Monday, 31 March 2025

বাবা - ৭

 


আমি তখন ক্লাস থ্রি। এসএসসি পাস করার পর দিদি কলেজে পড়ার জন্য শহরে চলে গেল। আমার আনন্দ এবং বিপদ একসাথে হাজির হলো। সে বাড়ি থেকে চলে যাওয়া মানে আমার মুক্তির আনন্দ। সারাক্ষণ তার খবরদারি থেকে মুক্তি।  ইচ্ছেমতো পুকুরে দাপাদাপি করার স্বাধীনতা, স্কুল ছুটির পর সোজা বাড়িতে না এসে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলে ধুলোকাদায় মাখামাখি হবার স্বাধীনতা। প্রতিবেশীদের নালিশ শুনে যার দোষই হোক, আমার পিঠেই দমাদম কিল মারতো সে। সেইসব

Monday, 24 March 2025

মহিউদ্দিন মোহাম্মদের ‘টয়োটা করোলা’




 ___________________________

টয়োটা করোলা ।। মহিউদ্দিন মোহাম্মদ ।। জ্ঞানকোষ প্রকাশনী ।। প্রকাশকাল জানুয়ারি ২০২৩ ।। প্রচ্ছদ - সব্যসাচী মিস্ত্রী ।। মূল্য ২৮০ টাকা ।। ১০৪ পৃষ্ঠা।।
____________________________


মহিউদ্দিন মোহাম্মদের মুক্তগদ্যের প্রথম সংকলন ‘আধুনিক গরু-রচনা সমগ্র’ পড়ার সময় তাঁর শক্তিশালী গদ্যে মুগ্ধ হয়েছি। তাই জ্ঞানকোষ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত তাঁর দ্বিতীয় বই ‘টয়োটা করোলা’র প্রতি প্রত্যাশা ছিল আরো বেশি। তেরোটি নাতিদীর্ঘ গল্পের সংকলন ‘টয়োটা করোলা’। আমি

Thursday, 20 March 2025

মহিউদ্দিন মোহাম্মদের 'আধুনিক গরু-রচনা সমগ্র'

 




বেশ কয়েকদিন ধরে একটানা পড়ে শেষ করলাম মহিউদ্দিন মোহাম্মদের পাঁচটি বই। কোনো একজন লেখকের প্রকাশিত ছয়টি বইয়ের মধ্যে পাঁচটি পড়ে ফেলা – কম কথা নয় আমার জন্য। বিশেষ করে যেখানে দীর্ঘদিন বাংলা পরিমন্ডলের বাইরে থাকলে – বাৎসরিক বইমেলা থেকে দূরে থাকতে হলে – বই তো দূরের কথা, বইয়ের খবরও যথাসময়ে এসে পৌঁছায় না। 

হিশেব করে দেখা যাচ্ছে এই লেখকের প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছে ২০২২ সালে। কম সময়ের মধ্যেই

Friday, 14 March 2025

জামাল নজরুল ইসলাম: মহাবিশ্বের নিয়তির সন্ধানে

 




বিজ্ঞানজগতে বাংলাদেশের গর্ব বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম। তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান ও কসমোলজিতে তাঁর যুগান্তকারী অবদান রয়েছে। তাঁর মৌলিক গবেষণাগুলিকে প্রধানত পাঁচটি ধাপে ভাগ করা যায়: কণা পদার্থবিজ্ঞানের ম্যান্ডেলস্ট্যাম রিপ্রেজেন্টেশানের গাণিতিক বিশ্লেষণ, জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটির আইনস্টাইন-ম্যাক্সওয়েল সমীকরণের সঠিক সমাধান, মহাজাগতিক ধুলোকণার ক্ষেত্র সমীকরণের সমাধান, মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি, এবং গাণিতিক অর্থনীতি।

Saturday, 8 March 2025

বিশ্ব নারী দিবস ২০২৫

 




এবছরও ধুমধাম করে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ২০২৫ সালের নারী দিবসের মূল স্লোগান – For All women and girls: Rights, Equality and Empowerment. সকল নারীর জন্য অধিকার, সমতা এবং ক্ষমতায়ন।

যতই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা থাকুক না কেন,  নারীর সম্মান এবং নারীর অধিকার দুটো ভিন্ন বিষয়। পৃথিবীর প্রায় সব সংস্কৃতিতেই নারীদের সম্মান দেয়া একটি লোকদেখানো ব্যাপার। উন্নয়নশীল অনেক

Saturday, 1 March 2025

রিফাৎ আরার 'মেলবোর্নে দেশ বিদেশ' - পর্ব ৩৮-৪৪

 



৩৮

 

রনিকে বললাম, রনিবাবা, বোটানিক্যাল গার্ডেনটা আরেকবার ঘুরে দেখতে চাই

          শনিবারের ছুটির দিনে রনি আমাদের নিয়ে গেল বোটানিক্যাল গার্ডেনে। অন্য যে দিন এসেছিলাম সেদিন স্রাইন অব রিমেম্বারেন্স দেখে গার্ডেনে ঢুকতেই বেলা পড়ে এসেছিল। আজ সকাল সকাল আসাতে রৌদ্রস্নাত উজ্জ্বল বাগানে ঢুকেই মন ভাল হয়ে গেল।

          এখানে ঘাস যেন মখমল পাতা। ইচ্ছে করলেই যে কোন জায়গায় শুয়ে পড়া যায়। অনেককেই দেখলাম রৌদ্রস্নান করছে। এক তন্বী তরুণী উর্ধাঙ্গে অন্তর্বাস পরেই উপুড় হয়ে গভীর মনযোগে লেখাপড়া করছে। অনভ্যস্ত চোখ আমার সুন্দরী মেয়েটির দিকে বার বার যায়, আর ভাবি

রিফাৎ আরার 'মেলবোর্নে দেশ বিদেশ' - পর্ব ৩০-৩৭

 


৩০

 

আমাকে কেউ যদি প্রশ্ন করে তুমি কোন্‌ শহরের কোন্‌ দর্শনীয় স্থানটা সবার আগে দেখতে চাও? আমি বলব বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং একবার নয় অসংখ্যবার। কিন্তু দুঃখ হল চিড়িয়াখানার মত আমাদের বাংলাদেশের বোটানিক্যাল গার্ডেনও অযত্নে অবহেলায় এখন একরকম পরিত্যক্ত। গণমাধ্যমে মাঝে মাঝে সংবাদ আসে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই ইত্যাদির অকুস্থল হিসেবে। তাই একসময়ে অনেক বড় এলাকা নিয়ে ঢাকা চিড়িয়াখানার পাশে পরিকল্পিত বিশাল বোটানিক্যাল গার্ডেন নব্বইয়ের দশকেও দ্রষ্টব্য ছিল। এখন আর সেই পরিবেশ নেই। জনজীবনের নিরাপত্তার অভাবে নির্জনতার সুখ উপভোগের সুযোগ হারিয়ে গেছে। প্রচুর টাকাকড়ি থাকলে এখন আছে সাজানো ফুলদানির মত রিসোর্ট। আর

রিফাৎ আরার 'মেলবোর্নে দেশ বিদেশ' - পর্ব ২১-২৯

 



২১

 

আজ আমরা যাবো মেলবোর্ন স্টেট লাইব্রেরি, আর-এম-আই-টির সিটি ক্যাম্পাস, মেলবোর্ন সেন্ট্রাল যেটি একটি শপিং মল আর আন্ডারগ্রাউন্ডে ট্রেন স্টেশন।

          গাড়ি পার্কিং লটে রেখে আমরা প্রথমেই গেলাম স্টেট লাইব্রেরিতে। স্থাপত্যের দিক থেকে নান্দনিক এ ভবনটির উপরে বিশাল ডোম। এই ডোম এমনভাবে তৈরি যে দিনের বেলা ভিতরে আলোর দরকার হয় না। তবে প্রত্যেক পড়ুয়ার টেবিলে ছোট টেবিল ল্যাম্প আছে, যতক্ষণ সে পড়ছে ততক্ষণ জ্বলছে। যাবার সময় নিবিয়ে যাবে। এখানে কেউ আইন অমান্য করে না।

          নিরবতা লাইব্রেরি বা পাঠকক্ষের সবচেয়ে বড় শর্ত। এখানে সেটাই একশ শতাংশ কার্যকর। বিশাল উঁচু ভবনের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত থরে থরে সাজানো বই। বৃত্তাকার লাইব্রেরির এক জায়গায় দাঁড়ালে মোটামুটি পুরোটাই চোখে পড়ে। তরুণ-তরুণীরা নিজ দায়িত্বে পাঠে মগ্ন। কেউ তাদের জোর করে পাঠায়নি অথবা পড়ার নামে ক্লোজ-আপের বিজ্ঞাপনের মত কাটাকুটি খেলছে না।

          শিক্ষা এখানে বাণিজ্য হলেও তার মানদন্ড রক্ষায় এতটুকু নড়চড় নেইটাকা দিয়ে পড়ছ পড়ো, কিন্তু পাশ তোমাকেই করতে হবে। অথচ আমাদের দেশে গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে প্রতিষ্ঠিত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ওপর থেকেই নির্দেশ থাকে পড়া-লেখা পরীক্ষা এসব কোন বিষয় নয় শিক্ষার্থী টাকা দিচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় চলছে। সুতরাং তাকে পাশ করাতে হবে। বুয়েট থেকে পাস করার পর আমার মেয়েও কিছুদিন এরকম দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছিল এবং সেখানে কর্তৃপক্ষের লিখিত না হলেও মৌখিক নির্দেশও এমন ছিল।

          অথচ এখানে টাকা দিয়ে পড়লেও শিক্ষার মানদন্ড যথেষ্ট উঁচু এবং শিক্ষার্থী সত্যিকার অর্থেই শিক্ষাগ্রহণ করতে আসে। তাইতো স্টেট লাইব্রেরিতে যেমন দেখলাম নিবিষ্ট মনে প্রত্যেকেই লেখাপড়ায় মগ্ন, তেমনি আর-এম-আই-টির লাইব্রেরিতেও। এখানে পড়তে বসে এরা চোখে চোখে লুকোচুরি খেলে না, কিংবা অন্যের বিঘ্ন ঘটিয়ে চড়াস্বরে আলাপচারিতা করে না। এটা তারা করে লাইব্রেরির বাইরে শহরের পার্কে, বিনোদনের জায়গায়। যেখানে স্বাধীনভাবে তারা পরস্পরকে আলিঙ্গন করে হাঁটে, নিবিড় চুম্বনে ডুবে যায় তখন কাউকেই তারা পরোয়া করে না।

          তবে দেশে থাকতেও প্রদীপের কাছে জেনেছিলাম আর এখানে এসেও জানলাম সত্যিকারের অজিরা সাম্প্রতিককালে লেখাপড়ার প্রতি উদাসীন। ধনী দেশের সন্তান, সরকার ভাতা দেয়, আর শ্রমের বিভাজন নেই বলে প্রয়োজনে যে কোন কাজ (রাস্তায় সুরকি ঢালা থেকে সবরকম শারীরিক পরিশ্রমের কাজ) তারা করে আবার সে টাকা মদে আর বান্ধবীর পিছনে উড়িয়ে দেয়। বান্ধবী শব্দটি কি সর্বাংশে শুদ্ধ? কারণ এখানেতো বন্ধু-বন্ধু আর বান্ধবী-বান্ধবীতে বিবাহ-বহির্ভূত দাম্পত্যেও কোন সমস্যা নেই। আর ছুটির দিনে পার্কে, গাছের ছায়ায় অথবা বিশাল দালানের ছায়ায় তারা মনের সুখে পরস্পর সঙ্গসুধা পান করছে, আবার কাল সকালেই হয়তো তুচ্ছ বিষয়ে সম্পর্ক ভেঙে যাবে।

          স্টেট লাইব্রেরি ঘুরে আমরা গেলাম ডকল্যান্ড ইয়ার্ডে। ইয়ার্ডের জলসীমার দুপাড় ঘিরে উঁচু ভবন। একপাশে ইত্তেহাদ স্টেডিয়াম দেখে মনে হয় আকাশ ছুঁয়েছে। প্রদীপ দেখাল অপর পারে রনির অফিসভবন এরিকসন। জ্বলে ভাসছে সাদা জলপায়রা শঙ্খচিলের মত জলযান।

          আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখানে একপাশে কিছু দোকান, তার মাঝে দু-একটা চায়নিজদের। ক্রেতা আকর্ষণ করার মত আকর্ষণীয় কিছু পণ্য এসব দোকানেই আছে। অন্য দু-একটা যা আছে সেগুলো একেবারেই ম্যান্দা। ইয়ার্ডের ওয়াকওয়ে দিয়ে অনেকদূর পর্যন্ত হাঁটা যায়। মুক্তবায়ু, স্বচ্ছ জল, নীল আকাশ আজ একটু মেঘলা তবু কি মোহনীয়!

          ডকইয়ার্ড প্রাঙ্গনে দুটো নারী স্ট্যাচু আছে। এদের একজনকে দেখিয়ে প্রদীপ আমাকে জিজ্ঞেস করল, বলো তো, এই মেয়েটি দেখতে কেমন? সে কিন্তু একজন অভিনেত্রী। আমি খুঁচিয়ে দেখে বললাম, তেমন আহামরি মনে হচ্ছে না

          হুঁ হুঁ কেমন বোকা বনলে। এই ব্যক্তি পুরুষ, কিন্তু নারী সেজে সারাজীবন এত নিখুঁত অভিনয় করেছেন যে অনেকে বুঝতেই পারে না। তাঁর নাম এডনা। অস্ট্রেলিয়ানরা এই মানুষটিকে খুব ভালবাসে। তাই এর মূর্তি বানিয়ে রেখেছে।

          বেশ খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরির পর যথারীতি খিদে চাগিয়ে উঠল। তাই নান্দুসমেলবোর্নের নান্দুস আমাকে জাদু করেছে। সুদূর পর্তুগাল থেকে আসা এই খাবারটি অজিদেরও রসনা জয় করেছে। না হলে সর্বত্র এর এত কদর কেন?

          বিকেল পাঁচটার পর শহর আস্তে আস্তে নির্জন হতে শুরু করে সব পাখি ঘরে ফেরে, সব নদী ... । আমরাও ফিরলাম। দূষণমুক্ত, সহজগম্য মনোরম এ শহরে সারাদিন ঘুরেও ক্লান্তি আসে না। আর আমাদের ঢাকা শহরে? যার ললাটে জুটেছে কখনো এক কখনো দুনম্বর দূষিত শহরের তকমা। সেখানে পথেই নষ্ট হয় জীবনের কর্মঘণ্টা, যানজটে অ্যামবুলেন্সে আটকা পড়ে মৃত্যু ঘটে বহু অমূল্য জীবনের। 

 

*****

২২

 

দেশের খবর না শুনলে ভাল লাগে না। যত কিছুই করি মন পড়ে থাকে জননী জন্মভূমির সংবাদের জন্য। বাংলাদেশি খবরের চ্যানেলে জানা গেল সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে গত একমাসে চারবার আগুন লেগেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরবন ঢাল হয়ে আমাদের রক্ষা করে আর এই অরণ্যমাতা আমাদের অবহেলায় দিন দিন তার ঐতিহ্য আর প্রাণ হারাচ্ছে। বিশ্বঐতিহ্যের গৌরবময় অংশ হয়েও দিনে দিনে বিরান হতে চলেছে।

          প্রদীপকে বললাম, দেশে এসব শুনে শুনে এত অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, এ্রর মাঝেই খাই দাই দুঃখ করি আবার ভুলেও যাই। আর দূরে আছি বলে যে কোন কিছুই মস্তিষ্কের কোটরে অনুরণন ঘটায়। নইলে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে হানাহানি, তনু হত্যা, ছাত্রনেতা নাজিম হত্যা, সড়ক দুর্ঘটনা, রেলগাড়ির লাইনচ্যুতি সবই এত মনোযোগ কাড়ে, এত আগ্রহ নিয়ে দেখি যেন শুধু আমি মেলবোর্নে আসার পরই এসব ঘটছে। শিশুহত্যা, নারী নির্যাতন যা আমাদের জীবনের নৈমিত্তিক ঘটনা বলা যায় তাও আমাকে ভাবায়! আর এখানে মেলবোর্ন শহরে এসেছি দুমাসের মত হতে চলল, শুনিনি রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটেছে, কোন নারী নির্যাতিত হয়েছে অথবা হিংস্রতায় কোন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হায় ঈর্ষা, তুমি আমাকে এত জ্বালিয়ে মারছ কেন? আমি অতিসাধারণ গৃহজীবী, অতিসাধারণ প্রাণী, দেশে থাকতে এসব নিয়ে কখনও ভাবিনি।

          আর আমাদের ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোও বলিহারি দেশে যেন ভাল কিছু ঘটছে না। শুধু নেতিবাচক খবর আতাল-পাতাল খুঁড়ে বের করে আনে। কার আগে কে কত বেশি দুঃসংবাদ পরিবেশন করতে পারে সেই প্রতিযোগিতা।

          আমার বন্ধু কাজল তার মেয়ের কাছে এখানে এসেছে গতবছর। একদিন এক অজিবুড়ো আলাপচারিতায় তাকে নাকি বলেছিল বাংলাদেশ? ঐ যেখানে ডিজাস্টার আর নানারকম ক্রাইম ঘটে! কাজল জানতে চাইল, কে বলেছে তোমাকে এ কথা?

          তার সোজাসাপ্টা জবাব, কেন তোমাদের মিডিয়াতেই তো আসে।

          সেই থেকে দেশের মিডিয়ার ওপর কাজল খুব খাপ্পা। যেখানে প্রতিবেশী ভারতীয় মিডিয়ার বেশিরভাগ চ্যানেল বিনোদনে মশগুল, সেখানে আমাদের চ্যানেলে চ্যানেলে শুধু সংবাদ আর বিরতিহীন বিজ্ঞাপন। ভারতীয় সিরিয়াল এমন আধিপত্য বিস্তার করেছে আমরা যারা একদা বিটিভির একনিষ্ঠ দর্শক ছিলাম তারাও এখন আর বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলের প্রতি কোন আকর্ষণ বোধ করি না। অথচ ভারতীয় চ্যানেলের পারিবারিক কূটনামীর চেয়ে আমাদের নাটক অনেক ভাল ছিল। তবে ইদানীং নাট্যকাররা হুমায়ূন আহমেদকে নকল করে এত বাজে নাটক তৈরি করে তা দেখার আগ্রহই থাকে না। সবাই যে হুমায়ূন  আহমেদ হয় না এটা উপলব্ধি করলে তাদের স্বকীয়তাও থাকত, নাটকও জনপ্রিয় হত।

  

*****

২৩

 

রাতের খাবার শেষে প্রদীপ বলল, গডফাদার দেখেছ? মার্লো ব্রান্ডোর?

          আমি বললাম, সিনেমা পত্রিকার পোকা ছিলাম, তাই অনেক কিছু জানি, কিন্তু দেখিনি। গডফাদার বইয়ের অনুবাদও পড়েছি।

          তাহলে দেখ, ভাল লাগবে

ছবি দেখতে দেখতে প্রদীপ জানাল, এই ছবির জন্য মার্লো ব্রান্ডো শ্রেষ্ঠ অভিনেতার অস্কার পুরষ্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সেটা গ্রহণ করেননি

          কেন? আমার চোখ কপালে উঠল।

          কারণ, তার ভাষ্য ছিল এই নেতিবাচক চরিত্রের জন্য অস্কার দিলে মানুষ তো কুখ্যাত মাফিয়া ডন হতে অনুপ্রাণিত হবে

          আসলে কেউ কেউ পারে এতটা দৃঢ়তা দেখাতে। যেমন জাঁ পল সাঁত্রে নোবেল প্রাইজ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

          ছবি দেখে অনেক আড্ডা দিয়ে ঘুমাতে গেলাম।

 

*****

২৪

 

সকালে উঠে যে খবর পেলাম তাতে মনটা বিষাদে তিক্ত হয়ে গেল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক রেজাউল করিমকে হত্যা করা হয়েছে। শিক্ষক হত্যা বাংলাদেশে খুব সাধারণ বিষয়। রাজনৈতিক কারণে নিজের দলের কর্মী হত্যা সেটাও এখন স্বাভাবিক। অনেক সময় এসব দলাদলি আর হত্যার সংবাদে আমরা এখন আর বিচলিত হই না। শুধু যার বা যাদের সন্তান যায় দুঃখটা তাদেরই আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। আশি-নব্বইয়ের দশকে রাউফুন বাসুনিয়া অথবা নূর হোসেনের কিংবা ডাক্তার মিলনের মৃত্যু আমাদের যতটা শোককাতর করেছিল এখন আর ততোটা করে না। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই ৬৯এ ডক্টর শামসুজ্জোহা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত আদর্শিক বিরোধে বেশ কয়েকজন শিক্ষককে প্রাণ দিতে হয়েছে। সহকর্মী, ছাত্র-ছাত্রীদের মতে এরা একেবারেই নিজকর্মে নিবেদিত ভাল মানুষ ছিল। আজ কষ্ট হচ্ছে কাল ভুলে যাব। শুধু কষ্টের বোঝা জীবনভর বহন করবে তাঁর পরিবারের সদস্যরা। আর বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কেঁদেই যাবে।

  

*****

২৫

 

আজ আমরা যাব ক্যাপ্টেন জেমস কুকের কটেজ দেখতে। এই কটেজটির বৈশিষ্ট্য হল এর প্রত্যেকটি ইট পাথর, ব্যবহার্য জিনিস ইংল্যান্ডে ঠিক যেমন ছিল খুলে প্যাকেট করে আবার এখানে এনে ঠিক সেভাবে স্থাপন করা হয়েছে।

          ছোট্ট দোতলা বাড়ি। সরু খাড়া সিঁড়ি, সামনে বাগান, পিছনে কিচেন ও হার্ব-গার্ডেন। বাইরে একপাশে সেই সময়ের পোশাক, বনেটদেয়া টুপি পরে উৎসাহী ট্যুরিস্টরা ছবি তুলছেএকবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে অষ্টাদশ শতকে ফিরে যাওয়া। লেখার টেবিল, ঘর গরম রাখার পিতলের মালসা সবই যথাস্থানে রাখা আছে। সম্ভবত এটা তার আদি নিবাস নয়। পড়ার টেবিলে কাগজ কলম পূর্ববৎ রাখা। টানা ইটালিক অক্ষরে সুন্দর হাতের লেখা দেখে মুগ্ধ হতে হয়।

          নিচের তলায় মিউজিয়াম এবং স্যুভেনির শপ। ছোট্ট মিউজিয়ামের দেয়ালে কুকের সমুদ্র যাত্রার জলপথের মানচিত্র আঁকা। কি দুর্ধর্ষ নাবিক ছিল এই মানুষটা! পৃথিবীর সমুদ্রের আর মহাসমুদ্রের কতটুকু সে পাড়ি দিয়েছিল সে ধারণা মনে হয় তারও ছিল না।

 

*****

২৬

 

আজ রোববার, ২৪ এপ্রিল। এদেশে এসেছি পুরো দুমাস হলো। আজকের পরিকল্পনা প্রদীপের আবাসিক এলাকা ঘুরে দেখব। এই এলাকাটি মেলবোর্নের ইস্ট সাইড, কিছুটা অসমতল। বাড়িগুলোও বনেদি ছাঁদের। কিছু কিছু বাসার সামনে ফুলের বাগান এত বেশি পুষ্পশোভিত যে বিমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়। প্রদীপ বলল, এসব বাড়ির মালিক সাধারণত বুড়োবুড়ি হয়। অবসরের কর্মহীন জীবনে এরা বাগানের পরিচর্যা করে বেঁচে থাকার আনন্দ আহরণ করে। এক বাড়ির সামনে ছোট্ট একটা ডালিম গাছে অসংখ্য ডালিম ধরে আছে দেখে না দাঁড়িয়ে পারলাম না। পারি কীভাবে? ক্ষুদ্রাকৃতির একটি গাছে এত ডালিম এটাতো আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য। কিছুক্ষণ পর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় অনুভব করল আমরা ডালিম দেখছি, আর ঘরের ভিতর থেকে অন্য কেউ আমাদের ওপর লক্ষ্য রাখছে। তাড়াতাড়ি সরে পড়লাম। এদেশে নাগরিকতা কোন কিছুতেই অতিমাত্রায় কৌতূহল পছন্দ করে না।

  

*****

২৭

 

মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় দেখেছি। আর-এম-আই-টির বান্ডুরা ক্যাম্পাস এবং শহরের কয়েকটি ক্যাম্পাস এবং লাইব্রেরি দেখেছি। আজ বিকেলে যাব লা-ট্রোব ইউনিভার্সিটিতে। এটা প্রদীপের বাসার কাছে।

          শেষ দুপুরের দিকে যখন বিকেল নামছে তখন আমরা গেলাম লা-ট্রোব ইউনিভার্সিটিতে। অনেক বড় এরিয়া নিয়ে তৈরি এই ক্যাম্পাস। এত প্রচুর জায়গা যে এখনও অনেক নতুন নতুন ভবন তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের জন্য। বিশাল সবুজে ঢাকা চত্বর। আকাশমুখি সরল একহারা গড়নের বৃক্ষ, অসংখ্য হলদে ঝুঁটি কাকাতুয়া। পাহাড়ি ঝিরির ওপর সেতু দিয়ে ক্যাম্পাসের দুপাশকে যুক্ত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ভাবতে যে বিরাটত্ব চোখের সামনে ভেসে ওঠে, মনের মাঝে যে প্রসারতা আসে এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তেমনই। আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এর গুণ-মানের জন্য একসময় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হত। এছাড়া রাজশাহী, জাহাঙ্গীর নগর, চট্টগ্রাম এমনকি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ও আকার আকৃতি, স্থাপত্য আর শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক উচ্চস্তরে ছিল। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি, ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি, সবকিছু নিয়ে আজ এসব বিশ্ববিদ্যালয় ক্রমশ অধোগতির পথে । ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি নীতি-নৈতিকতা সকল মূল্যবোধ ধ্বংস করে দিচ্ছেঅন্যদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যবসার আখড়া। কোন কোনটা তো সাইনবোর্ডসর্বস্ব। অথচ এখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখে মনে হয় কেউ চাইলে জ্ঞানচর্চায় এখানে একজীবন কাটিয়ে দিতে পারে।

          সন্ধ্যা হয়ে আসছে। কিন্তু লা-ট্রোবের বিশাল আঙিনা ছেড়ে যেতে মন চাইছে না। যেতে নাহি মন চায়, তবু যেতে হয় কারণ সন্ধ্যার পর এখানে থাকা যাবে না। চলে যাচ্ছি তবু মনে হচ্ছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দর-সুশোভন পরিবেশের স্মৃতি আজীবন আমার চোখে লেগে থাকবে।

          বাসায় ফিরলাম এবার ফিরে যাওয়ার পালা। নাতি-নাতনী আর কন্যা-জামাতা অপেক্ষা করছে। সাউথ মোরাং থেকে টারনিটের দূরত্ব ৫৪ কিলোমিটার। গাড়িতে ৪৫ মিনিটের মত লাগে। অনেক দূরত্ব, কিন্তু রাস্তার মসৃণতা, সরলগতি, চলার শৃঙ্খলা সব মিলিয়ে সময় অতটা টের পাওয়া যায় না।

  

*****

২৮

 

টারনিটে ফেরার পর আবার নতুন করে পরিকল্পনা শুরু হল কোথায় যাওয়া যায়। এখন পূর্বাদের ছুটি চলছে। এসময় সাধারণত মা-বাবারাও ছুটি নিয়ে বাচ্চারাসহ বেড়াতে যায়। আমরা লিস্টে প্রথম রাখলাম ওয়্যারাবি সাফারি। টারনিট থেকে ওয়্যারবি খুব কাছে। রাকারা ওখানে শপিং-এও যায়। এর আগে ওরাও সাফারিতে যায়নি।

          সুতরাং সাব্যস্ত হলো প্রথমে সাফারি। যাওয়ার পথে দুপাশে সবজি ক্ষেত। মাটির নিচে থেকে পাইপ দিয়ে পানি দেয়া হচ্ছে। সজীব সুন্দর বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো ক্ষেত। রনি বলল, এখানে চাষীরা হচ্ছে সবচেয়ে ধনী। আবার সরকারও তাদের পেট্রোনাইজ করে। দুপাশে বিস্তীর্ণ ক্ষেতআবার মাঝে মাঝে রাস্তার দুপাশে বৃক্ষবীথি সবকিছুকে আড়াল করে যেন বলছচে আমায় দ্যাখ। মেঘ-রৌদ্রের মাখামাখি আবহাওয়া। কখনো মেঘে মুখভার কিন্তু পূর্বাভাস বলেছে বৃষ্টির কোন সম্ভাবনা নেই।

          সাফারির অনেক দূর থেকে দুপাশে গাড়ির লম্বা লাইন। রনি অনেক দূরে গিয়ে পার্কিং-এর জায়গা পেল। গাড়ি রেখে কিছুটা পিছনে হেঁটে আমরা সাফারিতে ঢুকলাম। ভিতরে ঢুকেই চক্ষু চড়কগাছ। প্রচুর লোক বাচ্চাদের নিয়ে এসেছে। বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে লোকজনকে আটকে রাখা হয়েছে। এত লোকজন, কিন্তু কেউ শৃঙ্খলা ভাঙছে না, কেউ কাউকে ধাক্কা দিচ্ছে না।

          ট্রেইল বাস একদলকে সাফারি ঘুরিয়ে এনে অন্য জায়গায় নামিয়ে দিচ্ছে। একসঙ্গে দুটো করে বিশাল বাস জোড়া লাগানো। গাইড সঙ্গে আছে। চালকও মাঝে মাঝে বর্ণনা দিচ্ছে। বিশাল এলাকাজুড়ে সাফারিজিরাফ, গন্ডার, উট, জলহস্তী, হরিণ, জেব্রা সবই আছে। কিন্তু নিরাপদ দূরত্বে সহ-অবস্থানে। পাখি, গাছপালা, জলহস্তী, ক্যাঙারু, কুমীর সবাই যে যার মতো নিজের জায়গায় ঘুরছে ফিরছে। ট্যুরিস্টরা ছবি তুলছে।

          এত বড় জায়গা তবু ঘুরতে ঘুরতে আবার আগের জায়গায় এসে নামলাম। এখানেও অনেক কিছু দেখার। আদিবাসীদের নানারকম মুখোশ দিয়ে সাজানো তোরণ, একটা গোল কটেজে একজন আফ্রিকান বাচ্চাদের সিংহের গর্জন এবং তার ডাকের নানারকম কসরৎ দেখাল। পেছনে সেই মহাদেশের আদিম বাজনার দ্রিমি দ্রিমি ধ্বনি এক ধরনের আবেশ তৈরি করছে। ভীষণ দক্ষ কালো মানুষটি স্পষ্ট ইংরেজিতে বাচ্চাদের সাথে মজা করল অনেকক্ষণ। তারপর তার স্লটের সময় শেষ হতে একটুও দেরি না করে গুডবাই জানিয়ে বিদায় নিল।

          আমরা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম হাঁস, পাখি, কাকাতুয়া। এরপর বানর আর সিংহ। বিরাট এলাকায় অনেক দূরে পাঁচ ছয়টি সিংহ-সিংহী বসে আছে। গ্রিলের ভিতর দিয়ে দেখতে হয়। তবে আফ্রিকান সিংহের যে তেজ অ্যানিম্যাল প্ল্যানেটে দেখি তার কণামাত্রও এখানে দেখলাম না। বিধ্বস্ত বুড়োটে হতাশ পশুরাজদের দেখে মনে হল আসলেই বন্যেরা বনে সুন্দর।

          সব প্রাণীর হয়তো সমান অভিযোজন ক্ষমতা থাকে না। কারণ এখানে তো খাবার, যত্ন কোনটারই অভাব নেই। নাহলে আমাদের দেশে যেমন চিড়িয়াখানায় পশুপাখির বরাদ্দ খাদ্য রক্ষকরাই খায়। যে কারণে ঢাকা শহরের একটিমাত্র সরকারি রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিষ্ঠিত চিড়িয়াখানায় অপরিচ্ছন্নতা, দুর্গন্ধ আর আধমরা পশুপাখি একবার দেখলে দ্বিতীয়বার দেখার শখ থাকে না। অথচ দুইকোটির কাছাকাছি মানুষের ঢাকা শহরে এই চিড়িয়াখানাটি বিনোদন ও প্রত্যক্ষ জ্ঞানের ক্ষেত্র হতে পারত শিশুদের জন্য।

          এখানে দেখছি শিশুরা কত মজা করছে, ছুটছে, খেলছে, লাফাচ্ছে। মা-বাবার পরোয়া করছে না। কারণ এখানে নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিদ্র। দুপুরে আমরা একটা গাছের ছায়ায় কাঠের টেবিল আর বেঞ্চে বসে সাথে আনা খাবার খেলাম।

          আমি যেখানেই যাই শিশু, প্রকৃতি, প্রাণিকূল সবই আমাকে মুগ্ধ করেবিশেষত গাছপালার নিবিড় সাহচর্য। এখানেও দেখছি সবুজ সুন্দর ঘাস, ছায়াদেয়া বৃক্ষ। লতানো গুল্ম আবার সর্বত্রই একটা সৌষম্য।

          দুপুর বিকেলের দিকে গড়াতে আমরাও ফেরার প্রস্তুতি নিলাম। 

 

*****

২৯

 

আজ আমরা যাব মেলবোর্ন শহরের সবচেয়ে উঁচু ভবন ইউরেকা টাওয়ারের উপরে স্কাই ডেকে। আটাশি তলার উপরে উঠে মেলবোর্ন দেখা। রনি আগেই টিকেট করে এনেছিল।

          আমরা রওনা দিলাম। বাচ্চাদের ছুটি থাকায় বেশিরভাগ অভিভাবক নিজ নিজ শিশুদের নিয়ে এসেছেন, পাশাপাশি তরুণ-তরুণী, প্রবীণ-প্রবীণাও কম নয়।

          লিফ্‌ট এত দ্রুত চলে আমার জানা ছিল না। লিফ্‌টে উঠার পর ধপ্‌ ধপ্‌ করে কি যে দ্রুতগতিতে সেটি আমাদের স্কাইডেকে তুলে দিল বুঝতে পারলাম না সেকেন্ডের সমষ্টিতে মিনিট পূর্ণ হল কি না।

          এবার দেখার পালা। নিচে শহরের রাস্তাঘাট আর গাড়িগুলোকে মনে হচ্ছে কোন শহরের পরিকল্পিত নকশা। স্কাইডেক আস্তে আস্তে ঘুরছে। মুভিং হওয়ার কারণে শহর এবং শহরের চারপাশ দেখা যাচ্ছে। দূরে সাগর, সেখানে শ্বেতকপোতের মত জাহাজ, নীল জলরাশিতে ভাসমান ইয়ট, অভিযাত্রীরা পাল তুলে যাত্রা করেছে কোন অজানার পানে তারাই কেবল জানে। টেলিস্কোপ দেয়া আছে কিছু কিছু জায়গায় দেখার সুবিধার জন্য। কিন্তু মানবচরিত্রে সর্বত্রই কিছু সাদৃশ্য রয়েছে যা সহজে উপড়ানো যায় না। কারণ দেখলাম যারা একবার টেলিস্কোপ দখল করেছে তারা আর সহজে সেটা ছাড়তে চাইছে না। অন্যদেরও যে দেখার অধিকার আছে সেক্ষেত্রে সেই বোধটা তাদের মগজ থেকে ডিলিট হয়ে গেছে।

          এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি বোটানিক্যাল গার্ডেন, সাইন অব রিমেম্বারেন্স। কিন্তু সব যেন স্যুভেনির। পূর্বা-দিব্য ভীষণ আনন্দিত। আমরাও। রনিবাবাকে থ্যাংকস জানালাম।


পর্ব ৩০-৩৭


রিফাৎ আরার 'মেলবোর্নে দেশ বিদেশ' - পর্ব ১৪-২০

 



১৪

 

এখানে বাংলাদেশি টিভি চ্যানেলের গ্রাহক হওয়া যায়। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটি বা প্রকৌশলগত সমস্যার কারণে কি না জানি না, একমাত্র সময় টিভি চ্যানেল ছাড়া আর কোনটাই ভাল দেখা যায় না। তাই বাসায় থাকলে সকালে উঠেই আমার সঙ্গীর কাজ হল টিভি ছেড়ে বাংলাদেশের খবর শোনা। যদি কোনদিন আবহাওয়াগত কারণে সংবাদ শুনতে সমস্যা হয়, সেদিন তার মুখে ভাত রোচে না, হজম হওয়াতো দূরের কথা।

          যদিও জানি টিভি অন করলেই বাংলাদেশের যেসব সংবাদ শুনব সেগুলো মন ভালো করার চাইতে সারাদিনের জন্য মনের ভেতর একটা কাঁটা বিঁধিয়ে রাখবে। যত হাসি আনন্দ করি, ঐ কাঁটাটা মাঝে মাঝেই খচ্‌ করে একটা খোঁচা মারবে বেলুনে পিন ফোটানোর মত। কারণ এমন দিন নেই, যেদিন দেশে ট্রেন-বাস দুর্ঘটনার কথা নেই। অধিক জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ এই দেশে আমরা নানা দুর্ঘটনায় পায়ের তলায় পিঁপড়ের মত পিষে যাই। শিশু নির্যাতন, নারী নির্যাতন, ,গুম, খুন, হত্যা, সামান্য কিছুতে দুইপক্ষের মারামারিতে আহত নিহত এরকম এরকম অসংখ্য ঘটনার বয়ান মনকে পীড়িত করে। অথচ আমাদের এই দেশে একটা বীজ পড়লে যত্ন ছাড়াই বড় হয়, ফুল ফোটায়, ফল দেয়। প্রকৃতির বিচিত্র সবুজ আর সীমাহীন নীলাকাশ, অসংখ্য নদী খাল বিল সব কিছুই এই বদ্বীপকে দিয়েছে উর্বর শস্যের শ্যামলিয়া। কিন্তু সংবাদে কোন ভাল সংবাদ নেই।

          এখন প্রচন্ড দাবদাহে পুড়ছে বাংলাদেশ। চৈত্র-বৈশাখের খরা, তার ওপর ভূমিদস্যু আর নদীখেকোরা মাঠ-বাট, খালবিল্‌ নদী জলাশয় সব এমনভাবে গিলেছে যে মানুষ পানির কষ্টে, গরমে কেবলই অসুস্থ হচ্ছে। শহরে-গ্রামে সর্বত্রই দূষণ। ইটভাটা, কলকারখানা, ট্যানারি-মানববর্জ্য সব মিলে এই দেশটাকে শ্রীহীন করে তুলেছে। আধুনিক নগরায়ন অবশ্য ধনীদের জন্য বিলাসবহুল বাড়িঘর, অ্যাপার্টমেন্ট আর কনভেনশন সেন্টার, হোটেল, রেস্টুরেন্ট রিসোর্টের পসরা সাজিয়েছে কিন্তু পরিবেশের কথা কেউ ভাবছে না। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষা ছাড়িয়ে মেঘনার দিকেও যাচ্ছে দূষণ। কোথাও বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা, কোথাও পানিশূন্যতা। আর বন-জঙ্গলতো যে রক্ষক সেই ভক্ষক। হায় বাংলাদেশ, হায় দুঃখিনী মা আমাদের।

          এসব খবরের মাঝেও হঠাৎ যে খবরে চমকে উঠলাম সেটা তনু হত্যা। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে এই তরুণীটির লাশ পাওয়া গেছে। ঘাতকের দল খুবলে খেয়ে প্রাণটুকুও রাখেনি। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অনার্সের ছাত্রী তনু নাটক করত। লেখাপড়ার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে যুক্ত ছিল। টিভিতে ওর ছবিটা দেখছি মাথায় হিজাব পরা নির্মল সুন্দর একটি মুখ। এই মুখ দেখেও মায়া হয় না নরখাদকদের? এরাতো পশুরও অধম।

          কুমিল্লা শহর থেকে বিক্ষোভ বিষণ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। তনুর মা পাগলপ্রায়। কিন্তু হত্যার কোন ক্লু পাচ্ছে না। যাদের বাসায় যেত তাদেরকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। কি জানি এ হত্যারহস্য উদ্‌ঘাটন হবে কবে। কারণ সামরিক ঘাঁটির মত নিরাপদ জায়গায় এসব কাজতো সবাই করতে সাহস পাবে নানিশ্চয় এমন কেউ আছচে যাদের হাত অনেক লম্বা। আর প্রশাসন চাইলে অপরাধী ঠিকই ধরা পড়ে, আবার না চাইলে সাগর-রুনির হত্যার মত, ত্বকী হত্যার মত অনেক চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের কোনদিনও কোন সূত্র পাওয়া যায় না। এখানে বিবেক প্রশ্নকাতর কিন্তু বোধ নিরুত্তর।

 

*****

১৫

 

অস্ট্রেলিয়ায় প্রত্যেকটি আবাসিক এলাকায় শর্ত হচ্ছে পার্ক, লেক, খেলার মাঠ, প্রাইমারি স্কুল এগুলো থাকতে হবে টারনিট আবাসিক এলাকায় রাকাদের বাসার উল্টোদিকেই খেলার মাঠ, পার্ক, আরো কিছুটা হেঁটে গেলে লেক

          স্কুলগুলোতে প্রতি দশ সপ্তাহ ক্লাসের পর দুসপ্তাহ ছুটি এবং ফাইভ পর্যন্ত কোন পরীক্ষা নেই। শুধু শিক্ষকের মূল্যায়ন আছে শিক্ষার্থীর ক্লাস পারফরম্যান্স ও অন্যান্য কারিকুলামের ভিত্তিতে। এই এলাকায় অভিবাসী বেশি হওয়ার কারণে বেশিরভাগ স্কুলের শিক্ষার্থী এশিয়ান ও আফ্রিকানদের সন্তান। প্রথম শ্রেণিতে আমার নাতি দিব্যকে দেখলাম বাসায় টুকটাক প্র্যাকটিস করে আর একটা করে বই নিয়ে আসে। সে বইয়ের পৃষ্ঠাজুড়ে ছবি আর নিচে এক লাইনের বাক্য থাকে। এর ফলে যেটা হয় একই শব্দ ঘুরে ফিরে আসে। এর ফলে যেটা হয় একই শব্দ বারবার দেখতে দেখতে সে পড়তে শিখছে। একবার মনে হল। আহা বাংলায় যদি এমন হত।

          পরমুহূর্তেই মনে হল আরে বাবা, আমার মাতৃভাষা কি এত সহজ। তার একটা বিশেষ মর্যাদা এবং গৌরব আছে, আছে যুক্তাত্তর, ফলা, রেফ, মাথার ওপরে চন্দ্রবিন্দু আরো আরো কত কি। নাহ্‌ সম্ভব নয়। দরকার নেই আমরা না হয় আরেকটু কষ্ট করে শিখব, যেমন শিখছে চাইনিজ, রাশিয়ানরা।

          পার্কে যাই। আবহাওয়া ভাল থাকলে ঝলমলে রৌদ্রোজ্জ্বল দিন, নীল আকাশ আর তার বুকে সাদা মেঘের ভেলা। নানান দেশের নানা রঙের শিশু এবং অভিভাবক। গায়ের রঙ বা বর্ণই বলে দিচ্ছে এরা এশিয়ান এরা অজি, আবার এশিয়ানদের মধ্যে এরা সম্ভবত শ্রীলঙ্কান বা তামিল। পাঞ্জাবী আর শিখদের তো টুপিতে যায় চেনা। শিশুরাও মাথার চুল তালুতে বেঁধে আঁটোসাটো টুপি পরে থাকে। আর চাইনিজ, মালয়েশিয়ান, ইন্দো-জাপানিজ আলাদা করে চিনতে আমার কষ্ট হয়। তবে এই এলাকায় চায়নিজ তেমন চোখে পড়ে না। পার্কে যেমন ইচ্ছে খেলছে শিশুরা, দোলনায় দুলছে, দড়ি ধরে ঝুলছে, ধাঁধার পথ ধরে ওপরে উঠছে। সবাই আনন্দে মেতে আছে যেন আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে

          নাতি-নাতনি খেলে, আমরা বসে থাকি। আশেপাশে আমার চেয়েও অনেক বয়েসী মহিলা আছেন, আছেন তরুণী এবং বৃদ্ধ দাদুরাও। আমার ইচ্ছে করে কথা বলতে। ভাল ইংরেজিও জানি নাযেটুকু জানি সেটা এত টুটাফাটা যে মনে মনে ট্রান্সলেট করতে গিয়ে হিমশিম খাই। তবু ভরসা এখানে আমাকে কেউ চিনে না। তাই কখনও ইয়েস, নো, ভেরি গুড-এর মত ইংরেজি, আবার কখনো বলিউডি চালে হিন্দি বলার চেষ্টা করি। কিন্তু একজন বাংলাদেশিকেও পাই না। প্রবীণরা বেশি আসেন নাতি-নাতনির দেখাশোনা করতে। কারণ মা-বাবা চাকরি করে। কেউ কেউ অবশ্য বেড়াতে আসেন।

          একদিন এক পাকিস্তানি তরুণী-মাকে জিজ্ঞেস করলাম সে বাংলাদেশের নাম শুনেছে কি না। জানাল, শুনেছে। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ১৯৭১-এ তোমরা যে বাংলাদেশের কাছে যুদ্ধে হেরে গিয়েছিলে তা জান?

          মেয়েটি মাথা ঘুরিয়ে আমার দিকে ভাল করে দেখল। তারপর বলল, না।

          কয়েক মুহূর্ত পর সে আমার পাশ থেকে উঠে চলে গেল। আমার কেমন মনসুখ মনসুখ লাগল। একজন পাকিস্তানিকে তো বলতে পারলাম - তার দেশ পরাজিত।

          আমি এসব করি। প্রবীণাদের প্রশ্ন করি আপ কিসকে পাসসে রাহ্‌তে হ্যায় লেড়কা ঔর লেড়কি? তিনি জানালেন বেটা। তখন মনে পড়ল এটা তো লেড়কা-লেড়কি হবে না, হবে বেটা। তখন মনে হল, আহারে মহিলা আমার জ্ঞানের বহর দেখে মনে মনে হাসছেন। ধূর! তাতে কী এসে যায়। আমি কে, কী, কোথা থেকে এসেছি তা তো সে জানে না। মনে পড়ল একটা চুটকি এক অফিসের পার্টিতে একজন কর্মকর্তা বসকে দেখিয়ে জুনিয়র একজনের কাছে খুব দুর্নাম করছিল। অনেকক্ষণ পর জুনিয়রটি প্রশ্ন করল, জানেন আমি কে?

          না কর্মকর্তাটি বলল।

          আমি ওনার ছেলে

তখন কর্মকর্তাটি পাল্টা প্রশ্ন করল, তুমি জানো আমি কে?

          ছেলেটি বলল না

তাহলে তো কোন সমস্যা নেই। বলেই তিনি কেটে পড়লেন। আমাকে অবশ্য কেটেও পড়তে হল না। কারণ এ বিদেশ-বিভূঁয়ে আমাকে কেউই জানে না।

          আমার এসব কর্মকান্ডের মধ্যে নাতি-নাতনিদের নানা বসে বসে কেবল আফসোস করেন দেশে থাকা নাতনীটির জন্যে। আহা আমাদের অথৈতো এসব আনন্দ করার সুযোগ পায় না। ঘুরে ফিরে ফ্ল্যাটবাড়ির খাঁচায় বন্দী শিশু। এমনই তার ব্যাকুলতা পারলে অথৈকে উড়িয়ে নিয়ে আসে। আমি কিছুটা নির্বিকার। বাংলাদেশের লক্ষ কোটি শিশু অথৈদের মতই জীবন যাপন করে। আমরা তাদের জন্য কিছুই করতে পারিনি। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য আমাদের হয়ে অঙ্গীকার করলেও আমরা পালনে ব্যর্থ। তাই কষ্ট হলেও আমি চুপ করে থাকিকিন্তু ভদ্রলোক শিশুদের আনন্দ দেখে ওর কথা বলে, আমার ভিতরে কষ্ট আরও বাড়ে।

          দিব্য-পূর্বার স্কুল খোলা থাকলে ঐ সময়টুকুতে আমরা কোনদিন শপিং মলে যাই। কোনদিন বাসার কাছে লেকের পারে ঘুরতে যাই। এখানকার সজীব গুল্মলতা আমাকে ভীষণ আকর্ষণ করে। যত দেখি চোখ ফেরাতে পারি না। লেকে হাঁস সাঁতার কাটে। অনেক বড় বড় রাজহাঁস, ছোট পাতি হাঁস আর দুটো বড় ব্ল্যাক সোয়ান। ব্ল্যাক সোয়ান মনে হয় অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব কোথায় যেন পড়েছিলাম। সবাই বাসা থেকে পাউরুটি নিয়ে আসে। টুকরো করে ছুঁড়ে দিলেই কার আগে কে নেবে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়।

          লেকের ওপর বাঁধানো সেতু, পারাপার করা যায়। ওপারেও সুন্দর আবাসিক এলাকা। ছবির মত নয়, ছবিই বটে। কারণ হুশহাস শব্দে দুএকটা সচল মোটরযান গেলেও মানুষ চোখে পড়ে না।

          এ পারে লেকের ধারে কিছু বাড়ি ডুপ্লেক্স। এসব ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটবাড়িগুলোকে এরা বলে টাউন হাউজ। রাকাকে বলি, এখানে যারা থাকে তারা নিশ্চয় অনেক সুখি। এত সুন্দর দৃশ্য দেখতে পায়। বলেই মনে হল, সুখতো আসলে মনে। মনে সুখ না থাকলে পৃথিবী স্বর্গ হলেই বা কী আসে যায়।

 

*****

১৬

 

শপিং মলে গেলেই মেয়ে আমাকে কিছু না কিছু খাওয়ায়। আবার সবাই মিলে ছুটির দিনে ইন্দোনেশিয়ান রেস্টুরেন্টে যাই। একদিন গেলাম ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে। ওরে বাপ। সেকি ভীড়।  আমাদের এখানে অনেক বিয়ে বাড়িতে যেমন  যারা খাচ্ছে তাদের পরের ব্যাচে বসার জন্য চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এই কাজটা উভয়পক্ষের জন্য অস্বস্তিকর, তবু খালি পেটেতো ফিরে আসা যায় না। এখানেও উইকএন্ডে সেরকম ভীড়। আজ আবার এক নবদম্পতির বিয়ের পার্টি। সুতরাং ঠান্ডা গরম থেকে সবরকম পানীয় এবং খাবার আছে। এখানে মূল্য অনুপাতে খাবারের দাম বেশি বলে মনে হলো।

          এই রেস্টুরেন্টের মালিক কি কলকাত্তাইয়া? কারণ কলকাতার অর্থাৎ পূর্ব-বাংলা অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বাংলার মানুষদের মাঝে খাদ্যসংস্কৃতিতে বিরাট ব্যবধান। আমাদের বাংলাদেশের মানুষরা যেমন ভরপেট খেতে ভালবাসে তেমনি খাওয়াতেও ভালবাসে। অতিথি সত্যিই তাদের কাছে নারায়ণ। যত দরিদ্র গৃহস্থই হোক না কেন তার সাধ্যমত চেষ্টায় সে অতিথি আপ্যায়ন করে। অন্যদিকে কলকাতার মানুষদের কিপ্টেমি নিয়ে এই বাংলায় নানারকম কৌতুক প্রচলিত আছে। ওখানে নাকি কখনো খাওয়ার সময় ছেলে বাবার কাছে এলে বাবা জানতে চান, তুই নিশ্চয় খেয়ে এয়েচিস

          হ্যাঁ, হ্যাঁ আমি খেয়েচি, ও নিয়ে তুমি ভেবো না বলে ছেলেও বাবাকে আশ্বস্ত করে। আমার ছোট ভাই কমল প্রায় মজা করে, কারণ পশ্চিম বাংলার সাথে আমাদেরও আত্মীয়তা আছে। তার একটা গল্প এরকম দরজায় নক করার পর গৃহিনী জানতে চাইলেন, কে?

          বাইরে থেকে সাড়া এল, দরজা খোল পিসি, আমি জয়ন্তখাবারের সময় জয়ন্ত! পিসি গলা চড়িয়ে জবাব দিলেন কে জয়ন্ত, কস্মিন কালেও জয়ন্ত নামের কোন ভাইপো আমার ছিল না

     পিসি, আমি খেয়ে এসেছি, তুমি দরজা খোল- পিসি অমনি ছুটি এসে দরজা খুলে দুহাত বাড়িয়ে দিলেন, আয় বাবা জয়ন্ত, বুকে আয়

          আমার এক ছাত্রী রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। সেও বলেছিল, ম্যাডাম ওখানে দোকানে একটা মিষ্টিও কেনা যায়, আর কাটাপোনা মানে মাছের কাটাটুকরো অহরহ এক, দুটুকরো বিক্রি হয়। মনে পড়ছে একবার সানন্দা পত্রিকায় কিছু টিপ্‌স পড়েছিলাম। সেখানে একটা ছিল এরকম ধরুন আপনি নিজে খাবেন বলে রোস্ট রান্না করেছেন। এমন সময় বাড়িতে অতিথি এল তখন আপনি কী করবেন? একটা মোমবাতি কিছুক্ষণ জ্বালিয়ে রাখুন তাহলে অতিথি রোস্টের গন্ধ পাবেন না, আর আপনারও সমস্যা হল না।

          টিপ্‌স পড়ে হাসতে হাসতে দম ফাটার জোগাড়। কারণ মেহমান যদি আসে আমি বা আমরা তো খুশি হয়ে আগে রোস্ট তার পাতে তুলে দিয়ে মানসিক পরিতৃপ্তি লাভ করব।

          এখানেও দেখলাম স্টেনলেস স্টিলের ছোট ছোট বাটিতে এবং স্টিলের কড়াইতে খাবার পরিবেশন করা হয়েছে যা দামের তুলনায় যৎসামান্য। বসার চেয়ারগুলোও এতবেশি গায়ে গায়ে লাগানো যে ঠাসাঠাসি অবস্থা। অর্থাৎ যেখানে কুড়িজন বসতে পারে সেখানে চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশের ব্যবস্থা। আলো-আঁধারিতে ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক বাজছে, আবার হঠাৎ ধুমধাড়াক্কা গান। দেয়ালে কত্থক নৃত্যের ভঙ্গিমায় নারীর চিত্রপট। ঠিক আরাম পেলাম না। তবে এটাও ঠিক বিদেশিরা উইকএন্ডে রেস্টুরেন্টে যায় খেতে, পান করতে। তাই সাধারণ রেস্টুরেন্টগুলোতে অন্দরসজ্জার তেমন কোন আকর্ষণীয় আয়োজন নেই, অথচ আমাদের মধ্যমানের রেস্তোরাঁ বা চায়নিজ খাবারের দোকানগুলো এর চেয়ে অনেক বেশি ওয়েল ডেকোরেটেড।

          আমার নাতি দিব্যবাবুর পছন্দ ফিস-বার্গার। আর আমাদের চিকেন বা বিফ। সে একমাত্র ম্যাকডোনাল্ডসের ফিসবার্গারই খায়। অন্যত্র আমরা খেতে গেলে হাত তুলে বসে থাকে।

          তবে যত জায়গায় খেয়েছি আমার কাছে জম্পেশ লেগেছে নান্দুস এর মুরগি আর পটেটো ফিঙ্গার। তাই রাকা এবং প্রদীপের সাথে বাইরে গেলে আমার বায়না একটাই নান্দুস।

          মল-এর খাবারের দোকানগুলোতে গোটামুরগি যেভাবে বেক করে তা দেখে খাবারের রুচি তো পরে, তাড়াতাড়ি চোখ ফিরিয়ে নিতে পারলেই বাঁচি।

          শপিং মলগুলো এখানে বিকেল পাঁচটার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। শুধু কোল্‌স, আলডি, উলওয়ার্থস এরকম চেইনশপগুলো দিনরাত্তির খোলা থাকে। তখন খুব প্রয়োজন না হলে মানুষ দোকানে যায় না। কারণ তারা ভোরে উঠে কাজে যায়। দুপুরে হালকা খাবার খায়, সন্ধ্যায় ডিনার খেয়ে ঘুমাতে যায় অথবা ব্যক্তিগত কাজ করে। সপ্তাহে পাঁচদিন জীবন তাদের গতির ছন্দে বাঁধা। বাকি দুদিন মাস্তি। খাও-দাও, প্রচুর বেড়ানোর জায়গা আছে, বিচ আছে, ঘুরে বেড়াওহাসো, মাতো, ফুটি খেল অথবা দেখ।

          হ্যাঁ, ফুটি। অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। ক্রিকেট ওরা খেলে, কিন্তু ফুটি শিশু থেকে নারীপুরুষ সবার মাঝে ফুটির জন্য যে মত্ততা দেখলাম তা অবর্ণনীয়। যেদিন ফাইনাল থাকে সেদিন ট্রামে বাসে উপচে পড়া ভীড়রাস্তায় দলে দলে নারী-পুরুষ-শিশু সমর্থক দলের জার্সি গায়ে, হাতে ফুটি নিয়ে স্টেডিয়ামে যাচ্ছে। ভাগ্যিস সেদিন শহরে গিয়েছিলাম, না হলে বুঝতে পারতাম না মেলবোর্নে এত মানুষ থাকে।

          ফুটির বল ফুটবলের মত গোলাকার নয়। অনেকটা রাগবি খেলার বলের মত। দলে দলে নারীপুরুষ শিশু-প্রবীণ ফুটি দেখতে স্টেডিয়ামে যাচ্ছে। তাদের পোশাকে, চলায় বলায় আনন্দ উপচে পড়ছে। খাবারের অভাব নেই, অভাব নেই স্বাচ্ছন্দ্যের। তাই শৈশব থেকে এরা প্রাণোচ্ছল।

          আর আমরা বেগম রোকেয়া তাঁর এক লেখায় বলেছিলেন, ভাল আছি এই কথাটা বলতেও বাঙালির দ্বিধা। বেশি ভাল নেই চেহারা মলিন করে এই কথাটা বলা আমাদের সংস্কৃতি। তারপর প্রশ্নকর্তাকে হয়তো অবান্তরভাবে ভাল না থাকার পাঁচালী শুনিয়ে দিই। অথচ একবারও ভাবি না, এসব সমস্যা যাকে বলছি তারও আছে এরকম হাজারো সমস্যা। এটা শুধু প্রথম সাক্ষাতে ভব্যতার প্রকাশ, ভাব বিনিময় প্রথা।

          এদিক থেকে অজিরা অনেক প্রাণবন্ত। চোখাচোখি হলে হাই-হ্যালো করে। সবাই মিলে ফটো তোলার সমস্যা হলে এগিয়ে এসে নিজেরাই তুলে দেয়।

 

*****

১৭

 

বেশিরভাগ উইকএন্ডে আমাদের দাওয়াত থাকে রাকা-রনিদের বন্ধু-বান্ধবদের বাসায় প্রচুর খাবার, নানারকম ডেজার্ট সবই আমাদের মেয়েদের হাতে তৈরি কারণ আমরা যে ধরনের খাবার খাই সেগুলোর অনেকগুলোই এখানে দোকানে রেডিমেড পাওয়া যায় না তাছাড়া নিজের হাতে তৈরি খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করার আনন্দই আলাদা          এদের সবারই নিজের বাড়ি, তাই বাড়ির সামনে পেছনে সুন্দর বাগান এসব ফুল, লতা, গাছ সবই আমার জন্য নতুন একমাত্র গোলাপ ছাড়া তবে গোলাপও যেভাবে গাছেই তোড়া সেজে থাকে সেটাও দেখার বিষয়

          ঘুরে ফিরে দেখি, আমি আর সাজু আপা গল্প করি। নবীন, প্রবীণ, শিশু সবাই যার যার দল নিয়ে আনন্দ করে। শিশুদের এখানে সাথীর অভাব হয় না। এসব দেখে মনে হয় বাংলাদেশের শিশুরা ফ্ল্যাটবাড়ি আর অ্যাপার্টমেন্টের সুদৃশ্য খাঁচায় নিরাপত্তাহীনতার অভাবে এক অদ্ভুত মানসিকতা নিয়ে গড়ে উঠছে। এখন আবার তাতে যোগ হয়েছে মোবাইল, আইপ্যাড আর ট্যাব।

 

*****

১৮

 

অস্ট্রেলিয়া একটি মহাদেশ, তাই এর এক এক অঞ্চলে সময়ের হিসেব ভিন্ন ভিন্ন। আবার গ্রীষ্মে সূর্যের আলো সাশ্রয়ের জন্য দিনের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে দেয়া হয়। মেলবোর্নে ফেব্রুয়ারিতে আমরা যখন গেলাম তখন গ্রীষ্মকাল এবং সূর্য অস্ত যায় রাত নয়টার পরে। ফলে মেলবোর্নের সাথে আমাদের সময় ওদের শীতকালে ব্যবধান চার ঘন্টা আর গ্রীষ্মে পাঁচ ঘন্টা। অন্যদিকে দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থানের কারণে তাদের যখন গ্রীষ্মকাল, আমাদের তখন শীতকাল। প্রকৃতি ভারসাম্য রক্ষার জন্যই বোধহয় এমনটা করেছে।

 

*****

১৯

 

এখানে ট্রেনে বাসে চড়তে খুব আরাম। সরাসরি হুইলচেয়ারেও ওঠা যায়, কারণ প্লাটফরম আর গাড়ির দরজা একই সমতলে। আর আমাদের দেশে প্ল্যাটফরম থেকে ট্রেনের পাদানি এত উঁচুতে থাকে যে একটু পা ফসকালে ট্রেনের চাকার নিচে যাওয়াও অসম্ভব নয়। প্রথম এবং শেষ স্টেশন ছাড়া মধ্যবর্তী স্টেশনগুলোতে যে কী হুড়োহুড়ি করে উঠতে নামতে হয় তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন।

          যানবাহনে ওঠানামার নিয়ম হলো আগে নামবে, তারপর উঠবে। হায়রে নিয়ম! আমাদের ফেনী জেলার রেল স্টেশনে অনেক সময় মেইল ট্রেনগুলো প্ল্যাটফরমের বাইরে চলে যায়। তখন যারা সি অফ করতে আসে তারা আত্মীয় সম্পর্কিত মহিলা যাত্রীদের অনেক সময় কোলে করে ওঠায়। এরকম একটা ঘটনা আমার জীবনেও ঘটেছিল যা মনে পড়লে আজও মনে মনে হেসে উঠি। চাঁদপুরগামী মেঘনা এক্সপ্রেসে আমরা কজন ফেনী যাচ্ছিলাম। তো যেমন হয়, ফেনীর আগের স্টেশন কালীদহ স্টেশন পার হওয়ার আগেই আমরা তল্পিতল্পা নিয়ে প্রস্তুত। ট্রেন স্টেশনে ইন করার আগেই বেশ কিছু মানুষ ব্যাগবস্তা নিয়ে উঠে ট্রেনের দরজায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে নিজেদের লোকজন আর মালপত্র তোলার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করে। আমরাও কম যাই না। নোয়াখাইল্যা তো। হাউকাউ করে জায়গা নিয়ে শরীর ব্যাঁকাত্যাড়া করে নানান কসরত করতে করতে নেমে হাঁফ ছাড়লাম। যারা ওঠার তারা উঠল। সব মিলিয়ে কতক্ষণের ব্যাপার! দুই থেকে আড়াই মিনিট! কিন্তু গাড়ি থামবে পাঁচ মিনিট। সুতরাং বাকি আড়াই তিন মিনিট গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকল। মাছিমশাও উঠল না। হঠাৎ করে ফাঁকা হয়ে যাওয়া নির্জন স্টেশনে ট্রেনটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমার ভীষণ হাসি পেতে লাগল। আজও মনে পড়লে দৃশ্যটা আমাকে হাসায়

  

*****

২০

 

এই সাপ্তাহিক ছুটিতে আমরা প্রদীপের বাসায় যাবো। বিকেলে সে অফিস থেকে এসেছে। এ সপ্তাহের ছুটিটা আরো দুএকটা ছুটি মিলিয়ে বেশ লম্বাআমরাও যাচ্ছি শহরে ঘুরব, সাউথ মোরাং এর মাঠে ক্যাঙারু আসে সেগুলো দেখব। রাকাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠতে যাব, চোখ গেল চাঁদের দিকে। আজ পূর্ণিমা তিথি এই তিথিকেই তো বলে রাকা যে জন্যে আমি আমার প্রিয়তম কন্যার নাম রেখেছিলাম রাকা।

          কিন্তু এত্ত বড় চাঁদ! আমাদের বাংলাদেশে আমি এত বড় পূর্ণিমার চাঁদ দেখিনি। চারদিকে অপরূপ জ্যোৎস্না ঝরছে। কিন্তু চারপাশ এত নির্জন যে এত আলো ছড়িয়েও চাঁদটা যেন একটু বিষন্ন। বিশাল গোল চাঁদ, বিরাট আকাশে একাকী নিঃসঙ্গ। এখানে কি কেউ জ্যোৎস্নারাতে বনে যায় না! নাকি চাঁদকে নিয়ে আমরা যত রোমান্টিক, উন্নতদেশের মানুষ ততোটা নয়! কী জানি! এই বিশাল পৃথিবীর কিছুই না জেনে চিরটা দিন এক চাকাতে বাঁধা থেকে বেলাশেষের প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি।

          পথে যেতে যেতে চাঁদও আমাদের সাথে তার নিয়মে চলতে থাকল। প্রদীপ গাড়িতে রবীন্দ্রসঙ্গীত চালিয়েছে। আমি বিমনা, আনমনা হয়ে শুনছি আর তন্ময় হয়ে চাঁদ দেখছি। সৌন্দর্য উপভোগের জন্যে কি বয়স লাগে? আমার মনে হয় না। সৌন্দর্য চিরন্তন, চিরকালীন। শুনছি রবীন্দ্রসঙ্গীত, আবার একাকী নির্জন চাঁদ দেখে মনে পড়ছে জীবনানন্দকে। এমন নির্জন বিষন্ন জনশূন্য প্রান্তরের চাঁদের বর্ণনা আছে তাঁর কবিতায়।

          বাসায় পৌঁছে ডিনার শেষ করে প্রদীপ বলল, চলো তোমাকে বনে নিয়ে যাই চাঁদ দেখাতেতথাস্তু। আজ জ্যোৎস্নারাতে আমরা যাব বনে, বসন্তের এই মাতাল সমীরণে

          প্রদীপ ড্রাইভ করছে। আমি আর তার ভগ্নীপতি কথা বলছি। মাঝে মাঝে ভগ্নীপতির নানারকম রসাত্মক বাক্যবাণে বিদ্ধ হয়ে সে জঙ্গলের নির্জনতা খান খান করে হা হা হাসছে।

          অবশেষে আমরা জঙ্গলে প্রবেশ করলাম। বন-জঙ্গল সম্পর্কে আমাদের যে ধারণা এটা ঠিক সেরকম নয়। দুপাশে জঙ্গল, মাঝখানে মসৃণ পাকা রাস্তা শহরের অন্যদিকে চলে গেছে।

          চাঁদের আলো আর গাছের ছায়া কেমন একটা রহস্যময় নির্জনতা তৈরি করেছে। অথচ এই রহস্যময়তায় কোন ভয় তৈরি করছে না। কারণ এখানে সব জায়গায় মানুষ আর প্রাণির জন্য সুরক্ষার ব্যবস্থা আছে।

          প্রদীপ গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে রাস্তার একপাশে দাঁড় করাল। গাড়িতে বসেই জঙ্গল এবং চাঁদের আলো উপভোগ করতে হবে। বের হলেই জঙ্গলের ভয়ঙ্কর প্রাণির সামনে পড়ে বিপদ হতে পারে। আর গাড়িও চালাতে হবে সাবধানে। কারণ জঙ্গলের প্রাণিরা এখানে স্বাধীনভাবে বিচরণ করে, সুতরাং তাদের যেন কোন ক্ষতি না হয়। অস্ট্রেলিয়ায় বিশেষ করে ক্যাঙারুর দাপট বেশি। ওরা লাফিয়ে লাফিয়ে রাস্তা পার হয় একেবারে ড্যামকেয়ারলি। কেয়ারফুল হতে হবে মানুষকে।

          গাড়িতে বসে চাঁদের আলো উপভোগ করছি। কোনদিন কি ভেবেছি এই সৌভাগ্য হবে! কিন্তু হলো। মনে পড়ছে আমার মায়ের খাতায় লেখা গান চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে, উছলে পড়ে আলো। ও রজনীগন্ধা তোমার গন্ধ সুধা ঢালো

     মা মাঝে মাঝে গাইতেন। গানের প্রতি ভীষণ দুর্বলতা ছিল। তখন তো বই এত সুলভ ছিল না। রেডিও বা গ্রামোফোন রেকর্ডে শুনে হয়তো কপি করেছিলেন। তখন এটাই রীতি ছিল।

          চাঁদের আলো উছলে পড়ছে। কিন্তু রজনীগন্ধা? এদেশে কি রজনীগন্ধা ফোটে? অনেকক্ষণ চন্দ্রালোক উপভোগ করে জঙ্গলের আরো ভিতরের রাস্তা দিয়ে অনেকদূর গিয়ে বুকের মাঝে অপার্থিব সৌন্দর্যের স্মৃতিটুকু নিয়ে ফিরে চললাম গৃহপানে।

Latest Post

স্টিভ জবস-এর জন্মদিনে

  ১৯৫৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সান ফ্রানসিসকোর এক হাসপাতালে যখন ছেলেটির জন্ম হয় – তখন তার নাম রাখা হয়েছিল আবদুল লতিফ জানদালি। ছেলেটির জন্মদাতা প...

Popular Posts