Wednesday 28 February 2024

দারুচিনি দ্বীপের ভিতর - ০৭

 


অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশগুলিকে এখন আর তৃতীয় বিশ্বের দেশ বলা হয় না। ধনীদেশগুলি আদর করে এখন তাদের উন্নয়নশীল বলে ডাকে। মুক্তবাজার অর্থনীতির ফলে সেসব দেশে চোখ কপালে ওঠার মতো উন্নয়ন ঘটে চলেছে। ঋণ করে ঘি খাবার মানসিকতা থাকুক বা না থাকুক, এখন বিশ্বমোড়লরা জোর করে ঋণ দিয়ে ঘি খেতে বাধ্য করে। অনভ্যাসের ঐ ঘি সাধারণ জনগণের পেটে সহ্য না হলেও  সেসব দেশের ক্ষমতাশালী কিছু মানুষ রাতারাতি ধনী হয়ে যায়। আদর্শ রাষ্ট্র যেখানে দেশের সকল নাগরিকের জীবন-যাপনের সার্বিক মানোন্নয়নকেই প্রাধান্য দেয়, সেখানে উন্নয়নশীল দেশে ঘটে বাহ্যিক জৌলুস বাড়ানোর প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় বাহবা দিয়ে চড়া সুদে বৈদেশিক ঋণের ইন্ধন জোগায় মোড়লরা। মোড়লদের কথায় লোভী অসৎ শাসকরা উঠবস করে – কারণ তাতে দেশের বারোটা বাজলেও শাসকদের ব্যক্তিগত তহবিল ফুলেফেঁপে উঠতে থাকে। তার অতি সাম্প্রতিক উদাহরণ – চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি।


প্রেসিডেন্টের দপ্তর

কলম্বো মেইন রোডের ওপারে পাকা ইটের রঙের বিশাল ভবনটি দেখেই চিনতে পারলাম ওটা প্রেসিডেন্টের কার্যালয়। গতবছর ২০২২ সালের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত শ্রীলংকার বিক্ষুব্ধ জনগণ সরকারের অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছে। সেই সময় টেলিভিশনে এই ভবন দেখেছি অনেকবার। বিক্ষুব্ধ জনগণ গত বছরের এপ্রিলে এই ভবন দখল করে নিয়েছিল। আজও এখানে অসংখ্য সশস্ত্র প্রহরী পাহারায় নিযুক্ত। ক্রিস্টমাস উপলক্ষে পুরো ভবন আলোকসজ্জিত করা হয়ে গেছে। এখন ফুল দিয়ে সাজানো হচ্ছে। মনে হচ্ছে কোন বড় ধরনের উৎসবের প্রস্তুতি চলছে। 

শ্রীলংকার সরকারি অবকাঠামোর বেশিরভাগই ব্রিটিশদের তৈরি। এই ভবনটিও ব্রিটিশরাই তৈরি করেছিল ১৯৩০ সালে। সেই সময় মাত্র সাড়ে চার লাখ রুপি খরচ হয়েছিল এই বিশাল রাষ্ট্রীয় ভবন তৈরি করতে। প্রায় এক শ বছর বয়সেও এই ভবন ঝকঝকে নতুনের মতো। ব্রিটিশরা ১৯৪৭ পর্যন্ত এটাকে স্টেট কাউন্সিল অব সিলনের অফিস হিসেবে ব্যবহার করেছিল। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন হবার পর থেকে এটাই ছিল শ্রীলংকার পার্লামেন্ট হাউজ। ১৯৮৩ সালে দশ কিলোমিটার দক্ষিণে কুট্টিতে নতুন পার্লামেন্ট ভবন তৈরি হবার পর এই ভবন প্রেসিডেন্টের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। 

ভবনের সামনে শ্রীলংকার প্রথম তিন প্রধানমন্ত্রীর ধাতব মূর্তি রোদে জ্বলজ্বল করছে। এঁরা সবাই জনগণের ভালোবাসা পেয়েছিলেন নিশ্চয়। নইলে বিক্ষোভের সময় এসব মূর্তি অক্ষত থাকতো না। 

পাশেই লোটাস রোড চলে গেছে লোটাস টাওয়ারের দিকে। ওদিকে যাওয়ার আগে এদিকটা দেখে যাওয়া যাক। রাউন্ড অ্যাবাউট-এর সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় বুঝতে পারলাম ট্রাফিক লাইট না থাকলে রাউন্ড অ্যাবাউটে গাড়ি চালানোর যে স্বাভাবিক নিয়মকানুন মেনে চলতে হয় – গতি কমাতে হয়, পথচারীকে রাস্তা পার হতে দিতে হয় – এসবের কোন বালাই নেই এখানে। 

সমুদ্রের পাশে পুরনো বাঁধানো রাস্তার পর আরো অনেক খালি জায়গা পড়ে আছে। একটু দূরে সম্পূর্ণ নতুন একটি আবাসিক শহর ‘পোর্ট সিটি’ গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছিল। সরকারি দুর্নীতির স্বাক্ষী হয়ে এই নগরীর কাজ জনবিক্ষোভের মুখে আপাতত বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু কেউ যেতে চাইলে ওখানে গিয়ে ঘুরে আসতে পারে। 

সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সামনের রাস্তায় ছোট্ট একটা গেট আছে পোর্ট সিটিতে ঢোকার। গেটে লেখা আছে হেঁটে যেতে আসতে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হাঁটতে হবে। কেউ যদি গাড়িতে করে যেতে চায় তবে টাকা দিয়ে স্পেশাল পারমিট কিনে যেতে পারবে অন্য গেট দিয়ে। 


পোর্ট সিটির প্রবেশ পথ


গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে বুঝতে পারলাম এক সময় সাইট অফিস এবং ফ্ল্যাট বুকিং অফিস ছিল এদিকে। এখন আর নেই, কিন্তু বিশাল বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড দাঁড়িয়ে আছে এখনো। বহুতল ভবনে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিক হবার প্রলোভন দেখানো মনোলোভা বিজ্ঞাপন। লাস্যময়ী যে তরুণীর ছবি বিজ্ঞাপনে – হয়তো শ্রীলংকান কোন অভিনেত্রী  – যাকে দেখে ফ্ল্যাট কিনতে উদ্বুদ্ধ হবেন অনেকে। প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে যাবার জন্য নিশ্চয় সেই অভিনেত্রী দায়ী নন। বাংলাদেশে একটি প্রতিষ্ঠানের এরকম একটি বিজ্ঞাপন করেছিলেন রেজওয়ানা চৌধুরি বন্যা। রবীন্দ্রপ্রেমী অনেকেই ফ্ল্যাট কেনার জন্য অগ্রিম বুকিং দিয়ে প্রতারিত হয়েছিলেন।  

ছোট্ট একটি গার্ডরুম। তার পাশে মেটাল ডিকেক্টর। ওটার ভেতর দিয়ে যাবার সময় কোন ধরনের শব্দ হলো না। সম্ভবত ডিটেক্টরও কার্যক্ষমতা হারিয়েছে। গার্ডরুমের গার্ডের দিকে তাকালাম। তিনি ছোট্ট টেবিলে হাতের উপর মাথা রেখে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। চোখাচোখি হতেই একটু হাসলেন। মনে হলো বসে থাকা ছাড়া তার আর কোন কাজ নেই এখানে। 

ইট বিছানো ছোট্ট একটি রাস্তা ধরে হাঁটছি। বাম পাশে সামুদ্রিক ঝোপ, মেছো গন্ধ ভেসে আসছে নাকে। ডানে বড় বড় বিজ্ঞাপন দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে ভেতরের জঙ্গল। একের পর এক বিজ্ঞাপনে পৃথিবীর বড় বড় শহরের ছবির পাশাপাশি কলম্বোর পোর্ট সিটির তুলনা করা হয়েছে। বিজ্ঞাপনের দাবি সত্যি হলে কলম্বোর পোর্ট সিটি হার মানাবে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিকে, আমেরিকার নিউইয়র্ককে, জাপানের টোকিওকে, কানাডার টরন্টোকে। সামনে সমুদ্রের বাম পাশে কলম্বোকে খুবই সুন্দর লাগছে এখান থেকে। ঝকঝকে নীল আকাশ দেখে বোঝা যাচ্ছে কলম্বোর বাতাস অনেক বিশুদ্ধ।

মিনিট পাঁচেক হাঁটার পরই একটি বেশ বড় গোলচত্বর। তার সামনে বেশ বড় বড় ধাতব অক্ষরে লেখা হয়েছে পোর্ট সিটির নাম। সমুদ্রের পাড় সুন্দর করে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধাই করে বেশ কয়েকটি সিড়ি তৈরি করে দেয়া হয়েছে। বাঁধানো রাস্তার একপাশে সাগর, সেদিকে রেলিং দেয়া আছে। কয়েকটি বড় বড় নারকেল গাছ, সম্ভবত আগেই ছিল অধিকৃত জমিতে। কিছু নতুন গাছ লাগানো হয়েছে। পানির উপর দিয়ে হাঁটার জন্য একটি সুদৃশ্য টানা ব্রিজ তৈরি করা হয়েছে। ঘরবাড়ির কোন চিহ্ন কোথাও নেই।


পোর্ট সিটির ভেতরে সুদৃশ্য ব্রিজ


কিছু উঠতি প্রেমিক-প্রেমিকা ছাতা খুলে বসে আছে এখানে ওখানে। আর মাত্র গুটিকতক আমার মতো কৌতূহলী পর্যটক ছাড়া তেমন আর কেউ নেই। দুর্নীতির থলের বেড়াল বের হয়ে আসার কারণেই কি আকর্ষণ হারিয়েছে প্রস্তাবিত পোর্ট সিটি? তবে আমার মনে হচ্ছে এটা সাময়িক। কিছুদিনের মধ্যেই এটি আবার প্রচন্ড বিক্রমে শুরু হয়ে যাবে। কারণ এই প্রকল্প ছিল শ্রীলংকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের নিজের প্রকল্প, আর অর্থদাতা স্বয়ং চীন। 

এখান থেকে কলম্বো শহরের বড় বড় বিল্ডিংগুলি যেরকম উজ্জ্বল দেখাচ্ছে – সেরকম অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য দায়ী দুর্নীতির বড় বড় চিহ্নও চোখে পড়ছে। মেলবোর্নে আমার শ্রীলংকান প্রতিবেশীর সাথে অনেকদিন কথা হয়েছে শ্রীলংকায় বিক্ষোভের সময়। তখনকার প্রেসিডেন্ট এবং প্রেসিডেন্টের পরিবারের দুর্নীতির যে কাহিনি তার কাছে শুনেছি এবং প্রিন্ট মিডিয়া থেকেও যতটুকু জেনেছি তাতে শ্রীলংকার জনগণের জন্য কষ্ট লাগে। অনেকে বলে থাকেন, যেমন নাগরিক তেমন সরকার। তাই যদি হবে, তাহলে শ্রীলংকানরা এত সুনাগরিক হওয়া সত্ত্বেও এরকম প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী কীভাবে পায় বছরের পর বছর!

আমাদের মতো স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে হয়নি শ্রীলংকানদের। তবে দীর্ঘদিন ধরে তামিল টাইগারদের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ সামলাতে হয়েছে তাদের। ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর ধরে শ্রীলংকায় সরাসরি গৃহযুদ্ধ চলেছে। এই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন লক্ষাধিক সাধারণ মানুষ, সাতাশ হাজার তামিল টাইগার বাহিনির সদস্য এবং আটাশ হাজারেরও বেশি শ্রীলংকান সেনাবাহিনীর সদস্য। ২০০৯ সালে ফিল্ড মার্শাল সারদ ফনসেকার নেতৃত্বে শ্রীলংকান সেনাবাহিনি তামিল টাইগারদের পরাস্ত করে দীর্ঘ ছাব্বিশ বছরের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটায়। এর কৃতিত্ব অনেকটাই এসে পড়ে তখনকার প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের হাতে। 

শ্রীলংকার রাজনীতিতে রাজাপাকসে পরিবার ভীষণ প্রভাবশালী। ১৯৩৬ সালে ম্যাথিউ রাজাপাকসের ব্রিটিশ সরকারের অধীনে স্টেট কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হবার মধ্য দিয়ে তাঁদের রাজনীতির উত্থান শুরু হয়। ১৯৪৫ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ভাই আলভিন সেই পদে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে পার্লামেন্ট নির্বাচনে ম্যাথিউ রাজাপাকসের ছেলে লক্সমন এবং আলভিন দুজনই নির্বাচিত হন দুই এলাকা থেকে। ১৯৭৭ পর্যন্ত অবিরামভাবে রাজাপাকসে পরিবারের একাধিক সদস্য শ্রীলংকার পার্লামেন্ট মেম্বার ছিলেন। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত সাময়িক বিরতির পর ১৯৮৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত রাজাপাকসে পরিবারের একাধিক সদস্য শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীসহ অনেকগুলি পদ ধরে রেখেছিলেন। 

আলভিন রাজাপাকসের নয়জন ছেলেমেয়ের মধ্যে বড়ছেলে চামাল রাজাপাকসে ১৯৮৯ সালে এমপি নির্বাচিত হন, ২০০০ সালে ডেপুটি মিনিস্টার, ২০০৭ সালে সেচমন্ত্রী, এবং ২০১০ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন। তাঁর ছেলে শশীন্দ্র উভা প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ২০১৫ পর্যন্ত। 

আলভিনের দ্বিতীয় ছেলে মাহিন্দা রাজাপাকসে। তিনি ১৯৭০ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত এমপি ছিলেন। এরপর ১৯৮৯ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত আবার এমপি। ১৯৯৪ সালে শ্রমমন্ত্রী, ১৯৯৭ সালে মৎস্যমন্ত্রী, ২০০০ সালে বন্দরমন্ত্রী, ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী, ২০০৫ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। এই মাহিন্দা রাজাপাকসেকে শ্রীলংকার সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মূল ব্যক্তি বলে মনে করা হয়।

শ্রীলংকার শাসন ব্যবস্থা পুরোপুরি পার্লামেন্টারিয়ানও নয়, আবার পুরোপুরি প্রেসিডেন্সিয়ালও নয়। শুরুতে ব্রিটিশ পদ্ধতির পার্লামেন্টারিয়ান শাসনব্যবস্থা চালু থাকলেও পরে সরাসরি জনগণের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার বিধান রাখা হয়। নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের হাতে অনেক ক্ষমতা দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার মতোই কোন প্রেসিডেন্ট দুই মেয়াদের বেশি দায়িত্বে থাকতে পারবেন না – এই বিধান রাখা হয়। আর প্রেসিডেন্ট পদে ভোট দেয়ার পদ্ধতিও খুব সুন্দর। অনেকটাই অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচনের মতো – পছন্দের ক্রমানুসারে ভোট। তবে অস্ট্রেলিয়ায় যেরকম সব প্রার্থীকেই পছন্দের ক্রমানুসারে ভোট দিতে হয়, শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র প্রথম এবং দ্বিতীয় পছন্দকে ভোট দিলেই চলে। ধরা যাক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ক, খ, গ, ঘ, ঙ – এই পাঁচজন প্রার্থী। এখন ভোটারকে এই পাঁচ জনের মধ্যে দু’জনকে প্রথম ও দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে ভোট দিতে হবে। প্রথম পছন্দ হিসেবে যিনি সবচেয়ে বেশি ভোট পাবেন তিনিই নির্বাচিত হবেন। 

এভাবেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন মাহিন্দা রাজাপাকসে। ২০০৫ সাল থেকে ২০১৫ পর্যন্ত দুই মেয়াদ সম্পন্ন করার পরেও তাঁর প্রেসিডেন্ট পদের মোহ কাটেনি। আবারো প্রেসিডেন্ট হবার জন্য তিনি সংবিধান সংশোধন করে ফেললেন। আবার প্রেসিডেন্ট পদের জন্য নির্বাচনে দাঁড়ালেন। ২০০৯ সালে তামিল টাইগারদের দমন করে তিনি যতটা জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, সংবিধান সংশোধন করে একনায়কতন্ত্রের দিকে প্রকাশ্যে অগ্রসর হবার পর তেমন সুবিধা করতে পারলেন না। তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারলেন না। নতুন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দার আনা সংবিধানের সংশোধনী বাতিল করে দিলেন। তাতে দমবার পাত্র নন রাজাপাকসে। দুবছরের মধ্যেই রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়ে গেল। ২০১৮ সালে তিনি পার্লামেন্টে ফিরে এলেন প্রধানমন্ত্রী হয়ে। সেবার মাত্র তিন মাস প্রধানমন্ত্রী থাকলেও ২০১৯ সালে আবার প্রধানমন্ত্রী হলেন। সেই সময় প্রেসিডেন্ট হলেন তাঁর ছোটভাই গোটাবায়া রাজাপাকসে। 

রাজতন্ত্র ছাড়া গণতন্ত্রে এরকম পরিবারতন্ত্র খুবই বিরল। জনগণের ভোটেই তো এরা নির্বাচিত হয় বার বার। জনগণ তো সবাই শিক্ষিত, সুনাগরিক। তাহলে কেন তারা বার বার এদেরকেই নির্বাচিত করে এদের এতসব দুর্নীতি জানা সত্ত্বেও! এই পরিবারের হাতেই শ্রীলংকার সমস্ত বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। 

এই পোর্ট সিটি করার প্ল্যান পুরোটাই চীনের। ৬৬০ একর জায়গার প্রায় অর্ধেকটা চীনের কাছে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দিয়ে দেয়ার প্ল্যান। ৫০ একর জায়গা চীনের সরাসরি মালিকানায় দিয়ে দেয়ার পরিকল্পনাও পাস হয়েছে। চীনের কাছ থেকেই ফ্ল্যাট কিনতে হবে শ্রীলংকান নাগরিকদের। এই পুরো প্রকল্প পাস হয়েছে মাহিন্দা রাজাপাকসের প্রেসিডেন্ট থাকার সময়। পরে তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হন এবং তাঁর ছোটভাই যখন প্রেসিডেন্ট হন, তখন কাজ শুরু হয়। ২০২১ সালে বিল পাস হয় যে এখানকার চায়নিজ ডেভেলপারদের আগামী চল্লিশ বছর পর্যন্ত কোন ট্যাক্সই দিতে হবে না। 

কোভিডের কারণে এমনিতেই শ্রীলংকার অর্থনৈতিক অবস্থা টালমাটাল। তাছাড়া ২০১৯ সালে কলম্বোতে ঘটে গেছে জঙ্গি আক্রমণ। পর্যটন শিল্প একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে তখন। বৈদেশিক ঋণের বোঝা টানতে টানতে সরকারি কোষাগার খালি হয়ে গেছে। জনগণ বুঝে ফেলেছে রাজাপাকসে পরিবার তাদের পথে বসিয়েছে। বিক্ষোভ শুরু হয়। এখানেই প্রেসিডেন্ট অফিসের সামনে, গার্লে ফেইস গ্রিন – খালি মাঠ ভরে উঠে বিক্ষুদ্ধ জনগণের বিক্ষোভে। এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সাত মাস ধরে একটানা বিক্ষোভের পর রাজাপাকসে পরিবার ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয় এবং দেশ থেকে পালিয়ে যায়। নিজের দেশ থেকে লক্ষ কোটি টাকা চুরি করে তারা বিদেশে কী আরাম আয়েশে জীবন কাটায়। যেসব দেশ তাদের আশ্রয় দেয় – তারা তো খুব সভ্য দেশ। তাদের একবারও মনে হয় না এটা অন্যায়? নাকি ন্যায়-অন্যায় সবকিছু শুধুমাত্র তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হয় – যাদের টাকার জোর কম, ক্ষমতার জোর আরো কম! 

শ্রীলংকার জনগণও কিছুদিনের মধ্যেই ভুলে যাবে তাদের নেতাদের দুর্নীতির কথা। আবার ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে তাদেরই কোন সঙ্গীসাথীদের কিংবা তাদেরই পরিবারের কাউকে।


কাঠগোলাপের বাগান


পোর্ট সিটিতে সারিবদ্ধভাবে অনেক কাঠগোলাপের চারা লাগানো হয়েছিল। গুচ্ছ গুচ্ছ হলদে-সাদা ফুল ফুটে আছে। বড় বড় কিছু মাছি উড়ছে সেখানে। ছোট্ট একটা বিলাসী রেস্টুরেন্টও খোলা হয়েছিল একসময়। এখন বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। তার পেছন দিকে সবুজ ঘাসে মোড়া লন, নারকেল গাছের ঘন ছায়া, ফিরে আসার রাস্তা। এদিক দিয়ে  ফিরে  আসার সময় দেখলাম বন্ধ দোকানের পেছনে দেয়ালের দিকে মুখ করে ঘনিষ্ঠভাবে বসে আছে একজোড়া কিশোর-কিশোরী। সম্ভবত নতুন প্রেম – পায়ের শব্দে চমকে ঘাড় ফিরিয়ে দেখলো দুজনেই, তারপর আবার ডুবে গেল নিবিড় ভালোবাসায়। পোর্ট সিটির ইতিহাস এদেরকে স্পর্শ করে না মোটেও। 


No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 2

  In our childhood and even in our adulthood, there was no tradition of celebrating birthdays. We didn't even remember when anyone's...

Popular Posts