Monday 10 December 2018

সূর্যনগর ব্রিসবেন - ১ম পর্ব



কিছু কিছু মানুষ আছে যাঁরা কোন কিছুতেই সহজে প্রলুব্ধ হন না। তাঁরা খুব উঁচু পর্যায়ের মানুষ বলে আমার ধারণা। আমারো মাঝে মাঝে সাধ হয় সেসব অসাধারণ মানুষের মতো মুখে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব ফুটিয়ে তুলে পৃথিবীর সব আকর্ষণের প্রতি উদাসীন হয়ে থাকি। কিন্তু আমার এই বৈরাগী ভাবের স্থায়িত্ব বড়জোর তের মিনিট। আমার প্রফেসর যখন বছরে দু'বার পৃথিবী চষে বেড়ান, আমি উদাসীন হয়ে ভাবতে চেষ্টা করি- কী দরকার এত ঘোরাঘুরির! কিন্তু অন্তরে বড়ই যাতনা হয়। জেনে শুনে আঙুরের টকত্ব নিয়ে গলাবাজি কারা করে এবং কেন করে তা তো মোটামুটি জানি।
জুন জুলাই মাসে মেলবোর্নে প্রচন্ড শীত। শুধু শীত হলে তাও হতো। সঙ্গে বিশ্রী রকমের প্যাটপ্যাটে বৃষ্টি আর বিশ্রীতর ঝড়ো হাওয়া। তাপমাত্রা শূন্যের নিচে না নামলেও কেমন জানি অসহ্য লাগে। বাংলাদেশে ‘পৌষ মাস’ আর ‘সর্বনাশ’ পরস্পর বিপরীতার্থক শব্দ হলেও মেলবোর্নে তা সমার্থক। আমার সুপারভাইজার এই কারণেই ইউরোপ চলে যান এসময়। ইউরোপের সামার তাঁকে টানে। কিন্তু আমার তো সেই সুযোগ নেই। সুতরাং চেষ্টা করি উদাসীন হবার। মনে মনে পৃথিবীর অনিত্যতা সম্পর্কে ভাবতে চেষ্টা করি। কিন্তু মন তাতে ভরে না, মন আরো উড়ু উড়ু করে। দুধ যাদের জোটে না তাদের জন্য ঘোল নামক একটা বস্তু আছে। মেলবোর্নের শীত থেকে পালিয়ে যারা ইউরোপে যেতে পারে না তাদের জন্যও নিশ্চয় একটা কিছু আছে। কিন্তু কোথায় আছে?
উত্তরটা পাওয়া গেলো কিছুটা অপ্রত্যাশিতভাবে। মধ্যরাতে বাসায় ফিরে টেলিভিশন খুলতেই চ্যানেল সেভেনের বিজ্ঞাপন। মোটাসোটা কালো ভদ্রলোক- দেখলেই বোঝা যায় অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসি- ছোট্ট একটা নৌকার মতো বস্তু হাতে নিয়ে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে ঘাড় বেকিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে যা বললো তার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায়- "তুমি এখনো ঘরে বসে আছো? অলওয়ার্ক নো প্লে- ভালো নয়। এখুনি বেরিয়ে পড়ো। কোথায়! কোথায় আবার? কুইন্সল্যান্ড। চিরবসন্ত সেখানে। এমন সূর্য আর কোথাও পাবে ন।"
বিজ্ঞাপনের বাক্যে বেশি গুরুত্ব দেয়া নাকি উচিত নয়। কিন্তু সে আপ্তবাক্য আমার জন্য নয়। সুতরাং কয়েকদিন পরেই দেখা গেলো আমি ইন্টার-স্টেট বাসে চড়ে বসেছি। গন্তব্য ব্রিসবেন, কুইন্সল্যান্ডের রাজধানী।

অস্ট্রেলিয়ার পথে  পথে

বাস চলছে হিউম হাইওয়ে ধরে। বাসের জানালায় কুয়াশার আস্তরণ দেখে বোঝা যাচ্ছে বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা এখন। মেলবোর্ন থেকে ব্রিসবেনের বাস দূরত্ব প্রায় দু’হাজার কিলোমিটার। বাস যাবে মেলবোর্ন থেকে সিডনি, পরে সিডনি থেকে ব্রিসবেন। কোন ধরনের বিরতি ছাড়াই বাসের সময় লাগবে চব্বিশ ঘন্টা। আর আমার যাত্রাবিরতি, ট্রানজিট টাইম সব মিলিয়ে লাগবে প্রায় ছত্রিশ ঘন্টা। যেহেতু কাজ থেকে ছুটি নেয়ার জন্যই এই ভ্রমণ, সেহেতু এই ভ্রমণের সবটুকু সময়ই আমি উপভোগ করতে চাচ্ছি।
মেলবোর্ন থেকে সিডনি পর্যন্ত বাসে আসা যাওয়া করেছি একবার বছর দেড়েক আগে। ঝাপসা জানালায় চোখ রেখে মোটামুটি বুঝতে পারছি আশেপাশের প্রকৃতি তার দৃশ্যাবলীর খুব একটা পরিবর্তন ঘটায়নি এই আঠারো মাসে। আসলে পরিবর্তন ঘটায়নি নয়, ঘটাতে পারেনি। এখানকার মানুষ প্রকৃতিকে প্রকৃতির হাতে তুলে দিয়ে বসে থাকে না। তার নিয়মিত যত্ন নেয়, পরিচর্যা করে। এখানেই হয়তো বাংলার প্রকৃতির সাথে এদের প্রাকৃতিক পার্থক্য।
মেলবোর্ন সিটি এলাকা পেরিয়ে এসেছি অনেকক্ষণ। স্ট্রিট লাইট শেষ হয়ে গেছে। বাইরে এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাসের ভেতরে একটা দুটো রিডিং লাইট জ্বলছে। ভিডিওতে একটা সিনেমা দেখানো হচ্ছে। ছবির নায়ক বিলি কৃস্টাল একজন বাস্কেট বল রেফারি। তার বাবার মৃত্যুকালিন ইচ্ছা অনুযায়ী বাপের মৃতদেহ নিয়ে যাচ্ছে প্যারিসে কবর দেয়ার জন্য। কিন্তু প্যারিস এয়ারপোর্টে নামার পর দেখা গেলো কফিন চলে গেছে সুইজারল্যান্ডে। মজার মজার সব ঘটনা ঘটছে। কিন্তু আমি মজাটা ঠিক উপভোগ করতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছে আমাকেই যেন কফিনে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। কারণ আমার সহযাত্রিনী।
রাবীন্দ্রিক ভদ্রতায় যদি বলি তাঁর বহরে কিঞ্চিৎ বাহুল্য আছে, তাহলে তাঁর আয়তনকে নিতান্তই অপমান করা হয়। তিনি বিপুলা। বাসের একটি সিট তাঁর আয়তনের অর্ধেকও ধারণ করতে পারছে না। সুতরাং স্বাভাবিক অধিকার বশতই আমার সিটের অর্ধেকাংশও তাঁর দখলে। নিজেকে যতটুকু সংকুচিত করা যায় তার চেয়েও বেশি সংকুচিত হয়ে আছি তাঁর শরীরের তাড়নায়। তাঁর সেদিকে কোন বোধ আছে বলে মনে হচ্ছে না। অবশ্য বোধ থাকলেও তাঁর করার কিছু নেই। তাই মুখটা হাসি হাসি করে তাকাচ্ছেন আমার দিকে। যেন অভয় দিচ্ছেন, ‘ডোন্ট ওয়ারি মাই চাইল্ড’। আমিও দুঃসহ ভদ্রতায় হাসির ভাব করে দাঁত দেখাচ্ছি। ডেমিয়েনের কথা না শুনে মনে হয় ভুলই করেছি।
ডেমিয়েন আমার বন্ধু, ট্রিনিটি কলেজে একসঙ্গে পড়াই আমরা। বাসে যাবো শুনে রীতিমত রেগে গিয়েছিলো সে। আমি তাকে বোঝাতে চেয়েছি, আমি দেশটাকে দেখতে চাচ্ছি। রাস্তাঘাট, প্রকৃতি, গাছপালা সব। দীর্ঘ বাসভ্রমণ ছাড়া ঘন্টা দুয়েকের প্লেন-ভ্রমণে তা হবার নয়। প্লেনে বাংলাদেশের আকাশ আর অস্ট্রেলিয়ান আকাশের মধ্যে খুব একটা তফাৎ নেই। ডেমিয়েন নরম হয়ে বোঝাতে চেষ্টা করেছে- মেলবোর্ন থেকে সিডনি পর্যন্ত যেহেতু একবার বাসে ভ্রমণ করেছি, সেহেতু ঐটুকু পথ অন্তত আমার প্লেনে ভ্রমণ করা উচিত। কারণ ঐটুকু পথে কোন নতুনত্ব থাকবে না। আর প্লেন ভাড়াও এসময় খুব একটা বেশি নয়। ভার্জিন ব্লু নামে নতুন এয়ার কোম্পানি এখন বেশ সস্তায় ডোমেস্টিক সার্ভিস দিচ্ছে।
আমি তার কথার কোন গুরুত্বই দিইনি। আমার দীর্ঘক্ষণ ভ্রমণ ভালো লাগে। সুতরাং ভালো লাগার শাস্তি ভোগ তো করতেই হবে। অন্তত সিডনি পর্যন্ত এখন আমি অন্যজনের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তাঁকে অতিক্রম করে আমার সিট থেকে বেরোনোর কোন উপায় নেই। ঘুমিয়ে পড়ার যতটুকু কায়দা জানা আছে সবগুলোকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করলাম। ঘুম দরকার এখন, অস্বস্তি নিবারণকারী নিদ্রা।

ঘুম ভাঙলো সকাল সাড়ে ছটায়। বাস ক্যানবেরা পৌঁছেছে। ক্যানবেরা সেন্ট্রাল স্টেশনে যাত্রী উঠানামা হয়। বাস মিনিট বিশেক থামে এখানে। স্টেশনের বিশাল ডিজিটাল ঘড়ির নিচে থার্মোমিটারে দেখা যাচ্ছে ক্যানবেরার তাপমাত্রা এখন মাইনাস তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস। জানালায় কুয়াশা জমে ছোট ছোট মুক্তার দানার মতো দেখাচ্ছে। খুব ইচ্ছা হলো একবার নেমে দেখি বাইরের বরফ ঠান্ডা হাওয়ায়।
আমার ডান পাশের পাহাড় ঘুমাচ্ছেন। ঘুমানোর ভঙ্গি বলে দিচ্ছে এই ঘুম সহজে ভাঙবে না সহজে। প্যাসেজ দিয়ে অন্য যাত্রীরা চলাচল করতে গিয়ে বারবার তাঁর গায়ে ধাক্কা লাগছে। তাতেও তার ঘুমের কোন অসুবিধা হচ্ছে না। বুঝলাম অনেক দিনের অভ্যাস। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার নিচে নামার  ইচ্ছাটাকে চাপা দিতে হলো।
ঠান্ডা ভোরের ক্যানবেরা। ভীষণ সুন্দর লাগছে এখন। চারদিকে সূর্যের নরম আলো গাছপালায়, বরফে ঠিকরে পড়ছে। অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। চারপাশের কোথাও কোন মানুষ দেখা যাচ্ছে না। শীতের এই ভোরবেলায় ঘরের মানুষ জানতেই পারছে না কী চমৎকার রংধনু রঙের মেলা বসেছে ঘাসের ডগায়। আমার নিজেকে হঠাৎ বড় উদার মনে হলো। মনে হলো মানুষ যদি একবার মুক্ত মনে কোন কিছু পাবার আশা না করে প্রকৃতির দিকে তাকায়- এক নিমেষে সে সব পেয়ে যাবে। মন যদি ভরে ওঠে কোন অভাব তাকে অভাবী করতে পারে!
অন্যসব ভাবের মতো এই দার্শনিক ভাবও কেটে গেলো একটু পরেই। পাশের ভদ্রমহিলা জেগে উঠেছেন। উঠেছেন বলা ঠিক হচ্ছে না। জেগেছেন, কিন্তু উঠেননি। উঠতে সমস্যা হচ্ছে তাঁর। জানতে চাইলেন, ‘কটা বাজে?’
ড্রাইভারের মাথার ওপরে ঘড়ি আছে। কিন্তু ভদ্রমহিলা এখন যে অবস্থায় আছেন, সেখান থেকে শরীরের যে অংশটা তুলে ঘড়িটা দেখতে হবে, সেই গলা নামক অংশটার আলাদা কোন অস্তিত্ব তাঁর নেই। আর নিজের হাতে ঘড়ি পরতে গেলে ঘড়ির বেল্ট অর্ডার দিয়ে বানাতে হবে।
বাস লিভারপুল পার হয়ে এখন সিডনির দিকে এগোচ্ছে। আমার হঠাৎ ভয় হলো ভদ্রমহিলা কি ব্রিসবেন অবধি যাবেন? বিনীতভাবে জানতে চাইলাম, "গোয়িং ফার?"
জানা গেলো, না, সিডনি পর্যন্তই যাবেন। আমি বাচ্চা শিশুর মতো খুশি হয়ে গেলাম। যেন পৃথিবীতে তিনি ছাড়া আর কোন পৃথুলা নেই।
সকাল এগারোটায় বাস সিডনি সেন্ট্রালে থামলো। আমার যাত্রার প্রথমাংশ শেষ হলো। পরবর্তী অংশ সিডনি থেকে ব্রিসবেন। বাস সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে। প্রায় ছ'ঘন্টা সময় পাওয়া গেলো সিডনিতে একটু ঘুরে বেড়ানোর।
সিডনি অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় শহর এবং ব্যাস্ততম শহরও বটে। এই শহরটায় ঘুরে বেড়ানোর মতো কিছু অলিগলি আমি বছর দেড়েক আগে চিনেছি। সেই আত্মবিশ্বাসে হাঁটতে শুরু করলাম।
সিডনি অপেরা হাউজ

পৃথিবীর কিছু কিছু জিনিস কখনো পুরোনো হবে না এবং বারবার দেখলেও মনে হবে না, ‘এ তো আগে দেখেছি’। সিডনি অপেরা হাউজ এরকমই একটি বিস্ময়কর স্থাপত্য। সিটি অ্যারিয়াকে একটা চক্কর দিয়ে, জর্জ স্ট্রিট ধরে হাঁটতে হাঁটতে সোজা হারবার ব্রিজ। ব্রিজের নিচ দিয়ে হেঁটে এসে বসলাম অপেরা হাউজের সিঁড়িতে। মনে হচ্ছে সাগরের মাঝখানে ভেসে ওঠা একটা বিশাল ঝিনুকের ওপর বসে আছি আমি। পৃথিবীর নানা দেশের মানুষ এই অপেরা হাউজ দেখার জন্য আসে সিডনিতে। অপেরা হাউজের ছাদে আর দেয়ালে লাগানো লক্ষ লক্ষ সাদা টাইলসের কয়েকটিতে হাত বোলাতে বোলাতে ভাবছিলাম এর স্থপতির কথা। মানুষের সৃষ্টিই মানুষকে অমর করে রাখে।
সন্ধ্যা ছটা পনেরো মিনিটে শুরু হলো সিডনি টু ব্রিসবেন যাত্রা। পথে দু’বার আধঘন্টার বিরতি সহ মোট আঠারো ঘন্টার দীর্ঘ যাত্রা। সিডনি থেকে প্রায় বারোশ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে ব্রিসবেন। এবার বাসে দু'জন ড্রাইভার। দীর্ঘপথ দু'জনে ভাগ করে চালাবেন।
এবছর থেকে অস্ট্রেলিয়ার পাবলিক ট্রান্‌সপোর্টের আইন-কানুন আর একটু কড়া করা হয়েছে। এখন বাসে খোলা খাবার বা পানীয় নিয়ে ওঠা যাবে না। শুষ্ক খাবার- বিস্কুট, চকলেট বা চিপ্‌স খাওয়া যেতে পারে। কিন্তু যেসব খাবারে কড়া গন্ধ আছে তা খাওয়া যাবে না। ফলমূলও খাওয়া যাবে না গাড়ির ভেতর, তাতে নাকি গাড়ি ময়লা হবে এবং জীবাণুর আক্রমণ হতে পারে। খোলা পানীয় মানে গরম চা বা কফি ইত্যাদি নিয়ে গাড়িতে ওঠা যাবে না। কারণ কারো গায়ে টায়ে পড়ে গেলে অসুবিধা। কোকাকোলা ইত্যাদি নরম পানীয় চলতে পারে, তবে তা হবে ছিপিযুক্ত বোতলে। ক্যান চলবে না।
নিয়ম কানুন মনে হলো সবাই মেনে চলে এখানে। অন্যায্য আইন হলেও তা মেনে চলে যতক্ষণ পর্যন্ত তা আইনগতভাবে বে-আইনি ঘোষিত না হচ্ছে। তার মানে কি এরা আইনের প্রতি খুব শ্রদ্ধাশীল? আসলে তা পুরোটা ঠিক না, -আসল কথা হলো ঠেলার নাম বাবাজী। আইন ভাঙলে তাৎক্ষনিক মোটা অংকের জরিমানা করা হয়। প্রত্যেক নাগরিকের যেহেতু ট্যাক্স ফাইল নাম্বার থাকে সেহেতু টাকা আদায় করা সরকারের জন্য কোন ব্যাপারই না। ফাঁকি দেয়া প্রায় অসম্ভব বলেই সুযোগের অভাবে এখানে ভালো মানুষের সংখ্যা বেশি।
এবার বেশ আরাম করে হাত পা ছড়িয়ে বসলাম। পাশে যে ছেলেটা বসেছিলো সে উঠে চলে গেছে পেছনের দিকের খালি সিটে। বাস সিডনি ছাড়িয়ে চলেছে উত্তর দিকে। সিডনি থেকে ব্রিসবেন পর্যন্ত সারা পথে অনেকগুলো স্টপেজ। কোন যাত্রী থাকলে উঠছে আর না থাকলে বাস চলে যাচ্ছে। ইন্টার-স্টেট বাস সার্ভিসে গ্রেহাউন্ড পাইওনিয়ার এবং ম্যাকফার্টিস একচেটিয়া ব্যবসা করছে। নামে দুটো কোম্পানি, আসলে দুটোরই মালিক ম্যাকফার্টিস সাহেব। অস্ট্রেলিয়ান ট্যুরিজমে এই বাস কোম্পানির অবদান অনেক। সারা অস্ট্রেলিয়ার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে এই কোম্পানির সার্ভিস।
শীত যেন হঠাৎ কমে গেছে। বাসের ভেতরে বসে বাইরের তাপমাত্রা আঁচ করার উপায় হলো বাইরের লোকজনের পোশাক আর আচরণ পর্যবেক্ষণ করা। প্যারামাটা, চ্যাটস উড, হোমস বে (সিডনি অলিম্পিক পার্ক), সোয়ান সি, বেলমন্ট, চার্লস টাউন প্রভৃতি ছোট ছোট স্টপে বাস কয়েক মিনিট করে থেমে নির্ধারিত যাত্রী ওঠালো। তখন খেয়াল করে দেখেছি বাইরের তাপমাত্রা তের চোদ্দ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম নয়। মেলবোর্ন এসময় তাপমাত্রা ছয় সাতে নেমে যায়। রাত দশটার দিকে বাস থামলো নিউক্যাসেল-এ।
অস্ট্রেলিয়ার সব জায়গার নাম যদি ইংল্যান্ডের অনুকরণে হয় তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। অস্ট্রেলিয়া হাবেভাবে এখনো ইংল্যান্ডের কলোনি। আয়তনে ইংল্যান্ডের ৬০ গুণ হলেও কিছু যায় আসে না। ইংল্যান্ডের রানি এখনো অস্ট্রেলিয়ারও রানি। অস্ট্রেলিয়া গণপ্রজাতন্ত্রী দেশ হবার জন্য গণভোটের আয়োজন করেছিলো ১৯৯৯ সালে। তাতে ‘না’ ভোট বেশি পড়েছে। ফলে এখনো রানির কর্তৃত্ব বহাল আছে এদেশে। নিউক্যাসেলে অনেক যাত্রী উঠলেও বাস বেশিক্ষণ থামলো না এখানে। প্রথম যাত্রাবিরতি হলো ‘কারুহা’ নামে এক জায়গায়। মিল ব্রেক। মানে খাওয়া দাওয়া করার জন্য বিরতি।
বাস থেকে নেমে একটু হাঁটলাম। চমৎকার মেঘহীন আকাশ। কালো আকাশের বুকে হাজার হাজার তারার মেলা। এই জায়গাটির উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক আলো আর স্থানীয় ব্যস্ততা বাদ দিলে চারদিক সুনশান। যারা রাতের খাবার খেয়ে আসেনি, তারা ছুটে যাচ্ছে খাবারের দোকানের সামনে। আমি সিডনি থেকে খেয়ে এসেছি।
হাইওয়ে থেকে একটু ভেতরের দিকে এই স্টপ। হাইওয়েতে কিছুক্ষণ পর পর বেশ বড় বড় ট্রাক ছুটে চলেছে। বিশাল পণ্যবাহী এই ট্রাকগুলো দিনের বেলায় খুব একটা দেখা যায় না। এক্সপ্রেস পোস্ট লেখা বিরাট বিরাট পোস্টাল ট্রাক ছুটে চলেছে স্টেট থেকে স্টেটে। এখানে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে চিঠি পৌঁছে যায় এক স্টেট থেকে অন্য স্টেটে।
রাত সাড়ে এগারোটায় বাস ছাড়লো আবার। আর জেগে থাকার কোন মানে হয় না। আকাশে চাঁদ নেই। জানালা দিয়ে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ঘুমিয়ে পড়লাম কিছুক্ষণের মধ্যেই। রাত সাড়ে তিনটায় গাড়ি থামলো ম্যাক্সভিল নামে একটি জায়গায়। স্টপগুলোর নাম লেখা না থাকলে সবগুলো জায়গাই একই মনে হতো।
এখানে চল্লিশ মিনিট থামলেও আমি আর নিচে নামলাম না। অনেকে বলে থাকেন, দীর্ঘ যাত্রায় সুযোগ পেলেই একটু হেঁটে বেড়ানো ভালো। তাতে নাকি পায়ে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু রাত সাড়ে এগারোটায় ঘুমিয়ে সাড়ে তিনটায় উঠে আবার হাঁটাহাটি করতে হলে মানুষ ঘুমাবে কখন? সুতরাং আবার ঘুম। পরপর দুই রাত বাসে ভ্রমণ করতে করতে ঘুমাচ্ছি বা ঘুমিয়ে ভ্রমণ করছি। ভাবতেই খুব ভালো লাগলো।


____________
এ কাহিনি প্রকাশিত হয়েছে আমার 'অস্ট্রেলিয়ার পথে পথে' বইতে। তবে ছবিগুলি বইতে প্রকাশিত হয়নি।


No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 4

  This is my first photo taken with my father. At that time, I had just moved up to ninth grade, my sister was studying for her honors, and ...

Popular Posts