Thursday 29 April 2021

ফুটবলের বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের ফুটবল

 




"তোমার ফুটবল টিম কোন্‌টি?"

ভাইস-চ্যান্সেলারের প্রশ্নে আমি একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে এসেছি একমাসও হয়নি তখনো। মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির স্কলারশিপ অফিসের একটি অনুষ্ঠানে ভাইস চ্যান্সেলর নিজে এগিয়ে এসে কথা বলছেন শিক্ষার্থীদের সাথে। এখানে চ্যান্সেলর ভাইস-চ্যান্সেলররা সাঙ্গপাঙ্গ ছাড়া সাধারণ মানুষের মত চলাফেরা করেন এটাই আমার কাছে আশ্চর্য ঘটনা। কিন্তু তাঁদের কেউ যখন আটপৌরে মানুষের মত শিক্ষার্থীদের কাছে ফুটবল টিম সম্পর্কে জানতে চান - তখন যেন ঠিক স্বাভাবিক বলে মনে হয় না। আমার কোন উত্তর না পেয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় ফুটবলের মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে শুরু করলেন। অস্ট্রেলিয়ার সব মানুষই নাকি কোন না কোন ফুটবল দলের সমর্থক। অনেকে বংশানুক্রমিকভাবে কোন কোন দলের সমর্থক। আমি ভাবলাম - এ আর নতুন কী? আমরাও তো ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকা দিয়ে পুরো বাংলাদেশ ঢেকে ফেলি বিশ্বকাপের সময়।

ক্রমে ক্রমে জানলাম অস্ট্রেলিয়ার মানুষ যে ফুটবল টিমের সমর্থক - সেই সবগুলো টিম তাদের নিজেদের দেশের টিম, আর যে ফুটবল নিয়ে এত মাতামাতি করে - সেটা আমাদের ফুটবলের মত গোলাকার বা spheric নয় - সেটা spheroid বা উপগোলাকার। তাছাড়া তারা এই বলটা হাত-পা-মাথাসহ সারা গা দিয়ে ধাক্কাধাক্কি মারামারি করতে করতে খেলে। আমাদের গোলাকার বল নিয়ে শুধুমাত্র পা ব্যবহার করে যে ফুটবল আমরা খেলি তাকে এরা বলে সকার (soccer)। ফিফা ওলার্ল্ডকাপ ফুটবলকে এরা বলে ওয়ার্ল্ডকাপ সকার।

সকার শব্দটা আমার খুব একটা ভালো লাগে না। পা বা ফুট দিয়ে যে বল খেলি সেটা ফুটবল - সোজা হিসেব। সেখানে সকার! আসলে তাদেরও দোষ নেই খুব একটা। আমরা মানুষ নামক প্রাণিরা জন্মের আগেই মায়ের পেটে লাথি মারার মাধ্যমে পায়ের ব্যবহার শিখে যাই। জন্মের পর হাঁটতে শিখেই আমরা লাথি মারতে শুরু করি। সে হিসেবে ফুটবল খেলার জন্মের ইতিহাস অনেক পুরনো। খ্রিস্টাব্দ শুরু হবার কয়েক শ' বছর আগে থেকেই চীনের হ্যান সাম্রাজ্যের সৈনিকেরা অনুশীলনের অংশ হিসেবে ফুটবল খেলতো। চামড়ার তৈরি এই ফুটবলের ভেতর থাকতো পাখির পালক ও মানুষের চুল। তারা ফুটবলকে বলতো - 'সু চু' (Tsu' Chu)। ফুটবলের সংগঠন তৈরি করে দলগতভাবে তুলনামূলকভাবে আধুনিক ফুটবল খেলা শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে ১৮৬৩ সালে। ১৮৬৩ সালের ২৬ অক্টোবর ফুটবল খেলার নিয়মকানুন ঠিক করে দলগত ফুটবল বা Association Football শুরু হয়েছিল। এর আগে দলগত রাগবি খেলার চল ছিল। দলগত ফুটবল খেলা শুরু হবার পর রাগবি দলের লোকজনকে কথ্য ভাষায় রাগার (rugger) আর দলগত ফুটবলের লোকজনকে Assoccer থেকে Soccer বা সসার বলে ডাকা শুরু হলো। ক্রমে এই সসার হয়ে গেলো সকার। কিন্তু আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা - এই কয়েকটি দেশ ছাড়া বাকি সারা পৃথিবীতে ফুটবল হিসেবেই এই খেলা চলছে।

ফুটবলের বলটি একটি পারফেক্ট স্ফিয়ার বা গোলক, যার আয়তন 4/3(pi r^3)। আমাদের পৃথিবীর মতো, চাঁদের মতো গোলাকার। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী ফুটবলের পরিসীমা হতে হবে ৬৮ থেকে ৭০ সেন্টিমিটারের মধ্যে। গোলকের পরিসীমা 2(pi)r । এখান থেকে খুব সহজেই আমরা হিসেব করে বের করতে পারি ফুটবলের আদর্শ ব্যাসার্ধ হতে হবে ১১ সেন্টিমিটার। এই ব্যাসার্ধের মান কাজে লাগিয়ে আমরা ফুটবলের আদর্শ আয়তন হিসেব করে নিতে পারি  ৫৫৭৫ সিসি বা ঘন সেন্টিমিটার।

 

চিত্র: বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮: টেলস্টার ১৮


চিত্র: অস্ট্রেলিয়ান রুল ফুটবল

 

কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান ফুটবলের উপগোলাকার আকৃতিটাই তো ভালো লাগে না। তাছাড়া তার আয়তন বের করার জন্য যে ফর্মূলা ব্যবহার করতে হয় সেটাও খটমট। জ্যামিতিক গণিতের বিভিন্ন আকৃতির পদার্থের আয়তন ইত্যাদি নির্ণয় করতে গিয়ে স্কুল-কলেজে আমার "গণিতের মার্কায় কাটা গেল সর্বই" অবস্থা হয়েছিল। আমার সুপারভাইজার প্রফেসর অ্যামোস ভাবলেন তাঁদের ফুটবলের আকৃতির কারণেই আমি তাঁদের ফুটবল খেলা পছন্দ করছি না। একদিন দুপুরে আমাকে বোঝাতে বসলেন কেন অস্ট্রেলিয়ান ফুটবল আমাদের ফুটবলের চেয়ে একধাপ এগিয়ে আছে।

     'তুমি তো জানো সব ধরনের বলই কিন্তু ফিজিক্সের বেসিক মেকানিক্স মেনে চলে। ক্রিকেট, টেনিস, ফুটবল, সকার, বেসবল, গল্‌ফ সবই নিউটনের গতির সবগুলো সূত্র মেনে চলে। তবে আমাদের ফুটবলে কিন্তু ম্যাগনাস ইফেক্ট খুব কম।'

     ম্যাগনাস ইফেক্টের ব্যাপারটা কমবেশি সবাই জানে। ফুটবল খেলায় কর্নার কিক থেকে বল সরাসরি গোলবক্সে পাঠিয়ে দেয়ার ঘটনা অহরহ না ঘটলেও মাঝে মাঝে ঘটে যায়। বল যখন লাথি খেয়ে শূন্যে উঠে ঘুরতে থাকে  - তখন বলের ঘূর্ণনের ফলে বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়। ভরবেগের সংরক্ষণশীলতার কারণে বলের আদি ভরবেগ ও শেষ ভরবেগ সমান হতেই হবে। ভরবেগ সমান করার জন্য বাতাস যেদিকে যায় - বলটি তার বিপরীতদিকে ছুটে যায়। একারণেই দেখা যায় কর্নার থেকে বল সোজা গোলপোস্টের সামনে গিয়ে হঠাৎ ঘুরে গোলপোস্টে ঢুকে যায়। তবে এই ঘটনা ঘটানোর জন্য খেলোয়াড়দের প্রচুর দক্ষতা দরকার।

     অস্ট্রেলিয়ান ফুটবলে ম্যাগনাস ইফেক্ট কম হবার কারণ হলো বলের অসাম্যতা। ঘূর্ণন খুব কম হয়। কিন্তু আমার পয়েন্ট সেখানে নয়। ফুটবল খেলা দেখার সময় তার বিজ্ঞান নিয়ে কেউ ভাবে না। সবাই ভাবে গোল নিয়ে। অস্ট্রেলিয়ান ফুটবলে ম্যাগনাস ইফেক্ট কম হলে কী আসে যায়? অস্ট্রেলিয়ান ফুটবলে কর্নারই তো নেই। কারণ ফুটবলের মাঠটাই তো তাদের বলের মতো উপগোলাকার।

     প্রফেসর অ্যামোস এবার অ্যাটমিক ফিজিক্স দিয়ে আমাকে ঘায়েল করার চেষ্টা করেন। বলেন, "দেখো সকার বল কিন্তু বোর মডেল, আমার আমাদের ফুটবল সামারফেল্ড মডেল। সামারফেল্ড মডেল ছাড়া অ্যাটমিক মডেল অসম্পূর্ণ।"

 

চিত্র: পরমাণুর বোর মডেল অনুযায়ী ইলেকট্রনের কক্ষপথ বৃত্তাকার, কিন্তু সামারফেল্ডের মডেল অনুযায়ী ইলেকট্রনের কক্ষপথ ইলেকট্রনের শক্তিস্তর যত বাড়ে ততই উপবৃত্তাকার হতে থাকে।

 

     আমি দেখলাম প্রফেসর অ্যামোসের কথা অনেকটা সত্য। আমাদের ফুটবলের আকৃতি বোর মডেলের ইলেকট্রনের কক্ষপথের মতো, আর অস্ট্রেলিয়ান ফুটবলের আকৃতি সামারফেল্ড মডেলের ইলেকট্রনের কক্ষপথের মতো। কিন্তু ফুটবলকে টেনেটুনে বিজ্ঞানের তত্ত্বে নিয়ে আসতে হবে এমন কোন কথা নেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'সামারফেল্ড কি ফুটবল খেলতেন?'

     'তা তো জানি না।'

     'তাহলে সামারফেল্ডকে ফুটবলে টেনে আনবেন না। ফুটবলের ক্ষেত্রে বোর-ই কথা বলার অধিকার রাখেন। কারণ বোর ফুটবল খেলতেন।'

     পারমাণবিক তত্ত্বের জন্য বিখ্যাত নিলস বোর একজন ফুটবল প্লেয়ার ছিলেন। কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল টিমের দুর্দান্ত গোলকিপার ছিলেন নিলস বোর। নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের জনক আর্নেস্ট রাদারফোর্ড - যিনি পরমাণুর নিউক্লিয়াস ও প্রোটন আবিষ্কার করেছেন - নিউজিল্যান্ডের নেলসন কলেজে এবং ক্যান্টারবারি ইউনিভার্সিটিতে নিয়মিত রাগবি খেলতেন। ফুটবল খেলোয়াড়দের খুব পছন্দ করতেন তিনি। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও পরীক্ষণ পদার্থবিজ্ঞানীদের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব কাজ করে সবসময়। রাদারফোর্ড তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানীদের সহ্যই করতে পারতেন না। কিন্তু নিলস বোরের ব্যাপারে তিনি বলতেন, "তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী হলেও বোর কিন্তু ভালোমানুষ, কারণ সে ফুটবলার।"

ফুটবলাররা যে ভালোমানুষ, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু কোন তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী যদি ফুটবল না খেলেন - তাহলে যে তিনি খারাপ মানুষ হবেন এমন কোন কথা নেই। ম্যানহাটান প্রজেক্টের পরিচালক ছিলেন রবার্ট ওপেনহেইমার। তাঁর জীবদ্দশায় বিজ্ঞানের এমন কোন বিষয় ছিল না যে বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ছিল না। কিন্তু খেলাধূলা সম্পর্কে একেবারে কিছুই জানতেন না ওপেনহেইমার।  

নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালামও ফুটবল পছন্দ করতেন না। ইংল্যান্ড থেকে পিএইচডি করে পাঞ্জাবে ফিরে যাওয়ার পর প্রফেসর আবদুস সালামকে লাহোর সরকারি কলেজে ফিজিক্স পড়ানোর পাশাপাশি ফুটবল কোচের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল এবং তিনি সেই কাজটি মোটেও পছন্দ করেননি।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত খেলাধূলার বিজ্ঞান নিয়ে কেউ মাথা ঘামাতেন না। এখন ফুটবলের বিজ্ঞান নিয়ে নিয়মিত গবেষণা হয়। ১৯৮৭ সাল থেকে শুরু হয়েছে ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অব সায়েন্স অ্যান্ড ফুটবল। প্রতি চার বছর পর পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তা হচ্ছে। ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, ওয়েল্‌স, অস্ট্রেলিয়া, পর্তুগাল, তুরস্ক, জাপান, ও ডেনমার্কে সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর আগামীবছর মেলবোর্নে হবে এই কংগ্রেস। ফুটবলের বৈজ্ঞানিক গবেষণা এত বেশি হয়ে যাচ্ছে যে একটা কংগ্রেসে কুলোচ্ছিল না বলে ২০০৮ সাল থেকে শুরু হয়েছে সায়েন্স অ্যান্ড সকার কনফারেন্স। এখন বিজ্ঞানীরা অনুধাবন করছেন ফুটবল থেকে অনেক নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

নিউ সায়েন্টিস্ট ৩০ জুন ২০১৬-র একটা প্রতিবেদন অনুসারে ফুটবলের সেরা খেলোয়াড়রা প্রচন্ড মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন। তাদের ব্রেন ওয়ার্ক অনেক জটিল। জেতার জন্য পায়ের স্কিলের চেয়েও মস্তিষ্কের স্কিল অনেক বেশি জরুরি। বিশ্বকাপে যে টিমগুলো খেলে তাদের প্রত্যেকটি খেলোয়াড়ই দক্ষ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, যে দল মানসিকভাবে যত শক্ত - সেই দলের জেতার সম্ভাবনা তত বেশি। বিশেষ করে পেনাল্টি শ্যুট আউটের ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের মানসিক দক্ষতা অনেক বেশি কার্যকরী। গবেষণায় দেখা গেছে ১৯৮২ থেকে ২০১৫'র মধ্যে জার্মানরা ছয়টি পেনাল্টি শুটের মধ্যে ছয়টিতে জিতেছে। পেনাল্টিতে জার্মানরা ৯২% ক্ষেত্রে গোল করেছে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড জিতেছে সাতটির মধ্যে মাত্র একটিতে। তাদের খেলোয়াড়রা পেনাল্টির মাত্র ৬৭% গোল করতে পেরেছে।

এবারের বিশ্বকাপ থেকে আমাদের আনন্দের পাশাপাশি ফুটবলের অনেক অনেক নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য সামনে আসবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

সূত্র: FIFA.com, সায়েন্স অ্যান্ড সকার/থমাস রেইলি

________________________

বিজ্ঞানচিন্তা জুন ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত






No comments:

Post a Comment

Latest Post

The World of Einstein - Part 2

  ** On March 14, 1955, Einstein celebrated his seventy-sixth birthday. His friends wanted to organize a grand celebration, but Einstein was...

Popular Posts