মহাকাশবিজ্ঞানের জগতে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়ের নাম - আর্টেমিস। আরো সুনির্দিষ্টভাবে ধরলে আর্টেমিস-২। গত এপ্রিলের এক তারিখ আমেরিকার ফ্লোরিডার সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে মহাকাশে পাড়ি দেয় আর্টেমিস-২। আকাশভরা পূর্ণিমার আলো আর কোটি কোটি মানুষের দুচোখ ভরা কৌতূহলের সামনে দিয়ে সোজা আকাশে উড়ে যায় আধুনিকতম বিজ্ঞানের চাঁদের দেবী আর্টেমিস-২। সেই থেকে বিজ্ঞানে আগ্রহীরা তো বটেই, অনাগ্রহীরাও কৌতূহলে নড়েচড়ে বসে লক্ষ্য
করেছেন ছোট্ট একটি নভোযানে চড়ে চারজন মানুষ পৃথিবীর বাইরে একেবারে চাঁদের কাছাকাছি গিয়ে কী কী করেছেন।আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে আগ্রহী মানুষ নভোচারীদের প্রতি মুহূর্তের কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ করতে পারছেন। এজন্য আমেরিকান মহাকাশ সংস্থা (নাসা) তৈরি করেছে আর্টেমিস রিয়েল-টাইম অরবিট ওয়েবসাইট (AROW) এবং অ্যাপস। এই লাইনটি যখন লিখছি – তখন আর্টেমিস মিশনের চার দিন সাত ঘন্টা পয়তাল্লিশ মিনিট কেটে গেছে। এই মুহূর্তে আর্টেমিস-২ এর নভোযান অরিয়ন ছুটছে ঘন্টায় ১৩২৪ মাইল (২১৩১ কিলোমিটার) গতিতে। পৃথিবী থেকে এই মুহূর্তে তার অবস্থান ২৩৪৮৪০ মাইল (৩৭৭৯৩৮ কিলোমিটার) দূরে, আর চাঁদ থেকে মাত্র ৩৬৫৫১ মাইল (৫৮,৮১০ কিলোমিটার) দূরে।
পাঠক যখন এই লেখাটি পড়ছেন, ততদিনে আর্টেমিস-২
অভিযান শেষ করে চারজন চন্দ্রাভিযাত্রী নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন, আর আর্টেমিস-২
তৈরি করে ফেলেছে অনেকগুলি নতুন মাইলফলক।
এবার আসা যাক অর্ধশতাব্দী পর আবার চাঁদে যাবার নতুন মিশন
আর্টেমিসের গোড়ার কথায়। চাঁদের সাথে পৃথিবীর মানুষের সম্পর্ক চিরকালীন। সাড়ে চারশ কোটি
বছর ধরে সূর্যের আলো চাঁদের গায়ে লেগে পৃথিবীতে আসছে। অথচ পৃথিবীতে মানুষের উদ্ভব হয়েছে
মাত্র তিন লক্ষ বছর আগে। যখন থেকে মানুষ চোখ মেলে আকাশের দিকে তাকাতে শিখেছে, তখন থেকেই
দেখছে দিনের বেলা সূর্য আলো দিচ্ছে, আর রাতের বেলা চাঁদ। চাঁদ যে পৃথিবীর একমাত্র চাঁদ
– আমাদের সেই জ্ঞানেরও বয়স খুব বেশি নয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানের অনেক আগেই মানুষের কল্পনার
জগত দখল করে নিয়েছে চাঁদ-সূর্যের দেবদেবী। পৃথিবীর সব দেশের লোকজ সংস্কৃতিতে চাঁদ-সুরুজের
শত শত কাহিনি প্রচারিত। গ্রিক লোককাহিনিতে অ্যাপোলো আর আর্টেমিস জমজ ভাইবোন; অ্যাপোলো
সূর্যের দেবতা, আর আর্টেমিস চাঁদের দেবী। মানুষের চাঁদে যাওয়ার সাথে অ্যাপোলো ও আর্টেমিসের
নাম জুড়ে আছে ব্যাপকভাবে।
অর্ধশতাব্দী আগে মানুষের চাঁদে যাবার প্রকল্পের নাম ছিল অ্যাপোলো।
মোট সতেরটি অভিযান চালানো হয়েছিল আপোলো মিশনের আওতায়। প্রথম মিশন অ্যাপোলো-১ উৎক্ষেপণের
সময়েই আগুন লেগে পুড়ে মারা যান তিনজন নভোচারী -গাস গ্রিসম, এড হোয়াইট এবং রজার শ্যাফি।
এরপর অ্যাপোলো-২ থেকে অ্যাপোলো-১০ পর্যন্ত – নয়বার অভিযান চালানো হয়েছে নভোচারীদের
চাঁদে নামার পথ নিরাপদ করার লক্ষ্যে। অ্যাপোলো-১১ মিশন ছিল সর্বপ্রথম সফলভাবে চাঁদে
নামার মিশন। অ্যাপোলো-১১ চাঁদে নামে ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই। নীল আর্মস্ট্রং এবং এডউইন
অলড্রিন চাঁদে নামেন। চাঁদে মানুষের প্রথম পদক্ষেপ ছিল বিজ্ঞানের উন্নতির এক বিরাট
উল্লম্ফন। সেবছরই নভেম্বর মাসে চাঁদে পৌঁছায় অ্যাপোলো-১২। চাঁদে নামেন চার্লস কনরাড
ও অ্যালেন বিন। ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো-১৩ চাঁদের উদ্দেশ্যে রওনা হলেও যান্ত্রিক গোলযোগের
জন্য চাঁদে পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু অ্যাপোলো-১৩ পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে চলে গিয়েছিল।
মানুষের পক্ষে গত ৫৬ বছর ধরে ওটিই ছিল পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ দূরত্বে পৌঁছানোর রেকর্ড।
এবার আর্টেমিস-২ সেই রেকর্ড দূরত্বও অতিক্রম করে যাচ্ছে। ১৯৭১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি চাঁদে
পৌঁছায় অ্যাপোলো-১৪। চাঁদে নামেন অ্যালেন শেপার্ড ও এডগার মিশেল। এর পাঁচ মাস পর জুলাই
মাসে চাঁদে পৌঁছায় অ্যাপোলো-১৫। চাঁদে নামেন ডেভিড স্কট ও জেমস ইরউইন। ১৯৭২ সালের এপ্রিলে
চাঁদে পৌঁছায় অ্যাপোলো-১৬। চাঁদে নামেন জন
ইয়ং এবং চার্লস ডিউক। অ্যাপোলো-১৭ ছিল মানুষের চাঁদে যাবার সর্বশেষ মিশন। ১৯৭২ সালের
১১ নভেম্বর চাঁদে নামেন ইউজিন কারনান ও হ্যারিসন স্মিট। তিন দিন দুই ঘন্টা ৫৯ মিনিট
তাঁরা চাঁদের বুকে ছিলেন সেবার। এরপর দীর্ঘ ৫৪ বছর কেটে গেছে – মানুষ আর চাঁদে পা রাখেনি।
আর্টেমিস-২র অভিযাত্রীরাও চাঁদে নামছেন না এই যাত্রায়। এবার শুধু কাছে গিয়ে দেখে আসবেন,
পরের বার ঠিকমতো নামার জন্য।
অ্যাপোলো আর আর্টেমিস জমজ ভাইবোন হলেও, অ্যাপোলো মিশন আর
আর্টেমিস মিশন হুবহু এক নয়। অ্যাপোলো মিশন ছিল মূলত চাঁদে যাবার মিশন। ছয় বার যাবার
পর সেই মিশনের লক্ষ্য পূরণ হয়ে গিয়েছিল। আর্টেমিস মিশন চাঁদে শুধু যাবার মিশন নয়, থাকারও
মিশন। এই মিশনের লক্ষ্য আরো সুদূরপ্রসারী। চাঁদের কক্ষপথে এবং চাঁদের মাটিতে স্থায়ী
মহাকাশ স্টেশন স্থাপন করার উদ্দেশ্যও আছে এই আর্টেমিস মিশনের সাথে। সেই মহাকাশ স্টেশনকে
কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর পরবর্তী প্রকল্প।
আর্টেমিস মিশনের প্রধান উদ্দেশ্য
সমতা, প্রযুক্তি, অংশীদারিত্ব, স্থায়ীত্ব, জ্ঞান এবং সম্পদ
– এই ছয়টি প্রধান উদ্দেশ্য আর্টেমিস মিশনের।
(১) সমতা: বৈষম্যহীনভাবে মহাকাশ অভিযান পরিচালনা করে
সবার নারী-পুরুষ, সাদা-কালো সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা এই মিশনের প্রধান উদ্দেশ্য।
১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত যে ছয়টি মিশনে আঠারো জন নভোচারী চাঁদের কক্ষপথে গেছেন, এবং
তাঁদের মধ্যে বারো জন নভোচারী চাঁদে নেমেছেন – তাঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ।
আর্টেমিস মিশনে নভোচারীদের মধ্যে লিঙ্গ এবং বর্ণবৈষম্য দূর করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে
এই প্রথমবার একজন নারী এবং একজন অশ্বেতাঙ্গ পুরুষ নভোচারীকে সুযোগ দেয়া হয়েছে। আর্টেমিস-২
এর চারজন নভোচারী – কমান্ডার রেইড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, মিশন স্পেশালিস্ট-১
ক্রিস্টিনা হ্যামক কোচ, এবং মিশন স্পেশালিস্ট-২ জেরেমি হ্যানসেন। ভিক্টর গ্লোভার হলেন
প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নভোচারী, এবং ক্রিস্টিনা কোচ হলেন প্রথম নারী নভোচারী যাঁরা চাঁদের
অভিযাত্রী।
(২) প্রযুক্তি: প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধন আর্টেমিস মিশনের
দ্বিতীয় উদ্দেশ্য। ১৯৬৯ সালে মানুষ যখন প্রথমবার চাঁদে যায় তখন কম্পিউটার প্রযুক্তি
ছিল অত্যন্ত সীমিত। এখনকার মতো মানুষের হাতে হাতে আধুনিক কম্পিউটার থাকা তো দূরের কথা
– কম্পিউটারের নামও তখন সাধারণ মানুষ শোনেনি। যে লুনার মডিউল ‘ঈগল’ প্রথম চাঁদে নামে
তার কম্পিউটারের মেমোরি ছিল মাত্র ৭৪ কিলোবাইট। এখনকার শিশুদের খেলনা ইলেকট্রনিক্সেও
এর চেয়ে বেশি মেমোরি থাকে। তাই ১৯৬৯-৭২ সালের চন্দ্রাভিযানের চেয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতের
চন্দ্রাভিযান প্রযুক্তির দিক থেকে অনেক বেশি উন্নত হবে সেটাই স্বাভাবিক। আর্টেমিস মিশনের
জন্য সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রকেট থেকে স্পেসস্যুট পর্যন্ত সবকিছু তৈরি করা
হয়েছে, এবং ক্রমশ উন্নততর হচ্ছে যা ভবিষ্যতে আরো দূরের মহাকাশযাত্রায় কাজে লাগবে।
(৩) অংশীদারিত্ব: আমেরিকান মহাকাশ সংস্থা নাসা এবার
অন্যান্য দেশের মহাকাশ সংস্থার পাশাপাশি অন্যান্য বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান –
যেমন স্পেস-এক্স, বোয়িং ইত্যাদির সাথে যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এই মিশন পরিচালনা
করছে। প্রথম চারজন নভোচারীর মধ্যে একজন (জেরেমি হ্যানসেন) কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির
নভোচারী। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলির সাথে
যৌথভাবে কাজ করার লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে ‘আর্টেমিস অ্যাকর্ড’। এই প্রসঙ্গে পরের
অনুচ্ছেদে আলোচনা করছি।
(৪) স্থায়ীত্ব: অ্যাপোলো মিশনের চেয়ে অনেক দীর্ঘস্থায়ী
হবে আর্টেমিস মিশনের সময়কাল। অ্যাপোলো-১৭’র নভোচারীরা সর্বাধিক তিন দিন অবস্থান করেছিলেন
চাঁদে। আর্টেমিসের চাঁদে যাবার মিশনে নভোচারীদের চাঁদের পিঠে সপ্তাহেরও বেশি সময় থাকার
পরিকল্পনা করা হয়েছে। আরো পরের আর্টেমিস মিশনে যখন চাঁদ ও পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের সম-কক্ষে
লুনার গেটওয়ে স্টেশন স্থাপন করা হবে, তখন তিন মাস পর্যন্ত নভোচারীদের চাঁদে থাকার পরিকল্পনা
করা হয়েছে।
(৫) নতুন জ্ঞান: অ্যাপোলো মিশনের পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে অনেক। এই উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে আর্টেমিস মিশনের
নভোচারীরা চাঁদের অনেক অজানা তথ্য আবিষ্কার করতে পারবেন যা এতদিন জানা সম্ভব হয়নি।
আর্টেমিস-২ এর নভোচারীরা চাঁদের উল্টোপিঠ দেখে আসবেন অনেক সময় নিয়ে, যা পৃথিবী থেকে
দেখার কোন সুযোগ নেই। চাঁদের এই পিঠে যদি পানি পাওয়া যায়, তাহলে সেই পানি তো ভবিষ্যতের
চন্দ্রাভিযাত্রীদের কাজে লাগবেই, পানির উপাদান অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন থেকে মহাকাশযানের
জ্বালানি তৈরি করাও সম্ভব হবে। এই মিশন শুধুমাত্র চাঁদে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতের
আর্টেমিস মিশন চাঁদ থেকে মঙ্গল পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
(৬) চাঁদের সম্পদ: চাঁদে পানি এবং অন্যান্য দুষ্প্রাপ্য
খনিজ সম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এই মিশন সেই সম্ভাবনার সাথে বাস্তবের সমন্বয় করতে
সক্ষম হবে। এই সম্পদকে কাজে লাগিয়ে চাঁদে স্থায়ী মহাকাশ স্টেশন তৈরি করে সেখান থেকে
ভবিষ্যতের মহাকাশ মিশন চালানোর সম্ভাবনা বাড়বে।
আর্টেমিস অ্যাকর্ড
মানুষের প্রথম পর্যায়ে চাঁদে যাবার মিশন সফল হয়েছিল মূলত
আমেরিকা ও তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের ঠান্ডা যুদ্ধের ফলে। আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের
মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দক্ষতার যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছিল তাতে মহাকাশ প্রযুক্তির
ব্যাপক উন্নতি ঘটেছিল। কিন্তু মহাকাশ অভিযান ভীষণ ব্যয়সাপেক্ষ। শুধুমাত্র একটি দেশের
পক্ষে রাষ্ট্রতহবিল থেকে এই ব্যয় মেটানো সবসময় সম্ভব হয় না। আন্তর্জাতিকভাবে পারস্পরিক
সহযোগিতার মাধ্যমে হলে প্রতিযোগিতাও সুস্থ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। চাঁদ, মঙ্গল এবং
মহাকাশের অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহে অভিযান পরিচালনা ও শান্তিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান
ও মহাকাশ ব্যবহারের লক্ষ্যে আর্টেমিস মিশনের আন্তর্জাতিক রূপদানের উদ্দেশ্যে আর্টেমিস
অ্যাকর্ড তৈরি করা হয়।
আর্টেমিস চুক্তির প্রধান শর্তগুলি হলো:
(১) মহাকাশের
শান্তিপূর্ণ ব্যবহার: মহাকাশ শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা হবে। কোনো দেশ
মহাকাশে অস্ত্র স্থাপন করবে না, এবং মহাকাশকে যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করবে না।
(২) স্বচ্ছতা:
সকল দেশ তাদের মহাকাশ মিশন, পরিকল্পনা এবং কার্যক্রম সম্পর্কে খোলামেলা তথ্য দেবে যাতে
ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ না থাকে।
(৩) পারস্পরিক
কার্যকারিতা: বিভিন্ন দেশের মধ্যে মহাকাশ অবকাঠামো ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ থাকবে
যেন একের প্রযুক্তি অন্যে ব্যবহার করতে পারে। এর মধ্যে জ্বালানি সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা,
অবতরণ অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত।
(৪) জরুরি সহায়তা:
মহাকাশে কোনো নভোচারী বা নভোযান বিপদে পড়লে সব দেশ তাকে সাহায্য করবে — সে যে দেশেরই
হোক না কেন।
(৫) মহাকাশ
সামগ্রী নিবন্ধন: মহাকাশে পাঠানো সব স্যাটেলাইট, রকেট, মহাকাশযান আন্তর্জাতিকভাবে নিবন্ধিত
থাকবে।
(৬) তথ্য ও
বৈজ্ঞানিক উপাত্তের অংশীদারিত্ব: মহাকাশ গবেষণা থেকে পাওয়া বৈজ্ঞানিক তথ্য ও উপাত্ত
সব দেশের সাথে ভাগ করা হবে, যাতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি দ্রুত হয়।
(৭) মহাকাশে
ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সুরক্ষা: মহাকাশে যেসব ঐতিহ্য স্থাপিত হয়েছে, সেগুলি সংরক্ষণ করা হবে।
চাঁদে যেমন অ্যাপোলো মিশনগুলির নামার স্থান আছে, সেগুলোকে ঐতিহাসিক ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ
করা হবে।
(৮) মহাকাশ
সম্পদ ব্যবহার: চাঁদ বা গ্রহাণু থেকে পানি, খনিজ, জ্বালানি সংগ্রহ করা যাবে, তবে তা
আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে করতে হবে। এটি মহাকাশে ভবিষ্যৎ বসতি স্থাপনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ,
তাই মহাকাশ সম্পদের অপব্যবহার করা চলবে না।
(৯) নিরাপত্তা
অঞ্চল: যদি কোনো দেশ চাঁদে বা অন্য গ্রহে কাজ করে, তাহলে সেই কাজের এলাকাকে নিরাপত্তা
অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করতে পারবে যাতে অন্য দেশ দুর্ঘটনাক্রমে সেখানে ঢুকে সমস্যা না
তৈরি করে। মহাকাশের সমস্ত কাজ শুরু করার আগে অগ্রিম বিস্তারিত পরিকল্পনা জানাতে হবে
এবং তা জাতিসংঘের মহাকাশ নীতিমালা মেনে করতে হবে।
(১০) মহাকাশ-বর্জ্য
হ্রাস: মহাকাশের আবর্জনা কমানো এবং নিষ্ক্রিয় স্যাটেলাইট বা যন্ত্রপাতি নিরাপদভাবে
সরিয়ে ফেলার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২০২০ সালের ১৩ অক্টোবর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইতালি,
জাপান, লুক্সেমবার্গ, ইংল্যান্ড এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত আর্টেমিস চুক্তিতে স্বাক্ষর
করে। এরপর ক্রমে ক্রমে অন্যান্য দেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে শুরু করে। আর্টেমিস-২
চুক্তিতে এপর্যন্ত স্বাক্ষর করেছে ৬১ টি দেশ। বাংলাদেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে
২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল। সেই হিসেবে আর্টেমিস মিশনগুলিতে আমাদেরও নীতিগত অংশীদারিত্ব আছে
এবং এর তথ্য ও উপাত্ত ব্যবহারে আমাদের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
পঞ্চাশ বছর
আগে অ্যাপোলো মিশনের প্রতিযোগিতা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের মিশনগুলির সাথে। সেই সময় সোভিয়েত
ইউনিয়ন একবারও চাঁদে যেতে পারেনি। বর্তমানে চীন আর্টেমিস চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি।
ধারণা করা হচ্ছে চীনের সাথে চাঁদের অভিযানে শক্ত প্রতিযোগিতা চলবে।
আর্টেমিস
মিশনগুলি চালনার জন্য তৈরি করা হয়েছে সর্বাধুনিক স্পেস লঞ্চিং সিস্টেম (এস এল এস) রকেট,
এবং মহাকাশযান অরিয়ন। এগুলি আর্টেমিস মিশনকে দিয়েছে অ্যাপোলো মিশনের চেয়ে অনেক বেশি
দক্ষতা ও নিখুঁত পারদর্শিতা। মহাকাশযান অরিয়ন সম্পর্কে একটু পরে আলোচনা করছি। তার আগে
আর্টেমিস মিশনগুলি সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলে নিই।
আর্টেমিস
মিশনগুলি
নাসা
এপর্যন্ত পাঁচটি আর্টেমিস মিশনের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। ২০২২ সালের নভেম্বরে সম্পন্ন
হয়েছে আর্টেমিস-১ প্রকল্প যা ছিল প্রাথমিক
প্রস্তুতিমূলক অভিযান। আর্টেমিস-২ প্রকল্প এখন চলছে। আর্টেমিস-৩, ৪ ও ৫ আগামী কয়েক
বছরের মধ্যে সম্পন্ন হবে। প্রকল্পগুলির মূল উদ্দেশ্য এখানে আলোচনা করছি – তাতে আর্টেমিসের
ধারাবাহিকতা বুঝতে সুবিধা হবে।
আর্টেমিস-১
২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলেছিল আর্টেমিস-১ মিশন। নাসা এসএলএস
রকেট এবং অরিয়ন মহাকাশযানের একটি মানববিহীন পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে
এই মিশনে। নতুন এক্সপ্লোরেশন গ্রাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করে প্রথমবারের মতো রকেট উৎক্ষেপণ
পরীক্ষা করা হয় এবং অরিয়ন মহাকাশযানের বিভিন্ন সিস্টেম পরীক্ষা করা হয়। আর্টেমিস-১
মিশনটি আর্টেমিস-২ এর জন্য খুবই দরকারি অনুশীলন ছিল। নভোচারীরা সেই মিশনের নভোযানে
ছিলেন না বলে তাতে মহাকাশচারী বা পরবর্তী মিশনের
জন্য পরিকল্পিত গুরুত্বপূর্ণ লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
আর্টেমিস-২
এটিও চাঁদে যাবার পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন, যা এসএলএস রকেট ও অরিয়ন মহাকাশযানে মহাকাশচারীসহ
প্রথম উড্ডয়ন। গত ফেব্রুয়ারিতে সফল ওয়েট ড্রেস রিহার্সালের পর নাসা ইন্টারিম ক্রায়োজেনিক
প্রপালশন স্টেজে হিলিয়াম প্রবাহের একটি সমস্যা শনাক্ত করে এবং মেরামতের জন্য রকেট
ও মহাকাশযানকে ভেহিকল অ্যাসেম্বলি বিল্ডিংয়ে ফিরিয়ে আনা হয়। ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস
সেন্টারে ইঞ্জিনিয়াররা এই সমস্যার সমাধান করে ফেলেন বেশ দ্রুত। আর্টেমিস-১ মিশনে মহাকাশ
থেকে পৃথিবীতে ফিরে আসার সময় অরিয়নের ক্রু-মডিউলের তাপ-সুরক্ষা ব্যবস্থায় কিছু সমস্যা
দেখা গিয়েছিল। আর্টেমিস-২ মিশন শুরুর আগে সেই সমস্যারও সমাধান করা হয়েছে। এপ্রিলের
১ থেকে ১০ পর্যন্ত আর্টেমিস-২ মিশন চলছে।
আর্টেমিস-৩
২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে নাসা নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে একটি নতুন প্রদর্শনী মিশন যুক্ত
করেছে, যেখানে স্পেস-এক্স এবং ব্লু অরিজিন-এর বাণিজ্যিক ল্যান্ডারগুলোর একটি বা উভয়টি
পরীক্ষা করা হবে। এই মিশনেও অরিয়ন মহাকাশযানে করে মহাকাশচারীদের এসএলএস রকেটের মাধ্যমে উৎক্ষেপণ করা হবে এবং অরিয়ন
ও বেসরকারি মহাকাশযানের মধ্যে ডকিং সক্ষমতা পরীক্ষা করা হবে, যা ভবিষ্যতে মহাকাশচারীদের
চাঁদে অবতরণের জন্য প্রয়োজন হবে।
আর্টেমিস-৪
২০২৮ সালের শুরুর দিকে আর্টেমিস-৪ মিশনে নভোচারীদের প্রথম চাঁদে অবতরণের লক্ষ্য ধরা
হয়েছে। উৎক্ষেপণের পর মহাকাশচারীরা অরিয়ন থেকে একটি বাণিজ্যিক মুন ল্যান্ডারে স্থানান্তরিত
হবেন এবং সেটির মাধ্যমে চাঁদের পৃষ্ঠে যাবেন। কোন্ ল্যান্ডার ব্যবহার করা হবে তা নির্ভর
করবে কোন্ কোম্পানির ল্যান্ডার প্রস্তুত থাকে তার উপর। পরে তারা আবার অরিয়নে ফিরে এসে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন এবং প্রশান্ত
মহাসাগরে নিরাপদে অবতরণ করবেন।
আর্টেমিস-৫
২০২৮ সালের শেষের দিকে এই মিশনে মহাকাশচারীরা আবার চাঁদে যাবেন। এরপর থেকে প্রতি বছর
একটি করে চাঁদে অবতরণের মিশন পরিচালনার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এই মিশন থেকেই নাসা চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ
শুরু করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আর্টেমিস মিশন আরো দীর্ঘস্থায়ী হবে তাতে আপাতত কোন
সন্দেহ নেই।
এবার
চলমান আর্টেমিস-২ মিশনের আদ্যোপান্ত একটু দেখা যাক।
নভোযান
আর্টেমিস-২ মিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর নভোযান
– অরিয়ন। পৃথিবীবিখ্যাত নভোযান প্রস্তুতকারি সংস্থা লকহিড মার্টিন তৈরি করেছে
এই অত্যাধুনিক নভোযান অরিয়ন। এখনো পর্যন্ত অরিয়ন হলো পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক নভোযান।
এই নভোযান চন্দ্রাভিযানের নভোচারীদের নিয়ে গেছে গভীর মহাকাশে, আবার নিরাপদে ফিরিয়ে
নিয়ে আসবে পৃথিবীতে। মহাকাশের তেজস্ক্রিয়তা থেকে রক্ষা করছে নভোচারীদের। আবার পৃথিবীতে
ফেরার সময় পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের সাথে প্রচন্ড সংঘর্ষে যে অসহ্য তাপ উৎপন্ন হবে – রক্ষা
করবে সেই তাপ থেকেও।
অরিয়নের তিনটি প্রধান অংশ – লঞ্চ অ্যাবর্ট সিস্টেম, ক্রু
মডিউল, এবং সার্ভিস মডিউল। তিনটি অংশের মোট দৈর্ঘ্য ৬৭ ফুট। স্পেস লঞ্চ সিস্টেম রকেটের
উপর লাগানো অবস্থায় এর উচ্চতা ৩২২ ফুট। ৭৭,১৫০
ধরনের ৩,৫৫,০৫৬টি যন্ত্রাংশের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে অরিয়ন।
মহাকাশে নভোচারীদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিখুঁত হওয়াটা সবচেয়ে
জরুরি। প্রথমবার চন্দ্রাভিযানের সময় অ্যাপোলো-১ এর তিনজন নভোচারীর মর্মান্তিক মৃত্যু
ঘটেছিল। সেরকম দুর্ঘটনা যেন আর না ঘটে সেজন্য নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে অরিয়নে।
এই ব্যবস্থার নাম লঞ্চ অ্যাবর্ট সিস্টেম। স্পেস লঞ্চ সিস্টেমের রকেটের সাহায্যে
উৎক্ষেপণের সময় অরিয়নের ক্রু মডিউলের সামনে পঞ্চাশ ফুট দৈর্ঘ্যের এই লঞ্চ অ্যাবর্ট
সিস্টেম লাগানো থাকে। এই সিস্টেমের দুইটি অংশ – ফেয়ারিং অ্যাসেম্বলি এবং লঞ্চ অ্যাবর্ট
টাওয়ার। ফেয়ারিং অ্যাসেম্বলি হালকা যৌগিক ধাতুর তৈরি প্রকোষ্ঠ যেটা উৎক্ষেপণের সময়
উৎপন্ন তাপ, বাতাস এবং শব্দ থেকে অরিয়নকে রক্ষা করে। লঞ্চ অ্যাবর্ট টাওয়ারে লাগানো
থাকে তিনটি অত্যন্ত শক্তিশালী যান্ত্রিক মোটর যেগুলি প্রায় চার লক্ষ পাউন্ড ধাক্কা
তৈরি করতে পারে। উৎক্ষেপণের সময় যদি যান্ত্রিক ত্রুটি বা অন্য কোন কারণে নভোচারীদের
নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবার সম্ভাবনা দেখা দেয় – লঞ্চ অ্যাবর্ট সিস্টেমের মোটরগুলি চালু
হয়ে অরিয়নের ক্রু মডিউলে অবস্থানরত নভোচারীদের নিয়ে ক্রু মডিউলটিকে অরিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন
করে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে নিরাপদ জায়গায় উড়ে যায়। লঞ্চ অ্যাবর্ট সিস্টেমের বেগ
শূন্য থেকে ঘন্টায় ৮০০ কিলোমিটার উঠে যেতে পারে দুই সেকেন্ডের মধ্যে। অথচ একটি বোয়িং-৭৪৭
প্লেনের গতিবেগ ঘন্টায় শূন্য থেকে ৩৬০ কিলোমিটারে উঠতে কমপক্ষে দশ সেকেন্ড সময় লাগে।
যদি কোন দুর্ঘটনা না ঘটে এবং সবকিছু ঠিকঠাকমতো উৎক্ষেপণ হয়, তখন অরিয়নের লঞ্চ অ্যাবর্ট
সিস্টেমের আর কোন কাজ থাকে না। সেক্ষেত্রে শুধু শুধু এই পঞ্চাশ মিটার লম্বা যন্ত্রাংশ
নিয়ে মহাকাশে ঢোকার কোন মানে থাকে না। যখন আর কোন বিপদের সম্ভাবনা থাকে না তখন অরিয়ন
থেকে এই লঞ্চ অ্যাবর্ট সিস্টেম আলাদা হয়ে যায়। তখন অরিয়নের ক্রু মডিউল আর সার্ভিস মডিউল
নিয়ে চাঁদের পানে চলতে থাকে স্পেস লঞ্চিং সিস্টেমের রকেট।
অরিয়নের ক্রু মডিউল হলো মিশন চলাকালীন নভোচারীদের
আবাসস্থল। এগারো ফুট উচ্চতা এবং সাড়ে ষোল ফুট ব্যাসের এই চোঙাকৃতি জায়গায় চারজন নভোচারীর
থাকার ব্যবস্থা। উৎক্ষেপণের সময় থেকে শুরু করে পৃথিবী থেকে চাঁদে পৌঁছে আবার পৃথিবীতে
ফিরে আসা পর্যন্ত সর্বোচ্চ একুশ দিন পর্যন্ত এখানে স্বচ্ছন্দে থাকতে এবং প্রয়োজনীয়
কাজ করতে পারবেন চারজন নভোচারী। আর্টেমিস-২ এর চারজন নভোচারী এখানে থাকবেন দশ দিন।
পৃথিবী থেকে চাঁদে যাবার সময় ক্রু মডিউল এবং সার্ভিস মডিউল
একসাথে গেলেও পৃথিবীতে ফিরে আসার সময় শুধুমাত্র এই ক্রু মডিউলটাই ফিরে আসবে নভোচারীদের
নিয়ে। ক্রু মডিউলের ভেতর নভোচারীদের বাসোপযোগী পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। তাপমাত্রা, বায়ুচাপ,
আর্দ্রতা, অক্সিজেনের মাত্রা, কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা প্রভৃতি স্বাস্থ্যকর পর্যায়ে
রাখা হয়। স্বচ্ছ শক্ত কাচের জানালাযুক্ত ককপিট থেকে নভোচারীরা অরিয়নের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ
করতে পারেন। ক্রু মডিউলের দেয়াল এমনভাবে তৈরি যেন মহাকাশের তেজস্ক্রিয় বিকিরণ মডিউলের
ভেতর প্রবেশ না করতে পারে। মিশন চলাকালীন এই মডিউলই হয়ে ওঠে নভোচারীদের ঘরবাড়ি। এখানেই
তাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা, এখানেই ওজনহীন পরিবেশে তাদের টয়লেট করার ব্যবস্থা। নভোচারীদের
সুস্থ থাকার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম করতে হয়। এই মডিউলে তার ব্যবস্থাও আছে।
ক্রু মডিউলের নিচে লাগানো থাকে সার্ভিস মডিউল। ইওরোপিয়ান
স্পেস এজেন্সি এই মডিউলের সব ব্যবস্থা করেছে বলে অরিয়নের এই মডিউলের নাম ইওরোপিয়ান
সার্ভিস মডিউল। সার্ভিস মডিউল হলো নভোযানের পাওয়ার হাউজ। এখানেই সৌরপ্যানেল থেকে বিদ্যুৎ
উৎপন্ন হয়, এখানেই আছে ইঞ্জিন এবং থ্রাস্টার।
অরিয়নের সার্ভিস মডিউলের দৈর্ঘ্য ১৫.৭ ফুট এবং ব্যাস ১৬.৫ ফুট, ভর ৩৪,৪০০ পাউন্ড। ছয়
হাজার পাউন্ড ধাক্কা তৈরি করার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ইঞ্জিন আছে যেটা দিয়ে অরিয়নকে নিয়ন্ত্রণ
করা হয়। এই প্রধান ইঞ্জিনকে সাহায্য করার জন্য রয়েছে আটটি সাহায্যকারী ইঞ্জিন – যেগুলির
প্রত্যেকে ১১০ পাউন্ড ধাক্কা তৈরি করতে পারে। গতি-প্রতিক্রিয়া সামলানোর জন্য রয়েছে
আরো চব্বিশটি ছোট ইঞ্জিন – যেগুলি প্রত্যেকে ৫০ পাউন্ড ধাক্কা তৈরি করতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ
তৈরি করার জন্য রয়েছে পনের হাজার সৌরকোষ সমন্বিত চারটি সৌরপ্যানেল যেগুলি খুললে ৬২
ফুট লম্বা হয়। এগারো কিলোওয়াট বিদ্যুৎশক্তি তৈরি করতে পারে এই প্যানেলগুলি।
১০
দিনের যাত্রা
ফ্লোরিডার
কেনেডি স্পেস সেন্টারের ৩৯বি লঞ্চিং প্যাড থেকে ১ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে প্রায়
চল্লিশ কোটি নিউটন বলের এক ধাক্কার বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় আকাশে উঠে গেছে আর্টেমিস-২
এর স্পেস লঞ্চিং সিস্টেম রকেট। মাত্র দুই মিনিট পরে যখন রকেটটি প্রায় ৪৭ কিলোমিটার
উচ্চতায় পৌঁছে, তখন সলিড রকেট বুস্টারগুলো জ্বালানি শেষ হয়ে আলাদা হয়ে যায়। এরপর
কোর স্টেজের চারটি ইঞ্জিন আরও ছয় মিনিট SLS-কে এগিয়ে নিয়ে যায়, তারপর সেগুলোর জ্বালানিও
শেষ হয়ে আলাদা হয়ে যায়। ইন্টারিম ক্রায়োজেনিক প্রপালশন স্টেজ (ICPS)—যা SLS-এর
দ্বিতীয় ধাপ—শেষ ধাক্কা দিয়ে অরিয়নকে মহাকাশে পৌঁছে দেয়। ইঞ্জিন চালু হওয়ার মাত্র
১০ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে আর্টেমিস-২ একটি উপবৃত্তাকার কক্ষপথে প্রবেশ করে, যার
পৃথিবীর কাছের বিন্দু (perigee) ১৮৫ কিলোমিটার এবং দূরের বিন্দু (apogee) ২২৫০ কিলোমিটার।
![]() |
| আর্টেমিস-২ এর ১০ দিন |
ঘণ্টায়
২৮,৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে চলতে চলতে মহাকাশযানটি মাত্র ৯০ মিনিটে পৃথিবীর চারপাশে
একটি পূর্ণ ডিম্বাকার কক্ষপথ সম্পন্ন করে। এরপর ICPS আবার জ্বলে উঠে আর্টেমিস-২-এর
কক্ষপথকে ২৪০০ কিলোমিটার × ৭৪,০০০ কিলোমিটারে উন্নীত করে—যার সর্বোচ্চ বিন্দু মহাকাশযানকে
চাঁদের দিকে প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ পথ পর্যন্ত নিয়ে যায়। এটি পৃথিবীর একটি বিশাল কক্ষপথ,
এবং উৎক্ষেপণের প্রায় ২৪ ঘণ্টা পরে নভোচারীরা তাঁদের পরবর্তী বড় পদক্ষেপ নেন। ICPS
বিচ্ছিন্ন করে অরিয়ন মহাকাশযানের ছোট অনবোর্ড ইঞ্জিন ব্যবহার করে ট্রান্সলুনার ইনজেকশান
(TLI) প্রয়োগ করে মহাকাশযানকে চাঁদের দিকে ঠেলে দেয়। এই পর্যায়ে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ থেকে মুক্ত হতে অরিয়নকে
ঘন্টায় প্রায় চল্লিশ হাজার কিলোমিটার গতি অর্জন করতে হয়।
অরিয়ন
যদি এই গতি ধরে রাখতে পারত, তাহলে মাত্র ৮ ঘণ্টায় চাঁদে পৌঁছাতে পারত। কিন্তু পৃথিবী
থেকে মহাকাশে যাওয়া মানে যেন উঁচু পাহাড়ে ওঠা—পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ মহাকাশযানকে পিছনে
টেনে গতি কমাতে কমাতে ঘণ্টায় ৫,৫০০ কিলোমিটারে নামিয়ে দেয়। অরিয়ন যখন চাঁদ থেকে প্রায়
৬৬,০০০ কিলোমিটার দূরে এবং পৃথিবী থেকে প্রায় ৩২২,০০০ কিলোমিটার দূরে পৌঁছায়, তখন
চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণকে ছাড়িয়ে যায়। চাঁদ তখন অরিয়নকে নিজের দিকে
টানতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত মিশনের ষষ্ঠ দিনে অরিয়ন চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছাবে এবং চাঁদের
পশ্চিম গোলার্ধ দিয়ে উড়ে চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬,৪০০ কিলোমিটার দূর দিয়ে অতিক্রম
করবে।
এখানে
পদার্থবিজ্ঞান জীবন রক্ষাকারী ভূমিকা পালন করে। ট্রান্সলুনার ইনজেকটর মহাকাশযানের গতি
মুক্তিবেগের চেয়ে কিছুটা কমিয়ে ঘন্টায় ৩৯,০০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি রাখা হয়। গতিবেগ
ঘন্টায় ৪০,০০০ কিলোমিটার বা তার বেশি গতি হলে চাঁদে দ্রুত পৌঁছানো যেত, কিন্তু কোনো
কারণে যদি গাইডেন্স সিস্টেম কাজ না করে বা ইঞ্জিন চালু না হয়, তাহলে নভোচারীদের পৃথিবীতে
ফেরার কোন উপায় থাকবে না। মুক্তিবেগের চেয়ে একটু কম গতিতে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ তখনও
মহাকাশযানের উপর কিছু প্রভাব রাখে, ফলে যদি গাইডেন্স সিস্টেম নষ্ট হয় বা ইঞ্জিন চালু
না হয়, তাহলে মহাকাশযান একটি free-return trajectory-তে থাকবে। চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ
তাকে চাঁদের অন্যপিঠ দিয়ে ঘুরিয়ে আবার সরাসরি পৃথিবীর দিকে ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু যদি
গতি ঘন্টায় ৪০,০০০ কিলমিটার বা তার বেশি হয়, তাহলে মহাকাশযান এই পথ থেকে বেরিয়ে যাবে
এবং পৃথিবীর দিকে ফিরলেও খুব বেশি গতির কারণে পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে ছিটকে মহাকাশে হারিয়ে
যেতে পারে। এই নিয়ন্ত্রিত গতিতে চাঁদের অন্যপিঠের দিকে ঘোরার সময় আর্টেমিস-২ পৃথিবী
থেকে মানুষের দূরত্বের নতুন রেকর্ড তৈরি করবে। অ্যাপোলো-১৩—চাঁদের পিছনের দিকে ২৫৪
কিলোমিটার পর্যন্ত গিয়েছিল। আর্টেমিস-২ চাঁদের পেছন দিকে ৭৫০০ কিলোমিটার দূর দিয়ে যাবে।
চাঁদের
যে পিঠ পৃথিবী থেকে দেখা যায় না, সেই পিঠ পর্যবেক্ষণ করবেন আর্টেমিসের নভোচারীরা। এরপর
পৃথিবীতে ফেরার পালা। ছিয়ানব্বই ঘন্টারও বেশি সময় লাগবে আর্টেমিস-২ এর পৃথিবীতে ফিরতে।
আমেরিকান সময় ১০ এপ্রিল আর্টেমিস-২ পৃথিবীতে ফিরে আসবে।
দশ
দিনের প্রতিটি সেকেন্ডের কাজ হিসেব করা আছে চারজন নভোচারীর। ঘুম, ব্যায়াম, এবং স্বাস্থ্য
সুরক্ষা সবচেয়ে জরুরি। নভোযান পরিচালনায় কার কী দায়িত্ব এবং কখন কে কী করবেন তা মিশন
শুরু হবার অনেক আগে থেকেই অনেকবার অনুশীলন করেছেন তাঁরা সিমুলেশান মডিউলে। পৃথিবীর
মানুষ সরাসরি দেখার সুযোগ পেয়েছে আর্টেমিস-২ এর নভোচারীদের অনেক কাজ।
পৃথিবীতে
ফেরার ফেরার সময় শুধুমাত্র ক্রু-মডিউল চারজন নভোচারীকে নিয়ে পৃথিবীর কক্ষপথে এসে বায়ুমন্ডলে
প্রবেশ করবে। পৃথিবীতে ফেরার সময় মহাকাশযানের গতি হবে প্রায় চল্লিশ হাজার কিলোমিটার,
যা খুবই বিপজ্জনক। পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা মহাকাশযান সাধারণত ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে বায়ুমণ্ডলে
ঢোকে, কিন্তু চাঁদ থেকে ফেরত আসা মহাকাশযান অনেক বেশি গতিতে সরাসরি বায়ুমণ্ডলে ঢুকে
পড়ে। যদি সরাসরি নিচে নামার চেষ্টা করে, তাহলে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের সাথে সংঘর্ষে অতিরিক্ত
তাপ ও শক্তির কারণে মহাকাশযান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মহাকাশযানে কোন মানুষ না থাকলে
এই ঝুঁকি নিয়ে চিন্তা করতে হতো না। কিন্তু নভোচারীদের নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার
সময় কোনো ধরনের ঝুঁকি নেয়া অসম্ভব। তাই মহাকাশযান
পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে ঢোকার সময় একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে। মহাকাশযান প্রথমে বায়ুমণ্ডলে
ঢোকে, তারপর আবার উপরে উঠে মহাকাশে যায়, তারপর আবার ঢোকে—এভাবে কয়েকবার ঢুকে বের
হয়ে ধীরে ধীরে এর গতি ও তাপ কমায়। শেষে এটি ধীরে ধীরে নেমে আসবে সান দিয়েগোর সমুদ্রে।
আর্টেমিস-২
এর বৈজ্ঞানিক অর্জন
আর্টেমিস-২
চাঁদে অবতরণের মিশন নয়, বরং মানুষ নিয়ে গভীর মহাকাশে গিয়ে ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযানের
জন্য সব প্রযুক্তি ও জীবনধারণ ব্যবস্থা পরীক্ষা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক
মিশন। এই প্রায় দশ দিনের যাত্রায় নভোচারীরা প্রথমে মহাকাশযানের লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম
পরীক্ষা করেছেন—অর্থাৎ মহাকাশচারীদের জন্য অক্সিজেন, পানি, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, কার্বন
ডাই অক্সাইড অপসারণ, খাবার, টয়লেট এবং ঘুমানোর ব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করছে কিনা তা
পরীক্ষা করে দেখেছেন। একই সঙ্গে মহাকাশযানের নেভিগেশন, কম্পিউটার, যোগাযোগ ব্যবস্থা,
বিদ্যুৎ সরবরাহ, থ্রাস্টার ও জ্বালানি ব্যবস্থাও পরীক্ষা করেছেন, যাতে ভবিষ্যতে চাঁদে
মানুষ পাঠানোর আগে সব সিস্টেম নির্ভরযোগ্য কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়।
এই
মিশনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মহাকাশের রেডিয়েশন বা বিকিরণ পরিমাপ করা। পৃথিবীর
মাধ্যাকর্ষণ ও চৌম্বকক্ষেত্রের বাইরে গেলে মহাকাশচারীরা বেশি রেডিয়েশনের মুখোমুখি
হয়, তাই এই মিশনে খুবই সংবেদী ডিটেকটর দিয়ে সেই রেডিয়েশনের মাত্রা পরিমাপ করা হয়েছে,
যা ভবিষ্যতের চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহের মিশনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবে। এছাড়া
মহাকাশচারীরা নিজের হাতে মহাকাশযান নিয়ন্ত্রণ করার অনুশীলন করেছেন, যাতে কম্পিউটার
বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেলেও তারা নিরাপদে মহাকাশযান চালাতে পারেন। পৃথিবীর
সাথে দূরবর্তী যোগাযোগ ব্যবস্থা, সংকেত আসা–যাওয়ার সময় বিলম্ব, ডেটা পাঠানো ইত্যাদিও
পরীক্ষা করে দেখেছেন।
মিশনের
একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা পরীক্ষা হলো ফ্রি রিটার্ন ট্রাজেকটরি, যেখানে মহাকাশযান
এমন পথে চাঁদের দিকে যাবে যাতে কোনো কারণে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলেও চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ
তাকে ঘুরিয়ে আবার পৃথিবীর দিকে ফিরিয়ে দেয়। ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো-১৩ মিশনে এই পথ ব্যবহার
করেই মহাকাশচারীরা নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরতে পেরেছিল। মিশনের শেষে পৃথিবীতে ফেরার সময়
মহাকাশযানের হিট শিল্ড, বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ পদ্ধতি (skip-entry), প্যারাস্যুট এবং সমুদ্রে
অবতরণের ব্যবস্থাও পরীক্ষা করা হয়েছে।
চাঁদের
বিপরীত পৃষ্ঠ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা আর্টেমিস-২ এর বিশেষ বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য। চাঁদের
আগামী অভিযান হবে চাঁদের অন্যপিঠে যেখানে এর আগে পা পড়েনি কোন মানুষের।
সব
মিলিয়ে আর্টেমিস-২ মিশনের মূল উদ্দেশ্য —মানুষকে নিয়ে গভীর মহাকাশে গিয়ে মহাকাশযান,
জীবনধারণ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যোগাযোগ, রেডিয়েশন এবং পৃথিবীতে নিরাপদে ফিরে
আসার পুরো প্রক্রিয়াটি পরীক্ষা করা, যাতে ভবিষ্যতে মানুষকে নিরাপদে চাঁদে অবতরণ করানো
– সফল ভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এবার আমাদের অপেক্ষার পালা আর্টেমিসের তৃতীয় অভিযানের জন্য।
তথ্যসূত্র
১।
nasa.gov/missions/artemis/
২।
space.com
৩। বিজ্ঞানচিন্তা
জুলাই ২০২৩
_____________
বিজ্ঞানচিন্তা এপ্রিল ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত












No comments:
Post a Comment