিং প্লেস বা সম্মিলন ক্ষেত্র। 
ক্যানবেরার বেশির ভাগ স্থাপনা তৈরি হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। ১৯৪৬ সালে গড়ে উঠেছে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম সারির ইউনিভার্সিটি অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশানাল ইউনিভার্সিটি। সেই হিসেবে বেশ নতুন বলা চলে এই শহরটাকে।

পার্লামেন্ট হাউজের সামনে

পার্লামেন্ট হাউজের কাছে এসে অভিভূত হয়ে গেলাম। প্রথমেই চোখ যায় চার পায়ের উপর দাঁড়ানো বিরাট ফ্ল্যাগস্ট্যান্ডের ওপর। জাতীয় পতাকাকে সবচেয়ে বেশি সম্মান দেখানো হয় এখানে। তবে এই সম্মান একেক জনের কাছে একেক রকম। জাতীয় পতাকার রঙে এরা অন্তর্বাসও তৈরি করে।
অনেক ট্যুরিস্ট এসে গেছে এর মধ্যেই। দর্শকদের জন্য সপ্তাহের সাত দিনই খোলা থাকে এই পার্লামেন্ট হাউজ, সকাল নয়টা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত। গেট দিয়ে ঢুকতেই বেশ কয়েকজন সিকিউরিটি অফিসার দাঁড়িয়ে। তাদের দেখে ভয় পাবার কথা হলেও তারা কেউ ভয়ানক দর্শক নয়। বেশ হাসি খুশি। সিকিউরিটি অফিসারদের হাসিখুশি দেখলে তাদের কর্মক্ষমতা সম্পর্কে খুব একটা ভালো ধারণা হয় না। কিন্তু আমার ধারণা নিয়ে তারা কেউ খুব একটা বিচলিত বলে মনে হলো না। হাসি মুখেই ওয়েলকাম জানালো আমাকে।
সিকিউরিটি ইউনিটে একটা মেটাল ডিটেক্টরের ভিতর দিয়ে যেতে হয় সবাইকে আর সাথের সব জিনিসপত্র চালান করে দিতে হয় স্ক্যানারের ভিতর দিয়ে। খুব সহজ যান্ত্রিক ব্যবস্থা। এটাই একমাত্র প্রবেশপথ সাধারণের জন্য। আর কোথাও কোন চেকিং এর ব্যবস্থা নেই। গাইড আছে প্রায় প্রত্যেক ঘরেই। কিছু জানাতে চাইলে ঝটপট করে বলে দিচ্ছে। ভিতরের প্রত্যেকটা ঘরেই যাওয়া যায়। বেশ সুন্দর সাজানো গোছানো।
এই পার্লামেন্ট হাউজের বয়স মাত্র বারো বছর। ১৯৮৮ সালে তৈরি হয়েছে এই ভবন। ইতালিয়ান স্থপতি রোমালডো জিউরগোলা এই ভবনের ডিজাইন করেছেন। বার্লি গ্রিফিন লেকের ঠিক দক্ষিণ পাড়েই এই পার্লামেন্ট হাউজ। সবুজ পাহাড়ের চূড়োয় বসে আছে এক টুকরো ছবির মতো।
পার্লামেন্ট হাউজের ভিতর অসংখ্য পেইন্টিংস। সবগুলিই অস্ট্রেলিয়ান শিল্পীর আঁকা। সিনেট হল, পার্লামেন্ট হল সব ঘুরে ঘুরে দেখালাম। যখন পার্লামেন্ট অধিবেশন চলে তখনো নাকি দর্শক এসে দেখতে পারে। এদেশের এমপিরা সম্ভবত জনগণকে খুব একটা ভয় পায় না। অথবা জনগণকে খুব বেশি আলাদা মনে করে না। জনগণ যে এদেশের কাউকেই ছেড়ে কথা কয় না।

সিনেট হাউজ

অস্ট্রেলিয়ান নাগরিকদের জন্য ভোট দেয়া বাধ্যতামূলক আর এদেশের সরকারের মেয়াদ তিন বছর। পার্লামেন্ট হাউজের তিন তলায় বিরাট একটা আর্ট গ্যালারিও আছে আর আছে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস সম্বলিত ছবির প্রদর্শনী। ইতিহাসকে এরা আড়াল করে না। মনে হয় ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়ার মানসিকতাও আছে এই জাতির।
পার্লামেন্ট হাউজ থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যাওয়া যায় বার্লি গ্রিফিন লেকের পাড়ে। এই লেক কাটা হয়েছে ১৯৬৩ সালে। মুলুংগুলু নামে একটা নদী ছিলো আগে এখানে। নদীটি মরে যায় প্রবাহ না থাকায়। তখন নগর কর্তৃপক্ষ এই লেক কাটার ব্যবস্থা করে। শহরের স্থপতি বার্লি গ্রিফিনের নামে নামকরণ হলো এই হ্রদের। লেকের চারপাশে বাঁধানো পাড়ে সাইকেল চালানো যায়, স্কেটিং করা যায়। ইচ্ছে করলে হেঁটে পার হওয়া যায় পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার পথ।
হ্রদের স্বচ্ছ পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে ছোট ছোট নৌকা। ভাড়া করা যায় ঘন্টা হিসেবে। পানিতে ভেসে বেড়াতে ইচ্ছে হলে একটা নৌকায় চড়ে বসলেই হলো। হ্রদের মাঝখানে এক জায়গায় ক্যাপ্টেন কুক মেমোরিয়াল ওয়াটার জেট। এখান থেকে শূন্যে পানি উঠে যাচ্ছে প্রায় দেড়শো মিটার। সূয্যের আলোয় হীরক কুচির মতো ঝরে পড়ছে এই জেটের পানি।
হাতের সময় দ্রুত শেষ হয়ে গেলো। চলে এলাম বাস টার্মিনালে। সাড়ে বারোটার বাস সাড়ে বারোটাতেই ছাড়লো। এই বাস আসছে মেলবোর্ন থেকে। এখানে যাত্রী নামিয়ে সিডনিগামী যাত্রীদের তুলছে। আমার সিট একদম পেছনের দিকে। আবার চলছি সিডনির দিকে। এবার সিডনি শহরকে দেখতে হবে নিজের মতো করে।
চার ঘন্টা লাগলো সিডনি পৌঁছাতে। পথে একবারও থামেনি বাস। সিডনি শহরে ঢোকার সময় একটু রোদ ছিলো আকাশে। কিন্তু বাস থামতে না থামতেই বৃষ্টি নেমে এলো। প্রথমে এক দুই ফোঁটা, একটু পরেই অঝোর ধারায়। আকাশ আলকাতরা হয়ে আছে। এই বৃষ্টি কখন থামবে জানি না। হোটেল খুঁজতে হবে রাতে থাকার জন্য।
সেন্ট্রাল স্টেশনের কাছে একটা ব্যাকপ্যাকার হোস্টেল আছে। কিন্তু কোন সিট খালি নেই। আরো কয়েকটা হোটেলে ফোন করে দেখলাম। ছোট বড় সব হোটেলেই ক্রেডিট কার্ড চায়। আমার কোন ক্রেডিট কার্ড নেই। সুতরাং আমার কোন আইডেন্টিটি নেই বড় হোটেলে থাকার জন্য। উঠতে হবে ব্যাকপ্যাকার্স হোস্টেলে।
কিংস ক্রস অ্যারিয়া হলো ব্যাকপ্যাকারদের স্বর্গরাজ্য। অনেকগুলো ব্যাকপ্যাকার্স হোস্টেল আছে এখানে। বিছানা থেকে শুরু করে সব কিছু প্যাক করে পিঠে নিয়ে যারা ঘুরে বেড়ায় তাদের জন্য কম খরচে থাকার ব্যবস্থা থাকে বলেই তা ব্যাকপ্যাকার্স হোস্টেল। বৃষ্টি ধরে এসেছে একটু। কয়েক ফোঁটা যা ঝরছে এখনো, তাকে খুব একটা পাত্তা দিলাম না। রেইনকোটটা গায়ে চড়িয়ে পিঠে ব্যাকপ্যাক নিয়ে হাঁটতে লাগলাম কিংস ক্রসের উদ্দেশ্যে।
সিডনি সিটি ম্যাপ ফলো করতে কোন অসুবিধাই হচ্ছে না।  আকাশ মেঘলা হলেও আলোর অভাব নেই কোথাও। রাস্তার আনাচে-কানাচে আলো। পার্কের মাঝখানে পায়ে চলার পথে আলো। আক্ষরিক অর্থেই আলোয় ভুবন ভরা। কিংস ক্রস এলাকায় এসেই বুঝতে পারলাম কত ব্যস্ত আর মনোহারি এলাকা এটা। রাস্তায় প্রচণ্ড ভিড়। বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে আবার। কিন্তু ফুটপাতে শেড দেয়া আছে।
রাস্তার ধারেই একটা ব্যাকপ্যাকার্স চোখে পড়লো। দোতলায় রিসেপশান। ম্যানেজার ইন্ডিয়ান, নাম ভিক্টর। আমি জায়গা পেলাম ওয়ান সি রুমে। ছয়জনের একটা রুমে একটা সিট খালি আছে। চাবি নিয়ে রুমে ঢুকলাম। ছয়জনের জন্য তিনটা দোতলা বিছানা। চট্টগ্রামের স্টেশন রোডে কিছু ঢালাও বিছানার হোটেল আছে। সারি সারি বিছানা পাতা। ঘুমানোর জন্য বিছানা ভাড়া দেয়া হয়, রুম নয়। এখানেও সেরকম। ছয়জনের জন্য একটা বাথরুম, ঘরের ভিতরেই আছে। ফলে রুম থেকে বেরোবার দরকার নেই। টেলিভিশন ফ্রিজ সবকিছু আছে। এত কম ভাড়ায় এর চেয়ে বেশি আশা করা উচিত নয়। তাছাড়া বেড়ানো যেখানে মূল উদ্দেশ্য সেখানে হোটেলে বসে তো কেউ সময় কাটাবে না। সামর্থ্য না থাকলে কত ধরনের যুক্তিই দেখানো যায়। আমার বেশ থ্রিলিং লাগছে।
রুমের ভিতর এই বিকেলবেলায় চার বিছানায় চার জন ঘুমাচ্ছে। তিনটে দোতলা বিছানায় একটার উপরের একটা আর অন্যটার নিচের একটা বিছানা খালি আছে। কিন্তু নিচের খালি বিছানায় একটা জ্যাকেট মেলে দেয়া, আর ওপরেরটায় দুটো বই রাখা। এই দুটোর মধ্যে ঠিক কোন বিছানাটা খালি বুঝতে পারছি না। বামদিকের দেয়াল ঘেঁষে লম্বালম্বি লাগানো দুটো বিছানার একটার দোতলায় ঘুমাচ্ছে একটা মেয়ে। আমি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি এ সময় মেয়েটি চোখ খুলে বেশ স্বাভাবিক গলায় বললো, "হাই"।

"হাই, ডু ইউ নো, হুইচ সিট ইজ ভ্যাকেন্ট হিয়ার?"
"দিস ওয়ান। প্লিস টেক দিস ওয়ান।" বলেই সে উঠে বসলো বিছানার ওপর। হাত বাড়িয়ে অন্য বিছানার উপর থেকে বই দুটো টেনে নিলো নিজের বিছানায়। মেয়েটার গলার স্বর অদ্ভুত মিষ্টি।

ছেলে আর মেয়ে একই রুমে থাকাটা এদেশে খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। আমি ধীরে সুস্থে আমার লকার গুছালাম। লকারের লক ছিলো না, ম্যানেজারের কাছ থেকে তালা চেয়ে নিয়ে এলাম। তালার জন্য আলাদা দশ ডলার জমা দিতে হলো। যাবার সময় তালা ফেরত দিলে টাকা ফেরত দেবে।
লকারে ব্যাগটা রেখে সিডনি সিটির ম্যাপ নিয়ে উঠে এলাম আমার দোতলা বিছানায়। মেয়েটি দেয়ালের দিকে পা দিয়ে শুয়ে আছে। এখন আমি যদি অন্য দেয়ালের দিকে মাথা দিয়ে শুই তাহলে তার মাথায় আমার পা লেগে যাবার সম্ভাবনা আছে। সুতরাং আপাতত তার মাথার দিকেই আমাকে মাথা দিতে হচ্ছে। মনে হচ্ছে ট্রেনের বাংকে শুয়ে আছি। কয়েক মিনিট পরেই মেয়েটি আলাপ শুরু করলো।

"হাই, আয়াম সেরাহ।"
সেরাহ নামটা খুব প্রচলিত একটা নাম এখানে। বোধহয় প্রতি দশ-বিশজন মেয়ের মধ্যে একজনের নাম সেরাহ। আমরা যাকে সারা বা সারাহ উচ্চারণ করি তাই হয়ে গেছে সেরাহ। আমি আমার নাম বললাম। সে তা উচ্চারণ করার চেষ্টা করলো। এরা ‘দ’ উচ্চারণ করতে পারে না। প্রদীপ হয়ে যায় প্রাডিব।
জানা গেলো সারাহ সিডনির মেয়ে। এখানেই থাকে, পড়ে কোন একটা কলেজে। যে ছেলেরা ঘুমাচ্ছে তারা সব তার বন্ধু। ব্রিসবেন থেকে এসেছে তারা। সারাহ তাদের সিডনি শহর দেখাচ্ছে।
আমি আর দেরি করলাম না। পরে দেখা হবে বলে ছাতা আর রেইনকোট নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ঘরে বসে সময় নষ্ট করার কোন মানে হয় না।
রাস্তায় বেরিয়ে বুঝতে পারলাম ক্ষুধা লেগেছে। ম্যাকডোনাল্ডস খাব কিনা ভাবছি - চোখে পড়লো ‘ইন্ডিয়ান ক্যারি পয়েন্ট’ ঠিক রাস্তার ওপারেই।
ইন্ডিয়ান টেকওয়ে প্লেস যেরকম হয়ে থাকে সেরকম। খুব ছোট ছোট দোকান। মাত্র তিনটা টেবিল আর গোটা দশেক চেয়ার পাতা আছে। টেবিলের ওপর ময়লার আস্তরণ। কাউন্টারে তরকারি যেগুলো রাখা আছে সব আমার পরিচিত। ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে কাজ করতে করতে আমি মোটামুটি বিশেষজ্ঞ হয়ে গেছি এ ব্যাপারে।
ভাত আর একটা তরকারি নিয়ে খেতে বসলাম। প্লেটেও মনে হচ্ছে ময়লা লেগে আছে। মেজাজটা খারাপ হতে শুরু করেছে। ভাবছি যাবার সময় এই বিষয়ে কথা বলবো। হঠাৎ কাউন্টারে ছেলেটাকে টেলিফোনে বাংলায় কথা বলতে শুনে অবাক হয়ে গেলাম। কথায় ঢাকাইয়া আঞ্চলিক টান। বাংলাদেশের মানুষ পেয়ে খারাপ হয়ে যাওয়া মেজাজ আবার ভালো হয়ে গেলো। টেবিলের ময়লাকেও আর অসহ্য মনে হচ্ছে না । খুব বাজে স্বাদের রোগেনজোশকেও খুব একটা খারাপ লাগছে না।
পয়সা দেবার সময় জানতে চাইলাম, "ভাই কিছু মনে করবেন না, আপনি কি বাংলাদেশি?"
"হুঁ" - গলার ভেতর ছোট্ট একটা শব্দ করলো ছেলেটা। মনে হচ্ছে  আমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছুক নয় সে খুব একটা। আমার বাংলা কথা শুনেও তার মুখে হাসি ফুটলো না। আমি হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমার নাম বললাম। সে হ্যান্ডশেক করা বা তার নাম বলা - কোনটাই করলো না। তার চোখে-মুখে বিরক্তি।
আমি জানতে চাইলাম, "দোকানের মালিক কি ইন্ডিয়ান?"                                                               
        "না, বাংলাদেশি"
"তবে দোকানের নাম ইন্ডিয়ান কেন? বাংলাদেশি দোকান বললে বুঝি চলে না?"
আমার কথা শুনে ছেলেটা এত রেগে যাবে বুঝতে পারিনি। বেশ রাগী রাগী কন্ঠে বললো, "খাবারগুলো সব যে ইন্ডিয়ান তা চোখে দেখেন না?"
 
ইন্ডিয়ান তরকারি সম্পর্কে সে আমাকে যা বলতে চাচ্ছে তাতে আমার সন্দেহ হচ্ছে সে আদৌ কিছু জানে কিনা। তার কথা বলার ভঙ্গিতে ভদ্রতার লেশমাত্র নেই। আমার সঙ্গে বাংলাদেশি মানুষের এরকম বিতৃষ্ণ ব্যবহার এই বিদেশে আশা করিনি।
মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো, কোন রকমে সামলে নিলাম। কী দরকার! ছেলেটা হয়তো বড় কষ্টে আছে এখানে। হয়তো অবৈধভাবে আছে। কাজ করে যা পায় সব যায় উকিলের পেটে। শুনেছি এই সিডনি শহরে অনেক ছেলে অবৈধভাবে এক রুমে দশ-বারোজন গাদাগাদি করে থাকে। ঘন্টায় দু’তিন ডলার মজুরিতে কাজ করতে হয় রেস্টুরেন্টের কিচেনে বা গ্রোসারির গুদামে। বৈধ ওয়ার্ক পারমিট নেই বলে কম মজুরির জন্য কোথাও নালিশও করতে পারছে না। দেশেও চলে যেতে পারছে না। কী দরকার তার সাথে রাগারাগি করার। নিজের দেশের একজন মানুষ পেয়েও ভালভাবে কথা বলতে না পারাতে একটু কষ্ট লাগছে বৈকি।
___________________
এ কাহিনি আমার 'অস্ট্রেলিয়ার পথে পথে' বইতে প্রকাশিত হয়েছে।


4 comments:

  1. মনে হচ্ছিল আমি নিজেই এতক্ষন ক্যনবেরাতে ছিলাম, সেরাহ্ আমারই বান্ধবী হয়েছে আর বাঙ্গালী ছেলটার জন্য একটা চিনচিনে ব্যাথা হলো আমার মনের গহীনে। খুব সুন্দর সাবলীল বর্ননা করেছেন।

    ReplyDelete
    Replies
    1. অনেক ধন্যবাদ রুমানা।

      Delete
  2. মনে হচ্ছিল আমি নিজেই এতক্ষন ক্যনবেরাতে ছিলাম, সেরাহ্ আমারই বান্ধবী হয়েছে আর বাঙ্গালী ছেলটার জন্য একটা চিনচিনে ব্যাথা হলো আমার মনের গহীনে। খুব সুন্দর সাবলীল বর্ননা করেছেন।

    ReplyDelete
  3. মনে হচ্ছিল আমি নিজেই এতক্ষন ক্যনবেরাতে ছিলাম, সেরাহ্ আমারই বান্ধবী হয়েছে আর বাঙ্গালী ছেলটার জন্য একটা চিনচিনে ব্যাথা হলো আমার মনের গহীনে। খুব সুন্দর সাবলীল বর্ননা করেছেন।

    ReplyDelete

Latest Post

Memories of My Father - Part 4

  This is my first photo taken with my father. At that time, I had just moved up to ninth grade, my sister was studying for her honors, and ...

Popular Posts