Wednesday 17 July 2019

আইনস্টাইনের কাল - পর্ব-২৩


১৯৪৭
বিশ্বব্যাপী মারণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও বিশ্ব-সরকার গঠনের পক্ষে সুস্পষ্ট মত ব্যক্ত করে চলেছেন আইনস্টাইন তাঁর বড়ছেলে হ্যান্স এলবার্ট ইউনভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির হাইড্রলিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রফেসর হিসেবে যোগ দিয়েছেন এবছর এর আগে তিনি ক্যালটেকে কাজ করেছেন কয়েকবছর

প্যালেস্টাইনকে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে ভাগ করে নেয়ার ব্রিটিশ প্রস্তাব আরব ও ইহুদি উভয় সম্প্রদায়ই প্রত্যাখ্যান করেছে প্যালেস্টাইন সমস্যার সমাধানের ভার নিয়েছে জাতিসংঘ ভারতে বিট্রিশ শাসনের অবসান হয়েছে হিন্দু ও মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়ে গেছে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠদের নতুন দেশ পাকিস্তান স্বাধীনতা দিবস ধার্য করেছে ১৪ আগস্ট পরদিন ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস হিন্দু,মুসলমান ও শিখদের মধ্যে প্রচন্ড রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের বিভিন্ন স্থানে মহাত্মা গান্ধী দাঙ্গা থামাবার লক্ষ্যে অনশন পালন করেছেন

প্রকাশনা
এবছর প্রকাশিত আইনস্টাইনের পাঁচটি উল্লেখযোগ্য রচনাঃ

পেপারঃ২৫০ The Military Mentality. American Scholar, সংখ্যা ১৬ (১৯৪৭), পৃষ্ঠাঃ৩৫৩-৩৫৪ এ প্রবন্ধে আইনস্টাইন বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক নেতাদের মিলিটারি মানসিকতার কড়া সমালোচনা করেন পৃথিবীর সব দেশের চেয়ে বেশি ক্ষমতা অর্জন করাকে আমেরিকা অন্যসবকিছুর উর্ধ্বে স্থান দিয়েছে বলে তিনি আমেরিকাকে দোষারোপ করেন তিনি মনে করেন, ক্ষমতা অর্জনের মানসিকতা থেকে মিলিটারি মানসিকতার সৃষ্টি হয় যে কোন উপায়ে ক্ষমতা অর্জনই তখন মুখ্য হয়ে ওঠে আইনস্টাইন জার্মানির ব্যাপার থেকে শিক্ষা নেয়ার আহ্বান জানান জার্মানি পৃথিবী শাসন করার ক্ষমতা অর্জন করতে চেয়েছিলো বলেই দু দুটো বিশ্বযুদ্ধ হয়ে গেলো এখন পারমাণবিক যুগে ক্ষমতার লোভ তো আরো সাংঘাতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে শক্তিলাভের মানসিকতা থেকে আরো বেশি শক্তিশালী, আরো বেশি বিধ্বংসী ক্ষমতাসম্পন্ন মারণাস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেতে পারে  

পেপারঃ২৫১ Atomic War or Peace. As told to Raymond Swing. Atlantic Monthly, সংখ্যা ১৮০(নভেম্বর ১৯৪৭) আটলান্টিক মান্থলির সাংবাদিক রেমন্ড সুইং এর কাছে দেয়া আইনস্টাইনের সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে এই প্রবন্ধটি রচিত হয়েছে আইনস্টাইন পারমাণবিক বোমা নিষিদ্ধকরণের পক্ষে তাঁর মত ব্যক্ত করেন এজন্য বিশ্ব-সরকার ব্যবস্থার যে কোন বিকল্প নেই তা তিনি আবারো ব্যাখ্যা করেন

পেপারঃ২৫২ [Response to the Editor on Walter Whites article, Why I Remain a Negro.] Saturday Review of Literature, সংখ্যা ৩০ (১ নভেম্বর ১৯৪৭), পৃষ্ঠাঃ২১ আমেরিকায় বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনস্টাইন সবসময় সোচ্চার সংবাদপত্রে বর্ণসমস্যা সংক্রান্ত একটি প্রবন্ধের প্রতিক্রিয়া জানাতে আইনস্টাইন এ প্রবন্ধটি লেখেন

পেপারঃ২৫৩ [Open letter to the United Nations General Assembly on how to break the vicious circle.] United Nations World, সংখ্যা ১ (অক্টোবর ১৯৪৭), পৃষ্ঠাঃ১৩-১৪ সদ্য প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আইনস্টাইনের এই খোলাচিঠিটি পড়ে শোনানো হয় আইনস্টাইন বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নেতৃত্বে বিশ্ব-সরকার গঠনের আহ্বান জানান তিনি বলেন, একমাত্র বিশ্ব-সরকার ব্যবস্থাই পারে বিশ্বব্যাপী অস্ত্র প্রতিযোগিতার অশুভ চক্র ভাঙতে

পেপারঃ২৫৪ The Problem of Space, Ether and the Field in Physics. The Great Thinkers series এর চতুর্থ খন্ডে Man and the Universe অধ্যায়ে প্রকাশিত সম্পাদনাঃ এস কমিনস ও আর এন লিনস্কট প্রকাশকঃ র্যানডম হাউজ, নিউইয়র্ক (১৯৪৭) এ প্রবন্ধে আইনস্টাইন বৈজ্ঞানিক ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করেন আমাদের বৈজ্ঞানিক ধারণার সাথে স্থানকালক্ষেত্রইথার ইত্যাদি একটির সাথে অন্যটি সম্পর্কযুক্ত

১৯৪৮
আইনস্টাইনের ছোটছেলে এডোয়ার্ড মানসিক হাসপাতালে পড়ে আছে। মিলেইভা অসুস্থ শরীরে তার দেখাশোনা করেন। আইনস্টাইন এডোয়ার্ডের চিকিৎসার জন্য টাকা পাঠান। কিন্তু সে টাকায় কুলোয় না। আইনস্টাইনের নোবেল পুরষ্কারের টাকা দিয়ে তিনটি বাড়ি কিনেছিলেন মিলেইভা। তার একটিতে তিনি থাকেন, অন্যদুটো ভাড়া দিয়েছেন। ভাড়ার টাকা যা পান তা দিয়ে নিজের খরচই চলে না, এডোয়ার্ডের চিকিৎসার খরচ চলবে কী করে। মিলেইভা বাড়ি দুটো বিক্রি করে দিলেন। সে টাকাগুলোও দ্রুত শেষ হয়ে গেলো। বাহাত্তর বছরের বৃদ্ধা মিলেইভা শংকিত হয়ে পড়লেন অবশিষ্ট বাড়িটাও না বিক্রি করতে হয়। তিনি বাড়িটা আইনস্টাইনের নামে লিখে দিলেন। ভাবলেন এতে অন্তত তাঁর মাথা গোঁজার ঠাঁই বাড়িটা থাকবে।

এরমধ্যে একদিন বরফের ওপর আছাড় খেয়ে পা ভেঙে ফেললেন মিলেইভা। শয্যাশায়ী মিলেইভার স্বাস্থ্য দ্রুত ভেঙে পড়লো। আইনস্টাইন খবর পেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন-মিলেইভা মারা গেলে এডোয়ার্ডকে দেখবে কে? এডোয়ার্ডের চিকিৎসা ও দেখাশোনা করার জন্য আইনস্টাইন একটি ট্রাস্ট গঠনের পরিকল্পনা করলেন। তিনি তাঁর নামে লিখে দেয়া বাড়িটি বিক্রি করে টাকাটা মিলেইভার কাছে পাঠিয়ে দিলেন ট্রাস্টে জমা দেয়ার জন্য। বাড়ি বিক্রি করার সময় আইনস্টাইন পরিষ্কার শর্ত দিয়েছেন যে, মিলেইভা যতদিন বেঁচে থাকবেন, ঐ বাড়িতেই বিনা ভাড়ায় থাকবেন। কিন্তু মিলেইভা বাড়ি বিক্রি করে দেয়াতে খুব কষ্ট পেলেন। আইনস্টাইনকে তিনি আর কোন খবরই দিলেন না। আইনস্টাইন অনেকদিন মিলেইভার কোন খবর না পেয়ে জুরিখে লোক পাঠিয়ে খবর নিয়ে জানতে পারলেন, একটি বড় ধরণের স্ট্রোকে মিলেইভার শরীরের একদিক অবশ হয়ে গেছে। এবছর আগস্টের চার তারিখে মৃত্যু হলো মিলেইভার। মৃত্যুর পর তাঁর বিছানার নিচ থেকে পাওয়া যায় বাড়ি বিক্রিত পঁচাশি হাজার ফ্রাংক।

আইনস্টাইনের শরীর ভেঙে পড়ছে। পাকস্থলিতে মারাত্মক ব্যথা হচ্ছে তাঁর। বছরের শেষের দিকে প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হবার পরে ডাক্তাররা আইনস্টাইনের পেটের ধমনীর দেয়ালে বড়ধরণের ক্ষত দেখতে পান, তবে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়নি।

জানুয়ারির ৩০ তারিখে ভারতে উগ্র হিন্দুবাদীরা মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করে। শান্তিবাদী মহাত্মার বয়স হয়েছিলো উনাশি বছর। মহাত্মা গান্ধী ছিলেন আইনস্টাইনের শান্তির নায়ক। হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন মহাত্মা গান্ধী, আর সেকারণেই তাঁকে প্রাণ দিতে হলো। এদিকে স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে। কাইম ওয়েইজম্যান হলেন ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট, আর ডেভিড বেন-গুরিয়ন হলেন প্রিমিয়ার।

প্রকাশনা
এবছর প্রকাশিত আইনস্টাইনের সাতটি উল্লেখযোগ্য রচনাঃ

পেপারঃ২৫৫ [Letter on universal military training addressed to the chairman of the senate committee.] U.S Congress,Senate,Committee on Armed Services,Hearings on Universal Military Training, পৃষ্ঠা ২৫৭। বিশ্বব্যাপী সামরিক প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বিষয়ে আইনস্টাইন আমেরিকান কংগ্রেসে এই চিঠিটি লেখেন। সিনেট কমিটিতে চিঠিটি পড়া হয় এবছর (১৯৪৮) ২৪ মার্চ তারিখে। আইনস্টাইনের ওপর কয়েকজন সিনেটর বিরক্তও হয়েছেন এতে।

পেপারঃ২৫৬ Religion and Science: Irreconcilable? Christian Register, সংখ্যা ১২৭ (জুন ১৯৪৮), পৃষ্ঠাঃ১৯-২০। নিউইয়র্ক সিটির লিবারেল মিনিস্টারস ক্লাব আইনস্টাইনকে শুভেচ্ছাকার্ড পাঠায়। সেখানে আইনস্টাইনকে প্রশ্ন করা হয়,ধর্ম ও বিজ্ঞানের সহাবস্থান কি অসম্ভব? উত্তরে আইনস্টাইন জানান, এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া সহজ নয়। কারণ বিজ্ঞান বিষয়ে সব মানুষ একমত হতে পারলেও ধর্ম সংক্রান্ত বিষয়ে মানুষের মধ্যে মতের ভিন্নতা আছে। ধর্মে যে সমস্ত অলৌকিক কাহিনী চালু আছে, তা একেক ধর্মে একেক রকমের হওয়াতে এবং বাস্তবের সাথে সে সমস্ত ঘটনার বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকাতে মানুষের মধ্যে মতের ভিন্নতা দেখা দেয়। মত পার্থক্য থেকে তৈরি হয় অসহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক বিরোধিতা। কিন্তু ধর্মের প্রকৃত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য অলৌকিক অবাস্তব কাহিনীর কোন প্রয়োজন নেই।

পেপারঃ২৫৭ On Receiving the One World Award. ২৭ এপ্রিল ১৯৪৮ তারিখে কানের্গি হলে প্রদত্ত ভাষণ। বিশ্ব-সরকারের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে আইনস্টাইনকে ওয়ান ওয়ার্লড পুরষ্কারে সম্মানিত করা হয়। আইনস্টাইন পুরষ্কার প্রদান অনুষ্ঠানে আবারো বিশ্ব-সরকারের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পরেও অস্ত্র-প্রতিযোগিতা কমছে না দেখে আইনস্টাইন কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েছেন বিশ্বশান্তির ব্যাপারে। রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের কার্যকলাপে কিছুটা বিরক্ত হয়েই তিনি মন্তব্য করেন, এরকম চলতে থাকলে পৃথিবীতে শান্তি ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারবে একমাত্র অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী কোন সংগঠন।

পেপারঃ২৫৮ Looking Ahead.Rotarian, জুন ১৯৪৮, পৃষ্টাঃ৮-১০। আইনস্টাইন এ প্রবন্ধে বিশ্ব-সরকার ব্যবস্থার সপক্ষে আবারো মত প্রকাশ করেছেন। এ প্রবন্ধের সাথে বুলেটিন অব এটমিক সায়েন্টিস্টসে প্রকাশিত আইনস্টাইনের দুটো পেপার আবার প্রকাশ করা হয়। ওদুটো প্রবন্ধের একটিতে আন্তর্জাতিক বোঝাপড়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন [চতুর্থ সংখ্যা,পৃষ্ঠাঃ১ (১৯৪৮)]। অন্যটিতে সোভিয়েত বিজ্ঞানীদের সমালোচনার জবাব দিয়েছেন আইনস্টাইন [চতুর্থ সংখ্যা, পৃষ্ঠাঃ৩৫-৩৭ (১৯৪৮)]। এর আগে আইনস্টাইনের বিশ্ব-সরকারের ধারণার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা।

পেপারঃ২৫৯ Quantum  Mechanics and Reality.Dialectica, সংখ্যা ২ (১৯৪৮), পৃষ্ঠাঃ৩২০-৩২৪। কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে সম্পূর্ণভাবে মেনে নিতে পারেননি আইনস্টাইন। এ প্রবন্ধে তিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অসম্পূর্ণতা আলোচনা করে দেখিয়েছেন যে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সাথে বাস্তবের বিরোধ থেকেই যাচ্ছে।

পেপারঃ২৬০ General Theory of Gravitation. Reviews of Modern Physics, সংখ্যা ২০ (১৯৪৮), পৃষ্ঠাঃ৩৫-৩৯। এ গবেষণাপত্রে আইনস্টাইন জেনারেল থিওরি অব গ্র্যাভিটেশান তথ্য জেনারেল রিলেটিভিটি বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

পেপারঃ২৬১ Atomic Science Reading List. In 1948;Magazine of the Year(জানুয়ারি), পৃষ্ঠাঃ৬০-৬১। পারমাণবিক শক্তি ও তার ক্ষমতা সম্পর্কে জানার জন্য শুধুমাত্র আইসোটোপ,পিচব্লেন্ড ও প্লুটোনিয়াম সম্পর্কে জানাটাই যথেষ্ট নয়। এ প্রবন্ধে আইনস্টাইন ছয়টি ম্যাগাজিন ও বইয়ের কথা উল্লেখ করেন-যা থেকে পারমাণবিক শক্তি সম্পর্কে মোটামুটি পূর্ণাঙ্গ একটি ধারণা পাওয়া যাবে বলে তিনি মনে করেন। আইনস্টাইনের মতে পারমাণবিক শক্তি ও তার প্রয়োগের সাথে শান্তি, নিরাপত্তা ও মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের ব্যাপারটি এখন গভীরভাবে জড়িত।আইনস্টাইন যে বইগুলোর কথা উল্লেখ করেন, তা হলোঃ ১।মাসিক বুলেটিন অব দি এটমিক সায়েন্টিস্টস। আইনস্টাইনের মতে এই মাসিক পত্রিকা পারমাণবিক শক্তির উন্নয়ন ও তথ্যের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য সূত্র। ২।সেলিগ হেচের(Selig Hecht) বই এক্সপ্লেইনিং দি এটম। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত এই বইটিতে নিউক্লিয়ার ফিশানের বৈজ্ঞানিক ধাপগুলো ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ৩। জন হারসির(John Hersey) উপন্যাস হিরোশিমা। ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত এ উপন্যাসে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ওপর পারমাণবিক বোমার প্রভাব বাস্তবভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ৪। কর্ড মেয়ারের(Cord Meyer Jr.) পিস ফর এনার্কি (Peace or Anarchy)। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত এই বইতে পারমাণবিক বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তার জটিল ব্যাপারগুলো ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ৫। এমেরি রেভিসের (Emery Reves)দি এনাটমি অব পিস। ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত এই বইতে আইনস্টাইনের বিশ্ব-সরকারের ধারণাকে সমর্থন করা হয়েছে। ৬। র‍্যামন্ড সুইং (Raymond Swing)এর ইন দি নেম অব স্যানিটি (In the Name of Sanity). পারমাণবিক শক্তি আবিষ্কার ও তার ব্যবহার সংক্রান্ত ঘটনা ও খবরের ধারাবাহিক সংকলন এই বই।

১৯৪৯
বছরের শুরুতে অসুস্থ হয়ে মাসখানেক হাসপাতালে কাটাতে হলো আইনস্টাইনকে। কিছুটা সুস্থ হবার পর কয়েক সপ্তাহের বিশ্রামের জন্য ফ্লোরিডায় চলে গেলেন। সাথে গেলেন তাঁর পুরনো ডাক্তার বন্ধু ওয়ালটার বাকি। ডাক্তার বাকি থাকেন নিউইয়র্কের সেভেন্টি সিক্সথ স্ট্রিটে। আইনস্টাইন নিউইয়র্কে গেলে ডাক্তার বাকির বাড়িতেই ওঠেন। এবছর আইনস্টাইন তাঁর সংক্ষিপ্ত আত্মজীবনী অটোবায়োগ্রাফিক্যাল নোটস শেষ করেন।

মার্চের চৌদ্দ তারিখ আইনস্টাইনের সত্তরতম জন্মদিন উপলক্ষে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে আইনস্টাইনকে সম্বর্ধনা দেয়া হয়। প্রায় তিনশ বিজ্ঞানী এখানে জড়ো হন আইনস্টাইনকে শ্রদ্ধা জানাতে। এ উপলক্ষে একটি সিম্পোজিয়ামেরও আয়োজন করা হয়। আইনস্টাইন যখন হলে ঢুকছিলেন-সারা হলে পিনপতন নীরবতা, সবাই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আইনস্টাইনকে সম্মান জানালেন।

জার্মানির সাথে কোন ধরণের সম্পর্ক রাখতেই রাজী নন আইনস্টাইন। জার্মানি চাচ্ছে আইনস্টাইনকে আবার জার্মান নাগরিকত্ব দিতে। জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাংক ইনস্টিটিউটের বৈদেশিক সদস্য হবার আমন্ত্রণ জানানো হলো তাঁকে। জন্মস্থান উলম শহর নাগরিকত্ব দিতে চাইলো। কিন্তু সব আহ্বানই প্রত্যাখ্যান করলেন আইনস্টাইন।

এবছর ইসরায়েল স্বাধীনরাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করেছে। তেল-আবিব থেকে তাদের রাজধানী জেরুজালেমে স্থানান্তরিত হয়েছে। আইনস্টাইন ইসরায়েলকে সমর্থন করেছেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের প্রথম পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। শুরু হয়ে গেছে আমেরিকার সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্নায়ুযুদ্ধ।

প্রকাশনা
এবছর প্রকাশিত আইনস্টাইনের উল্লেখযোগ্য পাঁচটি পেপারঃ

পেপারঃ২৬২ Why Socialism ? Monthly Review: An Independent Socialist Magazine, বর্ষ ১, সংখ্যা ১ (মে ১৯৪৯), পৃষ্ঠাঃ৯-১৫। এ প্রবন্ধে আইনস্টাইন পুঁজিবাদের কড়া সমালোচনা করেন। পুঁজিবাদী সমাজের অর্থনৈতিক আগ্রাসনের ফলে সমাজে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়, সমাজে দুর্নীতির জন্ম হয়। পুঁজিবাদের দাপটে গরীব মানুষ পঙ্গু হয়ে যায়, তাদের কোন অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা থাকেনা। আইনস্টাইনের মতে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই সাধারণ মানুষকে অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে পারে।

পেপারঃ২৬৩ In the Shadow of the Atomic Bomb. Solution Patriot, বর্ষ ৭, সংখ্যা ৩ (মে ১৯৪৯)। আইনস্টাইন আমেরিকাকে পারমাণবিক বোমা তৈরিতে পরোক্ষভাবে উদ্বুদ্ধ করলেও পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। এ প্রবন্ধে আইনস্টাইন পারমাণবিক বোমার কুফল ব্যাখ্যা করেছেন।

পেপারঃ২৬৪ Autobiographical Notes and Remarks to the Essays Appearing in the Volume. In Albert Einstein; Philosopher-Scientist, সম্পাদনাঃপল শিলপ (Paul A.schilpp)। লাইব্রেরি অব লিভিং ফিলোসফারস, সপ্তম খন্ড, পৃষ্ঠা ৩-৯৪। প্রকাশকঃ ওপেন কোর্ট, লা সালি (১৯৪৯)। আইনস্টাইন তাঁর সংক্ষিপ্ত বৈজ্ঞানিক আত্মজীবনী অটোবায়োগ্রাফিক্যাল নোটস লিখেছেন পল শিলপের অনুরোধে।

পেপারঃ২৬৫ Foreword. In the Hebrew University of Jerusalem, 1925-1950. প্রকাশকঃগোল্ডবার্গ প্রেস, জেরুজালেম (১৯৪৯)। জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত সংকলনের ভূমিকায় আইনস্টাইন ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব ও লক্ষ্য সম্পর্কে আলোকপাত করেন।

পেপারঃ২৬৬ On the Motion of Particles in General Relativity Theory. সহলেখকঃলিওপোল্ড ইনফেল্ড। Canadian Journal of Mathematics, সংখ্যা ৩ (১৯৪৯), পৃষ্ঠাঃ২০৯-২১৪। আইনস্টাইন ও ইনফেলড এই গবেষণাপত্রে দেখান যে জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটির জন্য শুধুমাত্র ফিলড ইকুয়েশানই যথেষ্ট।

১৯৫০
আইনস্টাইনের শরীর ক্রমশ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারছেন তাঁর সময় প্রায় শেষ। মৃত্যুর পরে তাঁর গবেষণাপত্র ও অন্যান্য সম্পদের বিলিবন্টনের জন্য উইল করলেন তিনি। তাঁর বন্ধু অটো ন্যাথানকে দায়িত্ব দিলেন উইল বাস্তবায়নের। আর সেক্রেটারি হেলেন ডূকাসকে দায়িত্ব দিলেন তাঁর গবেষণাসহ সবধরণের কাগজপত্রের দেখাশোনার। সব গবেষণাপত্র ও গবেষণাসংক্রান্ত দলিল দান করলেন জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটিতে। অটো ন্যাথান ও হেলেন ডুকাসের মৃত্যুর পরে সব দলিলপত্র হিব্রু ইউনিভার্সিটিতে দেয়া হবে- এরকম সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। আইনস্টাইন তাঁর বেহালাটি দান করে দিলেন তাঁর নাতি বার্নহার্ডকে। আর টাকাপয়সা যা থাকবে তা পাবেন হেলেন ডুকাস, ছেলে হ্যান্স এলবার্ট ও এডোয়ার্ড এবং সৎকন্যা মার্গট।

ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ঘোষণা করলেন যে, আমেরিকা হাইড্রোজেন বোমা তৈরি করেছে। এ বোমা পারমাণবিক বোমার চেয়ে শক্তিশালী। ধারণা করা হচ্ছে হাঙ্গেরিয়ান-আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী এডোয়ার্ড টেলার এই বোমার জনক। আইনস্টাইন খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন এ ঘটনায়। তিনি টেলিভিশন মাধ্যমে এ বোমার ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে জাতিকে সতর্ক করে দিতে চাইলেন। টেলিভিশনে প্রচারিত বিবৃতিতে তিনি বললেন, হাইড্রোজেন বোমা যদি কখনো ব্যবহার করা হয়, পৃথিবী তেজস্ক্রিয়তায় ভরে যাবে, কোন প্রাণীই আর বেঁচে থাকবে না।

আমেরিকান সিনেটর জোসেফ ম্যাককারথি কমিউনিস্ট অনুসন্ধান শুরু করলেন। তাঁর ধারণা কমিউনিস্ট ও কমিউনিস্ট সমর্থকে ভরে গেছে আমেরিকান স্বরাষ্ট্র দপ্তর। কমিউনিস্ট শিকারের উদ্দেশ্যে পরবর্তী চারবছর ধরে ম্যাককারথি শতশত মানুষকে সন্দেহবশত হয়রানি করেছেন। বিশেষ করে বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী ও শিল্পীদের পেছনে গোয়েন্দা লেলিয়ে দিয়েছেন তিনি। কংগ্রেসে হাউজ আন-আমেরিকান অ্যাক্টিভিটিজ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কাউকে কমিউনিস্ট বলে সন্দেহ হলেই তাঁকে এই কমিটির সামনে নিয়ে আসা হয়। আর কমিটির নানারকম প্রশ্নের উত্তর দিয়ে, উত্তরের সপক্ষে প্রমাণ দাখিল করে সেই ব্যক্তিকেই প্রমাণ করতে হয় যে তিনি কমিউনিস্ট নন। অনেককে আবার চিঠি দিয়ে কমিটির সামনে হাজির হবার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। আইনস্টাইন তীব্র নিন্দা করলেন এ ব্যবস্থার। কমিটির সামনে উপস্থিত হয়ে নিজেকে কমিউনিস্ট নন প্রমাণ করার জন্য চিঠি পেয়েছেন এরকম অনেককেই আইনস্টাইন পরামর্শ দিয়েছেন কমিটিকে সহযোগিতা না করার জন্য। কারণা তিনি মনে করেন, এ ব্যবস্থা মানুষের নাগরিক স্বাধীনতার পরিপন্থী।

প্রকাশনা
এবছর প্রকাশিত আইনস্টাইনের সাতটি উল্লেখযোগ্য রচনাঃ

পেপারঃ২৬৭ On the Moral Obligation of the Scientist. Impact, বর্ষ ১(১৯৫০), পৃষ্ঠাঃ১০৪-১০৫। এ প্রবন্ধে আইনস্টাইন বিজ্ঞানীদের নৈতিক দায়িত্বের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

পেপারঃ২৬৮ Physics,Philosophy, and Scientific Progress.Journal of the International College of Surgeons, সংখ্যা ১৪ (১৯৫০), পৃষ্ঠাঃ৭৫৫-৭৫৮। ইন্টারন্যাশনাল কলেজ অব সার্জনস এর সমাবর্তন অনুষ্ঠানের জন্য আইনস্টাইনের এই ভাষণটি রেকর্ড করা হয় এবং অনুষ্ঠানে তা বাজিয়ে শোনানো হয়। আইনস্টাইন পদার্থবিজ্ঞান ও তার দর্শন প্রসঙ্গে আলোচনা করেন। পরে ভাষণটি কলেজের জার্নালে প্রকাশিত হয়।

পেপারঃ২৬৯ An Open Letter to the Society for Social Responsibility in Science. Science, সংখ্যা ১১২(১৯৫০), পৃষ্ঠাঃ৭৬০-৭৬১। বিজ্ঞানীদের সামাজিক দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সোসাইটি ফর সোশাল রেসপনসিবিলিটি ইন সায়েন্স। ডিসেম্বরের ২২ তারিখে সায়েন্স ম্যাগাজিনের চিঠিপত্র কলামে প্রকাশিত এই চিঠিতে আইনস্টাইন বিজ্ঞানীদের সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্য সোসাইটি গঠনের প্রশংসা করে মনে করিয়ে দেন যে, সমাজের মানুষের চিন্তা চেতনার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হলে এধরণের প্রতিষ্ঠান সমাজের কোন উপকারেই আসবে না। তিনি ন্যুরেমবার্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন যে, আত্ম-দায়িত্ববোধ থেকে রেহাই পেতে পারেন না কেউ।

পেপারঃ২৭০ On the Generalized Theory of Gravitation. Scientific American, বর্ষ ১৮২, সংখ্যা ৪ (এপ্রিল ১৯৫০), পৃষ্ঠাঃ১৩-১৭। সায়েন্টিফিক আমেরিকানদের সম্পাদকের অনুরোধে লিখিত এ প্রবন্ধে আইনস্টাইন ক্ষেত্র পদার্থবিজ্ঞান বা ফিলড ফিজিক্সের ভিত্তি স্থাপন করার জন্য তাঁর গাণিতিক অনুসন্ধানের বিবরণ দেন।

পেপারঃ২৭১ The Bianchi Identities in the Generalized Theory of Gravitation. Canadian Journal of Mathematics, বর্ষ ৪ (১৯৫০), পৃষ্ঠাঃ১২০-১২৮। ইউনিফায়েড থিওরি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছাড়েন নি আইনস্টাইন। এ গবেষণাপত্রে তিনি আবারো গ্র্যাভিটেশানের একটি সাধারণ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন।

পেপারঃ২৭২ Foreword ফিলিপ ফ্রাঙ্কের Relativity:A Richer Truth বইতে মুখবন্ধ হিসেবে আইনস্টাইনের এ লেখাটি প্রকাশিত হয়। প্রকাশকঃ জোনাথন কেইপ, লন্ডন (১৯৫১)।ফিলিপ ফ্রাঙ্ক এই বইতে সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে আপেক্ষিকতার প্রয়োগ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। আইনস্টাইন এই বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন, মাঝে মাঝে যুক্তির সাথে নীতির মিল নাও থাকতে পারে। কিন্তু সামাজিক বা ব্যক্তিগত নীতিগুলো-যৌক্তিক চিন্তা ও ব্যবহারিক জ্ঞানের মাধ্যমে আরো গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়। বিজ্ঞানে যেমন কোন ধারণা পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে গ্রহণ বা বর্জন করা হয়, সেরকম সামাজিক নীতিগুলোও পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে গ্রহণ বা বর্জন করা যেতে পারে। সমাজ ও ব্যক্তির উপকারে আসে এরকম নীতি গ্রহণযোগ্য হবে, আর ক্ষতিকারক হলে সেরকম নীতি বাদ দেয়া যেতে পারে।

পেপারঃ২৭৩ Message to the Italian Society for the Advancement of Science. ইটালিয়ান সোসাইটি ফর দি এডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স এর বেয়াল্লিশতম সভা উপলক্ষে আইনস্টাইন এই লেখাটি পাঠিয়েছিলেন। পরে তা প্রকাশিত হয়েছে ইউনেস্কো কর্তৃক প্রকাশিত জার্নাল ইমপ্যাক্ট এর হেমন্তকালীন সংখ্যায়। আইনস্টাইন বলেন, মানুষ যে কোন ব্যাপারেই সত্যকে খুঁজে বের করতে চায়, সত্যকে বুঝতে চায়। সেটাই মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জটিল সামাজিক ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে সহজ সত্যকে খুঁজে বের করা সহজ নয়। বৈজ্ঞানিকরা সহজ সত্য খুঁজতে গিয়ে জটিল জটিল সমস্যায় পড়ে যান। মানুষের মুক্তির জন্য গবেষণা করতে গিয়ে দেখা যায় তাঁরা এমনকিছু তৈরি করে ফেলেন যা দিয়ে মানুষকে সহজেই শৃঙ্খলিত করা যায়।




No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 4

  This is my first photo taken with my father. At that time, I had just moved up to ninth grade, my sister was studying for her honors, and ...

Popular Posts