Friday 21 December 2018

সূর্যনগর ব্রিসবেন - ৬ষ্ঠ পর্ব



সকাল আটটার মধ্যে বেরিয়ে গেলাম। আটটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে ট্যুরবাস ছাড়বে। অস্ট্রেলিয়ান ডে ট্যুর এর ‘সানশাইন ওয়াইল্ড লাইফ ট্যুর’এ যাচ্ছি। বিগ পাইনঅ্যাপেল, অস্ট্রেলিয়ান জু আর আন্ডার ওয়াটার ওয়ার্ল্ড ঘুরিয়ে দেখাবে। সব মিলিয়ে ৮৮ ডলার।
অস্ট্রেলিয়ান দর্শনীয় স্থানগুলো এত দূরে দূরে যে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে যাওয়া অনেক সময় সবার পক্ষে সহজ নয়। সে ক্ষেত্রে ট্যুর কোম্পানিগুলোর সার্ভিস খুব উন্নতমানের।
সাড়ে আটটায় বোর্ডিং পাস নিলাম। একটি হলুদ রঙের স্টিকার লাগিয়ে দিলো বুকের ওপর। ট্যুর কোম্পানির চিহ্ন এটা। চিহ্ন দেখেই গাইড চিনে নিতে পারবে আমরা কে কোন গ্রুপের। বাসের অর্ধেক ভর্তি হয়ে এসেছে গোল্ডকোস্ট থেকে।
সানশাইন কোস্ট ব্রিসবেন থেকে প্রায় একশ' কিলোমিটার উত্তরে। বাসের ড্রাইভার ছাড়া বাকি সবাই ট্যুরিস্ট। বেশির ভাগই চায়নিজ। আমাদের ড্রাইভার কাম গাইডের নাম স্টিফেন। অদ্ভুত সুন্দর তার বাচনভঙ্গি। চমৎকার তার শব্দচয়ন। আর প্রচুর জ্ঞান রাখে অনেক কিছু সম্পর্কে। পড়াশুনা যে তার ব্যাপক তা বোঝা যায় তার কথায়। মাইক্রোফোনে বিভিন্ন বিষয়ে ও বিভিন্ন স্থান বিস্তারিত বর্ণনা দিতে দিতে গাড়ি চালাচ্ছে সে।
ঠিক আটটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে যাত্রা করেছি আমরা। উইলিয়াম জলি ব্রিজ পার হবার সময় xxxx চিহ্নিত কারখানার পরিচয় দিলো স্টিফেন। ওটা ব্রিসবেনের বিয়ার ফ্যাক্টরি। মেলবোর্নের বিয়ারের নাম ভিক্টোরিয়া বিটার। আর এখানের স্থানীয় বিয়ারের নাম ফোর ক্রস বা xxxx। কেন এই নাম? বড় মজার সেই ইতিহাস। ১৮৫০ সালের দিকে যে সব কয়েদিদের নিয়ে এই ব্রিসবেন তৈরি হচ্ছিলো তারা ছিলো অশিক্ষিত। তাদের যখনই বিয়ার লাগতো ক্যাপ্টেনের কাছে স্লিপ পাঠাতো চারটা ক্রস চিহ্ন দিয়ে। সেই থেকে আস্তে আস্তে এখানকার বিয়ারের নামই হয়ে গেছে xxxx।
শহর ছাড়িয়ে চলেছি আমরা এখন। রাস্তা উঁচুনিচু। দু’পাশে বড় বড় ইউক্যালিপ্টাস গাছের সারি। স্টিফেন সব কিছুরই বিবরণ দিচ্ছে। তার কাছ থেকে জানা গেলো অনেক নতুন তথ্য।
কুইন্সল্যান্ড কাঠের জন্য বিখ্যাত। অস্ট্রেলিয়ার বেশির ভাগ কাঠই সাপ্লাই দেয় এই কুইন্সল্যান্ড। এখানকার ঘরবাড়িগুলোর বেশির ভাগই কাঠের তৈরি। আর পাহাড়ি অঞ্চল বলে বিভিন্ন টিলার উপর বাড়িগুলো তৈরি। বেশির ভাগ বাড়ির বেসমেন্টকে গাড়ির গ্যারেজ আর স্টোর রুম হিসেবে ব্যবহার করা হয় এখানে।
যেতে যেতে দেখছি কুইন্সল্যান্ডের সাবার্বগুলো। বাড়ির উঠানে দেখা গেলো উট চরছে। প্রথমে নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছিলো না আমার। সত্যি সত্যি উট, বাচ্চাসহ চরছে। একমাত্র অস্ট্রেলিয়ায়ই এখনো বুনো উট চরে বেড়ায় জঙ্গলে। অস্ট্রেলিয়া থেকে নিয়মিত উট রপ্তানি করা হয় মধ্যপ্রাচ্যে। অস্ট্রেলিয়ার একটি বিরাট অংশ মরুভূমি। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মরুভূমি অস্ট্রেলিয়ায়।
ইউক্যালিপ্টাস গাছ অস্ট্রেলিয়ার প্রায় সবখানেই আছে। কুইন্সল্যান্ড যেন ইউক্যালিপ্টাসের জঙ্গলে ভর্তি। ইউক্যালিপ্টাসকে এখানে ডাক নামে ডাকা হয়- গামট্রি। স্টিফেন এই গামট্রি সম্পর্কে অনেক মজার মজার তথ্য দিলো।
অস্ট্রেলিয়াতে প্রায় নয়শ' প্রজাতির গামট্রি আছে। গামের পাতা বিষাক্ত এটা জানতাম। কিন্তু ইউক্যালিপ্টাসের তেল যে সর্দি কাশির মহৌষধ তা জানা ছিলো না। এ ওষুধ খাবার নয়, গন্ধ নেবার।
পথের পাশে বিরাট বিরাট ইউক্যালিপ্টাসের বাগান বা জঙ্গল। এক একটা বিরাট বিরাট এলাকা জুড়ে দেখা যাচ্ছে পুড়ে গেছে বন। জঙ্গলে আগুন লাগাটা অস্ট্রেলিয়া বা আমেরিকার একটা বিরাট সমস্যা। দিনের পর দিন বন জ্বলতে থাকে। স্টিফেন বললো, প্রকৃতির এই ব্যাপারটারও প্রয়োজন আছে। স্টিফেনের কথা যতই শুনছি ততই অবাক হচ্ছি।
আগুন লাগলে থামে না কেন বা সহজে নেভানো যায় না কেন এখানে? কারণ ইউক্যালিপ্টাস গাছ থেকে তাপের সাথে সাথে যে রস বের হয় তা দাহ্য। বনে আগুন লাগার মাধ্যমেও ইউক্যালিপ্টাসের বংশবৃদ্ধি হয়। আগুনের সাথে সাথে ইউক্যালিপ্টাসের বীজ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। আর আগুনে ইউক্যালিপ্টাসের বাইরের আবরণ সম্পূর্ণ পুড়ে গেলেও ভেতর থেকে আবার নতুন প্রাণ জন্মে। জন্মে নতুন গাছ।
"প্রকৃতির সব রহস্য যদি মানুষের জানা হয়ে যায় মানুষ তখন কী করবে?" নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিলো স্টিফেন, "মানুষ প্রকৃতির রহস্য সবটুকু কখনোই জানতে পারবে না। মানুষ আসলে দিনের পর দিন তাদের অজ্ঞানতাকেই আবিষ্কার করবে।"
মনে পড়লো রিচার্ড ফাইনম্যানের কথা। তাঁর একটি লেখায় পড়েছিলাম, "ম্যান লার্ন সামথিং টু বিকাম ইগনোরেন্ট এগেইন।" মানুষ চিরদিনই অজানার পেছনে ছোটে।
আমি ভাবছি স্টিফেনের কথা। এত পড়াশোনা, এমন চমৎকার বাচনভঙ্গি, আর এমন সুদর্শন ছেলেটা বাস চালাচ্ছে কেন? তাকে এর চেয়ে বেশি ভালো মানাতো টিভিতে অনুষ্ঠান করলে।


রাস্তার বাঁ পাশে দেখা যাচ্ছে ছোটবড় কয়েকটি পাহাড়। এগুলোর নাম গ্লাস হাউজ মাউন্টেনস। তেরটি মৃত আগ্নেয়গিরি এখানে পাশাপাশি। দুই কোটি বছর আগে এই আগ্নেয়গিরি সক্রিয় ছিলো। ১৭৭০ সালে ক্যাপ্টেন কুক এই পাহাড়গুলোর নাম দিয়েছিলেন গ্লাস হাউজ মাউন্টেন। কেন? কারণ এগুলো দেখে কুক সাহেবের হঠাৎ মনে পড়েছিলো নিজের শহর ইয়র্কশায়ারের গ্লাস হাউজের কথা। মনে হচ্ছে তখন যদি তাঁর নিজের পোষা বেড়ালের কথা মনে পড়তো তাহলে হয়তো এই পাহাড়ের নাম হতো পেট ক্যাট মাউন্টেনস।






সোয়া দশটার দিকে পৌঁছে গেলাম বিগ পাইনঅ্যাপেলে। জায়গাটার আসল নাম উমবাই। কিন্তু বিগ পাইনঅ্যাপল নামেই চেনে সবাই। রাস্তা থেকে চোখে পড়ে বিশাল এক কৃত্রিম আনারস। গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত যার উচ্চতা প্রায় পঞ্চাশ ফুট। বিগ পাইনঅ্যাপল মূলত একটি আনারস বাগান। বিশাল আয়তনের বাগান। আনারস উৎপাদন আর আনারসের রসজাত অন্যান্য খাদ্য প্রস্তুতির পাশাপাশি এখন এটা একটি বিখ্যাত ট্যুরিস্ট স্পট।





গাড়ি থেকে নামতেই ছোট ছোট গ্লাসে আনারসের রস দিয়ে হাসিমুখে অভ্যর্থনা করলো কয়েকজন তরুণী। বিগ পাইনঅ্যাপল আঁকা টি-শার্টে তাদের দারুণ মানিয়েছে। ফার্মের একটি সীমা পর্যন্ত যেতে কোন প্রবেশ মূল্য লাগে না। কিন্তু ভেতরটা ঘুরে বেড়ানোর জন্য মিনি ট্রেনে উঠতে গেলে টিকেট কাটতে হয়। ট্রেন ছাড়াও আরো এক ধরনের গাড়ি আছে ভেতরে। তাও ট্রেনের মতো অনেকগুলো বগি যুক্ত গাড়ি। তবে চাকাগুলো সাধারণ গাড়ির চাকার মত। ঐ গাড়িতে চড়তেও টিকেট কাটতে হয় আলাদা। ফার্মের ভেতর পায়ে হেঁটে বেড়ানোর কোন সুযোগ নেই।
বিশাল আনারসটি ফার্মের বাইরে। শক্ত প্লাস্টিকের তৈরি। ভেতরের সিঁড়ি দিয়ে আনারসের মধ্যভাগে উঠে পুরো আনারস বাগান আর আশেপাশের এলাকা দেখা যায়। আনারসের পেটের ভেতর বিভিন্ন ফল এবং ফলজাত খাবারের রেসিপি, উপকারিতা, খাদ্যমুল্য ইত্যাদি নানারকম ছবি আর তথ্যের সমারোহ।
গেট দিয়ে ঢুকতেই বিশাল রেস্তোরা আর স্যুভেনির শপ। এখানে বড় বড় পাকা আনারস বিক্রি হচ্ছে প্রতিটি মাত্র এক ডলারে। কেউ কেউ কিনলেন এই তাজা পাকা আনারস। মজার ব্যাপার হলো আনারস কাটার যন্ত্রের দাম পনের ডলার।
ছোট্ট ট্রেনটি এঁকেবেঁকে চলে। মানুষের হাঁটার গতির চেয়ে একটুও বেশি নয় এর গতি। আনারস উৎপাদনের প্রত্যেকটি ধাপ দেখানো হচ্ছে। আসলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে আনারসের বৃদ্ধি ঘটিয়ে বীজতলা তৈরি থেকে আনারস উৎপাদন, বাগান থেকে আনারস তুলে তার কী কী প্রসেসিং করা হয় সব দেখানো হচ্ছে।
এখানে বিভিন্ন রকমের বোতলজাত খাবার তৈরি করা হচ্ছে। ফার্মের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য কিছু পশুপাখিও রাখা হয়েছে কয়েক জায়গায়। কয়েকটা ঘোড়া, উটপাখি আর হরিণ দেখা যাচ্ছে। ফার্মের পাশে একটা বড় পুকুর ছিলো কোন এক সময়। এখন দেখলাম সেখানে কোন পানি নেই। মাটি শুকিয়ে ফেটে ফেটে যাচ্ছে।
ফার্মটা সুন্দর। তবে আহলাদে নেচে ওঠার মতো কিছু নয়। শুধুমাত্র প্রচারের কল্যাণেই এই বিগ পাইনঅ্যাপলের এত নামডাক।
পৌনে বারোটায় পাইনঅ্যাপল ফার্ম থেকে বেরিয়ে দেখলাম আমাদের বাস বদল হয়েছে। স্টিফেন বড় বাসটি নিয়ে চলে গেছে। আমাদের সাথে তার আবার দেখা হবে বিকেল চারটায় আমাদের শেষ স্পটে। এখন এসেছে স্টোরি লাইনের একটা মিনিবাস। এই মিনিবাস আমাদের নিয়ে যাবে অস্ট্রেলিয়ান জু দেখাতে।
আমাদের এখনকার গাইডের নাম রয়। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ইনি ভারতীয়। রায় পদবী এখানে রয় হয়ে গেছে। উচ্চারণে তিনি বিশুদ্ধ অস্ট্রেলিয়ান। ঠিক বারোটায় আমাদের নিয়ে মিনিবাস রওনা হলো। রয় বর্ণনা দিচ্ছিলেন বিভিন্ন বিষয়ের। অস্ট্রেলিয়ান জু-এর একটা ম্যাপ হাতে ধরিয়ে দিলেন এবং এই চিড়িয়াখানা সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক ধারণা দিলেন।
অস্ট্রেলিয়ান জু হলো সম্পূর্ণ ব্যক্তি মালিকানাধীন। ইরউইন পরিবার এই চিড়িয়াখানার মালিক। আগে এটার নাম ছিলো অস্ট্রেলিয়ান রেপটাইল পার্ক। তখন শুধু সাপ আর কুমির ছিলো এখানে। এখন আস্তে আস্তে অন্যান্য কিছু প্রাণী যোগ করে একটা পূর্ণাঙ্গ চিড়িয়াখানাতে পরিণত করা হয়েছে এটাকে। কিন্তু এখনো এখানে কুমিরেরই প্রাধান্য।
স্টিভ ইরউইন এই চিড়িয়াখানার প্রধান নির্বাহী। তার বাবাই এই চিড়িয়াখানার প্রতিষ্ঠাতা। এখন স্টিভ আর তার বোন এবং তাদের পরিবার মিলে চালায় এই বিশাল প্রতিষ্ঠান। স্টিভের বোন পেপার ওয়ার্ক দেখে আর স্টিভ দেখে ফিল্ড ওয়ার্ক অর্থাৎ জন্তু জানোয়ার। ডিসকভারি চ্যানেলে স্টিভ এখন ক্রোকোডাইল হান্টার নামে পৃথিবীর অনেক দেশেই পরিচিত নাম। দুপুর দেড়টায় ক্রোকোডাইল শো হলো এই চিড়িয়াখানার মূল আকর্ষণ।
বনের ভেতর বিশাল এলাকা জুড়ে চল্লিশটি আলাদা আলাদা স্পটে বিভিন্ন জন্তু জানোয়ার রাখা আছে। প্রবেশ মূল্য পনের ডলার। আমাদের সবকিছু ট্যুর কোম্পানির সেই ৮৮ ডলারের মধ্যে।
প্রচুর দর্শক। আসলেই বিশাল এই ক্রোকোডাইল পার্ক। রিসেপশানের কাছাকাছি অজগরের আস্তানা। বিশ ফুট লম্বা বিশাল এক অজগর একটা সুপারি গাছ ঘিরে শুয়ে আছে। ছোটবেলায় এই অজগর সাপের ভয়ানক শক্তির কথা বর্ণনা দিতে গিয়ে আমাদের স্কুলের এক শিক্ষক বলতেন অজগর সাপ নাকি একটা হাতির চার পা একসাথে বেড় দিয়ে চাপ দিলে হাতির সব হাড় ছাতু হয়ে যাবে। ব্যাপারটা যে বাড়াবাড়ি রকমের বাড়িয়ে বলা হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আসলেই অজগর সাপ শিকার ধরে তাকে চাপ দিয়ে পিষে মেরে ফেলে। কারণ অজগর ছোবল দেয় না, বিষও নেই তার।
রয় জানালেন এই সাপ এসেছে ভারতের আসাম থেকে। এই তথ্য তিনি কীভাবে পেয়েছেন আমি জানি না। চিড়িয়াখানার দেয়া তথ্যের কোথাও এই অজগরের আদিবাসস্থান সম্পর্কে কিছু বলা নেই।

চিড়িয়াখানার একজন কর্মী একটা মাঝারি সাইজের অজগর গলায় পেঁচিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরছে। লোকটার সাহস আছে সন্দেহ নেই। অজগরের বিষ নেই সত্য, কিন্তু সাপ বলতেই তো গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে আমার।
সাপের জন্য বিশেষ একটা ঘর আছে এখানে। কাচের বড় বড় খোপে রাখা আছে নানারকম জাতের সাপ। একটা কাচের বাক্সে নিরীহ টাইপের কালো চিকন একটা সাপ। দেখলে মোটেও ভয় লাগে না। একটা গালভরা নামও আছে এই সাপের। সাপটা নাকি পৃথিবীতে এ পর্যন্ত জানা সাপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিষাক্ত। এই সাপের মধ্যে এক আউন্স বিষ নাকি একটা হাতিকে মেরে ফেলতে পারে কয়েক সেকেন্ডে। এ তথ্য জানার পরে সাপঘরে আর এক সেকেন্ডও থাকতে ইচ্ছে করলো না।






পার্কের অন্যদিকে প্রচুর কুমির। প্রধানত দু’ধরনের কুমির আছে। মিষ্টি পানির কুমির আর লোনা পানির কুমির। মিষ্টি পানির কুমির একটু ফর্সা টাইপের হয়, আর লোনা পানির কুমির হয় কুচকুচে কালো। সাইজেও লোনা পানির কুমির অনেক বড়। নানারকম কুমিরের জন্য বেশ বড় বড় কৃত্রিম জলাভূমি তৈরি করে তাদের আরামে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মোটা তারজালির বেড়া না থাকলে এই জায়গাটা যে মানুষের জন্য কত বিপজ্জনক হতো তা ভাবলেই কেমন লাগে।


একটা খোলা জায়গায় কিছু বিরাট বিরাট কচ্ছপ ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের একটার নাম হ্যারিয়েট। হ্যারিয়েট নাকি পৃথিবীর জীবিত কচ্ছপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বুড়ো। প্রাণিদের গাম্ভীর্য নিয়ে হ্যারিয়েট ঘুরে বেড়াচ্ছে একটা ড্যামকেয়ার ভাব করে। হ্যারিয়েট কি জানে যে তাকে সব জীবিত কচ্ছপের মুরুব্বি বলা হচ্ছে? হ্যারিয়েট কি পুরুষ নাকি মহিলা? হ্যারিয়েটের কেয়ারটেকার মেয়েটাকে জ্ঞিজ্ঞাসা করেও কোন উত্তর পাইনি।

কুমিরের প্রাচুর্য ছাড়া বাকি সবগুলো প্রাণী অন্যান্য সাধারণ চিড়িয়াখানায় যেমন থাকে। ক্যাঙারু, কোয়ালা, ডিঙ্গু, উট, নানারকমের পাখি ইত্যাদি।
বেলা একটা বাজার আগে থেকেই ২৮নং এলাকার গ্যালারি ভরে যেতে লাগলো। ২৮নং এলাকা হলো অ্যাগ্রোর এলাকা। অ্যাগ্রো এখানকার দ্বিতীয় বৃহত্তম কুমির। অ্যাগ্রোর ওজন এক টনের বেশি। দৈর্ঘ্য পনের ফিট।
পার্কের সবচেয়ে বড় কুমিরের নাম অ্যাকো। দৈর্ঘ্য ১৬ফুট আর ওজন তার অ্যাগ্রোর চেয়ে কিছু বেশি। অ্যাগ্রোকে আপাতত দেখা যাচ্ছে না কোথাও। কেবল ছোটখাট দুটো অতিথি কুমির দেখা যাচ্ছে ২৮নং এলাকার বিশ্রি পুকুরটার পাড়ে অলসভাবে রোদ পোহাচ্ছে।



পুরো এলাকাটি পরপর দুটো শক্ত লোহার বেড়া দিয়ে ঘেরা। বেড়ার বাইরে তিনদিকে দর্শকদের বসার জন্য গ্যালারি। দেড়টায় রেলিং টপকে ভেতরে প্রবেশ করলো খাকি হাফ শার্ট ও হাফ প্যান্টের একজন মানুষ। হাতে বালতি ভর্তি মাংস। কুমিরের খাদ্য। মানুষটাকে দেখেই দর্শকদের চিৎকার হাততালি। লোকটা স্বাগতম জানালো সবাইকে। তার সার্টের কলারে লাগানো শক্তিশালী মাইক্রোফোন তার কথাগুলো পৌঁছে দিচ্ছে সবার কানে। এই লোকটাই স্টিভ। এতবড় আয়োজনের মালিক। অথচ অন্য একশত কর্মচারীর সাথে তার পোশাক বা আচরণের কোন পার্থক্য নেই এখানে। কুমিরকে খাওয়ানোর দৃশ্য হলো ক্রোকোডাইল শো। স্টিভ কুমির সম্পর্কে অনেক কথা বলছে।
অ্যাগ্রো নাকি অ্যাগ্রেসিভ। পুকুরের পানি এখন সম্পূর্ণ স্থির। যে পানিতে কুমির থাকে সেখানে আর কোন প্রাণী বাস করবে যে পানি নড়বে! স্টিভ একদিকের পানিতে সামান্য নাড়া দিলো। পুকুরের অন্যদিকে সামান্য একটা বুদবুদ দেখা গেলো। কুমির পানির নিচ দিয়ে নিঃশব্দে চলাফেরা করতে ওস্তাদ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দেখা গেলো স্টিভ যে জায়গায় পানিতে নাড়া দিয়েছিলো সেখানে অ্যাগ্রোর মাথা। এতবড় পুকুরের আর কোথাও সামান্য বুদবুদ দেখা গেলো না।
অ্যাগ্রোর মাথাটা বীভৎস কুচকুচে কালো। নানা কায়দায় খাবার ছুঁড়ে দিচ্ছে স্টিভ অ্যাগ্রোর দিকে। কিছুক্ষণ খেলা চললো। পুকুরের এপাশ থেকে ওপাশ ছুটোছুটি হলো যেদিকে খাবার যাচ্ছে  অ্যাগ্রো সেদিকে ছুটে যাচ্ছে পানির ভেতর দিয়ে। শুরুতে নিঃশব্দ চলাচল হলেও শেষে পানিতে দাপাদাপি শুরু হয়ে গেছে। কয়েকবার স্টিভকে তাড়াও করলো অ্যাগ্রো।
স্টিভ চাচ্ছে অ্যাগ্রোকে পানি থেকে ডাঙায় তুলে আনতে। একবার মাত্র ডাঙায় উঠলো অ্যাগ্রো। স্টিভের সাইজের পাঁচটা মানুষকে একসাথে হজম করে ফেলতে পারবে এই কুমির।
খেলা শেষে দর্শকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিলো স্টিভ। স্টিভের বৌ টেরিও খেলা দেখায় মাঝে মাঝে। কুমির নিয়ে খেলা করা যেন তাদের কাছে কোন ব্যাপারই না। এমনকি তাদের তিন বছরের মেয়ে বিন্দিও অজগর নিয়ে খেলা করে। স্টিভদের এই পারিবারিক প্রতিষ্ঠানটি এখন অস্ট্রেলিয়ার একটি জাতীয় আকর্ষণ।
বেলা দুটোয় রয় আমাদের নিয়ে রওনা হলেন আন্ডারওয়াটার ওয়ার্ল্ড দেখানোর উদ্দেশ্যে। যাবার পথে কয়েকজন ট্যুরিস্টকে ওঠাতে গেলেন সুপার বি নামে একটা মধু তৈরির কারখানায়।
এই কারখানার আশে পাশে গভীর জঙ্গল। বিশাল বিশাল গাছ। গাছগুলোকে খুব একটা পরিচিত মনে হচ্ছে না। হয়তো অন্য কোন প্রকার গাম। সুপার বি অস্ট্রেলিয়ার একটি প্রধান মধু তৈরির কারখানা। মৌমাছির চাষ করা হয় এখানে। তারপর মধু। ট্যুরিস্টদের অনেকেই কৌটো ভর্তি মধু কিনলেন এখান থেকে। খাঁটি মধু নাকি কাজে লাগে। কিন্তু আমার ভালোই লাগে না এই মিষ্টি জাতীয় তরল পদার্থটি।



আমাদের প্যাকেজ ট্যুরের শেষ অংশ আন্ডারওয়াটার ওয়ার্ল্ড। সাগর তলের প্রাণিদের জগত। অ্যাকোরিয়ামের অন্য নাম হয়েছে এখানে আন্ডারওয়াটার ওয়ার্ল্ড। সিডনি বা মেলবোর্নের অ্যাকোরিয়ামের মতোই সবকিছু। হাঙর, ঈল, কাছিম, নানারকম জেলিফিশ ইত্যাদি। তবে ব্রিসবেনের এই স্থানের বিশেষ আকর্ষণ হলো সিল শো।



দুটো সিল মাছ নানারকম শারীরিক কসরৎ দেখালো। হাত মানে পাখনা তুলে স্যালুট দেয়। লেজের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সিড়ি বেয়ে হেঁটে হেঁটে উঠানামা করতে পারে এই সিল মাছ। খাবারের লোভ দেখিয়ে এদের কাছ থেকে কাজ আদায় করা হয়। আর কাজের শেষে পুরস্কার হিসেবে মাছ খেতে দেয়া হয়। সিলমাছ দুটো মুখের ওপর প্লাস্টিকের বল নিয়ে ছোটে বা পরস্পর বল ছুঁড়ে ওয়াটার পোলো খেলে সত্যিই আশ্চর্য লাগে। মানুষ যে কীভাবে অন্যান্য প্রাণির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলে, সিল মাছ থেকে কুমির সে যে প্রাণীই হোক।

এবার ব্রিসবেনে ফেরার পালা। ঠিক চারটায় বাস নিয়ে হাজির স্টিফেন। ফেরার পথে স্টিফেনকে একটু চুপচাপ মনে হলো। একটা ভিডিও চালিয়ে দিলো সে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে স্টিফেন একটা ট্যুর বাস অপারেট করছে। ধারাবিবরণী দিচ্ছে সে। এই হোম ভিডিওর মান প্রফেশনাল কোয়ালিটির চেয়ে কোন অংশে কম নয়। স্টিফেনের এই প্রোগ্রাম প্রচারিত হয়েছে কিনা আমি জানি না। এখানে তো অনেকগুলো টিভি চ্যানেল। ট্যুরিস্টদের অনেকেই ব্রিসবেন পর্যন্ত আসার আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
স্টিফেন হঠাৎ মাইক্রোফোনে বললো, "এই ট্যুর আমার শেষ ট্যুর। পনের বছর পরে কাল থেকে আমার ছুটি।"
ব্রিসবেন ট্রানজিট সেন্টারে বাস থেকে নামার পরে স্টিফেনকে ধন্যবাদ দিলাম তার চমৎকার গাইডিং-এর জন্য। জানতে চাইলাম, "শেষ ট্যুর বলতে তুমি কী বুঝাচ্ছো?"
"চাকরি ছেড়ে দিচ্ছি আজ।"
"কেন? এত ভালো করছো এখানে।"
"অন্য চাকরিতে যাচ্ছি। কম্পিউটার ইন্ডাস্ট্রিতে ঢুকছি এবার প্রোগ্রামার হিসেবে।"
স্টিফেনের সাথে কিছুক্ষণ আলাপ করলাম। স্টিফেন নাইট শিফটে পড়াশোনা করে কম্পিউটার প্রোগ্রামার হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার কম্পিউটার কাউন্সিলের স্বীকৃতি অর্জন করেছে এবং নতুন একটা চাকরিতে যোগ দিচ্ছে কাল থেকে। স্টিফেনের মেধা আর দক্ষতার যতটুকু পরিচয় পেয়েছি তাতে বুঝতে পারছি সে আরো অনেক উন্নতি করবে।
মানুষকে পরিশ্রম করে উন্নতি করতে দেখলে নিজের ভেতরও এক ধরনের অনুপ্রেরণা জাগে। মনে মনে বললাম, একদিন আমিও-। আমিও- কী করবো? বাস চালাবো নাকি কম্পিউটার প্রোগ্রামিং করবো? জানি না।
ট্রানজিট সেন্টারের দোতলায় নামতেই পেটের ক্ষুধাটা জেগে উঠলো। সারাদিনে একটা চিকেন স্যান্ডুইচ ছাড়া আর কিছুই খাওয়া হয়নি। আমার চায়নিজ রেস্তোরা ইতিমধ্যেই খাবার সাজিয়ে ফেলেছে। তেমন ভিড় নেই এখন। আসলে এখনো ডিনারের সময় হয়নি।
খাবার নিতে নিতে কাউন্টারের আধ বয়সী চায়নিজ ভদ্রলোকের সাথে আলাপ জুড়ে দিলাম। এই চায়নিজ ভদ্রলোকটি ভাঙা ভাঙা ইংরেজি বলেন। সাত বছর ধরে তিনি আছেন অস্ট্রেলিয়ায়। এই দোকানের মালিক তিনি। তার এখন তিন মেয়ে। বড়মেয়ের বয়স আঠারো। বাকি দুইজনের ছয় আর চার। বড় মেয়ে এখানে ক্যাশ সামলাচ্ছে।
ভদ্রলোক কথা বলতে ভালোবাসেন বুঝতে পারছি। কথা শুনে তাকে বেশ আমুদে লোক বলেই মনে হচ্ছে। চায়নিজরা নাকি মনের কথা মুখে বলে না বা মুখে যা বলে তার বেশির ভাগই তাদের মনের কথা নয়। সে যাকগে। আমি তাঁর খাবারের প্রশংসা করে বিদায় নিলাম।
হোস্টেলে ফেরার পথে রোমা স্ট্রিটের কর্নারে একজন বিশালদেহী খোঁচা খোঁচা দাড়িমুখ মাতাল পথ আগলে দাঁড়ালো আমার।
"ডু ইউ হ্যাভ ফিফটি সেন্টস ম্যান?"
অস্ট্রেলিয়ার সব শহরেই এরকম ব্যাপার দেখা যায় মাঝে মাঝে। মদ খাওয়ার জন্য বা ড্রাগ নেবার জন্য এভাবে পয়সা চায় লোকের কাছ থেক। বিশেষ করে আপাত দৃষ্টিতে দুর্বল লোকের কাছে। আমি লোকটার চোখের দিকে তাকালাম। ফিফটি সেন্ট দেবার জন্য যদি কিছু বের করি সব নিয়েই যে চলে যাবে এরকম একটা ভাব তার। তাকে পয়সা দেবার কোন ইচ্ছাই আমার নেই। একটু ভয় ভয় করলেও খুব একটা বিচলিত হলাম না। কারণ জোরে চিৎকার করলে সাড়া পাবার মতো লোকজন এখনো আছে রাস্তায়। লোকটার কাছে কোন গাড়ি নেই, তাই ছুটে পালাবার আগেই ধরা পড়বে সে।
আমি সোজা বাংলায় হাসিমুখে বললাম, "তুমি কী বলছো আমি বুঝতে পারছি না।"
"হোয়াট!!!"
লোকটা চমকে উঠেছে। আমি এবার বেশ জোরে বললাম তার চোখে চোখ রেখে, "তোমার ভাষা আমি বুঝি না।"
লোকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দ্রুত পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। আমি খুব মজা পেয়ে গেলাম তার এই প্রতিক্রিয়ায়। মনে হলো বাংলা খুব কার্যকরী ভাষা এখানে।

__________________
এ কাহিনি আমার 'অস্ট্রেলিয়ার পথে পথে' বইতে প্রকাশিত হয়েছে। তবে ছবিগুলো আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি।

No comments:

Post a Comment

Latest Post

নিউক্লিয়ার শক্তির আবিষ্কার ও ম্যানহ্যাটন প্রকল্প

  “পারমাণবিক বোমার ভয়ানক বিধ্বংসী ক্ষমতা জানা সত্ত্বেও আপনি কেন বোমা তৈরিতে সহযোগিতা করেছিলেন?” ১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বরে জাপানের ‘কাইজো’ ম্য...

Popular Posts