Thursday 20 December 2018

সূর্যনগর ব্রিসবেন - ৫ম পর্ব



দরজায় ঠক ঠক শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো। চোখ খুলে ঘড়ির দিকে তাকালাম। সকাল আটটা। এত সকালে রুম সার্ভিস? বিরক্ত হয়ে উঠে দরজার ছিদ্রে চোখ রেখে দেখি মিকি। দরজা খুলতেই মিকির হাসিমুখ। পিঠে বিশাল ব্যাগ।
"সরি, তোমার ঘুম ভাঙালাম। জাস্ট টু সে গুডবাই।"
"গুডবাই মিকি, টেক কেয়ার।"
"তোমার গতকালের তিন ডলার। দিতে ভুলে গিয়েছিলাম।"
মিকির হাত থেকে এক ডলারের তিনটা কয়েন নিতে নিতে বললাম, "থ্যাংক ইউ মিকি।"
মিকি আমার সাথে হ্যান্ডশেক করে বললো, "গুডবাই।"
হাসিমুখে বিদায় দিলাম তাকে।
ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে একটু। জুন মাসে কুইন্সল্যান্ডে বৃষ্টি হয় না বললেই চলে। গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মাত্র ছয় মিলিমিটার। ব্যস্ত রাস্তা। সোমবারের কার্যদিবস শুরু হচ্ছে। আকাশে সামান্য একটু মেঘ দ্রুত সরে যাচ্ছে সূর্যের তাপ বাড়ার সাথে সাথে। ব্রিসবেন নদী টানছে আমাকে। নদীটা শহরের তিন দিক ঘিরে আছে বলে এই তিন দিকের যে কোন দিকে একটানা হাঁটলে নদীর পাড়ে পৌঁছে যাওয়া যায়।
রোমা স্ট্রিট ধরে পশ্চিম দিকে হেঁটে গিয়ে দক্ষিণে ফিরলেই উইলিয়াম জলি ব্রিজ। এর পূর্বদিকে জলি ব্রিজের সমান্তরালেই আরেকটি রেলব্রিজ- মেরিভেল ব্রিজ। তার ওপর দিয়ে ছুটে চলেছে কিউ-আর লেখা কুইন্সল্যান্ড রেলওয়ে ট্রেন।
ব্রিজের উপর থেকে নদীর উত্তর পাড়ে তাকালে চোখে পড়ে ব্রিসবেন হাইওয়ে আর সিটিওয়ে। নদীর তীর ঘেঁষে তিনটি রাস্তা একটার উপর দিয়ে অন্যটা চলে গেছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় একটা তিনতলা রাস্তা। এই সকালে সবারই কাজে যাবার তাড়া। রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম না হলেও গাড়ির ভিড় প্রচুর। বোঝা যাচ্ছে এই ভিড় শহরকেন্দ্রিক। কারণ ১৭ লক্ষ ২৭ হাজার বর্গ কিলোমিটারের বিশাল কুইন্সল্যান্ডের জনসংখ্যা মাত্র ৩০ লাখ। অর্থাৎ কিনা শুধুমাত্র চট্টগ্রাম শহরের জনসংখ্যার সমান মানুষ বাস করছে বাংলাদেশের চেয়ে বারোগুণ বড় আয়তনের একটি এলাকায়।
জলি ব্রিজের উপর দিয়ে হেঁটে দক্ষিণ পাড়ে গিয়ে নামলাম। রাস্তার ডান পাশে কিছু আবাসিক হোটেল। বেশ বড় একটি কারখানাও দেখা যাচ্ছে এখানে। কিসের কারখানা ঠিক বুঝতে পারলাম না। চিমনির গায়ে লেখা আছে xxxx।
পাশের ছোট্ট পথ ধরে নামলাম ব্রিজের নিচ দিয়ে যাওয়া কাঠের ফুটব্রিজে। সকালবেলা কাঠের ফুটব্রিজ মোটামুটি খালি। একজন দু’জন দৌড়াচ্ছেন শরীরের মেদ কমানোর সাধনায়। ব্রিজের নিচে হাজারো কবুতরের বাসা। আশ্চর্যজনকভাবে কয়েকজন মানুষেরও বাস এখানে এই ব্রিজের নিচে। তেল চিটচিটে কয়েকটি ম্যাট্রেস ছড়ানো আর কিছু বাক্স প্যাটরা। নদীর পাড়ে বসার চেয়ারে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছেন কয়েকজন মানুষ। দারিদ্র্য এবং দরিদ্র এখানেও আছে তাহলে। অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য শহরের মতো এখানকার দরিদ্র মানুষেরাও সব কালো আদিবাসি সম্প্রদায়ের, সারভাইভ্যাল অব দি ফিটেস্ট-এর যুদ্ধে যারা পিছিয়ে পড়েছে বারবার।


নদীর পাড় ধরে কিছুদূর হাঁটলেই কুইন্সল্যান্ড স্টেট লাইব্রেরির ঘাট। লাইব্রেরির কর্মকর্তাদের অনেকেই ফেরিতে যাতায়াত করেন। লাইব্রেরির নিচের তলার রেস্তোরাঁর একটা অংশ একদম নদীর সাথে লাগানো। লাইব্রেরির ছাদে সুন্দর বাগান। নানা রঙের মৌসুমী ফুল ফুটে আছে সমস্ত বাগান জুড়ে। লাইব্রেরির ভেতরে একটা চক্কর দিয়ে বেরিয়ে এলাম।


তার পাশেই আর্ট গ্যালারি। গতকাল বিকেলে ঢুকতে পারিনি এখানে। এখন ভেতরে ঢুকে ঘুরে এলাম। আর্ট গ্যালারিগুলো সব জায়গাতেই ধরতে গেলে একই রকম। সেই নিয়ন্ত্রিত আলো, পরিপাটি দর্শক আর গম্ভীর নিস্তব্ধতা। চিত্রকর্মগুলো দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু ঠিক বুঝতে পারি না তাদের স্টাইল বা বিবর্তন।
আর্ট গ্যালারিতে স্থায়ী প্রদর্শনী ছাড়াও কিছু অস্থায়ী প্রদর্শনী চলছে। পৃথিবীবিখ্যাত সব শিল্পীদের মূল শিল্পকর্ম কিছুদিনের জন্য নিয়ে প্রদর্শন করা হয়। এখন এখানে চলছে জন ব্র্যাক-এর চিত্র প্রদর্শনী। মূল ছবিগুলো ক্যানবেরার ন্যাশনাল গ্যালারি অব অস্ট্রেলিয়ার সম্পদ। শিল্পী হিসেবে জন ব্র্যাক কেমন তা আমি বলতে পারবো না। ছবি আর গ্যালারি দেখে বেরিয়ে এলাম ঘন্টাখানেকের মধ্যে।
নদীর পাড় ধরে হাঁটছি। এখন ফুটব্রিজে বেশ ভিড়। আর দলে দলে  স্কুলের ছেলেমেয়ে। অস্ট্রেলিয়ায় এখন স্কুল হলিডে চলছে। হাঁটতে হাঁটতে সিটি বিচের কাছে এসে বসলাম একটা বেশ বড় পাথরের উপর। বিচে এখনো তেমন লোকজন নেই। কয়েকজন কর্মচারী পাম্প বসিয়ে বিচের বালি উঠাচ্ছে। এখানে পানির গভীরতা নিয়ন্ত্রিত। বাচ্চাদের অংশে এক মিটারের কম আর বড়দের অংশে সর্বোচ্চ এক দশমিক আট মিটার।
বিচ পেরিয়ে কিছুদূর গেলে শুরু হয়েছে গভীর অরণ্য। রেইন ফরেস্টের শহুরে সংস্করণ। কৃত্রিম লেকে কিছু হাঁস চরে বেড়াচ্ছে। অরণ্যের কাছাকাছি একটা নেপালি মন্দির। কাঠের তৈরি এই মন্দিরটার কারুকাজ আকর্ষণীয়। ভেতরে একটি বড় পিতলের মূর্তি আছে যার অসংখ্য হাত। এই নেপালি দেবতাটির নাম জানা গেলো না। মন্দিরের চূড়াটা সোনালি। একজন বললেন পুরোটাই সোনার তৈরি। যদি সত্য হয়, তাহলে এখানে কয়েক মণ সোনা লাগার কথা। আর সোনা তো দেবতার মাথার উপর থাকলেও নিরাপদ নয়। সুতরাং খাঁটি সোনার ব্যাপারটা আমার বিশ্বাস হলো না।


হাঁটতে হাঁটতে মেরিটাইম মিউজিয়ামের এসে ঢুকলাম। জাহাজের কলকব্জা থেকে শুরু করে ক্যাপ্টেনদের পোশাক, কেবিন ইত্যাদি সব জাহাজ সম্পর্কিত জাদুঘর। ক্যাপ্টেন কুক অস্ট্রেলিয়া দ্বীপের আবিষ্কারক হিসেবে বেশ খাতির পেয়ে থাকেন এদেশের সবখানে। মেরিটাইম মিউজিয়ামেও তাঁর ব্যবহৃত কিছু ম্যাপ রাখা আছে।
মেরিটাইম মিউজিয়ামের তীরে একটি মেমোরিয়াল পার্ক। ছোট্ট পাহাড় জুড়ে ছোট্ট পার্ক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভও আছে এখানে। এক ঝুড়ি তাজা ফুল কে যেন রেখে গেছে স্মৃতিস্তম্ভের বেদিতে।
এদিকের রাস্তাটি নদী থেকে অন্তত একশ’ ফুট উঁচুতে। রাস্তার নাম ভালচার স্ট্রিট। এ রাস্তা চলে গেছে অনেক উঁচু পাহাড়ের দিকে। আস্তে আস্তে হেঁটে দেখলাম রাস্তার একদিকে উঁচু দেয়াল তোলা। দেয়ালের মাঝে মাঝে রেলিং ঘেরা লুকআউট। এখানে দাঁড়ালে পুরো ব্রিসবেন শহর দেখা যায়। পুরু দেয়ালের গায়ে মোটা মোটা হুক লাগানো। কয়েকজন দড়ি নিয়ে কাজ করছে সেখানে। এই সেই খাড়া পাহাড়, যেটাতে গতকাল উঠতে চেষ্টা করেছিলাম মিকির সাথে। মিকি এখন কেইনস-এর পথে। তার সাথে হয়তো আর কখনো দেখাই হবে না আমার।
পাহাড়ের ওপরে এদিকে আবাসিক এলাকা। বিশাল বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংগুলোর আকৃতি প্রকৃতি দেখেই বুঝতে পারছি অভিজাত সম্প্রদায়ের লোকরা বাস করে এদিকে। ঘাড় বাঁকা করে এদিক সেদিক দেখতে দেখতে আবার চলে এলাম নদীর সমতলে। দক্ষিণ পাড় দেখা হয়েছে। এবার ভিক্টোরিয়া ব্রিজ পার হয়ে উত্তর পাড়।
পুরনো ট্রেজারি বিল্ডিং

নশুরুতেই চোখে পড়লো প্রাচীন ইটালিয়ান স্টাইলের বিশাল বিল্ডিংটার দিকে। পুরোনো ট্রেজারি বিল্ডিং। এখন রাষ্ট্রীয় তহবিলের ধরন বদলে গেছে, তাই ভবনও বদলে গেছে। পুরোনো এই খাজাঞ্চিখানা এখন হয়ে গেছে ট্রেজারি ক্যাসিনো। জুয়া খেলার কেন্দ্র।
দেয়ালের প্রাচীন শিল্পকর্মের ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে আধুনিক রঙিন বিজ্ঞাপন। লোভের হাতছানি। ‘এসো, এক ডলার খেলে মিলিয়ন ডলারের জ্যাকপট জিতে নাও’। যাদের টাকা এবং টাকার প্রতি লোভ দুটোই আছে তারা ছুটছে। আমার ওদুটোর কোনটাই নেই, কেবল আছে সামান্য কৌতূহল। ভেতরে ঢুকে দেখলাম সব চাঁদির যেমন একই রূপ, সব ক্যাসিনোরই একই দৃশ্য। মেলবোর্নের ক্রাউন ক্যাসিনোতে তবুও কিছু সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা আছে, এখানে তাও নেই।
ট্রেজারি ক্যাসিনোর পাশে একটা বিল্ডিং এর পরেই কুইনসল্যান্ড সায়েন্স সেন্টার। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের ভিড়ে গমগম করছে। এখানে টিকেট লাগে। ছয় ডলারের টিকেট কেটে ভেতরে ঢুকলাম। তিনতলা ভবনের পুরোটা জুড়েই সাধারণ বিজ্ঞানের স্থায়ী প্রদর্শনী।





নিচের তলায় শুরুতেই একটি সাইক্লোন সেন্টার। কাচের বিরাট জার ভর্তি পানিতে দেখানো হচ্ছে সমুদ্রে সাইক্লোন কীভাবে তৈরি হয়। নিচু টেবিলের সাথে লাগানো সুইচে চাপ দিলেই সাইক্লোনের প্রত্যেকটি ধাপ একে একে ঘটতে থাকে জারের পানিতে। দেয়ালে এই ধাপগুলোর সহজ ব্যাখ্যা দেয়া আছে। ছেলেমেয়েরা খেলতে খেলতেই শিখে নিচ্ছে চাপ, তাপ, আর্দ্রতা প্রভৃতি আপাত খটমটে বিষয়গুলো।



পাশের ঘরে আলোর কেরামতি। বিভিন্ন রঙের আলোর মিশ্রণে নতুন রঙের সৃষ্টি বা বিনাশ। লাল গোলাপের ওপর সবুজ আলো পড়ার পরে গোলাপটাকে কালো দেখাচ্ছে। কেন এরকম হচ্ছে? স্কুলের নিচু ক্লাশের ছাত্রছাত্রীদের উপযোগী এই বিষয়গুলো তারা খুব উপভোগ করছে।
স্যাটেলাইট টেলিফোন কীভাবে কাজ করে তা হাতে কলমে দেখানো হচ্ছে দুটো ডিশ অ্যান্টেনার মাধ্যমে। স্কুলের ছেলেমেয়েরা নিজেরাই তৈরি করছে কম শক্তির টেলিফোন।
দোতলার একটি বেশ বড় ঘরে পদার্থবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সূত্রগুলোর ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ দেখানো হচ্ছে। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস আমাদের দেশের যে সমস্ত ছেলেমেয়েরা উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়তে পড়তেই পদার্থবিজ্ঞানকে ঘৃণা করতে শুরু করে বা শিক্ষকের কারণে ভালোবাসা ঘৃণায় পরিণত হয়, তারা যদি এই প্রয়োগ এবং ব্যাখ্যা দেখতে পেতো, বুঝতে পারতো এমন সহজ করে, তাহলে পদার্থবিজ্ঞান যে আসলে একটি মজার সাবজেক্ট তা বুঝতে পারতো। না দেখে বা না বুঝে ভালোবাসা সম্ভব নয়।
কিশোর-কিশোরীদের জন্য ছোট্ট একটা ক্রিকেট পিচ আছে এখানে। না, ক্রিকেট খেলা শেখানো হচ্ছে না এখানে। ক্রিকেট বলের গতিবেগ মাপা হচ্ছে। এখানে বেশ ভিড়। সবাই বল ছুঁড়ে নিজের বলের গতিবেগ দেখছে ডিজিটাল স্পিডোমিটারে। ছেলেদের মুখ দেখে মনে হচ্ছে সবাই এক একজন ফাস্ট বোলার হবার স্বপ্ন দেখছে। কীভাবে বলের গতি মাপা হয়, তার সুন্দর ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। প্রায় একই রকম পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় রাস্তায় গাড়ির গতিবেগ মাপার ক্ষেত্রেও।
বিজ্ঞানের উঁচু ক্লাশের ছাত্রছাত্রীদের কাছে এই সায়েন্স সেন্টারকে মনে হতে পারে কম গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটা জাতি গঠনে যে ন্যূনতম বিজ্ঞান জানা দরকার তা জানার জন্য এ ধরনের প্রতিষ্ঠান খুবই দরকারি। আমাদের মতো দেশে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার দরকার ছিলো সবচেয়ে বেশি। কিন্তু যে দেশে শিশুদের জন্য ভালো কোন বই-ই লেখা হয় না, সেখানে হতাশাটাই আগে আসে।
তিনতলার একটি হলে প্রতিঘন্টায় চলছে বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা। সহজ সহজ বিষয়ে বক্তৃতা করছে ইউনিভার্সিটির প্রথম দ্বিতীয় বর্ষের স্টুডেন্টরা। আজকের বিষয় হলো শব্দের কলাকৌশল। বক্তৃতা দিচ্ছে অ্যানি হিন্ডেল। কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ার সায়েন্সের ছাত্রী। অ্যানি শিশু কিশোরদের উপযোগী চমৎকার বক্তৃতা দিলো। কথা বলার সাথে সাথে সে প্র্যাকটিক্যালি দেখিয়ে দিলো যে তত্ত্বের সাথে বাস্তবের কোন বিরোধ নেই।
একটা লম্বা প্লাস্টিকের টিউব দিয়ে সে শব্দের তীব্রতা, বেগ ইত্যাদি পরীক্ষামূলকভাবে ব্যাখ্যা করলো। জানা এবং জানানো দু’টি ভিন্ন জিনিস। জানেন অনেকেই, কিন্তু সঠিকভাবে জানাতে পারেন কয়জন? পড়লেই জানা যায়, কিন্তু বললেই জানা যায় না। বিশেষ করে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে। বিজ্ঞানের এই আর্টগুলো শেখা যে কত জরুরি তা আবার নতুন করে জানলাম। আজকের যুগে বিজ্ঞান আমাদের সব সময়ের সঙ্গী। ব্যবহারিক জীবনের সঙ্গী আসলে। কিন্তু মনোজগতে আমরা এখনো বিজ্ঞানের চেয়ে অবৈজ্ঞানিক ধ্যান ধারণাকে বেশি প্রশ্রয় দিই। লৌকিক বাস্তবতার চেয়ে অলৌকিক কিছু ঘটার জন্য আশা করে বসে থাকি।
পার্লামেন্ট হাউজ

সায়েন্স সেন্টার থেকে বেরিয়ে উইলিয়াম স্ট্রিট ধরে পূর্বদিকে কিছুদূর এগোলেই কুইন্সল্যান্ড পার্লামেন্ট হাউজ। পার্লামেন্ট হাউজটা খুব একটা আকর্ষণীয় নয়। পুরোনো গ্রিক স্টাইলের যেনতেন একটা তিনতলা ভবন। আমাদের দেশের পার্লামেন্ট হাউজ দেখলে এরা অবাক হয়ে সিডনি অপেরা হাউজের সাথে তুলনা করবে। অবশ্য পার্লামেন্ট অধিবেশন দেখলে কীসের সাথে তুলনা করবে তা আমার জানা নেই।




কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি
পার্লামেন্ট হাউজের দেয়াল থেকেই শুরু হয়েছে কুইনসল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির ক্যাম্পাস। ক্যাম্পাসের দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় কুইন্সল্যান্ড গভর্নমেন্ট হাউজ। ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসটা খুব বেশি বড় নয়। বিল্ডিংগুলো এ বি সি ডি ইত্যাদি নামে পরিচিত। পুরো ক্যাম্পাসটা ঘুরে দেখলাম। ইউনিভার্সিটি বিল্ডিংগুলোকে কিছুটা ঘিঞ্জি বলে মনে হলো। এই ক্যাম্পাসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো সামনের বিশাল বোটানিক্যাল গার্ডেন।
বোটানিক্যাল গার্ডেন

ব্রিসবেন সিটি বোটানিক্যাল গার্ডেনটা এখানে। দুই পাশে নদী। মাঝখানে এক চিলতে হ্রদ। হ্রদে নানাজাতের ছোটবড় হাঁস চড়ে বেড়াচ্ছে। নদীর তীর ঘেঁষে ঘন বন। বনের ভেতর কোন কোন জায়গায় এত গভীর বন যে সূর্যও দেখা যায় না। তখন মনেই হয় না যে এই বনটা শহরের মাঝখানে অবস্থিত। এক পাশে বড় বড় তাল গাছের সারি। সেখানে সবুজ ঘাসের চাদরে বসে আছে অনেক মানুষ।
কাছেই ফুড সেন্টার। একটা ভেজিটেবল স্যান্ডুইচ আর কোক নিয়ে এসে বসলাম ঘাসের ওপর তালগাছের ছায়ায়। কিছু সাদা সাদা হাঁসের মতো পাখি ঘুরে বেড়াচ্ছে আশেপাশে। একটু শব্দেই উড়ে আকাশে উঠছে আবার নেমে আসছে নিচে। আস্তে আস্তে ঘাসের উপর শুয়ে পড়লাম। শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখতে খুব ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে এভাবে ঘাসের উপর শুয়ে আকাশ দেখতে দেখতে যদি কাটে সারাটা জীবন- খুব একটা মন্দ হয় না। সারাটা জীবন আসলে কাটানো সম্ভব নয়, কিন্তু সারাটা বিকেল কাটালাম এখানে।
ব্রিসবেন অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম শহর। উন্নত পৃথিবীর বড় বড় শহরের সবগুলোই নাকি দেখতে একই রকম। আমি পুরো পৃথিবীর কথা জানি না। তবে বলতে পারি মেলবোর্ন, সিডনি বা এডেলেইড সিটির সাথে ব্রিসবেনের খুব বেশি একটা পার্থক্য নেই। সেই উঁচু উঁচু বিল্ডিং, শপিংমল, হোটেল, রেস্তোরা, বার, রঙিন সুরুচি আর কুরুচির বিজ্ঞাপন, রাস্তায় লাল সবুজ বাতি, ব্যস্ত মানুষ, বেকার মানুষ, ধনী মানুষ, মাতাল মানুষ এবং আমার মতো ক্যাবলাকান্ত মানুষ সবখানেই আছে। তারপরও প্রত্যেকটা জায়গার আলাদা নিজস্ব কিছু একটা থাকে। ব্রিসবেনেরও আছে। সুন্দর হাওয়া আর সীমাহীন নীল আকাশ।




সিটির রাস্তায় রাস্তায় হাঁটলাম কিছুক্ষণ সন্ধ্যার মুখে। কুইন স্ট্রিটের শপিংমলটা খুব সুন্দর। এই স্ট্রিটের উত্তর প্রান্তের শেষ সীমানায় নদীর পাড়ে কাস্টমস হাউজ। তারপাশে বিশাল রিভার সাইড মার্কেট। মার্কেটের ভেতর দিয়ে নদীর পাড়ে গিয়ে বসলাম। অফিস ছুটি হয়েছে। মানুষ অপেক্ষা করছে ফেরির জন্য। লাইন ধরে দাঁড়ানো নারী-পুরুষ। অফিসের উঁচুপদ আর নিচুপদের সব মানুষই এখানে একই লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন ফেরিতে ওঠার জন্য।
ছোট ছোট ফেরিগুলোতে ত্রিশজন মানুষ উঠতে পারে। ত্রিশ জন ওঠার পর বাকিরা নীরবে অপেক্ষা করতে থাকেন পরবর্তী ফেরির জন্য। নির্দিষ্ট সময়েই আসে ফেরি। তবুও মানুষের স্বাভাবিক উৎকন্ঠা যায় না। গলা উঁচু করে তাকায় নদীর দিকে যতদূর দেখা যায়। নদীর ঘাটে বসে মানুষ দেখতে ভালোই লাগছে আমার। নানা পেশার নানা রকম মানুষ, ভিন দেশের অচিন মানুষ।
আস্তে আস্তে আঁধার নেমে এলো। স্টোরি ব্রিজের বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। ব্রিসবেন নদীর পানিতে পড়েছে তার ছায়া। আকাশ কালো হবার সাথে সাথে তারার আলো ফুটে বেরুচ্ছে। প্রকৃতি ও মানুষের গড়া পৃথিবীর এই বিস্ময়কর সৌন্দর্যে আমি আবারো মুগ্ধ হলাম।
________________
এ কাহিনি আমার 'অস্ট্রেলিয়ার পথে পথে' বইতে প্রকাশিত হয়েছে। তবে ছবিগুলো আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি। 



No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 6

  The habit of reading books was instilled in us from a young age, almost unknowingly. There was no specific encouragement or pressure for t...

Popular Posts