Saturday 28 November 2020

বিদায় আলী যাকের


 বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটার এক সময় অত্যন্ত উঁচুমানের ছিল। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত ছিল গ্রুপ থিয়েটারের স্বর্ণযুগ। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে স্বৈরাচারী সরকারের দমনপীড়নের মধ্যেই বাংলাদেশে রচিত এবং মঞ্চায়িত হয়েছিল অত্যন্ত উঁচুমানের অনেকগুলি নাটক। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের নুরলদীনের সারাজীবন, দেওয়ান গাজীর কিস্‌সা, গ্যালিলিও -এসব নাটকের প্রধান অভিনেতা আলী যাকের ছিলেন আমার আদর্শ মঞ্চাভিনেতা। সিনেমা কিংবা টেলিভিশনের নাটকে অভিনয় করা আর মঞ্চে অভিনয় করার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। সিনেমা বা টিভির নাটকে একটি শট অসংখ্যবার দেয়া যায় - যতক্ষণ না পরিচালকের পছন্দ হচ্ছে। কিন্তু মঞ্চ এমন একটা জায়গা - যেখানে ভুল করার কোন সুযোগ নেই। এক সংলাপ দু'বার বলার সুযোগ নেই, ক্যামেরার কারসাজি নেই, সংলাপ ভুলে যাবার সুযোগ নেই। মঞ্চেই বোঝা যায় একজন অভিনেতার সত্যিকারের প্রতিভা। আলী যাকেরকে অনেকেই মনে রাখবেন টিভি নাটকের অভিনেতা হিসেবে, হুমায়ূন আহমেদের আজ রবিবার কিংবা বহুব্রীহি নাটকের অত্যন্ত জনপ্রিয় চরিত্রের মাধ্যমে। কিন্তু মঞ্চে তাঁর অভিনয় যাঁরা দেখেছেন - তাঁরা জানেন কী শক্তিমান বহুমাত্রিক অভিনেতা ছিলেন তিনি।

ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় কিছুদিন গ্রুপ থিয়েটারের কর্মী ছিলাম। সেই সময় চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে আলী যাকের মঞ্চস্থ করেছিলেন শেক্‌সপিয়ারের আলোকে রচিত 'দর্পণ'। মঞ্চের আলো নিয়ে কাজে হাত লাগানোর একটা ছোট্ট সুযোগ আমার হয়েছিল। তখন কাছ থেকে দেখেছি নাট্যনির্দেশক আলী যাকেরের কাজের প্রতি নিষ্ঠা। তাঁর একটি কথা এখনো মনে পড়ে - গ্রুপ থিয়েটার হলো এমন একটি জায়গা - যেখানে সবাই সমান, যেখানে সবার কাজই সমান গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সবাই অভিনেতা - আলাদা করে নায়ক বা নায়িকা বলে কিছু নেই। সবাই সমান ভালো অভিনয় করলেই একটা নাটক সফল হয়, সব কলাকুশলীরা সমান দক্ষতায় কাজ করলেই সাফল্য আসে।

অভিনেতা আলী যাকের আরো অনেক দুর্দান্ত চরিত্র সৃষ্টি করতে পারতেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে ২০০০ সালের পর থেকে আমাদের গ্রুপ থিয়েটারগুলি কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়েছে। আলী যাকেরের মৃত্যুতে ঝিমিয়ে পড়ার বেদনাটা আরো গাঢ় হলো।

গ্যালিলিও নাটকের দুটো সংলাপ ছিল এরকম: "দুর্ভাগা সেই দেশ, যে দেশে বীরের মর্যাদা নেই।"
"না, দুর্ভাগা সেই দেশ, যে দেশে বীরের দরকার হয়।"

আমরা আসলেই দুর্ভাগা। সব ক্ষেত্রেই আমাদের বীরের খুব দরকার হয়। বীর ছাড়া আমরা কেউই কোন কাজ করতে পারি না। মঞ্চের গ্যালিলিও - আপনি আমাদের গ্রুপ থিয়েটারের বীর ছিলেন। বিদায় বীর।

No comments:

Post a Comment

Latest Post

The World of Einstein - Part 2

  ** On March 14, 1955, Einstein celebrated his seventy-sixth birthday. His friends wanted to organize a grand celebration, but Einstein was...

Popular Posts